শোভা রাণী ত্রিপুরা – সংক্ষিপ্ত জীবন বৃত্তান্ত

0
83

কবি ও কথাসাহিত্যিক শোভা ত্রিপুরার জন্ম ২ ফেব্রুয়ারী ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার বরকল উপজেলায়। তাঁর পিতা স্বর্গীয় মি. লবঙ্গ কুমার ত্রিপুরা এবং মাতা স্বর্গীয় মিসেস কনকবালা ত্রিপুরা। বাবার চাকরিসূত্রে শোভা ত্রিপুরা খাগড়াছড়ি জেলার মহালছড়িতে বসবাস করেন। শৈশব-কৈশোর থেকেই তাঁর লেখালেখিতে বিশেষ আগ্রহ এবং কৈশোর জীবনেই তাঁর লেখায় হাতেখড়ি হয়। শোভা ত্রিপুরা ত্রিপুরীয় জনগোষ্ঠীর একজন মহীয়সী মহিলা এবং পেশায় শিক্ষক। জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন কোমলমতি শিশুদের মাঝে। শিক্ষকতার পাশাপাশি সংস্কৃতি চর্চা আর লেখালেখিতে তাঁর বিশেষ আগ্রহ। শৈশব-কৈশোর থেকে লেখালেখির অভ্যাস। ছোট বয়সে লেখায় হাতেখড়ি। শোভা ত্রিপুরা নিজ জনগোষ্ঠীর একজন উদ্যমী নারী।

আদিবাসী জীবনযাত্রা ছাড়াও তিনি লিখেছেন ছোটগল্প, কবিতা, নাটক, প্রবন্ধ, ভ্রমণ কাহিনী, গান, উপন্যাস ইত্যাদি। ধ্যান-জ্ঞান হয়ে ওঠেছে লেখালেখি। প্রাণ হয়ে ওঠেছে সাহিত্যচর্চা। তিনি ‘কথাসাহিত্য’ আর ‘লোকসাহিত্য’ তুলে ধরেন মন দিয়ে। লেখালেখির জন্য একজন মানুষের যে ব্যাকুলতা দরকার, সবটুকু লালন করেন এই নারী।

তাঁর বিভিন্ন লেখায় পাহাড়ি জনজীবনের কথা যেমন এসেছে, তেমনি এসেছে সমতলের মানুষের জীবনযাত্রার কথাও। ১৯৭৭ সালে খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজে প্রথম বর্ষে পড়া অবস্থায় শিক্ষক হিসেবে চাকরি পেয়েছিলেন। এখনো শিক্ষকতায় নিয়োজিত তিনি। জেলার মহালছড়ি চৌংড়াছড়িমুখ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তিনি। আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে অবসরে যাওয়ার কথা তাঁর। শোভা ত্রিপুরা জানালেন, কেবল পুঁথিগত শিক্ষা নয়; শিক্ষার্থীদের জীবনমুখী শিক্ষা দেয়াই তাঁর কাজ। ছেলেমেয়েদের শিক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে শিল্প, সাহিত্যবোধ আর জীবনগঠনের জন্যে যথার্থ মূল্যবোধ বিষয়টিকে তিনি সবসময় গুরুত্ব দিয়ে থাকে। ১৯৮৪ সালে আরেক লেখক ও গবেষক মংছেনচীং রাখাইন (মংছিন) এর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন শোভা ত্রিপুরা। তাঁর স্বামী মংছেনচীং সাহিত্যে ২০১৬ সালে একুশে পদক পান। পেলেন লেখক সঙ্গী। শুরু হয় নতুন যাত্রা। এর আগেই শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হয়েছিলেন। এভাবে লেখক শোভা ত্রিপুরার এগিয়ে চলা শুরু। কেবল লেখালেখি করেন তাই নয়, সমাজসেবায়ও শোভা রানীর আছে ভূমিকা। জীবনের প্রথমদিকে নিজে গিয়ে দৈনিক গিরিদর্পণ আর দৈনিক অরণ্যবার্তায় লেখা দিয়ে আসতেন। ডাকঘরের মাধ্যমেও লেখা পাঠাতেন। এ দুটি দৈনিক ছাড়াও রাঙামাটি থেকে প্রকাশিত ‘সাপ্তাহিক বনভূমি’ পত্রিকায় বহু কবিতা, ছড়া, গল্প ও প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে দেশ-বিদেশের কয়েকটি পত্র-পত্রিকা ও সাময়িকীতে তাঁর কয়েকটি লেখা প্রকাশ পেয়েছে। ন। শুধু শিক্ষার্থীদের এমন শিক্ষা দিচ্ছেন তা নয়, নিজের দুই কন্যা সন্তানকেও সঠিক পথে নিয়ে আসতে পেরেছেন বলে খুব গর্ববোধ করেন শোভা ত্রিপুরা। ‘রত্নগর্ভা’ এই নারীর দুই কন্যা স্ব স্ব মহিমায় ভাস্বর। ছোট কন্যা চেনচেননু জাতীয় রচনা প্রতিযোগিতায় রৌপ্য পদকপ্রাপ্ত। ২০১১ সালে মহালছড়ি মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে অংশ নিয়ে জাতীয় বিতর্ক প্রতিযোগিতায় ‘শ্রেষ্ঠ বিতার্কিক’ হন। বর্তমানে শান্তা মারিয়াম বিশ্ববিদ্যালয়ে এলএলবি অনার্স (চতুর্থ বর্ষ) করছে। বড় কন্যা প্রিয়াংকা পুতুল রাঙামাটি সদর শুকছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষিকা পদে কর্মরত।

গ্রন্থ তালিকা:
আদিবাসী জনজীবন ছাড়াও তিনি লিখেছেন ছোটগল্প, কবিতা, নাটক, প্রবন্ধ, ভ্রমণ কাহিনী, গান, উপন্যাস মিলে সর্বমোট ১৪ টি গ্রন্থ লিখেছেন। যা দেশে এবং দেশের বাইরে বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় পত্র-পত্রিকা ও সাময়িকীতে প্রকাশ পেয়ে আসছে। তাঁর প্রকাশনার মধ্যে রয়েছে, ঝরাপাতা (কবিতা) ১৯৯৬, ত্রিপুরা জাতির ইতিকথা ২০০১, ত্রিপুরা জাতির রূপকথা ২০০২, জাতক (বুদ্ধ) ২০০৪, ত্রিপুরা জাতি ২০০৭, ত্রিপুরা জাতির ইতিবৃত্ত, আলোময়ীমা ত্রিপুরেশ্বরী, শুভ বাংলা নববর্ষ ২০১২, স্বপ্নের ধূসর ছায়া (গল্প) ২০১৩, ‘রাখাইন ও ত্রিপুরা জাতিসত্তা’ ২০১৪, ধূসর পাহাড়ে সবুজ তারুণ্য (গল্প) ২০১৪, ত্রিপুরা জাতির কিংবদন্তী ২০১৪, একুশের অপরাজিত কথামালা (নাটক) ২০১৪, গিরি নন্দিনী (কবিতা) ২০১৪ ও আলোক নবগ্রহ ধাতু চৈত্য বৌদ্ধ বিহার ও ভদন্ত চন্দ্রমণি মহাথেরো প্রভৃতি। শোভা ত্রিপুরার সাহিত্য কর্মের বেশি অংশ জুড়ে নিজ জাতি-ধর্ম, সংস্কৃতি, জীবনযাত্রা, ইতিহাস স্থান পেয়েছে। তাছাড়া বৌদ্ধ ধর্ম ও জাতক, রাখাইন জীবনধারা ইত্যাদি নিয়েও কাজ রয়েছে তাঁর।

অবদান এবং পুরস্কার:
শোভা ত্রিপুরা ১৯৭৩ সালে ঢাকার বঙ্গবভনে কৃতি যুব সংবর্ধনায় অংশগ্রহণ করেন। ১৯৯৯ সালে ঢাকা নারী গ্রন্থ প্রবর্তনা কক্সবাজার ও তিন পার্বত্য জেলার লেখিকা হিসেবে সংবর্ধিত হন। অতঃপর মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস’ ২০১২-এর ২৬ মার্চ খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা মহালছড়ি উপজেলা সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংসদ কর্তৃক সাহিত্যে অবদানের জন্য ‘সংবর্ধনা’ প্রদান করা হয়। তিনি ১৯৮৫, ১৯৮৬ এবং ২০০০ সালে মহালছড়ি উপজেলাসহ খাগড়াছড়ির পার্বত্য জেলার ‘শ্রেষ্ঠ শিক্ষিকা’ নির্বাচিত হন। ১৯৮১ সালে তিনি ‘রাঙ্গামাটি বনভূমি সাহিত্য পুরস্কার’ এবং ১৯৮০ সালে রাঙ্গামাটি উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনষ্টিটিউট হতে রূপকথা প্রথম, ১৯৮৫ সালে পুনর্বার রূপকথা শাখায় উপজাতীয় রূপকথা তৃতীয় পুরস্কার পান। বাংলাদেশ আদিবাসী কবি পরিষদ ও বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ‘ক’ অঞ্চল রাঙ্গামাটি, রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা থেকে কবিতায় বিশেষ অবদানের জন্য ‘সম্মাননা সনদ’ (২১ ফেব্র“য়ারি’ ২০১৩খ্রি.), সিরাজগঞ্জ বিশ্ব বাংলা সাহিত্য উৎসব’ ২০১২ উপলক্ষে কবিতা ক্লাব আয়োজিত ‘সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী’ পুরস্কার প্রদান করা হয় ২৩ ফেব্র“য়ারি’২০১৩খ্রি., খাগড়াছড়ি আলোক নবগ্রহ ধাতু চৈত্য বৌদ্ধ বিহার পরিচালনা কমিটি শুভ-বুদ্ধ পূর্ণিমা’ ২৫৫৭ বুদ্ধাব্দ উপলক্ষে ‘সম্মাননা সনদ’ প্রদান করা হয় ২৪ মে’ ২০১৩খ্রি. সর্বস্তরের বাংলা ভাষাঃ শুদ্ধ বানানে, শুদ্ধ উচ্চারণে উপজেলা ভিত্তিক কর্মশালা ২০১৩খ্রি. ভাষায় উৎকর্ষে স্মারক সম্মাননা (১৭/০৭/২০১৩খ্রি.) আয়োজনে: ছায়ানীড় টাঙ্গাইল, জেলা প্রশাসকের সভা কক্ষ, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা, ছায়ানীড়ের ২৬তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী-২০১৪খ্রি. ‘ছায়ানীড় স্মারক সম্মাননা’ জাতীয় জাদুঘর, কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তন, শাহবাগ, ঢাকা ২৩ ফেব্রয়ারি ২০১৪, রবিবার, বিকাল ৪টা। মুর্শিদাবাদ রাহিলা সংস্কৃতি সংঘ-এর ২৯ তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে, ২১ ফেব্র“য়ারির বাংলা ভাষা আন্দোলনের শহিদদের স্মরণে এবং বিশ্ব মাতৃভাষা দিবসের প্রেক্ষিতে সাহিত্য সংস্কৃতি উৎসব-এর ‘রাহিলা সাহিত্য পুরস্কার-২০১৪’ প্রদান করা হয়। পশ্চিমবঙ্গ বাংলা একাডেমি সভাঘর (নন্দন চত্ত্বর, কোলকাতা তারিখঃ- ২২ ফেব্র“য়ারি ২০১৪), ২২ মে ২০১৪ ঢাকা কেন্দ্রিয় পাবলিক লাইব্রেরী ভিআইপি সেমিনার হল শাহবাগ-এর পান্ডুলিপি পরিষদ ও পিস ওয়ার্ল্ড সংস্থার পক্ষ থেকে আঞ্চলিক ভাষা ও কবিতায় বিশেষ অবদানের জন্য ‘কবি নজরুল স্মারক সম্মাননা-২০১৪’ প্রদান করা হয়। আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ ও বেগম রোকেয়া দিবস-২০১৬ উপলক্ষে মহালছড়ি সদর জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ কার্যক্রম-২০১৬এর আওতায় শিক্ষা ও চাকুরী ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ জয়িতা নির্বাচিত হন । ৩০ মার্চ ২০১৭খ্রি. তারিখ রাঙ্গামাটি দৈনিক গিরিদর্পণ পত্রিকায় ৩৪তম বর্ষপূর্তি ও ৩৫তম পদাপর্ণ স্মারক সম্মাননা-২০১৭খ্রি. প্রদান করা হয়। সর্বশেষ ২০১৭ সালের নারী জাগরণের অগ্রদূত মহীয়সী নারী বেগম রোকেয়া পদক – ২০১৭ লাভ করেন।


লেখক: নিপন ত্রিপুরা, শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here