বড়থলি, আরণ্যক জনপদ

0
67

০১

আর কত দূর, নিয়ে যাবে মোরে হে সুন্দরী?

বলো কোন পার ভিরিবে তোমার সোনার তরী।

                                                                 ———-রবি ঠাকুর।

নবম জাতীয় সাংসদ নির্বাচন সমাসন্ন। দীর্ঘ দুই বৎসর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় ভোটার তালিকা প্রণয়ন ও নির্বাচন অনুষ্ঠানের সকল কার্যাদি সম্পাদনের পর ২৯শে ডিসেম্বর ২০০৮ইং নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন যাতে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়, তার জন্য সরকার এবং সরকারী কর্মকর্তাদের চেষ্টা ও ব্যস্ততার অন্ত নেই। সারাদেশে সাজসাজ রব। বিলাইছড়ি উপজেলার মতো প্রত্যন্ত আঞ্চলেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। এখানেও সরকারী কর্মকর্তা ও জংনের মধ্যে উৎকণ্ঠা ও উৎসাহের কমতি নেই।

বিলাইছড়ি উপজেলা মোট নির্বাচন কেন্দ্র দশটি। এর মধ্যে চারটি কেন্দ্র দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে। বিশেষতঃ বড়থলি পাড়া বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র। যা বিলাইছড়ি উপজেলার সর্বদক্ষিণে সবচেয়ে দূরতম কেন্দ্র। এ চারটি কেন্দ্র নির্বাচনী মালামাল ও কর্মকর্তাদের পরিবহনের জন্য সরকার হেলিকপ্টারের ব্যবস্থা নিয়েছে।

অত্র উপজেলার কর্মকর্তাদেরও বিভিন্ন ভোট কেন্দ্রে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অনেকেই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পাওয়ার জন্য তদবির করছেন। আমাকে কোথায় দায়িত্ব দেওয়া হয়, এ নিয়ে আমার বুক দুরু দুরু করলেও আমার আশা বুক বেঁধে রইলাম। ব্যাংকের চাকরির সুবাধে হয়তোবা আমাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে। সাধারণতঃ তাই হয়ে এসেছে। তদুপরি ডিসেম্বরের ২৯ তারিখে ব্যাংকের অর্ধ-বার্ষিক হিসাব সমাপনীর কার্যক্রমের সে বিশাল কর্মযজ্ঞ, টাটে একজন কর্মকর্তা না থাকার অর্থ সঠিক সময়ে হিসাব সমাপনী সম্পাদন হয়তো বিলম্বিত হবে। কিন্তু আমাকে হতাশ করে নির্বাচনের পাঁচদিন পূর্বে চিঠি এসে  অগত্যা চিঠি রিসিভ করে জানলাম, আমার উপর সর্ব দূরবর্তী কেন্দ্র বড়থলি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভোট গ্রহণের দায়িত্ব বর্তেছে। কেন জানিনা এতে বরং রোমাঞ্চিতই হলাম। তাছাড়া অযাচিতভাবে হেলিকপ্টারে চড়াব দুর্লভ সুযোগ পেয়ে খুশিই হলাম।

প্রথমেই বলেছি বড়থলি পাড়া বিলাইছড়ি উপজেলার সর্ব দক্ষিণে ভারত ও বার্মা সীমান্তের কাছে দুর্গম অঞ্চলে অবস্থিত। বিলাইছড়ি থেকে সরাসরি কোন সড়ক কিংবা নৌ-যোগাযোগ নেই। পাহাড়িয়া দুর্গম ও জনশূন্য বিশাল এলাকা পায়ে হেঁটে যেতে কমপক্ষে তিনদিন লাগে। বিকল্প একটি রাস্তা আছে যা  বান্দরবান জেলার রুমার উপজেলা দিয়ে রুমা বাজার থেকে পায়ে হেঁটে সকাল ছয় ঘটিকায় বড়থলি পৌঁছা যায়। এখানে দূরত্বের হিসাব মাইলে হয়না। হয় ঘণ্টা হিসাবে ( যেমন অমুক জায়গা থকে অমুক জায়গায় যেতে একঘণ্টা লাগে)। পথে খাবার-দাবার, পানি নিতে হয়, কারণ পথিমধ্যে মাইলের পর মাইল জন মানবহীন গহীন অরণ্যানী।

০২

দ্বিধাভরে আজো প্রবেশ করোনি ঘরে, বাহিরে অঞ্চল করিলে সুরের খেলা

জানিনা কি নিয়ে যাবে যে দেশান্তরে, হে অতিথি আজি শেষ বিদায়ের পালা।

                                                                                                 ——-রবি ঠাকুর।

২৭-১২-০৮ ইং সকাল আট ঘটিকার আমার বাসায় উপজেলার পিয়ন এসে সংবাদ দিয়ে গেলো। যেনো ১০.০০ ঘটিকার মধ্যে নির্বাচন কার্যালয়ে গিয়ে নির্বাচনী মালামাল গ্রহণ করি। আমার সাথে সকল নির্বাচনী কর্মকর্তা ও সহকর্মীদের সংবাদ পাঠিয়ে আমি দ্রুত রেডি হয়ে নির্বাচন অফিসে উপস্থিত হলাম। প্রথমেই উপজেলা নির্বাহী অফিসার  বা সহকারী রিটানিং অফিসারের কাছে আমার উপস্থিতি জানিয়ে সালাম দিলাম। উপজেলা নির্বাহী অফিসার জনাব হাবিবুর রহমান, একজন সমাজসেবীও বটে। শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম ও অবদান বিলাইছড়িবাসী দীর্ঘদিন মনে রাখবে। এছাড়া উপজেলা উন্নয়ন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও মধুর ব্যবহারের জন্যও তিনি সুপরিচিত।

প্রখর ধী-শক্তি ও উন্নত চিন্তাধারা অধিকারী ইন্নোভেটিভ এই সুদর্শন মানুষটিকে দেখলে আমার প্রতিবারেই শ্রদ্ধা জাগে। অত্যন্ত অমায়িক ভাষার তিনি আমার কুশল জিজ্ঞাসা করলেন। নির্বাচন বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ কিছু নির্দেশনা দিয়ে তিনি আমাকে নির্বাচন কর্মকর্তা জনাই উৎপল বড়ুয়ার দায়িত্বে তুলে দিলেন। জনাব উৎপল বড়ুয়া সদা হাস্যজ্বোল একজন করিৎকর্মা অফিসার। তিনি আমাকে নির্বাচনী মালামাল যত্নের সাথে বুঝিয়ে দিলেন। আমি হাসি মুখে বিদায় নিলাম।

আমার সকল সহকর্মী আর নিরাপত্তা প্রহরীদের নিয়ে উপজেলা সদর ঘাটে বাঁধা ইঞ্জিন বোটে চড়ে বসলাম। রেইংখ্যং নদী বেয়ে আধ-মাইল উজানে দীঘলছড়ি সেনাক্যাম্প আমাদের আপাতঃ গন্তব্য। ওখান থেকেই আমাদেরকে হেলিকপ্টারে তুলে লেওয়া হবে। পঁচিশ মিনিটের মধ্যে সেনা-ক্যাম্পের ঘাঁটে পৌঁছলাম। সেনাক্যাম্প আমাদেরকে সাদরে গ্রহণ করা হলো। পাকা সিঁড়ি বেয়ে পাহাড়ের উপর হেলিপ্যাডে পৌঁছার পর,ক্যাপ্টেন হাসান আমাদের রিসিভ করলেন। হেলিপ্যাডের একধাপ উপরে পাহাড়ের উপর গোল চত্বর। চারদিকে সাজানো ঋজু বিশাল সব গাছের নীচে আমাদের ক্যাম্প চেয়ারে বসানো হলো। ক্যাপ্টেন হাসান অত্যন্ত সুদর্শন ও চৌকশ আর্মি অফিসার। অত্যন্ত অমায়িক সৌজন্য সহকারে তিনি আমাদের হেলিকপ্টার সম্পর্কিত বিষয়ে ধারনা দিলেন। এর মধ্যেই সবাইকে চা-নাস্তা পরিবেশন কর হলো।

এবার অপেক্ষার পালা। অপেক্ষা প্রহর আর শেষ হয় না। হঠাৎ হেলিকপ্টারের দূরাগত আওয়াজে আমাদের অপেক্ষার ছেদ পড়লো। আমরা তড়িৎ রেডি হয়ে নিলাম। হেলিকপ্টারের আওয়াজে,অজানা আশংকায় ও উৎকণ্ঠায় আমার তলপেটে সুড়সুড়ি অনুভব করলাম। আমাদের সারি বেঁধে  দাঁড় করানো হলো। শেণা সদস্যরা আমাদের গাইড করলেন।

সগর্জনে  হেলিকপ্টারটি ধীরে ধীরে হেলিপ্যাডে নামলো। ইঞ্জিন চালু অবস্থায় একপাশের দরজা খুলে পাইলট নেমে এলেন। সারির প্রথমেই আমি দাঁড়িয়ে। তিনি আমার সাথে করমর্দন করে আমার সাথে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে হেলিকপ্টারে তুলে নিলেন। বেশ বড়োসড়ো গঙ্গা ফড়িংটির পেটের ভিতর দেয়াল ঘেঁষে স্ক্রু দিয়ে আঁটা লম্বা লোহার বেঞ্চপাতা। দেয়ালে পোর্টহোল। আমি জড়োসড়ো হয়ে একটা পোর্টহোলের পাশে বসে পড়লাম। আর সবাই উঠে পড়েছে। সুস্থির হয়ে বসতে না বসতেই হেলিকপ্টার উঠে পড়লো আকাশে। পোর্টহোল দিয়ে বাইরে দৃষ্টি মেলে দিলাম। হেলিকপ্টার রোটরের আওয়াজে কারো সাথে কথা বলা জো নেই। তাই বাইরের অভাবনীয় অর্পূব দৃশ্যরাজির সমাহার দেখে নয়ন সার্থক করতে লাগলাম। যেদিকেই চোখ যায় দিগন্ত বিস্তৃত ঢেউ খেলানো সবুজাভ পাহাড় সারি। তারি মাঝে কোথাও ছোট ছোট গ্রাম। পাহাড়ি পায়ে চলা পথগুলো সোনালী রেখার মতো এঁকেবেঁকে এগিয়ে অনেক দূরে পাহাড়ের বাঁকে হারিয়ে গেছে। রেইখ্যং নদীটি স্বচ্ছ ফিতার মতো সর্পিলভাবে বয়ে চলেছে। কোথাও জল টানা হচ্ছে। কোথাও বা নৌকা কিংবা বোট চলেছে নদীর পানি কেটে। মনের অন্তরালে গুনগুন করতে লাগলো সাহিত্যিক আবুল হোসেনের কয়েকটি গানের কলি-

‘আমাদের দেশ আছে। আমাদের প্রাণের স্বদেশ

মানচিত্রে আঁকা

আঁকা বাঁকা রেখা টানা

সবুজে সবুজে মাখা,বিচিত্রিত ভূমি’

নিচে জমিগুলো আল দিয়ে ভাগ করা কোথাও জ্যামিতিক কোথাও সবুজ কোথাও খয়েরি কোথাও হলুদ কত বিচিত্র রঙ্গের খেলা। যেন রঙ্গের ক্যানভাসে আঁকা কোন এয়াবস্ট্রাকট ছবি। বাইরে দৃশ্যপট ধীরে ধীরে পরিবর্তন হয়ে বুনোরুপ নিলো। এখন কেবল পাহাড় আর পাহাড়। কমপক্ষে দশ মাইল ব্যবধানে ছোট ছোট আদিবাসী গ্রাম চোখে পড়ছে। জুম চাষই এদের একমাত্র অবলম্বন। সপ্তাহে একদিন লোকালয়ে এসে নৃত্যপ্রয়োজনী সামগ্রী কিনে নিয়ে যায়। তারপর সারাটা সপ্তাহ সভ্যতা বিচ্ছিন্ন অরণ্যানীর কোলে পড়ে থাকে। দূরে পাহাড় শ্রেণীর তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের মধ্যেও একটা ছন্দ খুঁজে পেলাম। দেখলাম নির্দিষ্ট দূরত্ব পর পরই কয়েকটি পাহাড় পর্বতের মতো আর সবাইকে ছাড়িয়ে মাথা উঁচু করে নিসংগ দাঁড়িয়ে। কিছু ল্যান্ডস্কোপের মতো মনে হলো। পার্থক্য কেবল এখানে সবুজের সমারোহ আর মরুতে সবই ন্যাড়া। এখানে প্রকৃতির নিরব কথকতা কেবল ভাবুক মানুষেরাই হৃদয়ের গভীরে শুনতে পাবে। সুইডিশ কবি টমাস ট্রান্সটোমারের কবিতার ভাষায়-

‘প্রকৃতির কোন শব্দ ভাণ্ডার নেই

অলিখিতি পৃষ্ঠা সে ছড়িয়ে দেয়

সব দিকে দিকে’

কিছুদূর যাওয়ার পর হেলিকপ্টারের গতি পথের নির্দিষ্ট একটা ছক অনুভব করলাম। ভালো করে লক্ষ্য করতেই বুঝলাম যে, রেইখ্যং নদীর ট্রেইল ধরেই উজানে চলছি আমরা। হেলিকপ্টার যাত্রা শুরু থেকেই ঘড়ি ধরে সময় দেখে চলছি আমি। ঘড়ি দেখলাম পনের মিনিট ধরে চলছি। দূরে তাকিয়ে ভাবলাম, কোথায় সে বড়থলি পাহাড়ের কোন খোঁজে লুকিয়ে- কে জানে!

০৩

And Gloss And loves Because

Not to love is impossible

                             ———পুশকিন।

তন্ময় হয়ে পাহাড়ি নৈর্সগ্য দেখতে দেখতে গুনগুন করে গান ধরেছি। ‘কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা’ সহকর্মীদের চঞ্চলতায় ঘাড়ে ফেরাতেই আমার সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার মিঃ অরুন ইশারায় জানালো বড়থলি এসে পড়েছি। পোর্টহোল দিয়ে নীচে তাকিয়ে বেশ বড়ো দুটি গ্রাম চোখে পড়লো। পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে পাহাড়ি ঝর্ণার মতো রেইখ্যং নদী। হেলিকপ্টার ধীরে ধীরে নেমে এলো সেনাক্যাম্পের হেলিপ্যাডে। সূর্য তখন হেলে পড়েছে পশ্চিমে। পাইলটের সহায়তায় আমরা বড়থলির মাটিতে পর্দাপন করলাম। হাত ঘড়ির সময় দেখে জানলাম দীর্ঘ বিশ মিনিটের আকাশ ভ্রমণ হয়েছে। আমাদেরকে নামিয়েই হেলিকপ্টার সর্গজনে উড়াল দিলো নূতন গন্তব্যে। আমি পাইলটের উদ্দেশ্যে হাত নাড়লাম। ক্রমশ বিন্দু থেকে বিন্দুতর হয়ে হেলিকপ্টার দিগন্তে মিলিয়ে গেলো।

বড়থলি পাড়া ক্যাম্পের কমান্ডার আমদের কুশল জিজ্ঞাসা করলেন। আমাদের পথ দেখিয়ে ক্যাম্পের আউট পোস্টে বসালেন। পাহাড়ের উপর ক্যাম্প থেকে নীচে বড়থলি পাড়া দৃষ্টিগোচর হলো। ক্যাম্পের নীচে আধ-মাইলটাক দূরে সমতল একটি মাঠ। মাঠের একপাশে চারচলা টিনের ছাউনি একটি ঘর, সম্ভবত স্কুল। প্রশ্ন করে জানলাম আমার অনুমান সঠিক এবং ওটাই আমাদের ভোট কেন্দ্র। পূবর্দিকে মাঠটাকে পেঁচিয়ে রেইখ্যং’র স্বচ্ছ পানি তরতর করে বয়ে চলেছে। বিলাইছড়িতে রেইখ্যং নদীটি যদি চল্লিশোর্ধ প্রৌঢ়া হয়, তবে এখানে টা ষোড়শী কিশোরী। মাঠের পরেই গ্রাম। মাচা ঘরের আধিক্য চোখে পড়ার মতো। পশ্চিমে গ্রামের কোল ঘেঁষেই আকাশ ছুঁয়েছে সুউচ্চ নাগ পাহাড়। বিশাল বিস্তৃতি নিয়ে সুঁচালো চূড়াটি ঝুলে আছে গ্রামের উপর। স্কুলের পেছনে অনতিদূরে পাহাড়ের পটভূমিকায় বিশাল কয়েকটা বাজপড়া গর্জন গাছ উচ্চশিরে দাঁড়িয়ে। গ্রামটির চার পাশেই বিশাল সব পাহাড়ের দেয়াল গ্রামটিকে দুর্ভেদ্য করে তুলেছে। গ্রামটির উপর কুয়াশার পাতলা চাদর ঝুলে আছে আসন্ন বিকেলেও। রবি ঠাকুরের কবিতার দুটি পঙটি হৃদয়ে দোলা দিয়ে গেলো।

‘নামিছে নিরব ছায়া ঘনঘন শয়ানে

এ দেশ লেগেছে ভালো নয়নে”

কিছুটা সময় জিরিয়ে নেওয়ার ফাঁকে ক্যাম্প কমান্ডার চা-বিস্কিট দিয়ে আমাদের সকলকে আপ্যায়ন করলেন। ভদ্রলোক অতি সজ্জন। আমাকে এক পাশে ডেকে নিয়ে স্থানীয় বিপদ আপদ সম্পর্কে ধারনা দিলেন। সেই সাথে যে কোন বিপদে তড়িৎ সাহায্য করার প্রতিশ্রুতিসহ অভয় দিলেন। ভারত এবং মায়ানমার বর্ডার এখান থেকে বেশি দূর নয়। বিপদের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

বিকেল চারটায় আমরা ক্যাম্প থেকে অতিক্রান্ত হলাম। ধীরে ধীরে ভোট কেন্দ্র অভিমুখে নামতে লাগলাম। সাতজন নির্বাচন কর্মকর্তা ও আটজন পুলিশ এবং ভিডিপি সদস্য নিয়ে মোট পনের জনের দলটা ভোটকেন্দ্রে পৌঁছে গেলাম। কেন্দ্রের পৌঁছেই ওয়ার্ড মেম্বার জ্যাকব ত্রিপুরা এসে সাক্ষাৎ দিলেন। সদাহাস্য মুখে সবার সাথে করমর্দন ও কুশল বিনিময় করলেন। চারপাশে তাকিয়ে দেখলাম, আমাদের আগমন গ্রামবাসীদের আনন্দ মুখর করে তুলেছে। কারণ এখানে হর-হামেশা এমন ঘটনা ঘটেনা। দলেদলে নারী পুরুষ কিশোর কিশোরী ও ছোট ছেলে-মেয়েরা মাঠে জড়ো হয়ে আমাদের নিরীক্ষণ করছে।

এক পাশে কিছু আদিবাসী বাঁশ দিয়ে ভোট কেন্দ্র তৈরিতে ব্যস্ত। এদেরকে আগে থেকে নির্দেশনা দেওয়া ছিল। সেই মোতাবেক কাজ চলছে।

মেম্বার জ্যাকব কেন্দ্রেই আমাদের রান্না বান্নার যাবতীয় ব্যিবস্থা করলেন। আমার সাথে করে গরম কাপড় ও কম্বল নিয়েছিলাম এবং যা আমাদের যথেষ্ট মনে হলেও মেম্বার সাহেব প্রতিজনের জন্য বাড়তি আরো চারটি করে স্থানীয় কোমর তাঁতে বোনা আদিবাসী মোটা কাপড় সরাবরাহ করলেন। বললেন, ‘এখানে শীত বেশি রাত নামলেই বুঝবেন’।

যতটুকু জানলাম এখানকার মুরং, পাংখোয়াং জনগোষ্ঠী পূর্বেও ছিলো। তবে ত্রিপুরা এবং মারমারা ১৯৬০ সালের পর এখানে এসে বসতি করে। ১৯৬০ সালে কাপ্তাই হ্রদের পানিতে যখন একের পর এক জনপদ নিমজ্জিত হচ্ছে সে সময় কেউ উত্তরে চলে যায়, কেউবা দক্ষিণে। পথ চলতে চলতে পাহাড়ে ‘জুম’ আবাদ করতে করতে শেষতক এখানে এত দূরে থিতু হয়ে বসে। ত্রিপুরা’রা পূর্বে সনাতন ধর্মাবলম্বী ছিলো। বর্তমানে তারা সবাই খৃষ্টান।

বড়থলিতে ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নামছে। গোধূলিতে আকাশ লালে লাল। শীত নামছে জাঁকিয়ে। যেন ‘শীতের রথের ঘূর্ণি ধুলিতে গোধূলিরে করে ম্লান-‘। গায়ে সোয়েটার কোট, মাথার মাফ্লার জড়িয়ে বসে বসে গোধূলীর ম্লান আলোটুকুর আঁধারে হারানো প্রতিটিক্ষন দু’চোখ ভরে দেখে নয়ন সার্থক ক্রছি। মনে মনে জপছি।

‘আয়ি সন্ধ্যে

অনন্ত আকাশ তলে বসে একাকিনী

কেশ এলাইয়া

মৃদু মৃদু কি কথা কহিস আপন মনে

গান গেয়ে গেয়ে’

সন্ধ্যা উৎরে যাবার পর উঠে পড়লাম। কুয়াশার ভিজিয়ে দিচ্ছে সব। প্রাঙ্গনে নাতিউচ্চ একটি বটগাছ নিঃসঙ্গ দাঁড়িয়ে। বটগাছের পাতায় শিশির জমে বৃষ্টির মতো টুপটাপ ঝরছে। শীতের কাঁপন ঠেকাতে তাড়াতাড়ি রুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিলাম। রাত্রির সাতটাই পরপরই খাওয়া দাওয়া সেরে নিয়ে লেপ মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লাম। কিন্তু নিদ্রাদেবী শজে ধরা দিচ্ছে না। আমার সহকর্মীরা সকলে তাস নিয়ে বসে গেছে। জমিয়ে খেলা চলছে। আমার চোখে ঘূম নেই। বাইরে পরিপূর্ণ নৈঃশব্দের মাঝে কেবল শিশির পড়ার টুপটাপ শব্দ আর মাঝে মাঝে বুনো হরিণের ডাক শুনছি। এক সময় খেলা ছেড়ে সকলে শুয়ে পড়লো। আমার পাশে সহকর্মী চিংসা অং মারমা গা ঘেঁষে শুয়ে পড়ায় তার শরীরের উষ্ণতায় কিছুটা উত্তাপ বাড়লো। অবশ্য তাতে প্রচণ্ড শীতের বিপরীতে শান্তিতে ঘুমানোর স্বস্তি পেলাম না। ক্লান্ত শরীরে ঘুমহীন চোখে জেগে রইলাম। অন্ধকারে অবচেতনে ফিরে এলো দুটি পঙক্তিঃ-

‘নির্মম শীত, তারি আয়োজনে-এসছিলো বনপারে

মর্জিয়া দিল শ্রান্তি-মর্জনা নাহি করে’

০৪

‘সেই নিরালা পাতার ঘেরা

বনের ধারে শিতল ছায়,

খাদ্য কিছু পেয়ালা হাতে

ছন্দ গেঁথে দিনটা যায়।’

২৮-১২-০৮ ইং। বড়থলি পাড়ায় প্রথম ভোর। আগের রাতে এপাশ ওপাশ করতে করতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানিনা। পাখি ডাকা ভোরে হঠাৎ ঘুম টুটে গেলো। এখানে কাক নেই। চড়ুই থেকে শুরু করে বিচিত্র কতনা পাখীর ডাকে ভোরের আগমন- মনের শব কালিমা, ক্লান্তি ঘুচিয়ে দিলো। বাইরে ঘন কুয়াশা। তিব্র শীত। এরই মধ্যে প্রাতঃকৃত্য সেরে নিলাম।

আজকের দিনটা পুরোটাই অবসর। সারাদিনের করণীয় সম্পর্কে ছক কেটে নিলাম। প্রথমেই নির্বাচনী কিছু কাজ যা আগাম সারা হলো। এর পর সহকর্মীদের নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম গ্রাম পরিভ্রমণে। ছোট মাঠ পেড়িয়ে একটু খাদ। সম্ভবতঃ ছোট কোন ঝর্ণা ছিলো এক সময়। এখন খটখটে শুকনো। চাড়ডীকে বুনো ঝোপ আর পাথর ছড়ানো। নাম না জানা হরেক ফুল ফুটে আছে শিশিরের মুকুট পরে। সুরুজের আলোয় মুক্তার মতো চিক চিক করছে। খাদ পেরিয়ে একটু খানি পায়ে চলা পথ হাঁটতেই গ্রামে এসে পড়লাম। পথের দু-পাশে সারি সারি মাচাঘর। দুটো গির্জা চোখে পড়লো। একটি ব্যাপ্টিস চার্চ, অন্যটি ক্যাথলিক। চার্চের সামনে স্থানীয় পাথরের মাধ্যমে তৈরি করা সমাধিফলক চোখে পড়লো। আড় একটু এগুতেই মেম্বার জ্যাকবের বাড়ি পৌঁছে গেলাম। মেম্বার সাহেব তার মাচার ঘরে সাদরে বসালেন। আদা দেওয়া রঙ চায়ের সাথে ঘরে বানানো পিঠা দিয়ে আপ্যায়ন করা হল।

এখানকার প্রাকৃতির সন্তান আদিবাসীরা এমনই নিষ্কলুষ যে মুহূর্তে তাদের সরলতা আর আন্তরিকতা দিয়ে আমাদের আপন করে নিলো। পাষে মেম্বার সাহেবের ছোট ভাইয়ের মাচা ঘর। কিছুক্ষণ খোশগল্পের পর তার নিজের বাড়ীতে আমাদের আতিথ্য গ্রহণের জন্য অনুরোধ জানালেন। আমরা মুগ্ধ আবেশে তার বাড়ি গেলাম। বাড়ীতে তার স্ত্রীর সাথে কুশল বিনিময় হলো। মহিলা বাংলা\চাকমা,বোঝেন না। জানার মধ্যে নিজের ভাষা ছাড়া মারমা ভাষা বোঝেন। এদিকে আমরা ত্রিপুরা ও মারমা ভাষার সম্পূর্ণ অজ্ঞ। তবে আমাদের সাথের সহকর্মী চিংসাঅং মারমা ও চাহোয়াই মারমা থাকায় তাঁরা প্রায় সময় দোভাষীর কাজ চালিয়ে নিয়েছেন। কারণ এখানে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সাথে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম মারমা ভাষা। মুরং, বোম, পাংখোয়াং, ত্রিপুরা প্রায় সবাই মারমা ভাষা জানেন।

ঘরের কর্ত্রীর পরে তার মেয়ে লক্ষ্মী ত্রিপুরার সাথে পরিচয় হলো। লক্ষী খাগড়াছড়ি সদরে হোস্টেলে থেকে পড়াশুনো করে। ছুটিতে বাড়ী এসেছে। তার সাথে কথাবার্তায় আমাদের সমস্যা হলো না। কিছুক্ষণ পর এখানকার একমাত্র এসএসসি পাস মহিলা সারিমা ত্রিপুরা, যুবক কলিন্স ত্রিপুরার সাথে পরিচয় হলো। এই তিনজনই এনজিও সংস্থা টঙ্গ্যাতে শিক্ষক হিসাবে চাকুরী করেন। ভোট কেন্দ্র হিসাবে নির্ধারিত স্কুলটি তাদের কর্মক্ষেত্র। তাদের আধুনিক চিন্তাধারা ও মননশীলতায় আমি মুগ্ধ হলাম। প্রত্যন্ত অঞ্চলে সভ্যতা বিবর্জিত, অবহেলিত এখানকার বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এগিয়ে নেওয়ার দৃপ্ত শপথে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ এই তিন তরুণ-তরুণীর কর্ম প্রচেষ্ঠা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও পরিশীলিত কথাবার্তায় আমি নিঃসন্দেহে হলাম। নিকট ভবিষ্যতে এখানে শিক্ষার হার ৫০% শতাংশ ছড়িয়ে যাবে। তাদের চোখে সোনালী জ্যোতি, বুকে রক্তিম দৃপ্ত হৃদয়। কবির ভাষায়-

‘দেখেহো কি মানুষের হৃদয়

জেনো রক্তে মোড়ানো মুঠি যেন

বুকের খাঁচায় বয়।’

দুপুরে স্নানের জন্য নদীর ঘাটে গেলাম। বিশাল বালুর চরা। সবর্ত্র নুড়ি পাথর ছড়ানো। নদীর পানিতে যথেষ্ট স্রোত। একেবারে স্বচ্ছ আয়নার মতো জল। কোথাও একটুও কাঁদা নেই। নদীর ওপারে বিশাল পাহাড়। ঘন সন্নিবেশিত গ্রহণ বন। উপরে উদার আকাশ। বিচিত্র পাখীর সমারোহ। স্বচ্ছ পানিতে মাছের রুপালী আঁশের ঝিলিমিলি। হৃদয়ে গুনগুন করে-

‘অপার ভুবন,উদার জ্ঞন শ্যামল ধরণীতল।

বসন্ত অতি মুগ্ধ মুরতি স্বচ্ছ নদীর জল।’

নদীতে জল হাঁটু পানির চেয়েও কম। জলে নামতেই ঠাণ্ডায় পা অবশ হয়ে গেলো। এতো শীতল। বরফের মতো হিমায়িত ঠাণ্ডা ‘জল কি আসলে হুতাশন। নাকি জল নিজেই পবন!’ মনে হচ্ছে যেন জল নয়, বরফ। অতি দ্রুত স্নান সারলাম। সংক্ষিপ্ত সময়ে স্নানের রেকর্ড যদি রাখা হতো তবে চ্যাম্পিয়ন হতাম নিঃসন্দেহে।

এখানে আদিবাসী নারীদের গলায় বিচিত্র ধরনের পুঁতির মালা চোখে পড়ার মতো। কারো কারো গলায় পুঁতির মালার প্রাচুর্য্য এতো বেশী যে, জমতে জমতে থুতনি অবধি উঠে এসেছে। একশ-দেড়শ মালাতো হবেই। কৌতূহল নিবৃত্ত করার জন্য জিজ্ঞাসা করলাম। জানলাম এ মালাগুলি অতীব সম্মানের।। এ মালা স্বামীর ভালোবাসার নির্দশন এছাড়া বিচিত্র সব আদিবাসী অলংকার যা আজকাল আর চাকমা মেয়েরা পড়েনা। অধিকাংশ প্রৌঢ়া\বৃদ্ধার কানের লতি ছেঁড়া। ছেঁড়া কান নিয়ে নিঃসংকোচে কাটিয়ে দিচ্ছে জীবন। এটা স্পষ্ট যে অলংকারের ভরে সবার এ অবস্থা। কারো কারো কানে বর্শার মতো একধরনের অলংকার দেখলাম যা কানের লতি ঢুকিয়ে কানের উপর ছিদ্র করে পরা হয়েছে। ভাষগত সমস্যার কারণে জানা হলো না অলংকারের নাম।

দুপুরে মেম্বারের বাড়ী খাওয়া দাওয়া হলো। মাচা ঘরে বসে বিশ্রাম নিলাম। বড় বড় বাঁশের ফালি দিয়ে বুনোট করা মেঝে। এমন মসৃণ আর শৈল্পিক নৈপুণ্যের শাঠে তৈরি যে আধুনিক টাইলসের সমক্ষ না হলেও কম কিসে! এক-দেরফুট চওড়া বাঁশের ফালিগুলি দেখলে একেকটা বাঁশ কতো বড় হতে পারে অনুমান করা যায়। বৈঠকখানা ঘুরে দেখতে গিয়ে অনেক বাঁধানো ছবী চোখে পড়লো। অনেক বড় বড় বিদ্ধান এবং মনীষীদের ছবির ভীরে আমাদের প্রাণপ্রিয় চাকমা রাজা দেবাশীষ রায়ের ছবিও দেখলাম। মেম্বার সাহেবের সাথে রাজা দেবাশীষ রায়ের ছবি দেখে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘এটি কবেকার ছবি?’ সমীহের সাথে গর্বভরে বললেন ‘বছর কয়েক আগে রাজা দেবাশীষ সদলবলে মেম্বারের অতিথি হন।‘ তিনি রুমা উপজেলা হয়ে সুর্দীঘ পাহাড়ি পথ হেঁটে এখানে আগমন করেন। এখানে তিনি বেশ কয়েকদিন অবস্থান করেন। এই না হলে রাজা! আমারও বেশ গর্ব হলো।

বিকেলে গ্রামের দক্ষিণে বেড়াতে চললাম। রেইংখ্যং নদীর ওপারে মারমাদের গ্রাম। এখানে বাহাত্তর পরিবার মারমা বসবাস করেন। মারমারা সবাই বৌদ্ধ। আমরা যখন গ্রামের মাঝামঝি স্থানে তখন বৌদ্ধ মন্দির থেকে মারমাভাষায় মাইকে ত্রিপিটক পাঠ করা হচ্ছে। নদীর তীরে অল্প অল্প সবজি ক্ষেত। তার পাশেই মাঠের মতো সমতল চরে কিছু কিশোর-যুবক ফুটবল খেলছে। এ, এক অন্য ভুবন। এখানে যন্ত্রদানবের গর্জন নেই। শহুরে জীবনের ব্যস্ততা নেই। শক, সরল, বাহুল্যবর্জিত জীবন। বিকেলে নদীতে যুবতী মেয়েরা একেকজন অনেকগুলো বাঁস নিয়ে নদী চরে কুয়া খুঁড়ে খাওয়ার পানি জোগায় করছে। বাঁস হলো এক ধরনের প্রাকৃতিক ফল। যা দেখতে লাউয়ের মতো। কিন্তু খাওয়া যায়না। প্রচণ্ড তিতকুটে। সাধারণতঃ এগুলো পাকার পর ভিতরের শাঁসটি ফেলে লাউয়ের খোলার মত বিভিন্ন কাজে করা হয়।

দুটি গ্রামের মানুষের জাতিসত্তা ভিন্ন ভাষা, সাংস্কৃতি এমনকি ধর্মও ভিন্ন হওয়া সত্ত্বেও সখ্যতা, আন্তরিকতা ও সহমর্মিতার অভাব দেখেনি। এদের মধ্যে বিবাহ সম্পর্কেও বিদ্যমান। অথচ সভ্য জগতে কেবল হিন্দু-মুসলমান, কিংবা পাহারি-বাংগালি ভেদাভেদের কারণে হাজার হাজার মানুষের জীবন প্রদীপ নিভে গেছে। রবি ঠাকুরের কবিতাখানি মনে পড়ে।

‘সভ্যতার নব নব কত তৃঞ্চা কত ক্ষুধা

উঠে কত হলাহল, উঠে কত সুধা

শুধা হেথা দুই তীরে, কেবা জানে না

দোহা-পানের চেয়ে আছে দুইখানি গ্রাম।’

এদের দারিদ্র্য ও অভাবের অন্ত নেই। তবু দারিদ্র্য, মুখের অনাবিল হাসিতে ম্লান করতে পারেনি। প্রাকৃতিক নির্যাস বুকে নিয়ে এরা প্রতিকূলতার সাথে নিয়ত সংগ্রাম করছে। আর্থিক দৈনাতার কথা বাদ দিলেও সভ্য জগতের আলোর রেশ এখানে পৌঁছাতে পারেনি সহজে। এখানে স্বাস্থ্য সমস্যা আছে, বিশুদ্ধ পানীয় জলের অভাব। কোন নলকূপ নেই। কোন চিকিৎসা সুবিধা নেই। হঠাৎ কোন ইমাজের্ন্সি রোগীকে নিকটতম হাসপাতালে নিতে হলে বিশ মাইল পাহাড়ি এলাকা পাড়ি দিয়ে রুমা উপজেলায় পৌঁছতে হবে। মনে হয় সৃষ্টি কর্তা বুঝি এদের উপর বিশেষ দৃষ্টি রাখছেন। তা হলে এরা বাঁচে কি করে! উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করণের ন্যূনতম সহজ পন্থায় না থাকায় চাষাবাদের অনীহা রয়েছে। কেবল জুম চাষের  মাধ্যমে নিজেদের অতি স্বল্প প্রয়োজনটুকু এরা মিটিয়ে নেয়। চারদিকের বিশ মাইল পরিধির ইমধ্যে কণ হাট বাজার না থাকায় সভ্য জগতের নিত্য নৈমেত্তিক দ্রব্য সামগ্রী স্খানে দুর্লভ। তাই প্রকৃতির প্রদত্ত দানে সংসার নির্বাহ হয়। খাদ্য তালিকা ও রন্ধন প্রক্রিয়া এখানে একেবারে সহজ সরল। আধুনিক রান্না বান্নায় এরা একেবারে চৌকশ হতে পারেনি। সভ্যতার যে ছিটে ফোটা আলো এরা পেয়েছে তা কেবল বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। স্কুলটি রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদ কর্তৃক নির্মিত হলেও কোন শিক্ষক দেওয়া হয়নি। যে তিনজন শিক্ষকের কথা আমি পুর্বে বলেছি তারা এনজিও সংস্থা ‘টংঙ্গ্য’ কর্তৃক নিয়োজিত।

রুমা উপজেলা থেকে বগা লেক পর্যন্ত রাস্তা নির্মিত করা হয়েছে। বর্তমানে চাঁদের গাড়ী (জীপ) চলে। এখানেও সরকারের সদিচ্ছা থাকলে রাস্তা নির্মান করা যেতে পারে। পর্যটন স্পট হিসাবেও জায়গাটি অনেকের দৃষ্টি কাড়বে। এছাড়া সরকারী কিংবা এনজিও – এর মাধ্যম হিসাবে এখানে রিংওয়েল, স্যানিটরী পায়খানা ও সোলার সরবরাহ করা যেতে পারে।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হবো হবো। আকাশে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি উড়ে চলেছে। সবারই নীড়ের ফেরা তাড়া। আমরাও ফিরে চললাম ভোটকেন্দ্র অভিমুখে। আমাদের ক্ষণিকের নীড়ে। রেইংখ্যং এর হাটুপানি ঠেলে এপারে এসে বসে পড়লাম বিশাল এক পাথরের বোল্ডারে। আর সবাই ইতস্ততঃ ছড়ানো নুড়ি পাথর নিয়ে পানিতে ছোড়াছুড়ি করছে। কি যে মোহময় পরিবেশ! সবারই বয়স যেন রিওয়াইন্ড হয়ে কৈশোরে ফিরে গেছে। অজানিতে গেয়ে ওঠে মন-

‘চৌদিকে ওব নূতন জগৎ, আপনি সৃজিত হবে।

এ সন্ধ্যা শোভা তোমারে ঘিরিয়া, চিরকাল জেগে রবে।’

সন্ধ্যা উৎরে যেতে তাড়া লাগালাম সবাইকে। আমরা জোর কদমে হেঁটে বড় থলি ত্রিপুরা পাড়ায় এসে পড়লাম। ব্যাপ্টিস গির্জায় নিকটে এসে সম্মিলিত প্রার্থনা সংগীতে সুর ভেসে এলো। আমার সহকর্মী সুনীল বাবু চাকমা শুধালেন ‘যাবেন নাকি? চলুন দেখে আসি।‘ আমি সায় দিলাম। আমরা দুজন চার্চের প্রাঙ্গনে ঢুকলাম। আমাদের দেখে সাদরে আহ্বান জানানো হলো। আমরা জুতা রেখে গির্জায় ভিতরে ঢুকলাম। এক পাশে বেঞ্চ পাতা। খালি দেখে বসে পড়লাম। প্রথম সারিতে লক্ষী ত্রিপুরা ও কয়েকজন যুবক বসে প্রার্থনা সংগীত গাইছে। আর সবাই তাদের সাথে সুরে সুরে গলা মেলাচ্ছে। গানের কথাগুলি ত্রিপুরা ভাষায় হওয়ায় অর্থ বুঝতে না পারলেও ভাবগম্ভীর পরিবেশে সম্মিলিত গানের সুরের আন্দোলনে আমার মনটা বিবশ হয়ে গেলো। কতক্ষণ জানিনা- হঠাৎ গান থামতেই সংবিত ফিরে পেলাম। শশব্যস্ত উঠে সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় নিলাম।

ক্যাম্পে ফিরতে ফিরতে আটটা বাজলো। রাতের খাবার খেয়ে দেয়ে ঘণ্টা খানেক তাস পিটালাম। এর পর ঘুমের আয়োজন। কিন্তু ঘুম আসে না। পরদিন ২৯ তারিখ। ভোটের দিন। নানা চিন্তা এসে ভর করছে মনে। একপাশে বাকী সহকর্মীরা নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। নিঃশব্দ রাত্রির অন্ধকারে নিজেকে বড়ো নিঃসংগ ও নিঃস্ব মনে হলো। নিঃশব্দের মাঝে আমার অন্তরের আমিটা জেগে উঠে বাইরের আমি টাকে প্রশ্ন বিদ্ধ করছে। আত্নজিজ্ঞাসা আর আত্নবিশ্লেষন চলছে নিরন্তর। কবি ও কথা সাহিত্যিক আব্দুল মান্নান সৈয়ডেড় কবিতার ভাষায়-

‘আমাকে জিজ্ঞাসা করো যদি আমি বলবঃ আমার সত্যি এ রাত্রির নির্জনে।’

০৫

৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন

বাংলাদেশের গণতন্ত্রের পথ পরিক্রমা একটি মাইল ফলক

২৯.১২.০৮ ইং। ভোরে ঘূম থেকে উঠেই প্রাতঃকৃত্য সম্পাদনের পর ব্যস্ততার সাথে তৈরি হলাম। পুলিশ ও ভিডিপি সদস্যদের নির্দেশনা দিলাম। ভোটকেন্দ্র সাজিয়ে ভোটারদের অপেক্ষায় রইলাম। সকাল ৯.০০ টায় মধ্যেই ভোটাররা আসতে শুরু করলো আমার সহকর্মীরা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ভোট গ্রহণ করতে লাগলো। প্রীতিপূর্ণ চাকমা, রসিক কুমার চাক্মার কর্মতৎপরতা লক্ষণীয়। অন্যদিকে চাহোয়াই মারমা ও চিংসাঅং মারমা ভোটাদের সাথে ভাষাগত সমস্যা সমাধানের সদা তৎপর। পুলিশ সদস্য ASI জনাব প্রণয় ক্ষত্রি, কনস্টেবল সর্ব জনাব মোশারফ, রফিকুল, বাবুল প্রত্যকেই স্ব-স্ব দায়িত্ব সুচারুরূপে সম্পাদনে ব্যস্ত। প্রণয় বাবুর নির্দেশনায় ভিডিপি সদস্যগণও তাদের দায়িত্ব দক্ষতার সাথে পালন করছে। বিকেল চারটায় মধ্যেই মোট ৭৮১ ভোট কাস্ট হলো। সমতলে চট্রগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি, রাঙ্গুনিয়া প্রভৃতি উপজেলার বিভিন্ন ভোট কেন্দ্রে প্রিজাইডিং অফিসার হিসাবে ভোট গ্রহণের পূর্বে অভিজ্ঞতা আমার আছে। কিন্তু বড়থলি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এমন নিরবিচ্ছিন্ন শান্তি শৃঙ্খলার মধ্যে স্বচ্ছ ভোট গ্রহণের অভিজ্ঞতা আমার এই প্রথম। আমার কাছে এ’ স্মৃতি চিরজাগরুক থাকবে।

ভোট গ্রহণ সম্পাদনের একঘণ্টা পর স্থানিয়ভাবে বেসরকারি ফলাফল ঘোষণা করে জ্যাকব মেম্বারের সাথে ভোট কেন্দ্র প্রাঙ্গনের একপাশে বসে লিকার চা পান করতে করতে খোশগল্পে মেতে উঠলাম। রাতে স্থানীয় ক্যাম্পের ওয়্যরলেস দিয়ে রিটার্নিং অফিসারকে ভোটের ফলাফল জানিয়ে দিলাম। শরীর এবং মন থেকে বিশাল দায়িত্বভার নেমে গিয়ে আমার সমস্ত অস্তিত্বকে হালকা করে দিলো। রাতে খাওয়া দাওয়া সেরে সহকর্মীদের সাথে নিঃসংকোচে তাসের আড্ডায় বসে পড়লাম। পরদিন ৩০.১২.০৯ ইং আমাদের এরাইভাল-ডে। বড়থলির শেষ রাত্রি যাপনকে সেলিব্রেট করার জন্য মেম্বার সাহেবের পাঠানো ঘরে তৈরি একটু আধটু মদপান করলাম। রাত দেড়টা-দুইটা পর্যন্ত  আমাদের আড্ডা চললো। এর পর ঘুমের আয়োজন। শুয়ে পড়ার সাথে সাথে সবারই নাক ডাকা শুরু হলো। সগর্জনে কারোবা মৃদু লয়ে। আমার চিরকালে অভ্যাস শোয়ার সাথে সাথে ঘুমাতে পারিনে। আকাশ-পাতাল জট পাকানো যত চিন্তাগুলো এসে জড়ো হয়। রাতের নিস্তব্দতায় নিজেকে বড়ো ক্ষুদ্র মনে হয়। কবি আব্দুল মান্না সৈয়দ’র কবিতায় আমার মনের ছায়া ফুটে উঠে-

আমার দিনগুলি একরকম

রাত্রিগুলি সম্পূর্ণ আলাদা

দিনে তেজ জোশ কর্মস্রোত

রাত্রিবেলা নৈরাশ নিলীন’

পরদিন একটু বেলায় ঘুম থেকে উঠেই সংবাদ পেলাম দুপুর বারটা মধ্যেয় হেলিকপ্টার আসতে পারে। সেনা ছাউনিতে হলুদ রঙের মার্কার বেলুন উড়তে দেখলাম। সবাই নাস্তা সেরে তাড়াতাড়ি ক্যাম্পের আউট পোস্টে এসে জড়ো হলাম। সাথে নির্বাচনী মালামাল। কাঁধে ব্যাগ-ব্যাগেজ। গল্পে গল্পে সময় কাটাচ্ছি। ক্যাম্প থেকে চা নাস্তা দেওয়া হলো। গ্রামবাসীদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে এসেছি তাই খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়নি। কাজেই সারাদিন উপোস। বিকেল সাড়ে তিনটায় ক্যাম্প থেকে টেলিফোন করলাম। রিটাংনিং অফিসার মহোদয় জানালেন অনিবার্য কারণে আজ আর হেলিকপ্টার আসবে না। তবে অবশ্যই আগামীকাল হেলিকপ্টার পৌঁছার নিশ্চয়তা দেওয়া হলো। আমাদের কষ্টের জন্য তিনি আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করলেন। এই সুন্দর মনের জ্ঞানের মানুষটি বিনয় প্রকাশের উদারতা আমাকে সংকুচিত করলো। আমি সসংকোচে জানালাম- কোন অসুবিধা নেই। আগামীকাল অর্থাৎ ৩১.১২.০৯ ইং হেলিকপ্টারের অপেক্ষায় থাকবো আমরা।

ঐ দিন বিকেলের রুমা যাওয়ার রাস্তা ধরে একা একা অনেকক্ষণ হাঁটলাম। কখনো চড়াই কখনো উতরাই। নির্জন বনানী। চারদিকে নাম না জানা বৃক্ষের সমারোহ। কোথাও ঘন কাশবন। সাদা কাশফুল ফুটে আছে অগণিত। কোথাও পথ পাশে বিশাল বৃক্ষ। যুগ যুগ ধরে দাঁড়িয়ে। আনমনে বৃক্ষের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়ালাম। একটু বিশ্রাম। অনুভব করলাম বৃক্ষের স্পন্দন। মনে প্রশান্তি নিয়ে বাতাসে সোঁদা গন্ধ বুক ভরে টেনে নিলাম। যেন ‘নির্জন অরণ্য প্তহ্র অবিরাম শান্তির সুঘ্রাণ।‘ ভাবি, যদি এ ধারায় বৃক্ষের এই সমারোহে না থাকতো, যদি পৃথিবীটা বৃক্ষরাজিতে শভিত-শ্যামল না হতো তবে মানব সভ্যতা হয়তো অঙ্কুরেই ধ্বংস হয়ে যেতো। ‘তাই বলি আজ মানুষের কথা জানতে হলে চলে যাও, বৃক্ষদের কাছে।‘ কিংবা কবি ফরিদ কবিরের ভাষায়-

‘মানুষের মধ্যে ন্য গাছে, আছে সকল রহস্য

তাদের ভাষাও বর্ণময়, নীলনীল সবুজ সবুজ।’

স্নধ্যার একটু আগে ফিরে লোকালয়ে। রাতে জ্যাকব মেম্বারের বাড়ীতে খাওয়া দাওয়া হলো। মেম্বার সাহেবের অনুরোধে ঐদিন সবাই মেম্বার সাহেবের বাড়ীতে রাত কাটালাম।

পরদিন আবারো তল্পিতল্পা গুটিয়ে সেনা ছাউনিতে গেলাম। হেলিকপ্টারের অপেক্ষায় হ্যালিপ্যাডের একপাশে মিষ্টি রোদে বসে পড়লাম। দুপুর সাড়ে এগারোটায় দিকে হেলিকপ্টার এলো। আমরা সারি বেঁধে হেলিকপ্টারে চড়লাম। বড়থলিকে বিদায় জানাচ্ছি। ছেলে-বুড়ো অনেক মানুষ এসেছে। দূরে দাঁড়িয়ে আমাদের বিদায় জানাচ্ছে। বড়থলিকে এ বিদায় জ্ঞাপন শেষ বিদায় হতে পারে। পাঁচ দিনের যে জীবন এখানে কাটিয়ে গেলাম তা স্মৃতিতে ভাস্কর থাকবে। জীবন যেখানে যেমন- এই নীতিতে কাটিয়ে দিলাম জীবনে বর্ণালী পাঁচটি দিন। পৃথিবীর একাংশে বাহুল্যবর্জিত অনাবিল পরিবেশে। মহাত্মা গান্ধির ভাষায়- For each one of us to have to try to live the life we would have the world to live.


লেখকঃ প্রতাঙ চাকমা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here