শাক্যমুনি বৌদ্ধ বিহারের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

0
34

রাজধানী ঢাকার শাক্যমুনি বৌদ্ধ বিহারের অবস্থান মিরপুর-১৩, ঢাকা-১২১৬। বাংলাদেশের প্রখ্যাত বিদ্যায়তন ‘স্কলাস্টিকা’, ও ‘হারম্যান মেইনার স্কুল এন্ড কলেজে’র পাশে বাংলাদেশ রোড ট্রন্সপোর্ট অটরিটির বিপরীতে ১০ নং মিরপুর গোলচত্তর থেকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট গমনাগমণের বড় রাস্তার সাথে সংযুক্ত, ১০ নং সেকশনে অবস্থিত ‘বনফুল আদিবাসী গ্রীনহার্ট কলেজ’কে বুকে ধারণ করে তিন পার্বত্য জেলার তাবৎ বৌদ্ধ জনগোষ্ঠির একমাত্র বৌদ্ধ মন্দির ‘শাক্যমুনি বৌদ্ধ বিহারে’র অবস্থান। এ বৌদ্ধ বিহারটি প্রতিষ্ঠা করে ‘পার্বত্য বৌদ্ধ সংঘ’। ঠিকানা শাক্যমুনি বৌদ্ধ বিহার, প্লট-৪, ব্লক-এ (আহসানউল্লাহ রোড-১) মিরপুর-১৩, ঢাকা- ১২১৬।

এ বৌদ্ধ প্যাগোডা বা মন্দিরটির স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন আমার অগ্রজ ভদন্ত বিমল তিষ্য ভিক্ষু মহোদয়। আজ থেকে ৪৩ (তেতাল্লিশ) বছর আগের কথা। ঢাকা শহরের বুকে সমতল ও আদিবাসী বৌদ্ধদের নিত্য নৈমিত্তিক পূজার্চনা, প্রার্থনা, ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান প্রতিপালনের জন্য একটিমাত্র বৌদ্ধ মন্দির  অবস্থিত ছিল। সেটি হল কমলাপুর ধর্মরাজিকা বৌদ্ধ মহাবিহার। বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামস্থ সংখ্যাগরিষ্ট আদিবাসী বৌদ্ধ জনগোষ্ঠির স্বকীয় বৌদ্ধিক সংস্কৃতির আবহে ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান প্রতিপালনের জন্য নিজস্ব বৌদ্ধ মন্দিরের প্রয়োজনীয়তা ও তাগিদ অগ্রজ বিমল তিষ্য মহোদয় মর্মে মর্মে উপলব্দি করে আসছিলেন। তারই ধারাবাহিকতায় পরিচালিত ***প্রাণান্তরকর প্রচেষ্টায় ‘পার্বত্য বৌদ্ধ সংঘে’র আবির্ভাব। পার্বত্য বৌদ্ধ সংঘের হাতে গোনা সদস্য/সদস্যার সম্মিলিত দূরদর্শী প্রচেষ্টাকে পুঁজি করে দীর্ঘ ৮(আট) বছরের সাধনায় শাক্যমুনি বৌদ্ধ বিহারের প্রতিষ্ঠা অগ্রজ ভদন্ত বিমলতিষ্য ভিক্ষু মহোদয়েরই অনন্য অবদান। মোর্দ্দাকথায় তাঁর দীর্ঘ আটটি বছরের ক্লান্তিহীন সাধনায় পার্বত্য চট্টগ্রামের সংখ্যাগুরু বৌদ্ধ আদিবাসী জনগোষ্ঠির জন্যে বাংলাদেশের রাজধানী কল্লোলিনী তিলোত্তমা সদৃশ ঢাকার বুকে তিনি একটি স্থায়ী ঠিকানা নির্ধারণ করে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। এটি কিন্তু তাঁর কম আত্মশ্লাঘার বিষয় নয়। আমরা বাকী পাঁচজন ভিক্ষু তাঁর এ সাধু প্রচেষ্টার সাথে চিনে জোঁকের মতো ওতপ্রোত সম্পৃক্ত থাকলেও অনন্যসাধারণ উদ্যোগটি কিন্তু অগ্রজেরই একচেটিয়া। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরের বুকে খুবই সীমিত সংখ্যক আদিবাসী সরকারী কর্মকর্তা, কর্মচারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের সম্মানীত শিক্ষক ডঃ নীরু কুমার চাকমাসহ হাতেগোনা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্র/ছাত্রীদের মধ্যে আস্থার উৎসর্জন ঘটিয়ে ‘পার্বত্য বৌদ্ধ সংঘ’ নামক একটি সংগঠন দাঁড় করানো, এ সংগঠনের নামে সদাশয় বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী মহোদয়ের সহৃদয় সহানুভূতি আদায় পূর্বক প্রচলিত সেলামীর বিনিময়ে জমির বরাদ্দপত্র আদায়করণ এবং সেই জমির উপর ‘শাক্যমুনি বৌদ্ধ বিহারে’র অস্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ অগ্রজের দীর্ঘ আট বছরের সাধনার ফসল। তাঁর এ দীর্ঘ আট বছরের ত্যাগময় সাধনপথ পুষ্প বিছানো ছিলনা। আদিবাসী জনগোষ্ঠির আজন্ম লালিত জড়তা, আস্থাহীনতা, ভেদবুদ্ধি, পরশ্রীকাতরতা(মুদিতা জ্ঞানের অভাব) একে অপরকে গুরুত্ব না দেওয়ার সংস্কৃতি, বুদ্ধের ধর্ম-দর্শনের উপর অগভীর বিশ্বাস ও বৌদ্ধ ভিক্ষুদের যাপিত জীবনের ব্যাপারে ভাইরাস আক্রান্ত ধারণা প্রভৃতিকে প্রতিমুর্হূতের চলার পথে আত্মস্থ করে ‘পার্বত্য বৌদ্ধ সংঘ’ ও ‘শাক্যমুনি বৌদ্ধ বিহার’কে একটি দৃশ্যমান পর্যায়ে উন্নীতকরণ তাঁর জন্য খুবই সহজ সাধ্য ছিলনা। এ ক্ষেত্রে তিনি তাঁর মেধা, মনন ও শ্রম নির্মোহভাবে আত্মনিবেদন করে পার্বত্য আদিবাসীদের জন্য একটি স্থায়ী ঠিকানা নির্মাণ করে দেওয়ার পরাকাষ্টা প্রদর্শন করেছেন। তাঁর এ অনন্যসাধারণ তিলতিল রক্ত ও স্বেদবিন্দু দিয়ে আকীর্ণ অবদান আদিবাসী বৌদ্ধ জনগোষ্ঠী চিরদিন স্মরণে রাখবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। আমি তাঁর সার্বিক মঙ্গল সুস্বাস্থ্যপূর্ণ দীর্ঘজীবন কামনা করি।

আমি এবং আমার অগ্রজ ভদন্ত বিমল তিষ্য ভিক্ষু হাটহাজারী ডিগ্রী কলেজ থেকে ১৯৭২ সালে দ্বিতীয় বিভাগে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ন হই। অতপর আমাদের উভয়ের পরমারাধ্য গুরু শ্রীমৎ জ্ঞানশ্রী মহাস্থবির মহোদয়ের সুপারিশক্রমে পরমপূজ্য মহাসংঘনায়ক বিশুদ্ধানন্দ মহাস্থবির মহোদয় কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ঢাকাস্থ কমলাপুর ধর্মরাজিকা মহাবিহারে তখনকার উপাধ্যক্ষ পরম শ্রদ্ধেয় শুদ্ধানন্দ মহাথেরো মহোদয়ের সান্নিধ্যে অবস্থান করার সুযোগ লাভের অনুষঙ্গে অগ্রজ বিমল তিষ্য ভিক্ষু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন শাস্ত্রে প্রথমবর্ষ সম্মান শ্রেণিতে ভর্তির অবকাশ পান।

১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে। ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ খ্রিঃ বাংলাদেশের স্থপতি, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী, জাতির জনক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে  স্বপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করা হল। বাংলাদেশের সামরিক আইন প্রশাসক তথা সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলেন। চাকমা রাজা ত্রিদিপ রায় মহোদয়ের মাতা রাণী বিনীতা রায় মহোদয়াকে মহামান্য রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান মহোদয় তাঁর উপদেষ্টা হিসেবে মনোনয়ন দিয়ে রাষ্ট্রপরিচালনায় সম্পৃক্ত হওয়ার অবকাশ দিলেন। রাজমাতা বাণী বিনীতা রায়ের একান্ত সচিব হিসেবে কাজ করার জন্য আদিবাসী চাকমা সমাজের তখনকার অন্যতম উচ্চ-পদস্থ সরকারী কর্মকর্তা মিঃ শরদেন্দু শেখর চাকমাকে নিয়োগ দেয়া হয়। রাজধানী ঢাকার বুকে তখন আদিবাসী বৌদ্ধ জনগোষ্ঠির সংখ্যা ছিল হাতেগোনা। ডঃ নীরু কুমার চাকমা তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন বিভাগে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। বলা যায় ঘুরে ফিরে বাংলাদেশ সচিবালয়ের তখনকার উপ-সচিব বাবু শরদিন্দু শেখর চাকমা, উর্ধ্বতন শাখা-প্রধান বাবু তারাচরণ চাকমা, ডঃ নীরু কুমার চাকমা প্রমুখ ব্যক্তিগণ অগ্রজ বিমল তিষ্য ভিক্ষুকে নানাভাবে দীর্ঘ আট বছরের ব্যাপ্তিকালে সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদানের পরাকাষ্টা দেখিয়েছিলেন। বস্তুতঃ তাঁদেরই সহযোগিতায় অগ্রজ বিমল তিষ্য ভিক্ষু ‘পার্বত্য বৌদ্ধ সংঘ’  নামে একটি আদিবাসী সংগঠন দাঁড় করানোর প্রচেষ্টায় নিরত থাকেন। ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দের ১০ ডিসেম্বর ঢাকার গ্রীনরোডস্থ হামিদুল হক চৌধুরীর বাড়িতে তখনকার পার্বত্য চট্টগ্রাম উপজাতীয় ছাত্রাবাসে ‘পার্বত্য বৌদ্ধ সংঘে’র জন্ম হয়। এ সংঘের আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশের অনুষ্ঠানে পার্বত্য বৌদ্ধদের  মধ্যে থেকে অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন বলে জানা যায়। এঁদের মধ্যে তদানীন্তন মহামান্য রাষ্ট্রপতির মাননীয় উপদেষ্টা রাজমাতা রাণী বিনীতা রায় মহোদয়া বৈঠকে সভাপতির আসন অলংঙ্কৃত করার পরাকাষ্টা দেখিয়ে পার্বত্য বৌদ্ধদেরকে চিরকৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করেন।

১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দের ১০ ডিসেম্বর ‘পার্বত্য বৌদ্ধ সংঘে’র জন্মলগ্ন থেকে দীর্ঘ আট বছরের নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টায় তখনকার মহামান্য রাষ্ট্রপতির মাননীয় উপদেষ্টা রাজমাতা রাণী বিনীতা রায় মহোদয়া, মহানান্য রাষ্ট্রপতির অন্যতম উপদেষ্টা বাবু সুবিমল দেওয়ান মহোদয় ও মহামান্য রাষ্ট্রপতির পরবর্তী উপদেষ্টা বাবু উপেন্দ্রলাল চাকমা মহোদয়গণের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও উদ্যোগ এবং বাবু শরদেন্দু শেখর চাকমা, বাবু তারাচরণ চাকমার সার্বিক তত্বাবধানে তদানীন্তন বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের বদান্যতায় মিরপুর-১৩ নং সেকশনে একটি বৌদ্ধ মন্দির নির্মাণের লক্ষে ‘পার্বত্য বৌদ্ধ সংঘে’র নামে অগ্রজ ০.৭৭ বিঘা পরিমাণ জায়গা প্রচলিত সেলামীর বিনিময়ে বরাদ্দ পেতে সক্ষম হন। বরাদ্দপ্রাপ্ত জায়গার উপর আরোপিত সেলামীর ১ম কিস্তি পরিশোধের পর জায়গার দখলপত্র পাওয়া যায়। অতঃপর শুরু হয় ‘শাক্যমুনি বৌদ্ধ বিহারে’র নির্মাণ কাজ। অগ্রজ ভদন্ত বিমল তিষ্য ভিক্ষু মহোদয়ের লেখনীতে উল্লেখ রয়েছে- “এ বিহারটি প্রতিষ্ঠার পেছনে যাঁদের অবদান উল্লেখযোগ্য এবং যাঁদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহানুভূতি ও সহাযোগিতা ব্যতিত শাক্যমুনি বৌদ্ধ বিহারের বর্তমান অবয়বের কথা চিন্তা করাই যায় না। তাঁদেরকে আজ আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই। তাঁরা হলেন- মহামান্য রাষ্ট্রপতির উপজাতীয় বিষয়ক মাননীয় উপদেষ্টা বাবু উপন্দ্রেলাল চাকমা,  রাষ্ট্রপতির প্রাক্তন উপদেষ্টা বাবু সুবিমল দেওয়ান, রাষ্ট্রপতির ভূতপূর্ব উপদেষ্টা রাজমাতা বিনীতা রায় ও সর্বজন শ্রদ্ধেয় মহামান্য বিশুদ্ধানন্দ মহাথেরো ও শুদ্ধানন্দ মহাথেরো প্রমুখ। এক্ষেত্রে অনুত্তর পুণ্যক্ষেত্র ভিক্ষুসংঘ ও পার্বত্য বৌদ্ধসংঘের সদস্য-সদস্যাদের নাম ও কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণযোগ্য।”

১৯৮৩ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ ফেব্রুয়ারী’ শাক্যমুনি বৌদ্ধ বিহারে’র ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করা হয়। এ ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে বাংলার বরেণ্য বৌদ্ধ পন্ডিত, বাংলার সত্যসূর্য অতীশ দীপংকর শ্রীজ্ঞানের সহস্রতম জন্ম জয়ন্তীতে আগত বিশ্বের প্রতিথযথা বৌদ্ধ-অবৌদ্ধ পন্ডিতগণ উপস্থিত থেকে পার্বত্য বৌদ্ধ সংঘকে চির কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করেন। শাক্যমুনি বৌদ্ধ বিহারের আনুষ্ঠানিক ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সরকারের তখনকার খাদ্যমন্ত্রী জনাব এ, জি মাহমুদ মহোদয় স্বশরীরে উপস্থিত থেকে স্বহস্তে ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করে পার্বত্য আদিবাসী বৌদ্ধ বিহারকে গৌরবান্বিত ও সম্মানীত করার পরাকাষ্টা প্রদর্শন করেন। সেই মহান অনুষ্ঠানে অগ্রজ বিমলতিষ্য ভিক্ষু মহোদয়ের অকৃত্রিম বন্ধু শিক্ষা সচিব জনাব কাজী জামাল উদ্দিন সাহেবও উপস্থিত থেকে অনুষ্ঠানকে গৌরবদীপ্ত করেন। আর্থিক দৈন্যতার দিকটি বিবেচনায় নিয়ে শাক্যমুনি বৌদ্ধ বিহারটি সম্পূর্ণ অস্থায়ী ভিত্তিতে নির্মাণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। অস্থায়ী নির্মাণ ব্যয় নির্বাহ করাও পার্বত্য বৌদ্ধ সংঘের জন্য তখন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। পার্বত্য চট্টগ্রামের দানশীল ব্যক্তিবর্গ, কক্সবাজারের সদ্ধর্মপ্রাণ দায়ক দায়িকামন্ডলী ও মহামান্য রাষ্টপতির তখনকার উপদেষ্টা বাবু উপন্দ্রেলাল চাকমা কর্তৃক একলক্ষ পঞ্চাশ হাজার টাকা মূল্যমানের মূল্যবান কাঠ বিনামূল্যে দান হিসেবে পাওয়ার পর সর্বমোট দু’লক্ষ আটত্রিশ হাজার টাকা ব্যয়ে ‘শাক্যমুনি বৌদ্ধ বিহারে’র নির্মাণ কাজ সমাপ্ত করা হয়।

১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ ফেব্রুয়ারী ‘শাক্যমুনি বৌদ্ধ বিহারে’র আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। এ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেও মহাসংঘনায়ক কমলাপুর ধর্মরাজিক মহাবিহারের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ বিশুদ্ধানন্দ মহাথেরো মহোদয়ের জন্মজয়ন্তী অনুষ্ঠানে আগত বিশ্ব বৌদ্ধ সৌভ্রাতৃত্ব সংঘের তাবৎ বৌদ্ধ বিশ্বের বিদেশী বৌদ্ধ প্রতিনিধিবৃন্দ উপস্থিত থেকে অনুষ্ঠানকে গৌরবমন্ডিত করেছিলেন। বিশ্ব বৌদ্ধ প্রতিনিধিবৃন্দের দু’দুবারের শুভ পদার্পনে শাক্যমুনি বৌদ্ধ বিহারটি বিশ্বব্যাপী পরিচিতি লাভ করে। তার পাশাপাশি ‘পার্বত্য বৌদ্ধ সংঘ’ ও তার কর্মকান্ড, পার্বত্য চট্টগ্রামস্থ আদিবাসী বৌদ্ধ জনগণ যে তাঁদের অন্তরের অন্তঃস্থলে অন্তঃসলিলা ফল্গুধারার মতো মানবপুত্র বুদ্ধের ধর্ম-দর্শনকে আবহমানকাল থেকে ধারণ, মনন ও অনুশীলন করে আসছিলেন তা বিশ্ব বৌদ্ধ পন্ডিত প্রতিনিধিমন্ডলীর কাছে পরিষ্কারভাবে প্রতিভাত ও পরিস্ফুট হওয়ার অবকাশ পায়। বাংলাদেশের বন্ধুপ্রতিম দেশ নেপালের বিখ্যাত বৌদ্ধ মনীষা ডঃ লোকদর্শণ, ডঃ আশারাম শাক্য ও লোকবাহাদুর শাক্য প্রমুখগণ শাক্যমুনি বৌদ্ধ বিহারে একটি সুদৃশ্য বুদ্ধ প্রতিমূর্তি দান করে বিহারের মর্যাদা, বিশ্বাসযোগ্যতা, গ্রহণযোগ্যতা আনয়নে অনন্য-সাধারণ ভূমিকা ও অবদান রাখার পরাকাষ্টা প্রদর্শন করেন। এ ক্ষেত্রে সর্বাগ্রে অবিস্মরণীয় অবদান রাখার পরাকাষ্টা প্রদর্শন করেছিলেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় পরমপূজ্য শুদ্ধানন্দ মহাথেরো মহোদয়। শাক্যমুনি বিহারটির নির্মাণ কাজ পরিসমাপ্তির পর আনুষ্ঠানিক উদ্ধোধনী অনুষ্ঠান আয়োজন প্রক্রিয়া শুরুর প্রাক্কালে কমলাপুর ধর্মরাজিকা মহাবিহার থেকে শ্বেতপ্রস্তরের একটি অনিন্দ্যসুন্দর বুদ্ধ প্রতিমূর্তি দান হিসেবে প্রদান করেছিলেন। এ পর্যায়ে আমি পরমপূজ্য ভদন্ত শুদ্ধানন্দ মহাথেরো মহোদয়ের সুস্বাস্থ্যপূর্ণ দীর্ঘ জীবন কামনা করি।

আমার পরমারাধ্য গুরু ভদন্ত জ্ঞানশ্রী মহাথেরো কর্তৃক ১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত মাইনী উপত্যকার দিঘীনালা উপজেলার ‘পার্বত্য চট্টল বৌদ্ধ অনাথাশ্রম’, ‘আবাসিক উচ্চ বিদ্যালয়’, রাঙ্গামাটি শহরের উপকণ্ঠে প্রতিষ্ঠিত ‘মোনঘর শিশু সদন’, ‘মোনঘর আবাসিক উচ্চ বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা সংক্রান্ত দুরুহ কাজে ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দ হতে ১৯৮৬ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত আমি, অগ্রজ বিমলতিষ্য ভিক্ষু, অনুজ প্রিয়তিষ্য ভিক্ষু, অনুজ শ্রদ্ধালংকার ভিক্ষু ও অনুজ জিনপাল ভিক্ষু পরস্পর হাতে হাত ও কাঁধে কাঁধ মিলে স্বতঃস্ফুর্তভাবে পরস্পর সম্পৃক্ত ছিলাম বিধায় ‘পার্বত্য বৌদ্ধ সংঘ’ ও ‘শাক্যমুনি বৌদ্ধ বিহারে’র প্রতিটি স্মরণযোগ্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাপ্রবাহের সাথে আমিসহ বর্ণিত পাঁচজন বৌদ্ধ ভিক্ষু সর্বতোভাবে ওয়াকিবহাল ছিলাম।

আমার জানামতে, পার্বত্য বৌদ্ধ সংঘের World Fellowship of Buddhist এর Affiliated Body হিসেবে স্বীকৃতি লাভসহ ‘শাক্যমুনি বৌদ্ধ বিহার প্রতিষ্ঠার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাপ্রবাহে কমলাপুর ধর্মরাজিকা মহাবিহারের মহাথেরো মহাসংঘনায়ক মহামান্য বিশুদ্ধানন্দ মহাথেরো মহোদয় সানন্দ চিত্তে ও তাঁর সুযোগ্য শিষ্য পরম শ্রদ্ধেয় শুদ্ধানন্দ মহাথেরো মহোদয় অনন্যসাধারণ অবদান রেখে আদিবাসী বৌদ্ধদেরকে চির কৃতার্থ করেছিলেন। পার্বত্য চট্টগ্রামস্থ আদিবাসী বৌদ্ধ জনগোষ্ঠির মিলন তীর্থ হিসেবে শাক্যমুনি বৌদ্ধ বিহারকে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এ দু’জন মহতোমহান মহাথেরোর অবদান চিরদিন শ্রদ্ধাভরে স্মরণযোগ্য।

শাক্যমুনি বৌদ্ধ বিহারটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্ধোধনের পর অগ্রজ ভদন্ত বিমলতিষ্য ভিক্ষু মহোদয়কে এ বিহারের অধ্যক্ষ পদে অধিষ্ঠিত করা হয়। তিনি ঢাকায় বসে ‘পার্বত্য বৌদ্ধ সংঘ’ পরিচালনা কাজের পাশাপাশি পার্বত্য চট্টল বৌদ্ধ অনাথ আশ্রম কার্যনির্বাহী পরিষদের সভাপতির ও রাঙ্গামাটিস্থ ‘মোনঘর’, ‘মোনঘর শিশু সদনে’র কার্যর্নিবাহী পরিষদের সভাপতির পদে অধিষ্ঠিত থেকে শিক্ষা বিস্তার ও আর্তমানবতার সেবায় ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দ হতে ১৯৮৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ জুন পর্যন্ত নিজেকে সম্পৃক্ত রাখার অবকাশ পেয়েছিলেন তিনি।

১৯৮৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ জুন মাইনী উপত্যকার দিঘীনালা উপজেলায় একটি উড়ো খবরের উপর নির্ভর করে আদিবাসী ও নতুন বসতি স্থাপনকারী বাঙ্গালীদের মধ্যে জীবন বিধ্বংসী প্রলংয়করী দাঙ্গা অনুষ্ঠিত হয়। এ দাঙ্গায় কোন প্রানহানী হয়েছিল কিনা জানা নেই। তবে নতুন বসতি স্থাপনকারী বাঙ্গালীরা মেরুং, বেতছড়ি, রত্মমোহন মেম্বারপাড়া, ভৈরপা প্রভৃতি ১০(দশ) টি আদিবাসী গ্রাম সম্পূর্ণ পুড়ে দিয়ে ধ্বংসস্তুপে পরিণত করে। রত্মমোহন মেম্বারপাড়ার সন্নিকটে অবস্থিত ‘পার্বত্য চট্টল বৌদ্ধ অনাথ আশ্রম’টি’ দাঙ্গাকারীদের কবল থেকে রেহাই পায়নি। তারা ‘অনাথাশ্রম আবাসিক উচ্চ বিদ্যালয়’টি বাদে তিনশত অনাথ শিশুর ৬টি আবাসিক হোস্টেল, ধর্মোদয় বৌদ্ধ মন্দির, ধর্মোদয় পালি কলেজ ভবন, পাকঘর, খাবারঘর, খাদ্যশষ্য খাবার ভাতঘর, মিনি হসপিতাল ভবন,  অনাথাশ্রম টেকনিক্যাল স্কুল ভবন, অনাথাশ্রম প্রাইমারী স্কুলটিতে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। দাঙ্গাকারী বাঙালীরা সেখান থেকে চলে গেলে সেদিনই মধ্যরাত্রে আশ্রমটি দেখাশোনার জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত ১২(বার) জন বৌদ্ধ ভিক্ষুর সাথে আশ্রিত ২৫০ (দু’শত পঞ্চাশ) জন অনাথ শিশু গহীন অরণ্যের পথ ধরে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের বর্ডারের অভিমুখে রওয়ানা দেয়। বান্দরবান পার্বত্য জেলা থেকে ঐ অনাথ আশ্রমে আশ্রিত ৫০(পঞ্চাশ) জন অনাথ শিশু, রাঙ্গামাটিস্থ ‘মোনঘর’ শিশুসদনে এসে আশ্রয় নেয়। পূর্বেই উল্লেখ করেছিলেন অগ্রজ ভদন্ত বিমল তিষ্য ভিক্ষু ‘পার্বত্য চট্টল বৌদ্ধ অনাথ আশ্রমে’র কার্যকরী পরিষদের সভাপতি ছিলেন আর আমি ছিলাম সাধারণ সম্পাদক। ২৫০ জন অনাথ, অসহায়, ছিন্নমূল ও হতদরিদ্র শিশু সম্পূর্ণ অভিভাবকহীন অবস্থায় কপর্দকহীন সংসারত্যাগী ভিক্ষুদের সাথে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে চলে যাওয়ায় অগ্রজ বিমল তিষ্য ভিক্ষুর মন ও মর্মযাতনা বাংলাদেশে সুস্থির থাকার অবকাশ দেয়নি। তিনি ১৯৮৬ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসের শেষের দিকে ‘পার্বত্য বৌদ্ধ সংঘ’ ও ‘শাক্যমনি বৌদ্ধ বিহার’কে আমার হাতে সমর্পন করে ভারতে পাড়ি জমালেন। এ দুঃখজনক দাঙ্গার দরুণ ২৫০ (দু’শত পঞ্চাশ)জন অনাথ শিশুর সাথে যে ১২(বারো)জন বৌদ্ধ ভিক্ষু ভারতে পাড়ি জমিয়েছিলেন তন্মধ্যে আমরা পঞ্চ পাণ্ডব হিসেবে অভিধাপ্রাপ্ত অন্যতম কর্মযোগৗ বৌদ্ধ ভিক্ষু ভদন্ত প্রিয়তিষ্য ভিক্ষুও ছিলেন। প্রিয়তিষ্য ভিক্ষু ভারতে আশ্রিত শরণার্থী জীবনের ভয়াবহ অবস্থা সহ্য করতে না পেরে রংবস্ত্র ত্যাগ করে গৃহী জীবনে ফিরে গিয়ে সজ্জন চাকমা নাম ধারণ করে এখনো গৃহী জীবন উপভোগ করে চলেছেন। এদিকে ‘পার্বত্য বৌদ্ধ অনাথ আশ্রমে’র আরেকজন একনিষ্ঠ কর্মযোগী ভদন্ত জিনপাল ভিক্ষুও গৃহী জীবনে ফিরে যাওয়ার অভিপ্রায়ে রংবস্ত্র ত্যাগ করেন। ‘পার্বত্য চট্টল বৌদ্ধ অনাথ আশ্রম’টি ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়ার পর শুধু অসহায় ছিন্নমূল ও হতদরিদ্র তিন শতাধিক শিশুর জীবনে নিদারুণ কালো অধ্যায় নেমে আসেনি বৌদ্ধ ভিক্ষুসংঘের মধ্যেও একটি দিশেহারা, কুল কিনারাহীন, আতঙ্কিত ও ভয়ের আবহ সৃষ্টি হয়েছিল যার ফলশ্রুতিতে বহু বৌদ্ধ ভিক্ষু রংবস্ত্র ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। সে সময়টিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের ‘পার্বত্য ভিক্ষু সংঘে’র ইতিহাসে একটি অভিশপ্ত জীবন বিধ্বংসী কালো অধ্যায় হিসেবে বিধৃত। ‘আমরা পঞ্চপাণ্ডব খ্যাত’ বৌদ্ধ ভিক্ষুদের মধ্য থেকে দু’জন এ দুঃখজনক ঘটনার পর রংবস্ত্র ত্যাগ করে গৃহী জীবনে ফিরে গেলেও বাকী অগ্রজ বিমল তিষ্য মহাথেরো, ভদন্ত প্রজ্ঞানন্দ মহাথেরো ও ভদন্ত শ্রদ্ধালংকার মহাথেরো এ তিনজন এখনো মুক্তবিহঙ্গ সদৃশ মহান ভিক্ষু জীবনে থাকার প্রচেষ্টায় সর্বতোভাবে নিরত রয়েছি।

১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দ থেকে আমি রাঙ্গামাটিস্থ মোনঘর, মোনঘর আবাসিক উচ্চ বিদ্যালয়, মোনঘর শিশুসদন, মোনঘর পালি কলেজ, সংস্কৃতি ও আদিবাসী ঐতিহ্য সংরক্ষণ সহায়ক অঙ্গ প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করে আত্মনিবেদিত হয়ে কার্যনির্বাহী পরিষদের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছিলাম। মোনঘর, পার্বত্য চট্টল বৌদ্ধ অনাথ আশ্রম, ও ঢাকার ‘পার্বত্য বৌদ্ধ সংঘ’ এ তিনটি সংগঠনে যা কিছু উন্নয়নমূলক কার্যক্রম হাতে নেয়া হতো তা পূর্বে উল্লেখিত পাঁচজন ভিক্ষুর উপস্থিতিতে বৈঠকে আলোচনা, পর্যালোচনা চুলছেড়া বিশ্লেষণ ও সমন্বিত সিদ্ধান্ত গ্রহন পূর্বক যথাযথ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নির্ধারণ করে বাস্তবায়িত হতো। এক্ষেত্রে আমরা শতভাগ গণতান্ত্রিক আদর্শ অনুসরণ করতাম। কিন্তু হঠাৎ করে অগ্রজ ভদন্ত বিমল তিষ্য ভিক্ষু ভারতে পাড়ি জমানোতে ‘মোনঘর’ ও ‘পার্বত্য বৌদ্ধ সংঘের’ যাবতীয় কাজ আমার কাঁধে বর্তায়। অগ্রজ চলে যাওয়ার অব্যবহিত পর থেকে প্রতি মাসের প্রথম ১৫ দিন ঢাকায় ও দ্বিতীয় ১৫ দিন রাঙ্গামাটিতে অবস্থান করে এ দু’টি সংগঠনের আরব্ধ কার্যাদি সুসম্পাদন করে যাওয়ার অঙ্গীকারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলাম। ১৯৮৭ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারী মাসের ১২ তারিখ ‘পার্বত্য বৌদ্ধ সংঘে’র একটি সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সভায় পার্বত্য বৌদ্ধ সংঘের ১১ সদস্য/সদস্যাবিশিষ্ট একটি কার্যনির্বাহী পরিষদ গঠিত হয়। আমাকে কার্যনির্বাহী পরিষদের সভাপতির পদে ব্রতী করা হয়। তার পাশাপাশি  শাক্যমুনি বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ পদেও আমাকে অধিষ্ঠিত করা হয়। তখন থেকেই আমি ‘পার্বত্য বৌদ্ধ সংঘে’র প্রতিটি ঘটনাপ্রবাহে আমার মেধা-মনন প্রয়োগপূর্বক অবদান রাখার চেষ্টায় সদাসর্বদা চেষ্টিত ছিলাম। অগ্রজ দু’দফায় দু’টি প্লট সদাশয় সরকার থেকে প্রচলিত সেলামির বিনিময়ে বরাদ্দ পেতে সক্ষম হয়েছিলেন। প্রথম দফায় ০.৭৭ বিঘা ও দ্বিতীয় দফায় ২৮০০ বর্গগজ। প্রথম দফায় বরাদ্দ প্রাপ্ত জমির দলিলে To built a Buddhist Monastery দ্বিতীয় দফায় বরাদ্দ প্রাপ্ত জমির দলিলে Institutional plot লেখা রয়েছে। প্রথম দফায় বরাদ্দ প্রাপ্ত ০.৭৭ বিঘার সেলামী আনুমানিক ৪,০০,০০০/=(চারলক্ষ) টাকা সদাশয় সরকারের কোষাগারে জমা দেয়া সম্ভব হলেও দ্বিতীয় দফায় বরাদ্দ প্রাপ্ত ২৮০০ বর্গগজের জমির সেলামী ১৫,১২,০০০ (পনের লক্ষ বার হাজার) টাকা সরকারী কোষাগারে জমা দিয়ে জমির দখলপত্র তাঁর অবস্থানকালীন নেয়া সম্ভব হয়নি অগ্রজের দ্বারা।

১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দ। এ দীর্ঘ আট বছরের ক্লান্তিহীন পরিশ্রমে অগ্রজের দ্বারা শাক্যমুনি বৌদ্ধ বিহারের একটি স্বল্প পরিসর অস্থায়ী কাঠামো দাঁড় করানো সম্ভব হলেও চারিদিকে সীমানা প্রাচীর না থাকায় প্রত্যেকদিন স্থানীয় যুবকদের নানাবিধ খেলাধুলার আসর বসতো মন্দিরের মাঠে। শাক্যমুনি বৌদ্ধ বিহারের ঢেউটিনের ছাউনীতে ফুটবল, ক্রিকেট ও ভলিবলের নিপতিত হওয়ার অত্যাচার সদাসর্বদা লেগেই থাকতো। এর থেকে মুক্তির জন্যে আমি ‘মোনঘরে’র উন্নয়ন তহবিল থেকে ২,৮০,০০০/=(দু’লক্ষ আশি হাজার) টাকা ব্যয়ে চারিদিকে সীমানা প্রাচীর নির্মাণপূর্বক অনাকাঙ্খিত অত্যাচারমুক্ত করলাম। উল্লেখ্য, ‘পার্বত্য বৌদ্ধ সংঘে’র নামে মন্দির নির্মাণের জন্য প্রথম দফায় বরাদ্দপ্রাপ্ত জমির মেলামী পরিশোধের জন্যও ‘মোনঘর’ উন্নয়ন তহবিল থেকে ১,৫০,০০০/=(একলক্ষ পঞ্চাশ হাজার) টাকা ‘পাবত্য বৌদ্ধ সংঘ’কে ধার হিসেবে দিয়েছিল। অগ্রজ তাঁর লেখনীতে তা উল্লেখ করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন। দ্বিতীয় দফায় ‘পার্বত্য বৌদ্ধ সংঘে’র নামে Institutional Plot হিসেবে বরাদ্দ প্রদত্ত Plot টি বাংলাদেশ সরকারের তদানীন্তন মহামান্য রাষ্ট্রপতি হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদ সরকারের অন্তরঙ্গ বদান্যতায় প্রাপ্ত। পূর্বেই উল্লেখ করেছিলাম এ প্লটটির পরিমাণ ২৮০০ বর্গগজ। আরোপিত সেলামীর পরিমাণ একসঙ্গে পরিশোধ করা সম্ভব হলে সর্বসাকুল্যে ১৫,১২,০০০/=(পনের লক্ষ বারো হাজার) টাকা। চারটি কিস্তিতে পরিশোধ করলে পরিশোধযোগ্য টাকার অংক দাঁড়ায় ১৮,০০,০০০/- (আটারো লক্ষ) টাকার কাছাকাছি। আমি ০৭/০১/১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দে ২৮০০ বর্গগজের বিপরীতে সদাশয় সরকার কর্তৃক আরোপিত প্রচলিত সমুদয় সেলামী ১৫,১২,০০০/=(পনের লক্ষ বারো হাজার) টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকে পরিশোধকরণ পূর্বক চুক্তি নামার দলিলে ৩,৭৩,০০০/=(তিন লক্ষ সাতাত্তর হাজার) টাকা মূল্যমানের স্ট্যাম্প সংযুক্ত করে এক মাসের মধ্যে ৯৯(নিরানব্বই) বছরের লিজ বা ইজারা চুক্তি সুসম্পন্ন করতে সক্ষম হই। সেদিন ‘মোনঘর’ এর উন্নয়ন তহবিল থেকে ‘পার্বত্য বৌদ্ধ সংঘে’র এই ইজারা চুক্তি সম্পাদনের যাবতীয় কাজ সুসম্পন্ন করার জন্যে সর্বমোট ২০,০০,০০০/= (কুড়ি লক্ষ) টাকা ধার হিসেবে গ্রহণ করেছিলাম যা অদ্যাবধি সেই ধারকৃত টাকা মোনঘরকে ফেরত দেয়া সম্ভব হয়নি। ৯৯ (নিরানব্বই) বছরের লিজ বা ইজারা চুক্তি সম্পাদন কাজ সুসম্পন্ন হওয়ার পর ‘বনফুল চিলড্রেন্স হোমস’ এর অবকাঠামো নির্মাণ কার্যক্রম আমি শুরু করতে সক্ষম হই। অবকাঠামোর নক্সাকার ছিলেন Mr. Bruno Lam Quang আর নির্মাণ কাজের ঠিকাদার ছিলেন প্রখ্যাত ইঞ্জিনিয়ার ‘শাহ এসোসিয়েটর’এর কর্মধর এস. এম শহীদুল্লাহ মহোদয়। ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দের ১৯ ফেব্রুয়ারী ৩২ জন অনাথ, অসহায়, ছিন্নমূল ও হতদরিদ্র আদিবাসী বালক ও ৩২ জন বালিকাকে নিয়ে ‘বনফুল চিলড্রেন্স হোমস’ এর কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। এ বনফুল কমপ্লেক্স এর নির্মাণ কাজ ১৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত চলে।

‘মোনঘর ও উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়নে’ ‘বনফুল চিলড্রেন্স হোমস’ এর নির্মাণ কাজসহ পর্যায়ক্রমে দফায় দফায় আশ্রিত ২০৮ জন বালক বালিকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আবাসন খরচ নির্বাহ করা সম্ভব হলেও মান সম্মতভাবে ‘শাক্যমুনি বৌদ্ধ বিহার’টি নির্মাণ করা আমার দ্বারা সম্ভব হয়নি। আর্তমানবতার সেবায় উন্নয়ন সহযোগীরা যতটুকু অবদান রাখতে বদ্ধপরিকর ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নির্মাণের ক্ষেত্রে কোথাও কোন ধরণের অবদান রাখতে তাঁরা পরাঙ্মুখ। ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দের কোন এক পুণ্যময় দিনে আমার সাথে ‘বনফুল আদিবাসী গ্রীনহার্ট কলেজ’ কার্যালয়ে বাংলাদেশের প্রখ্যাত ভাস্কর্য শিল্পী মৃনাল হক মহোদয়ের একান্ত সাক্ষাত হয়। এ সাক্ষাৎকারটি সংগঠিত করেছিলেন এ কলেজেরই দু’জন আদিবাসী শিক্ষিকা লক্ষ্মীদেবী চাকমা ও রেলি চাকমা। শাক্যমুনি বৌদ্ধ বিহারের সম্মুখে একটি সুদৃশ্য ও সুউচ্চ দাঁড়ানো বুদ্ধমূর্তি নির্মাণ করার স্বপ্ন বহু যুগ আগ থেকে আমার দ্বারা সযত্নে লালন করে আসার ব্যাপারটি মৃনাল হক মহোদয়কে অবহিত করাতে তিনি স্বহস্তে স্বউদ্যোগে ও বিনা পারিশ্রমিকে ৩৫(পয়ঁত্রিশ) ফুট উচ্চতাসম্পন্ন একটি দাঁড়ানো বুদ্ধ প্রতিমূর্তি নির্মাণ করে দেওয়ার সদয় সম্মতি প্রদান করে গোটা পার্বত্য আদিবাসী জনগোষ্ঠিকে চিরকৃতার্থ করার পরাকাষ্টা প্রদর্শন করেন। ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দের ৬ নভেম্বর শাক্যমুনি বৌদ্ধ বিহারে দানোত্তম কঠিন চীবর দানানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। দানানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হওয়ার দু’দিন আগে অর্থাৎ ০৪/১১/২০১৫ খ্রিষ্টাব্দ বুধবার শাক্যমুনি বৌদ্ধ বিহারের বর্তমান অনিন্দ্যসুন্দর দাঁড়ানো বুদ্ধ প্রতিমূর্তিটি মৃনাল হক মহোদয় দাঁড় করানোর কাজটি সুসম্পন্ন করেন। আমরা পার্বত্য চট্টগ্রামের বৌদ্ধ ভিক্ষুসংঘ ও পার্বত্য আদিবাসী বৌদ্ধ জনগোষ্ঠির তাবৎ জনগণ পরমশ্রদ্ধাভরে, বুদ্ধের অহিংসা ও মৈত্রীর বাতাবরণে বিশ্বখ্যাত ভাস্কর্য মৃনাল হক মহোদয়ের দীর্ঘ সুস্বাস্থ্য কামনা করি। তাঁর মহোত্তম প্রতিটি কাজের সাথে উদার মানবিকতা, অসাম্প্রদায়িক চিন্তা চেতনার কালজয়ী ‘সৃষ্টি সুখের উল্লাস’, সঞ্জাত অনুরণন সদাসর্বদা বিম্বিত হোক। মানব পুত্র বুদ্ধের কাছে, তাঁর পুণ্যপুত অহিংসামন্ত্রে আকীর্ণ ধর্ম-দশর্নের কাছে, পরম ¯স্নেহসিক্ত বন্ধু মৃনাল হক মহোদয় তাঁর মহতোমহান শিল্পী সত্ত্বা নিয়ে অনন্তকাল বেঁচে থাকুন। এরূপ পবিত্র আশাবাদ ব্যক্ত করি।

________________________________________________________________________________

লেখক: শ্রীমৎ প্রজ্ঞানন্দ মহাথের, প্রধান অধ্যক্ষ, রাঙ্গামাটি আনন্দ বিহার, তবলছড়ি, রাঙ্গামাটি পার্বত্য জিলা। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় হতে ১৯৭৭ সালে বাংলা সাহিত্য বি.এ (অনার্স) সহ এম. এ ডিগ্রী লাভ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে ১৯৮০ সালে পালি সাহিত্যেও এম.এ. ডিগ্রী লাভ করেন। ১৯৫২ সালে বর্তমান খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার দীঘিনালা উপজেলার বাবু ছড়া গ্রামে এক চাকমা পরিবারে তাঁর জন্ম।

১৯৬৫ সালে তৎকালীন বোয়ালখালি দশবল বৌদ্ধ রাজ বিহারের অধ্যক্ষ পার্বত্য চট্টল বৌদ্ধ আশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা সদ্ধর্মাদিত্য উপসংঘরাজ জ্ঞানশ্রী মহাথেরোর নিকট শ্রামন্যধর্মে দীক্ষিত হন। ১৯৬৮ সালে এস.এস.সি পাশের পর বৌদ্ধ পূর্ণিমাতে অষ্টমী তিথিতে একই গুরুর উপাধ্যায়াত্বে ২৬ জন প্রথিতযশা মহাথেরগণের উপস্থিতিতে উপসম্পাদা গ্রহণ করেন। ১৯৭৪ সালে মোনঘরের সাধারণ সম্পাদকের পদক লাভ করেন। ১৯৭৮ সালে এম.এ পাশের পর তিনি আনন্দ বিহার, তবলছড়ি,রাঙ্গামাটিতে উপ-অধ্যক্ষ হিসেবে আগমণ করেন এবং উ-জবনাতিষ্য মহাথেরর মহাপ্রয়াণের পর আনন্দ বিহারের অধ্যক্ষ পদে অভিষিক্ত হন। ২০০৪ সালে ঢাকার মিরপুরে আদিবাসী গ্রিনহার্ট স্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন এবং অদ্যাবদি এ প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বাংলাদেশ সংস্কৃত ও পালি শিক্ষা বোর্ডের অন্যতম সদস্য হিসেবে দায়িত্বরত আছেন। তিনি একজন সু-বক্তা  এবং বিশিষ্ট ধর্মীয় গুরু হিসেবে সমধিক পরিচিতি লাভ করছেন। পার্বত্য বৌদ্ধ সংঘ ও অত্তদীপ ফাউন্ডেশন-এর প্রতিনিধি হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ পরিভ্রমণ করেছেন। তিনি বিভিন্ন ধর্মীয়, সামাজিক ও শিক্ষা সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে কাজ করে যাচ্ছেন।


লেখকঃ ভেন. প্রজ্ঞানন্দ মহাথেরো

মুল লেখাটি এই লিঙ্ক থেকে নেওয়া হয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here