প্রকৃতির রহস্য সন্ধানী ডারউইন

0
12

যে মানুষটি এডিনবরা মেডিকেল কলেজে চিকিৎসা বিদ্যা শিখতে গিয়ে শেষ করতে পারেন নি, কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেছেন পাদ্রি (ধর্মযাজক) হওয়ার জন্যে কিন্তু মাত্র পাঁচ বছরের গবেষণার পর সে মানুষটি কীভাবে নাস্তিক হয়। সে কাহিনীটি অবহিত হতে হলে আওড়াতে হবে ডারউইনের জীবনী।

চালর্স ডারউইন (Charles Darwin) ১৮০৯ সালের ১২ ই ফেব্রুয়ারি ইংল্যান্ডের শ্রুসবেরিতে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহন করেন।  তাঁর বাবা রবার্ট ডারউইন ছিলেন পেশায় চিকিৎসক। তাঁর পিতামহ ও বড় ভাই ছিলেন চিকিৎসক, এককথায় বলা বলে চিকিৎসক পরিবারে তাঁর জন্ম। তাই তাঁর বাবা ছোটবেলা থেকে চিকিৎসক বানানোর তাগিদে স্কুলে ভর্তি করে দেন। ছোটবেলা থেকেই ডারউইন দুষ্টু টাইপের ছিলেন, লেখাপড়ায় মনোযোগ ছিল না তাঁর। তারঁ দুষ্টুমী কমিয়ে দেওয়ার জন্যে রবার্ট ডারউইন শ্রুসবেরির কেস সাহেবের দিবা স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন।  চার্লস স্কুলে যাওয়ার সময় পালিয়ে বেড়ান শহর তুলির মাঠে। চার্লস মাত্র আট বছর বয়সে তাঁর মাকে হারিয়ে ফেলেন। বিভিন্ন পাখির ডাক, সুন্দর সুন্দর গাছ ইত্যাদি প্রত্যক্ষ করা তাঁকে আকর্ষণ করত। প্রাথমিক স্তরটা শেষ করার পর ১৮১৮ সালে তাঁর বাবা চার্লসকে ডক্টর বাটলারের বিখ্যাত স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন। এ স্কুলের নিয়ম কানুন খুবই কড়াকড়ি।  নির্দিষ্ট সময়ে হাজির হতে না পারলে ঢুকতে দেয়া হয় না ঐ দিনের জন্যে। ছুটিও হয় বেশ দেরীতে। ছোটবেলায় তিনি শেক্সপিয়রের নাটক পড়তেন বলে বাবা তাকে রেগে গিয়ে ইউক্লিডের জ্যামিতি পড়তে বলেন।

১৮২৫ রবার্ট ডারউইন তার ছেলে চার্লসকে ডাক্তার বানানোর তাগিদে এডিনবরা মেডিকেল কলেজে ভর্তি করিয়ে দেন। সে সময় তাঁর বড় ভাই ইরাসমাস সে কলেজে ডাক্তারি পড়ছিলেন। অগ্রজের নিকট এসে উঠলেন তিনি। সমস্যা হচ্ছে এডিনবরাতে শিক্ষা দেওয়া হয় শুধুমাত্র বক্তৃতার মাধ্যমে। বক্তৃতাগুলো চার্লসকে তেমন আলোড়িত করতে পারেনি, তাঁর কাছে নীরস মনে হত। এইভাবে এডিনবরায় এক বছরের অধিক পার করে দিলেন চার্লস বেশ ব্যস্ততম জীবনের মধ্যে। দ্বিতীয় বর্ষে উঠার পরে তাদের পড়ানো শুরু হলো ভূবিদ্যা ও প্রাণীবিদ্যা। ডাক্তারী পড়তে এসে ভূবিদ্যা পড়তে হবে এটা তাঁর জানা ছিল না। প্রথমে তাঁর ভূ-বিদ্যা বিষয়টি জটিল লাগত। পরবর্তীতে সে বিষয়টি তাঁর সবচেয়ে মনোভূত হয়। ১৮২৬ সালে কলেজ বন্ধ দেওয়া হয় চার্লস ঠিক করলেন এই বন্ধে বাড়িতে না গিয়ে উত্তর ওয়েলসে বেড়াতে যাবেন। সেখানে বেড়াতে গিয়ে অনুসন্ধিৎসু মন নিয়ে মোটা গুল্মের ঝাড়, বড় বড় গাছের ঘন জঙ্গল ও অনেক পশুপাখি সংগ্রহ করে সেগুলোর নাম ও বর্ণনা লিখে খাতায় খসড়া প্রণয়ন করেন। এরপর থেকে চিকিৎসা বিদ্যায় আর তেমন ভাবে মনোনিবেশ করতে পারেনি চার্লস, তাঁকে সবসময় প্রকৃতিবিদ্যা আকর্ষণ করিত। ডাক্তারী বিদ্যা বাদ দিয়ে চার্লস যে প্রকৃতিবিদ্যা নিয়ে উৎসাহিত হয়ে উঠেছেন কথাটা কানে গেল পিতা রবার্ট ডারউইনের। অবশেষে তাঁর পিতা বাধ্য হলেন তাঁকে বাড়িতে নিয়ে যেতে। এভাবে তাঁর এডিনবরার শিক্ষাজীবন সমাপ্তি ঘটে। রবার্ট ডারউইন তার ছেলেকে নিয়ে চিন্তায় পড়ে গেলেন, ছেলেকে আর ডাক্তার বানানো হল না। অবশেষে তার বড় মেয়ে ক্যারোলিনের পরামর্শে পাদ্রি বানানোয় রাজি হলেন। কিন্তু পাদ্রি হতে হলে তাঁকে একটা ডিগ্রী থাকতে হবে। তাই সেই তাগিদে রবার্ট ডারউইন চার্লসকে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ক্রাইস্ট কলেজে ভর্তি করান। পাদ্রি হওয়ার ব্যাপারে চার্লস খুব একটা আপত্তি করলেন না।

কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাদান পদ্ধতি দারুণ পছন্দ হলো চার্লসের।

কোন কলেজে কোন বিষয়ে কখন বক্তৃতা হবে তা পূর্বেই জানিয়ে দেয়া হয় ছাত্রদের। কোনো লেকচার শোনার জন্যে ছাত্রদের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক নয়। তাঁর সবচেয়ে আকর্ষণ থাকত ভূবিদ্যার ক্লাসে। এ বিষয়টি পড়াতেন ড. জন স্টিভেন্স হেনসলো। তাঁর আকর্ষণীয় উপস্থাপন ও সরস পড়ানোর ভঙ্গি চার্সলের খুব ভাল লাগল। একদিন হেনসলো লেকচারে বলেছিলেন ‘প্রকৃতিবিদ্যা নিয়ে পড়তে চাও ভাল কথা। কিন্তু শুধু বক্তৃতা শুনলে হবে না। তোমাকে বেড়িয়ে পড়তে হবে মাঠে পর্যায়ে। গবেষণার অফুরন্ত বিষয় ছড়িয়ে আছে মাঠে ময়দানে। ‘প্রতিদিন তিনি হেনসলোর কথাবার্তা বিনিময় করতেন, ক্লাসে কিংবা বাড়িতে গিয়ে যোগাযোগ করতেন, এভাবে তিনি হেনসলোর প্রিয়ছাত্র হয়ে উঠেন।

একদিন অধ্যাপক সেজউইক শীঘ্র উত্তর ওয়েলসের পাহাড় অঞ্চলে ভূতাত্ত্বিক সফরে বের হবেন হবে জানিয়েছিলেন। ড. হেনসলো সেজউইকে অনুরোধ জানালেন যাতে তার সফর যাত্রায় চার্লসকে সঙ্গে নিয়ে যায়, চার্লস একজন ভদ্র, অমায়িক ছেলে বলে তার কাছে প্রসংশা করেন।এদিকে ডারউইন অধ্যাপক সেজউইকের সঙ্গী হতে পেরে খুব খুশী। অধ্যাপক চার্লসকে হাতে কলমে শেখাতে লাগলেন কীভাবে দেশকে চিনতে হয়, মাটিকে চিনতে হয়, মাটির স্তর কীভাবে হিসাব করতে হয়, ভূস্তরের গঠন কী দেখে বলা যেতে পারে, পৃথিবী উৎপত্তির রহস্য, ফসিল কী কাজে লাগে, শিলা কীভাবে তৈরি হয় ইত্যাদি। চার্লসের এসব কিছু জানতে পেরে তার খুব ভাল লাগল। এভাবে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন শেষ করলেন এবং শ্রুসবেরিতে ফিরে আসলেন।

বাড়িতে এসে চার্লস বাবার সাথে সময় কাটাচ্ছেন তখনও তাঁর পাদ্রি হয়ে উঠা হয়নি। একদিন হঠাৎ প্রিয় শিক্ষক হেনসলোর চিঠি পেয়েছেন তিনি।  চিঠিতে তিনি চার্লসকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন ‘বীগল’ (HMS Beagle) নামের একটা জাহাজ ইংল্যান্ড হতে সারা পৃথিবী ঘুরে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও সমীক্ষার কাজ করবে পঞ্চাশ বছরের উর্ধ্ব সত্তর জন অভিজ্ঞ ব্যক্তি। ক্যাপ্টেন তার সমবয়সী একজন সঙ্গী খুঁজছেন। শুধু সঙ্গ দিলে হবে না, বিজ্ঞান নিয়েও কাজ করতে হবে। ক্যাপ্টেন সাহায্য চেয়েছেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। চার্লস খুব খুশি হলেন আর ভাবলেন এ রকম সুযোগ হাতছাড়া করা যায় না। তাই তিনি তাঁর ইচ্ছার কথা বাবার কাছে পেশ করলেন কিন্তু তাঁর বাবা তাঁকে যেতে সম্মত দিলেন না। কারণ তাঁর ছেলেটি যদি দূরে চলে যায় তাহলে হয়তো পাদ্রি হতে পারবে না। অনেক চেষ্টা করেও বাবাকে রাজি করাতে পারলেন না চার্লস। অবশেষে মনের দুঃখে তাঁর অপারগতার চিঠি পাঠিয়ে দেন হেনসলোর কাছে। চার্লস তার বিষণ্নতা কাটানোর জন্যে মামার বাড়িতে বেড়াতে গেলেন।  মামা জোসিয়া চার্লসকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করার পর জানতে চাইলেন বাড়িতে কিছু ঘটেছে নাকি? তারপর চার্লস পুরো ব্যাপারটি মামাকে বলে দিলেন। মামা বললেন এ রকম সুযোগ একটা হাতছাড়া করতে নেই, চলো তোমার বাড়িতে চলো আমি তোমার বাবাকে ম্যানেজ করছি। রবার্ট ডারউইন জোসিয়াকে খুব শ্রদ্ধা করতেন। তাই তার কথায় অসম্মত করতে পারেন নি। এমন সময় চার্লসকে তাড়াতাড়ি হেনসলোর উদ্দেশ্যে রওনা দিতে হলো যাতে চিঠিটা পৌঁছার আগে সে পৌঁছে যায়। চার্লসকে পেয়ে হেনসলো খুশি হলো যদিও সে চিঠিটা আগে পেয়েছিল। হেনসলো জাহাজের ক্যাপ্টেন ফিটজরয়ের উদ্দেশ্যে একটা চিঠি লিখলেন এবং চার্লসকে তার সাথে করতে পাঠালেন।ফিটজরয় চার্লসের প্রথম শারীরিক গঠন দেখে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করলেন। কারণ ফিটজরয় মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন ‘ভোঁতা নাক ওয়ালা মানুষেরা দুর্বল চিত্তের অধিকারী হয়, তারা তেমন পরিশ্রমী হয় না। কিন্তু ডারউইন তার একথা মানতে নারাজ। তিনি গ্রিসের শ্রেষ্ঠ দার্শনিক সক্রেটিসের চেহারা আর থ্যাবড়া, চ্যাপ্টা নাকের কথা ক্যাপ্টেনকে বললেন। ক্যাপ্টেন সক্রেটিস খুব শ্রদ্ধা করত তাই উপযুক্ত দৃষ্টান্ত পেয়ে ডারউইনকে তার সঙ্গে নিতে রাজি হল। তারপর তিনি ডারউইনকে জাহাজটা পরিদর্শন করার জন্য অনুমোদন দিল। অনুমতি পেয়ে চার্লস প্লিমাউথ বন্দরে গিয়ে জাহাজটি দেখতে গেল। কিন্তু জাহাজটি দেখে চার্লস তেমন সন্তুস্ত হতে পারলেন না, ছোট একটা জাহাজ এখানে গাদাগাদি করে সত্তর জন থাকতে হবে।

Imaginary image
জাহাজ যাত্রার প্রতীকী ছবি, ছবি: ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত

১৮৩১ সালের ২৭শে ডিসেম্বর বীগল জাহাজ বাহাত্তর জন যাত্রী নিয়ে ডেভেনপোর্ট থেকে যাত্রা শুরু করে। সেদিন ছিল সমুদ্র খুব উত্তাল।জাহাজের নিরাপত্তার জন্যে রয়েছে দশটি কামান এবং তা পরিচালনার জন্যে দশজন নিরাপত্তা কর্মী রাখা হয়েছে। জাহাজে রয়েছে ডাক্তার, খালাসী, অফিসার, গবেষক, নৌ সেনা ও একজন পাদ্রি। জাহাজের ক্যাপ্টেন ফিটজরয়। ফিটজরয় একজন সুদর্শন, ভদ্র। ফিটজরয়ের মেজাজ যেমন কড়া তেমনি তিনি কর্তব্যে অবিচল। চার্লস জাহাজে লায়েল এর ‘প্রিন্সিপাল অব জিওলজি’ নামের বইটি পড়েন আর ক্যাপ্টেনের সাথে মত বিনিময় করেন। জাহাজে কয়েক দিনের মাথায় চার্লস সমুদ্র পীড়ায় আক্রান্ত হন। জাহাজ প্রথমে টেনেরিফ দ্বীপে পৌঁছায় কিন্তু চার্লস অসুস্থ থাকার কারণে কিছু করতে পারেনি। ১৮৩২ সালের ১৫ ই জানুয়ারি তারা কেপভার্দি দ্বীপে পৌঁছান। অসংখ্য পাহাড়, বৃক্ষহীন বিরান ভূমি।ক্যাপ্টেন তখন ব্যস্ত তার লোকদের নিয়ে দ্রাঘিমা নির্ধারণে। তিন সপ্তাহের সেখানে তারা অবস্থান নিল এ সুযোগে চার্লস বিচিত্রি ধরণের সামুদ্রিক প্রাণী পর্যবেক্ষণ করল। একদিন পাহাড়ের চূড়ায় শামুকের খোলের সন্ধান পেলেন। তাঁর মনে প্রশ্ন জাগল এগুলো সমুদ্র না থেকে পাহাড়ে উঠে আসল কীভাবে? পরে সে আবার গভীরভাবে লায়েলের ভূ-বিদ্যার বইটি পড়তে লাগল। বেশ উৎসাহের সহিত তিনি দ্বীপের সব ধরণের জীবজন্তুর বর্ণনা লিপিবন্ধ করেন এবং মাঝেমধ্যে ছবি এঁকে রাখেন। যদিও তিনি ভাল ছবি আঁকতে পারেন না। এরপর তারা সেন্ট পলস দ্বীপে পৌঁছান। সেখানে এমন এক ধরনের পাখি দেখল; যেগুলো আগে মনে হয় মানুষ দেখে নি। পাখিগুলো মানুষ দেখলেও পালিয়ে যেত না তাই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে খালাসিরা ইচ্ছেমত পাখি ধরে খাদ্য হিসেবে আহার করিত। এরপর তারা ব্রাজিলের সালভাদর বন্দরে এসে পৌঁছান। সেখানে থাকবে তারা তিন মাস। চার্লস সেখানে অাইরিশ ভদ্রলোক প্যাটিক লেননের সাথে কাজ করলেন। শৈবাল থেকে উদ্ভিদজগতে আবার পাখি জগতে বিভিন্ন ধরনের প্রজাপতি, পাখি, কীটপতঙ্গ, বিভিন্ন প্রজাতির টিকটিকি, পিপড়ার সন্ধান পান তিনি। ব্রাজিলের গিয়ে তিনি সবচেয়ে ব্যথিত হন দাস প্রথা দেখে। এরপর তিনি রিও ডি জেনেরো বন্দরে পৌঁছে যান সেখানে এক বন্ধু পেয়ে যান আগস্টাস এ্যারল কে।তিনি মোটামুটি সুন্দর ছবি আঁকেন। তাঁরা দু’জনে কাজ শুরু করে দিলেন চার্লস লিখতে থাকেন আর এ্যারল ছবি আঁকতে থাকেন। এভাবে তাঁরা অনেক ফসিল, তথ্য সংগ্রহ করে ইংল্যান্ডে হেনসলোকে পাঠিয়ে দিতেন। হেনসলো সেগুলো নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করত এবং সেগুলোর প্রত্যুত্তর চার্লসকে পাঠাতেন।

এভাবে তিনি অনেকগুলো তথ্য, উপাত্ত, ফসিল সংগ্রহ করে দিন দিন প্রাকৃতিক নির্বাচন জিনিসটা বুঝতে পারলেন, এক অঞ্চলের প্রাণীর সাথে অন্য অঞ্চলের প্রাণীর অমিল জিনিসটা লক্ষ করলেন, এক ঘাসগুলো লম্বা হয় আরেক অঞ্চলে যেখানে তৃণভোজী থাকে সেখানে ঘাস ছোট হবে।

পৃথিবীতে যোগ্যতমরাই টিকে থাকে, যারা পরিবেশের সাথে খাপ খাইতে পারবে তারা পৃথিবী থেকে অচিরেই বিলুপ্ত হয়ে যাবে।  যেমন ডাইনোসরগুলো পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াতে পারেনি বলে পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে হয়ে। এটাই হচ্ছে প্রাকৃতিক নির্বাচন।

ডারউইন একবার দেখেছিলেন এক প্রকার কেঁচো। এ কেঁচোকে নাড়াচাড়া করতে দ্বি খন্ডিত হয়ে যায়। তিনি পর্যবেক্ষণ করলেন কেঁচোটি মারা না গিয়ে ঐ খন্ডিত অংশগুলো আবার পরিপূর্ণ কেঁচোতে পরিণত হয়েছে। এভাবে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন প্রাকৃতিক নির্বাচন জিনিসটি।

এভাবে দীর্ঘ পাঁচ বছর জাহাজ ভ্রমনের পর চার্লস আবার ইংল্যান্ডে পৌঁছান। তখন বিজ্ঞানমহলে চার্লসের নামটি বেশ আলোচিত হচ্ছিল। তাঁর পাঠানো জিনিসগুলো হেনসেলো আর সেজউইক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতেন তারপর সেগুলো প্রচার করতেন এভাবে চার্লসের নামের খ্যাতি ছড়িয়েছে।

চার্লস ডারউইনের প্রকৃতি নিয়ে সন্ধান করতে করতে তিনি তাঁর পাদ্রী হওয়াটা ভূলে গিয়েছেন। তাছাড়া গবেষণা করার পর তিনি ধর্মের প্রতি সংশয় বোধ অনুভব করছিলেন। কারণ তিনি জানতে পারতেছেন আজকের মানুষ বিবর্তনের চূড়ান্ত ফসল। সৃষ্টিকর্তা মানুষ সৃষ্টি করেনি। কিন্তু পবিত্র বাইবেলে লেখা আছে জীব ও জগৎ ঈশ্বরের সৃষ্টি। শুধু মানুষ নয়, বিশ্ব সৃষ্টির মূলে রয়েছেন ঈশ্বর। ঈশ্বর ছয়দিনে পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন বলে বলা হয়েছে বাইবেলে। ডারউইন নিজেও বাইবেলে সম্বন্ধে ভাল জানতেন কারণ তিনি পাদ্রি হওয়ার জন্যে প্রচুর ধর্মীয় বই পড়েছেন। তিনি তাঁর কৃতকর্ম,গবেষণা তাকে নাস্তিক হতে বাধ্য করেছে।

পরবর্তীতে তিনি যাত্রার বর্ণনা ও অভিজ্ঞতা নিয়ে ‘দ্য ভয়েজ অফ দ্য বিগল’ (The voyage of the Beagle) বইটি লিখেন। ১৮৩৯ সালে ২৯ শে জানুয়ারী জেমস মামার মেয়ে এম্মা ওয়েজউডকে বিয়ে করেন।

স্যার লায়েল ও অধ্যাপক হুকারের একান্ত তাগাদায় ও পৃষ্টপোষকতায় বিবর্তনবাদ তত্ত্ব নিয়ে চার্লস ডারউইন তারঁ গ্রন্থ রচনার কাজ শেষ করলেন। ১৮৫৯ সালের ২৪ শে নভেম্বর লন্ডনে প্রকাশিত হলো ‘দি অরিজিন অব স্পিসিস’ (The origin of species) গ্রন্থটি। বিশ বিশ বছর ধরে একটু একটু বই লিখেছিলেন। যুক্তিজাল ও সাক্ষ্য প্রমাণে ঠাসা বইটি। বইটি প্রথমে প্রকাশ করা হয়েছিল ১২৫০ কপি। প্রকাশক ঐদিনই সন্ধ্যার পরে ডারউইনকে খবর পাঠালেন বইগুলো পুরোদমে বিক্রি হয়ে গেছে।

প্রথমে ডারউইনের বিবর্তনবাদ তত্ত্বটি তেমন সাড়া ফেলতে পারে নি পরে বিজ্ঞানীরা পরিক্ষা করে দেখেছে পৃথিবীতে প্রতিনিয়ত বিবর্তন সংগঠিত হচ্ছে, অবশেষে বিজ্ঞানীগণ তাঁর মতবাদটি যুক্তিযুক্ত বলো দাবি করে। আর এভাবে ডারউইন বিবর্তন বাদের জনক হিসেবে খ্যাতি পেয়ে গেলেন। ১৮৮২ সালে ১৯ শে এপ্রিল বিকাল অসুস্থতার কারণে চেয়ারে হেলে পড়া অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

বিস্তারিত ভাবে আরো জানতে পড়তে পারেন
১.ডারউইন – অশোক ঘোষ
২.চার্লস ডারউইন ও প্রজাতির উৎপত্তি – দ্বিজেন শর্মা
৩.ডারউইনঃ বিগল যাত্রীর ভ্রমণকথা – দ্বিজেন শর্মা
৪.চার্লস ডারউইন – অ্যানা স্পুল।


লেখক: ক্লিন্টন চাকমা, শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here