‘আমার সিনেমা, আমার ভাষা’ – ৪র্থ পার্বত্য চলচ্চিত্র উৎসব

0
111
Hill film festival
Hill film festival

সবাইকে ৪র্থ পার্বত্য চলচ্চিত্র উৎসবে স্বাগতম। আসুন, নিজের ভাষার সিনেমা দেখি। সিনেমার ভাষা বোঝার চেষ্টা করি। নিজের ভাষার সিনেমা আর সিনেমার ভাষার মধ্যে একটা সম্পর্ক তৈরী করি।

আমার সিনেমা, আমার ভাষা- এবারের ৪র্থ পার্বত্য চলচ্চিত্র উৎসব এর স্লোগান। আমাদের প্রথম চলচ্চিত্র উৎসবে কোন স্লোগান ছিল না। পরে আমরা চিন্তুা করলাম, আমরা এক একটা স্লোগান এর মাধ্যমে এক একটা বার্তা দিতে পারি। দ্বিতীয় পার্বত্য চলচ্চিত্র উৎসবে আমাদের স্লোগান ছিল ‘আমাদের জন্য সিনেমা’ অর্থাৎ আমাদের জুম্মদের জন্য সিনেমা কি হতে পারে। আমরা শুধুই ভাবতে আর ভাবাতে চাচ্ছিলাম সেই সময়। তার পর আমরা ঠিক করলাম ‘আমার সিনেমা, আমার পরিচয়’। অর্থাৎ আমরা বলতে চেয়েছি, আমাদের জন্য সিনেমা হতে পারে আমার (নিজের) পরিচয়কে তুলে ধরার একটা মাধ্যম হিসেবে। এবার আমরা ঠিক করলাম ‘আমার সিনেমা, আমার ভাষা’। আর এ কারণেই মূলত সিনেমার সাথে ভাষার একটা সম্পর্ক খোাঁজা জরুরি হয়ে পড়েছে।

এর আগেও এ ব্যাপারে টুকটাক কথা বলেছিলাম। এ যেমন একেবারে সরল ঠিক তেমনি ততটা কঠিন। সিনেমা কি কি ভাষায় হয়? এই জীবনে তো কত ভাষার সিনেমা দেখলাম। বাংলা, ইংরেজী, হিন্দি, তামিল, পার্সি, স্প্যানিশ, ইতালি, ফ্রেন্সসহ কত ভাষার সিনেমায় তো দেখলাম। চাকমা ভাষায় সিনেমা হয়েছে। মারমা ও ত্রিপুরা ভাষায় ও সিনেমা নির্মিত হয়েছে। তাহলে তো এটা পানির মত পরিষ্কার, যে ভাষায় সিনেমা নির্মিত হবে সেটা সে ভাষার সিনেমা। হ্যাঁ, এটা বলা যায়। এটা আধুনিক সময়ে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। কিন্তু এসব ভাষা বাদেও সিনেমার নিজস্ব একটি ভাষা আছে। আপনারা নিশ্চয় সবাই নির্বাক যুগের সিনেমা দেখেছেন। যখন শব্দগ্রহণ যন্ত্র আবিষ্কৃত হয় নি তখন সিনেমায় কোন ধরনের শব্দ ব্যবহার করা হতো না। সংলাপ তো দূরের কথা। শুধুমাত্র হলরুমে কোন কোন প্রযোজক বা পরিচালক সিনেমার সাথে সংগতি রেখে অর্কেষ্ট্রা বাজাতেন। সিনেমা সেইসময়ে শুধুমাত্র ‘দেখার মাধ্যম’ হওয়া সত্ত্বেও তখন মানুষ সিনেমার গল্প বুঝেছে এবং তার রস বা মজা নিতে পেরেছে। তাই নির্দ্বিধায় বলা যায় শব্দ বা সংলাপ ছাড়া ও সিনেমার গল্প বলার নিজস্ব একটা ভাষা আছে। তবে শব্দগ্রহণ যন্ত্র আবিষ্কৃত হওয়ার পর শব্দ বা সংলাপ সিনেমাকে একটি নতুন মাত্রা দেয়। তাই সিনেমা এখন দেখা ও শোনার মাধ্যম। অর্থাৎ দৃশ্য ও শব্দ মিলেই আধুনিক সিনেমা।

Hill film festival
Hill film festival

দৃশ্য তো বুঝলাম। শব্দ ও বুঝলাম। তাহলে ভাষা কী? সিনেমার ভাষা আসলে অনেকগুলো শিল্পের মিশ্রনে তৈরী হয়েছে। যেখানে দৃশ্য এবং শব্দ বা সংলাপ প্রধান ভাষা। এক্ষেত্রে সত্যজিত রায় এর কথাটা উল্লেখ করা যেতে পারে। তিনি বলেছিলেন, সিনেমা নিজেই একটা ভাষা। যে ভাষায় একটার পর একটা দৃশ্য বা ইমেজ যোগ করে আমরা সিকোয়েন্স বা বাক্য গঠন করে গল্প বলি। তিনি বলছেন, এক একটা ইমেজ এক একটা বাক্য আর সব মিলিয়ে পুরো বক্তব্য। অর্থাৎ পুরো গল্প। তাই আমরা বলতে পারি, সিনেমা সবশেষে একটা গল্প বলা বা তৈরী করা। সেই সিনেমার সংলাপ থাকতে ও পারে আবার নাও থাকতে পারে। চলচ্চিত্রের নির্বাক যুগেও সিনেমা গল্প বলেছে। তাই সিনেমার আসল ভাষা সংলাপ নিরপেক্ষ। আধুনিক যুগে ও অনেকে সংলাপ না বলে সিনেমার গল্প বলেন।

তবে সংলাপ ব্যাবহারে ও সিনেমা নতুন মাত্রা পেয়েছে। দর্শককে গল্প বুঝতে সহায়তা করেছে। হয়তোবা কিছু কিছু সিনেমা সংলাপ ছাড়া অর্থপূর্ণ হতো না। আর এ সংলাপটাই আমাদের হারিয়ে যেতে বসা ভাষাগুলোর জন্য আশীর্বাদ হতে পারে। পৃথিবীতে ঠিক কতগুলি ভাষায় মানুষ কথা বলে আমার জানা নেই। তবে সংখ্যাটা অনেক হবে এটা নিশ্চিত। এগুলোর অনেকগুলির অফিসিয়াল ব্যবহার না থাকায় বর্ণমালা বা লেখ্যরুপ থাকা সত্ত্বেও হারিয়ে যেতে বসেছে বা মৃতপ্রায়। সেই ভাষাগুলিকে রক্ষায় বা বিকাশের ধারায় সেই ভাষার সিনেমা একটি ভূমিকা রাখতে পারে। আবার ভাষাগুলি অনেক ক্ষেত্রে একটি জাতি বা জনগোষ্ঠীকে প্রতিনিধিত্ব করে। সেটা পৃথিবীর যে-কোন ভাষার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। আমাদের পার্বত্য অঞ্চলের ভাষাগুলোর ক্ষেত্রেও ব্যাপারগুলি প্রায় একই। তাই আমরা বলছি আপনার নিজের ভাষার সিনেমা আপনার পরিচয়কে প্রতিনিধিত্ব করবে।

তবে, সবার উপরে সিনেমা একটি শিল্প এবং বিনোদনের মাধ্যম। যে মাধ্যমে মানবমনের বৈচিত্র্যপূর্ণ বা বিচিত্র চিন্তা-ভাবনা গল্প হয়ে দৃশ্য আর শব্দে উদ্ভাসিত হয়। তারপর ও বলবো, আমার সিনেমা মানে আপনার গল্প আর আমার ভাষা মানে আপনার নিজের ভাষা এবং সিনেমার ভাষা। আসুন, চলচ্চিত্র উৎসব এ সিনেমা দেখুন। সিনেমা হলে সিনেমা দেখার আনন্দ উপভোগ করেন।


৬ এপ্রিল ২০১৮, রাংগামাটি
লেখক: এডিট দেওয়ান, উৎসব পরিচালক, ৪র্থ পার্বত্য চলচ্চিত্র উৎসব।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here