সিদোল কাহিনী

0
89

একদিন দুপুরে রুমে আমরা ‘হোরবো’ খাওয়ার জন্য সিদোল পুড়ছিলাম। আমাদের তো সেই খুশি। অনেকদিন পর মজা করে ‘হোরবো’ খাবো। সেদিন ছিল শুক্রবার। আমাদের কোন ক্লাস ছিল না। তাই সবাই রুমেই ছিলাম। দরজা জানালা বন্ধ করে আমরা সিদোল পুড়ছি। সুগন্ধ বেরোচ্ছে। সিদোল পোড়ার গন্ধ। আহ্ কি একটা সুগন্ধ।

হঠাৎ দরজায় ঠক ঠক আওয়াজ।

খুলে দেখি আমাদের ফ্লোরের অনেক বাঙালি ছাত্র কথা বলতে চান। যা সন্দেহ করেছিলাম, ঠিক তাই। ওরা সিদোল নিয়ে কথা বলতে চাই। এটা নিয়মিত না হলেও তার আশংকা সবসময় থেকে যায় যার কারণে আমরা সিদোল পোড়ার আগে দরজা জানালা বন্ধ করেছিলাম। এই খাদ্যটির গন্ধ বাঙালিরা সচরাচর সহ্য করতে পারেন না যার কারণে আমরাও দরজা জানালা বন্ধ করে পুড়ছিলাম। কিন্তু ব্যাপন প্রক্রিয়ার এই এক গুণ, নিমেষেই পুরো ফ্লোরে ছড়িয়ে পড়ে। অতএব, তারা জানতে চায়, আমরা কি খাই। এত দুর্গন্ধ কেন এই খাবারের। তারা অনুরোধ (বলে যান) করেন, এই খাবার না খেতে।

Sidol
সিদোল, ছবি: ফেসবুক থেকে সংগৃহীত

আমি জানি, আমরা যারা লেখাপড়া কিংবা চাকরির কারণে শহরে থাকি, তাদের কাছে এরকম হাজারটি গল্প আছে। হয়তোবা এতক্ষণ মনেও পড়ে গেছে কয়েকটা গল্প। এ সুযোগে আমি আরেকটি ছোট্ট ঘটনার কথা বলি। অবশ্য ঘটনাটি আমার বন্ধুর কাছ থেকে শোনা।

আমার ঐ বন্ধুটি তার বাবা মার সাথে থাকত। ঢাকা শহরেই। তো তারা তাদের এই প্রিয় খাবারটি প্রায় সময় খেত। তারাও জানত যে, এই গন্ধটির সাথে বাঙালি সমাজ পরিচিত নয়। কিন্তু ফ্যামিলি কিংবা ফ্ল্যাটবাড়ি হওয়ার কারণে খুব একটা গন্ধ বাইরে যেত না। তাই তারাও কোন অসুবিধার সম্মূখীন হচ্ছিল না। এভাবে ভালোই যাচ্ছিল। একদিন হঠাৎ দরজায় একটা হাতে লেখা পোস্টার সাঁটানো পাওয়া গেল। লেখা ‘আপনারা দুর্গন্ধযুক্ত খাবার খাওয়া বাদ দিন।’

চাকমাসহ সব জুম্মদের কাছেই প্রিয় এই সিদোল। চাকমারা সিদোল বললেও মারমারা এটাকে ‘নাপ্পি’ বলে। মাছ, চিংড়ি ইত্যাদি গাঁজন করে মূলত এই খাদ্য তৈরি করা হয় এবং এটি মূলত তরকারীতে ‘মিক্স’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তবে এই সিদোল ছাড়া ‘হোরবো’ তো কল্পনাই করা যায় না। এবং হ্যাঁ, এটা থেকে একটা গন্ধ বের হয় যেটা নিয়েই মূলত যত সমস্যা। কারো কাছে সুগন্ধ। আবার কারো কাছে দুর্গন্ধ! সেদিন তো একজন বাঙালি ছাত্রকে কি রকম লাগে জিজ্ঞেস করাতে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘অনেকটা ডাস্টবিনের গন্ধের মত।’

সিদোল নিয়ে হলে আরো অনেক ঝামেলা হয়। একবার তো এক বড় ভাই এক বাঙালি ছাত্রকে বের করে দিয়েছিলো কারণ তিনি ‘ব্যাড স্মেল, ব্যাড স্মেল’ করছিলেন বলে। অনেক ঝামেলা তো প্রভোষ্ট পর্যন্ত যাওয়ার উপক্রম হয়।

এই সিদোল বা নাপ্পি নিয়ে আমাদের অনেকে আবার ‘ইনফিরিয়রিটি কমপ্লেক্স’-এ ভোগেন। সোজা বাংলায় হীনমন্যতায় ভোগেন। তারা অনেক সময় প্রমাণ করতে চেষ্টা করেন, তারা এই খাবারটি খুব একটা খান না।

আরেকটি ঘটনার কথা বলি, এটাও আরেক বন্ধুর কাছ থেকে শোনা। জনৈক এক জুম্ম দম্পতির গল্প। একদিন নাকি উনাদের সিদোল খাওয়া নিয়ে ঝগড়া হয়। অনেকটা খাওয়া, না খাওয়া নিয়ে। তো সেই জনৈক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে নাকি বলেছিলেন, ‘প্রয়োজনে তোমাকে ছাড়ব তবুও সিদোল ছাড়তে পারব না।’

Brinjal dish with Sidol
সিদোল দিয়ে বেগুন তরকারী, ছবি: ফেসবুক থেকে সংগৃহীত

এবার নিজের গল্প বলি। না হলে বিশ্বাস করবেন না। আমার বেশ নামডাক আছে যে, আমি নাকি বেশ সিদোল খাই। বিশেষ করে যারা হলে আমার কাছে বেড়াতে আসে, তারা অভিযোগ করেন, ঠিক অভিযোগ নয়, অনুযোগ বলতে পারেন। একটা সাধারণ ট্রেন্ড যে, আমরা অতিথিদেরকে সচরাচর আমিষ দিয়ে আপ্যায়ন করি। আমি নাকি অতিথিদেরকেও সিদোল দিয়েই আপ্যায়ন করি।

সিদোল নিয়ে হঠাৎ হঠাৎ নানা কাহিনী  বেরোয়। সিদোলে নাকি বিষ মিশিয়ে দেয়া হয়েছে। যাতে করে সকল জুম্মরা মারা যায়। যেখানে বানানো হয় সেখানেই নাকি এই কাজটি করা হয়েছে। অনেকে আবার এখানে ‘সেটলার’ ষড়যন্ত্র তত্ত্বও খুঁজে পান। একবারের ঘটনা তো আরেক কাঠি সরেস। সেবার বেরোল, সিদোলে নাকি এমন এক উপাদান মেশান হয়েছে যেটি খেলে নাকি ছেলেরা আর বাবা হতে পারবেন না। কেউ কেউ বলছিলেন, বাবা হতে পারবেন তবে সন্তান মেয়ে হবে। উদ্ভট সব কথা বার্তা বেরোতে থাকে কিন্তু আমাদের মূখ থেকে সিদোল বেরোতে পারে না। যদিও অনেকে ‘জাতির পিতা’ হওয়ার আশায় কয়েকদিন সিদোল না খেয়ে বাবা হওয়ার ক্ষমতা বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করেন!

এরকম হাজারটি গল্প চাইলে হয়তোবা আপনিও লিখতে পারবেন। সিদোল নিয়ে যে কত ঘটনা ঘটে যায় তা একমাত্র শহরে বসবাসকারী জুম্মরা জানেন। আমাদের হলে এখন অবশ্য খুব বেশি অভিযোগ আসে না। কিন্তু তারপরেও আমরা যখন রান্না করি তখন অনেকে সজোড়ে দরজা জানালা বন্ধ করা শুরু করেন। আমরাও সর্ব্বোচ্চ চেষ্টা করি যাতে গন্ধটা বের না হয়। সবকিছূর মধ্যে ‘উপনিবেশবাদী’ চরিত্র না খুঁজলেও মনে হয় না এটা নিয়ে কারো হীনমন্যতায় ভোগা উচিত। এটা অনেকটা সাংস্কৃতিক বিনিময় এর  মত। সময় লাগবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের অনেক বাঙালিই তো এটা খুব মজা করে খান যারা আগে এর মজাটা জানতেন না। আরা ঢাকাতে এখন চাইনিজ, থাই খাবারের মত চাকমা বা আদিবাসী রেস্টুরেন্টগুলোতে অনেককে দেখা যায় এই সিদোল দিয়ে রান্না করা তরকারী খুঁজতে।

এই খাবারটা নাকি থাইল্যান্ড, অষ্ট্রেলিয়াসহ আরো অনেক জায়গায় পাওয়া যায়। তবে সেটা পুরোটা এখানকার সিদোলের মত নয়। একবার এক সহপাঠীর বড় ভাই আমেররিকা থেকে সিদোল পাঠিয়েছিলেন। অবশ্যই আমেরিকান সিদোল। ভালোভাবে বয়ামে প্যাকিং করা। কিন্তু সেখান থেকে ও গন্ধ বেরোচ্ছে। সেটা কিন্তু দুর্গন্ধও না আবার সুগন্ধও না। একদম সিদোল এর নিজস্ব গন্ধ। যে গন্ধটা ছাড়া সিদোল হলে মনে হয় না আসলে ‘সিদোল’ হবে।

Snail dish with Sidol
সিদোল দিয়ে শামুক তরকারী, ছবি: Tugun Restaurant

সিদোল প্যাকিং নিয়েও অনেক কথা বলা যাবে। আমরা যারা বাসা থেকে সিদোল নিয়ে আসি তারা যে কয়টা পলিথিন পরপর দিয়ে প্যাকিং করি তার শেষ নেই যাতে করে বাস সিদোলময় না হয়। তবে নিরাপত্তার কারণে সবাইকে ভিডিও করে রাখলেও কোনদিন শুনিনি কোন বাঙালি পুলিশ অফিসার সিদোল খুলে দেখেছেন। খুলে দেখলে ঝান্ডুদার মত কাহিনী হয়ে যেতে পারে। আপনারা জানেন ই তো, ঝান্ডুদা এক ইতালিয়ান চুঙ্গিওলাকে রসগোল্লা নাকে লেপ্তে দিয়েছিলেন যিনি নিরাপত্তার জন্য ‘ওয়েল প্যাকড্’ রসগোল্লা খুলতে বাধ্য করেছিলেন।

সিদোল নিয়ে কিন্তু অনেক অভিযোজন, বিবর্তনের উদাহরণ দেয়া যাবে। বাড়িওয়ালাদের এবং অন্যান্য ভাড়াটিয়াদের ‘সামন্তীয়, উপনিবেশবাদী’ চরিত্রের কারণে ঢাকা শহরের কিছু বাড়ীতে সিদোল খাওয়ার উপর মাঝে মাঝে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। একদিন এক দিদির বাসায় দাওয়াত খেতে গিয়েছিলাম। আমি আবার দাওয়াত খেতে গেলে একটা না একটা হোরবোর রেসিপি চেয়ে নিই। কিন্তু আমার আবদার রাখতে গিয়ে তিনি বেশ বিপদে পড়লেন। কারণ কয়েকদিন আগেই তাদের বাড়িওয়ালা তাদের সিদোল খাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। তো উপায় কী! আমরা তো সিদোল না খেয়ে থাকতে পারবে না। তখন তিনি মোমবাতি জ্বালিয়ে কি এক উপায়ে পোড়েন যেখান থেকে সিদোল তার গন্ধ একটু কম ছড়ায়। দিদিকে জিজ্ঞেস করাতে বলেছিলেন, অভিযোজনের এই পদ্ধতিটা তারা আয়ত্ব করেছিলেন হোস্টেলে লুকিয়ে লুকিয়ে পুড়তে গিয়ে।

গ্রামে বা বাড়ীতে মানুষ সিদোল এর টুকরাকে কড়কড়ে আগুনের কয়লার উপর রেখে পুড়ে থাকেন। এই কড়কড়ে আগুন দেখলেই আমার সিদোল, শুকনো শুটকি, হাঙর পুড়তে ইচ্ছে করে। তবে গ্যাস এর ক্ষেত্রে এটা পুড়তে হয় ছুরি কিংবা চামচ এর আগায় লেপ্তে দিয়ে গ্যাসের আগুনের উপর ধরে রেখে। আবার পাতিলায় লবণ দিয়েও পোড়া যায়। পোড়ার সময় লবণ দেয়ার একটা সুবিধা আছে। লবণ দিলে ভালোভাবে পুড়ে এবং কোন ছাই লেপ্তে থাকে না বা পাতিলার ক্ষেত্রে পাতিলার তলায় লেপ্তে যায় না।

Sidol Business
সিদোল ব্যবসায়ী, ছবি: ফেসবুক থেকে সংগৃহীত

মাঝে মাঝে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন ছবি দেখি যেগুলোতে বলা হয়, এগুলো সিদোল বানানোর ছবি। অনেকে পায়ে মারিয়ে বানাচ্ছেন। দেখতে দৃষ্টি সুখকর নয় এরকম ছবি। আমি সিদোল বানানোর পদ্ধতি স্বচক্ষে দেখিনি, তবে এই খাবারটি পৃথিবীর অনেক দেশে পাওয়া যায় এবং ভীষণ জনপ্রিয় বলে শুনেছি। বিদেশে বসবাসরত জুম্মদেরকে তাই আর বাড়ী থেকে সিদোল নিতে হয় না আর ‘চুঙ্গিওলারা’ও বেঁচে যান।

সবশেষে একটা দাবি জানাই। চলুন আমরা একদিন ‘সিদোল দিবস’ পালন করি। পৃথিবীতে কত দিবসই তো আছে। ঐ দিন আমরা সবাই সিদোল খাব। পুড়ে, রান্না করে কিংবা কাঁচা। সেদিন মজা করে, গর্বভরে শুধু সিদোল খাব। উপনিবেশবাদী চরিত্র সেদিন সভ্য হবে। চুঙ্গিওলা চেয়ে নেবে এক টুকরা পোড়া সিদোল। হীনমন্যতায়  ভোগা সবাই তৃপ্তিভরে সিদোল খাওয়ার আত্মবিশ্বাস পাবে। তাই চলুন ঐদিন ‘জ্বালো রে জ্বালো’ রেখে ‘খাও রে খাও’ আওয়াজ তুলে সবাই সিদোল খাই।


এডিট দেওয়ান

১৯ নভেম্বর ২০১৭,
জগন্নাথ হল, ঢাবি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here