icon

রাখাইনরা কেনো দেশ ছেড়ে যান?

Jumjournal

Last updated Jan 4th, 2020 icon 36

এক.

কক্সবাজারের চকোরিয়া থেকে আরেকটু ভেতরে এক চিলতে এক পাহাড়ি নদীর দেখা মেলে, রাখাইন ভাষায় নদীর নাম হারবাং।
এই হারবাং এর নামেই সেখানে গড়ে উঠেছে ছবির চেয়েও সুন্দর আর বেশ পুরনো একটি রাখাইন গ্রাম। সুশৃঙ্খল সারিবদ্ধ দোতলা কাঠের বাড়ি। কোনো কোনোটির বয়স আবার ৫০ ছাড়িয়ে গেছে।

রাখাইন স্টুডেন্টস অর্গানাইজেশন অব বাংলাদেশের (আরএসওবি)সভানেত্রি ক’চিন ঠে’র (ডলি)আমন্ত্রণে সাংগ্রাই এ(রাখাইনেদর বর্ষ বরণ উতসব)বেড়াতে যাওয়া ওই গ্রামে।

গ্রামে ঢোকার মুখেই একটি ঝুপড়ি চায়ের দোকানে লক্ষ্য করা যায়, এক আমুদে বাঙালি বুড়োর সঙ্গে ডলির অনর্গল রাখাইন ভাষায় সংলাপ।

পরে ডলি জানান, অনেক বছর ধরে হারবাং এ থাকতে থাকতে সহজেই অনেক বাঙালিই রাখাইন ভাষা রপ্ত করেছেন।

হারবাং এর আশেপাশের অনেক বাঙালিই না কি কাজ চালানোর মতো রাখাইন ভাষা জানেন। তবে দুই জাতির মধ্যে সাধারণ কথাবার্তা চট্টগ্রামের আঞ্চলিক বাংলাতেই হয়।

ডলির বাবা রোগে ভুগে গত হয়েছেন মাত্র। ওর মা ছোট ছোট ছেলেমেয়ে নিয়ে পরেছেন এক অনিশ্চিত জীবনে।

তিনি আরো দুঃখের সঙ্গে বলতে থাকেন বছরের পর বছর তাদের শাল – সেগুনের বাগান আর জমি-জমা সংখ্যাগুরু বাঙালিদের হাতিয়ে নেওয়ার কথা।

ডলিদের বেশ সুন্দর আর বিশাল কাঠের এক শক্তপোক্ত বাড়ি রয়েছে। মোটা মোটা গাছের গুড়ির ওপর পুরো বাড়িটি বসানো। আর মাচাং ঘরটিতে যাওয়ার জন্য আছে একাধিক কাঠের সিঁড়ি।

আছে বেশ চওড়া কাঠের ঝুল বারান্দা। সেখানে আবার রাখা ছোট্ট ছোট্ট বেশ কয়েকটি বর্মি আরাম কেদারা।

 

দুই.

বিকেল বেলা ডলি ওদের গ্রামটি ঘুরে দেখান। নিয়ে যান আরএসওবি’র কর্মী আর তার আত্নীয়-স্বজন, বন্ধু বান্ধবের বাসায়।

রাখাইন মেয়েরা আবার অনেকাংশেই পড়াশুনা, চাকরি-বাকরি, কি ব্যবসায় এগিয়ে তাই মেয়েদের ক্ষেত্রে কথাবার্তায় কোনো জড়তাই নেই।

এ বাসা ও বাসা ঘুরে জানা গেলো রাখাইন তাঁত সম্পর্কে আরো অনেক নতুন তথ্য। আগেই কক্সবাজার, বাঁশখালি, চৌফলদণ্ডি আর টেকনাফের সমস্ত রাখাইন এলাকা ঘোরার বিস্তারিত অভিজ্ঞতা ছিলো।

কিন্তু হারবাং এর অবস্থা আরো করুন। ঐতিহ্যবাহি তাঁতেরও তাই। রাখাইন প্রায় সব মেয়েই তাঁতের কাজ কিছু না কিছু জানেন।

তবে সুতা আর ক্রেতার অভাবে তাঁত শিল্প বিলুপ্তির পথে। তাছাড়া মিলের সস্তা দরের কাপড় তো আছেই।

রাখাইন তাঁত আবার প্রযুক্তিগতভাবে বেশ উন্নত। এটি পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী পাহাড়িদের মতো সরল প্রযুক্তির কোমড়-তাঁত নয়। তাই বয়নে কাপড়ে ফুঁটিয়ে তোলা যায় অনেক নৈপুন্য আর নকশা।

একজন রাখাইন মেয়ে দেখালেন, তার দুটি তাঁতের মধ্যে একটি ব্যবহারের অভাবে এরই মধ্যে ঘুঁনে ধরেছে!

 

তিন.

পরদিন সাংগ্রাই উৎসবে বুদ্ধ পূজা, আনন্দ-হাসি-গান, ছেলেমেয়েদের ঐতিহ্যবাহি পানি খেলা আর অবিরাম বরাহ মাংস সহযোগে ‘দারা’ নামক চোলাই খেতে খেতে পৌঁছে যাওয়া হয় অন্য এক অলৌকিক জগতে।

রাখাইন একটি প্রবাদে নাকি আছে, তুমি যদি মদ খাও,তোমার ভেতরে একজন ছোট মানুষ প্রবেশ করবে।

তো এই সব হট্টোগোলের ভেতর ডলির প্রেমপ্রার্থী ওয়াই মং এর কথাও ভাল করে মাথাতে ঢোকে না।

সন্ধ্যায় আবারো ডলিদের বাসার বারান্দার আরাম কেদারায় হারবাং নদীর দিকে মুখ করে মদ, ঝিনুক আর কাঁকড়ার মাংস নিয়ে বসা গেলো। পড়ন্ত সূর্যের লাল আভায় নদীর ওপাড়ের রাখাইন গ্রামগুলো যেনো জ্বলছে!

একটি ছিমছাম ছোট্ট দোতলা বাসা দেখিয়ে জানতে চাওয়া হয়, ওটা কার ঘর? ডলি বলেন, ওটা আমাদেরই এক আত্নীয়র ঘর ছিলো।

কিন্তু জীবন যুদ্ধে টিকতে না পেরে সেই আত্নীয় এখন পরিবার-পরিজন নিয়ে পাড়ি জমিয়েছেন বার্মায়। হারবাং ছেড়ে এ রকম অনেকেই বাড়িঘর বিক্রি করে ওপারে চলে যাচ্ছেন।

হারবাং এর অনেক ঘরই এখন হয়ে পড়েছে প্রায় পরিত্যাক্ত। আবার কোনো ঘর বাঙালিরা কিনে রাখাইন গ্রামের ভেতরেই বসতি করেছেন।

ডুবন্ত সূর্যের আলোয় ডলির ফর্সা কচিপানা মুখ লাল হয়ে ওঠে। ক্লান্ত গলায় বলেন, আচ্ছা বিপ্লব দা, আপনি তো অনেক টাকা বেতন পান। এ রকম একটা ছোট্ট ঘর সস্তায় কিনতে পারেন না?

তাহলে যারা আপনাকে ঘরটি বিক্রি করে বার্মায় চলে যাবে, তারা নিশ্চিন্ত থাকবে এই ভেবে যে বাপ-দাদার ভিটেমাটি অন্তত টিকে আছে।

আর আপনার মতো শিক্ষিতরা আমাদের ঘরবাড়ি কিনলে গ্রামের পরিবেশেরও কোনো ক্ষতি হবে না! ক্রমশই ডলির গলা বিষন্ন হতে থাকে।

আর কি আশ্চর্য, ওই রকম মদোমাতাল অবস্থাতেই মাথার ভেতর ঝলসে ওঠে তথ্য-বাণিজ্যের আইডিয়া।

সাংগ্রাইয়ের পরে আরো কয়েকদিন গ্রামটিতে থেকে বিস্তারিত খোঁজ-খবর নেওয়া হয় রাখাইনদের ধীর দেশান্তরের বিষয়ে।

পরে তখনকার কর্মস্থল দৈনিক ভোরের কাগজের সাপ্তাহিক প্রকাশনা ‘অবসরে’ করা হয় একটি প্রচ্ছদ প্রতিবেদন।

১৯৯৯ সালের এপ্রিল নাগাদ প্রকাশিত ওই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটির শিরোনাম ছিলো, ‘রাখাইনরা কেনো দেশ ছেড়ে যান?’

 

চার.

এতে জানানো হয়, প্রায় চারশ বছর আগে বার্মার রাখাইন রাজ্য হারা রাখাইন জাতি, যারা এক সময়ে ব্যবসা-বাণিজ্যে কক্সবাজারের বিস্তৃর্ণ এলাকায় ছিলো সবচেয়ে অগ্রসর, তারাই এখন বৃহত্তর বাঙালি জনগোষ্ঠির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে অতি ধীরে একে একে দেশান্তরী হচ্ছেন বার্মায়।

আবার কোনো কোনো পরিবারের একাংশ এপারে রয়ে গেলোও অনেকেই পরিবারের অন্য সদস্যদের ভাগ্যান্বেষনে পাঠাচ্ছেন ওপারে।

প্রতিবেদনটিতে নিজস্ব পরিসংখ্যান আর একাধিক সাক্ষাতকার তুলে ধরে জানানো হয় এই নিরব দেশত্যাগের বাস্তব কাহিনী।

জানামতে, কোনো গণমাধ্যমে এ বিষয়ে সেটিই ছিলো প্রথম প্রতিবেদন। আর এর ধাক্কাও ছিলো ব্যপক। প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর রাখাইনদের মধ্যেই মিশ্র প্রতিক্রিয়া ঘটে।

কক্সবাজারের সাংবাদিক বন্ধুরাও পক্ষে-বিপক্ষে নিজ নিজ মতামত ব্যক্ত করেন। এই নিয়ে ‘অবসরের’ পরেও সংখ্যায় চলে তীব্র বাদানুবাদ।

সে সময় একমাত্র বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ইটিভি’র একজন বিশেষ প্রতিবেদক টেলিফোনে বলেন,একটি আজগুবি প্রতিবেদন নাকি ফাঁদা হয়েছে।

তিনি নিজেই এক সপ্তাহ আগে কক্সবাজার শহরে বেড়াতে গিয়ে একটি রাখাইন পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জেনেছেন, ওই প্রতিবেদনটি আদৌ সত্য নয়।

মস্তিস্ক যেখানে উগ্রজাতীয়তাবাদী অহং, কেতাবী বিদ্যা আর দৃষ্টিসুখের মোহে বৃত্তাবদ্ধ, যুক্তি সেখানে নিস্ফল; সত্য সেখানে দূরাগত।

বহুবছর সারাদেশ ঘুরে ঘুরে ভাষাগত সংখ্যালঘু আদিবাসীদের নিয়ে তথ্য-প্রতিবেদন করার অভিজ্ঞতা থেকে অনেক কিছুই বলা সম্ভব ছিলো। কিন্তু এর জবাবে বলা হয়নি কিছুই।


তথ্যসূত্রঃ মুক্তমনা

Share:
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - [email protected] এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা

Jumjournal

Follow Jumjournal

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *