icon

হিগস বোসন তথা ঈশ্বর কণার খোঁজে

Jumjournal

Last updated Feb 5th, 2020 icon 162

চার দশকেরও বেশি অপেক্ষার পর দেখা মিলেছে গড পার্টিকেল বা ঈশ্বর কণার।

“হিগ বোসন তথা ঈশ্বর কণা (God particle)” কি তাহলে?

এখন এই ঈশ্বর কণা আসলে কী সত্যিকারে তা জানতে, সারা দুনিয়ার বিজ্ঞানী মহলে তো বটেই, সাধারণ মানুষের মধ্যেও ইদানীং ঈশ্বর কণা নিয়ে জানার শেষ নেই। তাহলে জানি একটু এই রহস্যময় কণাটি নিয়ে!


আমরা জানি যে, পদার্থ আর শক্তির একে অপরের পরিপূরক অর্থাৎ যারা হামেশাই একে অপরটিতে পরিবর্তিত হচ্ছে। মৌলিক কণাগুলো যখন একটি পদার্থের সৃষ্টির রহস্য।

ঠিক যেমন দুনিয়ার তাবৎ যৌগ মোটে একশটির মতো মৌল দিয়ে তৈরি, তেমনি ওই মৌলগুলোর একক হলো পরমাণু এবং পরমাণুকে আরও ভাঙলে যা পাওয়া যায়, সেগুলোই মৌলিক কণা।

মৌলিক কণাগুলো যে শুধু পদার্থের ক্ষুদ্রতম উপাদান, তা নয়, যাবতীয় শক্তি-ক্ষেত্র, যেমন-চুম্বকের আকর্ষণী-বিকর্ষণী ক্ষমতা বা বিদ্যুৎপ্রবাহের জন্য দায়ী তড়িৎ-চুম্বকক্ষেত্র; এগুলোরও ক্ষুদ্রতম উপাদান মৌলিক কণা।


মৌলিক পদার্থের মতো মৌলিক কণার সংখ্যাও একশর মতো, মিলটা নেহাতই কাকতালীয়! তো মৌলিক কণার তালিকায় একজন সম্মানিত, কিন্তু এখনো অধরা কণা হলো ঈশ্বর কণা। এটা ডাক নাম, ঈশ্বরের সঙ্গে এর নামের মিল স্রেফ কাকতালীয়। আসল নাম হিগস-বোসন।

এখন পর্যন্ত পরীক্ষামূলকভাবে বিভিন্ন মৌলিক কণা সম্পর্কে যেসব তথ্য জানা গেছে, সেগুলো থেকে দাঁড় করানো গাণিতিক মডেলে এক মস্ত ফাঁক থেকে যাচ্ছিল। মডেলটি বিভিন্ন কণার সব বৈশিষ্ট্য সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করলেও একটি বৈশিষ্ট্য, যা সন্দেহাতীতভাবে অনেক কণায় রয়েছে, সে ব্যাপারে কিছুই বলছিল না। সেই বৈশিষ্ট্য হলো ভর। মানে ভরহীন কণা!

The potential for the Higgs field, plotted as function , source: Wikipedia

যাক, এই ভরকে যদি কণাবাদী গাণিতিক মডেলে জোর করে ঢোকানোর চেষ্টা করা হয়, তাহলে সেই মডেল ভেঙে পড়ে। কারণ এতে কোনো ভর নেই।

শেষমেশ কোনো উপায় না দেখে এমন এক প্রস্তাব করা হলো, যাতে সাপও মরে, লাঠিও না ভাঙে। যদি ধরে নেওয়া হয় যে মহাবিশ্বজুড়ে এক অবিচ্ছিন্ন মাধ্যম বা ক্ষেত্র আছে, যা বিভিন্ন কণার ভরের জন্য দায়ী, তাহলে গাণিতিক মডেলের কোনো ক্ষতি না করেই ভরের ধারণাটি জুড়ে দেওয়া সম্ভব হয়।


এ যেন সেই ইথারের মতো, যাকে আলো চলাচলের মাধ্যম হিসেবে ধরে নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু পরে যার অস্তিত্ব অপ্রমাণিত হয়। ইথারের সঙ্গে তুলনীয়, কিন্তু ইথার থেকে একেবারেই আলাদা সেই সর্বত্র বিস্তৃত ক্ষেত্রটির নাম হিগস-ফিল্ড।

ইথারের অস্তিত্ব অপ্রমাণিত হলেও হিগস-ফিল্ড যে অস্তিত্বশীল, সে ব্যাপারে আমাদের হাতে বেশ কিছু পরোক্ষ প্রমাণ আছে। হিগস-ফিল্ডের ক্ষুদ্রতম একক হলো হিগস-বোসন কণা, যার অন্য নাম ঈশ্বর কণা ।

ঈশ্বর কণার আসলে কিরকম এবং এর বৈশিষ্ট্যগুলো নিয়ে একটু আলোচনায় আসি, যদিও আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান এই কণার ভর কত হওয়া উচিত, তা সূক্ষ্মভাবে ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারে না, তবু মোটামুটিভাবে ধরে নেওয়া হয় যে এর ভর 114 থেকে 185 GeV (গিগা ইলেকট্রন ভোল্ট)-এর মধ্যে হওয়া উচিত।

বলে রাখা ভালো, এক গিগা ইলেকট্রন ভোল্ট হলো সেই পরিমাণ শক্তি, যা 18 কেজির এক কোটি কোটি কোটি কোটি ভাগের এক ভাগ (1.8× 10^-27 Kg) ভরবিশিষ্ট পদার্থের সমতুল্য।

ঈশ্বর কণার বিপরীত কণা সে নিজেই। আপনি যদি একটি মৌলিক কণা হন এবং আপনি নিজেকে আয়নায় যেমন দেখেন, সেই রকম উল্টো চেহারার একটা কণার চার্জ যদি আপনার চার্জের বিপরীত হয় কিন্তু ভর হয় আপনার সমান, তাহলে আপনারা একে অন্যের বিপরীত কণা বা প্রতিকণিকা।

তার মানে, ঈশ্বর কণার চেহারা আয়নার সামনে ওল্টাবে না, আর তার চার্জ শূন্য। কারণ, কোনো কণার চার্জ ধনাত্মক হলে তার প্রতিকণিকার চার্জ ঋণাত্মক হতে হবে এবং ঋণাত্মক হলে হবে ধনাত্মক। যেটা প্রতিকণা নিয়েও আগে পোস্ট করেছি।
ঈশ্বর কণার ঘূর্ণন কোয়ান্টাম সংখ্যা বা স্পিন শূন্য।

কোনো মৌলিক কণার স্পিন যদি n হয় তবে সেটা কমপক্ষে 1/n চক্কর দিলে আগের মতো দেখায়। একজন যখন পুরো এক চক্কর (360 degree) ঘুরে আসেন, তখন তাঁর শরীর ঠিক সেই দিকে মুখ করে থাকে, চক্কর শুরুর আগে তিনি যেদিকে মুখ করে ছিলেন। তাঁর স্পিন ১। পুরো এক চক্কর না ঘুরে অর্ধেক চক্কর ঘুরলে যদি আগের অবস্থায় ফিরে আসা যায়, তবে স্পিন ২ হবে।

আর, স্পিন শূন্য মানে, ঈশ্বর কণাকে নিজ অক্ষের ওপর ঘুরতে দিলে কখনোই আগের অবস্থায় ফিরে আসে না। ঈশ্বর কণার বৈদ্যুতিক চার্জ যেমন শূন্য, তেমনি কালার চার্জও শূন্য।

কালার চার্জ হলো মৌলিক কণাগুলোর একটি বিশেষ ধর্ম, যার সঙ্গে কালারের বা রঙের কোনো সম্পর্ক নেই, বরং এটি ওই কণাগুলোর নিজেদের মধ্যে ক্রিয়াশীল সবল বলের (strong interaction) গতিপ্রকৃতি নির্দেশ করে।

এই সবল বলের জন্যই বিভিন্ন কণা পরস্পরের সঙ্গে আঠার মতো লেগে থাকতে পারে, যেমন নিউক্লিয়াসের প্রোটন ও নিউট্রন।ঈশ্বর কণার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, এটি অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী।

তৈরি হওয়ার পর এর অর্ধায়ু বড়জোর সেকেন্ডের দশ হাজার কোটি কোটি কোটি ভাগের এক ভাগের (in the order of 10^-25 seconds) শামিল। অর্থাৎ যতগুলো ঈশ্বর কণা একসঙ্গে তৈরি হয়, ওই সময় পেরোলে তার অর্ধেকই নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।

বাকি অর্ধের নিশ্চিহ্ন হতে আরও কিছু সময় লাগে, তবে তা-ও সেকেন্ডের অনেক ছোট ভগ্নাংশমাত্র।

মোটামুটিভাবে এগুলোই হলো ঈশ্বর কণার বৈশিষ্ট্য।

ঈশ্বর কণার আচরণ যদি বলি, তবে এটা আলাদাভাবে বলার চেয়ে অসংখ্য ঈশ্বর কণা দিয়ে গঠিত হিগস-ফিল্ডের আচরণ ব্যাখ্যা করলে সুবিধা হবে।


সর্বত্র বিরাজমান হিগস-ফিল্ডের মধ্য দিয়ে যখন কোনো কণা চলতে থাকে, তখন সেটা বাধা পায়। অর্থাৎ, ঠিক যেমন মরুভূমি বা সমুদ্রসৈকতের বালু মাড়িয়ে যেতে হলে ধীরে চলা ছাড়া উপায় থাকে না। সেই বালুকাবেলা যদি হিগস-ফিল্ড হয়, তাহলে প্রতিটি বালুকণা এক একটি হিগস-বোসন বা ঈশ্বর কণা।

এখন হিগস-ফিল্ডের মধ্য দিয়ে চলার সময় যে কণা যত বেশি বাধা পায়, সেটা তত আস্তে চলে। অন্যভাবে বললে, যে যত কম বাধা পায়, তার ভর তত কম এবং সে তত বেশি জোরে ছুটতে পারে।

Simulation of a particle collision in which a Higgs boson is produced.(Image: © Lucas Taylor/CMS)

হিগস-ফিল্ডে ফোটন মোটেই বাধা পায় না, তাই ফোটন ছোটে আলোর বেগে। আমরা মেপে দেখি, ফোটনের ভর শূন্য। আবার ইলেকট্রন যদিও খুব হালকা, তবু একেবারে ভরহীন নয়। অর্থাৎ হিগস-ফিল্ড তাকে কিছুটা বাধা দেয়। এ জন্য সে আলোর বেগের চেয়ে একটু কম বেগে ছোটে।
এমনিভাবে ব্যাখা করলে, প্রোটন আরও ভারী, কারণ সে হিগস-ফিল্ডে বাধা পায় আরও বেশি। অবশ্য মহাবিশ্বের একদম শুরুতে তাপমাত্রা যখন ছিল অনেক বেশি, তখন হিগস-ফিল্ডের গড় মান ছিল শূণ্য। ফলে তখন কোনো মৌলিক কণারই ভর ছিল না।

সবাই ফোটনের মতো আলোর বেগে ছুটতে পারত। মহাবিশ্ব একটু ঠান্ডা হলে পরে এই সাম্যাবস্থা ভেঙে পড়ে। তখন হিগস-ফিল্ডের গড় মান আর শূণ্য থাকে না। এর ফলে মহাবিশ্বে একটি নতুন গুণের সূচনা হয় এই “ভর”।

ফোটনের অবশ্য এতে কিছু আসে-যায়না, সে হিগস-ফিল্ডের গড় মান শূণ্য থাকার সময়ও ভরহীন ছিল, এখনো তা-ই আছে। এটা কিন্তু কোনো ব্যতিক্রম নয়। হিগস-ফিল্ডের সঙ্গে বিভিন্ন মৌলিক কণার ক্রিয়া বিভিন্ন রকম, এই তাত্ত্বিক সত্যের বাস্তব প্রতিফলনমাত্র।

তথ্যসূত্র :
https://angelsanddemons.web.cern.ch/…/what-is-the-god-parti…
https://www.gotquestions.org/God-particle.html
https://youtu.be/pxF7QxIkweU

লেখকঃ কেপন চাকমা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

শিক্ষার্থী, লেদার প্রোডাক্টস ইঞ্জিনিয়ারিং

Share:
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - [email protected] এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা

Jumjournal

Administrator

Follow Jumjournal

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *