শান্তিচুক্তি নিয়ে ২০টি হালকা প্রশ্ন এবং একটি বিষন্ন জিজ্ঞাসা

2
31

প্রথম পর্ব

এই লেখার শিরোনামে যদি পাঠক পাবলো নেরুদার ‘বিশটি প্রেমের কবিতা ও একটি হতাশার গান’ নামক একটি কাব্যগ্রন্থের ছায়া খুঁজে পান, তা কাকতালীয় হবে না। ‘শান্তিচুক্তি’র বিশ বছর পূর্তি উপলক্ষে ‘কুইজ’ গোছের বিশটি প্রশ্নের তালিকা করতে বসার পর আমার হঠাৎ করে মনে পড়ে গিয়েছিল নেরুদার বইটির কথা (যেটি ইংরেজি অনুবাদে Twenty Love Poems and a Song of Despair ও মূল স্প্যানিশে Veinte poemas de amor y una canción desesperada নামে পরিচিত)। তাই খানিকটা সেটির আদলে আমার লেখার শিরোনাম সাজিয়েছি। তবে যোগসূত্রটা কিছুটা আরোপিত হলেও পরে আমার মনে হয়েছে, নেরুদার প্রায় শতবর্ষী কাব্যগ্রন্থটি শিরোনামের মিল ছাপিয়ে বিষয়গতভাবেও আমাদের আলোচনায় যথেষ্ট প্রাসঙ্গিক, যে বিষয়ে লেখার শেষ দিকে (২য় পর্বে) দুটি কথা যোগ করব।

উল্লেখ্য, এই লেখায় তুলে ধরা প্রশ্নগুলি সাধারণভাবে আমার মাথায় ঘুরতে শুরু করেছিল সম্প্রতি পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রসঙ্গে একটা বক্তৃতা দেওয়ার প্রস্তাব পাওয়ার প্রেক্ষিতে। শুরুতে ভেবেছিলাম, অনুরোধটা যদি রাখিই, তাহলে যেহেতু ‘শান্তি চুক্তি’র বিশ বছর পূর্তি হতে যাচ্ছে, আমার আলোচনায় সেটার উপরই আলোকপাত করব। তখন এটাও ভাবতে শুরু করি, চুক্তি প্রসঙ্গেতো বহুবছর ধরে অনেক কথাই হল, নতুন কী বলার থাকতে পারে আমার? এমন ভাবনা থেকেই এই লেখায় পেশ করা অনেক প্রশ্ন আমার মনে উঁকি দিতে শুরু করেছিল। এসব নিয়ে ভাবতে শুরু করার পর অবশ্য দ্রুতই আমি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাই যে, নিজের চিন্তাভাবনা গুছিয়ে তুলে ধরতে গেলে যে সময় লাগবে, তা আপাতত আমি দিতে পারব না। তাই বক্তৃতার চিন্তা বাদ দেই। বর্তমান পর্বে নিচের অংশে মূলত প্রশ্নপত্র তুলে ধরা হল। পরের পর্বে থাকছে উত্তরপত্র।

প্রশ্নপত্র

নিচে ‘পার্বত্য শান্তিচুক্তি’ নিয়ে ২০টি হালকা প্রশ্ন বা ‘লঘু প্রশ্নাবলী’ দেওয়া আছে শুরুতে। এসব প্রশ্ন আবার প্রসঙ্গ অনুযায়ী চারটি ভাগে সাজানো হয়েছে – প্রতিটিতে পাঁচটি প্রশ্ন সমেত – যথাক্রমে ‘নামকরণ প্রসঙ্গে’, ‘পুরানো ইতিহাস’, ‘বাস্তবায়নের মাত্রা’ ও ‘বিবিধ ভাবনার খোরাক’ শিরোনামে। এসবের পর তুলে ধরা হয়েছে আমার ‘বিষন্ন জিজ্ঞাসা’।

লঘু প্রশ্নাবলী

নামকরণ প্রসঙ্গে

১। ১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে যে চুক্তি হয়েছিল, যা ‘শান্তিচুক্তি’ নামে বহুল পরিচিত, সেই দলিলে ‘শান্তি’ শব্দটি কয়বার ব্যবহৃত হয়েছে?

২। চুক্তির দলিলে যে শিরোনাম রয়েছে, তা কী?

৩। চুক্তিটিকে সংক্ষেপে কী নামে ডাকা হবে, এ ব্যাপারে দলিলে কোথাও সরাসরি কিছু লেখা আছে বা এ বিষয়ে পরে উভয় পক্ষের সম্মতিতে কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত কখনো হয়েছিল কি?

৪। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি ও আঞ্চলিক পরিষদের পক্ষ থেকে চুক্তিটিকে কী নামে অভিহিত করা হয়?

৫। সরকারিভাবে ‘শান্তি চুক্তি’ কথাটি ব্যবহার করা হয় কি?

পুরানো ইতিহাস

৬। পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে ১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বরের আগে অন্য কোনো ‘শান্তিচুক্তি’ হয়েছিল কি?

৭। ১৯৯৭ সালের ‘শান্তিচুক্তি’র আগে বাংলাদেশ সরকার ও পার্বত্য চট্টহগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে কয় দফা আনুষ্ঠানিক বৈঠক হয়েছিল?

৮। খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান, এই তিনটি জেলায় বর্তমানে যে পার্বত্য জেলা পরিষদসমূহ রয়েছে, সেগুলি কি ‘শান্তিচুক্তি’র ফলে সৃষ্ট?

৯। দেশের একটি প্রধান রাজনৈতিক দল পার্বত্য চট্টগ্রাম ‘শান্তিচুক্তি’কে ‘কালোচুক্তি’ আখ্যায়িত করে তা বাতিলের দাবিতে ১৯৯৮ সালের ৯ জুন ঢাকা থেকে খাগড়াছড়ি অভিমুখে ‘লং মার্চ’ করেছিল। সেই দল ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসার পর চুক্তি বাতিল করেনি কেন?

১০। যাঁরা ‘চুক্তি’র বিরোধিতা করেন, তাঁরা কি সবাই গণতন্ত্রবিরোধী বা পাহাড়ি বিদ্বেষী বর্গের মানুষ?

চুক্তি বাস্তবায়নের মাত্রা

১১। যেসব প্রতিষ্ঠান ‘শান্তিচুক্তি’র পর সৃষ্ট হয়েছে, বা নতুন নাম/আকার পেয়েছে, সেগুলি কি কি এবং সেগুলির মধ্যে কোনগুলি যথাযথভাবে কাজ করছে?

১২। চুক্তি কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, এ প্রসঙ্গে সরকারের ভাষ্য কী?

১৩। চুক্তি বাস্তবায়নের গতিপ্রকৃতি ও মাত্রা প্রসঙ্গে জনসংহতি সমিতির বক্তব্য কী?

১৪। চুক্তি বাস্তবায়নের মাত্রা সম্পর্কে বিভিন্ন তৃতীয় পক্ষের মূল্যায়ন কেমন?

১৫। নিচে দেখানো ছবিকে যদি আমরা চুক্তি বাস্তবায়নের বর্তমান অবস্থার প্রতীক হিসেবে দেখি, তবে এতে দেখানো গ্লাসটিকে আমরা কী হিসেবে বর্ণনা করব – ‘অর্ধেক খালি’ নাকি ‘অর্ধেক ভর্তি’?

Question
চুক্তি বাস্তবায়নের বর্তমান অবস্থা: গ্লাসটি ‘অর্ধেক খালি’ নাকি ‘অর্ধেক ভর্তি?; ছবি: ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত

বিবিধ ভাবনার খোরাক

১৬। তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদে যেসব জনপ্রতিনিধি রয়েছেন, তাঁদের পেছনে কতটুকু জনসমর্থন রয়েছে?

১৭। ধরা যাক, জেনারেল এরশাদ নিম্নোদ্ধৃত কাল্পনিক বক্তব্যের অনুরূপ কোনো কথা বলে বসলেন, তখন তাঁকে আমরা কী উত্তর দেব? “আমি না হয় ‘স্বৈরাচারী’ ছিলাম, কিন্তু আমার আমলে ১৯৮৯ সালে যখন পার্বত্য জেলা পরিষদসমূহ (ভিন্ন নামে) প্রথম গঠিত হয়, তখন যেভাবেই হোক নির্বাচনের মাধ্যমেইতো এসব প্রতিষ্ঠান গঠিত হয়েছিল। এদিকে আমার পতনের পর দেশে কত গণতান্ত্রিক সরকার এল গেল, কিন্তু দুই যুগের অধিককাল ধরে যে এসব পরিষদ সরকার মনোনীত ব্যক্তিবর্গের মাধ্যমেই চলছে, এ নিয়ে কোনো মহলেই তেমন কোনো উচ্চবাচ্য নেই কেন?”

১৮। চুক্তি নিয়ে এ পর্যন্ত কয়টি গবেষণা হয়েছে?

১৯। বিশ বছর আগে সম্পাদিত শান্তিচুক্তির পর শান্তি স্থাপন ও উন্নয়নের জন্য কয়টি সংস্থা পার্বত্য চট্টগ্রামে তৎপর রয়েছে?

২০। পার্বত্য চট্টগ্রামে ‘শান্তি’র অন্বেষা যে দীর্ঘকাল যাবত একটা জায়গায় ঘুরপাক খাচ্ছে, যার ফলে সাধারণ জনগণের মধ্যে বিরাজ করছে ব্যাপক হতাশা বা নির্লিপ্ততা, এই অবস্থার জন্য দায়ী কে? ক) সরকার; খ) জনসংহতি সমিতি; গ) চুক্তিবিরোধী পক্ষসমূহ; ঘ) বিবিধ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি; ঙ) আমরা (‘আপনি, আমি ও সে’)।

বিষন্ন (ও গুরুগম্ভীর) জিজ্ঞাসা

২১। ‘পার্বত্য শান্তিচুক্তি’তে ‘শান্তি’ শব্দটা থাকা অপরিহার্য ছিল কিনা জানি না, কিন্তু সেখানে থাকতে পারত, বা থাকলে ভালো হত, এমন বেশ কিছু শব্দের তালিকা আমরা করতে পারি। যেমন, জনগণ বা জনসাধারণ, গণতন্ত্র, সমতা, ন্যায়বিচার, অংশগ্রহণ, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, দরিদ্র, বঞ্চিত, জুমচাষী, নারী, শিশু। এসব শব্দের কোনোটিই যে চুক্তিতে নেই, অন্যদিকে বিশেষ কিছু শব্দ যে অনেকবার ব্যবহৃত হয়েছে (যেমন পরিষদ, চেয়ারম্যান, সদস্য, উপজাতীয়, অ-উপজাতীয়, চীফ/রাজা), এর তাৎপর্য কী? এখানে ভাবনার খোরাক হিসেবে একটা সুনির্দিষ্ট উদাহরণ তুলে ধরছি। আমার গুনে দেখা যদি ঠিক থাকে, তাহলে চুক্তিতে ‘পরিষদ’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে ১১৭ বার, সে তুলনায় ‘নির্বাচন’ শব্দটি আছে মাত্র তিনবার। এটা কি কাকতালীয় যে চুক্তি সম্পাদিত হওয়ার আগে থেকেই তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের অস্তিত্ব ছিল এবং চুক্তির পর যুক্ত হয়েছে আঞ্চলিক পরিষদ, কিন্তু গত বিশ বছরে এসব পরিষদে যারা সদস্য বা চেয়ারম্যান পদে ছিলেন বা রয়েছেন, কাউকে জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হয়ে আসতে হয়নি? আপনার কী মনে হয়?

আমরা কি ঠিক প্রশ্ন ওঠাচ্ছি?

এখানে তুলে ধরা বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর আমি যেভাবে বা যতটুকু জানি, পর্যায়ক্রমে ও সংক্ষেপে দেওয়ার চেষ্টা করব আলাদা একটি পর্বে‌ ডিসেম্বর ১ নাগাদ প্রকাশিতব্য ‘উত্তরপত্রে’র মাধ্যমে। তবে আগ্রহী পাঠক আগেভাগেই পরখ করে দেখতে পারেন আমার ওঠানো প্রশ্নগুলি কতটা যথার্থ, বা এগুলির উত্তর তাঁর কতটা জানা আছে। পরে আমার দেওয়া উত্তরপত্রও একইভাবে যাচাই করে দেখতে পারেন। এসবক্ষেত্রে যাঁরা প্রাসঙ্গিক তথ্য, মতামত বা নতুন কোনো প্রশ্ন যোগ করে আলোচনা এগিয়ে নেবেন, তাঁদের সবাইকে আগাম ধন্যবাদ জানিয়ে রাখছি।


লেখক: প্রশান্ত ত্রিপুরা

স্বতন্ত্র গবেষক ও লেখক (সাবেক সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়; অধ্যাপক, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি)

২৯ নভেম্বর, ২০১৭


২য় পর্ব: ‘শান্তিচুক্তি’ প্রসঙ্গে নতুন ভাবনার সন্ধান

2 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here