সাভারে দুই বন্ধুর জুম চাষ

0
40

ঢাকার অদূরে সাভারে দুই বন্ধু রতন বিজয় চাকমা এবং নিঝুম তালুকদার অনেকটা স্ব-উদ্যোগী হয়ে গড়ে তুলেছেন ‘জুম্ম সুরঞ্জলী শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক একাডেমি’ নামক একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান। তাদের এই সু-উদ্যোগের কথা জানতে পেরে জুমজার্নাল যোগাযোগ করে এই দুই জুম্ম তরুণের সাথে। সাভার থেকে ফিরে এসে সে কথাই জানাচ্ছেন এডিট দেওয়ান ও রিগ্যান দেওয়ান।

‘জুম্ম সুরঞ্জলী শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক একাডেমি’
‘জুম্ম সুরঞ্জলী শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক একাডেমি’

১১ ই আগস্ট, শুক্রবার, সরকারি ছুটির দিন। সকাল থেকেই গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি। এই বৃষ্টি মাথায় নিয়েই প্রায় ১৭ জনের মত ছোট ছোট ছেলেমেয়ে একটা হলরুমে জড়ো হয়েছে। কয়েকজন অভিভাবকও এসে হাজির হয়েছেন সেখানে। সব মিলিয়ে ২৫-৩০ জন মানুষের সমাবেশ হলরুমে। ছেলেমেয়েদের প্রায় সবাই স্কুলে পড়ে। আজ তাদের সবার ছুটির দিন। আজ তাদের সবার আনন্দের দিন। কিছুক্ষণ পরই সেখানে নাচ হবে, গান হবে কিংবা খুশিতে কল্পনার রাজ্যে হারিয়ে গিয়ে কেউবা আঁকবে লাল আকাশ।

বৃষ্টি মাথায় নিয়েই একদম ভোরে ঢাকা থেকে রওনা হয়ে সকালে আমরা সেখানে হাজির হয়েছিলাম। যোগাযোগটা পরিচালক রতন বিজয় চাকমার সাথে হলেও আমাদেরকে অভ্যর্থনা জানান ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিঝুম তালকদার। কারণ, রাত্রিকালীন ডিউটি থাকার দরুন তিনি (রতন বিজয় চাকমা) সবেমাত্র ঘুমুতে গিয়েছিলেন। যদিও খোলা চোখে ঘুম নিয়েই ৫ মিনিট পর তিনিও হলরুমে আসেন। তাঁদের সাথে কথা হচ্ছিল ‘জুম্ম সুরঞ্জলী শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক একাডেমি’ নিয়ে।

‘জুম্ম সুরঞ্জলী শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক একাডেমি’ সাভারের আশুলিয়ার বুড়িবাজার নামক জায়গায় অবস্থিত একটি সাংস্কৃতিক একাডেমি যেখানে সাভারে জন্ম এবং বেড়ে ওঠা জুম্ম শিশু-কিশোরদের জুম্ম সংস্কৃতি ও জীবনাচারের শিক্ষা দেয়া হয়। এই একাডেমিটিরই পরিচালক রতন বিজয় চাকমা এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিঝুম তালুকদার। তাঁদের দু’জনের দেয়া তথ্যমতে বর্তমানে সাভারে প্রায় ১২ হাজার জুম্ম বাস করেন। তাদের বিশ্বাস এই সংখ্যা ভবিষ্যতে ১ লাখের কাছাকাছি চলে যাবে। এত বড় জনসংখ্যার স্বকীয় সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব নিয়ে তাই তাঁরা অত্যন্ত সচেতন আগে থেকেই। সাভারে বসবাসকারী আদিবাসী জুম্মদের মধ্যে চাকমাদের সংখ্যা ৯৫ শতাংশের ও বেশী। জুম্মরা সেখানে বেশ কয়েকটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে তুলেছেন। এই ‘জুম্ম সুরঞ্জলী শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক একাডেমি’  তার মধ্যে একটি যেখানে প্রতি শুক্রবার জুম্ম শিশু-কিশোররা একসাথে এসে জড়ো হয়। রীতিমত যেমনটি হয়েছিল সেদিন। সেখানে তারা নাচে, গান গায় কিংবা আঁকে মা-বাবার কাছ থেকে শোনা রাধামন-ধনপুদির ছবি।

‘জুম্ম সুরঞ্জলী শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক একাডেমি’
ছবিঃ শিশুদের নৃত্য শেখাচ্ছেন শিক্ষক

সাভার, নামটা শুনলেই চোখে ভাসে জাতীয় স্মৃতিসৌধ আর গার্মেন্টস এর চিত্র। পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকেও আমাদের বাবা-ভাই, মা-বোন অনেকেই সেখানে কাজ করতে আসেন। সারাটা জীবন সেখানে অতিবাহিত না করলেও জীবনের একটা দীর্ঘ সময় তারা সেখানে পার করেন। এই দীর্ঘ সময়ে তাদের অনেকেই সন্তানের অভিভাবক হন এবং সন্তানদের  লেখাপড়া  ও শৈশবের বেড়ে ওঠাও সেখানেই হয়। ভালো – মন্দ সব মিলিয়েই অন্যান্য সবার জীবনের মত তাদেরও কেটে যায় দিন-বছর তদুপরি জীবন। দালান কোঠায় থাকলেও তারা তাদের জুম ‘ঘর’ কে কখনো ভুলতে পারেন না এবং ভুলতে দিতে চান না তাদের ছেলেমেয়েদেরকেও। সেখানকার দ্বিতীয় প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা খুব একটা জুম্ম সংস্কৃতি ও জীবনাচারের সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পান না। তাই তাদেরকে জুম্ম সংস্কৃতি ও জীবনাচারের সাথে পরিচিত করানোর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়েই রতন বিজয় চাকমা ও নিঝুম তালুকদার গড়ে তোলেন এই ‘জুম্ম সুরঞ্জলী শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক একাডেমী। এমনটাই বলেছিলেন তাঁরা।

বুড়ি বাজার এলাকায় এক বাড়ীওয়ালা নিচের গ্যারেজটা কমিয়ে সেখানে ভাড়া দেয়ার জন্য কয়েকটা রুম তৈরী করবেন। এই খবরটা নিঝুম তালুকদার আর রতন বিজয় চাকমার কানে এল। সেই সময় তারা প্রতিষ্ঠানটির জন্য একটা যুতসই জায়গা খুঁজছিলেন। তারা তখন সেই বাড়িওয়ালাকে বলে সেখানে একটা বিশেষ রুম বানিয়ে নেন যেটাই সেদিনকার সেই হলরুম যেখানে সেদিন আমরা তাদের সাক্ষাৎ পেয়েছিলাম। তবে ‘জুম্ম সুরঞ্জলী শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক একাডেমী’ প্রতিষ্ঠিত হয় ২০১৪ সালের ১লা মে। শুরুর দিকে ‘বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম’ ও ‘আদিবাসী সামাজিক কল্যাণ সমিতি’ তাদেরকে আর্থিক সহযোগীতা দান করলেও বর্তমানে একাডেমিটি প্রায় নিজস্ব অর্থায়নে স্বাধীনভাবে পরিচালিত। তবে এখনও মাঝে মাঝে রতন বিজয় চাকমা এবং নিঝুম তালুকদারকে কয়েক হাজার করে টাকা ভূর্তকি হিসেবে খরচ করতে হয়। একাডেমীতে বর্তমানে নাচ, ড্রইং, স্পোকেন ইংলিশ কোর্স চালু আছে। এর আগে চালু ছিল চাকমা ভাষা লিখন কোর্স। গানের শিক্ষকের ব্যাপারে ও কথা হচ্ছে। সেখানে রতন বিজয় চাকমা মাঝে মাঝে বিতর্ক প্রতিযোগীতারও আয়োজন করেন।

তাঁরা জানালেন, সাভারে বিভিন্ন প্রোগ্রামে তাদের ডাক পড়ে। কিছু বিশেষ দিনে ইপিজেডগুলোতে বিভিন্ন কর্মসূচি থাকে। তখন আয়োজকেরা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তাদেরকে আমন্ত্রণ জানান। সেক্ষেত্রে তাদের একটাই দাবি, এইসব প্রোগ্রামে সবকিছুর  মধ্যে অন্তত একটা জুম্ম সংস্কৃতির পরিবেশনা রাখতেই হবে। আয়োজকেরা ও তাদের এই দাবি মেনে নেন। তাছাড়া এই প্রতিষ্ঠানটি সাভারে বিঝু উপলক্ষেও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করে থাকে। তারা ফুল বিঝু উপলক্ষে আয়োজন করে ফুল ভাসানোর অনুষ্ঠান করেন।

‘জুম্ম সুরঞ্জলী শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক একাডেমি’
ছবিঃ হলরুমে আসা অভিভাবকদের একাংশ

আরো কিছু বিষয় না বললেই নয়। বিষয়গুলো মূল বিষয়ের সাথে পুরোপুরি প্রাসঙ্গিক না হলেও একেবারে অপ্রাসঙ্গিক নয়। সাভারে বেশ কয়েকটি জায়গায় জুম্মরা থাকেন। পল্লী বিদুৎ, বুড়ী বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় তারা একতাবদ্ধ হয়ে থাকেন। যেমন ‘জুম্ম সুরঞ্জলী শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক একাডেমী’ যে ভবনে অবস্থিত সেই ভবনটিতে পুরোটাই চাকমারা বসবাস করেন। প্রতি রুমে এক একটি পরিবার বাস করে। তারা গাজীর চট এলাকায় একটি বিহার প্রতিষ্ঠা করেছেন। আছে অনেকগুলো জুম্ম মুদির দোকান। সেখানকার দোকানি মনজু মিত্র চাকমা সম্প্রতি বিনা মূল্যে আবারো চাকমা ভাষা লিখন কোর্স চালু করেছেন। স্মৃতি বিকাশ চাকমা পরিচালনা করেন কম্পিউটার কোর্স। কর্মজীবি মায়েদের সন্তান লালন-পালন ও বিকাশের জন্য সুশান্ত চাকমা, নিঝুম তালুকদার আর রিন্টু চাকমা মিলে পরিচালনা করেন ‘জুম্ম শিশু পরিচর্যা কেন্দ্র’।

রতন বিজয় চাকমা এবং নিঝুম তালুকদার দু’জন বেশ কাছের বন্ধু। এবং তাদের দু’জনেই সংস্কৃতি এবং অধিকার সচেতন মানুষ। তাদের বাড়ী যথাক্রমে রাংগামাটি জেলার  লংগদু উপজেলার কাট্টলি এবং খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ি উপজেলার শান্তিপুর নামক জায়গায়। তারা জানেন না আর কত বছর তারা সেখানে থাকবেন নাকি পুরো জীবনটা কাটিয়ে দেবেন। তবে তারা সেখানে একটি ‘জুম্ম সাংস্কৃতিক ইনষ্টিটিউট’ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেন।

প্রতিটা সমাজেই কিছু মানুষ থাকেন যাদের হাত ধরেই মূলত সমাজ সঠিক পথে পরিচালিত হয়। রতন বিজয় চাকমা এবং নিঝুম তালুকদার এই দু’জনেই হচ্ছেন এমনই মানুষ যারা পুরো সাভার সমাজে সুচেতনার আলো ছড়িয়ে চলেছেন। এই পথচলায় তাঁরা থাকতে চান স্বাধীন, মুক্ত ডানায় ভেসে পুরো সাভার সমাজে বিচরণ করে ছড়াতে চান আলো।

‘জুম্ম সুরঞ্জলী শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক একাডেমি’
ছবিঃ নিঝুম তালুকদার (বামে) ও রতন বিজয় চাকমা (ডানে)

জুম একটি চাষ পদ্ধতি। যেটা মূলত পাহাড়ে প্রচলিত। পৃথিবীর বিভিন্ন পাহাড়ী অঞ্চলে এই চাষ পদ্ধতি অনুসরণ করে চাষাবাদ করা হয়। আমরা জুম্মরাও মূলত পাহাড়ের অধিবাসী এবং সেক্ষেত্রে জুম চাষ আমাদের আদি পেশা। বর্তমানে যদিও আমাদের জুম্ম সমাজের অনেকেই আর জুম চাষ করি না তারপরও জুম আমাদের কাছে এক আবেগ, এক চেতনা যা আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ রাখে। যে চেতনা জুম্ম সংস্কৃতি ও জীবনধারার কথা বলে। সেই দিক থেকে চিন্তা করলে সাভারে দুই বন্ধু মিলে জুম্ম সংস্কৃতি ও জীবনধারার চাষ করছেন। তাই আমরা বলতেই পারি সাভারে দুই বন্ধু মিলে জুম চাষ করছেন। আমরা জুমজার্নালের পক্ষ থেকে  তাদের সাফল্য এবং একই সাথে তাদের সাধনার ধন ‘জুম্ম সুরঞ্জলী শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক একাডেমি’র উত্তোরত্তর সমৃদ্ধি কামনা করি।


নিজস্ব প্রতিবেদন ,জুমজার্নাল

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here