ত্রিপুরা রূপকথা – পুন্দা তান্নায় (অজবদ/লালমতির প্রেম কাহিনী)

0
88

সুদূর অতীতকালে এক ত্রিপুরা গ্রামে দাংগুই বুড়া নামে এক প্রভাবশালী লোক ছিল। সে ছিল বৃদ্ধ এবং সমাজপতি। তাঁর প্রথম পুত্রের ঔরসজাত এক কন্যা সন্তান ছিল। ঐ কন্যার নাম ছিল লালমতি।

একদিন বিকেল বেলায় সূর্য অস্ত যাওয়ার সময়ে পাড়ার অদূরবর্তী পাহাড়ের সংকীর্ণ পথ দিয়ে জুমের কাজ শেষ করে পাড়ার লোকেরা বাড়ি ফিরছে। তখন কেউ পাহাড় থেকে নামছে। কেউ ছড়ায় এসে স্নান করছে। অাবার কেউ হাত-পা ধুয়ে পাড়ার রাস্তা বেয়ে উঠে অাসছে। সেই স্নান ঘাটের অদূরে রয়েছে একটি ডুমুর গাছ। তারই পার্শ্ব দিয়ে ছড়ার পানি বয়ে যাচ্ছে। তার পাশে একটি পানির কুয়া। সে কুয়ার স্বচ্ছ পানিতে লাল ডোরাকাটা দাগযুক্ত তিনটি নাবালাং মাছ (একপ্রকার ছোট জাতের মাছ) খেলছে। পাড়ায় তখন অস্তমিত সূর্যের অালো ছড়িয়ে পড়েছে।

দাংগুই বুড়া মাচাং ঘরের বারান্দায় এসে দা’এর সাহায্যে বাঁশের ফালি থেকে বেত তুলছে। তাঁর পুত্রবধূ অর্থাৎ লালমতির মা একটি ভাঙা কলসিতে কিছু খাদ্য নিয়ে মাচাং ঘর থেকে নেমে উঠানে গিয়ে শূকরদের খাবার দিচ্ছে। এমন সময় দোলনার উপর থাকা লালমতি কেঁদে উঠে। নাতনির কান্না শুনে দাংগুই বুড়া তাড়াতাড়ি গিয়ে নাতনি লালমতিকে কোলে তুলে এনে একখানা বক্ষ বন্ধনী কাপড় ‘রিসা’ বুকে বেঁধে দেয় এবং হাতে একটি সুন্দর নকশা করা বেতের পাখা দিয়ে বাতাস করতে করতে পাড়ায় ঘুরতে যায়।

দাংগুই বুড়া নাতনিসহ পাড়ায় ঘুরতে ঘুরতে এক সময়ে তার ছোট ভাই বোনদের বাড়ির সম্মুখে পৌঁছে একটি কাঁঠাল গাছের নিচে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এমন সময়ে তার ছোট ভাই বোনেরা নাতনি লালমতিকে দাদুর কোলে দেখে বলাবলি করছে, দাদা কেন তাঁর নাতনিকে কোলে করে বেড়াচ্ছেন? এমনি কালো নাতনি যে তাকে অাদর করার একটুও জোঁ নেই! অামরা হলে কোলেই নিতাম না।

দাংগুই বুড়া তাঁর ছোট ভাইবোনদের এরুপ কথা শুনে বলল – তোমরা তাকে এত অবহেলা কর না। একদিন দেখবে অামার এই নাতনি এমন বীরের বউ হবে যে বীর বিনা পাখায় অাকাশে উড়তে পারবে এবং যে বীর বিনা অস্ত্রে দিকবিজয় করতে পারবে।

দাংগুই বুড়ার এরূপ কথা শুনে সকলেই অাশ্চর্য হয়। এ রকম বীর পাওয়া কী করে সম্ভব হতে পারে! এ সম্পূর্ণ অবাস্তব কথা! কেউ তা বিশ্বাস করতে পারছে না। সেদিন বেড়ানো শেষ করে দাংগুই বুড়া তার নাতনিকে নিয়ে বাড়িতে ফিরে তার ছেলের বউকে বলল – মা অাজ তোমার মেয়েকে নিয়ে এক কঠিন প্রতিজ্ঞা করেছি। অামি বলে এসেছি একদিন তাকে কেন্দ্র করে এক নতুন অাশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটবে। কাজেই তোমার মেয়েকে অাদর স্নেহ দিয়ে লালন পালন করবে।

Lalmoti and her grandfather
লালমতিকে দোলানয় রেখে তার দাদু ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছেন, ছবিঃ ত্রিপুরা লোককাহিনী ও কিংবদন্তি

সেদিন এরূপ কথা বলার পর সন্ধ্যা ঘনিয়ে অাসে এবং অাস্তে অাস্তে রাত গভীর হয়। বুড়াকে তার পুত্রবধূ সব খাবার প্রস্তুত করে দেয়। বুড়া খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। তখন ফুলের বাগানে সন্ধ্যা মালতি ফুল ফুটেছে। সকালে ফুলের মধ্যে ভ্রমর এসে গুনগুন করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এভাবে দিন যায়, মাস যায়, বছর পেরোয়। অার এমন করে লালমতিও অাস্তে অাস্তে বড় হয়ে উঠে। সে দাদুর কাছ থেকে নানা রকম গল্প শুনত। মাঝেমাঝে তার সঙ্গে গল্প শোনার সময় অারো দু’জন বালক থাকত। এ তিনজন বাল্য বন্ধু দাংগুই বুড়ার কাছ থেকে নানা রকমের গল্প শুনত। এভাবে তারা একদিন বড় হয়ে পূর্ণ যুবক ও যুবতী হয়ে উঠে। অার সেই দু’জন যুবক একই সাথে লালমতির প্রেমে পড়ে। তারা দু’জনই লালমতিকে কাছে পাওয়ার জন্য অাপ্রাণ চেষ্টা করতে থাকে। এ দু’জনের মধ্যে সুমন্ত ছিল এতিম অার হেমন্ত ছিল উজিরের ছেলে। এতিম বলে সুমন্ত পরের ঘরে বড় হয়েছে। লালমতি কিন্তু সুমন্তের সাথে মেলামেশা করলেও সে সুমন্তকে পছন্দ করে না। হেমন্তের প্রতি তার গভীর ভাব রয়েছে। তাকেই সে মনে মনে ভালবাসে। গ্রামের পার্শ্ববর্তী ছড়াতে একদিন স্নান করতে গিয়ে হেমন্তের সাথে লালমতির বৌদির দেখা হয়। তখন লালমতির বৌদি হেমন্তকে বলে, “ভাই হেমন্ত, তুমি একটি অাজব কথা শুনেছো?” হেমন্ত বলে, “কী কথা বৌদি”। তখন লালমতির বৌদি বলে, “অামি একটি অবাক কথা শুনেছি। অামাদের বুড়া দাদু নাকি লালমতির শৈশবের সময় প্রতিজ্ঞা করেছেন লালমতির স্বামী হতে গেলে নাকি প্রচুর গুণের অধিকারী হতে হবে। বিনা পাখায় অাকাশে উড়তে পারে এমন ক্ষমতার অধিকারী হতে হবে। এরূপ গুণী হতে না পারলে হাজার প্রেমে পড়লেও লালমতিকে বিয়ে করা যাবে না। তুমি তাকে বিয়ে করার অাশা করো না। বিয়ে করার অাশা ছেড়ে দাও।”

হেমন্ত লালমতির বৌদির কথা শুনে অস্থির হয়ে উঠে এবং কী করে, কীভাবে এই গুণের অধিকারী হওয়া যায় সে বিষয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতে লাগল। সে মনে মনে ভাবে নিশ্চয় একথা লালমতিও জানবে। তার কাছে জিজ্ঞাসা করা দরকার। এরূপ চিন্তা করে হেমন্ত লালমতির নিকট গিয়ে ব্যাপারটা সত্য কিনা জিজ্ঞেস করে নেয়। তখন লালমতি বলে, ঘটনা সত্য। তার দাদু যেরূপ প্রতিজ্ঞা করেছেন সেরূপ গুণের অধিকারী হতে হবে। হেমন্ত লালমতির মুখ থেকে এমন কথা শুনে অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করে, তাহলে সে কেন তার প্রেমে অাবদ্ধ হয়েছে? এই প্রেম তো বৃথা। সাত সমুদ্র পার হয়ে বার বৎসর যোগ সাধনা করে তবে সিদ্ধি লাভ করে এরূপ গুণী হওয়া অামার পক্ষে সম্ভব হবে না। সময় থাকতে তোমার প্রেমে জড়িয়ে না পরে দূরে সরে যাওয়াই তো ভাল হবে। হেমন্তের এরূপ অস্থিরতা দেখে লালমতি বলে, তুমি পুরুষ, পুরুষের মত কথা বলবে। এই পৃথিবীতে অসম্ভব কাজ কিছুই নেই। মনে দৃঢ়তা থাকলে অসম্ভবও সম্ভব হতে পারে। তোমার বার বৎসর যোগ সাধনা করার জন্য যত টাকা প্রয়োজন সব খরচ অামি দেব। কাপড়-চোপড়সহ অন্যান্য খরচ যা প্রয়োজন তাও দেব। তোমার কোনো কিছুর অভাব রাখবো না। তবুও তুমি যোগ সাধনায় যেতে পারবে না? কোন পথ ধরে, কোন গ্রাম হয়ে যেতে হয় সবরকম পথের সন্ধান তোমাকে দেবো তবুও তুমি বারটি বৎসর সাধনা করার জন্য যেতে পারবে না? তখন হেমন্ত লালমতির উদ্দেশ্যে অাবার অস্থির গলায় বলে উঠে, “অাচ্ছা, অামি না হয় তোমার কথায়, তোমার নিকট থেকে বারটি বৎসর যোগ সাধনা করার জন্য সব টাকা নিলাম, পথের সন্ধান নিলাম, সাত সমুদ্র তের নদী পার হয়ে সন্ন্যাসীর নিকট থেকে সেই যোগ সাধনা শিখতে গেলাম। কিন্তু ততদিনে তুমিতো অামাকে বাদ দিয়ে অার একজনের প্রেমে পড়ে তাকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করে দুই তিনটি ছেলে-মেয়ের মা হয়ে যাবে। তখন অামার কী উপায় হবে?তখন লালমতি হেমন্তের নিকট শপথ করে বলে, “শ্রীকৃষ্ণ স্মারকা নগরে যাওয়ার পর রাধা যেমন করে ছিল অামিও তেমন করে থাকবো। মাথায় তৈল দেবো না। মাথায় উকুন পাখির ন্যায় উড়লেও অামি কিছু করবো না। রাধা যেমন পাখিদেরকে বলত, ওরে কাক, তোমরা অামার চোখ দুটো খেতে এসো না। শ্রীকৃষ্ণ স্মারকা থেকে ফিরে অাসলে অামি তাকে দেখতে পাবো না। উঁই পোকা, অামাকে খেয়ে ফেলতে চাইলে, অামিও রাধার ন্যায় বলবো, “উঁই পোকা তোমরা অামাকে খেয়ে ফেলো না। শ্রীকৃষ্ণ স্মারকা থেকে ফিরলে সে অামাকে দেখতে পাবে না। তুমি না অাসা পর্যন্ত অামি কোনো পুরুষের মুখের দিকে পর্যন্ত তাকাবো না। তবুও তুমি মন্ত্র শিখতে যাও। অামার জন্য চিন্তা করো না।

কোন প্রকার কষ্ট পেলেও তুমি ফিরে অাসবে না। সিদ্ধি লাভ না হওয়া পর্যন্ত থাকবে। যদি কোনো কারণে তুমি মন্ত্রের সিদ্ধি লাভ করতে না পার তাহলে অন্যকিছুর রূপ ধারণ করে অামাকে স্বপ্নে দেখাবে। তখন বার বৎসরের দূরের পথ হলেও সেখানে গিয়ে অামি তোমাকে নিয়ে অাসবো।

এভাবে সেদিন সন্ধ্যা হতে সারারাত পর্যন্ত উনুনের পাশে বসে তারা নানা অালাপ করল। এরপরে হেমন্ত লালমতির নিকট থেকে পথের সন্ধান নিয়ে, বার বৎসরের যোগ সাধনার খরচ নিয়ে এবং সমস্ত হিসেব নেওয়ার পর সব জিনিস বুঝে নিয়ে যোগ সাধনা করার উদ্দেশ্যে চলে যায়। দূরে অনেক দূরে। ঐদিন ভোরে হেমন্ত চলে যাওয়ার পর সুমন্ত লালমতির নিকট হেমন্ত সম্বন্ধে জানতে চায়। লালমতি তাকে বলে যে, হেমন্তের সাথে তার দেখা হয়নি এবং হেমন্ত সম্বন্ধে সে কিছুই জানে না। লালমতির কথা শুনে সুমন্ত বলে, “লালমতি, তুমি কথা গোপন করলেও অামি সব জানি। অামিও তোমাকে বলে যাচ্ছি হেমন্তের চেয়ে যদি অামি বেশি মন্ত্র শিখে অাসতে না পারি তো অামার নামই সুমন্ত নয়। এই বলে সুমন্ত পাড়ার পাহাড় বেয়ে নিচে নেমে নদীতে গিয়ে জলধাত্রী দেবী গঙ্গা মাকে প্রণাম করে বলে, “মা অামাকে অার্শীবাদ করো, অামি যেন অাশা পূরণ করে ফিরে অাসতে পারি।” এরপর সে পাহাড়ি পথ ধরে চলে যায়। যেতে যেতে পাহাড়ি পথ অতিক্রম করার পর সে এক সমতল ভূমিতে পৌঁছে। সেখানে সে একটি বিরাট বট বৃক্ষ দেখতে পায়। বট বৃক্ষটির চারিপাশে অজস্র ঢালপালা ছড়ানো। পূর্বের ঢালে ময়না পাখির বাসা। দক্ষিণ ঢালে সারস পাখির বাসা, উত্তরদিকে বাবুই পাখির বাসা। সে বট বৃক্ষ পার হয়ে সমতল ভূমির রাস্তা ধরে অাবার হেঁটে যায়। সেই রাস্তার দুই পার্শ্বে সুপারি গাছ ও লিচু গাছের সারি। কী সুন্দর দেখা যায়! এমন করে যেতে যেতে সে বারইদের বাড়ি পৌঁছে। তথায় গৃহস্বামী ও তার স্ত্রীকে প্রণাম করে সে তাদেরকে মা অার বাবা বলে সম্বোধন করে বললে, “অামার মা অার বাবা নেই, অামি বড়ই দুঃখী মানুষ। অামাকে দু’একটি মন্ত্র শিখিয়ে দেবেন, যে মন্ত্র বলে পাখা ছাড়া অাকাশে উড়তে পারে? অথবা এমন কোনো মন্ত্র অাছে কি যে মন্ত্র বলে বিনা অস্ত্রে দিকবিজয় করা যায়? তখন বারই অার বারইনি বলে, “বাবা অামরা তো এসব মন্ত্র জানিনা। তবে অামরা মাত্র একটি মন্ত্র জানি। ঐ মন্ত্র বলে যে কোন জীবকে পানি পড়া খাইয়ে দিলে সেটি লোহার ন্যায় শক্ত হলেও তা পানির মত নরম হয়ে যায়। এছাড়া অন্য কোন মন্ত্র জানিনা। সুমন্ত সে বারই বাড়িতে এক রাত্রি অবস্থান করে পরের দিন অাবার অন্য গ্রামের উদ্দেশ্যে চলে যায়।

সুমন্ত অাবার সমতল পথ ধরে হাঁটতে থাকে। সে রাস্তার দু’ধারে সারি সারি সুপারি, নারিকেল ও লিচু গাছ দেখতে পায়। এমন দৃশ্য দেখে যেতে যেতে সে পর পর কামার, কুমার, তাঁতীদের গ্রামে প্রবেশ করে এবং প্রত্যেকের গ্রামে গিয়ে সকল পরিবারের কর্তাদের ও তাদের পত্নীদেরকে প্রণাম করে। সে সবাইকে মা-বাবা সম্বোধন করে সেই সিদ্ধি মন্ত্র পাওয়ার ব্যাপারে সবাইকে একই রকম প্রশ্ন করতে থাকে। ঐসকল গ্রামের সবাই তাকে একই রকম উত্তর দিয়ে বলে, অামরা সেরূপ মন্ত্র জানিনা। সবশেষে সুমন্ত এক ব্রাহ্মণ ও তাঁর পত্নীকে পায়ে ধরে প্রণাম করে মা-বাবা সম্বোধন করে সিদ্ধি লাভের মন্ত্রের কথা জিজ্ঞেস করে। ব্রাহ্মণ অার ব্রাহ্মণী তার প্রশ্নের উত্তর দিয়ে বলেন, না, বাবা অামরা এরূপ মন্ত্র জানিনা। তবে তুমি যদি এরূপ মন্ত্র পেতে চাও তবে তোমাকে সাত সমুদ্র তের নদী পার হয়ে যেতে হবে। কিন্তু সাত সমুদ্র তের নদী পার হতে হলে তোমাকে অবশ্যই সাধনা করে দূর্গা মাকে হাজির করতে হবে। তার কাছ থেকে তোমাকে অার্শিবাদ নিতে হবে। তখন তোমাকে এক মাঝি জিজ্ঞেস করবে তোমার মা-বাবা অাছে কিনা, ভাই-বোন, অাত্নীয়, বন্ধু-বান্ধব অাছে কিনা। যদি জানে এমন অাত্নীয় তোমার কেউ নেই তবে মাঝি তোমাকে সিদ্ধি দাতা সন্ন্যাসীর নিকট নিয়ে যাবে।

ব্রাহ্মণের কথা শুনে সুমন্ত সমু্দ্র পাড়ে বালুচরে গিয়ে দূর্গা মায়ের আশীর্বাদ লাভ করার জন্য সেখানে একান্ত চিত্তে অারাধনা করতে থাকে। তখন তার অারাধনায় সন্তুষ্ট হয়ে দূর্গা মা হাজির হয়ে সুমন্তকে জিজ্ঞেস করেন, “কে তুমি? অামাকে এরকম অারাধনা করছো?” তখন সুমন্ত বলে, “মা অামার কেউ নেই, অামি অত্যন্ত দুঃখী। অামি সিদ্ধি লাভের মন্ত্র শেখার জন্য সমুদ্র পার হতে চাই। যদি দয়া করেন তবে অামাকে বর দিন।” দূর্গা মা তার অারাধনায় সন্তুষ্ট হয়ে তাকে বর দেয়। তখন একটি নৌকা ও এক মাঝি হাজির হয় এবং তাকে জিজ্ঞাসা করা হয় তার বাবা-মা, ভাই-বোন, অাত্নীয়, বন্ধু-বান্ধব অাছে কিনা। সুমন্ত প্রশ্ন সমূহের উত্তরে বলে, না! তার এরূপ কোনো অাত্নীয় নেই। তখন মাঝি তাকে সাত সমুদ্র তের নদী পার করে সিদ্ধি মন্ত্র দাতা সন্ন্যাসীর নিকট পৌঁছে দেয়। সেখানে পৌঁছে সুমন্ত সন্ন্যাসীকে প্রণাম করে। সে সন্ন্যাসীর নিকট হতে মন্ত্রের বই নিয়ে সেখানে ধ্যান করতে থাকে।

মহাশ্মশানে বসে মন্ত্র পাঠ করতে করতে সুমন্ত অল্প সময়ের মধ্যে সিদ্ধি লাভ করে। সে নিজে মন্ত্র পাঠ করে বিনা পাখায় উড়ে বেড়াতে পারে। এমন করে বারবার নিজেকে পরীক্ষা করার পর যখন মন্ত্রের প্রতি তার পূর্ণ বিশ্বাস জন্মেছে তখন সন্ন্যাসীর নিকট গিয়ে সন্ন্যাসীর চরণ ধরে প্রণাম করে বলে, “গুরুদেব অামি অাপনার আশীর্বাদে মন্ত্রে সিদ্ধি লাভে সক্ষম হয়েছি। অামার অার বিশেষ চিন্তা নেই। বার বার মন্ত্রের পরীক্ষা করে দেখেছি, বিশেষ কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। অামি এখন মন্ত্রের চালান দিয়ে নিজে নিজে বিনা পাখায় অাকাশে, মহাশূন্যে উড়ে বেড়াতে পারি।”

Sumonto and Yogi
সুমন্ত এবং তার গুরু সন্ন্যাসী, ছবিঃ ত্রিপুরা লোককাহিনী ও কিংবদন্তি

সন্ন্যাসী তার সব কথা শুনে তাকে অার্শীবাদ করে বলেন, “তোমার কথা শুনে অামি অত্যন্ত খুশি হয়েছি। তোমাকে অামি আশীর্বাদ করলাম, তুমি স্বদেশে ফিরে জনগণের ও রাষ্ট্রের সেবা করার জন্য সক্ষম হও। তোমাকে অামি অার অাশ্রমে রাখবো না। তুমি চলে যেতে পার।” তখন সুমন্ত সন্ন্যাসীর নিকট হতে বিদায় নিয়ে চলে অাসে। সে প্রথমে নিজের গ্রামে না গিয়ে ঐ দেশে কামি রোয়াজার দিকে যাত্রা করে। তারপর সেখানে গিয়ে কামি রোয়াজার গ্রামের চন্তাই বা অচাই-এর ঘরে গিয়ে অতিথি হয়। সেই অচাইয়ের দু’টি যুবতী মেয়ে ছিলল, রায়বতী ও সুমতি। তাঁর কোনো পুত্র সন্তান নেই। একজন সুস্বাস্থ্য সুন্দর যুবক অতিথি হয়ে ঘরে অাসায় অচাই মনে মনে খুব খুশি হয়। রাত্রের খাবার খাওয়ার পর তারা সকলে বারান্দায় এসে নানা অালাপ অালোচনা করতে থাকে। তার পরিচয় জিজ্ঞাসা করা হয়। সুমন্ত তার পরিচয় সবার কাছে বলে। সে অন্য এক রাজ্যের কামি রোয়াজার উজিরের ছেলে। বর্তমানে তার বাবা-মা কেউ নেই। সে গোঁসাইন রাজার এলাকার দাংগুই বুড়ার গ্রামে থাকে। সব তথ্য জানার পর অচাই জানতে পারেন ছেলেটির বাবা এবং তারা এক সময় একই পাড়ার বাসিন্দা ছিল। এক এলাকায় জুম চাষ করে খেত। সুমন্তের বাবা খুবই ভাল লোক ছিল। কোনো দিন তার সঙ্গে কোনো প্রকার ঝগড়া বিবাদ হতো না। ছেলেটির ব্যবহারে অচাই খুবই খুশি হলেন এবং তাঁর কোনো ছেলে না থাকায় তিনি তার বড় মেয়ের জন্য সুমন্তকে ঘর জামাই করে রাখার প্রস্তাব করেন। সুমন্ত তার প্রস্তাবে সম্মত হয়। একটি শুভ দিন দেখে সুমন্তের সাথে তার বড় মেয়ে রায়বতীর বিয়ে দেয়া হল। তারপর সুখে তাদের দিন কাটতে লাগল। রায়বতী একদিন তার ছোটবোন সুমতিকে নিয়ে জুমের কাজে যায়। এক সময় জুমের ধান একটু একটু করে পাকতে থাকে। সেই পাখা ধান তোতা এবং বাবুই পাখিরা এসে খেতে থাকে। সুমতিকে সেই পাখি তাড়ানোর জন্য জুমে পাঠিয়ে দেয়া হয়। সুমতি একা একা জুম ক্ষেতের এক পাশ থেকে পাখিদের তাড়িয়ে দিলেও সেগুলো উড়ে গিয়ে জুমের অন্য প্রান্তে গিয়ে পড়ে। সুমতি পাখি তাড়াতে না পেরে গাছের গোঁড়ায় বসে কাঁদতে থাকে। তার এ অবস্থা দেখে সুমন্ত নিরুপায় হয়ে তার স্ত্রী রায়বতীকে বলে, “তোমার বোন পাখি তাড়াতে পারছে না। তাকে জুম ঘর থেকে নিয়ে এসে দুইবোন মিলে উঁই ভিটা থেকে মাটি এনে গুলি তৈরি কর। স্বামীর কথামত রায়বতী ছোটবোন সুমতিকে ডেকে এনে উইপোকার ভিটা থেকে অানা মাটি দিয়ে মাটির গুলি তৈরি করতে থাকে এবং গুলিগুলো অাগুনে পুড়ে শক্ত করে নেয়। সুমন্ত সুন্দর মোটা বাঁশ ও বেত কেটে নিয়ে “বাদল” (ধনু বিশেষ) তৈরি করে নেয়। সব তৈরি করে নেয়া হলে গুলির ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে নিয়ে প্রথমে জুম ঘরের মাচাংয়ের উপর দাঁড়িয়ে বাদল দিয়ে পাখিদের গুলি মারতে থাকে। চারিদিকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে মারার পর একসময় সে খোলা মাচাং ঘর হতে মন্ত্র পড়ে উড়ে গিয়ে মেঘের ভিতরে প্রবেশ করে উড়ে উড়ে পাখিদেরকে গুলি মারতে থাকে। তখন পাখিরা বৃষ্টি ফোটার মত মাটিতে পড়তে থাকে। সুমন্ত এভাবে পাখির দলকে সাত সমুদ্র তের নদী পার করে দেয়। তারপর ছড়ায় নেমে ছড়া থেকে জুম ঘরে এসে ভাত খেয়ে নেয়। এরপর সে তার স্ত্রী ও শালীকে এ ঘটনা সম্পর্কে কোনো কথা পাড়া বা বাড়ির কারোরোর নিকট প্রকাশ না করার জন্য নিষেধ করে। কিন্তু সেদিনই রাত্রে খাওয়া-দাওয়ার পর সুমন্তের শালী সুমতি তার মায়ের কাছে বিছানায় শুয়ে চুপি চুপি সব কথা খুলে বলে। সুমতি বলে, মা অাজকে জুমে গিয়ে একটি অাশ্চর্যজনক ঘটনা দেখেছি। অামার ‘কুমুই’ (ভগিনীপতি) জুম ঘরের খোলা মাচাংয়ে দাঁড়িয়ে পাখিদের গুলি মারতে মারতে এক সময়ে অাস্তে করে অাকাশের উপর গিয়ে মেঘের ভিতর প্রবেশ করে পাখিদের মারতে থাকে। অামরা দুই বোন হতবাক দৃষ্টিতে অাকাশের পানে তা দেখতে থাকি। পাখিরা মরে অাকাশ থেকে বৃষ্টির মতো ঝরে পড়তে থাকে। কিছুক্ষণ পর অার পাখিদের দেখা যায় না। তখন কুমুই অাকাশ থেকে নেমে এসে ছড়ায় গিয়ে স্নান করে। ভাত খাওয়ার পর অামাদের দুই বোনকে পাড়া বা ঘরের কাউকে এ ঘটনার কথা না বলার জন্য নিষেধ করেছে।

এর অাগেও কয়েকটি ঘটনায় তার বীরত্বের প্রকাশ পায়। একবার কামি রোয়াজার লক্ষ্মীপূজা বা মাইনজুকমা পূজা অনুষ্ঠান অায়োজন কালে রোয়াজার সবচেয়ে বড় শূকরকে এক হাতে ধরে এক কোপে কেটে দিয়ে সে সকলকে অবাক করে। এরপর একদিন হলো কি, একশত বিশ পরিবারের গ্রামটির প্রতিটি ঘরের খোলা মাচাংয়ের ‘চাকেরেং’ এর মধ্য পোঁতা বাঁশগুলোর মাথা তার হাতের খড়গ দিয়ে এক নিঃশ্বাসে উড়ে গিয়ে কেটে ফেলে দিয়ে সকলকে বিম্মিত করে। এভাবে সে কামি রোয়াজা পাড়ায় একজন বীর হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

অপরদিকে সুমন্তের মন্ত্রের সিদ্ধি লাভ করে অাসার বহু পরে হেমন্ত সমুদ্রের পাড়ে বালুচরে এসে পৌঁছে। এতদিন সে লালমতির কথা মত বলা সমতল ভূমির রাস্তা দিয়ে না গিয়ে অন্য পথে পাহাড় ঘুরে যেতে গিয়ে বিলম্বে পৌঁছে। সেও দেবী দূর্গা মার উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করে দূর্গার আশীর্বাদ নিয়ে মাঝির নিকট মিথ্যা বলে সিদ্ধি লাভের জন্য নৌকাযোগে মন্ত্রদাতা সন্ন্যাসীর নিকট গিয়ে পৌঁছে। সে সন্ন্যাসীর নিকট থেকে যাবতীয় মন্ত্রের বই গ্রহণ করে শ্মশানে নিয়ে কঠোর সাধনা করতে থাকে। বহুদিন সাধনা করার পর হেমন্ত মন্ত্রগুলো পরীক্ষা করে দেখলে অদ্ভূত এক কান্ড ঘটে। সে মন্ত্রগুলো পরীক্ষা করতে দেখতে গেলে তার শরীর পরিবর্তিত হয়ে ছাগলের শরীরে রূপান্তরিত হয়ে যায়। সে নিজেকে বহুবার পরীক্ষা করে দেখেও ছাগল ছাড়া অার কোনো কিছুই করতে পারছে না। এখন তার মহাবিপদ! ছাগলের রূপ ধরে যদি দেশে ফিরে যায় তখন যে কেউ ধরে তাকে কেটে ফেলবে। বহু চিন্তা করার পর সে সিদ্ধিমন্ত্রের দাতা সন্ন্যাসীর নিকট সব কথা খুলে বলে এবং এ বিপদ থেকে পরিত্রাণের কি উপায় হতে পারে সে ব্যাপারে সঠিক পরামর্শ দেয়ার জন্য প্রার্থনা করে। তার কথা শুনে সন্ন্যাসী পরামর্শ দিয়ে বলেন, “শ্মশানে অাবার গিয়ে ধ্যান করে দেবী কালীর সাধনা করে কালীর আশীর্বাদ গ্রহণ করো। যথারীতি সে সেটা করতে থাকে। কালী তার অারাধনাস্থলে উপস্থিত হয়ে তার সব কথা শুনে বলেন, “ভবিষ্যতে তুমি বিচিত্র সব সম্পত্তির মালিক হবে। তোমার চোখ দু’টি মানিক হবে। দাঁতগুলো হীরা হবে, কান হবে কাঞ্চনের, শিং হবে রৌপ্যের এবং শরীর হবে লোহার। যদি তুমি বার বছর বেঁচে থাকতে পার তাহলে তুমি সমস্ত রাজ্য অাক্রমণ করে বিজয়ী হয়ে রাজা চক্রবর্তী হতে পারবে।” দেবী কালী মায়ের এরূপ আশীর্বাদের কথা হেমন্ত সন্ন্যাসীর নিকট এসে বলল। তারপর সে সন্ন্যাসীকে অনুরোধ করে বলে, অাপনি অামাকে নিজের সাথে করে নিয়ে গিয়ে বাজারে বাজারে ঢোল দিয়ে বলে দেবেন, যে মানুষ ছাগলটাকে নিজের হাতে দূর্বাঘাস এনে গলায় ধরে খাওয়াতে পারবে তার নিকট থেকে এক পয়সা মূল্য পেলেও ছাগলটাকে বিক্রি করা যাবে। অন্য কেউ অামার জন্য হাজার টাকা মূল্য দিলেও তার নিকট বিক্রি করবেন না। এরূপ অনুরোধ করে হেমন্ত ছাগলের রূপ ধরে সন্ন্যাসীসহ দেশে ফিরে অাসে। হেমন্ত সেদিন রাত্রে লালমতির স্বপ্নে দেখা দিয়ে বলে যে, বোন অামার কী দুর্ভাগ্য জানিনা, অামি যতগুলো মন্ত্র শিখেছি সব মন্ত্রের চালান দিলে অামার মানুষের শরীর বদলে গিয়ে ছাগলের রূপ ধারণ করে, এর কোনো পরিবর্তন অামি করতে পারি না। এখন অামি সন্ন্যাসীকে নিয়ে দেশে ফিরবো, অামি সন্ন্যাসীকে বলে দিয়েছি, যে লোক অামার গলায় জড়িয়ে ধরে ছাগলরূপী অামাকে দূর্বাঘাস খাওয়াতে পারবে তার নিকট থেকে এক পয়সা মূল্য পেলেও তার নিকট বিক্রি করা যাবে। অামি বিবির হাট, কাজির হাট এসব নানা বাজারে অাসবো, তুমি অামাকে কিনে নিতে অাসবে। প্রেমিকা লালমতির স্বপ্নে হেমন্তের এ খবর পেয়ে সারা রাত ধরে কান্না করতে থাকে। সে প্রভূকে ডেকে বলে, “অামার কপালে কেন এত দুঃখ! অামি যাকে মন দিয়ে ভালবাসি সে কেন মানুষের শরীরে নেই। পশুর শরীর নিয়ে দেশে ফিরছে। অামি একজন দুর্বল নারী, অামার পক্ষে দেশে দেশে ঘুরে ঘুরে তাকে খুঁজে নিয়ে অাসা কি সম্ভব হবে? এখন অামি তাকে বিপদ থেকে যদি উদ্ধার করে নিয়ে না অাসি তাহলে সকলে অামার প্রেমের ব্যাপারে অপবাদ রটাবে। এখন অামাকে জীবন দিয়ে হলেও তাকে উদ্ধার করে নিয়ে অাসতে হবে।

লালমতি তখন বিবির হাট, কাজির হাট, অারো নানা বাজারে গিয়ে সোনার অাংটি ক্রয়ের ছলনা করে তার দাদুর নিকট, ভগ্নিপতির নিকট থেকে টাকা চেয়ে নিল। কার সাথে যাবে দাদু জিজ্ঞেস করলে সে ভগ্নিপতির সাথে যাবে বলে জানায়। এইভাবে টাকা সংগ্রহ করে নিয়ে লালমতি তার বন্ধু-বান্ধবীদের সঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন বাজারে গিয়ে উক্ত যোগী ছাগলের খোঁজ নেয়। জিজ্ঞাসা করে জানতে চাইলে সবাই বলে গতকাল বিবির হাটে ছিল। অাজ কোথায় গিয়েছে জানে না। এভাবে খোঁজ করতে করতে পরে এক বাজারে গিয়ে সে ছাগলটির খোঁজ পায়। ছাগলটির শরীরে সোনা, হীরা, মণি-মাণিক্য এসব অমূল্য সম্পদ দেখে দেশে-বিদেশের অনেক রাজা, জমিদার ও সওদাগর এসে সন্ন্যাসীকে তাদের কাছে ছাগলটি বিক্রি করার জন্য অনুরোধ করে। কিন্তু সন্ন্যাসী ছাগলরূপী সুমন্তের কথা অনুসারে শর্ত দিয়ে বলেন, “কেউ যদি নদীর পার থেকে দূর্বাঘাস এনে ছাগলটিকে গলায় ধরে খাওয়াতে পারে সে তার নিকট থেকে এক পয়সা পেলেও ছাগলটি বিক্রি করবে। লালমতি সেই বাজারে গিয়ে বাজারের স্বর্ণকারগণ তিন পুরুষ পর্যন্ত যে সব অাংটি তৈরি করে রেখেছে সেগুলো কিনে তারপর ছাগলটি কেনার জন্য যায়। তখন চারদিকে কত রাজা, কত বাদশা, মহাজন, সওদাগরসহ অসংখ্য মানুষ ছাগলটির দিকে তাকিয়ে অাছে। ছাগলটির দু’টো সোনার চোখ, হীরার দাঁত, কাঞ্চনের কান, রূপার শিং দেখে উপস্থিত সকলে মুগ্ধ। এমন সময় লালমতি একখানা কলাপাতা নিয়ে নদী তীরের দূর্বাঘাস তুলে সেটি সুন্দর করে ধুয়ে নিয়ে বক্ষ বন্ধনী কাপড় দিয়ে বুকে জড়িয়ে ছাগলের দিকে এগিয়ে যায়। সে জনতার ভীড়ে অাস্তে অাস্তে প্রবেশ করে ছাগলটির পাশে দাঁড়িয়ে মনে মনে সংকল্প করে বলে, তোমাকে অামি নিয়ে যেতে এসেছি। দয়া করে তোমার জন্য অানা নদী পাড়ের দূর্বাঘাস খেয়ে অামার সঙ্গে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হও। এ বলে বক্ষ বন্ধনী কাপড় থেকে কলার পাতাটি খুলে দূর্বাঘাস হাতে নিয়ে ছাগলের গলায় জড়িয়ে ধরে সেগুলি মুখে দিয়ে দেয়। ছাগলটি লালমতি হাতের দূর্বাঘাস সম্পূর্ণ খেয়ে ফেলে। তখন লালমতি তার বক্ষ বন্ধনী (রিসা) ছাগলটির গলায় বেঁধে দেয় এবং টেনে নেওয়ার চেষ্টা করে। এদিকে কত রাজা-বাদশা, জমিদার, সওদাগর ছাগলটিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য কেউ রূপার শিকল, কেউ স্বর্ণের শিকল অাবার কেউ কেউ লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে টেনে নেয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু যখন ছাগলের পা নড়ে উঠে তখন সব শিঁকল ছিঁড়ে গিয়ে মানুষগুলো নানাদিকে ছিঁটকে পড়ে যায়। এতে প্রায় অর্ধেক সংখ্যক মানুষের মৃত্যুও হয়। কারো পক্ষে ছাগলটিকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। তখন সবাই লালমতিকে ছাগল নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেয়। লালমতি সেই যোগী ছাগলটিকে বক্ষ বন্ধনী কাপড় (রিসা) দিয়ে বেঁধে টেনে এনে বাড়িতে নিয়ে অাসে। অার তার জন্য পৃথক করে একটি সুন্দর ঘর তৈরি করে দেয়। সে ছাগলটিকে দিনের বেলায় ছেড়ে দেয় অার রাতের বেলায় ঘরের মধ্যে বেঁধে রাখে। রাত্রে কিন্তু ছাগলরূপী হেমন্ত মানুষের রূপ ধারণ করতে পারে। কিন্তু দিনের বেলায় যখন সে ছাগলের রূপ ধারণ করে তখন তার মধ্যে অার মনুষ্যত্ব জ্ঞান থাকে না। তার অাচরণ পশুর মত হয়ে যায়।

পাড়ার মেয়েরা ঝর্ণার পানি অানতে গেলে অথবা বন থেকে লাকড়ি অানতে গেলে ছাগলটি সেখানে গিয়ে পিছন থেকে বা সম্মুখ থেকে তাদের অাক্রমণ করে। কখনো কখনো কারোর হাঁটু ভেঙ্গে দেয়। নয়তো বা হাতে-পায়ে জখম করে দেয়। জুমে গিয়ে বিবিধ শাকসবজি খেয়ে ফেলে। পানের বরজে গিয়ে বারইয়ের সমস্ত পান খেয়ে ফেলে এবং ঘরের অাঙ্গিনার ফুলের বাগান থেকে সব ফুল ও ফুলগাছ খেয়ে সাবাড় করে দেয়। ছাগলটির অত্যাচারে পাড়ার মেয়েরা নদী হতে বা ঝর্ণার পানি সংগ্রহ করতে পারছে না। ছাগলটি জুমের সব রকমের শাক খেয়ে ফেলে। উঠানে ফুলের বাগান করা যাচ্ছে না। এভাবে ছাগলটি প্রতিদিন কোনো না কোনো পরিবারের ক্ষতি সাধন করতে থাকে। কেউ লালমতির কাছে কোনো অভিযোগ করলেও লালমতি ছাগলটাকে বাঁধা দিতে পারছে না। সারারাত লালমতি ছাগলরূপী হেমন্তকে লোকজনের অভিযোগের কথা বুঝিয়ে বললেও অাবার দিনের বেলায় সে একই রকম অঘটন ঘটিয়ে থাকে।

এমনি করে লালমতির প্রেমিক ছাগলরূপী হেমন্ত প্রতিদিন পাড়া গ্রামের কারো না কারোর নানা রকম ক্ষতি করতে থাকে। পাড়ার গণ্যমান্য ব্যক্তি বর্গ, নারান, খিজা সকলে মিলে অনেকবার অালাপ অালোচনা করে লালমতির যোগী ছাগলের বিরুদ্ধে বিচার করে ছাগলটির ক্ষতি রোধ করার চেষ্টা চালায়। কিন্তু তাতে কোনো ফল হচ্ছে না। পরিশেষে গোঁসাইন রাজার দরবারে গিয়ে লালমতির সেই যোগী ছাগল বা জিঁজুকপুন্দার বিরুদ্ধে নালিশ বা অভিযোগ করা হয়। কিন্তু তবুও কোনো রকমে তার উৎপাত কমানো যাচ্ছে না। তখন রাজা ছাগলটিকে তার দরবারে ধরে নিয়ে যাওয়ার জন্য অাদেশ করেন। কিন্তু কেউ তাকে ধরতে গেলে সে জীবিত ফিরে অাসতে পারে না। এমনি করে বহু লোকের মৃত্যু হয়। কারোর পক্ষে লালমতি ছাগলটিকে ধরে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। ছাগলটিকে ধরার ব্যাপারে কথা উঠলে প্রাণের ভয়ে সবাই পালিয়ে যায়। তারপর গোঁসাইন রাজা সেই ছাগলকে বন্দুক, কামান দিয়ে মেরে দরবারে হাজির করার জন্য অাদেশ করেন। বন্দুক, কামান নিয়ে ছাগলটিকে অাক্রমণ করা হলো কিন্তু ছাগলটির লাথি খেয়ে কামান পর্যন্ত বহু দূরে উড়ে গেল। কামানের গোলাতেও ছাগলটির মৃত্যু হলো না। তখন গোঁসাইন রাজা নিরূপায় হয়ে তার রাজ্যের প্রতিটি বাজারে ঢোল পেটানোর জন্য দু’জন ঢেঁঢরা বাদক যথাক্রমে হাচুকফা অার বজফাকে পাঠিয়ে দেন। হাচুকফা অার বজফা যে বাজারে গিয়ে ছাগলটিকে ধরার জন্য ঢোল পিটিয়ে ঘোষণা জারি করে, তখন সেখানে ঢোল ধরার লোক তো থাকে না, ঘোষণা শোনার সঙ্গে সঙ্গে বাজারে কোনো পুরুষ লোক থাকে না। ঐ ছাগলটিকে ধরার ভয়ে বাজার শূন্য হয়ে যায়। তখন বাজারে মানুষ পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া যায় না। হাচুকফা অার বজফা অার ঢোল না পিটিয়ে কামি রোয়াজার পাড়ার দিকে যায়। সেখানে তারা রাত্রি বেলায় পাড়াময় ঘুরে ঘুরে বেড়ানোর সময় অচাই দর্বা সিং এর বাড়ির কাছে গিয়ে তার প্রথম মেয়ে রায়বতীর স্বামী সুমন্তের বীরত্বের কাহিনী শুনতে পায়। তারা ভোরে উঠে গোঁসাইন রাজার নিকট গিয়ে সুমন্তের সব রকমের বীরত্বের কাহিনী রাজাকে শোনায়।

গোঁসাইন রাজা তাদের কথা শুনে রাজা কামি রোয়াজার নিকট দূত পাঠিয়ে জানান যে, তাঁর রাজ্যে এক যোগী ছাগলের উৎপাতে রাজ্যের সাধারণ জনগণ সুষ্ঠু জীবনযাপন করতে পারছে না। তাদের ক্ষেত-খামার নষ্ট করে দিচ্ছে। মেয়েরা ঝর্ণার পানি ও লাকড়ি অানতে গেলে ছাগলটি শিং দিয়ে গুঁতো মেরে তাদের হাঁটু ভেঙ্গে দেয়, হাত-পা ভেঙ্গে দেয়। জুমের তিল, ধান, সুতা খেয়ে ফেলে। যা কাছে পায় তার সব শেষ করে দিচ্ছে। তাকে কেউ ধরতে পারছে না। কামানের গুলিতেও মরে না। তাকে ধরার মত অাপনার গ্রামে সুমন্ত নামের এক বীর অাছে শুনেছি, দয়া করে একটু পাঠিয়ে দেবেন। এই ছাগলটাকে মারতে না পারলে এ রাজ্যে অার শান্তি অানা যাচ্ছে না। কামি রোয়াজা রাজদূতের মাধ্যমে সব খবর শুনে ছোট ভাইয়ের রাজ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে বিশেষ চিন্তা করেন। তার গ্রামের অচাইকে খবর দিয়ে বলেন, “অচাই বাবু, অামার ছোট ভাইয়ের রাজ্যে বড়ই অশান্তি চলছে। সেখানে এক যোগী ছাগল অাছে, কেউ তাকে ধরতে পারছে না। সেটি কামানের গুলিতেও মররছে না। সুতরাং তাকে না মারা পর্যন্ত সেই রাজ্যে শান্তি নেই। সেই যোগী ছাগলকে যে মারতে পারবে তাকে রাজ ভান্ডার থেকে যথেষ্ট সম্পত্তি দেয়া হবে। অাপনার মেয়ের জামাই সুমন্ত দ্বারাই এ কাজটি সম্ভব হতে পারে, দয়া করে সুমন্তকে একটু পাঠাবার ব্যবস্থা করবেন।”

এই কথা শুনে অচাই বাড়িতে ফিরে গিয়ে সুমন্তকে ডেকে বললেন, রাজার অাদেশ, তোমাকে গোঁসাইন রাজার নিকট যেতে হবে। রাজা যা অাদেশ করবেন তা পালন করতে হবে। তিনি রাজদূতের সঙ্গে যাওয়ার জন্য বলেন। শ্বশুরের কথামত সুমন্ত পরের দিন গোঁসাইন রাজার নিকট যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে নেয়। রায়বতী তা শুনে তার মা-বাবা অার স্বামীকে বাঁধা দিয়ে বলে, “ক’দিন হচ্ছে মাত্র অামাদের বিয়ে হয়েছে। শুনেছি সেই ছাগলের কাছে কেউ ভয়ে যেতে চায় না। কারণ সেই ছাগলকে কামানের গুলি দিয়েও মারা যাচ্ছে না। প্রাণের ভয়ে কেউ সেখানে যেতে চায় না। বাবার তো লোভ ধরে গেছে, রাজ ভান্ডার থেকে বহু ধন-দৌলত সম্মানি পাবে এ অাশায়। কিন্তু জামাইয়ের ভবিষ্যৎ পরিণতি কি হবে একবারও ভেবে দেখোনি! সবসময় জামাইয়ের শক্তি নিয়ে বাহাদুরি করতে চাও।” এই কথা বলে রায়বতী স্বামীর পোশাক ধুয়ে অানার জন্য ঘাটে চলে যায়। সে ঘাটে পৌঁছে যখন সেই পোশাকগুলো ধোয়ার জন্য কালো পাথরের উপর বসে তখন হাচুকফা ও বজফা এসে বলে, “রায়বতী তুমি কার জন্য কাপড় ধৌত করছ? ওগুলো রাখ, তোমার সাথে অনেক অালাপ অাছে। ভিন পাড়ার ছেলের প্রতি তোমার এত লোভ কেন? তোমাকে অাজ কাপড় ধুতে দেবো না।”

তখন রায়বতী বলে, “একথা বলার অধিকার তোমাদের কারোর নেই, তোমাদের সাথে অামার সামাজিক সম্পর্ক হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অাত্নীয়তার দিক থেকে তোমরা হচ্ছো অামার ভাগিনা। তোমরা লজ্জাহীন হয়ে কথা বলতে এসো না। অামাকে তাড়াতাড়ি কাপড় ধুয়ে চলে যেতে হবে। বিরক্ত করতে এসো না। তোমাদের সাথে সম্পর্ক করার সুযোগ যদি থাকতো তাহলে এতদিনে হয়ে যেতো। এ ধরণের অাত্নীয়তার কাঁটা অাছে। তাই সম্ভব হয়নি।

রায়বতীর কথা শুনে হাসুকফা ও বজফা বলে, তোমার সেই সব কথা বাদ দাও, অাগে অামাদর কথা শোন। এখন কাপড় ধোয়া বন্ধ কর। এইভাবে নানা কথা বলার পর রায়বতীর অার কাপড় ধোয়া হলো না। সুমন্ত অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পরও রায়বতীকে ঘরে ফিরতে না দেখে তার খোঁজে স্নান ঘাটে গিয়ে দেখে, হাচুকফা ও বজফা তার স্ত্রী রায়বতীকে দু’পার্শ্ব থেকে দু’জনে হাত ধরে টানাটানি করছে। সুমন্ত রাগান্বিত হয়ে লাফ দিয়ে যখন ছড়ার উপর নামল তখন হাচুকফা অার বজফা রায়বতীকে ছেড়ে দৌঁড়ে পালিয়ে যায়। এ ঘটনা বর্ণনা করে সুমন্ত রোয়াজার গ্রামে এসে গণ্যমান্যদের কাছে নালিশ করে। এরপর সে গ্রাম থেকে গোঁসাইন রাজার নিকট চলে যায়। সুমন্ত গোঁসাইন রাজার নিকট গিয়ে পৌঁছলে গোঁসাইন রাজা তাকে খুব সম্মান দিয়ে গ্রহণ করেন এবং তার সমস্যার ব্যাপারে একে একে সব অালাপ করেন। এসকল সমস্যা সমাধান করার ব্যাপারে কী কী করণীয় সে বিষয়ে তাদের অালাপ হয়। গোঁসাইন রাজার কথার বিবরণ শুনে সুমন্ত বলে, “মহারাজ সেই যোগী ছাগলকে যুদ্ধ করে ধরা সম্ভব হবে না। কৌশল অবলম্বন করতে হবে। অামার যা প্রয়োজন হবে তা অাপনাকে জানাবো। এখন কিছু সংখ্যক সৈন্য অামার সাথে দিলে অামি অামার কাজ শুরু করতে পারি।”

সুমন্ত এবং গোঁসাইন রাজার মধ্যে যা অালাপ হয়েছে সে সব কথা লালমতি শুনতে পেয়েছে। সেদিন রাত্রে তার ছাগলরূপী হেমন্তকে কাছে এনে লালমতি অনেক কথা অালাপ করে। লালমতি তার প্রেমিক ছাগলরূপী হেমন্তকে বলে, কাল গোঁসাইন রাজার সৈন্যরা তোমাকে নিয়ে যেতে অাসবে। এতদিন বাচঁতে পারলেও এবার তোমার বাঁচার কোনো পথ নেই। সুমন্ত তোমার বিরুদ্ধে কাজ করার জন্য গোঁসাইন রাজার নিকট চলে এসেছে। এত করে বলার পরও তুমি অামার একটি কথাও রাখনি। জুমে গিয়ে পরের তিল, সুতা ও ধানের গাছ নষ্ট করেছো, মেয়েরা লাকড়ি অার ঝর্ণার পানি অানতে গেলে তাদের তুমি শিং দিয়ে গুঁতো মেরে হাত-পা ভেঙ্গে দাও। বারইদের পানের বরজে গিয়ে সব পান খেয়ে ফেল, তুমি এভাবে প্রতিদিন উৎপাত করলে তোমাকে কিভাবে রক্ষা করি। মা দূর্গা তোমাকে বলেছেন, বারটি বছর তোমাকে নিরবে থাকতে হবে। অার মানুষকে ভালবেসে তোমার সাধনার সিদ্ধি লাভ করতে হবে। কিন্তু এভাবে প্রতিদিন গ্রামবাসীর সম্পত্তি নষ্ট করলে, অত্যাচার করলে, তোমাকে অামি অার রক্ষা করতে সক্ষম হবো না। ছোটবেলা থেকে রাধা অার কৃষ্ণের মত একই গ্রামের ছেলেমেয়ে হিসেবে অামরা একে অপরকে ভালবেসে এসেছি। তুমি এমন করলে অামাদের এই ভালবাসাকে অার রক্ষা করা সম্ভব হবে না। তোমার এই চরিত্র সংশোধন করতে না পারলে তাহলে অামার পক্ষে তোমাকে রক্ষা করা অার সম্ভব হবে না।

লালমতি সব কথা ছাগলরূপী হেমন্তকে বলল। অার হেমন্ত সব শুনে বলে, তোমার সব কথা শুনলাম, তোমাকে সবাই ভাল বলে। কিন্তু অামার সম্ভাব্য দুর্ভাগ্যের সব কথা ভাল করে জেনেও তা পালন করা অামার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। তুমিও তা ভালভাবে জান। কোনো মানুষ যদি মানুষ হয়ে পশুর ন্যায় অাচরণ করে সে মানুষের মত অাচরণ করতে পারে না। অামি এখন মানুষ। তোমার সাথে মানুষের মতো কথা বলছি এবং সব কথা ভালভাবে বলতে পারছি। যখন অামি পশুর রূপ ধারণ করবো বা পশুর ন্যায় অামার অাকৃতি হয়ে যায়, তখন অামার অার মানুষের মত জ্ঞান থাকে না। তখন অামি কি করি না করি অামি তা বুঝতে পারি না। এভাবে সারা রাত দু’জনে অালাপ করে চোখের জলে বুক ভাসিয়ে দেয়। যখন ভোরের অালো ফুটে উঠছে তখন একজন অারেকজনকে বুকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। লালমতি কান্নার সাথে সাথে প্রলাপ করতে থাকে, ভোর হলে সুমন্ত তোমাকে ধরে নিয়ে যেতে অাসবে। অামার পক্ষে তাকে বাঁধা দেওয়া সম্ভব হবে না। তোমাকে অামি চিরদিনের মতো হারাবো। এভাবে কাঁদতে কাঁদতে ভোর হয়ে অাসে। হেমন্তও অাস্তে অাস্তে ছাগলের রূপ ধারণ করতে থাকে। তখন লালমতি হেমমন্তের গলার রশি খুলে দিয়ে দূরে চলে যাওয়ার জন্য বলে।

ভোর হওয়ার পর সুমন্ত গোঁসাইন রাজার সৈন্যসহ লালমতিদের পাড়ায় পৌঁছে লালমতির ঘরে গিয়ে জিজ্ঞেস করে, “লালমতি, তোমার ছাগল কোথায়? লালমতি সুমন্তের প্রশ্নের উত্তর দেয়, “অামার ছাগল কোথায়, তোমার জিজ্ঞেস করার কী প্রয়োজন? কেনইবা অামি তোমাকে অামার ছাগলের কথা বলবো?” সুমন্ত অাবারো বলে, “বিনা প্রয়োজনে কেউ কোনো কথা কাউকে জিজ্ঞেস করে না। তুমি সহজ-সরলভাবে তোমার ছাগলের সন্ধান দিলে অামার অার কোনো কথা জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন হয়না। অার তুমি যদি সহজভাবে বলতে না চাও অামি যেকোনো উপায় অবলম্বন করতে বাধ্য হব।” লালমতি বলে, “তুমি পুরুষ, তোমার ক্ষমতা অাছে দুর্বল নারীর প্রতি অত্যাচার করার। কিন্তু তুমি জান কিনা জানিনা, সেই দুর্বল নারী অামি নই। অামাকে ভয় দেখিয়ে কোনো লাভ হবে না। তখন রাগান্বিত হয়ে সুমন্ত বলে, “তোমার ছাগলের সন্ধান দেওয়ার কোনো প্রয়োজন অাছে বলে মনে করি না। এরপর সুমন্ত তার সৈন্যদের দিয়ে লালমতির ঘর তল্লাশি করতে, লালমতির রিনাই এবং রিসা (বক্ষ বন্ধনী) বের করে নিতে অাদেশ দেয়। সেই সাথে লালমতির স্বর্ণের অাংটিও বের করতে বলে। সুমন্তের নির্দেশ পেয়ে সৈন্যগণ লালমতির ঘরে গিয়ে তল্লাশি করে পিনোন, কাপড় ও বক্ষ বন্ধনী কাপড় বের করে নেয়। কিন্তু সৈন্যরা ঘর ও ঘরের সিন্ধুক, অালমারি সবখানে দেখেও স্বর্ণের অাংটিটি খুঁজে পেল না। সৈন্যরা সুমন্তকে সব কথা জানাল।

তখন সুমন্ত এসব কথা গভীরভাবে চিন্তা করে, সামান্য অাংটিটিও একজন নারীর নিকট হতে অাদায় করা সম্ভব হল না! এখন কী উপায় অবলম্বন করলে সেই অাংটিটিকে উদ্ধার করা যায়! এভাবে বহুক্ষণ চিন্তা করার পর সে সিদ্ধান্ত নেয় যে, মহারাজার গণক বা গণনাকারীদের দিয়ে গণনা দেখে অাংটিটি খুঁজে বের করতে হবে। তখন সে, সৈন্যদের ডেকে বলে, যাও মহারাজকে গিয়ে বল লালমতির স্বর্ণের অাংটিটি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সেই অাংটিটি না পেলে সেই যোগী ছাগলকে ধরা সম্ভব হবে না। লালমতির সঙ্গে তার অাংটিটি নেই। কোথায় লুকিয়ে রেখেছে তা বলা যাচ্ছে না। মহারাজার গণনাকারীদের দিয়ে গণনা করে যদি ঠিক জায়গাটি চিহ্নিত করা যায় এবং যদি অাংটিটি পাওয়া যায়, তবে ছাগলটিকে ধরা সম্ভব হবে।

তার অাদেশে সৈন্যগণ রাজার নিকট গিয়ে বলে, সেনাপতি অাপনার নিকট অামাদেরকে পাঠিয়েছেন, লালমতির অাংটিটি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সেই অাংটিটি না পেলে ছাগলটি ধরা সম্ভব হবে না। গণনাকারীদের দিয়ে সেই অাংটিটি গণনা করে বের করতে হবে। লালমতি কোথায় লুকিয়ে রেখেছে সে জায়গাটি চিহ্নিত করে অাংটিটি খুঁজে বের করতে হবে। তখন মহারাজা গণনাকারীদের তাড়াতাড়ি ডেকে পাঠালেন এবং তাদেরকে তাড়াতাড়ি রাজার নিকট উপস্থিত হওয়ার জন্য অাদেশ করেন। মহারাজার অাদেশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গণনাকারীগণ এসে গণনা করতে থাকে। বহুক্ষণ গণনা করার পর তারা মহারাজাকে বলে, মহারাজ, খোঁজ পাওয়া গেছে। লালমতি যে পালংকে ঘুমায়, সেই পালংকের মাথার দিকে পশ্চিম পার্শ্বে একটি খোপ অাছে। সেই খোপের মধ্যে বক্ষ-বন্ধনী ‘রিসা’ কাপড়ের টুকরো দিয়ে তৈরি একটি থলেতে লালমতির অাংটিটি রাখা হয়েছে। সেখানে খোঁজ করলে পাওয়া যাবে। গণনাকারীদের দেয়া তথ্য সৈন্যগণ সুমন্তকে জানায়। সুমন্ত লালমতিকে তার সৈন্যবাহিনী দিয়ে গৃহবন্দি করে রাখে। পরে লালমতির পালংক পরীক্ষা করে পশ্চিম দিকের খুঁটির বা পায়ের খোপে স্বর্ণের অাংটিটি পাওয়া যায়।

সুমন্ত এবার লালমতির সবগুলো জিনিস নিয়ে বারই বুড়ার নিকট চলে যায়। সে বারই বুড়া ও বারইনীকে অাবারও বাবা এবং মা সম্বোধন করে তাদের পায়ে ধরে প্রণাম করে। তাদেরকে অনুরোধ করে বলে, অাপনারা একদিন অামাকে বলেছিলেন যে একটি মাত্র মন্ত্র অাছে। মন্ত্র পড়া পান কাউকে খাওয়ালে তার লোহার মত শরীরও পানির ন্যায় তরল হতে বাধ্য হয়। অামি বড়ই বিপদে পড়েছি। অাপনারা যদি অামাকে অাপনাদের ছেলে মনে করেন তাহলে সেই বিপদ হতে বাঁচাবার জন্য অামাকে মন্ত্রটি শিখিয়ে দিয়ে অামাদের রক্ষা করুন।

সুমন্তের সেই করুণ অার্তনাদ শুনে বারই বুড়া তার স্ত্রী বারইনিকে ডেকে মন্ত্রটি শিখিয়ে দেওয়ার জন্য বলে। তখন বারইনি সুমন্তকে খাওয়ানোর সব রকম কায়দাকানুন বলে দিয়ে মন্ত্রটি শিখিয়ে দেয়। সুমন্ত মন্ত্রটি শেখার পর সেই যোগী ছাগলরুপী হেমন্তকে খুজঁতে যায়। তখন ছাগলরূপী হেমন্ত সেই বারই বুড়ার পানের বরজের পানগুলো খেয়ে বরজের অদূরে এক পাহাড়ের ধারে জবর কাটছিল।

সুমন্ত সৈন্যদের দূরে রেখে লালমতির পোশাক পড়ে লালমতির বেশ ধরে ছাগলের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলে, অামি তোমার কাছে এসেছি দুটো কথা বলার জন্য। শুনলাম গোঁসাইন রাজার সৈন্যরা অাসছে। ঐ যে শুনা যাচ্ছে রণ বাদ্য, শিঙার ধ্বনি, কামানের শব্দ ভেসে অাসছে। অাকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয়েছে। তোমার সেই লোহার শরীরকে ধ্বংস করে দেবে। তোমাকে বাঁচানো অার অামার পক্ষে সম্ভব হবে না। তোমার সে বজ্রের মত লাথির শব্দ অার করতে পারবে না। কামানের গুলি প্রতিরোধ করার মত ক্ষমতাও অার থাকবে না। তাই অামি তোমার কাছে ছুটে এসেছি তোমাকে শেষ বারের মত অামার হাত দিয়ে এক কিলি পান খাওয়ানোর জন্য। তোমাকে অামি স্বামী হিসেবে পেয়েও হারাতে বসেছি। অামার উপর রাগ করো না। এই বলে সে ছাগলের গলা ধরে লালমতির ন্যায় পান পড়া খাইয়ে দেয়। তখন মন্ত্র পড়া পান খাওয়ার সাথে সাথে যোগী ছাগলরূপী হেমন্তের শরীর অাস্তে অাস্তে দূর্বল হয়ে পড়ে। সে অার অাগের মত পা নাড়াতে পারছে না। বজ্রের মত অাওয়াজ তুলতে পারছে না। সে ক্রমে ক্রমে মাটিতে নুয়ে পড়ে।

সুমন্ত হুইসেল বাজিয়ে সৈন্যদের ডেকে বলে, এবার নিয়ে চল। তখন সৈন্যরা ছাগলের গলায় রশি বেঁধে নেয়। সুমন্ত ছাগলটিকে লালমতির নিকটি নিয়ে যেতে বলে। ছাগলটি নিয়ে সকলে লালমতির নিকট হাজির হয়। সুমন্ত লালমতিদের বাড়ির উঠানে দাঁড়িয়ে লালমতিকে বলে, বোন অামাকে দোষ দিও না এবং দুঃখ নিও না। মহারাজা তার রাজ্যের প্রজাবৃন্দের শান্তিদানের লক্ষ্যে অামাকে এ কাজের ভার দিয়েছেন। অামি রাজার অাদেশ অমান্য করতে পারিনি। অামরা এখন রাজার নিকট চলে যাবো। অামাকে বিদায় দাও।

লালমতি বলে, তোমার বীরত্বের কাজ তুমি করেছো, তাতে দোষ চাপানোর কোনো কারণ নেই। তবে অামার একটি কথা মনে রেখো, অামাকে যখন স্বামী হারা করেছো, তোমাকেও একদিন স্ত্রী হারা হতে হবে। অামার যে দুঃখ, সেই দুঃখ যেন তোমার ভাগ্যের উপরও পড়ে। অামি অার কিছুই বলতে চাই না। তুমি অাদেশ পালনে ইচ্ছুক তা পালনের জন্য চলে যাও। এখানে বৃথা সময় নষ্ট করে লাভ নেই। যা কর্তব্য অাছে তা তুমি পালন করার চেষ্টা কর। এরপর সকলে রাজার স্বাক্ষাত নেয়ার জন্য জয়ধ্বনি দিয়ে যোগী ছাগলরূপী হেমন্তকে নিয়ে চলে যায়। সুমন্তের বীরত্বের কৌশল দেখে লক্ষ লক্ষ লোক অাশ্চার্যান্বিত হয়ে থাকিয়ে থাকে।

যথাসময়ে সুমন্ত মহারাজার সৈন্যদেরসহ ছাগলটিকে নিয়ে রাজার দরবারে হাজির হয়। একটি সৈন্যও ক্ষয় হয়নি। এর পূর্বে ছাগলটিকে ধরার জন্য গেলে ছাগলটির লাথি খেয়ে অনেক সৈন্য প্রাণ হারিয়েছে। তাই কেউ ছাগলকে ধরা তো দূরের কথা ছাগলের ধারে কাছেও যেতে ভয় পেত। বহুদূর থেকে তীর মেরে এবং বন্দুকের কামান মেরে মারার চেষ্টা করে দেখত। দরজা বেঁধে অাটকানোর চেষ্টা করত! তবুও পারেনি। সুমন্ত একটি মানুষও ক্ষয় না করে সুষ্ঠুভাবে ছাগলটিকে ধরে নিয়ে অাসে।

গোঁসাইন রাজা সুমন্তের বীরত্ব দেখে অাশ্চর্য হন এবং যোগী ছাগলটিকে মায়ের মন্দিরে নিয়ে বলি দেওয়ার জন্য অাদেশ করেন। রাজার অাদেশ পেয়ে রাজার চন্তাই মায়ের মন্দিরে নিয়ে যোগী ছাগলকে বলি দেয়। ছাগলটিকে বলি দেওয়ার পর লালমতি গোঁসাইন রাজার নিকট এসে তার স্বামীর সম্পত্তি দাবি করে বলে, দেশ শান্তিতে রাখার জন্য, প্রজাদের মঙ্গলে রাখার জন্য অামার প্রেমিকাকে হত্যা করার অধিকার রাজার অাছে কিন্তু তার সম্পত্তি অধিকার করার ক্ষমতা রাজার নেই। তার উত্তরাধিকারীকে তার সম্পত্তি ফেরত দিতে হবে। গোঁসাইন রাজা তা শুনে সবদিক বিবেচনা করে লালমতিকে তার প্রেমিকের সকল সম্পত্তি ফেরত দেয়। যোগী ছাগলরূপী হেমন্তের মৃত্যু বরণের পর রাজ্য সম্পূর্ণ শান্ত হয়। সকলের অন্তরে অাবার অানন্দ ফিরে অাসে। লালমতির প্রেম ও সুমন্তের বীরত্ব চিরস্মরণীয় হয়ে থাকে।


মহেন্দ্র লাল ত্রিপুরা

ত্রিপুরা লোককাহিনী ও কিংবদন্তি (২০১২ ইং)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here