চাঁদ নিয়ে যত কথা

0
21

চাঁদকে না চিনে কে? একটা ছোট্ট শিশুও চাঁদকে চিনতে পারে খুব সহজেই। বাবার কোলে থাকা শিশুটা চাঁদের দিকে আঙুল তাক করে জানতে চেয়েছে চাঁদ কি জিনিস, রাতের আকাশে নতুন সূর্য না তো! বাবাও ছেলের প্রশ্নের আবদার না রেখে পারে না। এভাবেই আমরা প্রথম চাঁদকে চিনি এবং চাঁদকে নিয়ে ভাবতে শিখি। দাদা-দাদীর কাছে কত কিছুই না আমরা শুনেছি! চাঁদ নিয়ে কত রুপকথা, সেগুলো শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে যেতাম; পরের দিন আবার দেখা হলে অপলক নয়নে তাকিয়ে থাকতাম চাঁদের দিকে। চাঁদ নিয়ে আমাদের মধ্যে যেমন কৌতুহল কাজ করে তেমনি কৌতুহল কাজ করেছিল পৃথিবীর অন্য সকল মানুষদের মাঝেও, বিজ্ঞানীরাও এর বাইরে নন।

আগে বিজ্ঞানীরা ভাবতেন চাঁদ এককালে পৃথিবীরই অংশ ছিল অথবা একই সময়ে আলাদাভাবে সৃষ্টি হয়ে পৃথিবীর আকর্ষণে বাধা পড়েছিল এবং তাই বাধা পেয়ে পৃথিবীর কাছাকাছি আবর্তন করছে। সত্তরের দশকে চাঁদের মাটি -পাথর পরীক্ষা করে তার জন্ম রহস্য সম্বন্ধে বিজ্ঞানীরা আজ নতুন কথা বলছেন। তাঁরা বলছেন, সৌরজগত সৃষ্টির প্রথম দিকে বিরাট গ্যাস আর ধুলো পাথরের পাজার মধ্যে সূর্যের কাছাকাছি পাথুরে চারটি গ্রহ তৈরি হয়েছিল আগে। দু’ তিন কোটি বছরের মধ্যেই কোটি কোটি পাথরের খন্ড একসঙ্গে জুড়ে গিয়ে পৃথিবী আর শুক্রের সৃষ্টি হল। তখন পৃথিবীর কাছাকাছি আদি বুধ আর আদি মঙ্গল ছাড়াও ছিল আরও সংখ্য বড় বড় পাথরের খন্ড, তার কোন কোনটা ছিল প্রায় বুধ আর মঙ্গলের সমান। এরা যে উপবৃত্তাকার পথে সূর্যের চারপাশে ঘুরছিল তা পৃথিবী আর শুক্রের কক্ষপথের খুব কাছাকাছি দিয়ে যাচ্ছিলত। হঠাত এক সময়ে মঙ্গল গ্রহের আকারের সমান একটি বস্তু – এসে ধাক্কা লাগল আমাদের পৃথিবীর সাথে ।

রাইফেল বুলেটের চেয়ে প্রায় দশগুণ বেশি বেগে বস্তুটি প্রচন্ড ধাক্কা দেয়ায় পৃথিবীর ওপর থেকে বিপুল পরিমাণ বস্তু উপরের দিকে ছিটকে উঠল। পৃথিবীর ওপরটা কেপে উঠল প্রবলভাবে, পাথর গলে লাভার স্রোত বইল। যে বস্তুটি এসে পৃথিবীর সঙ্গে ধাক্কা খেয়েছিল তার উপর চোট পড়ল আরও বেশি, সেটা ভেঙ্গে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। প্রচন্ড তাপে তার দেহ বাষ্প হয়ে ছিটকে উঠল মহাশূন্যে আর আঘাতের ধাক্কায় পৃথিবীর চারপাশে ঘুরপাক খেতে শুরু করল। এই জ্বলন্ত গ্যাসের পুঞ্জ পৃথিবীর চারপাশ ঘুরপাক খেতে খেতে জমাট বেঁধে সৃষ্টি হল চাঁদের দেহ।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, চাঁদের কক্ষপথ যে পৃথিবীর বিষুবরেখার সাথে কোণ তৈরি করে আছে সেটা এই সংঘর্ষেরই ফল।তাছাড়া চাঁদে আদৌ পানির কোন সন্ধন মিলছে না তার কারণ হলো তার একসময়ে গনগনে গরম হয়ে ওঠারই জন্য। পৃথিবীর মাটি-পাথরের সঙ্গে চাঁদের মাটি-পাথরের ভেশ কিছুটা মিল খুঁজে পাওয়া যায়। চাঁদের গা জমাট বাধার পর তেজস্ক্রিয়তার তাপে ভেতরে কোথাও কোথাও পাথর গলে লাভার প্রবাহ বয়ে গেছে; তাতেই তার ওপর তথাকথিত বালুর সাগরগুলোর সৃষ্টি হয়েছে। তবে এসব লাভা প্রবাহও শেষ হয়েছে অন্তত তিনশ কোটি বছর আগে। তারপর এত বছর ধরেই চাঁদ এক বিরান মরুভূমি হয়ে আছে।

 

moon

 

আচ্ছা, কোনদিন কি জানতে চেয়েছেন কেন আমরা চাঁদের একটা পিঠ দেখি অন্য পিঠ দেখতে পাই না?

তাহলে চাঁদের উল্টো পিঠের রহস্য কি!

পৃথিবীর চারপাশে একবার ঘুরে আসতে চাঁদের কত সময় লাগে ? সেটা ঠিক ২৭.৩ দিন। তবে যখন full moon হয় তখন একবার ঘুরে আসতে চাঁদের পাক্কা ২৯ দিন সময় লাগে। মজার বিষয় চাঁদ পৃথিবীর চারপাশে ঘুরে ২৭.৩ দিনে এবং  নিজ অক্ষের চারশে ঘুরতেও চাঁদের ঠিক ২৭.৩ দিন লাগে। বাহ! অপূর্ব মিল হয়ে গেল তাই না?

আসলে আপাতদৃষ্টিতে যোগাযোগটা খুব আশ্চার্যজনক বলে মনে হয়। কিন্তু কারণটা বুঝলে এটা আর তেমন আশ্চর্যের ব্যাপার বলে মনে হবে না। বহু কোটি বছর ধরে পৃথিবীর টানে চাঁদের গায়ে যে জোয়ার সৃষ্টি হয় তা চাঁদকে তার নিজ অক্ষের চারপাশে আবর্তনের গতিকে বাধা দেয় ফলে তার বাধার ফলেই চাঁদের নিজের অক্ষের উপর ঘুরপাক খাওয়ার ব্যাপারটা একবারে খাঁজে খাঁজে মিলে গিয়েছে।

moon

সৌরজগতের শুরুর দিকে চাঁদ এখনকার চেয়ে পৃথিবীর আরও অনেক কাছাকাছি ছিল; তার আজকের মতো এমন কঠিন ও হয়ে ওঠে নি। তখন চাঁদ নিজের অক্ষের উপর এখনকার চেয়ে আরও জোরে ঘুরপাক খেত; কিন্তু তার যেদিকটা পৃথিবীর দিকে মুখ করে থাকতো সেদিকটাতে পৃথিবীর টানে জোয়ারের মত ফুলে উঠত – এই ফুলে ওঠা তার ঘোরায় বাধার সৃষ্টি করত। এভাবে চাঁদের ঘোরার বেগ কমতে কমতে এক সময় আমাদের পৃথিবীর তুলনায় ঘোরা একেবারে থেমে গেল; যেটুকু ঘোরার থাকল তা একদম পৃথিবীর চারপাশে ঘোরার সমান।

যেমন ধরা যাক, কেউ ঘরের মাঝখানে একটা চেয়ার বসিয়ে তার দিকে মুখ রেখে চারপাশে ঘুরছে, চেয়ারটাতে কেউ একজন বসে থাকলে সে শুধু প্রথম জনের মুখই দেখতে পাবে, পিছন দিক কখনো দেখবে না। ব্যাপারটা অনেকটাই তেমন।

সুদূর অতীতে আমরা চাঁদের ৫০ শতাংশ দেখতে পেলেও এখন আমরা মোট চাঁদের ৫৯ শতাংশ এলাকা দেখি। পৃথিবীর চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে চাঁদ যখন পৃথিবীর খুব কাছে চলে আসে তখন তার দূরত্ব হয় পৃথিবী থেকে ৩৫৬,৪০০ কিলোমিটার যাকে বলা হয় অনুভূ ইংরেজীতে বলা হ্য় Aphelion.

আর যখন উপবৃত্তাকার পথে ঘুরতে ঘুরতে পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূরে সরে যায় তখন দূরত্ব হয় ৪০৬,৭০০ কিলোমিটার যাকে বলা হয় অপভূ ইংরজীতে যাকে বলা হয় Perihelion.

বিস্তারিত জানতে দেখতে পারেন — https://en.wikipedia.org/wiki/Perihelion_and_aphelion

সবমিলিয়ে চাঁদের ৪১ শতাংশ এলাকা সব সময় আমাদের চোখের আড়ালে থাকে। ১৯৫৯ সালেই আমরা পৃথিবী বাসী প্রথমবারের মতো চাঁদের উল্টো পিঠের ছবি দেখতে পেলাম যখন রাশিয়ার লুনা-৩ চাঁদের উল্টো পিঠের ছবি তুলে পাঠাল। দেখা গেল সচরাচর চাঁদের যে পিঠ আমরা দেখতে পাই উল্টো পিঠটা অনেকটা সেরকমই। চাঁদের যে পিঠে সূর্যের আলো পরে সে পিঠে তাপমাত্রা ওঠে ১২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস আর অন্যপিঠে তাপমাত্রা নেমে যায় – ১৭৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত।

খুবই দুঃখের বিষয় গ্রাফিক্স ডিজাইনের দক্ষতার অভাবে বিষয়টা আপনাদের সামনে খুব পরিস্কারভাবে হয়তো উপস্থাপন করতে পারলাম না। তবে আপনাদের বুঝার সুবিধার্থে ইউটিউবের একটি ভিডিওর লিংক দিচ্ছি, আশা রাখি আপনারা আপনাদের জ্ঞানের পিপাসা কিছুটা হলেও মিটাটে পারবেন। নিচে ভিডিওটি দেখে নিন…

 

এই আর্টিকেলটি নেওয়া হয়েছে এই লিঙ্ক থেকে। 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here