icon

বােমাং রাজপদের উত্তরাধিকার প্রথা : একটি সমীক্ষা

Jumjournal

Last updated Dec 10th, 2020 icon 211

বােমাং সার্কেলের রাজা (সার্কেল প্রধান) ক্য সাইন প্রু চৌধুরীর রাজপদ লাভের মাত্র ২মাস ১৬ মাস দিনের মাথায় এবং পরিণত বয়সে মৃত্যুতে জনমনে কিছুটা বিস্ময় এবং হতাশার সৃষ্টি করেছে।

কারণ তিনি পরিণত বয়সে (৮০ বছর) মারা গেলে ও রাজপদের সম্মান এবং মর্যাদা বেশী দিন ভােগ করে যেতে পারেননি। তাছাড়া নূতন রাজা হিসাবে জনগণ বিশেষতঃ বােমাং সার্কেলের তার প্রজাগণ তার সেবা এবং বাৎসল্য লাভ করার সুযােগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

একটা বিষয়ে হয়ত অনেকে একমত হবেন যে, বােমাং রাজারা প্রায় ক্ষেত্রেই বদ্ধ বয়সেই রাজপদে অধিষ্ঠিত হন। এখানে উল্লেখ্য যে, ১৪ তম বােমাং রাজা মং শােয়ে চৌধরী চাকরীর অবস্থায় আনুমানিক ৪৫ বছর বয়সে ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে এবং প্রয়াত ১৫তম রাজা অং শােয়ে প্রু চৌধুরী চাকুরী জীবন থেকে অবসর গ্রহণের অনেক বছর পর ৮১ বছর বয়সে রাজপদ (বােমা? গিরি) লাভ করেন। অনুরূপভাবে সদ্য প্রয়াত রাজা ক্য সাইন প্রু চৌধুরী ও ৮০ বছর বয়সে রাজপদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন।

বােমাং রাজাদের প্রায় ক্ষেত্রে বৃদ্ধ বয়সে রাজপদে অধিষ্ঠিত হওয়ার কারণ বুঝতে হলে এই পদের উত্তরাধিকার পদ্ধতির উদ্ভবের ইতিহাস জানা দরকার। তবে বােমাং রাজপদের উত্তরাধিকার প্রথা সম্পর্কে আলােচনার আগে এই পদের উদ্ভব সম্পর্কেও আলােচনা করা দরকার।

বােমাং রাজবংশের উদ্ভব

আর. এইচ. সিদ হাসিনসনের মতে আরাকানের রাজা মানরাজাগিরির সাহায্য নিয়ে ১৫৯৯ খ্রিস্টাব্দে অভিযান চালিয়ে বার্মার রাজা পেগু রাজাকে পরাজিত করেন। যুদ্ধে সাহায্যের পুরস্কার স্বরূপ বার্মার রাজা আরাকানের রাজাকে ৩৩,০০০ তেলেয়ং প্রজা এবং পেগুর পরাজিত রাজার বন্দী পুত্র এবং কন্যাকে উপহার দেন।

আবার আব্দুল হক চৌধুরীর মতে, আরাকানের রাজা মিনয়াজাগ্যি সলিম শাহ (১৫৯৩-১৬১২ খ্রিঃ) বার্মার অন্তর্গত পেগু রাজ্যের রাজা ন্যানডা বায়েনিং এর চারটি হাতির লােভে ১৫৯৯ খ্রিস্টাব্দে পেগু আক্রমণ করে পেগু রাজ্য জয় করেন।

তিনি যুদ্ধে জয়লাভ করে চারটি শ্বেতহস্তী, রাজকন্যা, সিনডােনং এবং রাজপুত্র মেং শােয়ে প্রু ও তার ছােট ভাই এবং কয়েক হাজার তেলেইং সৈন্য বন্দী করে রাজধানী ম্রোহং এ নিয়ে আসেন।

হাচিনসনের বিবরণমতে, আরাকানের রাজা (নাম উল্লেখ নেই) বন্দীনি পেগু রাজকন্যার (নাম উল্লেখ নেই) সৌন্দয্যে মুগ্ধ হয়ে তাকে বিয়ে করেন। আবার আব্দুল হকের বিবরণে আরাকান রাজার নাম এবং পেগুর রাজকন্যার নাম উল্লেখ আছে।

হাচিনসনের বিবরণ মতে মিনয়াজাগ্যি ১৬১৪ সালে তার শ্যালক পেগুর রাজপুত্রকে চট্টগ্রামের গভর্ণর নিযুক্ত করেন। আবার আব্দুল হকের বিবরণ মতে আরাকান রাজা মিনখা মৌংই তার সৎ মামা পেগুর ভূতপূর্ব রাজকুমার মং শােয়ে প্রুকে উল্লিখিত সালে চট্টগ্রামের শাসনকর্তা পদে নিযুক্ত করেন। তিনি ১৬৩০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ঐ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।

আব্দুল হক চৌধুরীর বিবরণ মতে মংশােয়ে প্রুর মৃত্যুর পর তৎপুত্র মংরাই প্রু ১৬৩০ খ্রিস্টাব্দে আরাকান অধিকৃত চট্টগ্রামে গভর্ণর নিযুক্ত হন এবং ১৬৬৫ খ্রিস্টাব্দে পর্যন্ত ঐ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তার মৃত্যুর পর তৎপুত্র হারিও প্রু ১৬৬৫ সালে চট্টগ্রামের গভর্ণর নিযুক্ত হন।

মােগল সেনাপতি বুজর্গ উমেদ খাঁ ২৭ জানুয়ারি ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে আরাকনী বাহিনীকে পরাজিত করে চট্টগ্রামের বৃহত্তর অংশ দখল করে নেন। অতপর হারিও প্রু ১৬৮৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত চট্টগ্রামের অবশিষ্ট দক্ষিণ অংশের গভর্ণরের দায়িত্ব পালন করেন হারি ও প্রু মৃত্যুর পর তার ভাতষ্পুত্র হারিও ১৬৮৭ দক্ষিণ চট্টগ্রামের গভর্ণর নিযুক্ত হন।

অষ্টাদশ শতকের শুরুর প্রথম দিকে কামানচি বিদ্রোহীরা আরাকানে অরাজকতা সৃষ্টি করে। এতে আরাকান সেনাপতি মহাদন্ডায়ু কামানচি বিদ্রোহ দমনে তৎপর হন। এসময় দক্ষিণ চট্টগ্রামের গভর্ণর হারিও তাকে ব্যাপকভাবে সাহয্য করেন।

তিনি বিদ্রোহ দমনে সফল হন এবং মহাদন্ডায় সান্দাউজিয়া নাম ধারণ করে আরাকানের রাজা হন। কামানচি বিদ্রাহ দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করায় আরাকানের নূতন রাজা ১৭১০ খ্রিস্টাব্দে তাকে ‘বােমাং গিরি’ উপাধি দিয়ে সম্মানিত করেন।

১৭২৭ খ্রিস্টাব্দে হারিও মারা গেলে তার প্রপৌত্র কং স্লা প্রু (আব্দুল হক চৌধুরীর মতে মং হ্রা প্রু) তার স্থলাভিষিক্ত হন। কং স্লা প্রু হলেন হারিও প্রু’র পুত্র (পিতার জীবদ্দশায় মৃত) ছাদা প্রু পুত্র। কং হ্লা প্রু মােগল আক্রমণের মুখে ক্রমশঃ দক্ষিণ দিকে সরে যেতে বাধ্য হন।

কং হ্লা প্রু একে একে রামু, ঈদগড়, ইয়াংছা, মাতামুহুরী ইত্যাদি স্থান ত্যাগ করে শেষ পর্যন্ত লামায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। অবশেষে আক্রমণের মুখে তিনি তার অনুগামীদের নিয়ে ১৭৫৬ খ্রিস্টাব্দে আরাকানে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন।

এখানে উল্লেখ্য যে, পেণ্ডর রাজকুমার মং শােয়ে প্রু এবং তার অধস্তন পাঁচ পুরুষ ১৬১৪-১৭৫৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ১৪২ বছর যাবত চট্টগ্রামে আরাকানী শাসনকর্তা হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং চট্টগ্রামের শাসনকর্তা হারিওর। ‘বােমাং গিরি’ উপাধি লাভের মধ্য দিয়ে বােমাং রাজপদের উদ্ভব হয়

রাজপদের উত্তরাধিকার প্রথা

আরাকান রাজ দরবারে নিগ্রহের শিকার হয়ে বােমাং কং হ্লা প্রু তার অনুগামীদের খ্রিস্টাব্দে পুনরায় চট্টগ্রামে চলে আসতে বাধ্য হন। তিনি তৎকালীন স্থানীয় বৃটিশ কর্তপক্ষের অনুমতি নিয়ে মাতামুহুরী নদীর তীরে রামু এবং ঈদগড়ে বসতি স্থাপন করেন।

অতপর ১৮১৯ খ্রিস্টাব্দে তার মৃত্যু হলে তার জেষ্ঠ পুত্র সাথানপ্রু বােমাং পদে অধিষ্ঠিত হন। তি) খ্রিস্টাব্দে বান্দরবানে বসতি স্থাপন করেন। তিনি স্থানীয় কর্তৃপক্ষ থেকে বাৎসরিক ৪৬০০ টাকা খাজনা প্রদানের শর্তে একটা কার্পাস মহাল লাভ করেন এবং তার পূর্ব পুরুষ (হারিও)এর ‘বােমাংগিরি’ পদবীর স্বীকৃতি লাভ করেন।

বােমাং সাথান প্রু ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দে নিঃসন্তান অবস্থায় মারা গেলে বােমাংরাজ পদের দাবী নিয়ে তার কনিষ্ঠ ভাই ম ম থােয়াই স্লা প্রু এবং সাতা প্রুর মধ্যে বিরােধ দেখা দেয়। অবশেষে চট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনার হেনরি রিকেটস এতে হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হন। তিনি কং হ্লা প্রু চৌধুরীর উত্তারাধিকারীগণের মধ্যে সমঝােতার ভিত্তিতে কম হ্লাংগ্য চৌধুরীকে ১৮৪৭ খ্রিস্টাব্দে বােমাংগিরি/ রাজা নিযুক্ত করেন।

কমিশনার একই সাথে রাজ্যের সীমানার নিরাপত্তা রক্ষার জন্য যথেষ্ট শক্তিশালী একটা সৈন্যবাহিনী সংরক্ষণ করার শর্তে বােমাংগিরির বাৎসরিক খাজনার অনু ৪৬০০.০০ টাকা থেকে হ্রাস করে ২৯১৮.০০ টাকা নির্ধারণ করে দেন।১০

পরে বার্ধক্য এবং শারীরিক অক্ষমতার কারণে কম হ্রাংগ্য চৌধুরী বােমাং গিরির পদ ছেড়ে দেন এবং তদস্থলে মমপ্রু (মতান্তরে মং প্র) চৌধুরী বােমং গিরি পদে অধিষ্ঠিত হন। তিনি ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দে লুসাই পাহাড় অভিযানে কুলি সরবরাহ করে তার বাৎসরিক খাজনার অঙ্ক কমাতে সক্ষম হন।

মমপ্রু চৌধুরীর মৃত্যুর পর তার কনিষ্ঠ ভ্রাতা সানাঞো চৌধুরী বােমং গিরি হন। ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে সানাঞো চৌধুরী মারা গেলে (মতান্তরে থানেহ চৌধুরী) তার ভ্রাতুস্পুত্র চৌ হ্লা প্রু চৌধুরী বােমাং রাজপদে (বােমং গিরি) অধিষ্ঠিত হন।১১

১৯১৬ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে পরবর্তী বােমাং রাজা হন মংচাঞো (মং চাইঙ্গ্যা)। তার মনােনয়ন অনুযায়ী পরবর্তী বােমাং রাজা হন ক্য জান প্রু চৌধুরী এবং ১৫ আগস্ট ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে মং শােয়ে প্রু চৌধুরী ১৪তম রাজা হন।

পারিবারিক বিরােধেই সরাসরি উত্তরাধিকার প্রথা লাইনচ্যুত হয়েছে

স্মরণ করা যেত পারে যে, ১৬১৪ খ্রিস্টাব্দে আরাকান রাজার কাছ থেকে চট্টগ্রামের (গভর্ণর) শাসনকর্তার দায়িত্ব লাভ করার পর পেগুর প্রাক্তন রাজ কুমার মং শােয়ে প্রু (মতান্তরে সান বাইউ) সেখানকার পর্তুগীজ দৌরাত্ম দমন করতে সমর্থ হন। এতে সন্তুষ্ট হয়ে রাজা তাকে বােমাংগিরি (বােমাংদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ রাজা) উপাধি প্রদান করেন। অর্থাৎ তিনিই বােমাং রাজ বংশের প্রতিষ্ঠাতা।

এই বংশেরই চতুর্থ বােমাং হারিও ১৭১০ খ্রিস্টাব্দে আরাকান রাজ মহাদন্ডায়ুসান্দাউজিয়াব কাছ থেকে ‘বােমাংগিরি’ (বােমাংদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ) উপাধি লাভ করেছিলেন। আর এই হারিওর প্রপৌত্র চট্টগ্রামের শেষ গভর্ণর। তাঁরা সবাই এই বংশের শুরু থেকে বংশের প্রধানের পদে সরাসরি নিয়ােগ লাভ করেছিলেন।

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে সাথানপ্রু নিঃসন্তান অবস্থায় মারা গেলে বােমং গিরি (বােমাং রাজা) পদ নিয়ে কং হ্লা প্রুর পুত্রগণ এবং অন্য উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বিরােধ দেখা দেয় । ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে ও বােমাং রাজপদ নিয়ে রাজপরিবারের সদস্যদের মধ্যে বিরােধ দেখা যায়। সেই বিরােধ প্রসঙ্গে আলােচনার আগে বােমাং রাজা কং হ্লা প্রু চৌধুরীর উত্তরাধিকারীগণের মধ্যে সৃষ্ট বিরােধের কথা আগে আলােচনা করা দরকার।

হাচিনসনের বিবরণ অনুযায়ী কং হ্লা প্রু জেষ্ঠ পুত্র সাথান প্রু নিঃসন্তান অবস্থায় ১৮৪০ সালে মারা গেলে রাজপদের অধিকার নিয়ে তার অপর তিন ভাইয়ের মধ্যে বিরােধ দেখা দেয়। তাঁর বিবরণ মতে কং হ্লা প্রু চারপুত্র ছিলেন। ফ্রানচিস বুকাননের মতে, কং হ্লা প্রুর তিন স্ত্রীর গর্ভে ছয় পুত্র এবং ছয় কন্যা ছিলেন।

কং হ্লা প্রু’র পুরাে নাম ছিল ঐ পােমাং কং হ্লা প্রু’ । ‘পাে-মাং’ হল তার উপাধি যার অর্থ ক্যাপ্টেন। কং হ্লা প্রু হল তার আসল নাম। ‘প্রু’ অর্থ সাদা এবং সেটাই পরিবারের নাম। বুকানন ১৭৯৮ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসের ১৮ তারিখে সােয়ালক খালের/ ছড়ার পূর্ব পারে অবস্থিত তার বাড়ীতে দেখা করতে যান। অবশ্য কং হ্লা প্রু নিজেই সােয়ালক খালের পশ্চিম তীরে স্থাপিত তাঁবুতে বুকাননের সাথে দেখা করেছেন।১২

রাজপদ নিয়ে কংলা প্রুর পুত্রগণের মধ্যে বিরােধ দেখা দিলে তারা চট্টগ্রাম বিভাগের তৎকালীন কমিশনার হেনরি রিকেটস এর আদালতে মামলা দায়ের করেন। রিকেটস এর হস্তক্ষেপে পরিবারের বিবাদমান সদস্যগণ শেষপর্যন্ত একটা আপােষ মীমাংসায় আসতে বাধ্য হন। এ ব্যাপারে আগস্ট ৯, ১৮৪৭ খ্রিস্টাব্দ তারিখে একটি চুক্তিনামা (Solenama) সম্পাদিত হয়।

এতে ১ম পক্ষ ছিলেন রাজা কং হ্লা প্রু চৌধুরীর পুত্র থােয়াই হ্লা প্ৰু, ২য় পক্ষ কমলাংগিও চৌধুরী পিতা মৃত অংপ্রু চৌধুরী এবং তৃতীয় পক্ষ মং প্রু চৌধুরী। সেই সময় তাদের যথাক্রমে বিলছড়ি, বান্দরবান এবং কাপ্তাই এ পৃথক পৃথক এস্টেট (জমিদারী) ছিল এবং তখন তারা সবাই চট্টগ্রামে বসবাস করছিলেন।১৩

চুক্তির পক্ষগণের মধ্যে প্রাক্তন রাজা কং হ্লা প্রুর একমাত্র জীবিত পুত্র হিসাবে ১ম পক্ষ থােয়াই হ্লা প্রু দাবী অগ্রগণ্য। চুক্তি অনুযায়ী তিনি বার্ধক্যজনিত এবং শারীরিক অক্ষমতার কারণে রাজপদের দাবী ছেড়ে দেন।

তিনি পরবর্তী রাজা হিসেবে অন্যদের মধ্যে সবার চেয়ে যােগ্য এবং বয়ােজেষ্ঠ কং লাং গিও চৌধুরীর নাম প্রস্তাব করলে সকল পক্ষ তা গ্রহণ করেন। এই চুক্তি অনুযায়ী পক্ষগণ সবাই তাদের নিজ নিজ জমিদারী নূতন রাজার পরিচালনায় ছেড়ে দিতে এবং তারা সবাই বান্দরবান রাজবাড়ীতে রাজার অধীনে বসবাস করতে অঙ্গীকার করেন। নব নিযুক্ত রাজা অন্যপক্ষগণের রাজরাড়ীতে বসবাস করার এবং তার মৃত্যুর পর অন্য গণের পালাক্রমে রাজপদ লাভের অধিকার স্বীকার করে নেন।১৪

চক্তিনামা অনুযায়ী কংলাংগিওকে (মতান্তরে কং হ্লা ঞো) পরবর্তী রাজা নিয়ােগ করা হয়েছে কিনা তা পরিস্কার নয়। নথিপত্রে দেখা যায় যে, তৎকালীন বৃটিশ কর্তপক্ষ ২৮, ১৮৪৭ খ্রিস্টাব্দে এর এক পরােয়ানা/ নিয়ােগ পত্র অনুযায়ী (১) ক্য হ্লা প্রু (২) কয়নাে লিরেয়ু এবং (৩) মামপ্রু নামে পূর্বের ৪৫৬৪ টাকার স্থলে ২৯১৮.০০ টাকার খাজনা প্রদান সাপেক্ষে একটি কার্পাস মহলে ইজারা দেওয়া হয়।১৫

পক্ষান্তরে, তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত রাজা মং চাইগ্যা কর্তৃক ১৫ জুন, ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দ তারিখে বিভাগের কমিশনারের কাছে লিখিত এক পত্র থেকে জানা যায় যে চুক্তি অনুযায়ী কংহ্লাংগিকে ঠিকই রাজা নিয়ােগ করা হয়েছিলাে। কিন্তু তিনি অতি অল্প সময়ের মধ্যে রাজপদটি মং প্রু চৌধুরীর পক্ষে ছেড়ে দিয়েছিলেন।

এখানে উল্লেখ্য যে, তিনি তাকে (নিজেকে) বােমাং রাজা হিসাবে স্বীকৃতি এবং বােমাং রাজ পদে নিয়ােগ লাভের জন্য উল্লিখিত পত্র লিখেছিলেন। তিনি সেই বছরের ডিসেম্বর মাসে বোমাং রাজপদে নিয়ােগ লাভ করেন।১৬

মং চাংগ্যা তার উল্লিখিত পত্রে অভিযােগ করেছেন যে, রাজা কং হ্লা প্রু চৌধুরীর উত্তরাধিকারীগণের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তিনামাটিকে (Solenama) পরবর্তী রাজাগণ এবং সরকার কখন ও একটা চুক্তি হিসাবে গ্রহণ করেননি। তিনি এটাকে বেআইনী এবং অর্থহীন বলেছেন।

তার বক্তব্য হল যে পক্ষগণের মধ্যে সৃষ্ট বিরােধ নিষ্পত্তির জন্য চুক্তিনামাটি করা হয়েছে। বংশ পরম্পরায় বােমাং রাজপদের উত্তরাধিকারের বিধি বিধান নির্ধারণের জন্য তা করা হয়নি। তিনি নিজেই তার চাচাত ভাই ক্য হ্লা প্রুকে তার উত্তরাধিকারী মনােনীত করেছিলেন।

ক্ষমতাসীন (নূতন নিয়ােগপ্রাপ্ত) বােমাং রাজা কর্তৃক তার উত্তরসূরী মনােনয়ন ঘােষণার বিষয় জানার পর তৎকালীন বাংলার ভারপ্রাপ্ত মুখ্য সচিব মিঃ জে. এইচ. কার ক্ষমতাসীন বােমাং রাজা কর্তৃক তার উত্তরাধিকারী মনােনয়ন সঠিক নয় মন্তব্য করে তার ২২, ফেব্রুয়ারি, ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দ তারিখের পত্রে সেই ব্যাপারে কিছু ব্যাখ্যা দেন।

তিনি লিখেছেন যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে বাংলা সরকারই চীফদের (রাজা) অভিষেক নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। তাই বর্তমানে বােমাং রাজা কতৃক তার উত্তরসূরী মনােনয়ন করা ঠিক হয়নি।

চট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনারের কাছে লিখিত সেই পত্রে বােমাং রাজা কর্তৃক তার উত্তরসূরী মনােনয়ন সরকার মেনে নিতে বাধ্য নয় মর্মে রাজাকে জানিয়ে দেওয়ার জন্য তিনি কমিশনারকে অনুরােধ করেছেন।

তিনি লিখেছেন যে, বর্তমান রাজার রাজপদের উত্তরাধিকার নিয়ে সষ্ট বিরােধের নিষ্পত্তি কোন নীতি-নিয়মের উপর ভিত্তি করে নিয়ন্ত্রিত হয় তা গভীরভাবে পর্যালােচনা করা হয়েছে। তিনি বলেছেন যে, রাজপদ যে রাজবংশের পুরুষ আত্মীয়দের মধ্যে জেষ্ঠতম ব্যক্তির কাছে চলে যায় তা যথার্থ অর্থে সত্য নয়।

তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলার তৎকালীন সহকারী কমিশনার লেফটেনান্ট গর্ডনের একটা চিঠির উল্লেখ করে বলেছেন যে, বােমং রাজপদে উত্তরাধিকারী মনােনয়নে বংশধারার অগ্রাধিকার প্রদানের চেয়ে যােগ্যতা এবং বয়স এর মানদন্ডে পরিচালিত হয়।

তিনি আরও উল্লেখ করেছেন যে, গভর্ণর এবং তাঁর মন্ত্রীসভা এই নীতি অনুসরণ করেই বর্তমান বােমাং রাজার উত্তরাধিকার অনুমােদন করেছেন। গভর্ণর মনে করেন যে, রাজপদে উত্তরাধিকার নিয়ে ভবিষ্যতে এরূপ বিরােধ উদ্ভব হলে তা নিষ্পত্তির জন্য এই নীতিই অনুসরণ করতে হবে।১৮

মং শােয়ে চৌধুরী এবং অং শােয়ে প্রু চৌধুরীর বিরােধ মামলা

১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে ১৩ তম বােমাং রাজা ক্যজ সান প্রু চৌধুরী মারা গেলে চট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনার ১৪ তম বােমাং রাজা হিসাবে মং শােয়ে প্রু চৌধুরীর নাম সুপারিশ করে তাকে নিয়ােগ দানের জন্য পূর্ব পাকিস্তান সরকারের কাছে ১৮ই জুলাই তারিখে চিঠি লিখেন।

পূর্ব পাকিস্তানের গভর্ণর আগস্ট ২৭, ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দ তারিখে মং শাে চৌধুরীর রাজপদে মনােনয়ন অনুমােদন এবং রাজা হিসাবে তাকে স্বীকৃতি প্রদান করেন।

পরবর্তী বােমাং রাজা অং শােয়ে প্রু চৌধুরী ও মং শােয়ে প্রু চৌধুরীর সাথে বােমাং রাজপদের একজন দাবীদার ছিলেন। তারা সম্পর্কে মামা ভাগিনা হন। বয়ােজেষ্ঠ এবং যােগ্যতম প্রার্থী হিসাবে সরকার মং শােয়ে চৌধুরীর মনােনয়ন অনুমােদন করেছিলেন।

অং শােয়ে প্রু চৌধুরী সরকারের সে মনােনয়নের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে মামলা দায়ের করেন। উচ্চ আদালত শেষ পর্যন্ত সরকারের অনুমােদন বৈধ ঘােষণা করলে বােমাং রাজপদের উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিরােধ তখনকার মত সেখানেই নিষ্পত্তি হয়ে যায়।

অং শােয়ে প্রু চৌধুরী এবং ক্য সাইন প্রু চৌধুরীর মধ্যে রাজপদ নিয়ে বিরােধ১৯

১৪ তম বােমং রাজা মং শােয়ে প্রু চৌধুরী ১৬ জুন, ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দ তারিখে মারা যান। এতে বােমাং রাজপদ খালি হয়। বাংলাদেশ সরকার ৪ নভেম্বর, ১৯৯৬ খিষ্টাব্দে তারিখের প্রজ্ঞাপন নং সেপ সা: আইন- ৩২/৯৫/০৫ মূলে ক্য সাইন প্রু চৌধুরীকে ১৫ তম বােমাং রাজা হিসাবে। স্বীকৃতি প্রদান করেন, যা ২১, নভেম্বর, ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে সরকারী গেজেট প্রজ্ঞাপন আকারে প্রকাশিত হয়েছে।

নবম বােমাং রাজার প্রপৌত্র এবং ১১ তম রাজার ভাতিজা অং শােয়ে প্রু চৌধুরী রাজপরিবারের জীবিত সদস্যদের মধ্যে বয়জেষ্ঠ এবং শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ ব্যক্তি হিসাবে বােমাং রাজপদে নিজেকে যােগ্যতম প্রার্থী দাবী করে সরকারের উল্লিখিত প্রজ্ঞাপন বাতিলের জন্য বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে একটি রীট মামলা দায়ের করেন, যাতে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে প্রতি রুল জারি করা হয়।

এই মামলায় সরকার পক্ষে ৩ জন এবং সরকারী স্বীকৃতি প্রাপ্ত রাজা ক্য সাইন প্রু চৌধুরী ৪ নং প্রতিপক্ষ হিসাবে আদালতে লিখিত আপত্তি (হলফ নাম) দাখিল করেন। ১ থেকে ৩ নং প্রতিপক্ষের আপত্তি একই রকম।

তাদের বক্তব্য হল ৪ নং প্রতিপক্ষ (ক্য সাইন প্রু চৌধুরী) ১১ তম রাজা থেকে শুরু করে ধারাবাহিকভাবে (পুরুষদের মধ্যে) রাজ পরিবারের সরাসরি বংশধর হন। তিনি ১৩ তম রাজার পুত্র এবং ১২৪তম রাজা (পৈত্রিক সূত্রে) তার চাচা। তিনি তার প্রয়াত পিতা ১৩ তম রাজার সাথে বােমাং রাজার দায়িত্ব সম্পর্কে সুপরিচিত।

অন্যদিকে, বােমাং রাজ পরিবারের দুরবর্তী বংশধর হিসাবে বােমাং সার্কেলের প্রশাসন সম্বন্ধে টিকারী অবহিত নন। অধিকন্তু মুক্তিযুদ্ধের সময় শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান এবং মালেক মন্ত্রী সভার সদস্য হিসাবে দুর্নামের ভাগীদার হয়েছেন।

১ ও ৩ নং প্রতিপক্ষের আপত্তিতে (Affidavit-in- Opposition) আরও বলা হয়েছে যে কেবল বয়সই রাজা হিসাবে স্বীকৃতি লাভের একমাত্র মানদন্ড নয়। বরং যােগ্যতা, গুণাবলী এবং সর্বোপরি উপজাতীয়দের কাছে গ্রহণযােগ্যতা এবং রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ইত্যাদি হল রাজপদ লাভের যােগ্যতা নির্ধারণী মাপকাঠি। এসব বিষয়গুলাে বিবেচনায় ৪ নং প্রতিপক্ষই হচ্ছে সেরা বাছাই।

৪ নং প্রতিপক্ষ তার লিখিত আপত্তিতে অনেকটা ১-৩ নং প্রতিপক্ষের আপত্তিগুলাের অনুসরণে বলেছেন যে তার নিজের এবং রীটকারীর যােগ্যতা, বয়স এবং গ্রহণযােগ্যতা তুলনামূলকভাবে যাচাই করেই সরকার তার নিয়ােগ এবং রাজা হিসাবে তাকে স্বীকৃতি প্রদান করেছেন।

তিনি আরও বলেছেন যে, রীটকারী রাজা হিসাবে নিয়ােগ লাভের যােগ্য নন। অন্যদিকে, রাজপরিবারের সদস্যরা তার (৪ নং প্রতিপক্ষ) নিয়ােগ এবং স্বীকৃতির পক্ষে সমর্থন ব্যক্ত করেছেন। রীটকারী ৮১ বছরের একজন বৃদ্ধ। এমনকি ১৪ তম রাজা থেকেও বয়জেষ্ঠ। অথচ বােমাং রাজবংশের ৩০০ বছরের ইতিহাসে ৭০ বছরের উর্দ্ধ বয়সী এমন কাউকে এ যাবত বােমাং রাজা নিয়ােগ দেয়া হয়নি।

রীটকারী অং শােয়ে প্রু চৌধুরী ৪ নং প্রতিপক্ষের আপত্তির (Affidavit-in-Opposition) বিরুদ্ধে। একটি প্রতি উত্তর/ আপত্তি (Affidavit-in-Reply) দাখিল করেন। তিনি তার প্রতি উত্তরে চট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনার কর্তৃক রাজা হিসাবে তার নাম প্রস্তাব ও তাকে স্বীকৃতি প্রদানের সুপারিশ সম্বলিত ১৯-৭-১৯৯৬ খ্রিঃ তারিখের একটি পত্র দাখিল করে ১৪তম রাজা থেকে বয়ােজেষ্ঠতার কথা অস্বীকার করেছেন।

হাইকোর্ট বিভাগের রায়

রীটকারী এবং প্রতিপক্ষগণের বক্তব্য বিচার বিশ্লেষণ করে আদালত এই মত ব্যক্ত করেন যে, বােমাং রাজপদ কোন সরকারী পদ নয়। বরং একটি রাজনৈতিক পদ। সরকার যােগ্যতা এবং বয়স বিবেচনায় রাজ পরিবারের সদস্যদের মধ্য থেকে একজনকে শুধু মনােনয়ন এবং স্বীকৃতি দিয়ে থাকেন। যােগ্যতার কোথাও সংজ্ঞা দেয়া হয়নি। যােগ্যতা বলতে শারীরিক না মানসিক যােগ্যতা অথবা শিক্ষাগত যােগ্যতা অথবা ক্ষমতাসীন রাজ পরিবারের সদস্যদের অথবা উপজাতীয় জনগণ অথবা সরকারের গ্রহণযােগ্যতা, সরকারের উপরােক্ত নীতিগত সিদ্ধান্তে কোন উল্লেখ নেই।

যােগ্যতা এবং বয়সকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, সেহেতু যােগ্যতার অভাবে পুরুষদের মধ্যে। জেষ্ঠতম সদস্য ও রাজপদের দাবীদার হতে পারে না। রীটকারী সেই কারণে বােমাং রাজপদের উত্তরাধিকারী হতে পারেন না। আদালতের কাছে এটা পরিস্কার যে, বােমাং রাজপদে মনােনয়ন ও স্বীকৃতি লাভের জন্য দাবীদারের উপযুক্ততা ও একটি মাপকাঠি।

আদালত বলেছেন যে, যেহেতু যােগ্যতা/ উপযুক্ততার কোন দিক নির্দেশনা নেই এবং যেহেতু ডেপুটি কমিশনার এবং বিভাগীয় কমিশনার উভয়ের প্রতিবেদন বিবেচনা করে রাজপরিবারের পুরুষ সদ্যসদের মধে ৪ নং প্রতিপক্ষকে সরকার প্রশাসনিক, রাজনৈতিক কারণে যােগ্য দাবীদার হিসাবে বেছে নিয়েছেন সেহেতু আদালত রীটকারীর বিজ্ঞ এডভােকেটের বক্তব্যে কোন সারবত্তা খুঁজে পাননি।

তাই তারা বিরােধীয় আদেশের উপর হস্তক্ষেপ করার মত বেআইনী কোন কিছু খুঁজে পাননি। অর্থাৎ রীট মামলাটি খারিজ করে দেওয়া হয়েছে। বিচারপতি কাজী এবাদুল হক এবং বিচারপতি আমিরুল কবির চৌধুরী সমন্বয়ে গঠিত দুই সদস্য বিশিষ্ট হাইকোর্ট বেঞ্চ ১২, জানুয়ারি ১৯৯৭ খ্রিঃ তারিখে উপরােক্ত রায় প্রদান করেন। এর ফলে ক্য সাইন প্রু চৌধুরীর নিয়ােগ বহাল থাকে।২০

হাইকোর্ট বিভাগের রায়ের বিরুদ্ধে আপীল দায়ের

রীটকারী অং শােয়ে প্রু চৌধুরী হাইকোর্ট বিভাগের উক্ত রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রীম কোর্টের আপীল বিভাগে আপীল দায়ের করেন। এতে সিভিল আপীল নং ০৮/৯৭ এর উদ্ভব হয়। প্রধান। বিচারপতি এটিএম আফজল এর নেতৃত্বে আপীল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ (৫ সদস্য বিশিষ্ট) শুনানীতে উপস্থিত ছিলেন।

জেষ্ঠ আইনজীবি খােন্দকার মাহাবুবুদ্দিন আহম্মদ (এস. এম. মনির এডভােকেট সহ) আপীলকারীর পক্ষে এবং ড. কামাল হােসেন প্রতিপক্ষ ক্য সাইন প্রু চৌধুরীর পক্ষে মামলা পরিচালনা করেছেন। এখানে উল্লেখ্য যে রীট মামলার ৪ নং প্রতিপক্ষ ক্য সাইন প্রু চৌধুরীকে আপীল মামলার ১ নং প্রতিপক্ষ করা হয়েছে (আইন/ বিধান মতে)।

আপীলকারী অং শােয়ে প্রু চৌধুরী তার রীট মামলায় (পিটিশনে) যা কিছু বলেছেন, আপীল মামলায় ও ঘুরে ফিরে সেই কথাগুলােই আদালতে বলেছেন। অন্যদিকে রীট মামলার ১ নং প্রতিপক্ষ বিশেষ কার্যাদি বিভাগের সেক্রেটারীর মাধ্যমে (আপীল মালার ২ নং প্রতিপক্ষ) রীট মামলার ৩ নং প্রতিপক্ষ (আপীল মামলার ৩ নং প্রতিপক্ষ) চট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনার ও রীট ৪ নং মামলার প্রতিপক্ষ ক্যসাইন প্রু চৌধুরী প্রত্যেকে আলাদা আলাদাভাবে আপীলের বিরুদ্ধে লিখিত আপত্তি (Affidavit-in-Opposition) আদালতে দাখিল করেছেন। তারা সবাই বাট মামলার বক্তব্যই আপীল মামলায় উপস্থাপন করেছেন।

রীটকারী আপীলান্ট আপীল মামলার ১ নং প্রতিপক্ষ ক্য সাইন প্রু চৌধুরী আপত্তির (Affidavit-in-opposition) সমুদয় বিষয় অস্বীকারে একটি প্রতিউত্তর/ প্রতিআপত্তি (Affidavit-in-reply) আদালতে দাখিল করেছেন। তিনি আরও বলেছেন যে, ১ নং প্রতিপক্ষকে বোমাং রাজা হিসাবে স্বীকৃতি দান সরকারের একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, আইনী সিদ্ধান্ত নয়।

আপিলান্ট যে ১৪তম বাজার চেয়ে কয়েকদিনের বড় ১নং প্রতিপক্ষের এতদসংক্রান্ত উক্তি সঠিক নয়। বরং আপীলকারীর চেয়ে বয়সে বড় (জেষ্ঠ) হওয়ার যুক্তিতে মং শােয়ে প্রু চৌধুরীকে ১৪ তম রাজা হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

আদালতের পর্যবেক্ষণ :

১) আদালত মনে করেন যে, পারিবারিক/ রক্ত সম্পর্কের চেয়ে বরং যােগ্যতা এবং বয়সই যে বােমাং রাজপদে উত্তরাধিকার লাভের মাপকাঠি বাংলার ভারপ্রাপ্ত মুখ্য সচিব জে. এইচ. কার আই. সি. এস. এর ২২ ফেব্রুয়ারি, ১৯১৭ খ্রিঃ তারিখে ঘােষিত নীতি অদ্যাবধি বহাল আছে। অনুসরণযােগ্য এই (নীতি) থেকে বিচ্যুতি সরকার নিজেই সংশােধন করেছেন।

১৩ নং বােমাং রাজা ক্য জ সান প্রু চৌধুরীর মৃত্যুর পর পূর্বে পাকিস্তান সরকারের ১৫ আগস্ট, ১৯৫৯ খ্রিঃ তারিখের সিদ্ধান্ত নং ৬৬০৫ পোল মূলে প্রয়াত রাজার ইচ্ছার প্রতি সম্মানস্বরূপ এবং চট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনারের ১৮ জুলাই, ১৯৫৯ খ্রিঃ তারিখের পত্র নং- ৯২৪/ সি এর সুপারিশ অনুযায়ী মং শােয়ে প্রু চৌধুরীকে বােমাং রাজা নিয়ােগ এবং স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

সরকার ৬৬০৫-পেপাল নং সিদ্ধান্ত ২৭ আগস্ট, ১৯৫৯ খ্রিঃ তারিখের সিদ্ধান্তমূলে চট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনারের ১৫ আগস্ট, ১৯৫৯ খ্রিঃ তারিখের ৯২৪/ সি প্রজ্ঞাপন নং- ৬৮৮৫-পােল দ্বারা সংশােধন করে যােগ্যতা এবং বয়স বিবেচনায় মংশােয়ে প্রু চৌধুরীকে বােমাং রাজা হিসাবে আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়ােগ এবং স্বীকৃতি দানের সুপারিশ করা হয়। কারণ রাজপদের দাবীদারদের মধ্যে তিনি সবচেয়ে উপযুক্ত।

২) গভর্ণর কমিশনারের সুপারিশ গ্রহণ করে বােমং রাজা হিসাবে তার উত্তরাধিকার এবং পদমর্যাদা অনুমােদন করেছেন। এর ফলে ১৫ আগস্ট ১৯৫৯ খ্রিঃ তারিখের ৬৬০৫ পােল নং- বিভাগীয় সিদ্ধান্ত বাতিল হয়ে যায় এবং সংশােধিত প্রজ্ঞাপন দ্বারা মি: জে. এইচ. কার, আই.সি. এস কর্তৃক ঘােষিত ঐতিহ্যবাহী বােমাং প্রথা/রীতির প্রতি পূর্ণ স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছে।

৩) বােমং রাজাপদের একাধিক দাবীদার থাকতে পারে। তখনই প্রতিদ্বন্দ্বী দাবীদারদের মধ্য থেকে একজনকে বাছাই করার প্রশ্ন উঠবে। এই নির্বাচন/বাছাই এর দায়িত্ব ক্ষমতা সরকারের উপর ন্যস্ত। ২৭ আগস্ট, ১৯৫৯ খ্রিঃ তারিখের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমেই পূর্ববর্তী বােমাং রাজা দাবীদারদের মধ্যে যােগ্যতম হিসাবে নিয়ােগ এবং স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।

৪) আদালত এই বিষয়ে সর্বোতভাবে একমত যে বিদায়ী রাজা কর্তৃক তার উত্তরসূরী মনােনয়ন, বিভিন্ন দল কর্তৃক কোন একজন দাবীদারের পক্ষে সমর্থন অথবা বিরােধীতা সরকারের কাছে কোন গুরুত্ব বহন করে না।।

৫) পক্ষগণের মধ্যে মূল বিরােধীয় বিষয় হল ‘বয়স’, ‘যােগ্যতা’ এবং সবেচেয়ে উপযুক্ত শব্দাবলীর ব্যাখ্যা নিয়ে। এ্যাড. খােন্দকার মাহাবুবুদ্দিন আহম্মদের মতে ‘বয়স’ অর্থ হল বয়সে জেষ্ঠতম। আবার এ্যাড. ড. কামাল হােসেনের মতে ৮২ বছর বয়স হল অতি দীর্ঘ সময়, যা অবসর জীবন যাপন এবং সাধনা করার বয়স। আদালত উভয় মতকে সঠিক বলে মনে করেন। আদালতের জানা মতে আপীলান্ট বয়সের ভারে তার দায়িত্ব পালনে শারীরিকভাবে এবং মানসিকভাবে অক্ষম এইরূপ কোন প্রতিকূল প্রতিবেদন সরকারের পক্ষ থেকে দাখিল করা হয়নি।

৬) ড. কামাল হােসেন মনে করেন ‘যােগ্যতা’ অফিসের/পদের জন্য যােগ্যতার সাথে সম্পর্কিত। এদের মধ্যে রয়েছে শিক্ষাগত যােগ্যতা, বয়স, বােমাং সার্কেলের কাজের অভিজ্ঞতা, স্থানীয় সমর্থন, সামর্থ্য, স্বাস্থ্যগত এবং বংশগত যােগ্যতা।

অন্যদিকে, খােন্দকার মাহাবুবুদ্দিন আহম্মদের মতে বােমাং রাজা একটি প্রথাগত অফিস যা বােমাং রাজ বংশের জেষ্ঠতম ব্যক্তির প্রাপ্য। বংশের অন্য কম বয়স্ক, যােগ্য, শিক্ষিত এবং সামর্থ্যবান দাবীদার আছেন, এই অজুহাতে তাকে সেই পদ থেকে বঞ্চিত করা যায়না। তবে বয়স এবং যােগ্যতা নামক দ্বৈত মানদন্ডে আপীলান্টের যে কোন ঘাটতি আছে আদালতের তা জানা নেই।

৭) খােন্দকার মাহাবুবুদ্দিন আহম্মদ হাইকোর্ট বিভাগের সিদ্ধান্তের সাথে সুর মিলিয়ে বলেছেন যে বােমাং রাজার অফিস/পদ একটি রাজনৈতিক পদ এবং যদি তাকে যােগ্য বিবেচনা করা না হয় তাহলে তাতে তার দাবী ক্ষতিগ্রস্থ হয়।

তার মতে বােমাং রাজপদটি একটি সরকারী পদ বিধায় এই পদে নিয়ােগ ও স্বীকৃতি রাজনৈতিক প্রশাসনিক বিবেচনার উপর ভিত্তি করেই দেওয়া হয়। আদালত মনে করেন যে তার। এই বক্তব্য বােমাং রাজা মনােনয়নে একটি নূতন মানদন্ডের প্রবর্তন করেছে যা বােমাং প্রথাগত আইনের পরিপন্থী ( নিজস্ব নহে)।

৮) বােমাং রাজপদ যে রাজনৈতিক পদ আদালত তা অতীতে কোথাও খুঁজে পাননি।আদালত মনে করেন যে, বােমাং রাজপদ একটি প্রথাগত পদ এবং তা সরকারও আদালত উভয়কে স্বীকার করতে হবে এবং অন্য কোন মানদন্ড অথবা উপাদান প্রবর্তন করবেন না, যা পদটির প্রথাগত প্রয়োজনকে ভারাক্রান্ত করবে।

আদালত আরো মনে করেন যে হাইকোর্ট বিভাগ বোমাং রাজপদবে একটি রাজনৈতিক প্রশাসনিক বিবেচনায় সরকার দারীদারকে মনোনয়ন দেন, – এই মত পোষণ করে স্পষ্টতই ভুল করেছেন।

৯) আদালত মনে করেন যে, বােমাং রাজপদ নির্বাচনের মাধমে পূরণযােগ্য কোন পদ নয়। বর্তমান-বিরােধে দাবীদারগণের পক্ষে কিংবা বিপক্ষে ভােটের মাধ্যমে কোন সমর্থন ব্যক্ত করা হয়নি। শুধু ব্যক্তিগত পত্রের মাধ্যমে তা করা হয়েছে। তাই কোন ব্যক্তি বা অন্য কারও সমর্থন বােমাং রাজা মনােনয়ন/নির্বাচনে মানদন্ড নয়।

১০) বােমাং রাজা মনােনয়ন/ বাছাই নিঃসন্দেহে নির্বাহী বিভাগের একটি বাছাই/মনােনয়ন। বিচার বিভাগ নির্বাহী বিভাগের মনােনয়নের স্থলে নিজস্ব কোন প্রার্থী বাছাই করবেনা। কারণ বােমাং রাজা মনােনয়ন/ বাছাই করা বিচার বিভাগের কাজ নয়। বােমাং রাজা মনােনয়ন/বাছাই এতে ঐতিহ্য, প্রথা এবং যে রীতিনীতি অনুসরণীয় তা অনুসরণ করা হয়েছে কিনা, আদালত কেবল তা পরীক্ষা করবে। যদি তাই করা হয়ে থাকে তাহলে আদালত তাতে হস্তক্ষেপ করবেনা।

যদি দেখা যায় যে, রাজা মনােনয়নে নির্বাহী বিভাগের সিদ্ধান্ত বাহ্যিক (নিজস্ব নহে এমন) কোন বিষয় বিবেচনার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে, তাহলে তা ক্ষমতা বহির্ভূতভাবে মনােনয়ন/ বাছাকরা হয়েছে মর্মে ঘােষণা করার ক্ষমতা আদালত অব্যশই রাখে। কারণ সরকারও একথা অস্বীকার করবে না যে উপজাতীয়দের সংবেদনশীলতাকে অবহেলা/ অবজ্ঞা করা উচিত নয়।

আদালতের আদেশঃ

উপযুক্ত কারণে আদালত মনে করে যে, প্রতিপক্ষগণ বােমাং রাজা বাছাই/মনােনয়নে সঠিক এবং প্রাসঙ্গিক পদ্ধতি অনুসরণ করেননি। তারা বাহ্যিক বিষয়াদি বিবেচনা করেছেন, যা নিয়ােগ এবং স্বীকৃতিদানকে ত্রুটিপূর্ণ/ অকার্যকর করেছে। তাই আপীল মঞ্জুর করা হল।২১

উপসংহারঃ

কং হ্লা প্রু চৌধুরীর পুত্রগণের মধ্যে ১৮৪৭ খ্রিস্টাব্দে সম্পাদিত আপােষ চুক্তিনামা, (Solenama) ভারপ্রাপ্ত মুখ্য সচিব মিঃ জে. এইচ. কার আই. সি. এস. এর ২২ ফেব্রুয়ারি, ১৯১৭ খ্রিঃ তারিখের পত্রে, ১৪ তম রাজার পদ নিয়ে মিঃ মং শোয়ে প্রু চৌধুরী এবং মিঃ অং শোয়ে প্রু চৌধুরীর বিরােধ এবং ১৫তম রাজার পদ নিয়ে মিঃ অং শােয়ে চৌধুরী এবং মিঃ ক্য সাইন প্রু চৌধুরীর মধ্যে বিরােধ এবং সুপ্রীম কোর্ট পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা (মামলা) ইত্যাদি ঘটনাগুলাে প্রমাণ করে যে, রাজপদে জেষ্ঠপুত্রের একক এবং অপ্রতিরােধ্য দাবী (প্রথা) রাজ বংশের নিকট আত্মীয়দের মধ্যে বার বার বিরােধ সৃষ্টির কারণে পাকাপােক্ত ঐতিহ্যের রূপ লাভ করতে পারেনি।

কারণ রাজপদ নিয়ে সৃষ্ট বিরােধে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। কেন্দ্রীয় শক্তিকে বার বার হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। উদ্বর্তন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত সব সময় যে সঠিক হবে তা নিশ্চয়ই আশা করা যায়না এবং বাস্তবে তা হয়ও নি, যে কারণে কোন কোন সময় আদালতকেই হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে।

তাই এখন উর্দ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে আদালতের সিদ্ধান্তে রাজা মনােনয়ন/বাছাই এর একটা এতিহ্যে পরিণত হয়েছে।

তথ্যসূত্র :

১। Gazeteer of the Chittagong Hill Tracts District- R.H. S Hutchinson, 1978 (Reprinted)
২। প্রাচীন আরাকানে রােয়াইঙ্গ্যা ও হিন্দু, বড়য়া বৌদ্ধ অধিবাসী- আব্দুল হক চৌধুরী ১৯৯৪ খ্রি:
৩। প্রাগুক্ত (ক্রমিক নং ১)।
৪। প্রাগুক্ত (ক্রমিক নং ০২)।
৫। প্রাগুক্ত (ক্রমিক নং ০১)।
৬। প্রাগুক্ত (ক্রমিক নং ০২)।
৭। প্রাগুক্ত (ক্রমিক নং ০২)।
৮। প্রাগুক্ত (ক্রমিক নং ০২)।
৯। প্রাগুক্ত (ক্রমিক নং ০১)।
১০। প্রাক (ক্রমিক নং ০১)।
১১। প্রাগুক্ত (ক্রমিক নং ০১)।
১২। Francis Buchanan in South East Bengal (1798) .
১৩। Selections from the correspondence on the Revenue Administration of the Chittagong Hill Tracts, 1962-1927.
১৪। Solenama, dated 9, August 1847 (Printed in Selections from the correspondence on the Revenue Administration of the Chittagong Hill Tracts)
১৫। প্রাগুক্ত (ক্রমিক নং ১৩)।
১৬। No. 49 B, dated Bandarban, the 15th June, 1916 From Mong Cha Ngao, Officiating Bohman Chief, Bandarban (Printed in Selections from the correspondence on the Revenue Administration of the Chittagong Hill Tracts:
১৭। Selections from the correspondence on the Revenue Administration of the Chittagong Hill Tracts, 1862-1927.
১৮। I bid.
১৯। I WRIT PETITION NO 5101 of 1996. as reported in Dhaka Law Reports, Vol No-XZLX (1997)
২০। I bid.
২১ Civil Appeal No-8 of 1997 as reported in Dhaka Law Reports, Vol-L(1998).

লেখকঃ জ্ঞানেন্দু বিকাশ চাকমা।

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - [email protected] এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা

Jumjournal

Administrator