icon

লাইব্রেরী নিয়ে যত কথা

Jumjournal Admin

Last updated Nov 18th, 2019 icon 1128

বই মনের চোখ খোলে। আর এ বই সংরক্ষণের উৎকৃষ্টতম স্থান হলো লাইব্রেরী। এই লাইব্রেরী শব্দটিরো জন্মবৃত্তান্ত আছে। ল্যাটিন শব্দ লিবার। কলদীয়রা গাছের ছালকে এ নামে অভিহিত করতো ল্যাটিনরা। এই লিবার থেকে লিবুরাবিয়াম এবং ইংরেজী লাইব্রেরী শব্দের উদ্ভব। তেমনি বহি থেকে বই। পুস্তা থেকে পুস্তক। গ্রন্থি থেকে গ্রন্থ। বাংলা ভাষায় লাইব্রেরীকে ‘গ্রন্থাগার’ বলা হয়। গ্রন্থ মানে বই, আগার মানে গৃহ। অর্থাৎ বই রাখার গৃহকে বাংলায় ‘গ্রন্থাগার’ বলা হয়। এই গ্রন্থাগার শব্দটি বাংলা হলেও এখনও কেমন যেন অপরিচিত মনে হয়। অনেক বিদেশী শব্দ বাংলা ভাষায় এমনভাবে জায়গা করে নিয়েছে যে, এতোদিন পর আমরা সেই শব্দকে হঠাৎ তাড়াতে পারছি না। তাই বাংলায় ‘গ্রন্থাগার’ ব্যবহার না করে ‘লাইব্রেরী’ ব্যবহার করছি। লাইব্রেরী বললে আমাদের চোখের সামনে যে ছবি ভেসে ওঠে। ‘গ্রন্থাগার’ বললে ভাবনার জগতে একটু ব্যাঘাত সৃষ্টি হয় যেন। তবে আমাদের বিশ্বাস, কালের প্রবাহে আস্তে আস্তে একদিন এ শব্দটির সঙ্গে পরিচয় ঘনিষ্ট হবে। শব্দটি একাত্ম হয়ে মিশে যাবে সবার মনে। ছোটদের কাছে গ্রহণযোগ্যতার কথা ভেবে এখানে কিছু শব্দের বাংলা ব্যবহার না করে ইচ্ছাকৃত ভাবেই ইংরেজী রেখেছি। যাতে নিয়ত কথিত শব্দের সঙ্গে বিষয়টি সহজেই শিশু কিশোর পাঠকদের হৃদয়ের কাছাকাছি পৌঁছায়। যেমন যদিও বিদ্যালয় ও গ্রন্থাগার শব্দ দুটি লিখতভাবে অনেক ব্যবহার হয়ে থাকে, তথাপি আমরা বলবার সময় বিদ্যালয়ে যাচ্ছি বা গ্রন্থাগারে যাচ্ছি না বলে স্কুলে যাচ্ছি, লাইব্রেরীতে যাচ্ছি বলে থাকি।

লাইব্রেরীতে বই থাকে আমরা জানি, কিন্তু আমরা অনেকেই জানি না হাতের কাছে তৈরি অবস্থায় পেতে বইগুলোতে কতোটা স্তর পেরিয়ে তবেই আমাদের সামনে আনতে হয়। অনেকের ধারণা বইয়ের দোকানে সাজানো বই এবং লাইব্রেরীতে সাজানো বই বোধ হয় একই কর্মধারায় সাজানো। এজন্য আমাদের দেশে অনেকেই বইয়ের দোকানকে লাইব্রেরী বলে থাকেন। এটা হয়েছে প্রকৃত লাইব্রেরী সম্পর্কে কোন ধারণা না থাকার ফলে। বইয়ের দোকানকে লাইব্রেরী বলা ভুল। বইয়ের দোকান এবং প্রকৃত লাইব্রেরীতে অনেক পার্থক্য আছে। মানুষ নিজের বাড়িতে এক রকম সাজসজ্জার নিজস্ব নিয়মে বাস করে। কিন্তু সে যখন বাইরের সমাজে মেশে তখন অনেক সময়ে তাকে স্বকীয়তা বাদ দিয়ে সামাজিক রীতি গ্রহণ করতে হয়।

বইয়ের দোকান এবং লাইব্রেরীর ব্যাপারে কিছুটা এরকমই। একসঙ্গে অনেক বই সুন্দর করে সাজিয়ে রাখলেই তা কখনও লাইব্রেরী হয় না। বই যতক্ষণ দোকানে থাকে এবং অর্থের বিনিময়ে ক্রয় করতে হয়, ততক্ষণ অন্যান্য পণ্য সামগ্রীর সঙ্গে তার কোনো তফাৎ নেই। বাজার বা দোকান থেকে কেনার পর বিশেষ পদ্ধতিতে বই শ্রেণীবদ্ধভাবে লাইব্ররীতে সারিবদ্ধভাবে সাজানো থাকে। লাইব্রেরীর কাজ হচ্ছে পাত্র অনুযায়ী জ্ঞান পরিবেশন করা মূখ্যতঃ ব্যক্তিগত উন্নতি এবং গৌণতঃ সমষ্টিগতভাবে মানব সমাজের উন্নতি সাধন করে। মানুষ যেমন খাবারের জন্য বেঁচে থাকে না, বেঁচে থাকার জন্য খায় – তেমনি মানুষ বই পড়ার জন্য বেঁচে থাকে না। বেঁচে থাকার জন্য পড়ে। সুতরাং শুধুমাত্র আনন্দ দেয়াটাই কোন লাইব্রেরীর উদ্দেশ্য নয়। পাঠককে মানুষের মত বেঁচে থাকার জন্য গড়ে তোলাই লাইব্রেরীর উদ্দেশ্য। লাইব্রেরী সায়েন্সের ভাষায় লাইব্রেরী হচ্ছে মানব প্রকৌশল কেন্দ্র। এ দিক থেকে বইয়ের দোকানে লাইব্রেরী না বলে ‘বইয়ের দোকান’ বা বুক শপ বলাই ভাল। সেখানে বই বিক্রি হয়। লাইব্রেরীতে বই-পুস্তক ব্যবহার করতে কোনো মূল্য দিতে হয় না বললেই চলে। যা দিতে হয় তা অতি সামান্য তাও চাঁদা বা অনুদান হিসেবে।

লাইব্রেরীতে বই বিজ্ঞান সম্মতভাবে বিশেষ পদ্ধতিতে সাজানো হয়। এখানে লাইব্রেরী ভেদে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সেবা ও সুশিক্ষার জন্য জ্ঞানের সকল শাখা-প্রশাখার শিক্ষা সামগ্রী সুষ্ঠুভাবে সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও সরবরাহ করা হয়। একটি আধুনিক লাইব্রেরী সর্বপ্রকার অডিও ভিজ্যুয়াল উপকরণ সহ সকল প্রকার বইপত্র সংগ্রহের ভান্ডার হিসেবে অভিহিত করা যায়। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লাইব্রেরী সম্পর্কে বলেছেন – “মহাসমুদ্রের শত বৎসরের কল্লোল কেহ যদি এমন করিয়া বাঁধিয়া রাখিত যে, সে ঘুমাইয়া পড়া শিশুটির মতো চুপ করিয়া থাকিত, তবে সেই নীরব মহা সমুদ্রের সহিত এই লাইব্রেরীর তুলনা হইত।

এখানে ভাষা চুপ করিয়া আছে, প্রবাহ স্থির হইয়া আছে, মানবাত্মার অমর আলোকে কালো অক্ষরের শৃঙ্খল কাগজের কারাগারে বাঁধা পড়িয়া আছে। ……… হিমালয়ের মাথার উপরে কঠিন বরফের মধ্য যেমন কত বন্যা বাঁধা আছে, তেমনি এই লাইব্রেরীর মধ্য মানব হৃদয়ের বন্যাকে বাঁধিয়া রাখিয়াছে। …… লাইব্রেরীর মধ্যে আমরা সহস্র পথের চৌ মাথার উপরে দাঁড়াইয়া আছি। কোনো পথ অনন্ত সমুদ্রে গিয়াছে, কোনো পথ অনন্ত শিখরে উঠিয়াছে, কোনো পথ মানবহৃদয়ের অতল স্পর্শে নামিয়াছে। যে যেদিকে ইচ্ছা ধাবমান হও, কোথাও কোন বাঁধা পাইবে না।”

লাইব্রেরীতে সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন, পিরিয়াডিকালস বা বিভিন্ন প্রকার সাময়িকী সংরক্ষণ করা হয়। এক কথায় লাইব্রেরী হলো জ্ঞান ও তথ্যের মহাসমুদ্র যেখান থেকে জ্ঞান আহরণ করে ও তথ্য সংগ্রহ করে মানব কল্যাণে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

প্রকৃতপক্ষে সমাজ-মানব সভ্যতার প্রয়োজনেই ক্রমান্বয়ে লাইব্রেরী গড়ে উঠেছিলো। মিশরীয় সভ্যতার প্রাচীনকালে লাইব্রেরী বিশেষভাবে বিস্তার লাভ করেছিলো পন্ডিতগণের বিবরণ থেকে জানা যায়, মিশরের বিত্তশালী, জ্ঞানী-গুণীদের মধ্যেও রাজদরবারে এবং ধর্মশালায় লাইব্রেরী গড়ে উঠছিলো। সে যুগের একটি বহুল প্রচারিত এবং প্যাপিরাসে লিখত বই ‘বুক অব দ্যা ডেড’ মিশরের ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য। মেসোপটেমিয়ার শহরগুলোর ধ্বংসস্তুপের ভেতর বহু সরকারি-বেসরকারি ও ব্যক্তিগত লাইব্রেরীর নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে। লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠার ব্যপারে এশিয়রা বেশ উৎসাহী ও অগ্রগামী ছিল। তার মাটির চাকতিতে লেখা বইয়ের বিশাল সংগ্রহ গড়ে তুলেছিল।

আমাদের দেশের লাইব্রেরীর ইতিহাসও অতি প্রাচীন। আমরা সকলেই জানি এক সময়ে আমাদের দেশ ব্রিটিশ শাসকদের অধীনে ছিল। তখন ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ মিলে ছিলো একটি উপমহাদেশ।এই পুরো উপমহাদেশটি ইংরেজরা শাসন করতো। ফলে এদেশে অনেক ইউরোপীয়দের বসবাস ছিলো। এরা আমাদের দেশে নীল চাষ করতো। এজন্য নীলকর সাহেবদের ঘন ঘন এদেশে যাতায়াত ছিলো। সেই সময়ে ঊনিশ শতকের প্রথম ও মধ্যভাগে ইংল্যান্ডে পাবলিক লাইব্রেরী আন্দোলন দিন দিন জোরদার হয়ে উঠেছিলো এবং প্রবল বিরোধ সত্ত্বেও ১৮৫০ সালে ব্রিটিশ সংসদে পাবলিক লাইব্রেরী বিল পাশ হয়েছিলো। ১৮৫৩ সালে এর বিস্তৃতি ঘটে। সেই আন্দোলনের প্রভাবেই ইংল্যান্ড থেকে আগত কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মচারীর প্রচেষ্টায় ১৮৫৪ সালে উত্তর বঙ্গের রংপুরে ‘রংপুর পাবলিক লাইব্রেরী’, বগুড়ায় ‘বগুড়া উডবার্ন পাবলিক লাইব্রেরী’, দক্ষিণের বরিশালে ‘বরিশাল পাবলিক লাইব্রেরী’ ও যশোরে ‘যশোর পাবলিক লাইব্রেরী’ প্রতিষ্ঠিত হয়। এই লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠায় বেসরকারিভাবে যারা প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে মিঃ কেম্প, মিঃ রেক্স ও মিঃ রয়েল- এই তিনজনের নাম বিশেষভাবে স্মরনীয়। এরা লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যক্তিগত সাহায্য ছাড়াও সে কালের বিত্তবান শ্রেণী ও জমিদারদের কাছে আর্থিক সাহায্য সংগ্রহ করছিলেন। সাহায্য দাতাদের মধ্য কয়েক জন নীলকর সাহেবও ছিলেন।

ঢাকার সবচেয়ে পুরাতন লাইব্রেরী হচ্ছে – নর্থব্রুক হল লাইব্রেরী। বুড়িগঙ্গার তীরে অবস্থিত ‘লালকুঠি’ নামের দালনাটিই সেই ‘নর্থব্রুক হল লাইব্রেরী’। এই লাইব্রেরী ১৮৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং তৎকালীন ভারতের গভর্ণর জেনারেল লর্ড নর্থব্রুক ঢাকায় বেড়াতে এলে তাঁর সম্মানে এই লাইব্রেরীর নাম তাঁর নামে ‘নর্থব্রুক হল লাইব্রেরী’ করা হয়।  বগুড়ার উডবার্ন পাবলিক লাইব্রেরীও তখনকার আসাম বাংলার লেফট্যানেন্ট গভর্ণর উডবার্ন – এর নামানুসারে ‘বগুড়া উডবার্ন পাবলিক লাইব্রেরী’ নামকরণ করা হয়। এসি রিয়ার অন্যতম রাজা আসুরবানি পাল যীশু খ্রীষ্টের জন্মের অনেক আগে ( ৬৬৮ -৬২৬ খ্রীঃ পূঃ ) লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠার জন্য খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর বিশাল লাইব্রেরীতে সরকারি দলিলপত্র ছাড়াও ব্যাকরণ ইতিহাস, বিজ্ঞান, ধর্ম ও সাহিত্য সংক্রান্ত রচনাবলী ছিল। এমনি অনেক তথ্য আমরা জানতে পারি।

লাইব্রেরীতে এসব তথ্য সংরক্ষিত আছে বলে। সংরক্ষণের এই প্রাচীন ধারা কালের বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে। সভ্যতার পাশাপাশি লাইব্রেরীর অনেক উন্নতি হয়েছে। বই যেমন জ্ঞানের বাহন, তেমনি লাইব্রেরী হচ্ছে সেই জ্ঞানের ধারক ও রক্ষক। বেকন বলেছেন, মানুষের জীবনে যা কিছু চাওয়া-সুখ, শান্তি, আনন্দ, বিনোদন, বেদনার উপশম, সবই পাবে বইয়ের মাঝে লাইব্রেরীতে।


তথ্যসূত্রঃ “শিক্ষকতা মহান পেশা” – মীর আবু সালেহ শামসুদ্দিন শিশির। 

দৈনিক আজাদী- ২৪/১১/২০০৪

Share:
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - [email protected] এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা

Jumjournal Admin

Administrator

Follow Jumjournal Admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *