icon

লোমহর্ষক শিক্ষকতা ও অপতথ্যের কারবার

Jumjournal

Published on Dec 4th, 2017 icon 423

যদি বলা হয়, শিক্ষকদের প্রধান কাজ হচ্ছে শিক্ষার্থীদের মানসলোকে জ্ঞানের আলো জ্বালানো, তাহলে এতে তেমন কারো দ্বিমত থাকার কথা নয়। (উত্তর-আধুনিকতাবাদীদের কথা অবশ্য ভিন্ন, কারণ তাদের দৃষ্টিতে কি ধরনের জ্ঞানের চর্চা হচ্ছে এবং সেটার সাথে ক্ষমতার সম্পর্ক কি, এই প্রশ্ন এড়িয়ে ‘জ্ঞানের আলো’ ছড়ানো নিয়ে কথা বলার দিন শেষ, কিন্তু সে প্রসঙ্গ আমাদের জন্য আপাতত বিবেচ্য নয়।) অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের অন্তরে আবেগিক উত্তাপ ছড়ানো শিক্ষকদের কাজ কিনা, এ প্রশ্নে ভালই মতভেদ দেখা দিতে পারে। যেমন, ধরা যাক বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে কোনো অধ্যাপকের বক্তৃতা শুনে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিশেষ কোনো মহলের প্রতি এমনই ক্ষোভ ও ঘৃণা ছড়িয়ে পড়ল যে, তাদের কেউ বলে উঠল, তাদের আর তর সইছে না – তাদের গায়ের লোম খাড়া হয়ে যাচ্ছে – তারা বেরিয়ে পড়তে চায় দুষ্টদের দমনে, ‘জ্বালো, জ্বালো’ স্লোগান দিতে দিতে, তাহলে আপনি কি বলবেন?

প্রশ্নটা আমি রাখছি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. খুরশীদা বেগমের একটা নিবন্ধে প্রকাশিত কিছু অভিমতের প্রেক্ষিতে (বি. দ্র. বর্তমান প্রতিক্রিয়াটি আসলে তিন বছর আগেকার একটি অপ্রকাশিত লেখা, যা এত দেরিতে এখন প্রকাশের বিশদ ব্যাখ্যা রয়েছে প্রথম টীকায়)।[1] ‘বাংলাদেশে তথাকথিত ‘আদিবাসী’ প্রচারণা: রাষ্ট্রীয় স্বার্থ প্রশ্নসাপেক্ষ’ শিরোনামের আলোচ্য নিবন্ধটি দৈনিক কালের কন্ঠে প্রকাশিত হয়েছিল তিন কিস্তিতে, ২০১৩ সালের জুলাই ২৮, ২৯ ও ৩০ তারিখে। এটির কথা আমি উল্লেখ করেছি আমার লেখা অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের কাছে খোলা চিঠি-তে, যেখানে এ কথা বলেছি যে, নিবন্ধটা প্রথম হাতে পাওয়ার পর তা কিছুদূর পড়েই সরিয়ে রেখেছিলাম। কারণ, সেই নিবন্ধে লেখকের যে আবেগ ও স্বর ফুটে উঠেছিল, তার প্রতিক্রিয়ায় পাঠক হিসাবে নিজের মধ্যেও জোরালো বিপরীত আবেগ লক্ষ্য করেছিলাম। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের কাছে লেখা চিঠিতে নমুনা হিসাবে অধ্যাপক খুরশীদা বেগমের নিবন্ধ থেকে যেসব উদ্ধৃতি দিয়েছি, সেগুলোর দু’টি দেখে নেওয়া যাক।

[নমুনা ১] আদিকালের মানুষের মতো আজকের পৃথিবীতে উলঙ্গ বা নরমুণ্ডু শিকারি, বা কাঁচা মাছ-মাংসভুক নরগোষ্ঠী অপসৃয়মাণ। আজ বিশ্বায়নের তোড়ে … ছোট নৃগোষ্ঠীগুলোর গোত্রজ সীমানা আপনি সংকুচিত হচ্ছে। বাংলাদেশের … প্রায় অর্ধশত নৃগোষ্ঠীর জন্যও এ কথা প্রযোজ্য। তাদের ছেলেদের পরনে লেংটির পরিবর্তে ইউরোপীয় প্যান্ট-শার্টমেয়েদের মধ্যে ক্রমবিস্তৃত শাড়ি-সালোয়ার-কামিজ, ঘরের আসবাব, প্রয়োজন অনুযায়ী গোত্রবহির্ভূত ভাষা শিক্ষা, … নন্দনকলায় আকাশ সংস্কৃতির প্রভাব ইত্যাদি গোত্রজ সীমানা সংকোচনের দৃষ্টান্ত।  [২৯/৭/১৩ তারিখে প্রকাশিত ২য় কিস্তি থেকে]

Kangaroo hunt
আদিম গোত্রজ নৃগোষ্ঠীরা এখন এই ছবির মত  দশায় নেই (ইন্টারনেট থেকে নেওয়া ছবি), ছবি: লেখক

[নমুনা ২] পার্বত্য চট্টগ্রামকেন্দ্রিক দাবিদাওয়া প্রশ্নে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষাবিদরা যখন দেশের জন্য উত্তেজিত হয়ে ওঠেন, যখন নানারূপ তথ্য-উপাত্ত হাতে শ্রেণীকক্ষে উত্তেজিত এমএস পর্বের শিক্ষার্থী বলেন যে, ‘…দেশের এক ইঞ্চি মাটি দেব না।’ যখন অন্য একজন শিক্ষার্থী সাংবাদিক বলেন, ‘ঘেন্না (ঘৃণা) করি বিদেশি টাকানির্ভর বুদ্ধিজীবী ও অপরিণামদর্শী রাজনীতিকগণকে, যাঁরা দেশের ও মানুষের স্বার্থ নিয়ে খেলা করেন’ অথবা গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যাচ্ছে বলে ওঠে দাঁড়ায় কেউ, তখন অনুমান করা যায়, বিষয়টি জনগণের কাছে পরিষ্কার হলে কী ধরনের চাপ সৃষ্টি হতে পারে। [৩০/৯/১৩ তারিখে প্রকাশিত ৩য় কিস্তি থেকে]

অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের কাছে লেখা খোলা চিঠিতে উপরের উদ্ধৃতিগুলি তুলে দেওয়ার পর এ নিয়ে আলাদা করে বিশেষ কিছু মন্তব্য করি নি। কিন্তু এখানে দু’একটা কথা যোগ করতে চাই। প্রথমত প্রথম উদ্ধৃতিতে প্রমাণ মেলে, লেখক ‘ছোট নৃগোষ্ঠী’দের ‘আদিবাসী’ হিসেবে মেনে না নিলেও তাঁদেরকে ঠিকই ‘আদিম’ মনে করেন, যদিও একটু কষ্ট করে বাজারে প্রচলিত যে কোনো বাংলা অভিধান খুলে দেখলে দেখতেন সেখানে কিন্তু ‘আদিবাসী’ এবং ‘আদিম’কে সমার্থকই ধরে নেওয়া হয়েছে। যেমন, ডক্টর সৈয়দ আনোয়ার হোসেন মহাপরিচালক থাকা অবস্থায় ২০১০ সালে পরিমার্জিত সংস্করণ হিসেবে ‘বাংলা একাডেমী’ প্রকাশিত ‘ব্যবহারিক বাংলা অভিধান’-এ শব্দটির অর্থ দেখানো হয়েছে ‘আদিম জাতি বা অধিবাসী’। (উল্লেখ্য, আদিম অর্থে আদিবাসী শব্দের বহুল প্রয়োগের বিষয়টি আমি উল্লেখ করেছিলাম ১৯৯৩ সালে লেখা আমার আন্তর্জাতিক আদিবাসী বর্ষ ও বাংলাদেশের আদিবাসী জনগণ শিরোনামের নিবন্ধে।)

দ্বিতীয়ত, প্রেক্ষাপট থেকে বোঝা যায় যে, ‘আদিবাসী প্রচারণা’ সম্পর্কে অধ্যাপক খুরশীদা বেগম তাঁর নিবন্ধে যে ধরনের কথা বলেছেন, ‘রাষ্ট্রের স্বার্থ’ নিয়ে যে ভাষায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, সে ধরনের বক্তব্য শুনেই নিশ্চয় তাঁর শিক্ষার্থীরা উত্তেজিত হয়ে উঠতেন। এখন, কেউ একথা বলতে পারেন যে, দেশ ও জাতির জন্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ জাগ্রত করাতো একটা মহৎ কাজ। কিন্তু প্রেক্ষিত যদি হয় আদিবাসী হিসাবে পরিচিত হতে চায় এমন মানুষেরা, এবং যদি তাদের সম্পর্কে এ ধারণাই শিক্ষার্থীদের মাথায় ঢোকানো হয় যে, তারা (বা তাদের কিছু ‘সুবিধাভোগী’ অংশ) বেশি বাড়াবাড়ি করছে, তাদেরকে আর প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না, তাহলে? উপরের দ্বিতীয় উদ্ধৃতির শেষাংশটা একটু ভাল করে লক্ষ্য করুন। এটা কি আসলে একটা প্রচ্ছন্ন হুমকি নয়? এ ধরনের হুমকি নিবন্ধের অন্যত্র আরো সরাসরিভাবেই রয়েছে। যেমন, প্রথম কিস্তি থেকে নেওয়া নিচের উদ্ধৃতিটা দেখুন:

দু-একজন করে বাঙালি প্রশ্ন করতে শুরু করেছে, বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাসহ অন্যান্য অঞ্চলে পার্বত্য চট্টগ্রামের ছোট নৃগোষ্ঠীদের জমি ক্রয়-বিক্রয় ও বাসা-ফ্ল্যাটে বসতি, রাষ্ট্রের প্রশাসনে চাকরি ইত্যাদির আগ্রহ ও অধিকার নিয়ে। বাঙালির এই উষ্মার দু-একটি ফুলকি ভবিষ্যতে যদি দাবানলের মতো কোটি কোটিতে ছড়ায় তার দাহ কি ছোট ছোট নৃগোষ্ঠীভুক্ত নাগরিকরা সহ্য করতে পারবে?

উনিশশত সত্তরের দশকের শেষ দিক থেকে শুরু করে আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে কয়েক লক্ষ বাঙালিকে নিয়ে বসানো, এবং তাদের পাশাপাশি সেনাবাহিনীর মাধ্যমে সেখানে দমন-নীতি কায়েম করার কথা অধ্যাপক খুরশীদা বেগম জানেন বা মানেন কিনা, এবং এসব ইতিহাস তাঁর শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরেছেন কিনা, সেসব বিষয় অবশ্য আমরা জানতে পারি না। আর মনে একটা প্রশ্ন থেকে যায়, যে ‘ছোট নৃগোষ্ঠী’দের মিলিত জনসংখ্যা মাত্র আট লাখের মত হবে (পার্বত্য চট্টগ্রামে), তাদের পোড়ানোর জন্য কোটি কোটি বাঙালির উষ্মার দাবানালের কোন প্রয়োজন আছে কি? পার্বত্য চট্টগ্রাম কি যথেষ্ট পোড়ে নি গত তিন-চার দশকে, বা এখনো পুড়ে চলছে না (যেভাবে খুব সম্প্রতি [২০১৩ সালের আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে] তাইন্দং পুড়ল)?

‘ছোট’দের বিরুদ্ধে ‘বড়’দের রোষানল ধাবিত হতে পারে, এমন প্রচ্ছন্ন হুমকির পাশাপাশি ড. খুরশীদা বেগমের বক্তব্যের আরেকটা বিষয় বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। তা হল, তাঁর পরিবেশিত যে ধরনের তথ্য ও বিশ্লেষণ শুনে তাঁর শিক্ষার্থীরা উত্তেজিত হতেন, সেসব যে খুব বস্তুনিষ্ঠ ছিল, তা মনে হয় না। যেমন, তাঁর যে নিবন্ধ নিয়ে আমরা আলোচনা করছি, সেটির ৩য় কিস্তির এক জায়গায় তিনি বলছেন,

‘আদিবাসী’ পদ প্রসঙ্গে পুনরায় উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশের জন্মের পরপরই পার্বত্য সহিংস সশস্ত্র তৎপরতা শুরু হলেও আগু-পিছু ২০০৮-০৯ থেকে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অপ্রযোজ্য আদিবাসী শব্দের আশ্রয়ে এখন সব ‘অস্বাভাবিক’ দাবি-দাওয়া বৈধতা লাভের প্রয়াসে নূতন মাত্রা পেয়েছে। এ দেশে ভিত্তিহীন আদিবাসী এই পদপ্রবঞ্চনায় দ্রুত প্রভাবিত হচ্ছে সারা বাংলাদেশের অন্যান্য ছোট নৃগোষ্ঠীগুলো, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ‘ethnic conflict’ এর অহিতকর ভবিষ্যৎ নির্দেশ করছে।

উপরের উদ্ধৃতিতে দেওয়া বক্তব্য বুঝতে যদি আমাদের ভুল না হয়ে থাকে, এখানে যে সময়কাল থেকে বাংলাদেশে ‘আদিবাসী প্রচারণা’ শুরু হয়েছে বলে বলা হচ্ছে, তা হল, ২০০৮-০৯ সালের দিকে বা কিছু আগে পরে। প্রকৃতপক্ষে, বাংলাদেশে সমকালীন অর্থে ‘আদিবাসী’ পরিচয় প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা শুরু হয়েছিল কম করে হলেও ১৯৯৩ সালে, জাতিসংঘ-ঘোষিত আন্তর্জাতিক বিশ্ব আদিবাসী বর্ষ উদ্‌যাপনের মধ্য দিয়ে (পূর্বোল্লিখিত আমার আন্তর্জাতিক আদিবাসী বর্ষ ও বাংলাদেশের আদিবাসী জনগণ শিরোনামের নিবন্ধ দ্রষ্টব্য)। ড. খুরশীদা বেগমের নিবন্ধ থেকে এমন আরো অনেক উদ্ধৃতি তুলে ধরা যায়, যেগুলোতে তথ্যগত বিভ্রাট, ব্যাখ্যার সমস্যা বা একদেশদর্শিতার প্রমাণ রয়েছে। তবে সেসব বিস্তারিত তুলে ধরার তেমন প্রয়োজন দেখছি না। তাছাড়া আমি তা করতে গেলে সেটা গর্হিত কাজ হিসাবে গণ্য হতে পারে। অধ্যাপক খুরশীদা বেগম যে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন, একসময় আমি নিজেও সেখানে পড়াতাম। তবে বয়সে, পদবীতে, শিক্ষাগত যোগ্যতায় – সবদিক থেকেই তিনি আমার উপরে রয়েছেন। তদুপরি আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে তাঁর বা তাঁর মত রাষ্ট্রপক্ষের ওকালতি করা অধ্যাপকদের কথার একটা ওজন আছে। সে তুলনায় আমার মত ‘ক্ষুদ্র’ (একাধিক অর্থে) এক ব্যক্তির কথা কে শুনবে, কেন শুনবে?

উপরের প্রশ্নটা ওঠানোর আরেকটা কারণ হল, ঘটনাক্রমে আমি নিজেও ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ বর্গে পড়ি, যাদের চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গী, দেশপ্রেম – সবকিছুর প্রতি সন্দেহের চোখে তাকানোকে স্বাভাবিক ব্যাপার হিসেবেই ধরে নেওয়া হয়। অন্তত অধ্যাপক খুরশীদা বেগমের নিজের দৃষ্টিভঙ্গী সেরকম বলেই মনে হয়। যেমন, পাহাড়ি নেতৃবৃন্দকে নিয়ে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে যে ধরনের কথাবার্তা থাকে বলে শোনা যায়, তাঁর নিবন্ধেও রয়েছে সেগুলিরই সরাসরি প্রতিধ্বনি। একটা উদাহরণ দিচ্ছি – নিবন্ধের ১ম কিস্তিতে এক জায়গায় তিনি লিখছেন – ‘অতি বিস্ময়কর ও সন্দেহ উদ্রেককর তথ্য এই যে পার্বত্য চট্টগ্রামে ছোট নৃগোষ্ঠীর নেতৃত্বের সঙ্গে বিদেশি কূটনীতিকদের আলোচনার মধ্যে বিদেশিরা বাঙালি সরকারি অফিসারকে থাকতে দেয় না।’ কি সাংঘাতিক কথা! ছোট নৃগোষ্ঠীর কোন্‌ ধরনের প্রতিনিধিদের সাথে কোন্‌ প্রেক্ষিতে কি ধরনের বিদেশি কূটনীতিকদের মধ্যে আলোচনার কথা হচ্ছে, সেখানে যে বাঙালি অফিসারদের থাকার কথা, তারা কারা এবং কেনইবা তাদের থাকা না থাকার প্রশ্ন আসছে, এসব ব্যাপারে অবশ্য কোন ব্যাখ্যা নিবন্ধে নেই। তবে উদ্ধৃত বক্তব্যের পেছনে যে অনুমানটা অনুক্ত রয়ে গেছে, তা বুঝতে অসুবিধা হয় না: ‘ছোট নৃগোষ্ঠীর’ লোকদের বিশ্বাস করা যায় না, কারণ তারা বাঙালি নয়। এটা বাঙালির দেশ। এ দেশের কোনো প্রতিষ্ঠান, অঞ্চল বা গোষ্ঠীকে বাঙালি ছাড়া, বা বাঙালির অনুপস্থিতিতে, ‘ছোট নৃগোষ্ঠী’র কেউ প্রতিনিধিত্ব করবে, তা ভাবা যায়?

আজ থেকে বিশ বছর আগে, ১৯৯৩ সালে, জাতিসংঘ-ঘোষিত ‘আন্তর্জাতিক বিশ্ব আদিবাসী বর্ষ’ উদ্‌যাপন উপলক্ষে যখন ঢাকায় একটা সেমিনার আয়োজিত হয়, তখন আমার উপর দায়িত্ব পড়েছিল সেই অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করার (যেটির শিরোনাম উপরে দু’বার উল্লিখিত হয়েছে)। অনুষ্ঠানটির যুগ্ম আহবায়ক হিসাবে তখন দায়িত্ব পালন করেছিলেন তৎকালীন বিরোধী দলীয় দুইজন সাংসদ, যাঁরা উভয়েই [প্রমোদ মানকিন ও দীপংকর তালুকদার] বর্তমান সরকারে রয়েছেন প্রতিমন্ত্রী পদে [২০১৩ সালের কথা]। সেই অনুষ্ঠান উপলক্ষে আদিবাসীদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে বাণী পাঠিয়েছিলেন তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা, যিনি বর্তমানে সরকার প্রধান পদে রয়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই, এই সরকার ক্ষমতায় আসার সময়, ‘আদিবাসী’ পরিচয়ের সাংবিধানিক স্বীকৃতি পাওয়া যাবে, এ আশায় দ্বিতীয়বারের মত বুক বেঁধেছিলেন এদেশের আদিবাসী জনগণ বা আদিবাসী পরিচয়ের প্রবক্তারা। কিন্তু হঠাৎ করে কি যেন হয়ে গেল, ২০১০ সালের দিকে এসে রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে নূতন করে ফিসফাস শুরু হল, ‘আদিবাসী’ পরিচয়ের দাবী নাকি দেশের জন্য একটা বড় হুমকি! তারপর ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীতে বহুল-প্রত্যাশিত (এবং প্রতিশ্রুত) ‘আদিবাসী’ পদের বদলে বরাদ্দ করা হল ‘উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়’, যেগুলো নিয়ে অনেক কথা হয়েছে, এখনো হচ্ছে। আমি নিজেও এ নিয়ে বেশ কথা বলেছি, বা বলে চলছি কেউ শুনুক বা না শুনুক।[2] কিন্তু অধ্যাপক খুরশীদা বেগমের নিবন্ধ পড়ে প্রশ্ন জাগছে, ‘আদিবাসী প্রচারণা’য় অংশ নিয়ে আমিও কি তাহলে এতদিন রাষ্ট্রবিরোধী কাজ করেছি? আর তাঁর নিবন্ধ নিয়ে প্রশ্ন তোলার জন্য ক্ষমতাসীনদের, তিনি সমালোচনার উর্ধে রেখেছেন এমন কোনো প্রতাপশালী প্রতিষ্ঠানের, বা ‘কোটি কোটি জনতা’র, রোষানলে পড়বনাতো? ভাবতে গিয়ে ভয়ে আমার গায়ের লোম খাড়া হয়ে যাচ্ছে! [তিন বছর আগে লেখা এই শেষ বাক্যটি ছিল পরিহাসমূলক বা বিদ্রূপাত্মক, কিন্তু অধ্যাপক খুরশীদা বেগমের অব্যাহত আদিবাসী-বিরোধী অপপ্রচার এবং এটির পেছনে রাষ্ট্রযন্ত্রে ঘাপটি মেরে বসে থাকা বিভিন্ন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সম্ভাব্য সমর্থনের প্রেক্ষাপটে আমি জোর গলায় যোগ করতে চাই, আমি সত্যিকার অর্থে ভীত নই। আমি জানি, এদের কারো চেয়ে আমি কোনো অংশে কম ভাবি না দেশ ও দশের মঙ্গল নিয়ে। কেউ যদি মনে করেন ‘আদিবাসী’ ধারণার পক্ষে লেখালেখি করার পেছনে আমার রাষ্ট্রবিরোধী মতলব ছিল বা আছে, তবে আমি তাদের আহবান জানাব এ ব্যাপারে যথাযথ প্রমাণ নিয়ে হাজির হতে। কেউ আমার বিরুদ্ধে অন্ধকারে আঘাত করলে আমি তা প্রতিহত করতে পারব না, কিন্তু যে কোনো উন্মুক্ত পরিসরে যে কাউকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে মোকাবেলা  করার ব্যাপারে আমি প্রস্তুত রয়েছি।]

টীকা

[1] এই লেখাটি প্রথমে ‘লোমহর্ষক শিক্ষকতা প্রসঙ্গে দুটি কথা’ শিরোনামে তৈরি করেছিলাম ২০১৩ সালের নভেম্বর ৫ নাগাদ, ফেসবুকে বা ব্যক্তিগত ব্লগে দেব ভেবে। কিন্তু এটিকে উল্লিখিত অধ্যাপকের প্রতি ব্যক্তিগত আক্রমণের জন্য লেখা বলে অনেকে ভুল বুঝতে পারেন ভেবে আর প্রকাশ করি নি সে যাত্রা। উল্লেখ্য, অধ্যাপক খুরশীদা বেগমের সাথে আমার আলাপ পরিচয় ছিল যখন আমিও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতাম (১৯৯১-২০০১)। তখন তাঁর সাথে কোনো বিষয়ে কখনো বিতর্ক বা বিতন্ডায় জড়িয়ে পড়ার কোনো অভিজ্ঞতা আমার হয় নি, বরং সামান্য যেটুকু কথাবার্তা হত, তা সবসময় সৌজন্যপূর্ণ ছিল উভয়পক্ষেই। তবে তাঁর যে ধরনের দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে এখানে আলোচনা করতে বসেছি, তা নিয়ে আগে আমার কোনো ধারণাই ছিল না। এদিকে অতি সম্প্রতি তাঁর  লেখা (আগস্ট ২০১৫-এর একটি তারিখ সম্বলিত) এমন একটি  নিবন্ধ বিভিন্নজনের হাত ঘুরে আমার কাছে এসেছে, যা অপ্রচলিত  বা অস্পষ্ট বিভিন্ন শব্দ ও বাক্যে সাজানো কিছু জানা বিষয়ের পাশাপাশি নানান অসত্য বা অর্ধসত্য তথ্য, বহু ভ্রান্ত ধারণা এবং ততোধিক আপত্তিকর মন্তব্যে ঠাঁসা। লেখটি কোথাও প্রকাশিত হয়েছে কিনা, হলে কোথায়, তা আমার জানা হয় ওঠে নি এখনো [১১/৯/১৫ নাগাদ], তাই নির্দিষ্ট কোনো সূত্র এখানে দেওয়া গেল না। তবে লেখাটিতে এক নজর চোখ বুলানোর পরই বুঝলাম, বর্তমানে তথ্য কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনরত অধ্যাপিকা ড. খুরশীদা বেগম সাঈদ ‘আদিবাসী’ শব্দটির প্রতি তাঁর আপত্তি প্রকাশের ক্ষেত্রে আগের মতই উচ্চকন্ঠ রয়ে গিয়েছেন (আমার হাতে আসা তাঁর লেখায় দেখা যায় তাঁর পূর্ণ নামে ‘সাঈদ’ রয়েছে, যা তথ্য কমিশনের ওয়েবসাইটেও আছে, যদিও পত্রপত্রিকায় তিনি শুধু ‘খুরশীদা বেগম’ নামেই লেখালেখি করে আসছেন; ‘অধ্যাপিকা’ সম্বোধনটা তাঁর নিজের প্রয়োগ অনুসারে এখানে ব্যবহার করা হয়েছে)। উল্লেখ্য, ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ বা তাঁর ভাষায় ‘গোত্রজ নৃগোষ্ঠী’দের ব্যাপারে বিশেষ জ্ঞানের অধিকারী হিসেবে তাঁর পরিচয় তথ্য কমিশনের ওয়েবসাইটে দেওয়া রয়েছে  (“expertise in the fields of Race and Ethnic Relations and National Integration relating to the small ethnic population or tribal people of Bangladesh”), কিন্তু এই ‘বিশেষজ্ঞতা’র যে ধরনের নমুনা তাঁর বিভিন্ন প্রকাশিত লেখায় ফুটে ঊঠেছে, সেগুলি বহু অসত্য বা অর্ধসত্য তথ্য ও আপত্তিকর বিভিন্ন মন্তব্যে পরিপূর্ণ। এ অবস্থায় তাঁর সর্বশেষ লেখাটা চোখে পড়ার পর আমার মনে হল, রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন একজন ব্যক্তি যখন দেশপ্রেমের নাম করে আগাগোড়া বর্ণবাদে চোবানো কোনো লেখা প্রচার করেন, যেটির প্রতিটি অনুচ্ছেদ থেকে  বিদ্বেষ ও বিভ্রান্তি উপচে পড়ছে, তখন আর চুপ করে থাকার মানে হয় না। (এই নিবন্ধে ব্যবহৃত ছবিগুলি ইন্টারনেট থেকে নেওয়া, তবে প্রথমটিতে কিছু সম্পাদনা করা হয়েছে।)

[2] যেমন অস্তিত্বের জমিন যখন লুটেরাদের দখলেআরণ্য জনপদের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক সনদের ছায়াতলেঅধ্যাপক আনিসুজ্জামানের কাছে খোলা চিঠি ও আরো বেশ কিছু লেখা, যেগুলির অনেকখানি আমার প্রবন্ধ সংকলন বহুজাতির বাংলাদেশ  গ্রন্থে রয়েছে।


প্রশান্ত ত্রিপুরা

স্বতন্ত্র গবেষক ও লেখক (সাবেক সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়; অধ্যাপক, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি)


তাঁর ব্যক্তিগত ব্লগ থেকে নেওয়া

প্রসঙ্গঃ
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা

Jumjournal

Administrator

Follow Jumjournal

Leave a Reply