ব্ল্যাক হোল (Black Hole) নিয়ে কিছু কথা!

0
82

ব্ল্যাক হোল হচ্ছে মহাবিশ্বের এমন একটি জায়গা যা অতি ঘনসন্নিবিষ্ট (একটি ক্ষুদ্র আয়তনে বিপুল পরিমাণ ভর)। যার কারণে ব্ল্যাক হোলের মধ্যাকর্ষণ বল এত শক্তিশালী হয় যে আলো বা অন্য যে কোনো বস্তু এ আকর্ষণ বলকে ছিন্ন করে ব্ল্যাক হোল হতে বের হয়ে আসতে পারে না।

ব্ল্যাক হোলের অস্তিত্ব সম্পর্কিত ধারণাটি প্রথম প্রস্তাব করা হয় অষ্টাদশ শতাব্দীতে। এই ধারণাটি প্রস্তাব করা হয় সেই সময়কার জানা মধ্যাকর্ষণ সূত্রগুলোর উপর ভিত্তি করে। ১৭৮৩ সালে জন মিচেল বলেছিলেন, “যদি একটি বস্তুর আকার যথেষ্ট ছোট ও ভর যথেষ্ট হয় যে কোনো কিছুর পক্ষে ঐ বস্তুর আকর্ষণ বল হতে পালানো সম্ভব নয়। এমনকি আলোও চিরকালের জন্য আটকে যেতে পারে।” ১৯৬৭ সালে হুইলার ‘ব্ল্যাক হোল’- নামটির সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন। পদার্থবিজ্ঞানী ও জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন যে, ব্ল্যাক হোলের নিকটবর্তী স্থান-কাল ব্যতিক্রমধর্মী আচরণ করে। এ কারণে সায়েন্স ফিকশন লেখকদের কাছে এটি লেখার জন্য প্রিয় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যাই হোক, ব্ল্যাক হোল কোনো ফিকশন (বানানো বা কাল্পনিক বস্তু) নয়। বাস্তবেই, মহাবিশ্বে এদের অস্তিত্ব রয়েছে।

যেহেতু ব্ল্যাক হোল হতে কোনো আলো বের হয়ে আসতে পারে না,তাই আমরা আধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়েও ব্ল্যাক হোলগুলোকে সরাসরি দেখতে পারি না। তাহলে, আমরা কীভাবে জানি যে তাদের অস্তিত্ব আছে?

ব্ল্যাক হোল তার নিকটবর্তী বস্তুসমূহকে আকর্ষণ করে। এমনকি এ শক্তিশালী আকর্ষণ বলের ফলে ব্ল্যাক হোলের নিকটবর্তী নক্ষত্র হতে কিছু অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে ব্ল্যাক হোলের দিকে ধাবিত হয়। যতই এ বিচ্ছিন্ন অংশগুলো ব্ল্যাক হোলের নিকটবর্তী হয় ততই সেগুলোর তাপমাত্রা, উজ্জ্বলতা ও গতি বেড়ে যায়। আমরা এদের লক্ষ্য করে ব্ল্যাক হোলের অস্তিত্ব এমনকি ভরও নির্ণয় করতে পারি। তাহলে কীভাবে ভর নির্ণয় করব?

ব্ল্যাক হোলকে কেন্দ্র করে প্রায়ই নক্ষত্র ও গ্যাস ঘুরে থাকে। বোঝার সুবিধার্থে,আমরা ধরে নিই যে, ১টি নক্ষত্র ও ১টি ব্ল্যাক হোল তাদের মধ্যাকর্ষণ বল অনুসারে একে অপরের চারদিকে ঘুরছে। যদিও আমরা ব্ল্যাক হোলকে দেখতে পারি না, কিন্তু আমরা নক্ষত্রটিকে লক্ষ্য করতে পারি। অতি সূক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে নক্ষত্রটির ভর, কক্ষপথ ও গতিবেগ বের করতে পারি যা থেকে মধ্যাকর্ষণ সংক্রান্ত সূত্রগুলোর সাহায্যে আমরা ব্ল্যাক হোলের ভর নির্ণয় করি।

ব্ল্যাক হোল কি আলোকে বাঁকিয়ে দেয়?

যে সকল আলোক রশ্নি ব্ল্যাক হোলের ঘটনা দিগন্ত অতিক্রম তারা ব্ল্যাক হোলে আটকা পড়ে যায় এবং বের হয়ে আসতে পারে না। আর যে সকল আলোক রশ্নি ব্ল্যাক হোলের ঘটনা দিগন্তের নিকট দিয়ে যায়(ঘটনা দিগন্ত অতিক্রম করে না), তারা ব্ল্যাক হোলে আটকা পড়ে না ঠিকই কিন্তু ব্ল্যাক হোলের মধ্যাকর্ষণ বলের কারণে বেঁকে যায়। ধরেন, আপনি একটা ব্ল্যাক হোলকে নিরাপদ দূরত্ব হতে দেখতেছেন এবং ব্ল্যাক হোলটির বিপরীত পাশে একটি নক্ষত্র রয়েছে। এখন, আপনি এ পাশ থেকে ঐ নক্ষত্রটির একাধিক প্রতিবিম্ব দেখতে পাবেন। কারণ ঐ নক্ষত্র হতে আলো আপনার কাছে আসার সময় ব্ল্যাক হোল তার মধ্যাকর্ষণ বলের কারণে বাঁকিয়ে দেয়। আইনস্টাইনের থিওরি অফ রিলেটিভিটি ভবিষ্যৎ বাণী করেছিল যে, প্রত্যেক বস্তু তার মধ্যাকর্ষণ বলের মাধ্যমে আলোকে বাঁকিয়ে দেয়। একে বলা হয় গ্র্যাভিশন্যাল লেন্সিং। কোনো বস্তুর ভর যত বেশি হবে, তার লেন্সিং তত শক্তিশালী হবে।

১৯১৯ সালে ব্রাজিলে পূর্ণ সূর্যগহণ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে দেখা যায় যে, সূর্য দূরবর্তী নক্ষত্র হতে আগত আলোকে বাঁকিয়ে দেয়। That proves the gravitational lensing. So, black holes can bend light.

ব্ল্যাক হোলের গঠন কেমন?
ব্ল্যাক হোলের গঠন সম্পর্কে আমাদের কোনো সুস্পষ্ট ধারণা নেই। আছে কিছু তথ্য যাদের পর্যবেক্ষণলব্ধ প্রমাণ খুবই কম। কেননা, ব্ল্যাক হোল হতে যেমন কোনো তথ্য উদ্ধার করা সম্ভব নয়, তেমনি সেখানে এমন কিছুকে পাঠানো সম্ভব নয় যে পরে আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারে।
.
সিঙ্গুলারিটি কি?

ব্ল্যাক হোলের কেন্দ্রকে বলা হয় সিঙ্গুলারিটি (Singularity)। এটিকে অসীম ঘনত্বের একটি বিন্দু বলা যায়। ব্ল্যাক হোলের সিঙ্গুলারিটি সম্পর্কেই আমাদের জ্ঞান সবচেয়ে অস্পষ্ট।

black hole

ইভেন্ট হরাইজন ঘটনা দিগন্ত কি?

আলো ব্ল্যাক  হোলের যে সীমার মধ্যে প্রবেশ করলে আর বের হতে পারে না,সে সীমাকে বলা হয় ঘটনা দিগন্ত (Event horizon) বলে। এটি একমুখী রাস্তা। এই সীমা অতিক্রম করলে আর ফিরে আসা সম্ভব নয়।

black hole

.
সোয়ার্জচাইল্ড ব্যাসার্ধ কি?

মহাবিশ্বের ত্রিমাত্রিক স্থানে ঘটনা দিগন্ত একটি গোলকের মতো যার ব্যাসার্ধকে সোয়ার্জচাইল্ড ব্যাসার্ধ [R(Sch)] বলে। R(Sch)=2GM\C^2,G=যেখানে মহাকর্ষীয় ধ্রুবক, M=নক্ষত্রের ভর, C=আলোর SWARZSCHILD RADIUS: সোয়ার্জচাইল্ড ব্যাসার্ধ=2GM\C^2, G=যেখানে মহাকর্ষীয় ধ্রুবক, M=নক্ষত্রের ভর,C=আলোর বেগ। সূর্য ও পৃথিবী যদি কখনো ব্ল্যাকহোল হয় তবে তাদের R(Sch)হবে যথাক্রমে 300km & 87cm। ব্ল্যাকহোলের ঘটনা দিগন্তের বাইরে সোয়ার্জচাইল্ড ব্যাসার্ধের 1.5 গুণ বড় ব্যাসার্ধের অঞ্চলকে ফোটন স্পিয়ার (Photon sphere) বলে। এ অঞ্চলে স্থান-কাল বক্রতাজনিত মধ্যাকর্ষণ বল প্রচন্ড। কিন্তু এ অঞ্চল হতে বের হওয়ার একটি মাত্র পথ আছে, যাকে বলা হয় এক্সিট কোণ (Exit Cone)। ফোটনস্পিয়ার হতে ঘটনা দিগন্ত পর্যন্ত কোনো অঞ্চলে মহাকাশ দেখাবে Exit Cone বরাবর এক চিলতে বৃত্তের মতো। যতোই আমরা ঘটনা দিগন্তের দিকে অগ্রসর হতে থাকব, ততোই exit cone-এর পরিধি কমতে কমতে বিন্দুতে পৌঁছাবে। ঘটনা দিগন্ত অতিক্রম করলে exit cone-এর অস্তিত্ব আর থাকবে না।
কোনো নক্ষত্র হতে ব্ল্যাক হোল সৃষ্টি হওয়ার পর তার শুধু তিনটি ধর্ম বজায় থাকে, যথা: ব্ল্যাক হোলের ভর (ব্ল্যাক হোল এর পদার্থের পরিমাণ), এর ঘূুর্ণন (এটি কি ঘূর্ণায়মান? যদি এটি ঘূর্ণায়মান হয় তবে এর কক্ষপথ এবং ঘূর্ণন গতি কি?) এবং বৈদ্যুতিক আধান।

কত প্রকার ব্ল্যাক হোল রয়েছে আমাদের মহাবিশ্বে?

ভরের ভিত্তিতে আমরা এখনো দুই প্রকারের ব্ল্যাক হোলের অস্তিত্ব খুুঁজে পেয়েছি।

১) স্টেলার ব্ল্যাক হোল (stellar black hole): এদের ভর সূর্যের ভরের কয়েক গুণের চাইতে বেশী;
২) সুপার ম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল (supermassive black hole): এদের ভর প্রায় একটি ছোট গ্যালাক্সির ভরের সমান।

কয়েকজন জ্যেতিবিজ্ঞানির মতে আরো কয়েক প্রকার ব্ল্যাক হোল রয়েছে। উদাহরণস্বরূপঃ primordial black hole-এর কথা বলা যায়। এ ব্ল্যাক হোলের ভর প্রায় একটি পর্বত এর ভরের সমান এবং আকার একটি পরমাণুর সমান।

ব্ল্যাক হোল কিভাবে উৎপন্ন হয়?

Primordial black hole – এ রকম ব্ল্যাক হোলগুলো উত্তপ্ত ঘনমাধ্যমের অত্যন্ত উচ্চচাপগ্রস্থ অঞ্চলের চুপসে যাওয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল। যে বৃহৎ বিস্ফোরণের ফলে মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়েছিলো তার স্বল্পকাল পরে ঐ রকম উত্তপ্ত ঘন মাধ্যম ছিলো বলে বিশ্বাস করা হয়।

Stellar black hole – সাধারনত একটি নক্ষত্রে প্রতিনিয়ত নিউক্লীয় বিক্রিয়া চলতে থাকে। হাইড্রোজেন গ্যাসের পরমাণু সমুহ পরস্পরের সাথে মিশে হিলিয়াম গ্যাসে পরিণত হয়। এ বিক্রিয়ার ফলে নক্ষত্রে প্রচুর তাপ ও চাপ উৎপন্ন হয়। উৎপন্ন তাপ নক্ষত্রকে উজ্জ্বল করে এবং উৎপন্ন চাপ নক্ষত্রের কেন্দ্রে বহির্মুখী চাপের সৃষ্টি করে যা মহাকর্ষীয় বলের কারণে নক্ষত্রে সৃষ্ট কেন্দ্রমুখী সংকোচনধর্মী চাপের সৃষ্টি হয়। একটি নক্ষত্রের জীবন কালের বেশীর ভাগ সময় এই দুই বিপরীতমুখী চপের মধ্যে ভারসাম্য বজায় থাকে। এরকম অবস্থা চলতে থাকে কয়েক মিলিয়ন বছর ধরে। কিন্তু এক সময় নিউক্লীয় জ্বালানিগুলো শেষ হয়ে যায় ও নিউক্লীয় বিক্রিয়া বন্ধ হয়। ফলে কেন্দ্রমুখী সংকোচনধর্মী চাপ এই নি্উক্লীয় বিক্রিয়ার ফলে সৃষ্ট বর্হিমুখী চাপের উপর বিজয় লাভ করে। ফলে তারার সকল ভর কেন্দ্রে সংকুচিত হতে শুরু করে। চন্দ্রশেখর সীমার নিচের নক্ষগুলোর ক্ষেত্রে যখন এটি হয় তখন এরা শ্বেত বামনে পরিণত হয়। চন্দ্রশেখর সীমার উপরের তারাদের ক্ষেত্রে আবার এমনটি ঘটে না। সংকোচনের ফলে বাইরের ও ভিতরের চাপ সমান করতে গিয়ে এই নক্ষত্রগুলো প্রচন্ড বিষ্ফোরনের মাধ্যমে নিজের ভিতরের কিছু অংশ বইরের দিকে প্রচন্ড বেগে বের করে দেয় এ ঘটনাকে বলা হয় সুপারনোভা। সুপারনোভার পর বাকী অংশের ভর যদি সূর্যের ভরের ২.৫ গুণের অধিক হয় তবে ঐ নক্ষত্রের সকল ভর দ্রুত কেন্দ্রে সংকুচিত হয়ে ব্ল্যাক হোলে পরিণত হয়। আর বের করে দেয়া অংশ প্রায়ই একটি ছোট নক্ষত্রে পরিনত হয়।

সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল কীভাবে সৃষ্টি হয়?

এ প্রশ্নের নিশ্চিত কোনো উত্তর এখনো আমাদের নেই। তবে আমাদের আছে কিছু ভবিষ্যদ্বাণী। কিছু বিজ্ঞানীর মতে, স্টেলার ব্ল্যাক হোলগুলো কয়েক সহস্র কোটি বছর ধরে বেড়ে উঠে সুপারম্যাসিভে পরিণত হয়। যেহেতু সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোলগুলো গ্যালাক্সির কেন্দ্রে অবস্থিত, তাই এ ভবিষ্যদ্বাণী মতে বলা যায়; সকল স্টেলার ব্ল্যাক হোলগুলো নয়, শুধু গ্যালাক্সির কেন্দ্রে অবস্থিত স্টেলারগুলোই সুপারম্যাসিভে পরিণত হওয়ার সামর্থ্য রাখে কেননা সুপারম্যাসিভে পরিণত হওয়ার জন্য গ্যালাক্সির কেন্দ্রেই প্রয়োজনীয় সরবরাহ পাওয়া যায়।

অনেক বিজ্ঞানী আবার মনে করেন শুধু একটি স্টেলার হতে নয়, বরং অনেকগুলো স্টেলার ব্ল্যাক হোল মিলেই সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল সৃষ্টি করে।
আবার, ব্ল্যাক হোল দ্বারা নক্ষত্র গিলে ফেলার মাধ্যমে অথবা বিশাল পরিমাণ মহাজাগতিক গ্যাস হতেও সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল উৎপন্ন হতে পারে।
যদি ২টি গ্যালাক্সির সংঘর্ষ হয়, তবে সেই বিশাল মহাজাগতিক ঘটনা থেকেও এ রকম ব্ল্যাক হোল সৃষ্টি হতে পারে।

আমাদের মহাবিশ্বে ব্ল্যাক হোলের সংখ্যা কত?

আমাদের মহাবিশ্বে এত বেশি ব্ল্যাক হোল রয়েছে যে তা গণনা করা অসম্ভব। সৌভাগ্যের কথা হল, মহাবিশ্ব অসীম ও কোনো ব্ল্যাকহোলই পৃথিবীর ক্ষতি করার মতো যথেষ্ট কাছে নেই। ব্ল্যাক হোলের সংখ্যা গণনা করার একটু চেষ্টা করা যাক। মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে প্রায় ১০০ বিলিয়ন নক্ষত্র রয়েছে। যাদের মধ্যে কমপক্ষে ১০০ মিলিয়ন নক্ষত্রের স্টেলার ব্ল্যাক হোল হওয়ার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ ভর রয়েছে। এদের মধ্যে অনেকগুলো নিশ্চয় ইতিমধ্যে ব্ল্যাক হোলে পরিণত হয়েছে (যার মধ্যে আমরা শনাক্ত করেছি মাত্র ১২/১৩ টি ব্ল্যাক হোল) আর হয়তো বা বাকিগুলো পরে ব্ল্যাক হোল হবে। হয়তো বা এই মুহূর্তে কিছু ব্ল্যাক হোলে পরিণত হচ্ছে! যদি এখন তা হয় তাহলে তা জানতেও আমাদের কয়েক বছর লেগে যাবে! তাছাড়া মিল্কিওয়ের মতো বড় গ্যালক্সিগুলোর কেন্দ্রে থাকে সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল। তাহলে আমরা বলতে পারি যে, প্রতিটি গ্যালাক্সিতে কয়েক মিলিয়ন ব্ল্যাক হোল রয়েছে। পৃথিবী হতে দৃশ্যমান মহাবিশ্বে কয়েক কোটি গ্যালাক্সি রয়েছে। তাহলে দৃশ্যমান মহাবিশ্বেই ব্ল্যাক হোলের সংখ্যা কয়েক শত বিলিয়ন। আর অদৃশ্যমান মহাবিশ্ব?

দুইটি ব্ল্যাক হোল মিলিত হলে কী ঘটে?

যদি দুইটি ব্ল্যাক হোল এতই কাছাকাছি পৌছে যে তারা নিজেদের মধ্যকার আকর্ষণ বল হতে পালাতে পারে না, তবে তারা মিলেমিশে একাকার হয়ে আরো বড় একটি ব্ল্যাক হোলে পরিণত হবে [*এভাবেও সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল সৃষ্টি হতে পারে*] এই রকম একটি মহাকর্ষীয় ঘটনা অতি ধ্বংসাত্নক হবে। এমনকি শক্তিশালী কম্পিউটারেও এ ঘটনা পুরোপুরি বিশ্লেষণ করা সম্ভব নয়। এরকম একটি ঘটনা বিপুল পরিমাণে শক্তি সৃষ্টি করে ও মহাবিশ্বের স্থান-কাল জালের মধ্যে তরঙ্গ প্রেরণ করে। যাকে আমরা বলে থাকি মহাকর্ষীয় তরঙ্গ(gravitational wave)। এই মহাকর্ষ তরঙ্গ সম্পর্কে আইনস্টাইনের থিওরি অফ রিলেটিভিটি সর্বপ্রথমে ভবিষ্যদ্বাণী করে। এই মহাকর্ষ তরঙ্গ বর্তমানে শনাক্ত করা হয়েছে। ১৩০কোটি আলোকবর্ষ দূরে সূর্য হতে যথাক্রমে ২৯ গুণ ও ৩৬ গুণ ভরের দুইটি ব্ল্যাক হোল পরস্পরের সাথে মিশে গিয়ে একটি ব্ল্যাক হোলে পরিণত হওয়ার সময় এ তরঙ্গ সৃষ্টি হয়েছিল যা পৃথিবীর যন্ত্রে ধরা পড়ে ২০১৫ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর প্রায় ১৩০ কোটি বছর পর! এর মাধ্যমে থিওরি অফ রিলেটিভিটির সত্যতা প্রমাণিত হয়।

.
ব্ল্যাক হোল নিয়ে ২ টি এক্সপেরিমেন্ট …………

Experiment-1: আমি কি একটি ব্ল্যাক হোলের নিকটে একটি কক্ষপথে নিরাপদে ঘুরতে পারি?
হ্যাঁ, এটা সম্ভব যে আপনি একটি ব্ল্যাক হোলের নিকটে ঘুরতে পারেন ব্ল্যাকহোলে না পড়েই! তবে একটাই শর্ত: আপনাকে অত্যন্ত দ্রুতবেগে ঘুরতে হবে। এ ঘটনাটিই সৌরজগতে ঘটে থাকে। পৃথিবী সূর্যে পতিত হয় না কারণ পৃথিবী এটির চারপাশে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৬৭০০০ মাইল বেগে ঘুরছে। কিন্তু একটি ব্ল্যাক হোলের নিকটবর্তী কক্ষপথগুলো বিভিন্ন কৌতুহলোদ্দীপক আকৃতির হতে পারে, যেখানে আমাদের সৌরজগতের কক্ষপথগুলো সবসময় উপবৃত্তাকার।

মনে করেন, আপনি একটি ব্ল্যাক হোলকে কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করার জন্য একটি মহাকাশযানে করে ব্ল্যাক হোলের দিকে যাত্রা শুরু করলেন। যদি আপনি কম বেগে যাত্রা শুরু করেন তবে আপনি সর্পিলাকার পথে ব্ল্যাক হোলে পতিত হবেন। যদি আপনি অতি দ্রুত বেগে যাত্রা শুরু করেন তবে আপনি আস্তে আস্তে ব্ল্যাক হোল হতে দূরে সরে যাবেন।মধ্যম বেগের ক্ষেত্রে অপনি ব্ল্যাক হোলের চারপাশে জটিল কক্ষপথে ঘুরতে থাকবেন। ব্ল্যাক হোলের চারপাশে একটি বৃত্তাকার পথে ঘুরার জন্য শুধুমাত্র একটিই নির্দিষ্ট গতিবেগ রয়েছে। এই গতিবেগটা আপনাকে একটি স্থিতীশীল সুবিধা প্রদান করবে যদি আপনি ব্ল্যাক হোল হতে সঠিক দূরত্বে যাত্রা শুরু করেন। কিন্তু আপনি যদি ব্ল্যাক হোলর অতি নিকট হতে যাত্রা শুরু করেন, সেক্ষেত্রে আপনি একটি জুয়া খেলায় অংশ নিতে চলেছেন। In that case, এমনকি ক্ষুদ্রতম অপসরণ/movement (অবস্থার পরিবর্তন) আপনার মহাকাশযানের কক্ষপথের বিশাল পরিবর্তন সাধিত করতে পারে। এর ফলে আপনি হয়তোবা ব্ল্যাক হোল হতে দূরে সরে যাবেন। কিন্তু আপনি সত্যিকার অর্থেই দুর্ভাগা যদি আপনি ব্ল্যাক হোলে পতিত হন।

Experiment-2: যদি আমি ব্ল্যাক হোলে একটি ঘড়ি ফেলে দিই,তবে কী ঘটবে?? আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্ব অনযায়ী, ভরযুক্ত বস্তু মাত্রই তার ভর অনুসারে স্থান-কালে বক্রতা সৃষ্টি করে। একটি ব্ল্যাক হোলের নিকটে এ বক্রতা এতই শক্তিশালী হয় যে কাল বা সময় স্বাভাবিক আচরণ করে না। কল্পনা করেন যে আপনি ব্ল্যাক হোলের নিকটে একটি মহাকাশযানে অবস্থান করছেন। এবার, আপনি ব্ল্যাকহোলে একটি ঘড়ি ফেলে দিলেন এবং মহাকাশযানের দেয়ালে অবস্থিত একটি ঘড়ির সময়ের সাথে ঐ ঘড়ির সময়ের সাথে তুলনা করতেছেন। আপনি দেখতে পাবেন যে, পড়ন্ত ঘড়িটির সময় আশ্চর্যজনকভাবে ধীর! এ পড়ন্ত ঘড়িটি যতই ব্ল্যাক হোলের নিকটে পৌছায় এর সময় ততই ধীর হতে শুরু করে। কিন্তু যখন এটি ঘটনা দিগন্তে পৌছায়, তখন এটি এবং এটির সময় একদম স্থির হয়ে যায়। অর্থাৎ আপনি কখনো এটিকে ঘটনা দিগন্ত অতিক্রম করতে দেখবেন না। আরেকটি বিষয় আপনি লক্ষ্য করবেন যে ঘড়িটি যতই ব্ল্যাক হোলের নিকটে পৌছায়, ততই এটি লাল বর্ণের হতে শুরু করবে। কারণ ঘড়িটি হতে আপনার কাছে আগত আলোকেও ব্ল্যাক হোল আকর্ষণ করবে [ঘড়িটি ঘটনা দিগন্তে পৌছানোর আগেই]। এ আকর্ষণ বলকে অতিক্রম করে আলো আপনার কাছে আসার সময় শক্তি হারিয়ে লাল বর্ণ ধারণ করে। অর্থাৎ, আপনি ঘটনা দিগন্তের বাইরে হতে কখনওই কোনও বস্তুকে ব্ল্যাক হোলের ঘটনা দিগন্ত অতিক্রম করতে দেখবেন না। একজন বাইরের পর্যবক্ষেক কখনও কোনো কিছুকে ব্ল্যাক হোলের ভিতরে পড়তে দেখবেন না। অপরদিকে আপনিও যদি ঘড়িটির সাথে ব্ল্যাক হোলে পড়তেন তবে আপনার কাছে সময়কে একদম স্বাভাবিক মনে হত। আপনি আপনার সাথে পড়ন্ত ঘড়িটির সময়ে কোনও ধীর লক্ষ্যে করতেন না। আপনি সময় ও বর্ণের কোনও দৃশ্যকর পরিবর্তন ছাড়াই ঘটনা দিগন্ত অতিক্রম করতেন ও ঘড়িটির বর্ণেরও কোনো পরিবর্তন আপনি লক্ষ্য করতেন না। এটাও সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের একটা নীতি, কোনো বস্তু স্থির না চলমান তার উপর নির্ভর করে বিভিন্নভাবে আবির্ভূত হয়। স্থির বস্তুর তুলনায় গতিশীল বস্তুর সময়ের গতি কমে যায়। অর্থাৎ, যে স্থির তার ঘড়িটি চলবে দ্রুত (গতিশীল বস্তুর সাপেক্ষে) আর যে গতিশীল তার ঘড়িটি চলবে ধীরে (স্থির বস্তুর সাপেক্ষে )।

ব্ল্যাক হোলের অন্তিম পরিণতি কী? তারা কী চিরকাল বিদ্যমান থাকবে?

যেহেতু ব্ল্যাক হোল হতে কোনো কিছু তার মধ্যাকর্ষণ বলের কারণে পালাতে পারে না, তাই এটা অনেক সময় ধরে ভাবা হয়েছিল যে ব্ল্যাক হোলগুলো কখনো বিলীন হবে না। কিন্তু বর্তমানে আমরা জানি ব্ল্যাক হোলগুলো ধীরে ধীরে শক্তি বিকিরণের মাধ্যমে বিলীন হয়ে যায়। ১৯৭৪ সালে বিখ্যাত পদার্থবিদ স্টিফেন হকিং এটি প্রমাণ করেন। তিনি এটির জন্য কোয়ান্টাম মেকানিক্সের নীতিগুলোর সাহায্য নিয়েছিলেন। কোয়ান্টাম মেকানিক্স ক্ষুদ্রতম স্কেলে পদার্থের আচরণ ব্যাখ্যা করে। কোয়ান্টাম মেকানিক্স অনুযায়ী, শূণ্যস্থান আসলে শূণ্য না। সে শূণ্যস্থানে প্রতিনিয়ত ভার্চুয়াল কণা নামক কণিকারা জোড়ায় জোড়ায় উৎপন্ন হচ্ছে এবং ধ্বংসও হচ্ছে। এই জোড়ার মধ্যে একটি বাস্তব কণা, অন্যটি প্রতিকণা।এই বাস্তব কণা ও প্রতিকণা উৎপন্ন হবার পর এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মত ক্ষুদ্র সময়ে পরস্পরের সাথে মিলিত হয়ে নিঃশেষ হয়ে যায়। এই কণাগুলো সৃষ্টি হওয়ার সাথে বিলীন হয়ে যায়। কিন্তু এই ভার্চুয়াল কণাগুলো যদি ব্ল্যাক হোলের ঘটনা দিগন্তের কাছে সৃষ্টি হয় তখন কী ঘটবে? কণাগুলো কি একইভাবে পরস্পরকে বাতিল করে দেবে?

এ প্রক্রিয়াটি ঘটনা দিগন্তের কাছে ভিন্নভাবে ঘটবে। কারণ ব্ল্যাক হোল এই কণাদের প্রভাবিত করে। ব্ল্যাক হোল কর্তৃক প্রযুক্ত শক্তির প্রভাবে এই কণাগুলো একে অপরের সাথে মিলিত হয় না। দুটি কণার মধ্যে একটকে ব্ল্যাক হোল তার নিজের দিকে টেনে নেয় ও অপরটিকে বাইরের দিকে ঠেলে দেয়। ফলে অপর কণাটি মুক্ত হয়ে যায় (অর্থাৎ ভার্চুয়াল কণাটি বাস্তব কণায় পরিণত হয়)। কণাটির বাইরে আসতে যে শক্তি লাগে তা সরবরাহ করে ব্ল্যাক হোল নিজে। লক্ষণীয়: এই যে কণাটি বাইরে আসছে তা কিন্তু সরাসরি ব্ল্যাক হোলের অভ্যন্তর হতে আসছে না। ব্ল্যাক হোল শুধু এ কণাকে বাইরের দিকে ঠেলে দেয়। এ কণাটিকেই আমরা বিকিরণ আকারে বের হতে দেখব ঘটনা দিগন্তের সীমানা হতে। এ বিকিরণকেই আমরা বলি “হকিং বিকিরণ “।
ব্ল্যাক হোলের ভর যত কম হয় হয়, এ বিকিরণের পরিমাণ ততই বাড়তে থাকে। অর্থাৎ, ছোট আকারের ব্ল্যাক হোলগুলো বড় আকারের ব্ল্যাক হোলগুলো হতে বেশি পরিমাণ কণা বিকিরণ করবে। যার শক্তি আসবে ব্ল্যাকহোল হতে। ফলে ব্ল্যাক হোল শক্তি হারাবে। শক্তি হারানোর অর্থ তার ভর কমে যাওয়া। এভাবে যদি বিকিরণ চলতেই থাকে তবে ব্ল্যাক হোল তাত্ত্বিকভাবে ভর হারাতে হারাতে একসময় নিঃশেষ হয়ে যাবে। উল্লেখ্যঃ ব্ল্যাক হোলের মধ্যাকর্ষণ টানের কারণে সময়ের বিচ্যুতি ঘটার ফলে এই প্রক্রিয়াটি ঘটে অত্যন্ত ধীরে ধীরে। যার কারণে আমরা দেখি বিলিয়ন-ট্রিলিয়ন বছর ধরে ব্ল্যাক হোল টিকে আছে।


লেখকঃ অভি দেওয়ান 


তথ্যসূত্রঃ

  1. Hubblesite
  2. NASA
  3. Wikipedia

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here