‘আমি কবে আমার ভাষায় পড়বো’?

প্রশ্ন করছে আদিবাসী শিশুটি। অনেক প্রত্যাশা আর আগ্রহ নিয়ে। কিন্তু সে প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর দেবার কেউ নেই। যাদের কাছে উত্তরটি জানা আছে, তারা সাই মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে। আদিবাসী শিশুটির তাই স্বপ্ন দেখা আর শেষ হয় না।

লোকে বলে, স্বপ্ন তো স্বপ্নই। কেবল দেখে যতে হয়। বাস্তবে যা পাওয়া যায় না, স্বপ্নে তার নাগাল পাওয়া যায়। যাকে বলে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো। একদিন আদিবাসী শিশু, যারা প্রতিনিয়ত বাংলায় ছাপা একগাদা বই হাতে নিয়ে স্কুলে হাজিরা দেয় জ্ঞানের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে, জগৎকে দেখতে ও বুঝতে, তাদেরকে এই রকমই একটি স্বপ্ন দেখানো হল- তারা অচিরেই নিজেদের ভাষায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়া-লেখা করতে শুরু করবে। শিশুটি বেজায় খুশি এতে। কারণ, শ্রেণীকক্ষে বাংলায় পড়তে গিয়ে তার মাথা ঘেমে নেয়ে উঠে। শ্রেনীকক্ষের পড়া সে বুঝতে পারে না। বোঝার কাজটি সহজও নয়। কারণটাকে খুঁজে নেওয়াও খুব কঠিন কিছু নয়। কারণ, বইটির ভাষা শিশুর কাছে অজানা। সমস্যাটি কিন্তু একবারেই নির্ভেজাল। অপরিচিত ভাষায় বিদ্যালয়ে বিদ্যা আয়ত্ত্ব করতে গিয়ে শিশুটিকে হোঁচট খেতে হয়। কারণ অনেক। বিদ্যালয়ের সম্পূর্ণ জগৎটা তার কাছে একবারেই নতুন। এই নতুন Physical environment-এ সে আড়ষ্ট বোধ করে। এখানকার শ্রেনীকক্ষগুলো তার জন্য নতুন। শ্রেনীর অন্য শিশুরা তার অপরিচিত। পরিচিত হয়তো বা গুটিকয়েক থাকতেও পারে। শিক্ষক শিক্ষিকারা তার কাছে অচেনা। বিদ্যালয়ে শেখাবার ধরন-ধারনও অভিনব। সর্বোপরি, বিদ্যালয়ে যে ভাষায় কথাবার্তা হয় তাও তার কাছে পরিচিত নয়। সব কিছুতেই হঠাৎ একটা পরিবর্তন। তার চেনা পরিবেশের বা্‌ইরে আরেক নতুন জগৎ। সব কিছু মিলিয়ে একটা তালগোল পাকানো পরিস্থিতি তৈরি করেছে তার জন্য। এই ধরনের পরস্থিতি শিশুর মানস জগতে একটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। কিন্তু আবার, বিদ্যালয়ে শিশুদের নিজেদের মুখে ব্যবহৃত ভাষার ব্যবহার তাকে এই অবস্থা থেকে উত্তরণের পথ বেঁধে দিতে পারে। এতে শিশুরা বাড়ি থেকে বিদ্যাভ্যাসের যে আবহকে তার অভিজ্ঞতার ঝুলিতে পুরে নিয়ে এসেছে তার সাথে তার নতুন লব্দ বিদ্যাপীঠের শিখনের প্রক্রিয়ার মধ্যে একটা সংযোগ তৈরির পথ খুলে দেয়ার সুযোগ থেকে যায়। কারণ, গৃহ-পরিবেশের মুক্ত শিক্ষা আর বিদ্যাপীঠে অনুশীলিত শৃঙ্খলে বিন্যস্ত আনুষ্ঠানিক শিক্ষার মধ্যে ফারাক থাকলেও শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে শিশুর পরিচিত ভাষার (মাতৃভাষা অর্থে) ব্যবহার শিশুটিকে বিদ্যালয়ের সঙ্গে মানিয়ে নিতে প্রভূত পরিমাণে সাহায্য করতে পারে।

বিদ্যালয়ে শিশুরা যখন একটি ভাষায় শিখতে শুরু করে যা তাদের জন্ম একবারেই নতুন- তেমন একটি পরিস্থিতি শিক্ষাকে পরোপুরি শিক্ষক-কেন্দ্রিক (teacher-centric) করে তোলে। এমনিতেই বিদ্যালয়ের নতুন পরিবেশে শিশুটি গুটিয়ে যায়, তাকে নীরব ও নিস্ক্রিয় করে রাখে। এই পরিস্থিতি শ্রেনীকক্ষে ‘নতুন ভাষাকে আত্মস্থ করার মরিয়া প্রচেষ্টা’ থেকে উদ্ভূত সাধারণ নীরবতা ও নিস্ক্রিয়তাকে আরও ভারী করে তোলে। এতে শিশুর সম্ভাবনাপূর্ণ বা প্রচ্ছন্ন শক্তি এবং সেই সাথে নিজেকে প্রকাশ করার যে স্বাভাবিক প্রবণতা, আগ্রহ ও স্বাধীনতা তা অবদমিত থেকে যায়। কচি মনের অনুসন্ধিৎসাকে নিষ্প্রান ও অনুভূতিহীন করে তোলে, তার সৃজনী শক্তিকে বাধাগ্রস্ত করে এবং শিখন প্রক্রিয়া ও তার শিখন অভিজ্ঞতাকে নিরানন্দময় ও অপ্রীতিকর করে তোলে। এই সব কিছু অবশ্যই কোন না কোন ভাবে শিখনের চূড়ান্ত ফলাফলের উপর নেতিবাচক প্রভাব রাখে।

ছবিঃ পার্বত্য চট্টগ্রামে শিক্ষাব্যবস্থা
আদিবাসী শিশুর শিক্ষাব্যবস্থা

 

প্রতিটি মানব শিশুই অমিত সম্ভাবনা নিয়ে জন্মায়। মানব শিশুর এই সম্ভাবনাকে লালন ও পরিপোষণ করা প্রতিটি সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অবিচ্ছেদ্য ও অবিভাজ্য দায়। শিশুর মধ্যে যে সুপ্ত প্রতিভা রয়েছে তার যথাযথ বিকাশের উপযোগী সমস্ত সুযোগ পাওয়া তার অধিকার। আর শিশুর প্রচ্ছন্ন শক্তির পরিপূর্ন বিকাশের অন্যতম একটি পরীক্ষিত মাধ্যম হল শিক্ষা। কিন্তু এখানে গুরুত্বপূর্ন প্রশ্নটি হল শিক্ষাটা কোন (ভাষার) মাধ্যমে হবে।

সাধারণভাবে আমরা যা দেখি, রাষ্ট্রের প্রধান ভাষাকেই শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ‘প্রধান ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে ব্যবহার’- এই বাক্যাংশের ব্যবহার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে নির্দেশ করেছে এবং তা হল, দেশে প্রধান ভাষাটি ছাড়াও আরও ভাষা রয়েছে। সেই ভাষায় যারা কথা বলে, জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি, তারা কিন্তু তাদের ভাষায় না পড়ে অন্য আরেকটি ভাষায় পড়ছে বা পড়তে বাধ্য হচ্ছে। এখন স্বাভাবিকভাবে যে প্রশ্নটি সামনে এসে দাঁড়ায়: এই অবস্থায় লেখাপড়ায় কারা ভাষার সুবিধা পাবে? কারা ভাষার সুবিধা নিয়ে এগিয়ে যাবে? স্বভাবতই, শিক্ষার মাধ্যমটি যাদের মুখের ভাষা, মায়ের ভাষা, তারাই পড়ালেখায় এগিয়ে যাবে, ভাল করবে। শিশুর লেখাপড়ার শুরুতেই এইভাবে কিন্তু একটা বৈষম্যকে দাঁড় করানো হয়েছে বা দাঁড়িয়ে গেছে। এতে একটি ভাষিক শ্রেনীর বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ স্বাভাবিকভাবেই রুদ্ধ হয়ে পড়ে।

এই বিষয়ে পরিচালিত বিস্তর গবেষনায়ও কিন্তু একই বক্তব্য উঠে এসেছে। বিভিন্ন গবেষনায় ফলাফল বলছে, মানব শিশুর মধ্যে অন্তর্লীন হয়ে থাকা গুণাবলীর কাম্য উৎকর্ষতা অর্জনে মাতৃ-ভাষা ভিত্তিক বহুভাষী শিক্ষা-ব্যবস্থা (Mother Tongue based Multilingual Education or MTB-MLE) একটি সফল মডেল হিসেব প্রমাণিত হয়েছে(Benson & Kosonen, 2013)। মাতৃভাষা ভিত্তিক বহুভাষী শিক্ষা ব্যবস্থার ফলে শিশু যেমন স্ব-স্ব ভাষার উৎকর্ষতার উচ্চতাকে স্পর্শ করতে পারে, তেমনি অন্য ভাষা আয়ত্ত করার ভিত্তিতাও মজবুত হয়। মাতৃভাষার শিক্ষার সুযোগ শিশুকে ‘এক-ভাষী’ (Unilingual) শিক্ষার তুলনায় চিন্তার ক্ষেত্রে অনেক বেশি অগ্রনী ও সৃজনমুখী করে তোলে। কিন্তু মাতৃভাষায় না হয়ে অপর একটি ভাষার শিশুর জন্য শিক্ষার ব্যবস্থা করা হলে শিশুর বিকাশ খন্ডিত হয়, কারন এর ফলে:

  • শিশু পুরোপুরি বা সফলভাবে শিখন প্রক্রিয়ায় ঢুকে যেতে পারে না;
  • পড়াশুনায় পিছিয়ে পড়া শিশু অনেকক্ষেত্রেই শিক্ষকের সুনজর থেকে বঞ্চিত থাকে যা শিশুর মধ্যে বঞ্চনাবোধ সৃষ্টি করে ও মানসিকভাবে তাকে অন্তর্মুখী করে তোলে;
  • শ্রেনীকক্ষে অকৃতকার্যতার স্বাদ পেতে হয়, যা শিশুদেরকে মানসিকভাবে পর্যদুস্ত করে;
  • ভাষার উপর অদক্ষতাজনিত ব্যর্থতা শিশুর মধ্যে হীনমন্যতার জন্ম দেয়;
  • মাতৃভাষায় পড়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত শিশু প্রায়শই নিজের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গভীরতা, গুরুত্ব ও মর্মকে তার যথাযথ প্রেক্ষিত ও প্রেক্ষাপটে ধারণে অক্ষম থাকে;
  • মাতৃভাষায় না হয়ে ভিন্ন ভাষায় শিশুর বিদ্যাচর্চা তার নিজের পার্থিব, জাগতিক ও আধ্যাত্মিক জীবনের অভিপ্রায় ধারণের সক্ষমতাকে ক্ষুন্ন করে; এবং
  • শিক্ষা ব্যবস্থা মাতৃভাষায় না হলে বিদ্যালয়ে শিশুর অবস্থানকাল অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘতর হয়, গ্রেডের পুনরাবৃত্তি ঘটে (Repetition of grade)।

এই সব কারণে, শিশুকে তার নিজের ভাষায় পড়তে ও শিখতে বাধাগ্রস্ত করা হলে শিশুর অন্তর্নিহিত মানবিক গুণাবলী, তার সৃষ্টিধর্মী সকল শক্তি অ-বিকশিত  ও অ-উন্মচিত থেকে যায়। এতে তার মৌলিক অধিকারকে হরণ করা হয়। সকল মানবাধিকার আইন, শিশু অধিকার আইন, এমনকি আমাদের রাষ্ট্রের সংবিধানও শিশুর সুপ্ত শক্তিকে পূর্ণরূপে বিকশিত করার অধিকার দিয়েছে।

এখানে সবচেয়ে বড় প্রণিধানযোগ্য বিষয়টি হল, মাতৃভাষায় শেখার মধ্য দিয়েই শিশুকে বেড়ে উঠতে দিতে হবে। কারণ, মাতৃভাষা ছাড়া অন্য কোন ভাষায় মানুষ নিজেকে পরিপূর্ণভাবে মেলে ধরতে পারে না। প্রতিটি জাতির মানস চেতনা, সাংস্কৃতিক অভিপ্রায়কে ধারণ করার উপযোগী করেই কিন্তু পৃথিবীতে এক একটি ভাষার আবির্ভাব ঘটেছে, বিবর্তিত হয়েছে। পৃথিবীতে প্রতিটি জাতিই স্ব-স্ব ভাষার মাধ্যমে সংস্কৃতিকে ধারন করে জাতির স্বতন্ত্র পরিচয়কে বহন করে চলেছে।

১৯৫৩ সাল থেকেই UNESCO মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা চালু করার কথা বলে আসছে। বাংলাদেশকে তো ১৯৫২ সনের ২১ ফেব্রুয়ারী রক্ত দিয়েই মাতৃভাষার অধিকারকে প্রতিষ্ঠা করতে হয়েছিল। এই ২১ ফেব্রুয়ারী দিনটিকেই ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর প্যারিস অধিবেশনে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারী থেকেই দিবসটি জাতিসঙ্ঘের সদস্য রাস্ট্রসমূহের মধ্যে ভাষিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র এবং বহুভাষিকতাবাদ সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য সাড়ম্বরে পালিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশে ১৯৫২ সালের পর থেকেই প্রতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারী পালিত হয়ে আসছে। ১৯৭২ সালের পর থেকে এই দিনটি রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বিভিন্ন অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি প্রদান ও গ্রহনের মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে। কিন্তু ভাষিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র এবং বহুভাষিকতাবাদ সম্পর্কে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে, রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারকদের মধ্যে আদৌ সচেতনতা বেড়েছে কি?

ছবিঃ পার্বত্য চট্টগ্রামে শিক্ষাব্যবস্থা
পার্বত্য চট্টগ্রামে শিক্ষাব্যবস্থা

২০১০ সালে প্রণীত বাংলাদেশের জাতীয় শিক্ষানীতিতেও দেশে ভাষিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের সুরক্ষা ও বহুভাষিকতাবাদকে পৃষ্ঠপোষণের অঙ্গীকার ব্যক্ত করে বলা হয়েছে:

ক. দেশের আদিবাসীসহ সকল ক্ষুদ্র জাতিসত্তার সংস্কৃতি ও ভাষার বিকাশ ঘটানো (অধ্যায় ১:  শিক্ষার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য, পৃষ্ঠা.২)।

খ. প্রাথমিক শিক্ষাস্তরে আদিবাসীসহ ক্ষুদ্র জাতিসত্তার স্ব-স্ব মাতৃভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা করা (অধ্যায় ২: খ. প্রাথমিক শিক্ষা: উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য, পৃষ্ঠা.৪)।

যুক্তিসঙ্গত কারণেই জাতীয় শিক্ষানীতিতে বর্ণিত উপরের দু’টি প্রতিশ্রুতি এই দেশের আদিবাসী কিংবা ক্ষুদ্র জাতিসত্তা যে নামেই তাদের অভিহিত করা হোক না কেন, সবার মনেই আশার সঞ্চার করেছিল যে, অবশেষে ভাষার জন্য রক্ত দেয়া জাতি শুধু নিজেরাই নিজের ভাষায় পড়ালেখা করছে না, অন্যদেরও নিজেদের ভাষায় পড়ার সুযোগ করে দিয়ে স্ব-স্ব ভাষা ও সংস্কৃতির সংরক্ষণ ও বিকাশের পথকে প্রশস্ত করে দিচ্ছে।

কিন্তু বাস্তবতা কি?

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রধান ভাষা বাংলা হলেও আরও বহু ভাষা এখানে প্রচলিত রয়েছে কিন্তু তার সবগুলোই মাতৃভাষা বা প্রথম ভাষা নয়। বাংলাদেশে প্রায় ৯৬.৬% মানুষের ভাষা বাংলা। এই বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদা দেবার দাবিতে বাঙালীরা বুকের রক্ত দিয়েছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরে ১৯৭২ সাল থেকে বাংলাকে রাষ্ট্রের সর্বস্তরে চালু করার জন্য বিভিন্ন সময়ে সরকার বিভিন্ন প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। সংবিধানের ৩ ও ২৩ অনুচ্ছেদে ‘বাংলা’র স্বীকৃতি রয়েছে। তারপরেও, যে দেশে রক্তের বিনিময়ে মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে হয়েছে, সেই দেশে বাংলা কি এখনও সর্বস্তরে চালু হয়েছে? সংবিধানের ৩ অনুচ্ছেদকে পুরোপুরি কার্যকর করার জন্য ১৯৮৭ সালে ‘বাংলা ভাষা আইন’ বলবৎ করা হয়েছিল। এর পর তিন যুগ পেরিয়ে গেছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে আজ ৪৩ বছর, আর ৬৪বছর আগে ভাষার জন্য রক্ত ঝরেছিল। সর্বস্তরে বাংলা চালু এখনও যেন অনেক দূরের পথ। উল্টোই, শিক্ষার মাধ্যম ‘বাংলা হবে’ বলা হলেও ‘ইংরেজী মাধ্যম’ শিশু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা যেন পাল্লা দিয়ে বেড়েই চলেছে। ‘বাংলা’র যদি এই অবস্থা হয় তাহলে আদিবাসীরা কবে থেকে মাতৃভাষায় শিখতে শুরু করবে?

 

তাই জাতীয় শিক্ষানীতিতে প্রতিশ্রুত দেশে সকল আদিবাসী ও ক্ষুদ্র জাতিত্তার ভাষা ও সংস্কৃতির বিকাশ ঘটানো হবে, তাদের স্ব-স্ব মাতৃভাষায় শিক্ষার ব্যবস্থা করা হবে মর্মে প্রদত্ত রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন কি আসলেই স্বপ্ন হয়ে থেকে যাবে?

নীতি, রাজনীতির এই সব ঘোরপ্যাচঁ শিশুটির মাথায় ঢোকে না। ঢোকারও কথা নয়। কিন্তু সে জুমঘরের খোলা মাচাঙ-এ কেরোসিনের কুপি বাতির টিমটিমে আলোয় পড়তে বসে বাতির জ্বলন্ত সলতে থেকে কুন্ডলী পাকিয়ে উঠা কালো ধোঁয়ার দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে কিংবা দূরবর্তী বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়ার পথশ্রমে ক্লান্ত ঘুমে ঢুলু ঢুলু চোখে এখনও স্বপ্ন দেখে, সে বিদ্যালয়ে নিজের ভাষায় পড়ছে, যে ভাষার মাধ্যমে সে তার জগৎকে দেখতে ও বুঝতে শিখেছে; জ্ঞান-বুদ্ধি বিকাশের ভিত্তিকে রচনা করে দিয়েছে, চিন্তায় ব্যাপ্তি এনেছে, কল্পনার পাখাকে ডানা মেলতে দিয়েছে; যে ভাষার মাধ্যমে সে নিশিদিন তার রাগ, অনুরাগ ও বিরাগের প্রকাশ ঘটিয়ে চলে এবং সুখ-দুঃখ ও আনন্দ-বেদনার অনুভূতিকে হৃদয়ের গভীরে একেবারেই মর্মমূলে ধারণ করতে পারে।


লেখকঃ মংচানু চৌধুরী

তথ্যসূত্রঃ দ্বিতীয় পার্বত্য চট্টগ্রাম আদিবাসী লেখক সম্মেলন ২০১৬, স্মারক সংকলন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here