চাকমা ভাষাঃ আদিবাসী ভাষাগত সঙ্কট ও সম্ভাবনার প্রেক্ষিত

0
72

একদা পৃথিবীতে ত্রিশ হাজার থেকে পাঁচ লক্ষ ভাষা ছিল বলে ভাষাবিদরা মনে করেন। যুদ্ধ, আগ্রাসন ও উপনিবেশিকতার ফলে ক্ষুদ্র জনসংখ্যা সম্পন্ন বা বিজিত জাতিসমূহের ভাষা হারিয়ে যেতে থাকে। তারই ফলশ্রুতিতে আজ ভাষার সংখ্যা এসে দাঁড়িয়েছে আনুমানিক ছয় হাজারে। ছয় হাজার ভাষার মধ্যে প্রায় তিন হাজারের অধিক ভাষা আজ বিলুপ্তি হতে চলছে। বিশেষতঃ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বসবাসরত আদিবাসী জাতিগোষ্ঠির ভাষা আজ চরম হুমকির মুখে। চাকমা ভাষাসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের দশ ভাষাভাষী এগারটি জাতিগোষ্ঠীর অবস্থাও তার ব্যতিক্রম নয়য়। বিশেষজ্ঞদের মতে কোন ভাষায় কথা বলার লোকের সংখ্যা যদি দশ হাজারের কম হয়, তাহলে সেই ভাষা রক্ষা করা কঠিন, পার্বত্য চট্টগ্রামেও দশ হাজারের কম জনসংখ্যাসম্পন্ন জাতিগোষ্ঠী রয়েছে, তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি আজ হুমকির মুখে। (আনুমানিক, ২০০২) স্মরণাতীত কাল থেকে বসবাসরত পার্বত্য চট্টগ্রামের দশ ভাষাভাষী আদিবাসী জুম্ম জনগোষ্ঠীর ভাষাগুলোর নমুনা হিসেবে সর্বপ্রথম শব্দ সংগ্রহ করেন ফ্রান্সিস বুকানন। তিনি ১৭৯৮ সালে একটি সরকারী কাজে পার্বত্য চট্টগ্রামে আসেন। ঐ সময় তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন ভাষার শব্দ সংগ্রহ করেন। তারপর ফেইরী (১৮৪১), হান্টার (১৮৬৮) এবং লেউইন (১৮৬৯) পার্বত্য চট্টগ্রাম ও আরাকানের। কয়েকটি জনগোষ্ঠীর ভাষার বিভিন্ন শব্দাবলী সংগ্রহ করেন। তবে তাদের কাজ শব্দ সংগ্রহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এরপর ডা. জর্জ আব্রাহাম গ্রীয়ারসন পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী ভাষাগুলোর তথ্যাদি সংগ্রহ করে প্রথম বারের মত প্রকাশ করেন। তিনি তাঁর “ল্যাংগুয়েজটিক সার্ভে অফ ইন্ডিয়া” নামক গ্রন্থে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী ভাষাগুলোর মধ্যে চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যা ভাষাকে ইন্দো-এরিয়ান পরিবারভুক্ত ও অন্য ভাষাগুলোকে তিব্বতী -চীন পরিবারভুক্ত হিসেবে শ্রেনীকরন করেন

তিব্বতি-চীন পরিবারভুক্ত ভাষাগুলোর মধ্যে মারমা ভাষাকে টিবেটো-বর্মি দল; ত্রিপুরা ভাষাকে বোড়ো দল; লুসাই, পাংখোয়া, বম, খিয়াং, খুমী, ম্রো ও চাক ভাষাসমূহকে কুকি- চীন দলভুক্ত করেন (সুগত ১৯৯৮)। বলাবাহুল্য ভিন্ন ভাষাভাষী আদিবাসী জুম্ম জনগোষ্ঠীরর মধ্যে চাকমারাই সংখ্যাগোরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী। পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকমা জনসংখ্যা চার লক্ষাধিক। এছাড়া প্রতিবেশি ভারতের ত্রিপুরা, মিজোরাম, অরুনাচল, আসাম ইত্যাদি রাজ্যেও চাকমাদের বসবাস রয়েছে। ভারতে চাকমা জনসংখ্যা আনুমানিক তিন লক্ষাধিক। এছাড়া রয়েছে তঞ্চঙ্গ্যা জনগোষ্ঠীরর লোক। চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যা ভাষার মধ্যে মিল রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাড়াও বার্মার আরাকান প্রদেশে তঞ্চঙ্গ্যাদের বসবাস রয়েছে। নৃতাত্ত্বিক দিক থেকে অন্যান্য আদিবাসী জুম্ম জনগোষ্ঠীর মতো চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যারাও মঙ্গোলিয় জনগোষ্ঠী ভুক্ত। অন্যান্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর মতো চাকমা ভাষা ও বর্নমালাও আজ হুমকির মুখে। বিশেষ করে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর আগ্রাসী সংস্কৃতি, চাকমা ভাষার সাহিত্য -সংস্কৃতি চর্চা ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাবহারের অভাব, সর্বোপরি বাংলা ভাষার সাথে নৈকট্যের কারনে মূল চাকমা ভাষা দ্রুত হারিয়ে যেতে বসেছে। ডা. গিয়ারর্সন চাকমা ভাষাকে ইন্দো-এরিয়ান ভাষাভুক্ত করলেও কারো কারো মতে এই ভাষা সিনো-টিবেটান (Sino – Tebetan) অথবা তিব্বতি- বর্মি (Tibete- Burman) পরিবারভুক্ত, আবার কারো কারো মতে প্রাকৃত অহমিয়া, তিব্বতি- বর্মি এবং বাংলা ও অন্যান্য ইন্দো-এরিয়ান ভাষার সংমিশ্রিত একটি ভাষা।বর্তমান চাকমা ভাষার অনেক শব্দ সংস্কৃত, পালি, প্রাকৃত প্রভৃতি প্রাচীন ইন্দো-এরিয়ান ভাষার সাথে মিল রয়েছে। আবার অনেক শব্দ তিব্বতি- বর্মি ও সিনো- টিবেটান ভাষার সঙ্গে বিশেষ করে টিবেটান, আরাকানি বা বার্মিজ, থাই, ককবরক ভাষার সঙ্গে মিল দেখা যায়। এ থেকে ধারনা করা হয় যে, ইন্দো-এরিয়ান ভাষার প্রভাবে মূল চাকমা ভাষার আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। চাকমাদের নিজস্ব লিপি রয়েছে। চাকমা লিপি বার্মিজ লিপি এবং প্রাচীন অহোম লিপির সাথে মিল রয়েছে। ভাষাতত্ত্ববিদ ডা. গিয়ারর্সনের মতে চাকমা লিপি দক্ষিণ -পূর্ব এশিয় খেমার (khmer) লিপি থেকে উদ্ভুত। ডা. গিয়ারর্সন তাঁর ” লেঙ্গুয়েজটিক সার্ভে অফ ইন্ডিয়া” গ্রন্থে বলেছেন ভারতবর্ষের পূর্ব সীমান্তে বিভিন্ন পাহাড়ি জাতির মধ্যে অহোম, খামতি, চাকমা ও আরাকানিদের ব্যবহৃত লিপির মধ্যে সাদৃশ্য রয়েছে। এসব লিপির সাথে কম্বোদিয়া, লাওস, মালয়, শ্যাম এবং বার্মার দক্ষিণাঞ্চলে ব্যবহৃত লিপির মধ্যে নিকট সম্পর্ক রয়েছে।

ডা. গিয়ারর্সন বলেছেন, দক্ষিন ভারতের ব্যবহৃত তামিল লিপির সাথে খেমার লিপির মিল রয়েছে। বার্মার ইতিহাসে জানা যায় যে, ষষ্ঠ শতাব্দীতে দক্ষিন ভারতের কৃষ্ণা এবং গোদাবরী নদী অঞ্চলের লোকেরা নৌপথে গিয়ে বার্মার দক্ষিন-পূর্ব এশিয়ায় ছড়িয়ে দেয় (সুগত ১৯৯৫) অন্যান্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীরর বর্নমালার মতো চাকমা বর্নমালাও ব্যবহারের অভাবে আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। এ যাবৎ চাকমা বর্নমালা ব্যবহার করে আসছেন ” লুরী” নামক একশ্রেণীরর ধর্মীয় পুরোহিত ও গ্রামের বৈদ্যরা। লুরীরা চাকমা বর্নমালায় তালপাতার উপর বিকৃত পালি ভাষায় ১৭খন্ডে বিভক্ত ধর্মীয় শাস্ত্র ‘আঘরতারা’ লিপিবদ্ধ করে রাখতেন এবং বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে উক্ত আঘরতারা থেকে সূত্রপাঠ করতেন। পার্বত্য চট্টগ্রামে এখন লুরীরা হারিয়ে গেছে। অপরদিকে এখনো গ্রামের বৈদ্যরা তাদের তালিকশাস্ত্র চাকমা বর্নমালায় লিখে রাখেন। বলা যায় বৈদ্যরাই এখনো চাকমা বর্নমালাগুলো বাঁচিয়ে রেখেছেন। অষ্টাদশ শতাব্দীতে চাকমা সাহিত্যের চারন কবি শিবচরন তাঁরর রচিত ‘গোজেনমালা’ নামক গীতিকাব্যে চাকমা লিপির ব্যবহার করেছিলেন। চাকমা ভাষা ও বর্নমালাকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষা প্রচলনকল্পে নানা উদ্যেগ নেয়া হলেও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে তা সফলতা অর্জন করতে পারেনি। ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮৬২ সালে চন্দ্রগোনায় প্রতিষ্ঠিত প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বাংলা ও ইংরেজী ছাড়া জুম্মদের চাকমা ও মারমা ভাষা শেখানো হতো যদিও পরবর্তীতে ইংরেজ শাসক ও পার্বত্য চট্টগ্রামের সামন্ত প্রভুদের উদাসীনতার কারনে আদিবাসী ভাষায় শিক্ষাদান স্থগিত হয়ে যায়। পরবর্তীকালে ১৯৪০ সালে মি. মিলার কতৃক ‘চাকমা প্রাইমার ‘নামক শিশু পাঠ্যপুএ প্রকাশ ও স্কুল পাঠ্য হিসেবে চালু করার প্রচেষ্টা করেন। খ্রিষ্টান ধর্মে দীক্ষিত করার সূক্ষ পরিকল্পনা ছিল এই অজুহাতে কতিপয় স্থানীয় নেতৃবৃন্দের বিরোধিতার কারনে তা চালু হতে পারেনি। চাকমা ভাষা ও বর্নমালাকে বাঁচিয়ে রাখতে ১৯৫৯ সালে নোয়ারাম চাকমা ‘চাকমার পত্থম শিক্ষা নামে একটি শিশুশিক্ষা পুস্তক প্রকাশ করেন। এছাড়া হরিকিশোর চাকমাও একটি বই প্রকাশ করেন। নোয়ারাম চাকমার রচিত বইটি পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকমা শিশুদের পাঠ্যবই হিসেবে ততৎকালীন টেক্সটবুক বোর্ডের অনুমোদন লাভ করে। তবে এ বিষয়ে আর কোন অগ্রগতি লাভ করেনি।১৯৬৯ সালের ৬ জুন পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন চার্কেল প্রধানদের ২৫তম অধিবেশনে জুম্ম জাতিসত্তাসমুহের মধ্যে যাদের স্বকীয় বর্নমালা রয়েছে; যেমন – চাকমা ও বার্মিজ ভাষাকে এই অঞ্চলের প্রাথমিক শিক্ষার পাঠ্য তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কিন্তু তৎকালীন সরকারের অনীহার কারনে তা বাস্তবে রূপ লাভ করাতে পারেনি

সত্তর দশকে জুমিয়া ভাষা প্রচার দপ্তর ( জুভাপ্রদ)- সহ কতিপয় সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংগঠনের উদ্যেগে চাকমা ভাষা ও সাহিত্যসহ জুম্ম জাতিগোষ্ঠীর ভাষা ও সাহিত্য চর্চার উদ্যোগ শুরু হয়। এরপর আশি দশক থেকে কিছু সাংস্কৃতিক সংগঠন, বিশেষতঃ জুম ঈথিকস কাউন্সিল ( জাক) এর উদ্যোগে চাকমা ভাষার কবিতা, গল্প, নাটক, গানের বই প্রকাশ করা হয়। জাকের উদ্যোগে ঢাকা সহ পার্বত্য চট্টগ্রাম ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চাকমা ভাষায় বহু নাটক মঞ্চস্থ করা হয়। এছাড়া উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইন্সটিটিউটের উদ্যোগে অন্যান্য আদিবাসী সহ চাকমা বর্নমালার প্রাথমিক শিক্ষা ও ভাষা কোর্স চালু করা হয়। কিন্তু এসব প্রয়াস অতন্ত্য সীমিত আকারের। মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহন ও মাতৃভাষা চর্চা একটি মৌলিক ও জন্মগত অধিকার। প্রতিটি গণতান্ত্রিক দেশসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মাতৃভাষায় শিশু শিক্ষার স্বীকৃত দিয়েছেন। ১৯৫৭ সালে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার ৪০তম অধিবেশনে গৃহীত কনভেনশন ১০৭- এ শিশুদেরকে তাদের নিজস্ব মাতৃভাষায় অথবা সম্ভব না হলে তাদের মধ্যে বহুল প্রচলিত ভাষায় শিক্ষা প্রদান করা স্বীকৃতি দেয়। বাংলাদেশ সরকার উক্ত কনভেনশনের স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু উক্ত কনভেনশনের স্বাক্ষরদাতা দেশের আদিবাসী হয়েও আজ দেশের ছেলেমেয়েরা নিজস্ব মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত রয়েছে। প্রাথমিক স্তরে আদিবাসী শিশুরা শিক্ষার ক্ষেত্রে যে বাঁধাগুলোর সম্মুখীন হয় তার মধ্যে অন্যতম হলো ভাষাগত সমস্যা। যে আদিবাসী শিশু বাংলায় কথা বলে না তাকে স্কুলে ভর্তির পর যদি বাংলা ভাষায় শিক্ষাদান দেওয়া হয় তা কতটুকু বাস্তবসম্মত তা একটু ভেবে দেখলে সহজেই বুঝা যায়। শিক্ষা সমাজের মুল্যবোধ এবং পুঞ্জিভূত জ্ঞান হস্তান্তরের মাধ্যমে সমাজকে যেমন অগ্রগতির পথে নিয়ে যায় তেমনি সমাজের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র‍্য ও স্বরূপ সংরক্ষন করে। শিক্ষার এইই ভুমিকা ও উদ্যোগকে সামনে রেখে শিক্ষাক্রম নির্ধারিত হয়ে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশ এ প্রচলিত শিক্ষাক্রমে আদিবাসীদের মুল্যবোধ, সংস্কৃতি, ভাষা, ইতিহাস ইত্যাদির কোনটিই স্থান পায়নি। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা বিষয়ক গবেষনায় দেখা যায় যে, আসিবাসী শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা থেকে ঝড়ে পড়ার হার ৬০% থেকে ৭০%।মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ৩০% থেকে ৪০%। গবেষনায় প্রতীয়মান হয়েছে যে, এই ঝড়ে পড়ার প্রধান কারন হচ্ছে ভাষাগত সমস্যা।

তার শিক্ষা জীবনের প্রথম দিনে যদি স্কুলে এসে শিক্ষকের কোন কথা বুঝতে না পারে, তাহলে সে কিভাবে শিক্ষা শুরু করবে? তার কাছে স্কুলটি যেমন অপরিচিত ছাত্র-ছাত্রী -শিক্ষক অপরিচিত সেক্ষেত্রে দ্বিতীয় দিনে সে কিভাবে স্কুলে যেতে উৎসাহিত হবে? এমন পরিবেশে একটি শিশুকে ঠেলে দেওয়ার অর্থ হলো স্কুল আর শিক্ষাকে তার কাছে দুর্বোধ্য করে তোলা। অপরদিকে স্কুলে এসে যদি সে নিজ মাতৃভাষায় কথা বলতে ও শিক্ষা গ্রহণ শুরু করতে পারে, সে শিক্ষা তার কাছে সহজ ও বোধগম্য হবে, শিক্ষা গ্রহনে সে উৎসাহিত হবে নিঃসন্দেহে। স্বভাবতই একটি শিশু মাতৃভাষায় যত সহজে শিক্ষাগ্রহণ করতে পারে অন্য ভাষায় কখনো পারে না। মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহনের এ গুরুত্ব অনুধাবন করে আদিবাসী শিশুদের জন্য প্রাথমিক শিক্ষায় আদিবাসী ভাষা প্রচিলনের অতীব প্রয়োজন। তাই আজ আদিবাসীদের শিক্ষা গ্রহনের ক্ষেত্রে প্রাথমিক শিক্ষায় আদিবাসী ভাষা প্রয়োগ ও প্রচলনের বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে সরকারিভাবে কোন পদক্ষেপ এ যাবত গ্রহন করা হয় নি। যদিও বাংলাদেশ সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে ১৯৯৭ সনের ২রা ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রামে মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদান বিষয়টি স্বীকার করে নেয়া হয়েছ্র এবং চুক্তি মোতাবেক সংশোধিত পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একথা ঠিক যে প্রাথমিক শিক্ষার আদিবাসী ভাষা প্রয়োগ ও প্রচলনের ক্ষেত্রে অনেক সমস্যা রয়েছে। যেমন লিপি সমস্যা, শিক্ষকের সমস্যা পাঠ্য বইয়ের সমস্যা ইত্যাদি। মূলত এগূলা কিন্ত কোন মৌলিক সমস্যা নয়। সবচেয়ে বড় সমস্যা হল রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব ও উদ্যোগহীনতা। সে ক্ষেত্রে মূল উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকে। তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন কার্যকর করতে হবে। পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশেষ শাসন ব্যবস্থার অধীনে প্রতিষ্ঠিত প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানসমূহ যেমন পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদসমূহ আদিবাসী ভাষাসমূহের লিপি সমস্যা সমাধান, পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যসূচি প্রণয়নের উদ্যোগ নিতে হবে। এক্ষেত্রে আদিবাসীদের ভাষা ভিত্তিক সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানসমূহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।বাংলাদেশে সাংবিধানিকভাবে একমাত্র বাংলা ভাষাকে স্বীকৃতির ফলে চাকমা জাতিগোষ্টিসহ বাংলাদেশের আদিবাসীদের বাংলা ভাষায় শিক্ষাগ্রহন এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে বাংলা ভাষা ব্যবহার করতে হয়। নিজ পরিবারে মাতৃভাষায় কথা বললে ও মাতৃভাষায় শিক্ষা লাভের কোন সুযোগ নেইই। তদুপরি নিজ মাতৃভাষা চর্চা ও ব্যবহারের কোন তাগিত না থাকায় আদিবাসী ভাষার মৌলিক শব্দের বদলেবিজাতীয় শব্দ অনুপ্রবেশ ঘটছে অবাদে। এছাড়া চাকমা ভাষাসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী ভাষা ও সংস্কৃতি ধ্বংসের অংশ হিসেবে স্থানের আদিবাসী নাম পরিবর্তন করে করা হচ্ছে বাঙালিকরণ বা ইসলামীকরণ। যেমন ‘হেদমারা’কে বাংলা করা হয়েছে হাতিমারা। ‘জগনাতলী’কে বলা হয় জাহানাতলী। ‘নাহ্নানচর’ কে করা হয়েছে নানিয়াচর। ‘খবংপর্য্যা’কে লেখা হয় ‘খবংপড়িয়া’। পার্বত্য চট্টগ্রামের সর্বোচ্চ পাহাড় ‘তাজিনদং’কে একসময় বিজয় নামকরন করার চেষ্টা করা হয়। ‘ফালিটাঙ্যা চুগ’কে ‘পাকিস্তান টিলা’ নামকরন করা হয়। রাঙামাটি (আসলে ‘রাঙা মাট্যা’) শহরের বুকে রাঙাপান্যার কাছে পুলিশলাইনের নামকরন করা হয় ‘সুখী নীলগঞ্জ’। তার পাশেই রয়েছে ‘ফিলিস্তান বাগ’ নামে একটি স্থান। এভাবে আজকে স্থানের আদিবাসী নামগুলিও অবলুপ্তি করা হচ্ছে। ভাষাসহ গোটা আদিবাসী সংস্কৃতিকে বিলুপ্তি পথে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। এভাবে আজ হারিয়ে যাচ্ছে চাকমা ভাষাসহ দেশের আদিবাসী জাতিসমুহের ভাষা।


লেখকঃ উৎপল চাকমা

তথ্যসূত্রঃ জুম ম্যাগাজিন (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here