আত্মপরিচয়ের বঞ্চিত সমীকরণ

0
137

পতাকা ও পরিচয়

মা-বাবার কল্যাণে নানান দেশের পতাকার রঙ আর চেহারা মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল শৈশবে। তারপর দেখি একটা একটা করে কত নতুন পতাকার জন্ম হয়, পতাকা বদলে যায়। বুঝতে শিখি  – ‘দেশ’ আর ‘রাষ্ট্রের’ ভেতর বিস্তর দূরত্বের গণিত। দেখি দেশের পতাকাকে পতপত করে রাষ্ট্রের পতাকা বানানো হয়। অনেক পতাকার ওড়াওড়ির ভেতর ঘন নীল, উজ্জ্বল লাল, টকটকে সবুজ আর গাঢ় হলুদ রঙের একটি পতাকা দেখলে ভিমরি লাগে। এ আবার কোন রাষ্ট্রের পতাকা? আন্নেলি জনসন ঈদ্রি জাতির এক সাহসী নারী। ঈদ্রি, গাবনা এমন অনেক প্রান্তিক আদিবাসী জাতিসমূহ সুইডেন, নরওয়ে ও রাশিয়ার বেশ কিছু অংশ জুড়ে বিস্তীর্ণ সামি অঞ্চলে বৃহৎ সামি আদিবাসী হিসেবে পরিচিত। ১৯৯১ সন থেকে শুরু হয়েছে সামি আদিবাসীদের জন্য এক পৃথক ও স্বতন্ত্র সংসদ। ৩৬ সদস্যের এই ‘সামি-সংসদই’ সামি আদিবাসী জনগণের এক রাজনৈতিক নির্দেশিকা। উল্লেখিত পতাকাটি সামি আদিবাসীদের সামি অঞ্চলের। আন্নেলি জনসন জানান, এই পতাকা রাষ্ট্রের নয়, সামি ভূখণ্ডের। পতাকার রঙেই চার রঙের পোশাক গায়ে দিয়ে সামি আদিবাসীরা সুইডেন কি নরওয়ের পথে-প্রান্তরে আদিবাসী জনগণের আত্মপরিচয়ের রাজনৈতিক অধিকারের জন্য ঘুরে বেড়ান। ঘন নীল মানে জল, গাঢ় হলুদ মানে সূর্য, টকটকে সবুজ মানে ধরিত্রী আর উজ্জ্বল লাল মানে আগুন। সবকিছু মিলিয়ে সামি জীবনের এক বহমান ঐতিহাসিক আত্মপরিচয়ই বিকশিত হয়েছে সামি পতাকা ও পোশাকে।

বাংলাদেশের সকল আদিবাসী সমাজে এমনই ঐতিহাসিকভাবে বহমান আছে রঙ ও উপস্থাপনের আপন সব আত্মপরিচয়। চাকমা বস্ত্রবিজ্ঞান অনুযায়ী কোন কাপড় বোনার আগে যেসব নকশা করা হয় সেইসব নকশার ব্যাকরণ ও শুরুর নকশাকে চাঙমা ভাষায় আলাম বলে। আলামের মৌলিক লাল, কালো, বেগুনি ও সবুজ রঙগুলোও প্রকৃতি এবং জীবনকে প্রকাশ করে। আলাম যেমন চাকমা জাতির এক আত্মপরিচয়, বিঞ্চুপ্রিয়া মণিপুরীদের ইনাফি কি ওঁরাওদের কারসা ভাড়া তেমনি এক এক আদিগন্ত আত্মপরিচয়ের নমুনা। পার্থক্য হলো রাষ্ট্র হিসেবে সুইডেন সামি আদিবাসীদের পোষাক ও পতাকার এই আপন আত্মপরিচয়ের রাজনৈতিক স্বীকৃতি দিয়েছে আর বাংলাদেশ তার আদিবাসী জনগণের আত্মপরিচয়কে প্রতিদিন গলাটিপে হত্যা করে চলেছে। পঞ্চাশোর্ধ্ব আন্নেলি জনসন দৃঢ়তার সাথে জানান, আমি কে কি আমার পরিচয় কিভাবে আমি নিজেকে বিরাজিত রাখতে চাই এই সিদ্ধান্ত ও পরিচালনার সূত্র যখন আমার মত করেই আমার আয়ত্তে থাকে তখনি আত্মপরিচয়ের সমীকরণ নিয়ে আমরা আলাপ তুলতে পারি। আর এটি কেবল আমার বয়ে নিয়ে চলা ভূ-খণ্ডের সীমানাতেই সম্ভব, আমাকে উচ্ছেদ করে বা মালিক কি শাসক কি দাস বানিয়ে এটি কোনভাবেই সম্ভব নয়। দীর্ঘদিন থেকে বাংলাদেশের আদিবাসী জনগণ সাংবিধানিক স্বীকৃতির জন্য লড়াই করে চলেছেন। আর এটি আদিবাসী জনগণের আত্মপরিচয়েরই এক রাজনৈতিক উচ্চারণ। আন্নেলি জনসনের প্রসঙ্গ এ জন্যই উল্লেখ করছি, কারণ তার কথাগুলো কোনভাবেই আমার কাছে নতুন মনে হয়নি। এই উচ্চারণ এই স্বাধীন রাষ্ট্রে এই আত্মপরিচয়ের বাহাসকে যিনি প্রথম রাজনৈতিক কায়দায় শ্রেণীপ্রশ্ন হিসেবে ছুড়ে দিয়েছিলেন, তিনি মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা। ১৯৭৩ সনে তার অসাধারণ সংসদীয় বিতর্ক ও বক্তৃতা থেকে ‘কৃষি বিষয়ক গবেষণা ও গবেষক’ শীর্ষক অংশ আজকের আলাপে টেনে আনছি। আত্মপরিচয়ের ব্যাকরণ পাঠে এই অংশটুকুর গুরুত্ব আমার কাছে নিম্নবর্গের রাজনৈতিক কায়দা মনে হয়েছে।

M N Larma
জুম্ম জনগোষ্ঠীদের বর্ণমালায় এম এন লারমার প্রতিকৃতি, ছবি: ফেসবুকক থেকে সংগৃহীত

কে কার কথা বলবে?

আত্মপরিচয় বলতে আমরা ‘সচরাচর’ রাষ্ট্রে কি বহাল থাকতে দেখি? বলা হয়ে থাকে বাংলাদেশে এক সময় ২০ হাজার জাতের ধান ছিলো। আমরা কি ২০ হাজার ধান জাত নিয়ে আত্মপরিচয়ের গর্ব করতে দেখেছি রাষ্ট্রকে কোনোদিন? ১৯৬০ মানে তখনই তথাকথিত সবুজ বিপ্লব শুরু হয়, আর আমাদের হাজার হাজার আপন ধানের সত্ত্বাগুলো বিলীন হতে থাকে, যা আমাদের আত্মপরিচয়ের এক দুর্বিনীত অংশ। ১৯৭৩ সনের ২৮ জুন সংসদে ‘বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইন্সটিউট’ এবং কৃষিভিত্তিক গবেষণার গবেষকের ধরণ নিয়ে প্রস্তাব উত্থাপিত হয়। তৎকালীন সাংসদ মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাই পয়লা সেই উত্থাপিত প্রস্তাব প্রসঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক বয়ান হাজির করেন। আমরা প্রথমে সেই বিতর্কগুলো দেখে নিই আসুন। কারণ এখান থেকেই আমরা আত্মপরিচয়ের সূত্র ও সমীকরণগুলো ধারালো করে নিতে পারি।

জনাব স্পিকার: Amendment in clause 6. Are you moving your amendment, Mr. Larma?

শ্রী লারমা: জনাব স্পিকার সাহেব, আমি আমার amendment move করব। Sir, I beg to move that in clause 6, in para (b) of the bill, in first line, after word, ‘Two members of the parliament’ the words ‘and three Model farmers’ be inserted.

স্যার, আমার ২ নম্বর Amendment-টাও move করছি। Sir, I beg also to move that in clause 6, in para (i) of the bill, be deleted and para (j) be re-numbered as para (i).

জনাব মোঃ আব্দুল সামাদ: জনাব স্পিকার সাহেব, আমি এর বিরোধিতা করি। এটা একটা Vague প্রস্তাব। Model Farmer-এর কি definition সেটা এর মধ্যে পরিষ্কার করা নাই। সুতরাং আমি মনে করি select committee যেটা বিবেচনা করেছে সেটা গ্রহণযোগ্য।

শ্রী লারমা: মাননীয় স্পিকার সাহেব, এই দুইটা সংশোধনী প্রস্তাবের পক্ষে আমার যে যুক্তি সেটা হল যে, এখানে বাংলাদেশ রাইস রিচার্চ ইনস্টিটিউট পরিচালনার জন্য যে বোর্ড করা হয়েছে সেই বোর্ডের জন্য বিলের (ন) তে আছে ‘(ন) Two members of parliament to be appointed by Government by notification in the official Gazette’ এছাড়াও ধ, ন, প, ফ, ব, ভ, ম, য, র, ল পর্যন্ত বিভিন্ন সদস্য নেওয়া হয়েছে। মাননীয় স্পিকার সাহেব, বাংলাদেশ কৃষি ভিত্তিক দেশ। এখানে যাদের সদস্য করা হয়েছে তারা এদেশের সন্তান হলেও সত্যিকারভাবে মাটির সঙ্গে তাদের বিশেষ সম্পর্ক নেই। যে কৃষক রোদে পুড়ে, জলে ভিজে চাষাবাদ করে, নিজের জীবন নিঃশেষে বিলিয়ে দেয়, আজকের এই রাইস ইনস্টিটিউট – যেটার দ্বারা বাংলাদেশের খাদ্য-শস্যের ঘাটতি পূরণ করা হবে, সেখানে তাদের স্থান নাই। আজকে সেখানে প্রাধান্য পেয়েছে Secretary, Ministry of Agricultural; Secretary, Ministry of Finance; Secretary, Ministry of Planning; Chairman, Bangladesh Agricultural Development Corporation; Director of Agriculture (Extension and Management); Director of Agriculture (Research and Education); A Representative from International Rice Research Institute, Philippines; and Director, Bangladesh Rice Research Institute. আমার আর একটা amendment আছে clause 6 এর (র)-তে যেটা আছে A representative nominated by the International Rice Research Institute, Los Banos, Philippines সে সম্পর্কে। মাননীয় স্পিকার সাহেব, প্রথম সংশোধনী সম্পর্কে আমার বক্তব্য হচ্ছে যে, যে দুই জাতীয় সংসদ সদস্যকে রাইস রিসার্চ ইনস্টিটিউট বোর্ডের সদস্য করা হবে, তাঁরা সাধারণত জাতীয় সংসদের সদস্য নাও হতে পারে। এখানে যেসব সদস্য রয়েছেন তাদের মধ্যে বুদ্ধিজীবী, ডাক্তার, ইঞ্জিয়ার, শিক্ষক, উকিল, ব্যবসায়ী বিভিন্ন শ্রেণীর লোক রয়েছেন; কিন্তু কৃষক যারা সত্যিকারে চাষাবাদ করেন, লাঙ্গল ধরে, যারা প্রকৃত মানুষ এই জাতীয় সংসদে তাদের মতন এমন প্রতিনিধি আছে কিনা জানি না। আমি একজন কৃষকের ছেলে। কৃষকের ছেলে হয়ে কৃষকের কথাই বলতে চাই। তাই আমি দেখছি যারা কৃষকের অভিজ্ঞতার কথা বলবে তাঁদেরকে এখানে বাদ দেওয়া হয়েছে। আর যারা ‘এয়ার-কন্ডিশন’ ঘরে আরাম কেদারায় রিসার্চ করবে এখানে কেবল তাঁদেরই নেওয়া হয়েছে।

জনাব স্পিকার: ‘মডেল ফার্মার’ গবেষণা করতে যায় না, তারা চাষ করতে যায়।

শ্রী লারমা: জনাব স্পিকার সাহেব, এই যে রাইস রিসার্চ ইনস্টিটিউট-এর নাম আগে ছিল ইস্ট পাকিস্তান রাইস রিসার্চ ইনস্টিটিউট। এটা মোনায়েম খানের আমলে হয়েছিল। তখন আমরা দেখেছি বই-পুস্তক সেখান থেকে বের হত কতজন কৃষক সেটা জানে এবং তাতে জমি চাষাবাদের যে কি নিয়ম ছিল, বাস্তবে তার কতটা প্রতিফলন হয়েছে। সে জন্য ৩ জন ‘মডেল ফার্মার’ বা ভালো চাষীকে এর সদস্যভুক্ত করা হোক সেটাই আমি চাচ্ছি।

জনাব স্পিকার: মিঃ লারমা, আপনার বক্তব্য বোধ হয় পরিষ্কার হয়েছে।

শ্রী লারমা: জনাব স্পিকার সাহেব, আমার দ্বিতীয় সংশোধনীর উপর কিছু বক্তব্য আছে। আমার দ্বিতীয় সংশোধনী হচ্ছে A representative nominated by the International Rice Research Institute, Los Banos, Philippines এটাকে বাদ দেওয়া হোক। জনাব স্পিকার সাহেব, আমি বুঝতে পারি না যে, আমাদের দেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে বাইরের একটি দেশের লোক কেমন করে এই বাংলাদেশ রাইস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের বোর্ডের সদস্য হতে পারেন। আমরা বরং তাদের কাছ থেকে উপদেশ গ্রহণ করতে পারি, তাদের সাহায্য গ্রহণ করতে পারি। দরকার হলে, এখান থেকে আমরা প্রতিনিধি ফিলিপাইনে পাঠাব। তাছাড়া যেখানে ভালো গবেষণা হচ্ছে, সেখানেই লোক পাঠাব। তাই কেবল ফিলিপাইন গবেষণার ইনস্টিটিউটের লোক নিব কেন? আমাদের দেশের মাটিতে আমরা গবেষণা করব, আমরাই পরীক্ষা করব এবং তার জন্য প্রয়োজন হলে বিদেশ থেকে সাহায্য নিব, বুদ্ধি পরামর্শ নিব। সেই জন্য আমি এটাকে সম্পূর্ণরুপে ‘ডিলিট’ করতে বলছি

………….. (কৃষিমন্ত্রীর বক্তব্যর পর ভোটে প্রস্তাবটি নাকচ হয়ে যায়) ………………

মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা উল্লিখিত সংসদীয় বাহাস থেকে আমরা বেশ কিছু নিশানা ও আওয়াজ স্পষ্ট খেয়াল করতে পারি। কে, কার জন্য, কি এবং কিভাবে বলছেন। আত্মপরিচয় প্রসঙ্গের ভ্রূণ এখানেই। মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইন্সটিটিউটে কৃষক প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্তকরণ এবং ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠানে সদস্য হিসেবে দেশের বাইরের কারো উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। প্রশ্ন ও প্রসঙ্গসমূহ দেশের সার্বভৌমত্ব ও আত্মপরিচয়ের সুরক্ষিত সীমানার সাথে জড়িত। মানবেন্দ্র প্রশ্ন করেছেন, কেন ধান নিয়ে রাষ্ট্রের গবেষণা প্রতিষ্ঠানে ধান নিয়ে যার আজন্ম অধিকার সেই কৃষকের অধিকার থাকবে না? কেন দেশের বাইরের ফিলিপাইনের ইরির কেউ বাংলাদেশের ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সদস্য হবেন। এখানে এম এন লারমা ভৌগলিক সীমানাকে যাপিতজীবনের সংস্কৃতি দিয়ে পাঠ করেছেন। মানুষের অভিজ্ঞতা ও বহমান সংস্কৃতির ঠিকুজির প্রসঙ্গ তুলেছেন। আর এখানটাতেই আমরা আত্মপরিচয়ের সূত্রগুলো হাজির হয়ে থাকতে দেখি।

আমি কে? কে নির্ধারণ করবে?

আমি একজন কৃষকের ছেলে।
কৃষকের ছেলে হয়ে কৃষকের কথাই বলতে চাই।
(মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা: জুন ১৯৭২)

 

বাংলাদেশের কোটি কোটি জনগণের সঙ্গে আমরা ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
সব দিক দিয়েই আমরা একসঙ্গে একযোগে বসবাস করে আসছি। কিন্তু আমি একজন চাকমা
(মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা: অক্টোবর ১৯৭২)

 

এই সংবিধানে আমরা আমাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত। আমরা বঞ্চিত মানব।
আমাদের অধিকার হরণ করা হয়েছে
(মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা: অক্টোবর ১৯৭২)

 

মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার বক্তব্য থেকে এখানে তার এক ধরণের শ্রেণি পরিচয়ও আমরা ঠাহর করতে পারি। তিনি বলেছন, তিনি একজন কৃষকের ছেলে। মানে এখান থেকে আমরা উৎপাদন সম্পর্কের সাথে জড়িত তাঁর সামাজিক শ্রেণিগত পরিচয়টি পাই, পাই তাঁর লিঙ্গীয় পরিচয়। যখন তিনি আরো বিস্তারিতভাবে নিজেকে চাকমা হিসেবে উপস্থাপন করেন, তখনই গর্বিত কায়দায় প্রকাশিত হয় তাঁর জাতিগত শ্রেণিচরিত্র। পেশা কি জাতি সব ছাপিয়ে তিনি যখন নিজেকে এক বিস্তৃত শ্রেণির সদস্য হিসেবে নিজেকে পাঠ করেছেন, তখন তিনি নিজেকে বলেছেন ‘বঞ্চিত মানব’। মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাই নিজের পরিচয় নিজে উপস্থাপন করেছেন রাষ্ট্রীয় দরবারে। তবে এ পরিচয় তিনি গায়গতরে একতরফা নির্ধারণ করেন নি। তিনি এই পরিচয়ের ঐতিহাসিক সম্পর্ক ও বিস্তারকে টেনে এনেছেন। এই পরিচয় এক বিরাজমান ও বিকাশমান আত্মপরিচয়। যার সাথে তাঁর কৃষি ও উৎপাদন সম্পর্কের জীবন, চারপাশের প্রকৃতি, চলমান সংস্কৃতি এবং সামাজিক বঞ্চনা ও ক্ষমতার বল প্রয়োগ জড়িয়ে আছে। এই পরিচয় এক সামাজিক দেন-দরবার আর শ্রেণি-সম্পর্কের ঘাত-প্রতিঘাতের ভেতর দিয়ে বাহিত হয়েছে। একজন মানুষের পরিচয় কি হবে, কিভাবে হবে, কিভাবে সে তাঁর পরিচয়কে আগলে থাকবে কি থাকবে না সব কিছুই তার চারপাশের সমাজ ও প্রকৃতির সম্পর্কের রূপান্তরের ভেতর দিয়ে আওয়াজ মেলে। আপন কায়দায় এই আওয়াজকে ধারণ করে সামিল হওয়া কি দৃশ্যমানতার বিবরণ তৈরি করাই ‘আত্মপরিচয়ের ব্যাকরণ’। মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার মতো এই ব্যাকরণ আর কাউকেই এমন প্রবলভাবে রাষ্ট্রসভায় উপস্থাপন করতে আমরা দেখিনি।

মানবেন্দ্র যখন বলেন, ‘আমি কৃষকের ছেলে’, তখন আমরা এক চলমান জুম ও কৃষিজীবন ধারায় বহমান তাঁর এক পরিচয় আমাদের সামনে উপস্থাপিত হয়। এই পরিচয় তিনি নির্মাণ করেননি, এই পরিচয় তিনি বহন করে চলেছেন। এখানে তিনি তাঁর পূর্বজনদের স্মৃতি ও আখ্যানের সূ্ত্র সমন্বয় করেছেন। আর এই অবস্থান থেকেই তিনি কৃষকের কথা বলতে চেয়েছেন। রাষ্ট্রের পরিচয়ের কাঠামোতে তিনি কৃষককে, উৎপাদন ও শ্রম সম্পর্কের সাথে জড়িত তাঁর বাহিত জীবন পরিচয়কে যুক্ত করতে চেয়েছেন। তিনি তাই বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে কৃষকের অন্তর্ভুক্তির জোর দাবি তুলে ধরেছেন। কিন্তু নিদারুণভাবে দেখতে পাই রাষ্ট্র মানবেন্দ্রের এই আওয়াজকে পাত্তা দেয়নি। নাছোড়বান্দা রাষ্ট্র জনগণের আত্মপরিচয়ের দলিলকে দলিত করে গড়ে তুলেছে বাংলাদেশ রাইস রিসার্চ ইন্সটিটিউট (ব্রি)-এর মতো এক প্রাণ ও জুম-কৃষি সংহারী প্রতিষ্ঠান।

M N Larma
মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা, ছবি: ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত

বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ধান গবেষণা শুরু হয় ১৯১০ সালে ঢাকার তেজগাঁও এলাকায় যা ঢাকা ফার্ম বা মণিপুরী ফার্ম নামে পরিচিত ছিল। ১৯১০ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত ৬০টি স্থানীয় ধানের জাতকে ঢাকা ফার্ম থেকে অনুমোদন দেয়া হয়। পাশাপাশি ১৯৩৪ সালে হবিগঞ্জ জেলার নাগুরা এলাকায় স্থাপিত হয় উপমহাদেশের প্রথম গভীর পানির ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠান, যা বর্তমানে ব্রি’র আঞ্চলিক কার্যালয় হিসেবে কাজ করছে। ১৯৬০ সালেই ফিলিপাইনে স্থাপিত হয় আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠান (ইরি)। উষ্ণমণ্ডলীয় জলবায়ু অঞ্চলে উচ্চ ফলনশীল (উফশী) ধানের প্রবর্তক। ইরির মাধ্যম ঢাকা ফার্ম ১৯৬৬ সালে আইআর-৮ নামের একটা তথাকথিত উফশী ধানের জাত সংগ্রহ করে এবং প্রশ্নহীনভাবে এ দেশের কৃষির ঐতিহাসিক বিরাজমানতাকে অস্বীকার করে ১৯৬৭ সালে মাঠ পর্যায়ে চাষাবাদের জন্য আইআর-৮ ধান জাতটিকে অনুমোদন দেয়া হয়। তখনই দেশব্যাপী লোকায়ত জুম-কৃষির বিস্তৃত প্রাণবৈচিত্র্যেকে কোনো ধরণের বিবেচনায় না এনে তথাকথিত ‘সবুজ বিপ্লবের’ নামে মাটির তলার পানি টেনে তুলে-রাসায়নিক সার এবং বিষ প্রয়োগে চালু করা হয় উফশী ধান চাষের নানা প্রকল্প।

১৯৭০ সনে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইন্সটিটিউট বা ব্রিই বাংলাদেশের কৃষিভূমি এবং কৃষকচৈতন্যে তথাকথিত ‘সবুজ বিপ্লবের’ প্রচলক এবং রাষ্ট্রের বৈধ সমন্বয়ক। ১৯৭০ থেকে ২০১২ সন পর্যন্ত ব্রি হাইব্রিডসহ মোট ৫৮ উফশী ধানের জাত ‘উদ্ভাবন’ এবং অনুমোদন করেছে। কেবলমাত্র ব্রি বা গবেষণা প্রতিষ্ঠানই নয়, দেশের কোনো কৃষি প্রকল্পেই দেশের সমতল অঞ্চলের কৃষি বা পাহাড় এলাকায় জুমচাষের ক্ষেত্রে কখনোই স্থানীয় ধানবৈচিত্র্য এবং লোকায়ত কৃষিচর্চাকে বিবেচনা করা হয়নি। সবুজ বিপ্লবের ভেতর দিয়ে সংগঠিত এই তথাকথিত কৃষি উন্নয়ন কর্মসূচি কি দেশের কাঙ্ক্ষিত খাদ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পেরেছে? যদি এ উন্নয়ন কর্মসূচিকে আমরা দেশের প্রাণ, প্রকৃতি ও জনজীবনের স্থায়িত্বশীলতা সবকিছু দিয়ে বিচার করি তবে তা এখনো পর্যন্ত কোনো ধরণের স্থায়িত্বশীলতার উদাহরণই সৃষ্টি করতে পারেনি। তাই ইরির ৫০ বছর পূর্তিতে ‘সবুজ বিপ্লবের’ বিরূদ্ধে বৈশ্বিক প্রতিরোধ সংগঠিত হতে দেখা গেছে। নিপীড়িত কিষাণ-কিষাণীরা ইরির দিকে আঙুল তুলে চিৎকার করে বলেছে, ৫০ ‍বছর যথেষ্ট সময়, আর নয়।

মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা যখন নিজেকে চাকমা হিসেবে পরিচয় দেন, তখনও সেই পরিচয় তাঁর বহমান জীবন আখ্যানই হাজির করে। শ্রম ও উৎপাদন সম্পর্কের পাশাপাশি এখানে জড়িয়ে আছে যাপিতজীবনের আরো জটিল গণিত। রাষ্ট্র যে গণিতকে বরাবর ‘নাক চ্যাপ্টা আর চ্যাং ব্যাং ভাষা’ দিয়ে চিহ্নিত করে সকল ঐতিহাসিকতাকে আড়াল করে ফেলতে চায় জলপাই বাহাদুরি আর উন্নয়নের মারদাঙ্গা চাবুকের তলায়। রাষ্ট্র সেই ১৯৭২ সালেই মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাকে ‘বাঙালি’ হওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। ৩০ জুন ২০১১ তারিখে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশ আদিবাসী-বাঙালিসহ সকলের জাতীয়তা নির্ধারণ হয়েছে ‘বাঙালি’। রাষ্ট্র আদিবাসী জনগণের নতুন নাম দিয়েছে, ‘উপজাতি, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও সংখ্যালঘু জতিসত্তা। পাশাপাশি রাষ্ট্র সমসাময়িক কালে বলছে, দেশে কোনো আদিবাসী নেই। রাষ্ট্র যখন জনগণের পরিচয় নির্মাণ করার মারদাঙ্গা জিইয়ে রাখে, তখনই দেশের পতাকা রাষ্ট্রের মাধ্যমে ছিনতাই হয়ে যায়। তখনই দেশ ও রাষ্ট্রের ভেতর তৈরি হয় যোজন যোজন দূরত্ব। এ দূরত্বকে রাজনৈতিক কায়দায় মোকাবেলার জন্য নিম্নবর্গের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ সামিল থাকলেও জরুরি এক বিপ্লবী শ্রেণি জাগরণ। মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা শেষ পর্যন্ত সেই লড়াই শুরু করেছিলেন।

কৃষকের ছেলে বা চাকমা নয়, মানবেন্দ্র শেষতক নিজের পরিচয়ের সীমানা বিস্তৃত করেছেন ‘বঞ্চিত মানব’ হিসেবে। বলেছেন অধিকারহীন। এখানে আর চেপ্টা কি খাড়া নাক, ধলা কি কালা, কৃষক কি জেলে, মজুর কি তাঁতী, নারী কি পুরুষ কাউকেই আর আলাদা পরিচয়ে দেখা হয়নি। এই সীমানা বঞ্চিত অধিকারহীন নিম্নবর্গের এক জোরালো পাটাতন। কিন্তু কোনভাবেই মানবেন্দ্র তাঁর কৃষক ও চাকমা পরিচয়কে গায়েব করে ফেলেননি। বরং বরাবর তিনি রাজনৈতিকভাবে স্পষ্ট করেছেন। সকল দলিত বঞ্চিত বর্গসমূহের এক সম্মিলিত শ্রেণিকেই তিনি ‘বঞ্চিত মানব’ হিসেবে চিহ্নিত করতে চেয়েছেন। যেখান থেকে প্রবল ক্ষমতার বিরুদ্ধে শ্রেণি প্রতিরোধ আরো সক্রিয় হয়ে ওঠে। কিন্তু ঐতিহাসিকভাবেই আমরা দেখেছি ক্ষমতার বলপ্রয়োগ কিভাবে কৃষক, আদিবাসী ও বঞ্চিত মানবের উপর বরাবর প্রশ্নহীন কায়দায় হামলে পড়েছে। নিরন্তর ক্ষমতাহীনের আত্মপরিচয়কে ফানা ফানা করে ক্ষমতা কাঠামোর পরিচয়কেই চাপিয়ে দেয়ার জবরদস্তি বহাল রেখেছে।

১৮৫৫ সনের সাঁওতাল বিদ্রোহের সময়েও আমরা দেখেছি বাঙালি বা দিকুরা কিভাবে আদিবাসী জনগণকে ঘিরে এক অন্যায় শোষণের বলয় তৈরি করেছিল। নেত্রকোণার সুসং দূর্গাপুরে হাতীখেদা আন্দোলনের সময়ও আমরা দেখেছি হাতীবাণিজ্যের বিরোধিতাকারী হাজংদের রাজা-অবাধ্য নামে ঘোষণা করা হয়। সেখানেও শুরু হয়েছিল রাজা-বাধ্য আর রাজা-অবাধ্যর এক শ্রেণিসংগ্রাম। উলগুলান বা মুন্ডা বিদ্রোহে বিরসা মুন্ডা উপনিবেশ রাষ্ট্রের জুলুমের বিরুদ্ধে এই আওয়াজ দিয়েছিল। এক প্রবল উপনিবেশের ভেতরে থেকেও যারা নিজেদের আপন জাতিগত শ্রেণিজাগরণের স্ফুলিঙ্গসমূহ একত্র করে অন্যায় আর জুলুমের বিরুদ্ধে বারবার রুখে দাঁড়ান তারাই ‘আদিবাসী’। জাতিরাষ্ট্রের বৈষম্যের গণিতে যারা অনিবার্যভাবে গরিব, সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক হয়ে পড়েন। যাদের কোনো অধিকার ও ন্যায়বিচার থাকে না। রাজা, জমিদার, মহাজন, জোতদার, দিকু, দিয়াড় আর প্রবল বাঙালিগিরির বিরুদ্ধে যাদের বারবার লড়াই করে যেতে হয়। রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ কোনোভাবেই নিম্নবর্গের এসব শ্রেণিপ্রশ্নকে আমলে নেয় নি, করে রেখেছে ‘দুধভাত নাগরিক’। শ্রী হরিদাস পালিত ১৯৩২ সালে কায়স্থ সমাজ পত্রিকায় ‘বাংলার আদিম জাতি ও সভ্যতা’ শীর্ষক প্রবন্ধে লিখেছেন, দেশের আদিম আদিবাসীরা – হড়, হো (কোল) নামক জাতি, এরাই এদেশের আদি মানব; তারাই তাদের দেশকে বলতবাংলো এদেশটা জলবহুল দেশ, জলাভূমি যথেষ্ট, ছেঁচে জল ক্ষেত্রে দিতে হতো না বাং মানে না, আর লো মানে পাত্র ডুবিয়ে জল তোলা তা থেকে জল ছেঁচা বোঝায় যে দেশে ছেঁচে জল দিতে হয় না, জল ছেঁচার আবশ্যক হয় না, অর্থাৎ ধান্যক্ষেত্রে জলের অভাব হয় না সেই দেশইবাংলোদিশম ইহাই তাদের জন্মভূমি (আয়ুদিশম) আর্য বৈদিকরা এদেশের নাম করেন নাই

নিদারুনভাবে আমরা দেখতে পাই রাষ্ট্রের মনোজগত ও নিপীড়নের বারুদ বারবার ঝলসে দেয় আদিবাসী ভুবন। এক আদিবাসী আত্মপরিচয়কে ঘিরেই রাষ্ট্র যা শুরু করেছে, বুঝে হোক না বুঝে হোক রাষ্ট্র তার ঝুরঝুরে রাজনৈতিক অনভিজ্ঞতাই প্রকাশ করে দিচ্ছে বারবার। অমুক তমুক বাহিনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রকে কেন বারবার নিরাপত্তার ব্যর্থ ছল তৈরি করতে হয় বা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনী কেন নিরপরাধ বেসামরিক জনগণের উপর হামলা চালায়? এসব বাহাস আর দেনদরবার নিয়েই হয়তো রাষ্ট্র বিকশিত হয় ‘সুশীল’ ভাবাদর্শের জখম ছড়িয়ে। আমরা সেদিকে আজকের আলাপে যাচ্ছি না। কিন্তু রাষ্ট্র যখন আদিবাসী জনগণের উপর নিরাপত্তা বাহিনীর অবিরাম নিপীড়নকে ‘নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব কর্তব্য’ হিসেবেই বৈধ করতে চায় আমাদের দ্বন্দ্বটা সেখানেই। আমরা এটি দেখে অভ্যস্ত হয়েছি যে, জলবিদ্যুতের নামে, সামাজিক বনায়নের নামে, বাণিজ্যিক খননের নামে, কি পর্যটনের নামে, কি সেনাস্থাপনা সম্প্রসারণের নামে আদিবাসী জনপদ উচ্ছেদ হবে। জনশুমারীতে আদিবাসী পরিসংখ্যান উধাও হয়েই থাকবে। রাষ্ট্র জনগণের যাপিতজীবন নিয়ে নিরাপত্তার যে পাতানো খেলা খেলে চলে আদিবাসীদের সেখানে ‘দুধভাত’ বানিয়েই রাখা হয়েছে। আদিবাসীদের নিয়ে রাষ্ট্রের অধিপতি মনস্তত্ত্বের মূলে রয়েছে এক ঐতিহাসিক ঔপনিবেশিকতা। উপনিবেশিকতার এই অন্যায় ঘোর ভেঙে নতুন সম্পর্ক বিনির্মাণের ভেতর দিয়েই সুরক্ষিত হবে আত্মপরিচয়ের আপন সীমানা। অন্য কোনোভাবেই এটি ঘটবে না, ইতিহাসের সূত্র ও সমীকরণ সেই আওয়াজ দেয় না।

কার রচনা? কার ইতিহাস?

বলা হয়ে থাকে, এখনও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস রচিত হয়নি বা সঠিকভাবে ইতিহাস রচনা করা হয়নি। কিন্তু যতটুকু রচিত হয়েছে, তার সবখানেতেই লেখা আছে ‘মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির গৌরবময় ইতিহাস’। দেশের সকল প্রান্তের আদিবাসী জনগণ মুক্তিযুদ্ধে জানবাজি রেখে অংশ নিয়েছেন, শহীদ হয়েছেন। তারপরও মুক্তিযুদ্ধ কেবলি বাঙালির ইতিহাস। ঠিক যে কায়দায় মুক্তিযুদ্ধে নারী ও হিজড়াদের দুবির্নীত অংশগ্রহণকেও আড়াল করে বরাবর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস হয়ে ওঠে কেবলি ‘পুরুষের ইতিহাস’। এ প্রশ্নটি দীর্ঘদিনের। অমীমাংসিত। কিংবা মীমাংসার অতীত। কার রচনা কে রচনা করবে কিভাবে করবে? ইতিহাস কার দৃষ্টিতে কার ইতিহাস হিসেবে কার জন্য কিভাবে কোন কায়দায় এবং কেন নথিভুক্ত হবে? একথা অস্বীকার করার কোনো কারণই নেই যে, ইতিহাস মানেই ক্ষমতা কাঠামোর ইতিহাস। বিদ্যমান রচনাসমূহ তাই আড়াল করে ফেলে নিম্নবর্গের আত্মপরিচয়ের আহাজারি ও আখ্যান। মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে উপলব্ধি করেছেন। সংসদে এ নিয়ে বিতর্ক তুলেছেন। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইন্সটিটিউট তার বোর্ডের সদস্য করতে চেয়েছিল আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মনোনীত প্রতিনিধিকে। মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা ছাড়া আর কেউ এর প্রতিবাদ করেন নি। বা করতে চাননি বা প্রতিবাদ করার মতো রাজনৈতিক যোগ্যতাই ছিল না। বাংলাদেশের কৃষিভূগোল ও বাস্তুসংস্থানের সাথে চূড়ান্তভাবে সম্পর্কহীন ফিলিপাইনের লসবানুসে অবস্থিত ইরি কিভাবে বাংলাদেশের মতো একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের রাষ্ট্রীয় পাবলিক প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি হতে পারে? কিভাবে রাষ্ট্র দেশের প্রাণসম্পদ ও প্রকৃতির সীমানা বহিরাগত কর্পোরেট জিম্মায় ছেড়ে দিয়ে সার্বভৌমত্বের মেকি গণতন্ত্রের ঝকমারি বজায় রেখেছে তা বুঝেতে হলেও আমাদের সেই সময়ের সংসদীয় বিতর্কগুলো জানা বোঝা জরুরি। একজন মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার আত্মপরিচয়ের সংগ্রামকে পাঠ ও পাঠ্য করা জরুরি। উত্তর আমেরিকার বিশ্বব্যাংকের সদর দপ্তরে অবস্থিত আন্তর্জাতিক কৃষি গবেষণা পরামর্শক দল বা সিজিআইএআর এবং ইরি মিলেই গোলার্ধ জুড়ে তথকথিত সবুজ বিপ্লবের নামে শুরু হয় ‘প্রাণডাকাতি’। হাজার হাজার শস্য ফসলের জাতও প্রাণসম্পদের বিপুল ভাণ্ডার চলে যায় তাদের জিম্মায়। পরবর্তীতে তাদের হাত ধরেই সিনজেনটা, মনস্যান্তো, কারগিল ও ডুপন্টের মতো কর্পোরেট কৃষি-বিষ কোম্পানিরা দুনিয়ার কৃষি ও জুম সীমানা দখল করে নেয়। যেন এ এক অনিবার্য নিয়তি।

M N Larma
এম এন লারমা, ছবি: স্মারক গ্রন্থ, এম এন লারমা

মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা কৃষি ও জুম সীমানার এই সর্বনাশা পরিস্থিতি আঁচ করেছিলেন। তাই তিনি রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের জোর প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছিলেন, আমাদের মাটি আমাদের জমি আমরাই চায় করবো, আমরাই গবেষণা করবো। কৃষি কি জুম যেহেতু আমাদের জীবন মরণের ইতিহাস, সেই ইতিহাস রচনায় দায় ও দায়িত্ব মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা অন্য কোনো বহিরাগতের কাছে ছাড়তে চান নি। কারণ তিনি জানপ্রাণ দিয়ে আপন ইতিহাসের বিস্ময় ও বৈচিত্র্যর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন। পরবর্তীতে আমরা কি দেখছি, রাষ্ট্র কি দেশের জনগণের পরিচয় ও বেঁচেবর্তে থাকবার প্রাণসম্পদের কি কোনো ধরণের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পেরেছে? না কোনোভাবেই পারেনি। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইন্সটিটিউট নির্দয়ভাবে ২০১২ সালে সংরক্ষিত আট হাজার ধানের জাতকে গলা টিপে হত্যা করেছে। জনগণের ধানের জাতকে জনগণের কোনো অনুমোদন ছাড়াই গবেষণার নামে ব্রি তুলে দিয়েছে কর্পোরেট সিনজেনটা কোম্পানির জিম্মায়। একক আয়তনে দুনিয়ার সবচে বড় ম্যানগ্রোভ বনভূমিতে শেল কোম্পানিকে খননের অনুমোদন দিয়েছে। লাউয়াছাড়া বনভূমিকে ছাড়খাড় করে দিয়েছে অক্সিডেন্টাল, ইউনোকল ও শেভরন। অথচ, সেই ১৯৭২ সালেই মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা রাষ্ট্রের কাছে দাবি তুলেছেন, আমাদের গবেষণা ও কাজ আমরাই করবো। মানবেন্দ্রের এই ‘আমরা’ উচ্চারণের ভেতর দিয়ে আমরা এক সামগ্রিক বাংলাদেশের আত্মপরিচয়কে প্রবলভাবে খুঁজে পাই। তিনি সকল ধরণের অন্যায় ও দখলদায়িত্বের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণকে ‘আমরা’ হিসেবে পাঠ করেছেন। তিনি নিজেই সেই জনগণের অংশ হিসেবে নিজেকে সাহসের সাথে পরিচিত করেছেন। এই ‘আমাদের’ ভেতরেই তিনি ‘বঞ্চিত মানব’, ‘চাকমা’ ও ‘কৃষকের ছেলের’ পরিচয়কেও সমমর্যাদা ও রাজনৈতিক কায়দায় প্রতিষ্ঠা করেছেন। মানবেন্দ্রের আত্মপরিচয়ের এই সমীকরণ আমাদের বারবার দেশের আদিবাসী কি বাঙালি সকলের আত্মপরিচয় সাহসিকতার সাথে তুলে ধরার এক মৌলিক রাজনৈতিক পাঠ্য। দেশের প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ্যপুস্তকে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার এই দীক্ষা ও দর্শন যুক্ত ও চর্চা করা জরুরি। কারণ তা না হলে, আপন আত্মপরিচয়ের আপন নির্মাণ ও ভূগোল থেকে বারবার কেবলমাত্র আদিবাসী নয়, দেশের সকল জনগণকেই ছিটকে পড়তে হবে। নিরুদ্দেশ ও আড়াল হয়ে যেতে হবে।

আন্নেলি জনসনকে আমি প্রশ্ন করেছিলাম, কেন সুইডেন সরকার জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করছে না? আন্নেলির স্পষ্ট জবাব, এর এমন কি দরকার? আমরা প্রতিনিয়ত আমাদের আত্মপরিচয়ের সূত্র ও সমীকরণগুলি তরতাজা রাখার জন্য রাষ্ট্রের সাথে লড়াই করে চলি। রাজনৈতিক আন্দোলন ছাড়া কোনোভাবেই দুনিয়ার কোথাও আদিবাসী জনগণের মুক্তি সম্ভব নয়। আমি সরাসরি রাষ্ট্রের সাথে প্রতিনিয়ত দেনদরবার করে চলি। একটি ঘোষণা কি দলিল কি আছে কি নেই তা কিন্তু আমার বহমান আত্মপরিচয়কে আটকে ফেলতে পারে না। ঘোষণা কি দলিলের জন্য আমি নই। আমার জন্যই ঘোষণা কি দলিল তৈরি হয়েছে। আর আমাদের সামি আদিবাসীদের এই রাজনৈতিক চেতনাই আমরা মনে করি, আমাদের আত্মপরিচয়। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইন্সটিটিউট-এর প্রসঙ্গ টেনে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা ঠিক একটি আদিবাসী আত্মপরিচয়ের সর্বজনীন সূত্রকে আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। রাষ্ট্রের একটি পাবলিক প্রতিষ্ঠানকে তিনি জনগণের যাপিতজীবনের সম্পর্কের ভেতর দিয়ে জনগণের কায়দায় দেখতে চেয়েছেন। প্রয়োজনে বহিরাগত সহযোগিতা নেয়ার ক্ষেত্রেও তিনি মন্তব্য করেছেন। কিন্তু সবার আগে দরকার নিজেদের জন্য নিজেদের মতো করে নিজেদের অংশগ্রহণে একটি নিজেদের প্রতিষ্ঠান, নিজেদের সীমানা। মানবেন্দ্রের এই অবস্থান হয়তো প্রতীকী অর্থে কেবলমাত্র একটি প্রতিষ্ঠানের সাপেক্ষে একটি কিন্তু এর ভেতর দিয়েই রাষ্ট্রকে ছাপিয়ে জনগণের সামনে এক আপন ‘দেশের’ রূপ ও আওয়াজ উন্মুখ হয়ে ওঠে। আর সেই দেশের পতাকাই তখন জনগণের পতাকা হয়ে ওঠে। আত্মপরিচয় ও আত্মনিয়ন্ত্রণের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সকল সূত্র ও সমীকরণ এখানেই। জনগণের রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার আত্মপরিচয়ের এই সমীকরণ মানতে বাধ্য।


পাভেল পার্থ

স্মারক গ্রন্থ, মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার জীবন ও সংগ্রাম; এপ্রিল ২০১৬


১ বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ বিতর্ক। বিষয়: BANGLADESH RICE RESEARCH INSTITUTE BILL, 1972, খণ্ড ২ সংখ্যা ২১। বৃহস্পতিবার, ২৮ জুন, ১৯৭২।

 বাংলাদেশ গণপরিষদে বিতর্ক। বিষয়: সংবিধান-বিল বিবেচনা (দফাওয়ারী পাঠ), খণ্ড ২ সংখ্যা ১৩। মঙ্গলবার, ৩১ অক্টোবর, ১৯৭২।

 প্রাগুক্ত।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here