icon

ম্রো জনগোষ্ঠীর বিবাহ বিচ্ছেদ (তাখোয়া)

Jumjournal

Last updated Dec 15th, 2019 icon 249

ম্রো বিবাহ বিচ্ছেদ

 ম্রো পরিবারে স্বামী ও স্ত্রীর বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন করাকে ‘তাখোয়া’ বলা হয়।

 

বিবাহ বিচ্ছেদের বিভিন্ন পদ্ধতি

স্বামী কিংবা স্ত্রী যে কোনো একজনের মৃত্যুতে ম্রো সমাজ কর্তৃক স্বীকৃত একটি দাম্পত্য জীবন তথা বিবাহিত জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। তবে সমাজ ও আইন স্বীকৃত উপায়ে নিম্নবর্ণিত কারণে স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে জীবদ্দশায় বৈবাহিক সম্পর্কের পরিসমাপ্তি বা ‘তাখোয়া’ হতে পারেঃ-

ক) স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে সমাজপতির উপস্থিতিতে ‘তাখোয়া’ সম্পাদন করা যায়।

খ) স্বামী-স্ত্রী একে অপরের বিরুদ্ধে সমাজপতির নিকট দ্বারস্থ হয়ে সমাজপতির উপস্থিতিতে সামাজিক আদালতের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ‘তাখোয়া’ সম্পাদন করতে পারে।

গ) ম্রো জনগোষ্ঠীর সামাজিক আদালতে অথবা কার্বারী আদালতের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হেডম্যান আদালতে এবং হেডম্যান আদালতের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সার্কেল চীফ-এর আদালতে আপিল করতে পারে। এ বিষয়ে সার্কেল চীফের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলে গণ্য করা হয়। ম্রো সমাজে ‘তাখোয়া’ সংক্রান্ত কোনো প্রকার সামাজিক মোকদমা হেডম্যান আদালতের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সার্কেল চীফ আদালত পর্যন্ত গড়ানোর একটি মাত্র দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। বান্দরবানে ম্যানরোলা দম্পতির বিবাহ বিচ্ছেদ মামলাটি বোমাং চীফ আদালত পর্যন্ত গড়ায়। (সূত্রঃ বাংলাই ম্রো, হেডম্যান, ৩১৫নং রেনিক্ষ্যং মৌজা)।

 

কোন কোন ক্ষেত্রে স্বামী বা স্ত্রীতাখোয়া’ দাবী করার অধিকার লাভ করে

নিমোক্ত কারণে ম্রো সমাজে স্বামী বা স্ত্রী ‘তাখোয়া’ প্রদানের অধিকার লাভ করে। তবে সামাজিক আদালতে স্ত্রীর অভিযোগকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয়ঃ-

ক) স্বামী যদি দৈহিক মিলনে অক্ষম বা পুরুষত্বহীন হয় কিংবা স্ত্রী। গর্ভধারণে অক্ষম হয়, সেক্ষেত্রে স্বামী বা স্ত্রী যে কোনো একজন যথোপযুক্ত ডাক্তারী পরীক্ষার সনদপত্র দ্বারা ‘তাখোয়া’ দাবী করতে পারে।

খ) স্বামী বা স্ত্রী যদি পরকীয়া কিংবা ব্যভিচারে বা নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে লিপ্ত হয়, তাহলে এ ধরণের অপরাধের জন্য যে কোন একজন সামাজিক আদালতে দোষী সাব্যস্ত হলে অপরজন ‘তাখোয়া’ দাবী করতে পারে।

গ) স্ত্রীর সম্মতি বা অনুমতি ব্যতিরেকে স্বামী দ্বিতীয়বার বিবাহ করলে, সেক্ষেত্রে সতীনের সাথে একত্রে বসবাসে অসম্মত হয়ে প্রথমা স্ত্রী সামাজিক আদালতে দ্বারস্থ হয়ে ‘তাখোয়া’ দাৰী করতে পারে।

ঘ) স্বামী বা স্ত্রী যে কেউ নিরুদ্দেশ হলে এবং বহু বছর যাবৎ উভয়ের মধ্যে কোনো প্রকার দাম্পত্য সম্পর্ক বা পারিবারিক যোগাযোগ না থাকলে, সেক্ষেত্রে যে কোনো একপক্ষ সামাজিক আদালতের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ‘তাখোয়া’ সম্পাদন করে দ্বিতীয় বিবাহে আবদ্ধ হতে পারে। স্বামী বা স্ত্রী যে কোনো একজন যদি মানসিক বিকারগ্রস্ত অথবা বিকৃত রুচির হয়, সেক্ষেত্রে অপরপক্ষ সামাজিক আদালতের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ‘তাখোয়া’ প্রদান করতে পারে।

ঙ) স্বামী বা স্ত্রী যে কোনো একজন গুরুতর অপরাধে দন্ডিত হয়ে দীর্ঘদিন কারাভোগে যদি থাকে, সেক্ষেত্রে অপরপক্ষ সামাজিক আদালতের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ‘তাখোয়া’ দাবী করতে পারে। স্বামী বা স্ত্রী যে কোনো একপক্ষ সংসারত্যাগী বৌদ্ধ/ক্রামা ধর্মীয় পুরোহিত বা সাধুমা হলে, সেক্ষেত্রে অপরপক্ষ সামাজিক আদালতকে অবহিত করে ‘তাখোয়া’প্রদান করতে পারে।

জ) স্বামী বা স্ত্রী যে কোনো একপক্ষ নিষ্ঠুর প্রকৃতির, অহেতুক সন্দেহ প্রবণ, মাদকাসক্ত, নির্যাতনকারী হলে সেক্ষেত্রে অপরপক্ষ সামাজিক আদালতের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ‘তাখোয়া’ সম্পাদন করতে পারে।

ঝ) স্ত্রী যদি নিজ স্বামীর সংসারে প্রাপ্য ভরনপোষণ, ন্যায্য অধিকার, চিকিৎসা-সেবা ও পারিবারিক মর্যাদাসহ স্ত্রীর অধিকার থেকে বঞ্চিত হয় সেক্ষেত্রে স্ত্রী সামাজিক আদালতের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ‘তাখোয়া’ সম্পাদন করতে পারে।

ঞ) স্বামী বা স্ত্রী যে কোনো একপক্ষ যদি অবিশ্বস্ত বা অবাধ্য হয়, পারিবারিক দায়িত্ব ও কর্তব্য প্রতিপালনে অনিচ্ছুক বা উদাসীন হয়, সেক্ষেত্রে অপরপক্ষ সামাজিক আদালতের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ‘তাখোয়া’ প্রদান করতে পারে।

 

বিবাহ বিচ্ছেদের (তাখোয়া) আইনগত ফলাফল

ক) সমাজ স্বীকৃত পদ্ধতিতে সামাজিক আদালতের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ‘তাখোয়া’ সম্পাদিত হলে স্বামী-স্ত্রী যে কেউ পুনরায় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে। তবে স্ত্রী যদি ‘তাখোয়া’ প্রদান করে, সেক্ষেত্রে ‘তাখোয়া’ প্রাপ্ত স্বামী বিবাহ অনুষ্ঠানে কনেপণ দেয়া ‘মাংতাং’ ফেরত পায়।

খ) ‘তাখোয়া’ সম্পাদনের পর স্বামী বা স্ত্রী এমনকি উভয়ের সম্মতিতে দৈহিক মিলন অবৈধ হয়। এরূপ দৈহিক মিলনজাত সন্তান অবৈধ বা জারজ হিসেবে গণ্য হয়।

গ)স্বামী বা স্ত্রী যে কোনো পক্ষ দ্বারা ‘তাখোয়া’ সম্পাদনের পর পারস্পরিক সমঝোতা ও আস্থা প্রতিষ্ঠিত হলে পুনরায় দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপনের জন্য ‘বংকম’ ও ‘মাংতাং’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পূনঃ বিবাহের দ্বারা সামাজিক স্বীকৃতি অর্জন করতে হয়।

ঘ) ‘তাখোয়া’ সম্পাদনের পর স্বামী ও স্ত্রী উভয়ে উভয়ের উপর অধিকার এবং কর্তৃত্ব হারায়।

ঙ) ‘তাখোয়া’ সম্পাদনের পর স্ত্রী তার পূর্ব স্বামীর উত্তরাধিকারসহ পারিবারিক পদবী ও মর্যাদা হারায়।

চ) ‘তাখোয়া’ সম্পাদনের পর স্বামীর স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তিসহ ভরনপোষণ হতে স্ত্রী বঞ্চিত হয় এবং স্বামী সরকারী চাকুরীজীবী হলে স্বামীর মৃত্যুর পর ‘তাখোয়া’ প্রাপ্ত স্ত্রী পেনশন সুবিধা হতে বঞ্চিত হয়।

 

তাখোয়া’ সম্পাদনকালে স্ত্রী গর্ভবতী অবস্থা 

ক) ‘তাখোয়া’ বা বিবাহ বিচ্ছেদের সময় স্ত্রী যদি গর্ভবতী অবস্থায় থাকলে অনাগত সন্তানের উপর দায় দায়িত্ব থাকে স্বামীর দোষের কারণে বিবাহ বিচ্ছেদ হলে বিচ্ছেদপ্রাপ্ত স্ত্রী ভরণপোষণ ও সন্তান প্রসবকালীন খরচ পায়। তবে যদি স্ত্রীর দোষের কারণে বিচ্ছেদ হয় তাহলে স্ত্রী কিছুই পায় না।

বিবাহ বিচ্ছেদ কালীন সময়ে গর্ভবতী অবস্থায় থাকলে (স্বামীর দোষের কারণে) তাদের বিচ্ছেদ হলে বিচ্ছেদপ্রাপ্ত স্ত্রী ভরণপোষণ ও প্রসবকালীন খরচ পায়।

তবে তাখোয়া সম্পাদনের পর স্ত্রীর দ্বিতীয় বিবাহ সত্ত্বেও যদি ধাত্রী বিদ্যামতে প্রমাণিত হয় যে, বিচ্ছেদ পূর্ব সময়ে স্ত্রী গর্ভবতী ছিল,সেক্ষেত্রে গর্ভস্থ সন্তানের জন্য পূর্বের স্বামীর নিকট হতে কোনো ভরনভোষণ পায় না।

তবে ভূমিষ্ট সন্তান সামাজিক আদালতের সিদ্ধান্তমতে পিতৃ স্বীকৃতি পায় কিন্তু জন্মদাতার উত্তরাধিকারী হয় না।

বিচ্ছেদ প্রাপ্ত স্ত্রীর দ্বিতীয় বিবাহের পর পূর্বের স্বামীর সন্তান যদি তার সাথে থাকে সেক্ষেত্রে উক্ত সন্তান দ্বিতীয় স্বামীর আইনগত উত্তরাধিকারী হয়।

খ) বিবাহ বিচ্ছেদ বা ‘তাখোয়া’ সম্পাদনের তারিখ হতে পরবর্তী ২৮০ দিন পর বিচ্ছেদপ্রাপ্ত স্ত্রী গর্ভে যদি সন্তান ধারণ করে, সেক্ষেত্রে ধাত্রী বিদ্যামতে ভিন্ন কিছু নিশ্চিত প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত বিচ্ছেদপ্রাপ্ত স্বামী উক্ত সন্তানের পিতৃত্ব গ্রহণে বাধ্য নয়। বিচ্ছেদপ্রাপ্ত স্ত্রীর গর্ভজাত এ ধরণের সন্তানের দায়দায়িত্ব ম্রো সমাজের রীতিনীতি অনুসারে সামাজিক আদালত নির্ধারণ করে।

গ) তাখোয়ার পর পুত্র সন্তান যদি পিতার হেফাজতে থাকে তাহলে সে তার উত্তরাধিকারী হয়।


তথ্যসূত্রঃ পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের আদিবাসীদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক আইন (গ্রন্থনা ও সম্পাদনা – এডভোকেট জ্ঞানেন্দু বিকাশ চাকমা,  এডভোকেট প্রতিম রায়, সুগত চাকমা) ।

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা

Jumjournal

Administrator

Follow Jumjournal

Leave a Reply