ইসরায়েল বিশ্বের অন্যতম আধুনিক ও উন্নত রাষ্ট্র। এই রাষ্ট্রের জন্ম হয় ১৯৪৮ সালে। অথচ ৭০ বছর বয়সী এই রাষ্ট্রটি অল্প সময়েই হয়ে ওঠে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধশালী একটি রাষ্ট্র। ২০১০ সালের ১৭ই সেপ্টেম্বর ইসরায়েল ‘অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা’ র সদস্যপদ লাভ করে। ২০১৭ সালের আইএমএফ এর প্রকাশিত জিডিপি র‍্যাংকিং অনুযায়ী এটি বিশ্বের ৩৪তম সর্ববৃহৎ অর্থনীতির দেশ। এই রাষ্ট্রের আয়তন মাত্র ২০,৭৭০ বর্গমাইল, অথচ ছোট্ট এই রাষ্ট্রটিই কিনা বিশ্বের অন্যতম উদ্যোক্তা বানানোর কারিগর। ছোট্ট, বিতর্কিত এবং রাজনৈতিকভাবে আইসোলেটেড হওয়া সত্ত্বেও কিনা ইসরায়েল হয়ে ওঠে বিশ্বের অন্যতম ব্যবসায়িক উদ্যোগশীল এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনশীল রাষ্ট্র।

ইসরায়েলের এই বিষ্ময়কর অর্থনৈতিক শক্তি হয়ে ওঠার পেছনকার গল্প নিয়েই লিখেছেন Dan SenorSaul Singer তাদের Start-Up Nation: The Story of Israel’s Economic Miracle বইটি। সেই বইয়ের-ই সারাংশ এখানে তুলে ধরা হল:

ইসরায়েলিদের সমাজ ব্যবস্থা ক্রমাধিকারতান্ত্রিক (Hierarchical) নয়, বরং সমঅধিকারতান্ত্রিক (Egalitarian)। তাদের সমাজ ব্যক্তিগত উদ্যোগ এবং উদ্ভাবনের উপর জোর দেয়। তারা প্রত্যেকেই ব্যর্থতাসহিঞ্চু, কারও চেষ্টাকে তারা নিরুৎসাহিত করে না। তারা এটাও জানে যে প্রতিকূলতা উদ্ভাবনের জন্ম দেয়, তাই তারা তাদের রাষ্ট্রের জন্মলগ্ন থেকে পাওয়া প্রতিকূলতাগুলোকে কাজে লাগিয়ে সামনে এগিয়েছে।

২০০৮ সালে PayPal যখন টাকা লেনদেনের প্রতারণা প্রতিরোধের জন্য একটি ইসরায়েলি কোম্পানি কিনে নেয়, এইসময় ওই কোম্পানির লোকেরা PayPal এর CEO কে তাদের প্রথম মিটিংয়ে PayPal এর তৎকালীন ত্রুটিপূর্ণ কর্মপদ্ধতির সমালোচনা করে। এই জেদপূর্ণ দৃঢ়তাব্যঞ্জক মনোভাব, নিজের আইডিয়ার জন্য আত্মবিশ্বাসী হয়ে জোরালো অবস্থানে অটুট থাকার মাসিকতাকে হিব্রুতে বলা হয় Chutzpah, এটি একটি মূল্যবোধ যা চর্চার জন্য প্রত্যেক ইসরায়েলি শিশুর মধ্যে উৎসাহ করা হয়।

ইসরায়েলিদের উদ্ভাবনশীল হওয়ার পিছনে আরেকটি অন্যতম কারণ হচ্ছে তারা প্রত্যেকেই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করার সংস্কৃতিকে চর্চা করে। কোনটি যৌক্তিক এই প্রসঙ্গে যুক্তিতর্ক করার সংস্কৃতিই তাদেরকে উদ্যোক্তা হিসেবে বানানোর পিছনে প্রভাবক হিসেবে কাজ করে।

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী তাদের দেশের হাই স্কুলগুলো থেকে মেধাবী শিক্ষার্থীদের মাঝখান থেকে ২% সর্বোচ্চ মেধাবীদের বাছাই করে তাদের সর্বোচ্চ এলিট ফোর্স এবং ইন্টেনসিভ এন্ড হাইলি এডভান্সড টেকনোলজিকাল ইউনিটে নিয়োগ দেয়। মাত্র ১০% মেধাবী শিক্ষার্থী কঠিন এক গণিত এবং পদার্থবিজ্ঞানের পরীক্ষায় পাস করে ফাইনাল পার্সোনালিটি এবং এপ্টিটিউড টেস্টের জন্য বাছাই হয়। তারা সেনাবাহিনীতে সৈনিক নিয়োগের ক্ষেত্রে তাদের সামাজিক ব্যবস্থা এবং সামাজিক মূল্যবোধকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে প্রয়োগ করে। তারা তাদের সেনাবাহিনীতে খুব কমই সিনিয়র অফিসার রাখে, অফিসার এবং সৈন্যদের অনুপাত হল ১ঃ৯। অপরদিকে আমেরিকায় এটি ১ঃ৫। তারা তাদের সেনাবাহিনীতেও ক্রমাধিকারতান্ত্রিকতাকে (Hierarchical) রাখেনি। যার কারণে তাদের জুনিয়র সৈন্যরা আরও দায়িত্ববান হওয়া শিখে এবং নিজের বুদ্ধিমত্তা এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগ চর্চার সুযোগ পায়। আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে মাত্র ৬ দিনে বিজয়ী হতে ঠিক এই জিনিসটাই কিন্তু ইসরায়েলের পক্ষে বিরাট ভূমিকা রাখে।

ইসরায়েলের কার্যকারী সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদ থাকা সত্ত্বেও এর প্রতিকূলতার সাথে মানিয়ে নেওয়ার ও পরিবর্তনের গুণ এবং উদ্ভাবনের প্রয়াস প্রমাণিত হয় ব্যবসায়িক উদ্যোগশীল রাষ্ট্র হয়ে ওঠার পটভূমি। প্রত্যেক রাষ্ট্রই তার জাতীয় উন্নয়নের জন্য কিছু কিছু ক্ষেত্রে ফোকাস করে, ঠিক তেমনি ইসরায়েলও তার ব্যতিক্রম নয়। আর এই রাষ্ট্র জন্মলগ্ন থেকেই সুচিন্তিত এবং কৌশলগতভাবেই জোর দেয় উদ্ভাবনী প্রযুক্তি আর ব্যবসায়িক উদ্যোগের উপর। ইসরায়েল সেই রাষ্ট্রদের মধ্যে অন্যতম যেটি তার অর্থনৈতিক বাজেটের বিরাট অংশ খরচ করে R&D তে অর্থাৎ গবেষণা এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের উপর, কারণ তারা মনে করে যে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও উন্নয়নই হচ্ছে একটি রাষ্ট্রের সার্বিক উন্নতির মূল চাবিকাঠি।

ইসরায়েলের রয়েছে অসংখ্যক ইঞ্জিনিয়ার এবং বিজ্ঞানী যা অন্য যেকোন দেশের চেয়ে বেশি। এর রয়েছে সর্বোচ্চ সংখ্যক ইন্টারনেট ব্যবহারকারী এবং সর্বোচ্চ সংখ্যক ব্যবসায়িক উদ্যোক্তার ঘনত্ব। যার কারণে ইসরায়েলের রয়েছে ইউরোপের চাইতে অধিক NASDAQ (একটি আমেরিকান স্টক এক্সচেঞ্জ কোম্পানি) লিস্টেড কর্পোরেট কোম্পানি। ২০০৮ সাল অনুযায়ী, এই দেশটি মাথাপিছু ২ বিলিয়ন ডলার বিদেশি পুঁজি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করেছে যা যুক্তরাজ্য, জার্মানি কিংবা ফ্রান্সের সমন্বয়ের চেয়ে বেশি। পুঁজি বিনিয়োগিরা ২০০৮ সালে ইসরায়েলে যে মাথাপিছু বিনিয়োগ করেছে তা আমেরিকায় বিনিয়োগকৃত অংশের চাইতে ২.৫ গুণ বেশি।

প্রযুক্তিক্ষেত্রে ইসরায়েলের ব্যবসায়িক উদ্যোগ এবং উদ্ভাবন চমকপ্রদ। ইন্টেল (Intel) হচ্ছে ইসরায়েলের সর্ববৃহৎ কর্পোরেট চাকরি নিয়োগদাতা। কম্পিউটার চিপ জায়ান্ট ইন্টেলের ইসরায়েলি টীম ১৯৮০ তে ইন্টেল ৮০৮৮ মাইক্রোপ্রসেসর চিপ ডিজাইন করে যা পার্সোনাল কম্পিউটার তৈরিতে ব্যাপক সাহায্য করে, ১৯৮৬ তে তারা আরও দ্রুততর চিপ ইন্টেল ৩৮৬ মাইক্রোপ্রসেসর চিপ উদ্ভাবন করে এবং ১৯৯৩ সালে পেন্টিয়াম চিপ উদ্ভাবন করে প্রযুক্তির জগতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে দেয়। আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় যখন ইসরায়েলে স্কাড মিসাইল নিক্ষেপ করা হয় ঠিক তখনও ইসরায়েলের ইন্টেল টীম নির্বিঘ্নে কাজ করতে থাকে। মাইক্রোসফট, সিসকো, ফেসবুক, ইন্টেল, গুগলের মতো বাঘা বাঘা প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো ইসরায়েলে তাদের R&D অর্থাৎ রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট সেন্টার খুলে বসে। বিশ্বের প্রায় অর্ধেকেরও বেশি প্রযুক্তি কোম্পানি ইসরায়েলে R&D সেন্টার খুলেছে।

১৯৫৬ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন স্পুটনিক স্যাটেলাইট মহাকাশে পাঠায়, তখন আমেরিকা তার সাথে পাল্লা দেওয়ার চেষ্টা করে এবং শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে প্রতিরক্ষাগত উন্নয়নের হিড়িক লাগে। ঠিক ১১ বছর পরে আরব-ইসরায়েলের মধ্যকার ৬ দিনের যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে ফ্রান্স ইসরায়েলের উপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা শুরু করে দেয় যার ফলস্বরুপ ইসরায়েল বাধ্য হয় নিজস্ব অস্ত্র উদ্ভাবন ও উৎপাদনে। ইসরায়েল যেহেতু প্রতিরক্ষার জন্য এয়ারক্রাফট, মিসাইল এবং যুদ্ধাস্ত্র কিনতে অন্য দেশগুলোর উপর ভরসা করে না এবং কেনাটা যেহেতু প্রচুর ব্যয়বহুল তাই তারা নিজেরাই তাদের প্রতিরক্ষার অস্ত্র ও সরঞ্জাম বানানো শুরু করে। অর্থাৎ ইসরায়েল তাদের প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণতা লাভে মনোনিবেশ করে। ইসরায়েলের নিজস্ব অস্ত্র উদ্ভাবন এবং উৎপাদনের চেষ্টাটা পারতপক্ষে বিস্ময়কর ব্যাপার কারণ অন্য কোন ক্ষুদ্র রাষ্ট্র তার মতো সেই চেষ্টাটা করেনি।

ইসরায়েলকে বলা হয় স্টার্ট-আপ নেশান। ঐতিহাসিকভাবেই এই রাষ্ট্রের সূচনালগ্ন থেকে আরবরা এই রাষ্ট্রের বিরোধীতা করে এসেছে এবং তারা এই রাষ্ট্রের উপর রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা দেয়। ইসরায়েলিরা নিষেধাজ্ঞার কারণে আগে তার পার্শবর্তী কোন দেশেই গমন করতে পারতো না। ইসরায়েলিরা এই লিমিটেশনকেই কাজে লাগায়। ইসরায়েল তার অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার জন্য ও তা সচল রাখার জন্য বাধ্য হয় দেশের জনগণের মধ্যে ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক উদ্যোগকে উৎসাহিত করতে। এতে ইসরায়েল জোর দেয় টেকনোলজি, সফটওয়্যার, কমিউনিকেশন আর নেটওয়ার্কের উদ্ভাবনী ব্যবসায়িক উদ্যোগের উপর- কারণ তারা জানে এসব প্রযুক্তি যেকোন বর্ডারকেও অতিক্রম করে যায়। যেহেতু ইসরায়েলের পক্ষে ব্যয়বহুল প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম আমদানি করা সম্ভব ছিল না তাই তারা নিজেরাই নিজস্ব প্রযুক্তি বানানোতে ফোকাস করে। আমরা বলতে পারি স্বনির্ভর জ্ঞান ও প্রযুক্তিগত অর্থনৈতিক রাষ্ট্র হওয়ার জন্য ইসরায়েল একপ্রকার বাধ্য হয়, গ্লোবাল একটি ট্রেন্ড হওয়ার আগ পর্যন্ত।

সুতরাং ইসরায়েলের শক্তিশালী এবং বিস্ময়কর অর্থনীতির পেছনের কারণগুলো খুঁজলে দেখা যায় এতে তাদের সামাজিক ব্যবস্থা, মূল্যবোধ, উদ্ভাবনের মানসিকতা, উদ্যোগ, জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির প্রতি তাদের ঝোঁক- এর বিরাট প্রভাব রয়েছে। তাদের সামাজিক মূল্যবোধ, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক উদ্যোগ নেওয়ার মানসিকতা এবং প্রতিকূলতাকে কিভাবে কাজে লাগাতে হয় তা থেকে আমাদের প্রত্যেকেরই কিছু না কিছু শেখার আছে। পরিশেষে পাঠকদের প্রতি Start-Up Nation: The Story of Israel’s Economic Miracle – এই বইটি পড়ার ব্যক্তিগত অনুরোধ রইলো।


লেখক: নবাংসু চাকমা, শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here