icon

শেকড়ের সন্ধানে: রাজমালার আলোকে ত্রিপুরার উৎপত্তির ইতিহাস(পর্ব-২)

MUKUL KANTI TRIPURA

Last updated May 20th, 2020 icon 21

সুপ্রিয় পাঠকবৃন্দ, ‘রাজমালার আলোকে ত্রিপুরার উৎপত্তির ইতিহাস’ এর দ্বিতীয় পর্বের আলোচনায় আপনাদের সবাইকে শুভেচ্ছা ও স্বাগত জানাচ্ছি।

আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আপনাদের আলোচনায় অংশগ্রহণ আমাদের ইতিহাস অনুসন্ধানে অনেক বেশি সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। তাই সাথে থাকুন এবং মন্তব্য করুন। 

‘রাজমালা’ নিয়ে ইতিপূর্বের পোস্টে বেশ কিছু বিষয় আলোচনা করেছিলাম। কিন্তু আলোচনায় এ সম্পর্কিত আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উপেক্ষিত রয়ে গেছে বিধায় আরেকটু আলোচনার প্রয়োজনবোধ করছি।

আচ্ছা, একটু কল্পনাশক্তি দিয়ে ভেবে দেখুনতো, ত্রিপুরা মহারাজাগণের রাজ্য শাসনের অতীত ঘটনাগুলো যখন কোন এক সুতো দিয়ে একটি মালা আকারে গাঁথা হয়, তাহলে কেমন হবে? আবার তা যদি হয় ঠিক সাদা, লাল, হলুদ ববেগুনি  পুষ্পমাল্যের মতো?

সত্যিই অপূর্ব সুন্দর মনে হবে তাই না? হ্যা, আমার কাছে ত্রিপুরা অধিপতিদের পদ্যাকারে নান্দনিক এই ধারাবাহিক সুবিন্যস্ত ঘটনাগুলো তেমনই অসাধারণ একটি মালার মতোই মনে হয়।

হয়তোবা এই কারণেই রাজমালা গ্রন্থের প্রণেতাগণ মহারাজাগণের কাহিনীগুলোকে বিভিন্ন সর্গে, পর্বে অথবা লহরে সন্নিবেশিত করে নাম দিয়েছিলেন ‘রাজমালা’।

তবে এই রাজমালা সৃষ্টির কৃতিত্ত্ব কি সব মহারাজাগণকে দেওয়া যায়? না, এমন কৃতিত্বের অর্জন শুধুই মহারাজা ধর্ম্মমাণিক্যের।

কেননা, তাঁর পূর্বের ত্রিপুরা মহারাজাগণের মধ্যে কারোর মনে রাজাগণের ইতিহাস রচনার এমন অভূতপূর্ব সৃষ্টিশীল ভাবনার উদয় ঘটেছিল বলে আমার অন্তত মনে হয়না। অথবা হলেও তা কোনরূপ ফলাফল পরিলক্ষিত হয়নি।

তাই বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ‘রাজমালা’ গ্রন্থ রচনা করানো মহারাজা ধর্ম্মমাণিক্যের শাসনামলের এক উজ্জল অবিনশ্বর কীর্তি। 

এই মহারাজা ধর্ম্মমাণিক্য ছিলেন মহারাজা রত্নমাণিক্যের অধস্তন তৃতীয় পুরুষ। তিনি ছিলেন পবিত্রমনা, ধর্মপরায়ন ও করুণহৃদয়সম্পন্ন রাজা। মহারাজা ধর্ম্মমাণিক্য ত্রিপুরা নরপতিদের এই ইতিহাস রচনার ভার দিয়েছিলেন চতুর্দ্দশ দেবতার চন্তাই বা প্রধান পূজারী দুর্লভেন্দ্র চন্তাইকে।

দুর্লভেন্দ্র চন্তাই রচনার দায়ভার কাঁধে নিলেন। রচনায় পন্ডিত শুক্রেশ্বর ও বানেশ্বর ভাতৃদ্বয়ের অবদানও নিতান্ত কম নয়। প্রথম যে গ্রন্থটি প্রকাশ করা হয় তাঁর নাম দেওয়া হয় ‘রাজরত্নাকর’।

গ্রন্থটি রচিত হয়েছিল ৮৬৮ ত্রিপুরাব্দ(১৪৫৮ খ্রি.) থেকে ৮৭২ ত্রিপুরাব্দ(১৪৬২ খ্রি.) সময়ের মধ্যে। কেননা মহারাজা ধর্ম্মদেব এর রাজত্ত্বকাল ছিল এই চার বছর।

তবে মহারাজা ধর্ম্মমাণিক্যের সময়ের প্রথম ও প্রাচীন রাজমালাটি বর্তমানে খুঁজে পাওয়াটা দুস্কর। কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে বললেও অত্যুক্তি না হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়।

প্রায় সকল পন্ডিতগণের মতে, ‘রাজরত্নাকর’ রচিত হয়েছিল ত্রিপুরা জাতির জাতীয় ভাষা ‘ত্রিপুর ভাষায়’(বর্তমানে এই ভাষাটি ককবরক বা ত্রিপুরা ভাষা হিসেবেই পরিচিত)।

‘শ্রীরাজরত্নাকরম্’ গ্রন্থের ভূমিকার চার নং পৃষ্ঠায় জ্যোতিষ নাথ(৩০/০৮/২০০২খ্রি.) ‘রাজরত্নাকরম’ এর প্রথম সর্গের কথা উল্লেখ করে বলেন-

“এই সর্গেই কথিত হয়েছে যে, চন্তায়ি দুর্লভেন্দ্র ত্রিপুরভাষায় আদিতম রাজরত্নাকরটি রচনা করেছিলেন। কালের ব্যবধানে এর অবলুপ্তি যে কোন কারণেই ঘটুক না কেন, এ কথা আজ ঐতিহাসিকভাবে প্রতিপাদনযোগ্য যে ত্রৈপুরভাষীদের প্রাচীনভাষাসংস্কৃতি একদিন নিজ অধিকারেই উত্তম সাহিত্যকৃতি রচনার শক্তি অর্জন করেছিল” (সূত্র: জ্যোতিষ নাথ, শ্রীরাজরত্নাকরম্, ২০০২ খ্রি.)।

আবার এই গ্রন্থটিকে সংস্কৃত ও বাংলা ভাষায় অনুবাদ করে নাম দেওয়া হয় ‘রাজমালা’। এই সংস্কৃত বা বাংলা ভাষায় রচিত গ্রন্থগুলোর উপর ভিত্তি করেই অধূনা রাজমালাগুলো সম্পাদিত হয়েছে।

তাই এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, বর্তমানে যেই ত্রিপুরার ইতিহাস লিখার প্রচেষ্টা করুক না কেন তাঁর রাজমালার আশ্রয় নেওয়াটা আবশ্যক। 

আমি ত্রিপুরার উৎপত্তির ইতিহাস বিষয়টি আলোচনার জন্য যে রাজমালা বা গ্রন্থগুলোর আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করেছি সেগুলোর পরিচিতি এবং ত্রিপুরার উৎপত্তির বিষয়টি কিভাবে উপস্থাপিত হয়েছে সেগুলোই আমার আলোচনার মূখ্য বিষয়।

তবে আজকে সবগুলো বিষয়ে বিশদভাবে আলোচনা করার সুযোগ না পেলেও পরবর্তী পর্বগুলোতে অবশ্যয় আলোচনার সুযোগ পাওয়া যাবে বলে আমি আশাবাদী।

তাই আজ আমি প্রথমেই আলোচনায় নিয়ে আসতে চাই শ্রীকৈলাসচন্দ্র সিংহ প্রণীত ও শ্রীযোগেশচন্দ্র সিংহ কর্তৃক ১৩০৩ বঙ্গাব্দের(১৮৯৬খ্রি.) আশ্বিন মাসে প্রকাশিত ‘রাজমালা বা ত্রিপুরার ইতিহাস’ গ্রন্থটিকে।

যে গ্রন্থটি মহারাজা বীরচন্দ্র মাণিক্য বাহাদুরের সময়ে প্রণীত হয়েছিল।  তিনি এই গ্রন্থে ত্রিপুরা রাজ্যকে ভারতবর্ষের সবচেয়ে প্রাচীন রাজ্য বলে আখ্যা দিয়েছেন। গ্রন্থের ভূমিকার শুরুতেই তিনি লিখেছেন-

“ত্রিপুরা ভারতবর্ষ মধ্যে একটী অতি প্রাচীন রাজ্য। সুবিখ্যাত গুপ্ত সম্রাটদিগের শিলালিপি পর্য্যালোচনা দ্বারা অনুমিত হইতেছে যে, মিবারও ইহার ন্যায় প্রাচীন নহে।” 

কিন্তু কে এই কৈলাসচন্দ্র সিংহ? কিভাবে তিনি এই গ্রন্থটি রচনা করেছিলেন? তাহলে একটু জেনে নেওয়া যাক।

শ্রীকৈলাসচন্দ্র সিংহের জন্ম ১৮৫১ খ্রি. এবং মৃত্যু ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দ।  অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে কৈলাসচন্দ্র সিংহ এর খুল্লপিতামহ রায় রামপ্রসাদ সিংহ ছিলেন ত্রিপুরা রাজার অধীনন্ত এক রাজকর্মচারী।

কিন্তু নিজ গুণে গুণান্বিত এই রামপ্রসাদ বাবু পরবর্তীতে মহারাজা রাজধর মাণিক্যের প্রতিনিধি(আম-মোক্তার) নিযুক্ত হয়ে তৎকালীন জাহাঙ্গীর নগর অর্থাৎ বর্তমান ঢাকায় আজীবন কর্মরত ছিলেন।

তাঁর মৃত্যুর অনেক বছর পর তাঁর ছেলে অর্থাৎ শ্রীকৈলাসচন্দ্র সিংহ এর পিতা রায় গোলকচন্দ্র সিংহ ১২৪০ বঙ্গাব্দে ত্রিপুরার রাজকার্যে যোগদান করেন। তিনি চাকুরী জীবনের অধিকাংশ সময় ছিলেন সেরেস্তাদার অর্থাৎ তৎকালীন ত্রিপুরার রাজস্ব বিভাগের প্রধান কর্মচারী।

পিতা ১২৭৩ বঙ্গাব্দে স্বর্গবাসী হওয়ার পর মাত্র ১৫ বছর বয়সে শ্রীকৈলাসচন্দ্র সিংহ ত্রিপুরার রাজকার্যে কর্মজীবন শুরু করেন।

তবে রাজকার্যে মাত্র ৪ বছর কাজ করার পর তিনি পদত্যাগ করেন।

তাঁর এভাবে পদত্যাগের পেছনে যে কারণটি সবচেয়ে বেশি উল্লেখযোগ্য ছিল মহারাজা ঈশানচন্দ্র মাণিক্যেরে একমাত্র জীবিত পুত্র কুমার নবদ্বীপচন্দ্র বাহাদুরের সাথে তৎকালীন মহারাজা বীরচন্দ্র মাণিক্য বাহাদুরের কলহ। কেননা শ্রীকৈলাসচন্দ্র সিংহ পক্ষ নিয়েছিলেন কুমার নবদ্বীপের।

এমনকি বিভিন্ন জমিদারি, চাকলে রোশনাবাদে স্বীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা ইত্যাদির জন্য কুমার নবদ্বীপ ব্রিটিশ বিচারালয়ে শরনাপন্ন হওয়ার সময় মামলা মোকাবিলার সমস্ত দায়িত্ব পালন করেছিলেন কৈলাস বাবু।

উল্লেখ্য, নবদ্বীপচন্দ্র ভারতীয় উপমহাদেশের প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ সচীন দেববর্মনের পিতা।

তৎকালীন সময়ে ত্রিপুরার ইতিহাস সম্পর্কিত বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ কৈলাসচন্দ্র সিংহ সংগ্রহ করতে সমর্থ হন।

এমনকি ১২৮৩ বঙ্গাব্দে ‘রাজমালা বা ত্রিপুরার ইতিবৃত্ত’ নামক একটি পুস্তকও প্রকাশ করেন তিনি।

আর পরবর্তী ২০ বছরের মধ্যে বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত সংগ্রহের পর সৃষ্টি করেন ‘রাজমালা বা ত্রিপুরার ইতিহাস’ নামক মহারাজাদের কাহিনীসম্বলিত একটি ঐতিহাসিক গ্রন্থ। (সূত্র: শ্রীকৈলাসচন্দ্র সিংহ, রাজমালা ও ত্রিপুরার ইতিহাস, ১৩০৩ ত্রিপুরাব্দ )

শ্রীকৈলাসচন্দ্র সিংহ তাঁর এই ‘রাজমালা বা ত্রিপুরার ইতিহাস’ গ্রন্থে ত্রিপুরার উৎপত্তি নিয়ে যে আলোচনাটি করেছেন তা খুবই যৌক্তিক এবং তথ্যসমৃদ্ধ ।

এমনকি ত্রিপুরা রাজবংশের গৌরবময় অধ্যায়গুলো তিনি অত্যন্ত সুচারুরূপে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছেন তাঁর এই গ্রন্থে।

তবে বিষাদের সময়গুলোও এড়িয়ে যাননি তিনি। লিখেছেন নিখুঁত ভঙ্গিমায়। বারংবার ত্রিপুরা জাতির কথা তুলে ধরেছেন নিবিড়ভাবে। তাহলে একটু দেখে নিই ত্রিপুরার উৎপত্তি সম্পর্কে কি লিখেছেন তিনি?

গ্রন্থ রচনার শুরুতেই অর্থাৎ প্রথম অধ্যায়ে শ্রীকৈলাসচন্দ্র সিংহ ‘ত্রিপুরা’ শব্দটির উৎপত্তি নিয়ে একটি বিশদ আলোচনা করেছেন। এমনকি প্রচলিত কিছু ধারণার দ্বিমতও পোষণ করেন এই ইতিহাসবেত্তা।

শ্রীকৈলাস বাবু তাঁর রাজমালার প্রথম ভাগের উপক্রমণিকার প্রথম অধ্যায়ের সূচনার ১ নং পৃষ্ঠায় তেমনই প্রচলিত অযৌক্তিক (তাঁর মতে) ধারণাগুলো তুলে ধরেছেন এবং লিখেছেন-

“কামরূপ ও রাক্ষিয়াং দেশের মধ্যবর্তী স্থানকে প্রাচীন আর্য্যগণ সুহ্ম আখ্যা দান করেন। ইহার অন্য নাম কিরাত দেশ। বিষ্ণুপুরানে লিখিত আছে, ভারতের “পূর্ব্বদিকে কিরাতের বাস”। সুতরাং দেখা যাইতেছে যে, লৌহিত্য বংশীয় মানবদিগকে আর্য্য ঋষিগণ কিরাত আখ্যায় অভিহিত করিয়াছেন। তদনন্তর কিরাত ভূমি “তৃপুরা” আখ্যাপ্রাপ্ত হয়। এই “তৃপুরা” শব্দ হইতে ক্রমে ত্রীপুরা এবং “ত্রীপুরা” হইতে ত্রিপুরা শব্দের উৎপত্তি।
ত্রিপুরা শব্দের মূল নির্ণয় করা সুকঠিন। তন্ত্র ও পুরাণ আলোচনা দ্বারা বিবিধ প্রকার সিদ্ধান্ত অনুমান করা যাইতে পারে, “ত্রিপুরাসুর হইতে ত্রিপুরা নামের উৎপত্তি কিম্বা ত্রিপুরাসুর নির্ম্মিত তিনটি পুরী হইতে ত্রিপুরা নামের উদ্ভব; অথবা ভগবতী ত্রিপুরা সুন্দরী হইতে ত্রিপুরা নামের উৎপত্তি কিম্বা রাজবংশের স্থাপনকর্তার নামানুসারে এই দেশ ত্রিপুরা আখ্যা প্রাপ্ত হইয়াছে।”

অর্থাৎ প্রাচীনকালে উত্তরে কামরূপ এবং দক্ষিণে রাক্ষিয়াং (রাক্ষিয়াং অর্থ রাক্ষসের নিবাসভূমি এবং প্রাচীন বঙ্গবাসীরা এই দেশকে রসাঙ্গ বলতেন, যার বর্তমান নাম আরাকান) দেশের মধ্যবর্তী স্থানকে সুহ্ম বলা হতো যার অন্য নাম ছিল কিরাত দেশ।

এই কিরাত ভূমিই পরবর্তীতে তৃপুরা আখ্যাপ্রাপ্ত হয় এবং তৃপুরা শব্দটি থেকে ত্রীপুরা ও পরবর্তীতে ‘ত্রিপুরা’ রূপে পাকাপোক্ত হয়।

আবার ত্রিপুরাসুর থেকে ‘ত্রিপুরা’ নামের উৎপত্তি কিংবা তিনটি পুরী হইতে ত্রিপুরা নামের উদ্ভব; অথবা ভগবতী ত্রিপুরা সুন্দরী থেকে ‘ত্রিপুরা’ নামের উৎপত্তি কিংবা রাজবংশের স্থাপনকর্তার নামানুসারে এই দেশের নাম ‘ত্রিপুরা’, ইত্যাদি সিদ্ধান্তগুলোকে শ্রীকৈলাসচন্দ্র সিংহ কোনমতেই মানতে নারাজ। বরং তিনি বলেছেন

“এই সকল সিদ্ধান্ত আমাদের বিবেচনায় নিতান্ত অযৌক্তিক”।

অন্যদিকে তিনি ত্রিপুরা নামের উৎপত্তিতে ত্রিপুরাদের জাতীয় ভাষার প্রভাবকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, তিপ্রা বা ত্রিপুরাদের জাতীয় ভাষায় জলকে বলা হয় ‘তুই’, আর তুই এর সাথে ‘প্রা’ যুক্ত হয়ে নিষ্পন্ন হয়েছে ‘তুইপ্রা’ শব্দটি।

আর এই তুইপ্রা শব্দ থেকে ‘তিপ্রা’ ও তিপ্রা শব্দ থেকে ক্রমেই ‘তৃপুরা’, ‘ত্রীপুরা’ এবং ‘ত্রিপুরা’ শব্দের উৎপত্তি হয়েছে।

এইভাবে ‘ত্রিপুরা’ শব্দের উৎপত্তিকেই তিনি বেশ গুরুত্বসহকারে উপস্থাপন করার প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। তাই উক্ত অধ্যায়ের ২ ও ৩ নং পৃষ্ঠায় তিনি উল্লেখ করেছেন-

“যে অনার্য্য কিরাতদিগকে আমরা “তিপ্রা”(ত্রিপুরা) আখ্যায় পরিচিত করিয়া থাকি, তাহাদের জাতীয় ভাষায় জলকে “তুই” বলে। এই তুই শব্দের শহীদ প্রা সংযুক্ত করিয়া “তুইপ্রা” শব্দ নিষ্পন্ন হইয়াছে। সেই তুইপ্রা হইতে তিপ্রা, এবং তিপ্রা হইতে ক্রমে তৃপুরা, ত্রীপুরা ও ত্রিপুরা শব্দের উৎপত্তি।”

এমনকি তিনি পাদটীকায়ও এ নিয়ে ব্যাখ্যা করার প্রয়াস পেয়েছেন এভাবে-

“এই তুই শব্দ সংস্কৃত তোয় শব্দের অপভ্রংশ কি না তাহা বিশেষ বিবেচ্য, কারণ ত্রিপুরা জাতির পূর্ব্ব ও দক্ষিণ দিগবাসী কুকি, কুইমি, মুরু, খেয়াং বঞ্জুগী ও পংখু জাতি জলকে তুই বা তোই বলে। কেবল সিন্ধুগণ ‘তি’ বলিয়া থাকে। সিন্ধুগণ দ্বারা “তিপ্রা” নামকরণও বিচিত্র নহে।”

তাঁর মতে কালিদাস ও হিয়োনসাঙ এর লিখনীতেও সাগর তীরবর্তী একটি দেশের অস্তিত্বের কথা জানা যায়। সুতরাং তিনি মনে করেন, এই অনার্য্য কিরাতগণ এই দেশকে ‘তুইপ্রা’ আখ্যা দিয়েছিলেন। আর এভাবেই তুইপ্রা থেকে ত্রিপুরা নামের উৎপত্তি। তিনি লিখেছেন-

“কবিচুড়ামণি কালিদাস ববুবংশে সুহ্মদেশকে মহাসাগরের “তালিবন শ্যাম উপকন্ঠ” বলিয়া বর্ণনা করিয়াছেন। চীন পরিব্রাজক হিয়োনসাঙের ভ্রমণ বৃত্তান্ত “সি-উ-কি” গ্রন্থে কমলাঙ্ক(কুমিল্লা) সাগরতীরবর্তী দেশ বুলয়া বর্ণিত হইয়াছে। আমাদের বিবেচনায় অনার্য্য কিরাতগণ এই জল অর্থাৎ সমুদ্রের তীরবর্তী দেশকে “তুইপ্রা” আখ্যা প্রদান করিয়াছিল। সেই তুইপ্র কিরূপে তিপ্রা(ত্রিপুরা) শব্দে পরিণত হইয়াছে তাহা পূর্ব্বে বর্ণিত হইয়াছে।”

তিনি তাঁর উক্ত গ্রন্থে ‘ত্রিপুরা’ শব্দটিকে শুধুমাত্র একটি দেশ বা রাজ্যের নাম হিসেবেই ব্যবহার করেননি বরং ব্যবহার করেছেন জাতিবাচক নামের ক্ষেত্রেও।

শ্রীকৈলাসচন্দ্র সিংহ প্রাচীন সুহ্ম বা ত্রিপুরা রাজ্যের আয়তন ৭৫০০০ বর্গমাইলের কম নয় বলে মনে করেন।

আর্থাৎ তৎকালীন কুকি প্রদেশ, মিতাই(মণিপুর) রাজ্য, কাছার, শিলহট্ট(শ্রীহট্ট), চট্টগ্রাম ও নওয়াখালী এই সুহ্ম বা ত্রিপুরার অন্তর্গত ছিল বলে তিনি অভিমত প্রকাশ করেন ।

এমনকি রাজ্যের সীমানা উত্তরে তৈরাঙ্গ নদী, দক্ষিণে রসাঙ্গ(আরাকান), পূর্ব্ব সীমা মেখলী(মণিপুরী) রাজ্য এবং পশ্চিমে বঙ্গের সহিত সংলগ্ন বলে প্রাচীন রাজমালার সূত্র ব্যবহার করেন।

তাঁর গ্রন্থের প্রথম ভাগের প্রথম অধ্যায়ের ৪ নং পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন-

“কিঞ্চিদুন পঞ্চশতাব্দী পূর্ব্বেযৎকালে মহারাজ ধর্ম্মমাণিক্যের সভাপন্ডিত ব্রাহ্মণকূলজাত শুক্রেশ্বর ও বাণেশ্বর “রাজমালা” রচনা করেন, তৎকালে তারা ত্রিপুরা রাজ্যের সীমা এইরূপে নির্দেশ করিয়াছেন-
কিরাত নগরে রাজা বিধির গঠন।
রাজ্যের সীমানা কহি শুনহ বচন।।
উত্তরে তৈরঙ্গ নদী দক্ষিণে রসাঙ্গ।
পূর্ব্বেতে মেখলী সীমা পশ্চিমে কাচবঙ্গ।।
ত্রিবেগ স্থানেতে রাজা করিল এক পুরী।
নানামত নির্ম্মাইল পুরীর চওারি।।
 -প্রচীন রাজমালা”

শ্রীকৈলাসচন্দ্র সিংহের রাজমালার এই অধ্যায়ে ত্রিপুরা রাজ্য বহির্জগতে কি কি নামে পরিচিত, তা খুবই সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছেন।

যেমন, তাঁর মতে ব্রহ্মার প্রচীন ইতিহাস ‘মহারাজোয়াং’ গ্রন্থে এই রাজ্যকে আখ্যা দেওয়া হয়েছে ‘পাটিকারা’ নামে, আরাকানের প্রাচীন ইতিহাস রাজোয়াং গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে ‘থুরতন’ নামে, মিতাই বা মণিপুরীরা বলতেন ‘তকলেঙ’, আবার প্রাচীন মুসলমান ইতিহাস লেখকগণ ত্রিপুরা রাজ্যকে ‘জাজনগর’ বা ‘জাজিনগর’ নামে বর্ণনা করেছেন।

এইভাবে শ্রীকৈলাসচন্দ্র সিংহ তাঁর ‘রাজমালা বা ত্রিপুরার ইতিহাস’ নামক গ্রন্থে ত্রিপুরার উৎপত্তি সম্পর্কে সুনিপুন ও বিশ্লেষণাত্বক উপস্থাপনের মাধ্যমে প্রাচীন রাজমালার অনেক মূল্যবান তথ্যগুলো তুলে ধরেছেন। রেখে গেছেন অনন্য অবদান।

যাঁর উপর ভিত্তি করে আমরা আজও বলার সাহস পাই একটি স্বাধীন রাজ্য ত্রিপুরার কথা। যুগে যুগে ত্রিপুরা মহারাজারা যেমন অমর হয়ে আছেন প্রজা বা জাতির নিকট, তেমনি শ্রীকৈলাসচন্দ্র সিংহও বেঁচে থাক তাঁর এই অসামান্য কীর্তিতে। আর প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে গবেষকগণ লিখে যাক ত্রিপুরার গৌরবময় ইতিহাসগুলো।

লেখক: মুকুল কান্তি ত্রিপুরা

শেকড়ের সন্ধানে : রাজমালার আলোকে ত্রিপুরার উৎপত্তির ইতিহাস (১)

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - [email protected] এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা

MUKUL KANTI TRIPURA

Author

Follow MUKUL KANTI TRIPURA

2 thoughts on “শেকড়ের সন্ধানে: রাজমালার আলোকে ত্রিপুরার উৎপত্তির ইতিহাস(পর্ব-২)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *