কি আছে আমাদের মহাবিশ্বে?

0
7

“মহাবিশ্বে মহাকাশে মহাকাল-মাঝে ॥ আমি মানব একাকী ভ্রমি বিস্ময়ে, ভ্রমি বিস্ময়ে ॥ তুমি আছ, বিশ্বনাথ, অসীম রহস্যমাঝে নীরবে একাকী আপন মহিমানিলয়ে ॥ অনন্ত এ দেশকালে, অগণ্য এ দীপ্ত লোকে, তুমি আছ মোরে চাহি– আমি চাহি তোমা-পানে। স্তব্ধ সর্ব কোলাহল, শান্তিমগ্ন চরাচর– এক তুমি, তোমা-মাঝে আমি একা নির্ভয়ে ॥” —- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর!

আমাদের চিরচেনা মহাবিশ্ব সদা রহস্যময়, কিন্তু বিজ্ঞানের জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে মানবজাতি প্রযুক্তির সহায়তায় মহাবিশ্বের এই রহস্যময়তাকে ভেঙ্গে নিত্যনতুন অনেক জিনিস আবিস্কার করে চলেছে অসীম অন্ধকারের মাঝে। আজ অবধি আমরা মহাশূন্যের মহাকাল মাঝে যা কিছু আবিস্কার করেছি সেগুলো নিয়ে সংক্ষেপে কিছু লেখার চেষ্টা করছি। আশা রাখি আপনাদের এগুলোকে চিনতে খুব একটা কষ্ট হবে না।

সুপার ক্লাস্টারঃ

“সুপার ক্লাস্টার” হল আমাদের দৃশ্যমান মহাবিশ্বের সবচেয়ে বিশাল বস্তু। কতগুলো ছোট ছোট ক্লাস্টার বা অনেকগুলো গ্যালাক্সি মিলে একটি “সুপার ক্লাস্টার” গঠিত হয়। আমাদের “মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি” যে সুপার ক্লাস্টার এর অন্তর্গত তার নাম -“Laniakea Supercluster”।আমাদের দৃশ্যমান মহাবিশ্বে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা প্রায় ১০ মিলিয়ন সুপারক্লাস্টারের সন্ধান পেয়েছেন। “Colossal Ring of Galaxies” হল দৃশ্যমান মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় বস্তু বা সুপারক্লাস্টার। এর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তের দূরত্ব প্রায় ৫ বিলিয়ন আলোকবর্ষ!

গ্যালাক্সি ক্লাস্টারঃ

ক্লাস্টার হল দৃশ্যমান মহাবিশ্বের দ্বিতীয় বড় বস্তু। ১০০ থেকে ১০০০ গ্যালাক্সি মিলে গঠিত হয় এক একটা গ্যালাক্সি ক্লাস্টার।গ্যালাক্সি ক্লাস্টা্র হল- গ্যালাক্সিদের একটা লোকাল গ্রুপ। সুপারক্লাস্টার যদি ১০ মিলিয়ন হয় তবে গ্যালাক্সি ক্লাস্টার কয়টা হবে চিন্তা করে দেখেন!

গ্যালাক্সিঃ

জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের সবচেয়ে সঠিক হিসাব অনুযায়ী আমাদের দৃশ্যমান মহাবিশ্বে অন্ততঃপক্ষে ১৭০ বিলিয়ন গ্যালাক্সি রয়েছে। ছোট বড় অনেক অনেক নক্ষত্র মিলে গঠিত হয় এক একটি গ্যালাক্সি। যেমন আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কথা যদি ধরি, মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির মধ্যে প্রায় ১০০ বিলিয়ন নক্ষত্র রয়েছে, কোন কোন গ্যালাক্সিতে এই সংখ্যা ৪০০ বিলিয়ন। [বিঃদ্রঃ বাংলায় ছায়াপথ শব্দটা এড়িয়ে গেলাম]

নক্ষত্রঃ

আমাদের দৃশ্যমান মহাবিশ্বে নক্ষত্র কতটি হতে পারে? নক্ষত্রগুলোকে তাদের তাপমাত্রা এবং স্পেক্ট্রার উপর ভিত্তি করে ৭ টা ভাগে ভাগ করা হয়। O, B, A, F, G, K এবং M। যেমন আমাদের সূর্য G2V টাইপের হলুদ বামন নক্ষত্র। সূর্যের চেয়েও অনেক বেশি গুণ বড় নক্ষত্রের সন্ধান মিলিছে অহরহ আমাদের এই দৃশ্যমান মহাকাশ ! আর হ্যাঁ, নক্ষত্রের সংখ্যাটা হল – ১০০ অক্টিলিয়ন সোজা কথায় ১ এর পরে ২৯ টা শূন্য বসায় দিলে হবে!

কোয়াসারঃ

কোয়াসার বা Quasar নামক বস্তুটিকে ধরে নেওয়া হয় আমাদের মহাবিশ্বের সবচেয়ে দূরবর্তী বস্তু। Quasar মূলত Quasi-stellar radio source নামের সংক্ষিপ্ত রুপ যার অর্থ “আংশিক মাত্রায় নাক্ষত্রিক”। এরা আকারে গ্যালাক্সিদের চেয়ে ছোট হলেও তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি গ্যালাক্সির তুলনায় প্রায় ১০০ থেকে ১০০০ গুণ বেশি আলো উৎপন্ন করে থাকে আমাদের মহাবিশ্বে।

সুপারনোভাঃ

Supernova বাংলায় সুপারনোভা সম্পর্কে আমরা অনেকেই অনেক ভালো জানি। অতিবিশাল বিস্ফোরণমুখী নক্ষত্রগুলোকে সুপারনোভা বলা হয়। যে মুহুর্তে এরকম বিশাল নক্ষত্রের মৃত্যু ঘটে তার ঠিক আগে এটি প্রচন্ড পরিমাণে শক্তি নির্গত করে, এর ফলে আগের তুলনায় লক্ষ-কোটিগুণ বেশি আলোকিত হয়ে ওঠে। এরপর ক্রমশ সংকুচিত হয় মৃত-নক্ষত্রে পরিণত হয়। সত্যি বলতে গেলে এই সুপার নোভার বুক ফেটেই আমাদের দেহ গঠনকারী মৌলগুলো জন্ম নেয়। আমরা সুপারনোভার সন্তান বললে মোটেই ভুল হবে না!

ব্ল্যাক হোলঃ

ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণ গহ্বর যাই বলি এই টার্মটা বিজ্ঞানপ্রেমী মানুষদের কাছে এত কমন যে নতুন করে কিছুই বলার নাই। সূর্যের চেয়েও বহুগুণে ভারী নক্ষত্র বা অনেকগুলো নক্ষত্রপুঞ্জ গ্র্যাভিটেশনাল বিস্ফোরণের মাধ্যমে কৃষ্ণ গহ্বরের সৃষ্টি হয়। বড় বড় কিছু নক্ষত্রের জন্য এটাই চূড়ান্ত পরিণতি। এক্ষত্রে বিস্ফোরণ কিন্তু বাইরের দিকে হয় না বরং ভিতরের দিকে হ্য়, ফলে এর ঘনত্ব এত বেড়ে যায় যে, গ্র্যাভিটির টানে আলো পর্যন্ত বেরিয়ে আসতে পারে না এর কবল থেকে।

নীহারিকাঃ

নীহারিকা বা Nebula যাই বলি, ধুলা-হাইড্রোজেন, হিলিয়াম ও অন্যান্য গ্যাস দিয়ে গঠিত দানব আকৃতির দ্যূতিময় মেঘ। বহুবচনে Nebula কে Nebulae বলা হয়। আশেপাশের উজ্জ্বল নক্ষত্রের আলোতে এরা আলোকিত হয়। এই পর্যন্ত তিনশোরও বেশি নীহারিকার নামকরণ করেছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা।

ধুমকেতুঃ

যার ইংরেজী নাম “Komet” গঠিত হয় জমাট বেঁধে বরফ হওয়া গ্যাস আর ধূলিকণা দিয়ে। সূর্যের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় এটি উত্তপ্ত হয়ে গ্যাস মুক্ত করে এবং অস্পষ্ট অবয়ব তৈরি করে। এই অস্পষ্ট অবয়বকে আমরা ধুমকেতুর লেজ হিসেবে জানি।

উল্কাঃ

ইংরেজীতে যাকে বলা হয় “Meteor” । উল্কা ধুমকেতু, গ্রহ, চাঁদ বা গ্রহাণূর খন্ডিত অংশ। ধারণা করা হয়, প্রতিদিন কোটি কোটি উল্কা পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে প্রবেশ করে। কিন্তু ভূ-পৃষ্ঠে পৌছার আগেই বাতাসের সাথে সংঘর্ষে ধ্বংস হয়। যেগুলো ধ্বংস হয় না সেগুলো ভূ-পৃষ্ঠে এসে আঘাত করে এবং এগুলো উল্কাপিন্ড নামে পরিচিত।

ডার্ক ম্যাটার বা কৃষ্ণবস্তুঃ

বিজ্ঞানীদের দেওয়া বিভন্ন তত্ত্বনুযায়ী এই ডার্ক ম্যাটার সারা মহাবিশ্বে ছড়িয়ে আছে কিন্তু শক্তিশালী দূরবীন দিয়েও এই ডার্কম্যাটারকে দেখা সম্ভব না! তাহলে কীভাবে এই ডার্কম্যাটারগুলো আছে বলে আমরা ধরে নিলাম? আসলে ব্যাপারটা হলো বিজ্ঞানীরা অনেক আগেও এ্দের উপস্থিতি সম্পর্কে জ্ঞাত ছিল না। কিন্তু নক্ষত্র এবং বিভিন্ন গ্যালাক্সিদের উপর এই ডার্কম্যাটার এর প্রভাব দেখেই অদৃশ্য কিছু আছে তা সহজে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন বিজ্ঞানীরা।

ইভন্ট হরাইজন বা ঘটনা দিগন্তঃ

এটা হল কৃষ্ণবিবরের সীমানা, যার ভেতরের কোন ঘটনাই বাইরের মহাবিশ্ব থেকে দেখতে পাওয়া যায় না। আমরা সবাই জানি যে, আমাদের পৃথিবী এবং সূর্য কোনটির পক্ষেই ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণগহ্বর-এ পরিণত হবার যোগ্যতা নেই। সাধারণত সূর্যের চেয়ে কয়েকগুণ ভারী নক্ষত্রদেরই ব্ল্যাক হোলে পরিণত্ হবার সুযোগ থাকে। তারপরও যদি ধরে নিই যে আমাদের পৃথিবীটা এক সময় ব্ল্যাক হোলে পরিণত হবে তাহলে তার ঘটানা দিগন্তের আয়তন কেমন হবে?
উত্তর হবে – একটা টেনিস বলের আয়তনের সমান! এই আয়তন নিয়ে আমরা অন্যান্য ব্ল্যাক হোলের ঘটনা দিগন্তের সাথে ভাব নিতে যায় তাহলে মান সম্মান প্লাস্টিক হয়ে যাবে। ?

মূলধারার তারাঃ

মেইন স্ট্রিম স্টার বা মূলধারার তারা হলো সেগুলোই যে তারাগুলোর কেন্দ্রে এখনও অনেক আগের তারাদের মত হাইড্রোজেন হিলিয়ামে পরিণত হচ্ছে। চারটা হাইড্রোজেন পরমণু একীভূত হয়ে একটি হিলিয়াম পরমাণুতে পরিণত হচ্ছে।

এন্টিম্যাটার বা প্রতিপদার্থঃ

যাকে প্রতিবস্তু বললেও ভুল হবে না। এর আগে প্রতিবস্তু নিয়ে মোটামুটি একটা পোস্ট করা হয়েছে। তারপরও এইবার একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেওয়ার চেষ্টা করি – এনার্জি থেকেই একই সাথে সমপরিমাণ ম্যাটার এবং এন্টিম্যাটার সৃষ্টি হয়। কিন্তু প্রতি দশ বিলিয়ন কণার মধ্যে একটি ম্যাটার কণা বেশি সৃষ্টি হয় অর্থাৎ একটি ম্যাটার কণা বেঁচে যায়। এজন্যই আমাদের এই বিশ্বজগত ম্যাটার দিয়ে গঠিত, এন্টিম্যাটার দিয়ে নয়। আর মজার বিষয় হল – এই ম্যাটার এবং এন্টিমেটারকে একসাথে মিশালেই এরা পরস্পরকে বিলুপ্ত করে। ফলে বিশাল এনার্জি উৎপন্ন হয় যেমন করে এনার্জি থেকে বস্তু ও প্রতিবস্তু তৈরি হয়।

সৌরকলঙ্কঃ

সৌরকলঙ্ক বা সান স্পট হল সূর্যের আলোকমন্ডলে যে কালো দাগ দেখা যায়। এই কালো দাগ গুলো কীভাবে উৎপন্ন হয়? এগুলো সূর্যের নিজের চৌম্বক ক্ষেত্রের কারণে সৃষ্টি হয়। এখন যদি আবার বলা হয়, সূর্য চৌম্বক ক্ষেত্র পাবে কই? এর উত্তরে শুধু বলবো, পৃথিবী নিজেই একটি বিরাট চুম্বক তাহলে সূর্য কেন নয়? 🙂

বাদামি বামনঃ

বাদামি বামন বা Blue Dwarf গ্রহ আর তারার মাঝামাঝি ভরের বস্তু। এদের ভর হয় সূর্যের ভরের ০.০৮ গুণ কম। এদের ভেতরে নিউক্লিয়ার ফিউশন বিক্রিয়া ঘটতে পারে না, তবে গ্র্যাভিটির কারণে সংকুচিত হয় বলে কিছু শক্তি বিকিরিত করে।

লাল বামনঃ

লাল বামন বা Red Dwarf হল মূলধারার তারা। এরা বেশ হালকা, মিনমিনে এবং বেশ ঠান্ডা এবং গ্র্যাভিটির কারণে সংকুচিত হয় বলে কিছু শক্তি বিকিরিত করে।

সাদা বামনঃ

যে তারাগু্লোকে আমরা সাদা বামন বা White Dwarf বলে চিনি এরা সাধারণত ঘনীভূত তারা, লাল দানবের গা থেকে তার বাইরের স্তর খসে পড়লে তার কেন্দ্রে সাদা বামন দেখা দেয়।

মহাজাগতিক রশ্মিঃ

বাইরে থেকে পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে উচ্চ শক্তিসম্পন্ন যে আহিত কণাসমূহ প্রবেশ করে তাদেরকে সমষ্টিগতভাবে মহাজাগতিক রশ্মি বলা হয়। ইংরেজী- Cosmic Ray।

মহাজাগতিক পশ্চাৎপট বিকিরণঃ

আমাদের কাছে সচরাচর CMB নামেই পরিচিত। প্রসারিত করলে দাড়ায় Cosmic Background Radiation। এই রেডিয়েশন বিগ ব্যাঙ এর সময়কালেই সৃষ্টি হয়েছিল। এগুলো এখনও আমাদের টেলিভিশন ডিটেক্টরে ধরা পড়ে। এদের অস্তিত্ব পাওয়া যা মাইক্রোওয়েভ রেডিয়েশন ডিটেক্টরে খব ভালভাবেই। 🙂

আশা করি আপনাদের কিছুটা হলে জানাতে পেরেছি। বিজ্ঞানী লরেন্স ক্রাউস এর একটা পঙক্তি দিয়ে শেষ করছি……

“আমাদের মহাবিশ্ব সম্পর্কে সবচেয়ে কাব্যিক যে সত্যটা আমি জানি তা হল, আপনার দেহের প্রতিটি অণু পরমাণু একসময় লুকিয়ে ছিল একটি বিস্ফোরিত নক্ষত্রের অভ্যন্তরে। অধিকন্তু, আপনার বাম হাতের পরমাণুগুলো হয়তো এসেছে এক নক্ষত্র থেকে, আর ডান হাতের গুলো এসেছে ভিন্ন আরেকটি নক্ষত্র থেকে। আমরা আক্ষরিক ভাবেই সবাই নক্ষত্রের সন্তান, আমাদের সবার দেহ তৈরি হয়েছে কেবল নাক্ষত্রিক ধূলিকণা দিয়ে” ~~~~ লরেন্স ক্রাউস।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here