ম্রো রূপকথা – ক্রংথপ সাংচিয়া (পৃথিবী সৃষ্টির কাহিনী)

0
139

অনেক অনেক দিন আগের কথা। পৃথিবী সৃষ্টির পূর্বে বিশ্ব ব্রহ্মান্ডে কোনো মৃত্তিকা ছিল না। তখন মহা সমুদ্রের উপর ভেসে যাওয়া এক খন্ড প্রস্তরকে বিশ্ব ব্রহ্মান্ড বলা হতো।

সে প্রস্তর খন্ডে বাস করতো এক বিধবা বুড়ি ‍ও ‘ক্লাংচা’ নামে এক যৌবন উদীপ্ত সুদর্শন নাতি। একদিন যুবক ক্লাংচা কুকুর নিয়ে শিকার করতে গেলো। সে শিকারে ‘পাকচারুয়া; (এক প্রকার বন্য জন্তু) শিকার পেলো।

বৃদ্ধা পাকচারুয়াকে দেখে বললো, “ক্লাংচা তুমি তাকে মেরে ফেলো না, তাকে দিয়ে মহা সমুদ্রের উপর মৃত্তিকার আচ্ছাদন তৈরি করে পৃথিবী সৃষ্টি করো।

তুমি পাকচারুয়াকে পাঠিয়ে দাও ‘রেংমা ওয়ালে চর উম নুই’ (মৃত্তিকা দ্বীপে)–এ। সে সেখান থেকে মৃত্তিকা খন্ড সংগ্রহ করে ভূমন্ডল সৃষ্টি করতে পারবে।

মৃত্তিকা দ্বারা আচ্ছাদিত হলেই জীবকুল ও উদ্ভিদকূল সবই সৃষ্টি হবে।” ক্লাংচা দাদীর কথা অনুসারে পাকচারুয়াকে মৃত্তিকা দ্বীপে পাঠিয়ে দিলো।

পর দিন পাকচারুয়া মৃত্তিকা দ্বীপ থেকে মাটির খন্ড চুরি করে নিয়ে আসলো। কিন্তু পথিমধ্যে সমুদ্র অতিক্রম করার সময় মৃত্তিকা খন্ডটি তিমি মাছ ছিনিয়ে নিলো।

চুরি করে নিয়ে এসেছে বলে তিমি মৃত্তিকা খন্ডটি নিতে বাধা দিলো। ব্যর্থ হয়ে পাকচারুয়া শূন্য হস্তে ফিরে এলো। ক্লাংচা দাদীকে সব ঘটনা বর্ণনা করলো।

নাতির কথা শুনে দাদী বললো, “তুমি পাকচারুয়াকে চুরি করতে বারণ করো। চুরি করে মৃত্তিকা আনলে কোনো দিনও ভূমি সৃষ্টি হবে না। কাজেই তুমি স্বয়ং গিয়ে মৃত্তিকা দ্বীপের শাসন কর্তার নিকট হতে অনুমতি নিয়ে তোমার পরিকল্পনা জানাও।

তিনি তোমার পরিকল্পনার কথা স্বহৃদয়ে গ্রহণ করবেন।” পরদিন প্রত্যুষে নাতি ক্লাংচা পাকচারুয়ার পিঠে চড়ে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে মৃত্তিকা দ্বীপে পৌঁছালো।

তাদের আগমনে ও দর্শনে দ্বীপবাসীরা ঢাল, তলোয়ার হস্তে তাদের বন্দি করে রাজার নিকট নিয়ে গেলো। রাজা ক্লাংচার আগমনের উদ্দেশ্য জানতে চাইলো।

ক্লাংচা তার পরিকল্পনা রাজার কাছে জানালো। রাজা ক্লাংচার পরিকল্পনা শুনে খুবই সন্তুষ্ট হলো এবং ক্লাংচার আগমনকে স্বাগত জানালো।

পরদিন ক্লাংচা রাজার নিকট হতে মৃত্তিকা খন্ড নিয়ে রওনা দিলো। সাথে রাজা আরো বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী ও উদ্ভিদের বীজ দিয়ে দিলো।

আর রোগ-ব্যাধি, ঝগড়া-ঝাটি, চুরি-ডাকাতি, আলোচনা-সমালোচনা ও ছলনা, ব্যভিচারের বীজও সথে দিয়ে দিলো।

এ সমস্ত বীজ কোন কোন জায়গায় রোপণ করবে বা প্রয়োগ করবে তাও শিখিয়ে দেয়া হলো।

শেখানো হলো যে, ঝগড়া-বিবাদের বীজ মদ্যপান আসরে, রোগ-ব্যাধির বীজ ঝর্ণার ধারে, সমালোচনার বীজ রমণীদের আড্ডা খানায়, চুরি-ডাকাতির বীজ গৃহের সম্মুখে এবং ব্যভিচারের বীজ যুবক-যুবতীদের শয়ন কক্ষে প্রয়োগ করার জন্য। ফিরে এসে ক্লাংচা পাকচারুয়ার মাধ্যমে বিশ্ব ব্রহ্মান্ডে মৃত্তিকা কণা দ্বারা তিন ভাগে জল ও এক ভাগে স্থল সৃষ্টি করলো।

তারপর ক্লাংচা তার কর্মকান্ড সমাপ্তকরণের বার্তা দাদীকে জানালো। দাদী তাকে উদ্ভিদকুল জন্মানোর জন্য বিভিন্ন জাতের উদ্ভিদের বীজ ভূমিতে বপন করতে নির্দেশ দিলো।

বিশ্ব ব্রহ্মান্ডে যাতে অতি দ্রুত তৃণগুল্ম ছেয়ে ফেলতে পারে তার জন্য প্রথমে ‘পাংচা’কে (নল খাগড়া) আদেশ দিলো। তাতে পাংচা জবাব দিলো, “ক্লাংচা, যখন আপনি আমাকে মৃত্তিকা দ্বীপ থেকে নিয়ে এসেছেন, তখন আমি পরিপূর্ণ পরিশুদ্ধি লাভ করিনি।

তদুপরি আমি এ ভূমণ্ডলে অতি দ্রুতবেগে পরিপূর্ণভাবে জন্মাতে পারবো না। আমি শুধু সমতল ভূমিতে, নদীর ধারে, খাল-বিলের ধারে জন্মগ্রহণ করবো।

তারপর বরাখ বাঁশকে নির্দেশ দেয়া হলে বরাখ বাঁশ বললো, “আমার সম্পূর্ণ পরিশুদ্ধি লাভ হয় নি। ফলে আমি দ্রুত গতিতে ভূমন্ডলে বীজ জন্মাতে পারবো না।

আমার জন্মস্থান হবে সমতল ভূমিতে। সমতল বাসীরা আমাকে ব্যবহার করবে।” ক্লাংচা তৃতীয়বার ডলু বাঁশকে আদেশ দিলো।

ডলু বাঁশ ক্লাংজার জবাবে উত্তর দিলো, “আমি পরিশুদ্ধি লাভ করিনি। যার ফলে আমিও ত্বরা করে জন্মাতে অপারগতা প্রকাশ করছি। আমার জন্মস্থান হবে শুধুমাত্র পাহাড়ের পাদদেশে।

জগৎবাসীরা আমাকে লবণ দানী ও নস্যিদানি হিসেবে ব্যবহার করবে।” ক্লাংচা কোনো উপায় না দেখে নিরাশ হয়ে পরিশেষে মুলি বাঁশকে ভূমন্ডল পরিপূর্ণ করে ছেঁয়ে ফেলার নির্দেশ দিলো।

ক্লাংচার কথা শুনে মুলি বাঁশ বললো, “আমি নিশ্চই আপনার আকাঙ্খা পূর্ণ করবো। তবে রাঙ্গাবর্ণের মোরগের রক্ত দিয়ে নয়টি বাঁশের পাতায় সাজিয়ে পোকার টিবিকে পূজা করতে হবে। তারপর আমি ভূমন্ডলে অতিদ্রুত জন্মাবো।”

ক্লাংচা মুলি বাঁশের কথা অনুযায়ী পূজা অর্চনা করলো। সত্যি সত্যি পরদিন বীজ ছিটিয়ে দেয়া হলো। তাতে সমস্ত বিশ্ব ব্রহ্মান্ড বন জঙ্গলে পরিপূর্ণ হয়ে গেলো। ক্লাংচা দাদীকে তার কর্ম ফলের বার্তা জানালো।

দাদী তাকে পবনের বলয় প্রয়োগ করার জন্য নির্দেশ দিলো।  ক্লাংচা দাদীর কথার পরিপ্রেক্ষিতে পবনের বলয় নিক্ষেপ করলো। তাতে ভূ-মন্ডলের সমস্ত বন-জঙ্গল বাতাসে উপড়ে গিয়ে বিনষ্ট হলো।

এতদিনে পরিশ্রমের ফল বিফলে গেছে বলে ক্লাংচা কাঁদতে কাঁদতে দাদীর কাছে সমস্ত ঘটনা খুলে বললো। দাদী ক্লাংচার বর্ণনা শুনে বললো “তোমার প্রধান কর্মকান্ড আজও বাকি আছে।

তা যদি তুমি সম্পাদন করো তাহলেই তোমার সুকর্ম ফলের দর্শন পাবে। কাজটি হলো – আগে তুমি লতাগুল্ম বীজ ছিটিয়ে দাও, দেখবে বাতাসে আর তৃণগুল্ম উপড়ে যাবে না।

ঠিকই বন জঙ্গল রয়ে যাবে।” ক্লাংচা দাদীর পরামর্শ অনুযায়ী কর্ম সম্পাদন করলো। পরবর্তীতে পুনরায় যখন পবনের বলয় প্রয়োগ করলো তখন সত্যি সত্যি বাতাসে আর গাছপালা, বৃক্ষ-গুল্ম উপড়ে যায়নি।

লতা পেঁছিয়ে গাছগাছালি, বাশেঁর ঝাড় পূর্ণ অরণ্য দাঁড়িয়ে রইলো। তারপর বিভিন্ন প্রজাতির পশুপক্ষী, সরীসৃপ, কীট-পতঙ্গ আর সেই বৃক্ষ পরিপূর্ণ বন জঙ্গলে ছেড়ে দেয়া হলো।

এ সমস্ত কর্মক্রিয়া শেষ হওয়ার পরও একটি বৃহৎ সমস্যা রয়ে গেলো। দিবস ঠিক আছে কিন্তু কোনো রাত্রি নেই। ক্লাংচা দ্রুত দাদীর কাছে গিয়ে ঘটনা পুনরাবৃত্তি করলো।

দাদী ক্লাংচার কথা শুনে জবাব দিলো, “তুমি ব্যাঘ্রকুলকে বল’ দিবস ও রাত্রি সৃষ্টি করতে। ব্যাঘ্র ঠিকই দিবস-রাত্রী ঠিক করতে পারবে।” ক্লাংচা দাদীর পরামর্শ অনুযায়ী বাঘকে দিবা-রাত্রি সৃষ্টি করার আদেশ দিলো।

ক্লাংচার কথা শুনে বাঘ মনে মনে ভাবতে লাগলো, আমি যদি দিবাই সৃষ্টি করি তাহলে আমাদের (বাঘদের) পক্ষে আহার সংগ্রহ করা দুষ্কর হয়ে পড়বে।”

এই ভেবে বাঘ দিবা সৃষ্টি না করে শুধু রাত্রিরই সৃষ্টি করলো। কখনো আর আলোর আভাস দেখা দিলো না। ক্লাংচা পুনরায় ছুটে গেলো দাদীর কাছে।

দাদী এবার ভাল্লুকের মাধ্যমে দিবা-রাত্রি সৃষ্টি করার নির্দেশ দিলো। ক্লাংচার নির্দেশক্রমে ভাল্লুক কোনো রাত্রি সৃষ্টি না করেই শুধুই দিবসের সৃষ্টি করলো। ক্লাংচা আবারও দাদীর কাছে গেলো পরামর্শ গ্রহণ করতে।

দাদী এবার পক্ষীগণের মাধ্যমে দিবা-রাত্রি সৃষ্টি করার জন্য আদেশ দিলো। ক্লাংচা প্রথমে ধনেশ পাখির নিকট গিয়ে নিবেদন করলো দিবা-রাত্রি সৃষ্টি করার জন্য। তখন ধনেশ পাখির স্ত্রী অন্তঃসত্বা ছিলে।

এ অবস্থায় তার পক্ষে দিবা-রাত্রি সৃষ্টির কাজে হস্তক্ষেপ করা বাস্তর সম্মত নয় বরং এ অবস্থায় যদি সে দিবা-রাত্রি সৃষ্টি করে তাহলে সমস্ত ভূমন্ডলে অমঙ্গল ও অশুচিতা আসবে বলে সে ক্লাংচাকে জানালো।

তা না হলে সত্যি এরূপ কর্ম সম্পাদন ধনেশ পাখির পক্ষে সম্ভব ছিলো। এরপর ক্লাংচা গেল বুলবুল পাখির কাছে।

ক্লাংচার কথা বলার পরপরই বুলবুলি “নিশ্চয় পারবো” বলে ক্লাংচাকে আশ্বাস দিলো। বুলবুলি আগে বাঘের নিকট রাত সৃষ্টির কৌশল ও ভাল্লুকের নিকট দিবা সৃষ্টির কৌশল রপ্ত করে ফেলেছে।

বুলবুলি কর্মকান্ড দর্শনে ক্লাংচা মুগ্ধ হয়ে খুশিতে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বুলবুলিকে ধন্যবাদ দিলো।

দিবা-রাত্রি সবই সৃষ্টি হলো। কিন্তু কীভাবে গৃহ নির্মাণ করতে হবে তা ক্লাংচার নিকট আরো একটি অজানার বিষয় রয়ে গেলো।

গৃহ নির্মাণের কৌশল জানার জন্য ক্লাংচা আবাার দাদীর কাছে গেলো। জবাবে দাদী বললো, “চারটি কোণ সমন্বয়ে গৃহ নির্মাণ করতে হয়।” তবুও ক্লাংচার নিকট দাদীর কথা বোধগম্য হলো না।

পুনরায় দাদীর কাছে গিয়ে জানতে চাইলো, এ গৃহ কৌশল কোন দেশে পাওয়া যায়? দাদী তাকে দক্ষিণ মেরুর প্রান্তরে শৈবাল দ্বীপবাসীদের ‘কামড়াকিম’ বাসগৃহ নির্মাণের কৌশল অনুকরণ করে আনতে বললো।

পরদিন ক্লাংচা সেই শৈবাল দ্বীপ থেকে গৃহ নির্মাণের কৌশল অনুকরণ করে এলো। বিশ্বব্রহ্মান্ডে গৃহ নির্মাণের কর্মক্রিয়া সম্পন্ন হলে দাদী ক্লাংচাকে খাদ্য আহরণ করতে নির্দেশ দিলো।

সে খাবার অন্বেষণে পূর্ব দিকে অগ্রসর হলো। কিন্তু সেখানে ‘পোকাক’ নামের এক শয়তানের সাথে তার সাক্ষাত হয়। পোকাক তাকে খাদ্য সংগ্রহ করতে না দিয়ে সেখান থেকে বিতাড়িত করে দেয়।

উল্লেখ্য যে, পৃথিবী সৃষ্টির পূর্বে এ বিশ্ব ব্রহ্মান্ডে শয়তান ছিলো না। শয়তান তখন মৃত্তিকা দ্বীপে ছিলো। দ্বীপ থেকে যখন পাকচারুয়া মৃত্তিকা চুরি করতে গেছে তখন শয়তান পোকাকের পাকচারুয়ার উপর নজর পড়ে।

এক ফাঁকে পোকাক পাকচারুয়ার সঙ্গে এ পৃথিবীতে এসছে বলে ম্রো’দের বিশ্বাস। ক্লাংচা পোকাকের তাড়া খেয়ে দক্ষিণে চলে যায়।

এমন সময় ‘কুকুর্ক’ (এক প্রকার পাখি) ক্লাংচাকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলল – ক্লাংচা, তুমি ‘দুর্মাং তাকোয়াই দামলী কাপলং সোং অর্থাৎ হিমালয়ের পাদদেশে গিয়ে খাদ্য সংগ্রহ করতে পারবে।

সেখানে পর্যাপ্ত পরিমাণের খাদ্য আছে। কুকুর্কে‌র কথা অনুসরণ করে ক্লাংচা সেখানে গেলো। ঘুরতে ঘুরতে সে একসময় একটা জঙ্গলি আলুর মূল পেলো।

খেয়ে দেখে সে বুঝতে পারল সেগুলি অত্যন্ত মিষ্টি ও সুস্বাধু। তারপর সে আলু নিয়ে এসে দাদীকে দেখালো। দাদী তাকে সেগুলো নদীতে ধোয়ার জন্য পাঠিয়ে দেয়।

ক্লাংচা নদীর তটে পৌঁছতেই ‘তরিং তরাং’ নামে এক শয়তান যুগল তাকে নদীতে আলু ধৌত করতে বারণ করলো।

সে ফিরে এসে দাদীকে ঘটনার কথা জানাল। দাদী তাকে উদল কম্বল বৃক্ষের ছাল দ্বারা দড়ি পাকিয়ে ‘তরিক তরাং’ – কে ফাঁদ পেতে ধরার জন্য কৌশল শিখিয়ে দেয়।

কিন্তু ফাঁদ পুতে দেয়ার পূর্বে কোনো পূজা, অর্চনা না করায় ‘তড়িং তরাং’ ফাঁদে পড়লো না। দাদী তাকে পুনরায় পূজা-অর্চনার আয়োজন করে অশ্বথ ও বট বৃক্ষের কষ দ্বারা আঠা বানিয়ে ধরার কৌশল শিখিয়ে দিল।

দাদীর কথা মত ক্লাংচা আবার অশ্বথ ও বট বৃক্ষের কষ দ্বারা আঠা বানিয়ে ছিটিয়ে দিল। পরদিন ক্লাংচা দেখতে পেলো ‘তড়িং তরাং’ – এর পরিবর্তে একটি ‘কাংচো ‍সিরিং ওয়া’ (কোয়েল জাতীয় পাখি) আঠায় আটকিয়ে রয়েছে।

সে পাখিটাকে দাদীর কাছে নিয়ে গেলো। দাদী পাখির মাংস কুটতে গিয়ে দেখতে পেলো পাখির গলার ভেতর নানা জাতের খাদ্য শস্যের দানা।

সে শস্য দানাসমূহ দু’ভাগে বিভক্ত করতে একভাগ বীজ হিসেবে ব্যবহারের জন্য রেখে দিলো, আর একভাগ খাওয়ার জন্য রান্না করে ফেললো।

রান্নার পর ক্লাংচাকে বললো – এ খাওয়ার উপযোগী কী না পরীক্ষা স্বরূপ আমি আগে খেয়ে দেখবো। তাতে ভালো কি মন্দ তার ফলাফল দেখতে পাবে। খাওয়া শেষ হলে দাদীর চোখে ঘুম আসলো।

কিছুক্ষণ পর দাদী ঘুমিয়ে পড়লো। নাতির কান্নার বিলাপের আওয়াজে দাদীর ঘুম ভেঙ্গে গেলো। দাদী ক্লাংচাকে এ খাবার সুস্বাদু এবং জীবণ ধারণের উপযোগী খাদ্য উপাদান বলে জানালো।

কৃষি কর্ষণ, ভূমি কর্ষণ ইত্যাদি কৃষি কর্মের কৌশলাদিও দাদী ক্লাংচাকে শিখিয়ে বললো – তুমি সারা বছর খাবার যোগার করে রাখবে।

বাৎসরিক খাবার মজুদ না থাকলে বৃষ্টি বাদলের দিনে কিংবা তোমার স্ত্রী সন্তান জন্মদানকালে তুমি কষ্ট ভোগ করবে। পূর্বে খাবার মজুদ না রাখলে দুর্দিন, দুর্বিপাকে তোমাকে অনাহারে অর্ধাহারে থাকতে হবে।

এখন আমার যাওয়ার সময় হয়ে এসেছে। তার আগে দাদী ক্লাংচাকে এক জোড়া ‘খংরাও’ (পাথর) দিয়ে বললো – “তুমি লাল বর্ণের মোরগ পূজায় উৎসর্গ করে এ প্রস্তরদ্বয়কে বছরে দু’বার পূজা অর্চনা করিও, তাহলে তোমার নবান্ন পুনর্জীবিত হয়ে উঠবে।

আর তোমার জীবন সঙ্গী হিসেবে ‘মাসীওয়া’ নামে আর এক মানবী সৃষ্টি করে দিলাম। তোমার এ পৃথিবীতে সমস্ত মানব জাতীর আদি পিতা-মাতা হবে। তোমরা এ ভুবনে বংশ বৃদ্ধি করো”।

এ কথাগুলো বলে দাদী এক খন্ড মৃত্তিকা নিয়ে নারী জাতি সৃষ্টি করে দিলো। পরদিন সকালে ঊষার আলো দেখার সাথে সাথেই পশ্চিম দিকে নক্ষত্রের আলোর বিচ্ছুরণের মতো ক্লাংচাকের দাদী পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলো।


সিংইয়ং ম্রো
ম্রো রূপকথা, লোককাহিনী ও কিংবদন্তি

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here