icon

স্পেনের গৃহযুদ্ধে মিগেল হার্নান্দেজ ও গের্নিকা

Jumjournal Admin

Last updated Nov 18th, 2019 icon 221

স্পেনের গৃহযুদ্ধ সম্পর্কে জানার জন্য তেমন কোন লেখা, বই কিংবা অনুবাদ বই’ই আমার চোখে পড়েনি। তাই এ সম্পর্কে লেখার আগ্রহ অনেক দিনের। আশাকরি মিগেল হার্নান্দেজ ও গের্নিকার আলোচনা থেকে অন্তত কিছু হলেও স্পেনের গৃহযুদ্ধ সম্পর্কে ধারনা পাওয়া যাবে।

১৯৩১ এর এপ্রিলে স্পেনে রাজতন্ত্র ভেঙে জনগণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। অপরদিকে ইউরোপের বাতাসে তখন ফ্যাসিবাদের গরম নিশ্বাস ভেসে বেড়াচ্ছিল।

জার্মানিতে হিটলার আর ইতালিতে মুসোলিনি। তাই স্বাভাবিক ভাবেই ফ্যাসিস্টদের স্পেনের প্রতি কুদৃষ্টি পড়ার কথা। অপরদিকে পরাভূত রাজতন্ত্র ক্ষোভে ফেটে পড়ছিল আর সুযোগ খুঁজছিল। তাই সে হাত করলো ফ্যাসিস্টদের সাথে, দাড় করানো হলো ফ্রাঙ্কো নামে এক সুযোগ সন্ধানী সেনাপতিকে।

স্পেনের অধীন আফ্রিকার মরক্কোতে বর্বর যুদ্ধে তার বেশ খ্যাতি আছে যদিও সেখানে স্পেন প্রচন্ডভাবে হেরে যায়। গির্জা আর রাজতন্ত্রের মদত দিতে ১৯৩৬ সালে সে স্পেনে প্রবেশ করল। আর এর সাথে সাথে শুরু হয়ে গেল ফ্যাসিবাদের সাথে রিপাবলিকের যুদ্ধ অর্থাৎ গৃহযুদ্ধ। যাকে বিবেচনা করা হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মহড়া হিসেবে।

বত্রিশ মাসের এই যুদ্ধে স্পেনের অন্তত দশ লক্ষ লোক মারা যায়। স্পেনই বোধহয় প্রথম দেশ যেখানে কবিরা সরাসরি আন্দোলনে যুক্ত থেকে এবং লেখনীর মাধ্যমে প্রতিবাদ করে শেষ পর্যন্ত প্রাণ পর্যন্ত দিয়ে দিয়েছে। স্পেনের গণতন্ত্রকে উৎখাত করার ষড়যন্ত্রে নেমে প্রথমেই প্রাণ নিল শ্রেষ্ঠ কবি ফেদেরিকো গার্থিয়া লোরকার যাকে হত্যা করার পর তার কবর পর্যন্ত পাওয়া যায়নি, কারাবাসে মৃত্যু হল মিগেল হার্নান্দেজের।

রাফায়েল অ্যালবার্তি কোনমতে পালিয়ে প্রাণে বেঁচে যান। যাহোক, এখানে আমি শুধু মিগেল হার্নান্দেজকে নিয়ে আলোচনা করছি। মিগেল হার্নান্দেজের জন্ম ১৯১০ সালে, পূর্ব স্পেনের ওরিউয়েলা গ্রামে। তিনি ছিলেন একজন রাখাল, ওরিউয়েলা গ্রামে ছাগল চড়াতেন। তিনি লেখাপড়া শিখেছেন নিজের চেষ্টায়, প্রায় একা একাই।

গাঁয়ের চার্চের গ্রন্থকার তাকে সন্ধান দিয়েছিলেন স্পেনের সাহিত্যের স্বর্ণযুগের। গোঙ্গারো, কেভেদো, লোপে দে ভেগা, কালদেরোন সহ আরো অনেক স্বরণীয় কবি নাট্যকারকে এই চার্চের ধূলিধূসর লাইব্রেরীতে আবিষ্কার করেছিলেন হার্নান্দেজ। একদিক থেকে সেটা তার পক্ষে ভালোই হয়েছিল। কেননা স্বর্ণযুগের পর স্পেনের সাহিত্যে সে একটা বিষম বন্ধ্যা ও ঊষর যুগ গেছে।

কবিতা আবার প্রাণ ফিরে পেয়েছে বিংশ শতাব্দীতে — ফেদেরিকো গার্থিয়া লোরকা, রাফায়েল অ্যালবার্তি, আস্তোনিয়ো মাচাদো, ভিসেন্তে আলেইহান্দ্রে, হোর্হে পর পর অনেকগুলো নাম জ্বলজ্বল করতে থাকে। যেন কেউ দীর্ঘদিন পর অসাড় কোনো ঘুম থেকে জেগে উঠেছে। কিন্তু সেই জাগরণ যে স্পেনের রাজনৈতিক নবজাগরণের সময়েই ঘটেছিল, এটা কোনো কাকতাল নয়। এই কবিদের সকলেই যে ফ্রাঙ্কো বিরোধী ছিলেন, সকলেরই যে বিশ্বাস ছিলো সাম্যবাদে — এটা বুঝিয়ে দেয় যে দেশের রাজনৈতিক জাগরণের সঙ্গেই জড়ানো ছিল সাহিত্যেরও নবজাগরণ। এদেরই মধ্যে একজন কবি হার্নান্দেজ।

কিন্তু ফ্রাঙ্কো যাদের হত্যা করেছিলো কিংবা দেশ থেকে পাঠিয়েছিলো নির্বাসনে। হার্নান্দেজকেও গ্রেফতার করে বিনাবিচারে আটকে রাখা হলো ঠান্ডা, স্যাঁতসেঁতে, অন্ধকার জেল কুঠুরিতে, যেখানে তার ফুসফুস ঝাঁঝরা করে দিলো ক্ষয়রোগ। ১৯৪২ এর বসন্তে, যক্ষ্মায়, ফ্রাঙ্কোর জেলখানায় একটানা তিন বছর কাটানোর পর মৃত্যু হয় কবি হার্নান্দেজের। অথচ তার বয়স তখনো বত্রিশও হয়নি।

মিগেল হার্নান্দেজের প্রথম কবিতার বই “অনেক চাঁদে দক্ষ” বেরোয় ১৯৩৩ সালে, যখন তার বয়স মাত্র বাইশ। তার ঠিক তিন বছর পর বেরোয় তার দ্বিতীয় কবিতার বই “যে বজ্র কখনো থামে না”। তার দু’বছর আগে চিলির কবি পাবলো নেরুদা মাদ্রিদে এসেছিলেন চিলির দূতাবাসে কাজ নিয়ে। মাদ্রিদে যে বাড়িতে নেরুদা তাঁর স্ত্রী দেলিয়ার সাথে থাকতেন, সেটা অল্পদিনেই কবিদের ওপেন হাউস হয়ে উঠলো।

সবচেয়ে বেশি যেতেন গার্থিয়া লোরকা ও হার্নান্দেজ। ১৯৩৬ সালের ১৮ জুলাই ফ্রাঙ্কো উত্তর আফ্রিকা থেকে হামলা চালাল। নেরুদা, কন্সাস হিসেবে তার যে ক্ষমতা, তাকে ছাড়িয়ে গিয়ে ঘোষণা করলেন, চিলি স্পেনীয় রিপাবলিকের পক্ষে।

তাকে মাদ্রিদ থেকে ছড়িয়ে দেওয়া হলো। কিছু কবিদের সহায়তায় নেরুদা স্পেনের উদ্বাস্তুদের জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে শুরু করেন। দক্ষিণ পন্থিদের বর্বরতা তাকে এতটাই নাড়া দিয়েছিলো যে তিনি এবার প্রকাশ্যে বামপন্থীদের সঙ্গে মিলে কাজ করতে শুরু করলেন। ততদিনে ফ্রাঙ্কোর মাস্তানরা গার্থিয়া লোরকাকে খুন করেছে।

সরাসরি গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়া মাত্র হার্নান্দেজ সেচ্ছাসেবক বাহিনীতে নাম লিখিয়েছেন, রিপাবলিক পন্থী সৈন্যদের পঞ্চম রেজিমেন্টের সঙ্গে সরাসরি ফ্রন্টে চলে গিয়েছিলেন। পরে তাকে বদলি করা হলো মাদ্রিদে, রাজধানীর প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলবার জন্য। যুদ্ধের সূচনাতেই, মিগুয়েলের বাগদত্তা হোসোফিনা মোনরেসার বাবা ফ্রাঙ্কো পন্থিদের হয়ে লড়াই করে ফ্রন্টে নিহত হয়েছিলেন।

হার্নান্দেজের কোন কোন কবিতা পোস্ট কার্ডে ছাপা হয়ে সেনাবাহিনীর হাতে হাতে ঘুরতো। ১৯৩৯ সালের ১১ মে তাকে গ্রেফতার করলো গুয়ার্দিয়া সিভিল। কারাগারে যখন সে যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত, শরীরের ক্ষত স্থান থেকে রক্ত, পুস পড়ে তখন তার জন্য কিছু জিনিস পত্র চেয়ে স্ত্রীর কাছে চিঠি লিখলে তার স্ত্রী জানাই, তার সন্তানদের খাওয়া জন্য বাড়িতে পেঁয়াজ ছাড়া আর কিছুই নেই। জীবনের বাকি দিনগুলো হাজতে কাটিয়েই এই বিপ্লবীর জীবনাবসান হয়।

স্পেনের গৃহযুদ্ধে ধ্বংসলীলার শিকার একটা শহর গের্নিকা। স্পেনের বাস্ক অঞ্চলের রাজধানী গের্নিকা। ছোট্ট একটা শহর। এটি ছিল বাস্কের ঐতিহাসিক ও পবিত্র একটা শহর। স্পেনের কমিউনিস্ট ও বামপন্থী রাজনীতির আস্তানা ছিল এই বাস্ক অঞ্চল। ১৯৩৭ সালের ২৬ এপ্রিল, হাটবাজারের দিন, বিকেলের প্রথম দিকে ফ্রাঙ্কোর সাহায্য নিযুক্ত জার্মান বিমানবহর ঝাঁকে ঝাঁকে এসে সাড়ে তিন ঘন্টা ধরে গের্নিকার ওপর বোমা বর্ষণ করে। শহরটা সম্পূর্ণভাবে বিধ্বস্ত হয়ে যায়। দু হাজার মানুষ নিহত হয়। তারা সবাই বেসামরিক লোক।

গের্নিকার ধ্বংসের খবর যখন পাবলো পিকাসো কানে পৌঁছে তখন তিনি প্যারিসে। খবর শোনার পর তিন দিন ঘুমাতে পারেননি। পিকাসো প্যারিসে স্থায়ীভাবে বসবাস করলেও তার জন্ম স্পেনের মালাগায়। গরিব ঘরের ছেলে ছিলেন তিনি।

স্পেনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চিতার হাত থেকে এড়াতে চলে আসেন প্যারিসে। যাহোক, গের্নিকার ধ্বংসলীলার কথা তাকে বেশ নাড়া দিয়েছে। তারপর উম্মাদের মতো আরম্ভ করেন টুকরো টুকরো স্কেচ। প্যারিসের ওয়লর্ড ফেরার প্যাভিলিয়নে ১৯৩৭ এ দেখানো হল “গের্নিকা”। সঙ্গে সঙ্গে সারা পৃথিবীতে এটি আলোড়ন সৃষ্টি করে। শোনা যায়, পরে জার্মান বাহিনী পিকাসোর ছবি প্রদর্শনী নিষিদ্ধ করে, হিটলার পিকাসোর ছবি নষ্ট, পচা বলে ধিক্কার জানাই।

তখন প্যারিসে হিটলারের প্রতিনিধি ছিল আবেটস। একদিন সে এসেছিল পিকাসোর স্টুডিওতেএসে লোভ দেখিয়ে বলল, “মহাশয় পিকাসো, আপনি তো তেল কয়লা খাবার দাবার পাচ্ছেন না ঠিক মতো, কষ্ট পাচ্ছেন শুধু শুধু, ব্যবস্থা করব কিছু?” পিকাসো তখন খুব শান্ত ভাবে তাকে দরজা খুলে বেরিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত করে। আবেটস পেছনে ফিরতে যেয়ে চোখে পড়ল গের্নিকার দিকে। বলল, “ও তাহলে এটা আপনারই কান্ড?” পিকাসো উত্তর দিলেন, “না। এটা তোমাদের কান্ড।”

অবশেষে ১৯৩৯ সালে বামপন্থী রিপাবলিকান সরকার যুদ্ধে হেরে যায়। ফ্রাঙ্কো সরকারের ক্ষমতা দখল করে।


লেখকঃ সুদর্শী চাকমা


তথ্যসূত্রঃ

১। মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত, স্পেনের গৃহযুদ্ধ: পঞ্চাশ বছর পরে ।

২। উইকিপিডিয়াঃ স্পেনের গৃহযুদ্ধ

Share:
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - [email protected] এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা

Jumjournal Admin

Administrator

Follow Jumjournal Admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *