‘শান্তিচুক্তি’ প্রসঙ্গে নতুন ভাবনার সন্ধান

1
61

‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি’কে ঘিরে গত বিশ বছরে যত বিভেদ, অশান্তি ও ভুলভ্রান্ত্রি দেখা দিয়েছে – আসুন সেসব পেছনে ফেলে, সব তিক্ততা ভুলে গিয়ে, পথের ক্লান্তি ও হতাশা কাটিয়ে আমরা সবাই মুক্তির পথ খুঁজি যুক্তি, ভালোবাসা ও ইচ্ছাশক্তি দিয়ে।

শান্তিচুক্তি নিয়ে ২০টি হালকা প্রশ্ন এবং একটি বিষন্ন জিজ্ঞাসা

২য় পর্ব: উত্তরপত্র

এই লেখার শুরুতে (১ম পর্বে) যেমনটা উল্লেখ করেছিলাম, ‘শান্তিচুক্তি’ প্রসঙ্গে নতুন আলাপ কী হতে পারে, এ নিয়ে ভাবতে গিয়ে সম্প্রতি আমার মনে কিছু প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে শুরু করেছিল। সেই সূত্রে গত নভেম্বর ২৯ তারিখে ফেসবুকে যেসব প্রশ্ন তুলে ধরেছিলাম, সেগুলিরই উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছি এই নোটে। পাঠক এখানে ক্লিক করে আগের নোট ও সেখানে দেওয়া প্রশ্নপত্র দেখে নিতে পারেন। তবে আপনি চাইলে শুধু বর্তমান নোটটিই পড়তে পারেন, যেহেতু এখানে সব প্রশ্ন আবার তুলে দেওয়া হয়েছে, যদিও কিছু ক্ষেত্রে তা করা হয়েছে একটু ভিন্নভাবে বা সংক্ষেপে। নিচে প্রত্যেক প্রশ্নের পর উত্তর নির্দেশ করা হয়েছে ‘উ:-’ দিয়ে।

নামকরণ প্রসঙ্গে

১। ‘শান্তি চুক্তি’র মূল দলিলে ‘শান্তি’ শব্দটি কয়বার ব্যবহৃত হয়েছে? উ:- একবারও না।

২। চুক্তির যে শিরোনাম স্বাক্ষরিত দলিলে রয়েছে, তা কী? উ:- “গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক গঠিত পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটির সহিত পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির চুক্তি”।

৩। চুক্তিকে সংক্ষেপে কী নামে ডাকা হবে, এ ব্যাপারে উভয় পক্ষের সম্মতিতে কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত কখনো হয়েছিল কি? উ:- এ প্রশ্নের কোনো সুনির্দিষ্ট উত্তর আমি খুঁজে পাই নি। আপনি কিছু জানেন কি?

৪। জনসংহতি সমিতি ও আঞ্চলিক পরিষদ চুক্তিকে কী নামে অভিহিত করে? উ:- ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি’

৫। সরকারি মহলে ‘শান্তি চুক্তি’ কথাটি ব্যবহৃত হয় কি? উ:- হ্যাঁ, কিছু পরিসরে, যেমন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে, এটি দেখা যায়।

পুরানো ইতিহাস

৬। পার্বত্য চট্টগ্রামে ১৯৯৭ সালের আগে কি কোনো ‘শান্তি চুক্তি’ হয়েছিল? উ:- হ্যাঁ। অন্তত একটির কথা আমি জানি, যা সম্পাদিত হয়েছিল দেড়শত বছর আগে, ১৮৬৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। সেটির মূলে ছিল জাদুকরি ছলাকলা নির্ভর ঔপনিবেশিক প্রতারণা! পার্বত্য চট্টগ্রামের তখনকার প্রশাসক ক্যাপ্টেন লুইন ও একজন লুসাই গোত্রপ্রধানের মধ্যে সম্পাদিত হয়েছিল এই চুক্তি (বিস্তারিত বিবরণ জানতে চাইলে ক্লিক করুন  এখানে, যা আলাদা একটি ফেসবুক পোস্টের লিংক)।

৭। ‘শান্তিচুক্তি’ সম্পাদনের আগ পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকার ও পার্বত্য চট্টহগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে কয়বার বৈঠক হয়েছিল? উ:- বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ১৯৮৫ সাল থেকে শুরু করে ১৯৯৭ সালের মধ্যে উভয় পক্ষের মধ্যে মোট ২৬ বার বৈঠক হয়েছিল। (এসব বৈঠকে ঠিক কী আলোচনা হয়েছিল, কখন কোন ধরনের বিষয় প্রাধান্য পেয়েছিল, এসব তথ্য জনসমক্ষে আসা দরকার। তাতে ১৯৯৭ সালের চুক্তিকে একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখে এর সবল-দুর্বল সব দিক যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা সহজতর হবে।)

৮। খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান, এই তিনটি জেলায় বর্তমানে যে ‘পার্বত্য জেলা পরিষদ’সমূহ রয়েছে, সেগুলি কি ‘শান্তিচুক্তি’র ফলে সৃষ্ট? উ:- না, এগুলি ঠিক নতুন কোনো প্রতিষ্ঠান নয়। এসব পরিষদ প্রথম গঠিত হয়েছিল ১৯৮৯ সালে, তবে আগে এগুলি পরিচিত ছিল ভিন্ন নামে, যথাক্রমে ‘খাগড়াছড়ি/রাঙ্গামাটি/বান্দরবান স্থানীয় সরকার পরিষদ’ হিসেবে।

৯। যে দল ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি’কে একটি ‘কালো চুক্তি’ আখ্যায়িত করে তা বাতিলের দাবিতে ১৯৯৮ সালের ৯ জুন ঢাকা থেকে খাগড়াছড়ি পর্যন্ত ‘লং মার্চ’ করেছিল, সেটি কেন ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসার পর চুক্তি বাতিল করে নি? উ:- এ প্রশ্নের উত্তর দলটির নেতৃবন্দই ভালো দিতে পারবেন।  তাঁরা কখনো তা দিয়েছেন কিনা, আমার জানা নেই। তবে মুখে চুক্তির বিরোধিতা করেও কার্যত তা মেনে নেওয়া আর চুক্তি করেও তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে না পারা বা না চাওয়া, এই উভয় প্রবণতার মধ্যে কোনোটিকেই বেছে নেওয়ার কিছু নেই। আমাদের বরং দেখতে হবে, এসব প্রবণতার পেছনে মূল কী কারণ রয়েছে।

১০। যাঁরা ‘শান্তিচুক্তি’র বিরোধিতা করেন, তাঁরা কি সবাই গণতন্ত্রবিরোধী বা পাহাড়ি বিদ্বেষী? উ:- গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে যে কেউ চুক্তির বিরোধিতা বা সমালোচনা করতেই পারেন, কাজেই কেউ চুক্তির বিপক্ষে কথা বললেই শুধু সে কারণে তাঁকে অগণতান্ত্রিক বা পাহাড়ি-বিদ্বেষী বলা যাবে না। এক্ষেত্রে দেখতে হবে কারা কী উদ্দেশ্যে, কোন যুক্তিতে এবং কেমন পন্থায় চুক্তির বিরোধিতা করছেন। আমরা জানি, অনেকে চুক্তির বিরোধিতা করেন ‘উপজাতীয়’দের অনেক বেশি ছাড় দেওয়া হয়েছে মনে করে। অন্যদিকে ‘জুম্ম’ পরিচয়ের প্রবক্তা বা সমর্থকদের মধ্যে অনেকে রয়েছেন, যাঁরা বলে আসছেন, চুক্তির মাধ্যমে পাহাড়ি বা জুম্ম জনগণ প্রতারিত হয়েছে। আবার এই দুই বিপরীত মেরুর মাঝখানে বা ভিন্ন কোনো অবস্থানে থেকেই চুক্তির মূল্যায়ন করেন, এমন মানুষেরও অভাব নেই। সবার কথাই জানতে হবে, শুনতে হবে, বোঝার চেষ্টা করতে হবে।

চুক্তি বাস্তবায়নের মাত্রা

১১। ‘শান্তিচুক্তি’র পর পুনর্বিন্যস্ত বা নবগঠিত বিবিধ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কোনগুলি যথাযথভাবে কাজ করছে? উ:- চুক্তির পর বেশ কিছু নতুন (বা সংশোধিত) আইন হয়েছে, তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের নতুন নামকরণ ও পুনর্বিন্যাস হয়েছে এবং আঞ্চলিক পরিষদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন, শরণার্থী বিষয়ক টাস্ক ফোর্স প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান গঠিত হয়েছে। ‘যথাযথভাবে’ কাজ করার প্রশ্নে এগুলির কোনোটিকেই ভালো নম্বর দেওয়া যায় না, যদি জনগণের চাহিদা অনুযায়ী কাজ করার সামর্থ্য, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মত মাপকাঠি আমরা বিবেচনায় নেই। তবে বাংলাদেশের সার্বিক বাস্তবতায় এই অবস্থা অপ্রত্যাশিত নয়। এর মধ্যেও কিছু প্রতিষ্ঠান আছে, যেগুলির কার্যকারিতা এখন পর্যন্ত খুবই সীমিত, এমনকি প্রায় শূন্যের কোঠায় (যেমন ‘ভূমি কমিশন’)। কেন এই অবস্থা, তা তলিয়ে দেখা দরকার।

১২। সরকারের দৃষ্টিকোণ থেকে চুক্তির কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে? উ:- সিংহভাগ। উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ১০ই ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী সংসদে বলেছিলেন, চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টি পুরোপুরি এবং ১৫টি আংশিক বাস্তবায়িত হয়েছে এবং বাকি ৯টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

১৩। চুক্তি বাস্তবায়নের গতিপ্রকৃতি ও মাত্রা প্রসঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতির দৃষ্টিভঙ্গী কী? উ:- প্রধানমন্ত্রীর উল্লিখিত বক্তব্যের (১২ নং উত্তর দ্রষ্টব্য) প্রেক্ষিতে প্রকাশিত জনসংহতি সমিতির একটি ‘খোলা চিঠি’ থেকে জানা যায়, তাদের দৃষ্টিতে চুক্তির ‘দুই-তৃতীয়াংশ’ই অবাস্তবায়িত রয়ে গেছে।

১৪। চুক্তি বাস্তবায়নের মাত্রা সম্পর্কে বিভিন্ন তৃতীয় পক্ষের মূল্যায়ন কেমন? উ:- সাধারণভাবে মিশ্র। যেমন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি ‘আন্তর্জাতিক শান্তি অধ্যয়ন’ বিষয়ক প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়ন অনুসারে চুক্তি সম্পাদনের দশ বছরের মাথায় বাস্তবায়নের মাত্রা ছিল ৪৯%!

Question
চুক্তি কি অর্ধেক বাস্তবায়িত, নাকি অর্ধেক অবাস্তবায়িত?; ছবি: ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত

১৫। পাশের ছবিতে দেখানো গ্লাসটি যদি চুক্তি বাস্তবায়নের প্রতীক হয়, তাহলে এটিকে আপনি কী বলবেন, ‘অর্ধেক খালি’ নাকি ‘অর্ধেক ভর্তি’? উ:- যাঁদের চোখে গ্লাসটি ‘অর্ধেক খালি’, তাঁরা স্বভাবে আশাবাদী, আর যাঁরা এটিকে ‘অর্ধেক ভর্তি’ হিসেবে দেখেন, তাঁরা নৈরাশ্যবাদী!

বিবিধ ভাবনার খোরাক

১৬। তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদে যেসব ‘জনপ্রতিনিধি’ রয়েছেন, তাঁদের পেছনে কতটুকু জনসমর্থন রয়েছে? উ:- জেলা পরিষদসমূহের বেলায় এই প্রশ্ন অবান্তর কেননা তাঁরা কেউ নির্বাচিত হয়ে আসেননি! আর জেলা পরিষদসমূহ যেহেতু নির্বাচন ছাড়াই চলছে, সেখানকার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সমর্থন নিয়ে আঞ্চলিক পরিষদ গঠনের বিধানও এখন পর্যন্ত কাগজে কলমেই রয়ে গেছে।

১৭। তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ এখন পর্যন্ত যেহেতু একবারই, একদম শুরুতে ১৯৮৯ সালে, নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত হয়েছে (তখন এগুলি ভিন্ন নামে পরিচিত ছিল), জেনারেল এরশাদ এ নিয়ে ‘বড়াই’ করলে আমরা তাঁকে কী জবাব দেব? উ:- এই প্রশ্নের সুষ্পষ্ট কোনো উত্তর আমার জানা নেই। তবে জেনারেল এরশাদ যদি বড়াই নাও করেন, নির্বাচনহীনতা বিষয়ক কিছু ব্যাখ্যা জনগণের সামনে আসা দরকার। যেমন, ১৯৮৯ সালে না হয় জোর করেই নির্বাচন চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু এরপর দুই যুগের বেশি পার হয়ে গেল, পরের কোনো সরকারের আমলে যে পার্বত্য জেলা পরিষদসমূহের জন্য কোনো ধরনের নির্বাচন আয়োজনের জোর চেষ্টা কোনো পর্যায়ে দেখা যায় নি, এর ব্যাখ্যা কী? আর এই নির্বাচনহীনতা নিয়ে যে নাগরিক সমাজেও তেমন কোনো উচ্চবাচ্য নেই, তারই বা ব্যাখ্যা কী?

১৮। বিগত বিশ বছরে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি’ নিয়ে দেশে-বিদেশে কী পরিমাণ ও কী ধরনের গবেষণা ও লেখালেখি হয়েছে? উ:- এই প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ উত্তর দিতে গেলে এ নিয়েই একটি গবেষণা করা লাগবে। কাজটা অন্য কেউ করেছেন কিনা জানি না। তবে আমি নিজে তা না করলেও ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ থেকে আমার মনে হয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক অধিকাংশ গবেষণাই পরিচালিত হয়েছে দূর থেকে বা বিক্ষিপ্ত ভাবে, অথবা সমাজ ও রাজনীতির উপরতলাগুলিতে বেশি নজর দিয়ে। এদিক থেকে সাধারণ জনগণের মাঝে থেকেও তাদের পক্ষে পরিচালিত গবেষণার একটা ঘাটতি রয়ে গেছে।

১৯। ‘শান্তিচুক্তি’র পর শান্তি স্থাপন ও উন্নয়নের জন্য কয়টি সংস্থা বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামে তৎপর রয়েছে? উ:- এর সুনির্দিষ্ট হিসাব আমার জানা নেই। তবে এটা জানি, বিগত বিশ বছরে এই সংখ্যা অনেক বেড়েছে। তথাপি বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় পার্বত্য চট্টগ্রামে যে অধিক হারে এনজিও ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা কাজ করছে, তা বলার উপায় নেই। আর এক্ষেত্রে যে সরকারিভাবে ‘নিরাপত্তা’ ইত্যাদির অজুহাতে পার্বত্য চট্টগ্রামের বেলায় বিভিন্ন সংস্থার কর্মকাণ্ডের উপর বাড়তি কড়াকড়ি আরোপ করা হয়, সেটাকে বহুকাল ধরে অনুসৃত একটা বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ হিসেবেই দেখতে হবে।

২০। বর্তমান অচলাবস্থার জন্য কে বেশী দায়ী, ক) সরকার, খ) জনসংহতি সমিতি, গ) চুক্তিবিরোধী পক্ষসমূহ, নাকি ঘ) বিবিধ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি? উ:- এই প্রশ্নের উত্তরে আমরা নিজেদের অবস্থান ও পছন্দ-অপছন্দ অনুযায়ী একটা উত্তর বেছে নিতেই পারি, কিন্তু এমন ক্ষেত্রে বিজ্ঞজনদের একটা উপদেশও আমরা মনে রাখতে পারি। আমরা যখন দোষারোপের উদ্দেশ্যে অন্য কারো দিকে তর্জনী নির্দেশ করি, তখন কিন্তু হাতের তিনটা আঙুল নিজেদের দিকেই তাক করা থাকে! এমনিতে যার যত বেশি ক্ষমতা, তার দায়টাও একটু বেশি থাকে। সে হিসেবে সরকারের দায় একটু বেশিই। তবুও এক্ষেত্রেও তিনটা আঙুলকে আমরা একটা বিশেষ প্রতীকী অর্থ দিতে পারি। আমরা বলতে পারি, তিনটা আঙুল নির্দেশ করছে ‘আপনাকে, আমাকে ও তাকে’, অর্থাৎ সামষ্টিক ভাবে আমাদের সবাইকে বা জনগণকে। সরকারের ভেতরে বা বাইরে থেকে যেসব ব্যক্তি ও গোষ্ঠী নানান ধরনের সংকীর্ণ স্বার্থসিদ্ধির কাজে ব্যস্ত, তাদের বিরুদ্ধে আমরা, জনগণ, কী বলছি বা করছি?

বিষন্ন জিজ্ঞাসা

২১। ‘পার্বত্য শান্তি চুক্তি’তে ‘শান্তি’ শব্দটা থাকা অপরিহার্য ছিল কিনা জানি না, কিন্তু সেখানে থাকতে পারত, বা থাকলে ভালো হত, এমন বেশ কিছু শব্দের তালিকা আমরা করতে পারি। যেমন, জনগণ, গণতন্ত্র, সমতা, ন্যায়বিচার, অংশগ্রহণ, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, দরিদ্র, বঞ্চিত, জুমচাষী, নারী, শিশু। এসব শব্দের কোনোটিই যে চুক্তিতে নেই, অন্যদিকে বিশেষ কিছু শব্দ যে অনেকবার ব্যবহৃত হয়েছে (যেমন পরিষদ, চেয়ারম্যান, সদস্য, চীফ/রাজা), এর তাৎপর্য কী? এখানে ভাবনার খোরাক হিসেবে একটা সুনির্দিষ্ট উদাহরণ তুলে ধরছি। আমার গুনে দেখা যদি ঠিক থাকে, তাহলে চুক্তিতে ‘পরিষদ’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে ১১৭ বার, সে তুলনায় ‘নির্বাচন’ শব্দটি আছে মাত্র তিনবার। এটা কি কাকতালীয় যে চুক্তি সম্পাদিত হওয়ার আগে থেকেই তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের অস্তিত্ব ছিল এবং চুক্তির পর যুক্ত হয়েছে আঞ্চলিক পরিষদ, কিন্তু গত বিশ বছরে এসব পরিষদে যারা সদস্য বা চেয়ারম্যান পদে ছিলেন বা রয়েছেন, কাউকে জনগণের দ্বারা বা পরোক্ষভাবে হলেও নির্বাচিত হয়ে আসতে হয় নি? উ:- এখানে তুলে ধরা প্রশ্নগুলির কোনো সদুত্তর আমার জানা নেই। তাই মূল প্রশ্নপত্রে আমার ‘বিষন্ন জিজ্ঞাসা’র শেষে পাঠকের উদ্দেশ্যে একটা প্রশ্ন যোগ করেছিলাম, ‘আপনার কী মনে হয়?’ এখানেও সেটাই আবার তুলে দিলাম।

উপসংহার: হতাশা কেটে গিয়ে ভালোবাসা ও ইচ্ছাশক্তির জয় হোক

শেষ করার আগে এই লেখার শুরুতে (প্রথম পর্বে) উল্লিখিত নেরুদার ‘বিশটি প্রেমের কবিতা ও একটি হতাশার গান’ শিরোনামের কাব্যগ্রন্থের কথা আবার স্মরণ করব একটু। বইটিতে সবার শেষে কেন হতাশার গান রয়েছে? এই প্রশ্ন মাথায় উঁকি দেওয়ার পর আমার মনে হয়েছে, প্রেমের অনুষঙ্গ হিসেবে বিবিধ বেদনার অনিবার্যতা উপলব্ধি করে কবির মনে হতাশা চলে আসতেই পারে, তবু হতাশার গানেও একভাবে প্রেম ও জীবনের জয়গানই তিনি গেয়েছেন। আমরা যদি একটু মনোযোগ দেই, তাহলে শুনতে পাব, মাত্র বিশ বছর বয়সে পা দেওয়া নেরুদার হতাশার গানে ভালোবাসার সুর মিশে আছে ঠিকই এবং সেখানে আরো রয়েছে প্রকৃতির জন্য গভীর মমতা, যা তাঁর প্রেমের কবিতাগুলিতেও ছড়িয়ে রয়েছে। উল্লেখ্য, নারী ও প্রকৃতির প্রেমে আচ্ছন্ন এই তরুণ কবি যখন (তাঁর পরবর্তীকালের কবিতায়) শোষণ নিপীড়ন থেকে মানবতার মুক্তির কথা বলেন, তা স্বাভাবিক ও প্রত্যাশিতই মনে হয় আমাদের কাছে। যাই হোক, নেরুদার কবিতা নিয়ে আমার এই ব্যাখ্যা আসলে আমার নিজের লেখার শেষে ‘বিষন্ন জিজ্ঞাসা’ রাখার একটা যৌক্তিকতা খোঁজার পরোক্ষ প্রয়াস মাত্রা। তাই এবার আসল প্রসঙ্গে সরাসরি কিছু কথা বলে এই লেখা শেষ করছি।

‘শান্তিচুক্তি’কে ঘিরে অনেকের মনে নানান মাত্রার হতাশা বা ক্ষোভ থাকতেই পারে। কিন্তু আমাদের সামনে সুযোগ রয়েছে ভালোবাসার জোরে এসবকে হটিয়ে দেওয়ার। মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার নেতৃত্বে জনসংহতি সমিতির আন্দোলনে যাঁরা যোগ দিয়েছিলেন, তাঁদের মনে বঞ্চনাজনিত ক্ষোভ ছিল, কিন্তু অনেকের অন্তরে ক্ষোভের চাইতেও বেশি ছিল ভালোবাসা – মানুষের জন্য, প্রকৃতির জন্য, নিজেদের পরিচয়ের জন্য – যে ধরণের ভালোসাবার সাথে মিশে ছিলে সুন্দর একটি সমাজ, রাষ্ট্র তথা বিশ্বের স্বপ্ন। এমন ভালোবাসা, এমন স্বপ্ন, আমাদের জিইয়ে রাখতে হবে। চারপাশের নানান প্রবণতা তলিয়ে দেখলে আমাদের মনে হতাশা ভর করতেই পারে। তবে এক্ষেত্রে জেল থেকে ভাইকে লেখা এক চিঠিতে গ্রামসির বলা একটা কথা (“I’m a pessimist because of intelligence, but an optimist because of will.” – Gramsci, December 19, 1929) ধার করে আমরা বলতে পারি, আমাদের বিচারবুদ্ধি যদি আমাদের নৈরাশ্যের দিকেও ঠেলে দেয়, ইচ্ছাশক্তি দিয়ে আমরা প্রত্যেকে আশাবাদ জাগিয়ে রাখব। আমরা চাইব, হতাশার বদলে জয় হোক ভালোবাসা ও ইচ্ছাশক্তির, অটুট থাকুক সুন্দর একটি আগামীর জন্য আমাদের স্বপ্ন, যার অংশ হবে শান্তিপূর্ণ পার্বত্য চট্টগ্রাম, বহুজাতির গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ এবং সমতাভিত্তিক ও সোহার্দ্যময় বিশ্ব।


লেখক: প্রশান্ত ত্রিপুরা

স্বতন্ত্র গবেষক ও লেখক (সাবেক সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়; অধ্যাপক, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি)

১ ডিসেম্বর, ২০১৭


১ম পর্ব: শান্তিচুক্তি নিয়ে ২০টি হালকা প্রশ্ন এবং একটি বিষন্ন জিজ্ঞাসা

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here