২০১৭ রমেল, ১৯৯৬ কল্পনাঃ রাষ্ট্রীয় সংগঠন

0
40

বিভিন্ন স্থানীয় মিডিয়া ও অধিকার কর্মী, ব্লগারদের মাধ্যমে জানলাম এইচ এস সি পরীক্ষার্থী রমেল চাকমা (যিনি একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধীও ছিলেন) মারা গেছেন। অভিযোগ উঠছে সেনাবাহিনীর হাতে নির্যাতনের পর রমেল টানা পনের দিন (এপ্রিল ৫ – এপ্রিল ১৯) চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ছিলেন কিন্তু এমন নির্যাতন তার উপর হয়েছিল যে ১৫ দিনের চিকিৎসাও তাকে সুস্থ করে তুলতে পারলো না। অভিযোগ উঠছে নান্যাচর, রাঙ্গামাটির মেজর তানভীরের নেতৃত্বে রমেলের উপর এই নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। কি কারণে তাঁকে ধরে এমন পিটানো হল তা এখন পর্যন্ত স্পষ্ট নয় (আমার কাছে, কেউ জানলে জানাবেন)। স্থানীয় মিডিয়া লিখেছে, রমেলের বাবা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে এ সংক্রান্ত ব্যাপারে অভিযোগ জানিয়েছিলেন, কিন্তু কোন সাহায্য পান নি।

এ সংক্রান্ত কোন খবর এখনো কোন জাতীয় দৈনিকে আসেনি। না আসার পিছনে দুটো কারণ থাকতে পারে –

১। জাতীয় দৈনিকে কর্মরত যে সকল স্থানীয় সাংবাদিক পার্বত্য চট্টগ্রামে দায়িত্বরত আছেন তাঁদের নিরাপত্তাজনিত কারণে তাঁরা নিজেরাই সে খবর জাতীয় দৈনিকে পাঠাননি।

২। তাঁরা খবর পাঠিয়েছেন অথবা জাতীয় দৈনিক জানেন এই ধরনের ঘটনা ঘটেছে কিন্তু যেহেতু কোথাকার কোন জংলি মারা গেছে (তা সে এইচ এস সি পরীক্ষার্থী হোক আর দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হোক), জাতীয় দৈনিক মনে করছেন না এটা কোন নিউজ। বরঞ্চ পাহাড়ের জংলিদের পানি মারামারি এর চাইতে বড়ো নিউজ জাতীয় দৈনিকের কাছে।

অনেকে ফেইসবুকে অনেক ভালো ভালো লেখা লিখছেন রমেলকে নিয়ে। সেনা শাসন নিয়ে। প্রশাসনের পাহাড়িদের উপর ঘটে যাওয়া ঘটনায় সুবিচার দেওয়ার মন মানসিকতা না থাকা নিয়ে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সেনাবাহিনী সংক্রান্ত ঘটনাবলি নিয়ে অভিযোগ পাহাড়িরা দায়ের করলে তা নিয়ে কাজ করার ব্যাপারে উদাসীনতা ও উপেক্ষা নিয়ে। খুব ভালো কথা। আমার ভালো লাগছে দেখে। তরুণ যুব প্রজন্ম তাঁদের অস্তিত্ব নিয়ে ভাবছে, তাঁরা যারা এসব ব্যাপার জানেন না, তাঁদের জানাচ্ছেন। জনমত গঠন করছেন। এসবের দরকার আছে, কিন্তু নিয়মতান্ত্রিক ভাবে সরকারী যে প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তির উপর রমেলকে মেরে ফেলার ব্যাপারে অভিযোগ উঠছে সেই প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহিতার আওতায় কিভাবে আনা সম্ভব তা নিয়ে তরুণ প্রজন্ম কি ভাবছে? আমি বলছিনা, লেখালেখির কোন দাম নেই। অনেক অনেক দাম আছে। কিন্তু আমাদের আরও যে সকল পন্থায় অন্যায়ের প্রতিবাদ করা সম্ভব তাও তো শিখতে হবে! লেখালেখির দাম আছে, রাস্তায় নেমে আন্দোলনের দাম আছে, এসি রুমে বসে নেটওয়ার্কিং-এর দাম আছে, সভা সেমিনার এর দাম আছে। কোন কিছুর সুবিচার যখন আমরা চাই, তখন আমাদের প্রতিটি পথ ধরে এগুতে হবে। প্রতিটি পথকে কাজে লাগাতে হবে। কল্পনা চাকমা মামলা গত ২০ বছরের উপর চলছে, সেই ১৯৯৬ সাল হতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই মামলায় নিজেদের শ্রম, সময়, মেধা ব্যয় করেছেন। এখন দায়িত্ব বর্তেছে আমাদের প্রজন্মের উপর, আমরা চেষ্টা করছি। লেগে আছি। এই মামলার সাথে নিজের সম্পৃক্ততার কারণে আমি ব্যক্তিগত ভাবে যে কথা বলতে চাই – মামলার বিচারে অভিযুক্ত ব্যক্তির শাস্তি হবে কি হবে না তা আমার কাছে এখন আর মুখ্য নয়। আমি এই মামলাটি কে দেখি এক উদাহরণ (আইনের ভাষায় যাকে বলা হয় “নজির”) হিসেবে।

সুবিচার হলে আমি বাংলাদেশের উপর আরও বেশী করে আশা রাখবো, দেশে বিদেশে বলবো “দেখুন, বাংলাদেশে ন্যায়বিচার হয়। সময় লাগে কিন্তু বিচার পাওয়া যায়। বাংলাদেশ আসলেই অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। আমি বাংলাদেশী হিসেবে গর্বিত।”

আর যদি সুবিচার না হয় তাহলে বলবো – “কল্পনা চাকমার মত আলোচিত মামলায় দেশ বিচার দিতে পারেনা। যে মামলার মনিটরিং শুধু দেশে না পৃথিবীর সব খানে অধিকার সংগঠনগুলো করছে। যেখানে চাক্ষুষ সাক্ষী আছেন দুইজন। যেইখানে পুলিশ তদন্ত করে ২০ বছরের উপর। সেই মামলায় দোষী ব্যক্তিরে খুইজা পাওয়া যায় না। তাহলে ভাইবা দেখেন আমাদের পুলিশ আর সেনাবাহিনী কত দক্ষ! এদের আপনারা প্রশংসা করেন? কল্পনার মামলায় এমন ফল, তাইলে এইবার মাথা খাটাইয়া ইকতু ভাইবা দেখেন তো “এঁরা গ্যাঁড়া ত্যাড়া চাকমা, তঞ্চংগ্যা, মারমা, চাক’ তাঁদের মামলায় সোনার বাংলাদেশের দক্ষ বাহিনী কি করে!!!!”

তাহলে কি দাঁড়াচ্ছে, যে কোন অবিচারের বিরুদ্ধে আমরা জনমত গঠন করতে পারি, বন্ধু সগঠন, বন্ধুস্থানীয় ব্যক্তিদের সাহায্য চাইতে পারি, ন্যায়বিচারের আবেদন জানাতে পারি, ন্যায়বিচার দেওয়ার কোন উদ্যোগ প্রতিস্থানের ভিতর না দেখলে তাঁদের বিরুদ্ধে কোর্টে মামলা দায়ের করতে পারি। আমাদের দেশে শেষ আশা বিচার বিভাগ। আর কি কি করতে পারি?

জাতিসংঘ কে জানাতে পারি। দেশে আমাদের উপর কি হচ্ছে তা কিন্তু আমরা না জানালে তাঁরা জানবে না এবং বাংলাদেশের উপর কোন রূপ চাপও দিবেনা। যা যা ব্যাপার জাতিসংঘকে আমরা জানিয়েছি তা নিয়ে বাংলাদেশ বহুত মাইনকা চিপায় আছে। কিন্তু আমাদের এইখানে যা ঘটে তার সবগুলো কিন্তু আমরা জাতিসংঘকে জানাই নাই। আমরা এই পন্থায় এখনো কাঁচা। কিন্তু আমাদের এই পন্থা অবলম্বন করাও শিখতে হবে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন যদি আমাদের আবেদন না নেয়, আমরা জাতিসংঘ কে জানাতে পারি। সেনাবাহিনী যদি আমাদের উপর অন্যায় করে আমরা জাতিসংঘ কে জানাতে পারি। ব্যক্তি যদি রাষ্ট্রীয়/সরকার প্রতিষ্ঠানের উপর অন্যায় করে আমরা জানাতে পারি। জাতিসংঘ কে জানাইতে কোন অধিকার সংগঠন/প্রতিস্থানের পরিচালক/পদবীধারি ব্যক্তি হওয়ার আপনার দরকার নাই। যে কেউ জাতিসংঘকে জানাতে পারেন। আপনার পরিচয় আপনি যদি না চান তাহলে তা গোপন রাখারও ব্যাবস্থা আছে। কিন্তু অভিযোগ জানাইতে হবে কিছু নিয়ম মেনে। সেই নিয়ম গুলো আমাদের তরুণ সমাজ যারা নিজেদের, জাতির অধিকার সম্পর্কে সচেতন তাঁদের শিখানোর কথা অনেক দিন ধরে বলে আসছি। অনেক গুলো কারণেই তা হয়তো এখন পর্যন্ত বড়ো আকারে, প্রাকটিক্যাল করা সম্ভব হয় নাই। এখন তো হাতে হাতে মোবাইল। ফেইসবুকে স্ট্যাটাসগুলোই একটু সাজিয়ে, জাতিসংঘের ফরম্যাট ধরে গুছিয়ে লিখলেই নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে আমরা পুরো পৃথিবীকে কে জানাতে পারি কি হচ্ছে এইখানে।

অনেকে ভাবতে পারেন – এইসব করে কি হবে! জাতিসংঘতো বিভিন্ন দেশের সরকার দ্বারা গঠিত কমিটি। ওরা আর কি করবে? ওয়েল, বাংলাদেশ যদি নর্থ কোরিয়ার মত রাষ্ট্র হইতো, তাইলে আসলে কোনো আশা ছিল না। কিন্তু এখনো দেশের পরিস্থিতি ভালো দিকে বদলানোর আশা আছে। দেশ এখনো অতো খারাপে যায় নাই। আর সবচাইতে বড়ো কথা, আমরা চেষ্টা করে তো দেখতে পারি। কি হবে তার কথা প্রথমেই না ভেবে আমাদের যার যতটুকু সাধ্য তা নিয়ে চেষ্টা করে দেখতে পারিনা? ন্যায়বিচার, দেশে শান্তি, জীবনে শান্তি আসলে ভালো। না আসলেও অন্তত মনরে তো বুঝ দিতে পারবো – আমার যতটুকু সামর্থ্য ছিল আমি খেটেছি। পারিনি, কিন্তু চেষ্টা করেছি।

ফেইসবুকের লেখা হারায় যায়। মানুষ ভুলে যায়। মনে উঠে যখন একি রকম আবার কোন ঘটনা ঘটে। ফেইসবুক, ব্লগ, এসি রুম, রাস্তায় আন্দোলনের পাশাপাশি আমরা এই উপায় ট্রাই করে দেখতে পারি। ভাইভা দেইখেন, আমি আছি। মোটামুটি ইংরেজি জানা, ওয়েবসাইট ব্রাউজ করতে জানা শুধু চার/পাঁচ জনের একটা গ্রুপ হইলেই হবে। আমি নিয়ম গুলা আপনাদের জানাই দিতে রাজি আছি। অথবা আপনারা ইন্টারনেটে খুঁজে শিখে নিতে পারেন, ভাইভা দেইখেন ভাইজান, আপামনিরা।


লেখকঃ মুক্তাশ্রী চাকমা সাথী। 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here