icon

আদিবাসীদের জ্ঞানই পারবে জীববৈচিত্র্যের সংকটকে সমাধান করতে

Shanta Chakma

Last updated Jun 27th, 2020 icon 317

ভূমিকে কেন্দ্র করে যেসব মানুষদের বসবাস তাঁরা টিকে থাকেই বাস্তুসংস্থানকে সংরক্ষণ করার মাধ্যমে, এবং সেই কারণে পরিবেশকে সংরক্ষণ করতে তাঁরা যেসব অভিনব কৌশল ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা সেগুলোকে জানার চেষ্ঠা করছে।

গতবছর জাতিসংঘ একটি প্রারম্ভিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে যেখানে বলা হয়েছে যে, হুমকিস্বরুপভাবে বৈশ্বিক   জীববৈচিত্র্য অভূতপূর্ব হারে কমছে, সেইসাথে প্রায় এক লক্ষ প্রজাতির প্রাণী বিলুপ্ত হওয়ার ঝুঁকির মুখে আছে।

যদিওবা প্রতিবেদনে এটাও বলা হয়েছে যে, আদিবাসী শাসিত অঞ্চলগুলোতে জীববৈচিত্র্য পতনের হার উল্লেখযোগ্যভাবে অনেক ধীরগতির, যা তাঁদেরকে তাঁদের নিজেরদের প্রাকৃতিক পরিবেশের সফল তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে প্রদর্শন করে।

জীববৈচিত্র্য বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীর মধ্যেকার জিনগত বৈচিত্র্য এবং সেইসাথে এর সঙ্গে স্বাস্থ্য ও বাস্তুসংস্থানের সহনশীলতার মধ্যেকার অখণ্ড সম্পর্ককে ব্যাখ্যা করে।

জীববৈচিত্র্যের এই হ্রাস মানুষের উপর বিভিন্নভাবে নেতিকবাচক প্রভাব ফেলবে, খাদ্য নিরাপত্তা থেকে শুরু করে পানির মান পর্যন্ত।

বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে, বিশ্বব্যাপী আমাদের পবিত্র জীবাঞ্চলকে রক্ষা করার যুদ্ধে, আদিবাসী জ্ঞানের এখন দায়িত্ব সেই যুদ্ধে একটি অপরিহার্য ভূমিকা পালন করার।

সারা বিশ্বজুড়ে আদিবাসী সম্প্রদায়গুলো বহু প্রজন্ম ধরে তাঁদের ঐতিহ্যগত ভূমিতর সাথে মিলেমিশে বসবাস করে আসছে।

ভূমি এবং তার সম্পদের উপর নির্ভর হয়ে তাঁরা টিকে থাকলেও একইসাথে তাঁরা বাস্তুসংস্থানের অখণ্ডতাকেও বজায় রাখছে।

আদিবাসী সম্প্রদায়দের জন্যে পরিবেশগত ধারনক্ষমতাকে বজায় রাখাটা অপরিহার্য,  এটি ছাড়া তাঁদের নিজেদেরই জীবিকা হুমকির মুখে দাঁড়াবে।

ঐতিহ্যগত বাস্তুসংস্থানসংক্রান্ত জ্ঞান এবং  চর্চা এতটাই সফল হয়ে আসছে যে, যদিওবা আদিবাসীদের ভূমি পৃথিবীর মোট স্থলভাগের ২২% থেকেও কম, তাঁদের এই ঐতিহ্যবাহী এলাকায় পৃথিবীর মোট জীববৈচিত্র্যের ৮০% প্রাণী বসবাস করে।

যা কিনা টেকসই ভূমি ব্যবস্থাপনা ও বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার এবং সেইসাথে জলবায়ু অভিযোজন কৌশলের জন্য, পরিবেশগত উপাত্ত প্রদানে ঐতিহ্যগত বাস্তুসংস্থানসংক্রান্ত জ্ঞানের গ্রহণযোগ্যতাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে।

ক্রমবর্ধমানভাবে টেকসই ভূমি এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনায় ঐতিহ্যগত বাস্তুসংস্থানসংক্রান্ত জ্ঞান কিংবা TEK (Tradtional Ecological Knowledge) আধুনিক বিজ্ঞানের পরিপূরক হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে।

এটি  আদিবাসী সম্প্রদায়ের দ্বারা তাঁদের নিজেদের পরিবেশকে গভীরভাবে বুঝতে পারার ফসল, যেটি কিনা বহু প্রজন্ম ধরে বিবর্তিত হয়ে আসছে।

বিভিন্ন ধরণের ঐতিহ্যগত ব্যবস্থাপনার চর্চা, যেমনঃ মাটির  উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোর জন্যে গাছপালা পোড়ানোর যে চর্চা সেটি একই সাথে সাংস্কৃতিক ও পরিবেশগত ভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

অস্ট্রেলিয়াতে সেখানকার আদিবাসীদেরকে প্রান্তিকীকরণ করার ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও অস্ট্রেলিয়া সরকার ১৯৯০ সালে ৭৫ টি ‘আদিবাসী সংরক্ষিত এলাকা’ প্রতিষ্ঠা করার  মাধ্যমে পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় আদিবাসীদের জ্ঞানের শক্তিকে স্বীকৃতি দিয়েছে।

এইসব এলাকাগুলোতে আদিবাসীদের উপর তাদের নিজেদের ভূমির ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ করার দায়িত্ব ন্যস্ত করা থাকে।

অধিকন্তু অস্ট্রেলিয়ার জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা ছাড়াও এই আদিবাসী সংরক্ষিত এলাকা প্রকল্পটি আদিবাসী সম্প্রদায়দের সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক উন্নতি সাধন করেছে।

ঐতিহ্যগত বাস্তুসংস্থানসংক্রান্ত জ্ঞান কিংবা TEK (Tradtional Ecological Knowledge) পরিবেশের জটিল পদ্ধতির সম্পর্কে তথ্য উন্মোচন করতে পারে। বহু শতাব্দী ধরে আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী চর্চা নিয়ে সাবধানতার সাথে করে আসা পর্যবেক্ষণকে শেখার এবং বোঝার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা প্রাকৃতিক পদ্ধতি সম্পর্কে জ্ঞানলাভে এগোতে পারবে।

যেমনঃ বলিভিয়া (Bolivia) ও পেরুর আন্দিজ (Peruvian Andes) পর্বতমালায় বসবাসকারী আদিবাসী কৃষকরা সঠিকভাবে আবহাওয়া আগাম বার্তা দিতে পারে আকাশের কৃত্তিকার (Pleiades) তারকাপুঞ্জের আকার এবং ঔজ্জ্বল্য  দেখে।

আদিবাসী কৃষকদের এই চর্চা পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা ট্রপোস্ফেরিক(Tropospheric) মেঘ এবং এল নিনো (El Niño – প্রশান্ত মহাসাগরে জমা উষ্ণ ঢেউ) এর মধ্যেকার একটি সম্পর্ককে আবিষ্কার করেছেন যেটির সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা আগে অবগত ছিলেন না।

এই আবিষ্কার এবং সেই সাথে আদিবাসীদের ঐতিহ্যগত জ্ঞান থেকে পাওয়া ফলাফল এটাই প্রদর্শন করে যে পরিবেশের সম্পর্কে আমাদের সমষ্টিগত বোঝাপড়া  এবং এর ব্যবস্থাপনায় ঐতিহ্যগত বাস্তুসংস্থান সম্পর্কিত জ্ঞান অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। 

জলবায়ু পরিবর্তন ইতোমধ্যে পরিবেশের বাস্তুসংস্থানে পরিবর্তন আনছে এবং বর্তমানে চলতে থাকা  জীববৈচিত্র্য সঙ্কটের পিছনে এক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে।

জলবায়ু সংক্রান্ত এই পরিবর্তনে বিশেষত আদিবাসী সম্প্রদায়গুলো বেশি ঝুঁকির মুখে আছে যেহেতু পরিবেশের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ট সম্পর্ক রয়েছে, এবং এর উপরেই তারা নির্ভরশীল অথচ স্থানীয়রা এই বাস্তুসংস্থানকে ভঙ্গুর করে দিচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের মুখে আদিবাসী সম্প্রদায়দের সহনশীলতার দীর্ঘমেয়াদী উন্নতি সাধন করতে হলে, বাধ্যতামূলকভাবে জলবায়ু সম্পর্কিত পরিবর্তনগুলোকে চিহ্নিত করতে হবে এবং তার সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্য কার্যকরী কৌশল তৈরি করতে হবে।

ঐতিহ্যগত বাস্তুসংস্থানসংক্রান্ত জ্ঞানকে সদ্বব্যবহার করার মাধ্যমে অতিদ্রুত জলবায়ুকে সহনশীল করার একটি সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে। 

প্রথমত, যেসব অঞ্চলগুলোতে পরিবেশ পর্যবেক্ষণ খুবই সীমিত কিংবা নেই বললেই চলে সেসব অঞ্চলগুলোতে ঐতিহ্যগত বাস্তুসংস্থানসংক্রান্ত জ্ঞান কিংবা TEK (Tradtional Ecological Knowledge) পরিবেশ সম্পর্কিত উপাত্ত সংগ্রহের ভিত্তি হিসেবে কাজ করতে পারে।

পরিবেশের ঐতিহাসিক অবস্থার সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকলে, বিজ্ঞানী এবং অন্যান্য অংশীদারদের (stakeholder) জলবায়ু প্রবর্তিত পরিবর্তনগুলোকে বুঝতে সুবিধা হয়।

দ্বিতীয়ত,  বহু শতাব্দী ধরে আদিবাসী সম্প্রদায়গুলো পরিবেশগত এই পরিবর্তনগুলোকে চিহ্নিতকরণ করা, এর সাথে খাপ খাওয়ানো এবং সাড়া দিয়ে আসছে।

জলবায়ু অভিযোজন কৌশলের উন্নয়নে ঐতিহ্যবাহী বোধশক্তিকে আধুনিক বিজ্ঞানের পরিপূরক হিসেবে মোতায়ন করা উচিত।

এই উদীয়মান জীববৈচিত্র্যের সংকটে, প্রাকৃতিক বাস্তুসংস্থানকে সংরক্ষন এবং পরিচালনা করার জন্যে কার্যকরী কৌশলগুলোর উন্নয়নসাধন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জাতীয় ও বৈশ্বিক মাত্রায় জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে পরিবেশ সংরক্ষণের যেসব প্রচেষ্টা ও কার্যকলাপগুলো নেওয়া হয়েছে সেগুলোতে অনেক ঘাটতি রয়ে গেছে।

৭ আগস্ট, ২০১৯ তারিখে জাতিসংঘ অতিরিক্ত আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে যেখানে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির সাথে সাথে জলবায়ু প্রণোদিত ভূমি ক্ষয় এবং খাদ্য নিরাপত্তাকে কেন্দ্র করে যেসব বাঁধার সৃষ্টি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে সেসবের একটি বিশদ বিবরণ দেওয়া হয়েছে।

বিশেষভাবে এই প্রতিবেদনটি আদিবাসীদেরকে ভূমি ব্যবস্থাপনায় এবং কৃষিকাজে নিযুক্ত করার উপরে গুরুত্ব আরোপ করেছে।

একই সাথে এটাও উল্লেখ করেছে যে আদিবাসীদের জ্ঞানই পারবে জলবায়ু প্রণোদিত পরিবর্তনকে পরাস্ত করতে।

আদিবাসী মানুষদেরকে পরিবেশ পরিচালনায় নিযুক্ত করার মাধ্যমে বহু প্রজন্ম ধরে চলে আসা তাঁদের পর্যবেক্ষণগুলোকে শিখতে পারার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগের সৃষ্টি হবে একই সাথে আদিবাসী মানুষদের তাঁদের নিজেদের ঐতিহ্যবাহী ভূমিতে প্রবেশ, ব্যবহার এবং পরিচালনা করার যে অধিকার রয়েছে তা যুগপৎভাবে বহাল থাকবে।  

পরিবেশ সংরক্ষণ ও পরিচালনায় আদিবাসীদের জ্ঞান ও দৃষ্টিভঙ্গিকে সংযুক্ত করার লক্ষ্যকে সামনে রেখে সহযোগী যে উদ্যোগগুলো নেওয়া হয়েছে সেগুলো পরিবেশ এর নিয়ন্ত্রণকে আরো বেশি শক্তিশালী করে তুলেছে।

সামনের দিনগুলোতে সরকার এবং সম্পদ ব্যবস্থাপকদের উচিত পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় ঐতিহ্যগত বাস্তুসংস্থানসংক্রান্ত জ্ঞান কিংবা TEK (Tradtional Ecological Knowledge) কে উন্নীত করা এবং সেই সাথে পরিবেশ পরিচালনায় আদিবাসী মানুষদের অধিকারকে স্বীকৃতি প্রদান করা।

মূল লেখক : হানাহ রান্ডল (Hannah Rundle)

মূল লেখাটি প্রকাশিত হয়েছেঃ https://blogs.scientificamerican.com/observations/indigenous-knowledge-can-help-solve-the-biodiversity-crisis/

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা

Shanta Chakma

Contributor

Follow Shanta Chakma

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Close Bitnami banner