রাঙ্গামাটির বর্তমান চাকমা সমাজ ও কিছু কথা

0
90

লেখাটি ২০০৪ সালের এবং এর বিষয়বস্তু অবশ্যই সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে লেখকের ব্যক্তিগত বিশ্লেষণ


রাঙ্গামাটি পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রধান শহর। এখানে বসবাসরত লোকদের মধ্যে চাকমারাই প্রধান। কেবল বর্তমানে নয়, আদিকাল থেকেই চাকমারা রাঙ্গামাটিতে সংখ্যাধিক্য হিসাবে বসবাস করে আসছে। চাকমা রাজার বাসস্থানও এই রাঙ্গামাটিতেই। অবশ্য চাকমাদের ইতিহাস রাঙ্গামাটিকে নিয়ে নয়, চাকমাদের গোড়ার ইতিহাস অন্যত্র। ইতিহাস পর্যালোচনা এই লেখার প্রধান উদ্দেশ্য নয়, রাঙ্গামাটির বর্তমান চাকমা সমাজ নিয়ে পর্যালোচনা এবং কিছু ভাবনা চিন্তার কথা বিবৃত করাই মূখ্য উদ্দেশ্য।

মানুষ সমাজবদ্ধ জীব। সমাজ ছাড়া মানুষের অবস্থান ও বেঁচে থাকা কল্পনার অতীত। কোন জায়গায়, কখন, কিভাবে একটা জাতির দিনকাল অতিবাহিত হয় তার সঠিক চিত্র বর্ণনার মাধ্যমে সেই জাতির ইতিহাস রচিত হয়ে থাকে। অতএব রাঙ্গামাটির বর্তমান চাকমা সমাজের কথা ভবিষ্যৎ চাকমা জাতির ইতিহাস রচনার একটা মূল্যবান ভূমিকা পালন করবে তাতে কারও দ্বিমত থাকার কথা নয়। আমরা জানি, নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে দিন অতিবাহিত করে চাকমারা বর্তমান অবস্থায় এসে পৌঁছেছে। বর্তমানে চাকমারা একটা ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। এই কালটা কি সুখের, না দুঃখের, উন্নতির না অবনতির এই বিষয়ে ভিন্ন জনের ভিন্ন মত থাকা অস্বাভাবিক নয়। চার বছর আগের রাঙ্গামাটির চাকমা সমাজ আর বর্তমান চাকমা সমাজ এক নয়, সবদিক দিয়ে একটা পরিবর্তন লক্ষনীয়। শিক্ষাদীক্ষায় বেশ ভূষা, রাঙ্গামাটির চাকমা সমাজের উপর আছাড় খাচ্ছে। পরিবর্তনের ফল শুভ কি অশুভ হবে তা একমাত্র ভবিষ্যৎ জানে।

 

রাঙ্গামাটি ঝুলন্ত ব্রীজ
রাঙ্গামাটি ঝুলন্ত ব্রীজ; ছবিঃ ইন্টারনেট

চাকমাদের বর্তমান সামাজিক চিত্র একটা পরিবর্তিত চিত্র। বর্তমানে রাঙ্গামাটির চাকমাদের মধ্যে এক দলের মত হচ্ছে পরিবর্তনের। এই ডামাডোলে চাকমারা নিজেদের আসল কৃষ্টি, সংস্কৃতি হারিয়ে ফেলছে যা কোনরূপে গ্রহণযোগ্য নয় এবং শুভও নয়। ভিন্নমত পোষণকারী দলের মতে পরিবর্তনশীল বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে না পারলে চাকমা জাতটার অস্তিত্ব রক্ষা সম্ভব নয়। অতএব তাঁদের মতে, গোঁড়ামির পরিবর্তে প্রয়োজনবোধে সমাজের পরিবর্তন অত্যাবশ্যাক। এই দুটো মতের মধ্যে কোনটা গ্রহণযোগ্য তার বিচার করতে গেলে সামাজিক বিষয়গুলির বিস্তারিত বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করা যায়। পরিবর্তনের দোহাই দিয়ে সামাজিকতার মূলভাবটা নষ্ট হচ্ছে কিনা তা দেখতে হবে এবং সমাজ বিশৃঙ্খলার মায়াজালে পতিত হয়ে সর্বাংশে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে কিনা তা সূক্ষ্মভাবে বাছবিচার করে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বর্তমানে চাকমাদের মধ্যে এক শ্রেণীর স্বার্থপর ও আত্মকেন্দ্রিক লোক লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তারা নিজের বিষয়গুলি এত বেশী বড় করে দেখে যে ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করা তারা প্রয়োজন মনে করে না। ফলে পরের যাত্রা ভঙ্গ করে নিজের কাজটা হাসিল করতে পারাটাই তারা গৌরব মনে করে এবং আনন্দিত হয়। এই শ্রেণীর লোকদের কাজকর্মে রাঙ্গামাটির বর্তমান চাকমা সমাজ দ্বিধা ত্রিধা বিভক্ত হয়ে পড়েছে। চাকমা সমাজের এই বিভক্তির সুযোগ নিচ্ছে বহিরাগতরা যারা সুসংবদ্ধ চাকমা সমাজ চায় না। তারা চায় না চাকমারা একতাবদ্ধ থাকুক। তারা চায় চাকমাদের মধ্যে সংঘাত ও বিশৃঙ্খলা। ধনে মানে, জ্ঞান গরিমায়, শোর্য্যে, বীর্য্যে অধিকতর দুর্বল চাকমা সমাজ তাদের কাম্য।

এই কথা সত্য যে, মানুষ একা জীবন-যাপন করতে পারে না সমাজবদ্ধ হয়ে থেকে সুখে সুন্দরভাবে জীবন অতিবাহিত করতে হয়।বস্তুতঃ সমাজ ছাড়া যেমন মানুষ বাঁচতে পারে না, ঠিক সেরূপ ব্যক্তি মানুষ ছাড়াও সমাজের কথা ভাবা যায় না। চাকমা সমাজের স্বার্থপর ও আত্মকেন্দ্রিক লোকদের উপরোক্ত সত্য কথাটির তাৎপর্য  উপলদ্ধি করতে হবে এবং নিজের প্রয়োজনে সুসংবদ্ধ সমাজ গঠনে সামাজিক যত্নবান হতে হবে, নচেৎ চাকমাদের ধ্বংস অনিবার্য। খারাপ যদি হয় তাহলে তা কেবল একজনের জন্য  হবে না, সমস্ত চাকমা সমাজ এর ফলভোগী হবে, এমন কি স্বার্থপর ও আত্মকেন্দ্রিক যাদের কাজের জন্য কুফল নেমে আসবে তারাও বাদ যাবে না।

এখন দেখা যাক কিভাবে বর্তমান রাঙ্গামাটির চাকমা সমাজ ধ্বংসের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রথমে ধর্মের কথা ধরা যাক। ধর্ম ও সমাজ অঙ্গাঅঙ্গিভাবে সম্পর্কিত। চাকমারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। মানুষের চরিত্র গঠনে বৌদ্ধধর্মের নীতিমালা অত্যন্ত ফলপ্রসু ভূমিকা পালন করে। পরমপূজ্য মহাপুরুষ বনভান্তের আবির্ভাবের ফলে চাকমাদের ধর্মের প্রতি আকর্ষণ বৃদ্ধি পেয়েছে সত্য, কিন্তু তা কেবল বনভান্তের কিয়াংয়ে আসা যাওয়ার মধ্যে সীমিত। বাস্তবে বনভান্তের দেশনা মত খুব কম লোকেই ধর্মের নীতিমালা পালন করে থাকে। বলা যায় ধর্মের প্রতি আকর্ষণ  কেবল লোক দেখানে এবং হুজুগে। চাকমা সমাজে ধর্মসন্ত্রাসী একদল লোকের আবির্ভাব হয়েছে যারা শ্রদ্ধেয় বনভান্তেকে ব্যবহার করে নিরীহ লোকদের কাছ থেকে বিভিন্ন কায়দায় হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে যা অত্যন্ত অহিতকর এবং অকল্যাণকর।

 

 

সুবলং, রাঙ্গামাটি
সুবলং, রাঙ্গামাটি; ছবিঃ ইন্টারনেট

অর্থ ছাড়া কিছুই করা সম্ভব নয়। দু’বেলা খাওয়া জুতানো যায় না। অর্থই আবার অনর্থের মূল। অর্থের দুর্দান্ত প্রতাপে অনর্থের সম্মুখীন কতিপয় চাকমারা দুরাবস্থা প্রত্যক্ষ করলে উক্ত কথার সত্যটা প্রমাণিত হয়। ছলে বলে কৌশলে অর্থ রোজগার করার বিষময় ফলের কথা চিন্তা ভাবনা করে অর্থ রোজগারের অসৎ পথ পরিহার করা সমাজের হিতের জন্য অপরিহার্য। চাকমাদের মধ্যে আগের তুলনায় শিক্ষিতের হার অনেকগুণ বেড়েছে, বাড়েনি গুণগত মান, সার্টিফিকেটধারী শিক্ষিত চাকমাদের অবস্থা বর্তমানে অত্যন্ত নাজুক। বেকার সমস্যা, মাদকাসক্তি, বড়দের প্রতি অসম্মান, বেহায়াপনা, কাজের প্রতি অনীহা তথা অলসতা ইত্যাদিভাবে ভারাক্রান্ত বর্তমান চাকমা যুবক সমাজ। বর্তমান চাকমা সমাজে নেতৃস্থানীয় লোকদের ভূমিকা অত্যন্ত নেতিবাচক নেতাদের পরষ্পরের মধ্যে অনৈক্যের ফলে সমাজের অগ্রগতি দূরের কথা বরং অবনতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। স্বার্থসিদ্ধির কাজে নেতারা এতই ব্যস্ত যে তারা সমাজের লোকদের কথা চিন্তা করার জন্য মোটেই সময় ব্যয় করতে রাজী নন, অথচ সমাজ তাদের কাছ থেকে পাবার দাবীদার।

রাঙ্গামাটির বর্তমানে চাকমা সমাজে রাজা, মন্ত্রী, এমপি, চেয়ারম্যান, দালান কোঠাওয়ালা ধনী, উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সবই আছে। এই রাঙ্গামাটি সমাজকে অনুসরণ করবে গ্রামের হাজার হাজার চাকমা সমাজ। সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমাদের পথিকৃৎ রাঙ্গামাটির চাকমা সমাজের দায়িত্ব ও কর্তব্য যে অত্যাধিক সে কথা সর্বজন স্বীকৃত। অতএব দায়িত্ব ও কর্তব্য বোধে সচেতন হয়ে সমাজ রচয়িতাদের সঠিক পথ অবলম্বন করতেই হবে।


লেখকঃ সুনীতি বিকাশ চাকমা, ১২ এপ্রিল ২০০৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here