এন্টিম্যাটার বা প্রতিপদার্থ

0
16

২০০০ সালের একটি বেস্ট সেলার উপন্যাসের নাম “Demons And Angels”, উপন্যাসটি রোমাঞ্চকর। অনেকেই হয়তো পড়েছেন। পুরো উপন্যাসটি গড়ে উঠেছে একটি ভয়ঙ্কর বোমের উপর। পারমাণবিক বোমা? না, পারমাণবিক বোমা নয়। তার চেয়েও ভয়াবহ! এটি হল এন্টিম্যাটারের বোমা।বোমা না হয় বুঝলাম, কিন্তু এন্টিম্যাটার? এটা আবার কি? কণা।

পদার্থবিজ্ঞানের ধারণা মতে, এন্টিম্যাটার হল এমন এক ধরনের পদার্থ যা এন্টিপার্টিকল বা প্রতিকণা দ্বারা গঠিত। এই প্রতিকণাসমূহের ভর স্বাভাবিক পদার্থের কণাসমূহের ভরের সমান কিন্তু​ আধান (চার্জ) ও কোয়ান্টাম সংখ্যা সম্পূর্ণ বিপরীত হয়ে থাকে। উদাহরণস্বরূপ, একটি প্রোটনের আধান ধনাত্মক হয়ে থাকে যেখানে একটি অ্যান্টিপ্রোটনের আধান ঋণাত্মক()। অনুরূপভাবে, একটি ইলেকট্রনের আধান ঋণাত্মক কিন্তু একটি অ্যান্টিইলেকট্রন (যাকে বলা হয় ‘পজিট্রন’) আধান ধনাত্মক (+)। স্বাভাবিক পদার্থের কণাসমূহ যেমন পদার্থ গঠন করে, তেমনি প্রতিকণাসমূহ তৈরি করে প্রতিপদার্থ। যেমন: একটি পজিট্রন (ইলেকট্রনের প্রতিকণা) ও একটি এন্টিপ্রোটন (প্রোটনের প্রতিকণা) মিলিত হয়ে এন্টিহাইড্রোজেন পরমাণু গঠন করে। এন্টিহাইড্রোজেন পরমাণুর নিউক্লিয়াসে থাকে ঋণাত্মক আধানযুক্ত এন্টিপ্রোটন (প্রোটনের প্রতিকণা) যাকে ধনাত্মক আধানযুক্ত পজিট্রন(ইলেকট্রনের প্রতিকণা) প্রদক্ষিণ করে! এন্টিম্যাটারের আধান বা চার্জ ম্যাটারের বিপরীত হলেও এন্টিম্যাটার ম্যাটারের মতোই আচরণ করে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় যে, একটি অ্যান্টিম্যাটারের তৈরি নক্ষত্র (যাকে আমরা বলতে পারি ‘এন্টিস্টার’) একটি স্বাভাবিক নক্ষত্রের মতোই উজ্জ্বল হবে।

এন্টিম্যাটার

১৮৯৮ সালে জার্মান বিজ্ঞানী আর্থার শুস্টার (Sir Franz Arthur Friedrich Schuster) প্রথম এন্টিম্যাটারের ধারণা এবং এন্টিএটম বা প্রতিপরমাণুর অস্তিত্ব অনুমান​ করেন। এটি ছিল একটি অনুমান নির্ভর তত্ত্ব। ১৯২৮ সালে বিজ্ঞানী পল ডিরাক একটি গবেষণা পত্রে এন্টিম্যাটারের আধুনিক তত্ত্বটি ব্যাখ্যা করেন। তিনি শ্রডিঞ্জারের তরঙ্গ তত্ত্বের আলোকে ইলেকট্রনের বিপরীত পদার্থ পজিট্রনের অস্তিত্ব থাকার সম্ভাবনা দেখান। এটিকে সহজভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে এভাবে:-

x^2 = 4

এখানে, x এর মান 2 অথবা -2 উভয়ই হতে পারে। কিন্তু পদার্থবিদেরা শুধু 2 নিয়ে ভেবেছেন, -2 এর সম্ভাব্যতা​ বিবেচনা করে দেখেন নি (১৯২৮ সালের আগ পর্যন্ত)। কিন্তু দুটো সমাধানই সমীকরণটিকে সিদ্ধ করে, তাই এন্টিম্যাটারের অস্তিত্ব রয়েছে। একটু বেশিই সহজ হয়ে গেল। কিন্তু মূল ধারণাটি অনেকটা এ রকমই। এর প্রমাণ পাওয়া যায় ১৯৩২ সালে।যখন বিজ্ঞানী কার্ল ডি এন্ডারসন পজিট্রন আবিষ্কার করেন। ১৯৫৫ সালে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানী​ এমিলিও সেগ্রে ও ওন চেম্বারলিন এক্সপেরিমেন্টের​ মাধ্যমে এন্টিপ্রোটনের অস্তিত্ব আবিষ্কার করেন। যার কারণে ১৯৫৯ সালে তারা নোবেল পুরস্কার পান। ১৯৫৬ সালে বেভাট্রনের ব্রুস কর্ক ও তার সহযোগীরা প্রোটন-প্রোটন সংঘর্ষের মাধ্যমে এন্টিনিউট্রন আবিষ্কার করেন। এভাবে পরে এন্টিনিউক্লিয়াস ও এন্টিপ্রোটন তৈরি করা হয়।

এন্টিম্যাটার যদি স্বাভাবিক পদার্থের সংস্পর্শে আসে, তাহলে তারা পরস্পরকে​ নিশ্চিহ্ন করে দিবে। এর ফলে প্রচুর পরিমাণে উচ্চ শক্তির ফোটন (গামা রশ্মি) ও বহু কণা-প্রতিকণা জোড়ার সৃষ্টি হয় এবং বিপুল পরিমাণ শক্তি নির্গত হয়। এই, বিপুল পরিমাণ শক্তি আসলে​ কত? তা বুঝার জন্য আমরা একটি বিখ্যাত সমীকরণ ও একটি ঘটনার কথা আগে জানব।

একটি বিখ্যাত সমীকরণ:- E=mc²
যেখানে,
E=শক্তি; m=ভর ; c=আলোর বেগ।
এ সমীকরণটি থেকে বোঝা যায় যে, ভরকে শক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব।

আইনস্টাইন

একটি ঘটনা –  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা ফেলে দেয়া হয়। সে ধ্বংসযজ্ঞের কথা আজও আমরা স্মরণ করে শিহরিত হয়ে উঠি। পারমাণবিক বোমা কিংবা পারমাণবিক চুল্লিতে মূলত ইউরেনিয়ামকে ভেঙে ক্ষুদ্রতর মৌলে পরিণত করা হয় এবং অতি সামান্য পরিমাণ ভর (যার পরিমাণ সাধারণত ১%) হয়।  ইউরোনিয়ামের হারানো এই ১% ভরই হল m যাকে E=mc² …… সমীকরণে বসিয়ে আমরা বিপুল পরিমাণ শক্তি পায়। যদি ১% ভর দিয়ে আমরা এত বিপুল পরিমাণ শক্তি পায়, তাহলে সম্পূর্ণ ভর অর্থাৎ ১০০ % ভর শক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব হলে আমরা বিপুল বিপুল বিপুল পরিমাণ শক্তি পাব। ঠিক তাই ঘটে এন্টিম্যাটার ও ম্যাটারের সংঘর্ষের ফলে। সম্পূর্ণ ভরই শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। ১ কেজি এন্টিম্যাটারকে ১ কেজি ম্যাটারের সাথে সংঘর্ষ করানো হলে ১.৮ *১০^১৭ J (১৮০ পেটাজুল) শক্তি উৎপন্ন হয়। এ শক্তির পরিমাণ প্রায় ৪৩ মেগাটন TNT বিস্ফোরণের​ সমান এবং ২৭,০০০ কেজি Tsar বোমা (শক্তিশালী পারমাণবিক বোমা) বিস্ফোরণ হতে সামান্য কম!!! এ কারণে এন্টিম্যাটারের ব্যবহার ভাবা হচ্ছে জ্বালানি (বিশেষ করে রকেটের জ্বালানি) ও বোমা তৈরির জন্য। এ বোমাটি যে প্রচুর পরিমানে ধ্বংসকর হবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে ভয়ের কিছুই​ নেই। কেন ভয়ের কিছু নেই তা আমরা এই পোস্টের শেষের দিকে জানব।

যদি আমি আমার এন্টিরূপের সংস্পর্শে আসি তাহলে প্রচুর পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন করে আমরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাব। আমার ভর ৩০ কেজির উপরে। তাই, এর ফলে শুধু আমিই নিশ্চিহ্ন হব না, উৎপন্ন শক্তি (৮,১০,০০০ কেজি Tsar বোমা বিস্ফোরণের প্রায় সমান) আমার আশেপাশের​ অনেক কিছুকেই ধ্বংস করে দিবে। তাই, কোনো এক সুন্দর সকালে ঘুম থেকে উঠে হুবহু কাউকে দেখলে তাকে কিছুতেই স্পর্শ করতে যাবেন না। 🙂

আশার কথা হচ্ছে, আমরা আমাদের আশেপাশে যা কিছু দেখতে পাই কিংবা দেখতে পাই না তার সবই স্বাভাবিক পদার্থ। আকাশে যে গ্রহ-নক্ষত্র-উল্কা-ধূমকেতু সকল কিছুই​ পদার্থের তৈরি। এ কারণে আমাদের হঠাৎ এন্টিম্যাটারের সংস্পর্শে আসার সুযোগ নেই। অর্থাৎ,  মহাবিশ্বে তেমন একটা এন্টিম্যাটার নেই।

পদার্থ বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন যে, বিগ ব্যাং এর ফলে সমপরিমাণ ম্যাটার ও এন্টিম্যাটার সৃষ্টি হয়েছিল। তাহলে, কেন আমরা ও আমাদের চারপাশের​ সকল কিছুই ম্যাটার দ্বারা তৈরি? এন্টিম্যাটার দ্বারা নয় কেন? এন্টিম্যাটার কোথায় গেল?
এটি পদার্থ বিজ্ঞানের​ অজানা রহস্যগুলোর​ একটি। পদার্থবিজ্ঞানীরা এটি নিয়ে কাজ করছেন। এ সম্পর্কিত সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য হাইপোথেসিসটি হল –  বিগ ব্যাং এর ফলে সমপরিমাণ ম্যাটার ও এন্টিম্যাটার সৃষ্টি হয় নি। ম্যাটার এন্টিম্যাটারের চেয়ে বেশি পরিমাণে সৃষ্টি হয়েছিল। উৎপন্ন হওয়ার পরমূহুর্তেই ম্যাটার ও এন্টিম্যাটার পরস্পরের সংস্পর্শে এসে বিলীন হয়ে যায় এবং বিপুল পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন করে। যেহেতু, ম্যাটার বেশি পরিমাণে সৃষ্টি হয়েছিল তাই কিছু ম্যাটার অবশিষ্ট থেকে যায়। এই অবশিষ্টাংশ​(Left over) থেকেই​ সৃষ্টি হয়েছি আমরা।এ হাইপোথেসিসটি আমাদের আরও একটি প্রশ্ন এনে দেয়:- কেন এন্টিম্যাটারের চেয়ে বেশি পরিমাণে ম্যাটার সৃষ্টি হয়েছিল? এটাও একটি বড় রহস্য।

মহাবিশ্বে স্বাভাবিকভাবেই কখনো কখনো এন্টিম্যাটার তৈরি হতে পারে। দুটি উচ্চগতি সম্পন্ন কণিকার বিপরীতমূখী সংঘর্ষে প্রায়ই প্রতিপদার্থ বা এন্টিম্যাটার তৈরি হয়। পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের উপরিভাগে উত্তপ্ত অবস্থায় প্রতিনিয়ত প্রতিপদার্থ কণিকা তৈরি হয় তবে পরক্ষণেই স্বাভাবিক পদার্থের সংস্পর্শে এসে তা নিশ্চিন্হ হয়ে যায়। তাছাড়া গ্যালাক্সিগুলোর কেন্দ্রে অতি উচ্চ তাপমাত্রায় শক্তি রূপান্তরিত হয়ে পদার্থ ও প্রতিপদার্থে পরিণত হয়।

যেহেতু, এন্টিম্যাটার একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তির উৎস এবং একে আমরা মহাবিশ্ব থেকে একে আমরা পাচ্ছিও না,তাই আমরা অবশ্যই চেষ্টা করব এটি তৈরি করার। এ চেষ্টা সফল হয়েছে। অর্থাৎ, আমরা এন্টিম্যাটার তৈরি করতে পারি।

১৯৯৫ সালে CERN ৯টি প্রতিহাইড্রোজেন পরমাণু বানানোর ঘোষণা দিয়ে ইতিহাস রচনা করে। ফার্মিল্যাব এর বিজ্ঞানীরাও বসে ছিলেন না , তাঁরা ১০০টি প্রতিহাইড্রোজেন পরমাণু বানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। একমাত্র উৎপাদনের ব্যয় ব্যতিত এমন কোন বাধা নাই যা বিজ্ঞানীদের প্রতিপরমাণু উৎপাদনে বাধা সৃষ্টি করে। অল্প কিছু আউন্স (১ আউন্স = ১/১৬ পাউন্ড ) প্রতিপরমাণু উৎপাদনে একটি জাতি পর্যন্ত দেউলিয়া হয়ে যেতে পারে। বর্তমানে প্রতি বছর এক গ্রামের দশ বিলিয়ন থেকে এক বিলিয়ন ভাগের এক ভাগ প্রতিপরমাণু উৎপাদন করা হয়।

antimatter

বিজ্ঞানীদের মতে, দুনিয়ার সবচেয়ে ব্যয়বহুল কাজ হচ্ছে এন্টিম্যাটার বানানো! ২০০৬ সালে বিজ্ঞানী জেরাল্ড স্মিথ অনুমান করেন যে, ১০ মিলিগ্রাম পজিট্রন উৎপাদন করতেই প্রায় ২৫০ মিলিয়ন ইউএস ডলার খরচ পড়বে। নাসা হিসাব দেখিয়েছে প্রতি গ্রাম এন্টিহাইড্রোজেন তৈরিতে খরচ পড়বে ৬২.৫ ট্রিলিয়ন ইউএস ডলার। সার্ন (CERN) এর খবর অনুযায়ী, মাত্র এক বিলিয়নের ভাগের এক ভাগ এন্টিম্যাটার তৈরি করতে তাদের প্রায় কয়েকশত মিলিয়ন সুইস ফ্রাঙ্ক খরচ হয়েছে।

এন্টিম্যাটার তৈরির পর সবচেয়ে বড় চ্যালেন্জ এটাকে টিকিয়ে রাখা। কারন একে যে পাত্রে রাখা হবে সেটা কোন না কোন পদার্থ দ্বারা তৈরি করতে হবে। ফলে সেই পদার্থ প্রতিপদার্থের সাথে মিলে নিশ্চিন্থ করে ফেলবে। তবে, এ সমস্যার সমাধান হয়েছে।তা হল: এক বিশেষ ধরনের বোতল।এ বোতলের ভিতরে বিশেষ স্থিতিশীল চৌম্বকীয় ক্ষেত্র তৈরি করে তার ভিতরে এন্টিম্যাটার সংরক্ষণ করেন। চৌম্বকক্ষেত্র কোন পদার্থ দিয়ে তৈরি হয় না। এটা শুধুমাত্র একটি বলক্ষেত্র যেখানে প্রতিপদার্থ আকৃষ্ট হয়ে আটকে যায় এবং কোন পদার্থের সংস্পর্শে না আসতে পারায় সংরক্ষিত থাকে। পারমাণবিক বোমা নিয়ে ভয়ের কিছুই নেই বলেছিলাম মনে আছে? কারণটি জানিয়ে পোস্টটি শেষ করব।

প্রতিকণা পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান বস্তু কারণ এটি খুবই অল্প পরিমাণে​ উৎপন্ন করা সম্ভব। CERN & Fermilab-এ দু’টিতেই মূলত সবচেয়ে বেশি পরিমাণে প্রতিকণা উৎপন্ন করা হয়। এই পর্যন্ত CERN যে পরিমান প্রতিপরমাণু উৎপাদন করেছে তা যদি আমরা পরমাণুর সাথে ধ্বংস করি তাহলে কি করা যাবে মনে হয়? CERN এর একটি বিবৃতি হতে এটি পরিস্কার হয় “আমাদের কাছে একটি বাল্ব কে কয়েক মিনিট জ্বেলে রাখার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ শক্তি আছে ।”

তাই, একটি এন্টিম্যাটার বোমা তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় পরিমাণ এন্টিম্যাটার তৈরি করার দিন থেকে আমরা অনেক দূরে আছি।এ কারণেই​ এন্টিম্যাটার বোমা নিয়ে আপাতত ভয়ের কিছু নেই।


লেখকঃ অভি দেওয়ান 


তথ্যসূত্রঃ


আপনি ব্ল্যাক হোল নিয়ে জানতে চান? পড়ুন অভি দেওয়ানের আরো একটি লেখা – ব্ল্যাক হোল নিয়ে কিছু কথা! 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here