বন, পাহাড়, পরিবেশ এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠী

0
197

সারাবিশ্বের পরিবেশ বর্তমানে বিপর্যয়ের মুখে। এই বিপর্যয়ের প্রাথমিক ও প্রধানতম শিকার হচ্ছে আদিবাসী জনগোষ্ঠী। প্রকৃতি ধ্বংসের মুখে তাদের সহজাত জীবনযাত্রা ভেঙ্গে পড়ছে। আদিবাসীদের অস্তিত্ত্ব, সংস্কৃতি, জীবিকা, সমাজ সবকিছু চুরমার হয়ে পড়ছে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এই বিপর্যের প্রাথমিক শিকার আদিবাসী জনগোষ্ঠী হলেও চূড়ান্ত আঘাত হানবে সমগ্র মানব জাতিকে। গত ২২ অক্টোবর ২০০৭ ওয়ার্ল্ডওয়াচ ইনষ্টিটিউট কর্তৃক ঢাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঢাকাসহ বিশ্বের ২১টি শহরকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই এখন বিশ্বে ছোট-বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘন ঘন ঘটছে। এর ফলে মানুষের দুর্ভোগও বাড়ছে, অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়।

এই সভ্যতা বিধ্বংসী বিপর্যয়ের পেছনে অন্যতম কারণ হচ্ছে পরিবেশ-বান্ধব উন্নয়নের পরিবর্তে সকল ক্ষেত্রে পরিবেশ-বিধ্বংসী উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহণ। উন্নয়ন কার্যক্রমে প্রাকৃতিক সম্পদের স্থায়ীত্বশীল ব্যবহারের অভাব। বস্তুতঃ আদিবাসী জনগোষ্ঠীসমূহ বংশ পরম্পরায় লব্ধ ঐতিহ্যগত  জ্ঞানের মাধ্যমে প্রাকৃতিক সম্পদের স্থায়ীত্বশীল ব্যবহার করে আসছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আদিবাসীরা তাদের ঐতিহ্যগত জ্ঞানের মাধ্যমে একাধারে জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ রক্ষা করে এসেছে এবং তাদের জীবন জীবিকা নির্বাহ করে এসেছে। কিন্তু আধুনিক উন্নয়ন কৌশলে আদিবাসী জ্ঞানের স্বীকৃতি বা প্রয়োগ নেই। ফলে বিশ্বের জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশ দ্রুত ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ছে। যে উন্নয়ন কার্যক্রম জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার উপর বিরুপ প্রভাব ফেলে সেই উন্নয়ন পরিকল্পনা কখনই স্থায়ীত্বশীল হতে পারে না তা বিগত কয়েক দশকে দেশে দেশে উন্নয়ন কার্যক্রম পর্যালোচনা করলে সহজে প্রমাণিত হয়।

উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে ১৯৬০ সালে শিল্পায়নের নামে বাস্তবায়িত কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। এই প্রকল্পের ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের এক লক্ষাধিক মানুষ উদ্বাস্তু হয়। এই অঞ্চলের প্রথম শ্রেণীর ৫৪% জমিসহ প্রায় ৩৫০ বর্গমাইল এলাকা হ্রদের পানিতে তলিয়ে যায়। এই জনপদের জনমানুষের জীবনযাত্রা সম্পূর্ণরূপে ভেঙ্গে পড়ে। তাদের অর্থনৈতিক মেরুদন্ড পঙ্গু হয়ে পড়ে। অধিকতর নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ৬০ হাজার মানুষ প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত ও বার্মায় পাড়ি জমায়। এই প্রকল্প থেকে হয়তো সাময়িক সুফল পাওয়া গেছে। বিদ্যুৎ পাওয়া গেছে এবং শিল্পায়নে সহায়ক ভূমিকা অর্জিত হয়েছে। কিন্তু জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশেরই উপর সুদূর প্রসারী বিরুপ প্রভাব পড়েছে। এই ধরণের উন্নয়ন কার্যক্রম কখনই স্থায়িত্বশীল হতে পারে না। তাই বর্তমানে বিশ্বের দেশে দেশে জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও প্রাকৃতিক সম্পদের স্থায়িত্বশীল ব্যবহারের উপর গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে। আর এক্ষেত্রে উন্নয়ন কার্যক্রমের লাগসই কর্মকৌশল হিসেবে আদিবাসী জ্ঞান ব্যবস্থাকে কাজে লাগানোর ও স্বীকৃতি প্রদানের প্রয়াস শুরু হয়েছে।

আদিবাসী জনগোষ্ঠীসমূহ বন ও বনজ সম্পদকে ব্যবহার করে অত্যন্ত সংযমের সাথে ও পরিমিতভাবে। কারণ তারা মনে করে বন তাদের মৌলিক চাহিদা যেমন – খাদ্য, আশ্রয়, পানি, ঔষধ, জ্বালানী এবং বস্ত্র জোগায়। আদিবাসীরা বনকেও মনে করে মাতা বা পিতা হিসেবে এবং সেজন্য বনকে দেবতা বা ঈশ্বর জ্ঞান করে এর পবিত্রতা রক্ষা করে। আদিবাসীরা বিশ্বাস করে যে, প্রাকৃতিক জগৎ ও আধ্যাত্মিকতা পরষ্পর সম্পর্কযুক্ত ও সংহত। সকল মানুষের সমৃদ্ধি ও পরিবেশ পরস্পর অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই পরিবেশকে ধ্বংস করার অর্থ মানব সভ্যতাকে ধীরে ধীরে গলা টিপে হত্যা করা।

জুম চাষ ও পরিবেশ

আদিবাসী জনগণ বংশ পরম্পরায় স্মরণাতীত কাল থেকে জুমচাষ করে আসছে। তারা ঐতিহ্যগতভাবে জীবিকা নির্বাহের জন্য জুম চাষের উপর নির্ভরশীল। পাহাড়ে ঢালু জায়গায় জঙ্গল পরিষ্কার করে আগুনে পুড়ে এই চাষ করা হয়। ধানসহ একসঙ্গে অনেক ফসলাদি চাষ করা হয় এতে। বাংলাদেশ ও উত্তর-পূর্ব ভারতে জুমচাষ নামে পরিচিত। জুমচাষ প্রক্রিয়ায় শীতের মধ্যে বা শেষ ভাগে বৃহৎ গাছগুলো বাদে জঙ্গল পরিষ্কার করা হয়। কাটা ঝোপঝাড়কে বসন্তে আগুন লাগিয়ে পোড়ানো হয়। উৎপন্ন ছাই সার হিসেবে কাজ করে। মৌসুমী বৃষ্টির শুরুতেই ভূমিতে ছোট ছোট গর্ত করে ধান, তুলা, যব, তিল এবং অন্যান্য ফল ও সবজির বীজ একত্রে বপন করা হয়। ফসল ভেদে শস্য সংগ্রহের সময় হয় ভিন্ন ভিন্ন। ভূমি সংরক্ষণের জন্য কেবল ছোট ছোট গর্ত করা হয়। কখনোই জমি কোপানো হয় না।

Preparation for Jum by Niswi Mong Marma
জুম চাষের প্রস্তুতি, ছবি: নিশৈমং মারমা

বনবিভাগের মতে এই জুমচাষ পদ্ধতি পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। কিন্তু আদিবাসীদের মতে প্রথাগত জুমচাষ পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর নয়। জঙ্গল পরিষ্কার করা হলেও বড় বড় গাছ কাটা হয় না। ফলে এতে বন উজার হয় না। সাধারণতঃ ১০ থেকে ১৫ বছর বিরতি দিয়ে একটা জায়গায় জুম চাষ করা হয়। বর্তমানে জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও বন সংকোচনের ফলে ৫ থেকে ১০ বছরের বিরতি দিয়ে জুমচাষ করা হচ্ছে। এই বিরতির ফলে কর্তিত জমিতে সহজে গাছপালা জন্মাতে পারে। পরিত্যক্ত জমিকে চাকমা ভাষায় বলা হয় ‘রান্যা’। রান্যায় অনেক সবজি ও ফসল জন্মে এবং ধীরে ধীরে ঝোপঝাড় ও গাছ-গাছালি জন্মাতে থাকে। ফলে এ সময় পশু-পাখিরা এসে রান্যায় ভিড় জমায় খাদ্যের সন্ধানে। এতে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে সহায়ক হয়। বস্তুতঃ শত শত বছর ধরে আদিবাসীরা জুমচাষ করে আসলেও বনাঞ্চল ধ্বংস হয়নি। বনাঞ্চল ধ্বংসের প্রক্রিয়া শুরু হয় যখন থেকে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বনজ সম্পদ আহরণ শুরু হয়।

সরকারী বন ব্যবস্থাপনা এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠী

জাতিসংঘ বলছে যে, আদিবাসীদের জীবন-সংস্কৃতি ছিল বিশ্বের পরিবেশের জন্য ভারসাম্য ও বন্ধুত্বপূর্ণ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আদিবাসী জনগণ বিশ্ব পরিবেশকে সমৃদ্ধ করেছে। বন ও পাহাড়ের সাথে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর রয়েছে নিবিড় সম্পর্ক। আদিবাসীদের জীবন-জীবিকা, সংস্কৃতি, সমাজ, রীতিনীতি সবকিছু বন ও পাহাড়ের সাথে সম্পর্কযুক্ত। আদিবাসীরা শত শত বছর ধরে নিজস্ব সনাতনী পদ্ধতিতে স্থায়ীত্বশীল বন ব্যবস্থাপনা করে আসছে এবং জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ ভারসাম্য রক্ষা করে আসছে। কিন্তু বর্তমান জাতিরাষ্ট্রে তার কোন যথাযথ স্বীকৃতি নেই।

বন ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশে অনেক নীতিমালা রয়েছে। তার মধ্যে ১৯৭৯ সালে জাতীয় বননীতি যা ১৯৯৪ সালে সংশোধিত ও ফরেষ্ট্রি মাস্টার প্লান (১৯৯৪ – ২০১৩) অন্যতম। উপনিবেশিক আমলে প্রবর্তিত বননীতির সাথে ১৯৭৯ সালের বননীতির তেমন কোন মৌলিক পার্থক্য নেই। এই বননীতিতে মূলতঃ বন সংরক্ষণ ও তথাকথিত ‘বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা’ এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও পরিবেশ ভারসাম্যের জন্য বনজ সম্পদের যথাযথ আহরণের উপর জোর দেয়া হয়। এতে বনজ সম্পদ ব্যবস্থাপনায় বন-নির্ভর আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অংশীদারিত্বকে কোন গুরুত্বই প্রদান করা হয়নি।

বর্তমানে প্রচলিত বননীতি ১৯৯৪ সালে গৃহীত হয় এবং সরকারীভাবে ১৯৯৫ সালের ৩১ মে ঘোষণা করা হয়। এই নীতিমালা মোতাবেক এডিবি ও ইউএনডিপি’র ব্যবস্থাপনায় ২০ বছরব্যাপী বন মহাপরিকল্পনা প্রণীত হয়। জাতিসংঘের জীববৈচিত্র্য সম্মেলনের এজেন্ডা ২১-এর সাথে এই মহাপরিকল্পনা সমন্বয় সাধন করা হয় বলে দাবী করা হয়। দেশের মোট বনভূমির পরিমাণ বিভিন্ন পরিসংখ্যানে বিভিন্ন পরিমাণ উল্লেখ করা হয়। নিম্নবর্ণিত সারণী উল্লেখ্য –

উৎস সাল পরিমাণ (লাখ হেক্টর) দেশের মোট আয়তন
বন মহাপরিকল্পনা ১৯৯৩ ২৫.৬ ১৭.৮%
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ১৯৯৯ ২২.৫ ১৪.০%
বিশ্বব্যাংক ১৯৯৭ ১৪.৭ ১১.০%


ব্রিটিশ আমলের বন আইন ও নীতিমালায় আদিবাসীদের ঐতিহ্যগত বন ব্যবস্থাপনা স্বীকৃত হয়নি। বনবিভাগের হাতেই বন ব্যবস্থাপনা দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। বনবিভাগের কাজের ফলে দু’টি প্রভাব স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা গেছে তা হলো – (১) রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পাইকারী হারে বনজ সম্পদের বাণিজ্যক আহরণ এবং (২) বন ব্যবহার ও ব্যবস্থপনা থেকে বন-নির্ভর জনগোষ্ঠীগুলোকে ক্রমবর্ধমান হারে প্রান্তিকীকরণ। এই দুটো প্রভাবের ফলে ঔপনিবেশিক আমল থেকে বর্তমান পর্যন্ত দ্রুত বন উজার হতে থাকে এবং জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে।

১৯২৭ সালে বন আইনে বন-নির্ভর জনগোষ্ঠীর বনের উপর সমষ্টিগত অধিকারের সীমিত স্বীকৃতি রয়েছে। কিন্তু এই সমষ্টিক মালিকানাধীন বনভূমিকে ধীরে ধীরে রাজস্ব ভূমির আওতায় নিয়ে আসা হয় এবং সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ কায়েম করা হয়। এর ফলে এদেশে ধীরে ধীরে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রথাগত অধিকার ক্ষুন্ন হয় এবং বন সংরক্ষণে সমৃদ্ধ-ঐতিহ্য বিপন্ন হয়ে পড়ে।

১৯৭৯ সালে ও ১৯৯৪ সালে জাতীয় বননীতি প্রণীত হলেও এবং তদনুসারে ১৯৯৪ সালে জাতীয় বন মহাপরিকল্পনা ঘোষিত হলেও বন ব্যবস্থাপনায় বন-নির্ভর জনগোষ্ঠীর অংশীদারিত্বের কোন মৌলিক অগ্রগতি হয়নি। যদিও অনেক অংশীদারিত্বমূলক বনায়ন কর্মসূচী বাস্তবায়ন করা হয়, কিন্তু বনবিভাগ গ্রামীণ অধিবাসী বা বন-নির্ভর জনগোষ্ঠীকে সম্প্রসারিত সেবা প্রদানে ক্রমাগতভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দেয়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বন ও জীববৈচিত্র্য বিষয়ক বিভিন্ন ফোরামে সরকারের অংশগ্রহণ অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু সে অনুসারে জনমুখী ও জীববৈচিত্র্য-সহায়ক নীতিমালার কোন অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়নি।

বাংলাদেশের সংবিধানে ২৮ অনুচ্ছেদে ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, লিঙ্গ বা জন্মস্থানের কারণে বৈষম্য প্রদর্শনের উপর নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অন্যদিকে সংবিধানে অনগ্রসর বংশের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্যও রাষ্ট্রকে বলেছে। কিন্তু সরকারের ভূমি ও বন ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সমঅধিকার ও বৈষম্যহীনতার নীতি অনুসরণ করা তো হয়ই না, অধিকন্তু অনগ্রসর বংশ হিসেবে বন-নির্ভর আদিবাসীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থার কোন বিধান রাখা হয় নি। এই নীতিমালাগুলো কার্যত জেন্ডার ইস্যু ও আদিবাসী প্রেক্ষাপটগুলোকে পুরোপুরিভাবে উপেক্ষা করেছে। পক্ষান্তরে সংবিধানের সমঅধিকার ও বৈষম্যহীনতার ধারা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে প্রাকৃতিক সম্পদের উপর আদিবাসীদের প্রথাগত অধিকারকে সম্পূর্ণভাবে পদদলিত করা হয়েছে। যেমন – মধুপুরের ইকো পার্ক প্রকল্প, মৌলভীবাজারের ইকো পার্ক প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আদিবাসীদের প্রথাগত অধিকার উপেক্ষা করা হয়েছে।

দেশে আইন ও সংবিধানে লিঙ্গ ভিত্তিক বৈষম্যকে নিষেধ করা হয়েছে কিন্তু তা সরকারের প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা নীতিমালায় প্রতিফলিত হয় না। অনেক আদিবাসীর প্রাথমিক দায়িত্ব প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনার সাথে সরাসরি সংশ্লিষ্ট। নারীরা ঐতিহ্যগত ঔষধ ও খাদ্য-উৎস এবং প্রাকৃতিক সম্পদের বৈচিত্র্য সংরক্ষণে সাধারণতঃ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু আদিবাসী নারী প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও অন্যান্য সর্বসাধারণের ব্যবহার্য জলাশয় কমার কারণে অসংখ্য কষ্ট ভোগ করে। প্রাকৃতিক বন ধ্বংসের ফলে অনেক বৃক্ষ, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, স্বাস্থ্য ও আদিবাসী নারীর জ্ঞানভান্ডার হারিয়ে যায়।

পার্বত্য চট্টগ্রামের বনাঞ্চল ও আদিবাসী জনগোষ্ঠী

পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল বনজ সম্পদে সমৃদ্ধ একটি অঞ্চল। পার্বত্য চট্টগ্রামে ৪ (চার) ধরণের বনভূমি রয়েছে; যেমন – (১) সংরক্ষিত বন বা রিজার্ভ ফরেষ্ট যার পরিমাণ পার্বত্য চট্টগ্রামের মোট আয়তনের প্রায় এক-দশমাংশ; (২) রক্ষিত বন বা প্রটেকটেড ফরেষ্ট যার আয়তন এলাকার মোট আয়তনের এক শতাংশ এবং এর অধিকাংশই ইতিমধ্যে সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষিত হয়েছে; (৩) ব্যক্তি মালিকানাধীন বন যার বেশির ভাগ অংশই আদিবাসী কৃষকের মালিকানাধীন, তবে কিছু কিছু অস্থানীয় ব্যক্তি বা কোম্পানীর মালিকানাধীন এবং (৪) অশ্রেণীভূক্ত বন যেগুলো পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় বিস্তৃত।

ব্রিটিশ শাসকরা অধিকতর রাজস্ব আদায়ের জন্য এই অঞ্চলের এক-চতুর্থাংশ এলাকাকে সংরক্ষিত বন বা রিজার্ভ ফরেষ্ট হিসেবে ঘোষণা করে। এসব বনাঞ্চল ছিল গ্রীষ্মমন্ডলীয় চিরহরিৎ, আধা-চিরহরিৎ ও পত্রঝরা উদ্ভিদের বৃক্ষরাজির সমারোহ। ছিল জীববৈচিত্র্যের সমাহার। তবে ঊনবিংশ শতাব্দীর ৭০ (সত্তর) দশক থেকে ধীরে ধীরে এর বনজ সম্পদ ও জীববৈচিত্র্যের পরিবর্তন হতে থাকে। সরকার সে সময় থেকে বার্মা থেকে আমদানীকৃত সেগুন গাছের একক বনবাগান গড়ে তুলতে শুরু করে। এর ফলে উদ্ভিদ এবং জীববৈচিত্র্যের দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। বন-নির্ভর আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা বাধাগ্রস্থ হয়ে পড়ে। বর্তমানে কেবলমাত্র ভারত সীমান্তবর্তী কাচালং সংরক্ষিত বনাঞ্চলে ও মায়ানমার সীমান্তবর্তী সাঙ্গু সংরক্ষিত বনাঞ্চলে বিভিন্ন প্রজাতি সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক বনের অবশিষ্ট রয়েছে। তাও নানা কারণে বর্তমানে উজাড় হয়ে যাচ্ছে।

এসব সংরক্ষিত বনাঞ্চলে আদিবাসীরা বংশ পরম্পরায় বসবাস করে আসছে। তারা এসব বনাঞ্চলে বসবাস করলেও ভূমি অধিকার থেকে বঞ্চিত। শুধু তাই নয়, সাধারণ নাগরিক হিসেবেও তারা তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত। এখানে সরকারের স্বাস্ব্যসেবা, শিক্ষা সুযোগ ও অন্যান্য সরকারী সুবিধা পৌঁছায় না। এসব এলাকায় কোন সরকারী স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়নি। স্কুল প্রতিষ্ঠার অন্যতম শর্ত হলো স্কুলের নিজস্ব জমি থাকতে হবে। তবেই সরকারী অনুমোদন বা অনুদান পাওয়া যাবে। কিন্তু রিজার্ভ এলাকা হওয়ায় স্কুলের নামে কোন জমি বন্দোবস্ত পাওয়া যায় না। এমনকি এসব এলাকায় আধিবাসীরা তাদের নিজস্ব প্রতিনিধি নির্বাচনের ভোটাধিকার থেকেও বঞ্চিত। ভূমি মালিকানা না থাকায় দীর্ঘমেয়াদী চাষাবাদ বা ভূমির বাণিজ্যিক ব্যবহার করতে পারেনা তারা।

সংরক্ষিত বনাঞ্চলে বসবাসকারী আদিবাসীরা নিজেরাই গ্রামের কার্বারী বা হেডম্যান মনোনীত করে। কোন কোন ক্ষেত্রে বনবিভাগ কার্বারী বা হেডম্যান নিয়োগে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। এসব কার্বারী-হেডম্যানরা বনবিভাগের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে বনবিভাগের কর্মকর্তারা তাদের উপর কর্তৃত্ব করে। ফলে তারা অনেকাংশে গ্রামবাসীর অধিকার বা স্বার্থ যথাযথভাবে রক্ষা করতে ব্যর্থ হন।

দেশে প্রচলিত আইন অনুসারে রিজার্ভ ফরেষ্টের মালিক হচ্ছে বনবিভাগ। কিন্তু বন-নির্ভর আদিবাসী জনগোষ্ঠীর রয়েছে ভিন্ন মত। তাদের মতে, বন কর্মকর্তাদের আগমনের অনেক আগে থেকে তাদের পূর্বপুরুষরা সেসব জমিতে চাষাবাদ করে আসছে। তারা অবাধে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে গিয়ে বসতি স্থাপন ও জুম চাষ করতো। সুতরাং এসব বনভূমিতে তাদের ঐতিহ্যগত সামাজিক স্বত্বাধিকার রয়েছে বলে আদিবাসীরা দাবী করে। উপরোক্ত সমস্যার কারণে ১৯৭৬ সালে একদল বিশেষজ্ঞ সুপারিশ প্রদান করেন যে, সংরক্ষিত বনাঞ্চলের কিছু এলাকা অসংরক্ষিত ঘোষণা করা হোক। কিন্তু সরকার তা গ্রহণ করেনি।

নতুন সংরক্ষিত বন ঘোষণা

বনবিভাগ পার্বত্য চট্টগ্রামের রক্ষিত ও অশ্রেণীভূক্ত বনাঞ্চলের ২,১৮,০০০ একর ভূমি রিজার্ভ ফরেষ্ট হিসেবে ঘোষণা করে। কেবলমাত্র বান্দরবান জেলায় ৭টি উপজেলায় ৩৫ টি মৌজায় ৯৪,০৬৭ একর সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এই পরিকল্পনাটি পার্বত্যাঞ্চলের বনের পরিধি বাড়ানোর ক্ষেত্রে উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা হলেও এতদাঞ্চলের বসবাসকারী আদিবাসীদের ভূমি অধিকার ও মানবাধিকারের ক্ষেত্রে একটি বড় হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এসব ভূমির মধ্যে প্রান্তিক কৃষকের রেকর্ডীয় বসতভিটা ও পাহাড় ভূমি, বন্দোবস্তী প্রক্রিয়াধীন কৃষিজমি এবং যৌথভাবে ব্যবহ্রত ঐতিহ্যগত বন ও চারণভূমি রয়েছে। এমনকি ১৯৬০ সালে কাপ্তাই বাঁধে ক্ষতিগ্রস্থদের নামে বনবিভাগের জুম নিয়ন্ত্রণ বিভাগ কর্তৃক উদ্যান চাষের জন্য বরাদ্দকৃত জমিও রয়েছে যেগুলো বন্দোবস্তী প্রক্রিয়াধীন।

অশ্রেণীভূক্ত বনাঞ্চলকে সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণার বিরুদ্ধে পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীরা তীব্র বিরোধীতা করে। উক্ত ঘোষণা বাতিলের দাবী নিয়ে ১৯৯৮ সালের আগষ্টে আদিবাসী জুম্ম নেতৃবৃন্দ তৎকালীন বন ও পরিবেশ মন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করেন। মন্ত্রী মহোদয় সেসব ঘোষণা স্থগিতকরণের প্রতিশ্রুতি দিলেও তা এখনও কার্যকর করা হয়নি। এই নতুন সংরক্ষিত বন ঘোষণার ফলে এতদঞ্চলে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর জীবনধারার উপর বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।

Jumghor by Nabangsu Chakma
জুমের পাহাড়ে জুমঘর, ছবি: নবাংশু চাকমা

মৌজা বন বা গ্রামীণ বন

পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রথাগত বন ব্যবস্থাপনার অন্যতম উদাহরণ হলো মৌজা বন বা গ্রামীণ বন। এগুলো সাধারণতঃ ৫০ থেকে ৩০০ একরের মধ্যে ছোট ছোট প্রাকৃতিক বন বা রক্ষিত বন। এগুলো মৌজা হেডম্যান বা গ্রামের কার্বারীর নেতৃত্বে মৌজাবাসী বা গ্রামবাসী সংরক্ষণ ও ব্যবহার করে থাকে। এই বন থেকে মৌজাবাসী বা গ্রামবাসী আলোচনা ও সম্মতি সাপেক্ষে গৃহস্থলির জন্য বনজ সম্পদ আহরণ ও ব্যবহার করতে পারে। ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধির ৪১(ক) ধারায় এই ধরণের বনের স্বীকৃতি রয়েছে। পরবর্তী সময়ে বিশেষ করে ব্রিটিশ আমলের শেষভাগে ও পাকিস্তান শাসনামলে জেলা প্রশাসন প্রদত্ত অনেক নির্বাহী আদেশে এসব বনের স্বীকৃতি মেলেনি। প্রণীত আইনগুলোতে এসব বনের অস্তিত্বকে স্বীকার করা হয়নি বা এসব বনের উপর জনগোষ্ঠীর প্রথাগত অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। ফলশ্রুতিতে এসব বনভূমিকে সরকারী উদ্যোগে ব্যক্তি নামে বন্দোবস্তী দেয়া শুরু হয়। তাই বর্তমানে এসব মৌজা বন বা গ্রাম বন বিলুপ্তির পথে। এখনো অনেক এলাকায় এ ধরনের মৌজা বন বা গ্রামীণ বন থাকলেও তা আগের তুলনায় অনেকটা হাতেগোনা কয়েকটি মাত্র।

রক্ষিত ও অশ্রেণীভূক্ত বনাঞ্চল এবং আদিবাসীদের অধিকার

পার্বত্য চট্টগ্রামে আরো রয়েছে রক্ষিত ও অশ্রেণীভূক্ত বনাঞ্চল। এযাবৎ এসব বনের মালিকানা জেলা প্রশাসকের রাজস্ব বিভাগের উপর অর্পিত। তবে বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন মোতাবেক সংরক্ষিত বন ব্যতীত রক্ষিত বনসহ অন্যান্য সকল বন পার্বত্য জেলা পরিষদের আওতাধীন বিষয়। কিন্তু এখনো পর্যন্ত উক্ত কার্যাবলী পার্বত্য জেলা পরিষদের নিকট স্থানান্তরিত হয়নি।

সংরক্ষিত বনাঞ্চল ব্যতীত অন্যান্য বনাঞ্চলগুলোকে এযাবৎ আদিবাসীরা জুমচাষ, গো-চারণ, বনজ সম্পদ আহরণ, কবরস্থান ও শ্মশানভূমি হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যতীত জনগণ এসব রক্ষিত বন ও অশ্রেণীভূক্ত বনাঞ্চলে প্রবেশ করতে পারে এবং নির্দষ্ট কিছু গাছের প্রজাতি ছাড়া বনজ সম্পদ আহরণ ও ব্যবহার করতে পারে। আদিবাসীরা এসব বনভূমিকে যৌথ সম্পত্তি হিসেবে বিবেচনা করে। আদিবাসীরা বংশ পরম্পরায় এসব বন প্রথাগতভাবে ব্যবহার করে আসছে। যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে অথবা কোন কোন ক্ষেত্রে হেডম্যান ও কার্বারীর পরামর্শে এসব বন ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হয়ে আসছে।

প্রাকৃতিক সম্পদের উপর আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকারের প্রেক্ষাপট থেকে বিচার করলে এর ইতিবাচক দিক হচ্ছে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশীদারীত্বের ভিত্তিতে জনগোষ্ঠীর যৌথ সিদ্ধান্ত মোতাবেক এসব বন পরিচালিত হয়। এতে একাধারে মৌজা বা গ্রামবাসীর গৃহাস্থলির চাহিদা মেটানো সম্ভব এবং বন পরিবেশ রক্ষিত হয়। এসব বন ব্যবস্থাপনার কোন আইনগত বা দালিলিক পদ্ধতির প্রয়োজন হয় না। তবে এক্ষেত্রে বড় ধরণের দুর্বলতা হচ্ছে এ ধরণের বনের কোন আইনগত স্বীকৃতি নেই। কিন্তু সরকারী কর্মকর্তাদের মতে এসব বনভূমি বা পাহাড়ভূমি হচ্ছে খাসভূমি, যা রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন।

বাণিজ্যক বা শিল্পভিত্তিক পাহাড়ভূমি ইজারা

আদিবাসী জীবনযাত্রার উপর মারাত্নক বিরূপ প্রভাব সৃষ্টিকারী একটি পদক্ষেপ হলো পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে বাঙালী অধিবাসীদের কাছে বাণিজ্যক উদ্দেশ্যে বা শিল্প স্থাপনের জন্য দীর্ঘমেয়াদী ভিত্তিতে পাহাড়ভূমি ইজারা প্রদান। সবচেয়ে বেশী ইজারা প্রদান করা হয়েছে পার্বত্য বান্দরবান জেলায়। কেবলমাত্র বান্দরবান জেলায় ৪০,০৭৭ একর ভূমির ১৬০৫টি প্লট ইজারা প্রদান করা হয়েছে বহিরাগতদের নিকট। এসব পাহাড়গুলো ছিল মূলতঃ আদিবাসীদের জুমভূমি ও যৌথ মৌজা বন। এই ইজারা প্রদানের ফলে শত শত আদিবাসী পরিবার প্রথাগত জুমচাষ ও গৃহস্থলি ব্যবহারের জন্য বনজ সম্পদ আহরণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সার্বিকভাবে তাদের জীবনযাত্রা বিপন্ন হয়ে পড়ছে। ভূমি ইজারাদাররা আদিবাসী জুমচাষীদের জুমচাষে বাধা দিচ্ছে এবং তাদের উপর সন্ত্রাসী দিয়ে হামলা করছে। ইজারা নেয়া এসব পাহাড়ভূমির বরাতে ইজারাদাররা ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ঋণ নিয়েছে। তারা ইজারা নিলেও অধিকাংশ পাহাড়ভূমি অনাবাদী অবস্থায় রেখেছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি অনুযায়ী এসব ইজারা বাতিলের বিধান রয়েছে। কিন্তু সরকার আজ অবধি এই বিধান কার্যকর করেনি। পক্ষান্তরে এই বিধান লঙ্ঘন করে পার্বত্য জেলার জেলা প্রশাসকরা এখনো ইজারা প্রদান অব্যাহত রেখেছেন।

সামরিক কাজের জন্য অধিগ্রহণ

সামরিক কাজে ব্যবহারের জন্য সরকার কেবলমাত্র পার্বত্য বান্দরবান জেলায় ৭৫,৬৮৬ একর পাহাড়ভূমি অধিগ্রহণ করেছে। এই অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে পার্বত্য জেলা পরিষদ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সাথে আলোচনা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। আইন অনুসারে পার্বত্য জেলা পরিষদের পূর্বানুমোদন ব্যতীত কোন ভূমি অধিগ্রহণ করা যায় না। ক্ষতিগ্রস্থরা অভিযোগ করেছে যে, অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। তাদের সাথে কোন আলোচনা করা হয়নি। এই অধিগ্রহণের ফলে হাজার হাজার আদিবাসী জুম্ম অধিবাসী নিজ বাস্তুভিটা থেকে উচ্ছেদ হয়ে পড়ছে এবং তাদের প্রথাগত জুমভূমি হারিয়ে তাদের জীবন জীবিকা বিপন্ন হয়ে পড়ছে। ইতিমধ্যে বিশেষ করে রুমা সেনাবাহিনীর জন্য অধিগ্রহণকৃত ভূমি থেকে শত শত আদিবাসী জুম্ম ও স্থায়ী বাঙালী অধিবাসী উচ্ছেদ হওয়া ও তাদের মানবেতর জীবন সম্পর্কে পত্রপত্রিকায় অনেক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

প্রাকৃতিক তেল-গ্যাস অনুসন্ধান

১৯৮০ সালের দিকে বহুজাতিক কোম্পানী শেল-এর উদ্যোগে পার্বত্য চট্টগ্রামে সর্বপ্রথম ভূকম্প জরিপ শুরু হয়। কিন্তু সংঘাতময় পরিস্থিতির কারণে তা পরে পরিত্যক্ত হয়। পরবর্তীতে ১৯৯০ সালের দিকে মার্কিন কোম্পানী ইউনাইটেড মেরেডিয়ান লিমিটেডের উদ্যোগে পুনরায় জরিপ কাজ শুরু হয়। পরে আরেক মার্কিন কোম্পানী ইউনিকোলের সাথে যুক্ত হয়। জানা গেছে যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে ইউনিকোলের অনুসন্ধানের কাজ এক সৌদি শেখ ক্রয় করেছেন। বর্তমানে অনুসন্ধান কাজ বন্ধ রয়েছে। তবে অদূর ভবিষ্যতে শুরু করা হবে বলে জানা গেছে।

দেশের প্রচলিত আইন অনুসারে ভূ-গর্ভস্থ যে কোন খনিজ সম্পদের একচ্ছত্র মালিক সরকার। তবে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন অনুসারে পরিষদ যে কোন খনিজ সম্পদ আহরণের ক্ষেত্রে লভ্যাংশ লাভের অধিকারী। রাজস্বের হিসাব, উত্তোলন ব্যবস্থা, ড্রিলিং সাইট, গ্যাস-লাইন এলাকায় বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর উপর প্রভাব, স্থানান্তর, পুনর্বাসন, ক্ষতিপূরণ ইত্যাদি বিষয়ে সেসময় পার্বত্য চট্টগ্রামের নেতৃবৃন্দ বা প্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠানের সাথে কোন আলোচনা হয়নি। গ্যাস অনুসন্ধান বা কূপ খনন কার্যক্রমের প্রভাবের নেতিবাচক প্রভাবের প্রথম শিকার হবে আদিবাসী জুমচাষীরা। জুমচাষীদের জমি রেকর্ডীয় নয় বিধায় আর্থিক ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে তারা চরম বৈষম্যের শিকার হবে বলে অনেকের অভিমত। দ্বিতীয়তঃ প্রাকৃতিক গ্যাস ও তেল যেহেতু দাহ্য পদার্থ তাই অনুসন্ধান কার্যক্রমের এলাকায় জুমচাষ নিয়ন্ত্রিত হতে পারে। বিশেষ করে জুমচাষের প্রস্তুতি পর্বে কাটা জঙ্গল আগুন দিয়ে পোড়ানোর কাজ পুরোপুরি নিষিদ্ধ হতে পারে। এতে করে আদিবাসী জুমচাষীরা জুমচাষ থেকে বঞ্চিত হবে এবং এসব এলাকা থেকে চিরতরে উচ্ছেদ হয়ে পড়বে। খনিজ অনুসন্ধানের পরিবেশগত প্রভাবও মারাত্নকভাবে ক্ষতি করবে আদিবাসী জনগণকে।

সমতল অঞ্চলে বন ব্যবস্থাপনা ও আদিবাসী জনগোষ্ঠী

১৯২৭ সালের বন আইনের ২৮(১) ধারা মোতাবেক সরকার যেকোন জনগোষ্ঠীকে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভূমি মালিকানা বা ব্যবহার করার অধিকার দিতে পারে। পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাড়াও দেশের অন্যান্য অঞ্চলে যেমন – সিলেট, বৃহত্তর ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ইত্যাদি অঞ্চলে সরকার নিয়ন্ত্রিত সংরক্ষিত বনাঞ্চলে আদিবাসীরা বসবাস করে আসছে। এসব অঞ্চলে বসবাসকারী আদিবাসীদের জন্য এই অধিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ব্যবহারিক ক্ষেত্রে এই অধিকার কেবলমাত্র সিলেট অঞ্চলের আদিবাসীদের ক্ষেত্রে সীমিতভাবে প্রযোজ্য রয়েছে। বৃহত্তর ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে বসবাসকারী আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলো এই অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তারা সংরক্ষিত বনাঞ্চলে বসবাস করলেও তাদের কোন ভূমি অধিকার নেই যা পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের ক্ষেত্রেও সমভাবে লক্ষণীয়।

সরকারী ও বেসরকারী উদ্যোগে আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলে ইকোপার্ক গড়ে উঠেছে। কিন্তু ইকোপার্ক ঘোষণার আগে সংশ্লিষ্ট আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাথে কোনরূপ আলোচনা করেনি সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এক্ষেত্রে মধুপুর ইকোপার্ক, শেরপুরে মধুটিলা ইকোপার্ক, মাধবকুণ্ড-মুরইছড়া ইকোপার্ক, গজনী ইকোপার্ক, খাগড়াছড়ির আলুটিলা ইকোপার্ক, বান্দরবানের চিম্বুক ইকোপার্ক বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সরকার এ পর্যন্ত যে কয়টি ইকোপার্ক প্রকল্প হাতে নিয়েছে তার সিংহভাগই আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায়। এসব ইকোপার্কের সাথে জড়িয়ে রয়েছে অরণ্য-সংস্কৃতি নির্ভর আদিবাসী জনগোষ্ঠী। আদিবাসীদের অভিযোগ আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকাসমূহে ইকোপার্ক প্রকল্পের স্থান নির্বাচনের অন্যতম গোপন উদ্দেশ্য হলো আদিবাসীদের উপর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক শোষণ চালানো।

যেমন মধুপুর ন্যাশনাল পার্ক উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের পূর্বে বা বাস্তবায়নের সময় সরকার আদিবাসী বা স্থানীয় মানুষের সাথে আলোচনা না করেই জোরপূর্বক সরকার মধুপুর বনে দেয়াল নির্মাণ শুরু করে। আদিবাসীরা পরবর্তীতে মিলিতভাবে এই প্রকল্পের বিরোধীতা করে। ২০০৪ সালে মধুপুরে গারোদের মিছিলে পুলিশ ও বনরক্ষীরা নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করে। গুলিতে গারো যুবক পিরেন স্নাল নিহত হয় এবং আদিবাসী নারী-শিশুসহ ৩০ জন আহত হয়। পিঠে গুলিবিদ্ধ হয়ে দশম শ্রেণীর ছাত্র উৎপল নকরেক চিরতরে পঙ্গু হয়। এর কোন বিচার এখনও হয়নি, বরং উল্টো আদিবাসীদের নামে অসংখ্য মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। আদিবাসীদের বক্তব্য হলো, বনের মধ্যে দেয়াল নির্মাণসহ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলে আদিবাসীদের জীবন ও জীবিকা বিপন্ন অবে, তাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবন মারাত্মক ব্যাহত হবে এবং চূড়ান্তভাবে আদিবাসীরা বন থেকে এবং নিজেদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হয়ে পড়বে।১০

ইকোপার্ক উন্নয়নের মধ্য দিয়ে দুটি নগ্ন তৎপরতাকে উৎসাহিত করা হয়েছে; একটি হলো আদিবাসী বনজ-ভূমিকে জবরদখল করার মাধ্যমে তার উপর আধিপত্য বিস্তার করা, আর দ্বিতীয় হলো ভূ-প্রকৃতি ও বনজ-প্রকৃতিকে ধ্বংস করা। এই উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে বিনষ্ট করা হচ্ছে সেসব এলাকার ভেষজ উদ্ভিদসমূহ। উদ্ভিদ বিনাশের কারণে ধ্বংস হচ্ছে সেখানকার প্রাণবৈচিত্র্য। উন্নয়নের নামে রাষ্ট্রের বন-আগ্রাসন নীতি একদিকে আদিবাসী এলাকার প্রাকৃতিক-বৈচিত্র্যকে ধ্বংস করছে, অন্যদিকে এই প্রাকৃতিক-বৈচিত্র্যের মধ্যে বসবাসকারী আদিবাসী নৃ-জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক নির্মাণসমূহ অবলুপ্ত হচ্ছে।১১

গাজীপুরে আদিবাসীদেরকে তাদের ঐতিহ্যগত ভূমি থেকে উচ্ছেদ করে অপরিকল্পিতভাবে শিল্পকারখানা স্থাপন করা হচ্ছে। এতে করে আদিবাসীদের জীবন-জীবিকা, সংস্কৃতি ও সমাজব্যবস্থা, তথা পরিবেশের উপর বিরুপ প্রভাব পড়ছে। ঢাকা থেকে গিয়ে একশ্রেণীর উঠতি ধনীরা এসব শিল্প-কারখানা গড়ে তুলছে। তারা নানা কৌশলে আদিবাসীদের জমি হাতিয়ে নিচ্ছে।১২

উত্তরবঙ্গের আদিবাসীরা প্রান্তিক ভূমিহীন মানুষে পরিণত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে ভূমিতে বসবাস করার পরেও তাদের ভূমি খাস খতিয়ানভূক্ত করা হয়েছে। উত্তরবঙ্গের বরেন্দ্রভূমিসহ জয়দেবপুর জেলায় বিস্তীর্ণ জঙ্গল আর গজারি বনে বসবাস উপযোগী এবং চাষযোগ্য জমি তৈরির কৃতিত্ব আদিবাসীদেরই, অথচ বর্তমানে সেখানে আদিবাসীরা ভূমি অধিকার থেকে বঞ্চিত। আজ তারা সেখানে নিজদেশে পরবাসীর মতো জীবন অতিবাহিত করতে বাধ্য হচ্ছে। এ অবস্থায় তাদের ঐতিহ্যগত ভূমি অধিকারকে স্বীকার করে উত্তরবঙ্গের আদিবাসীদের ভোগদখলীয় ভূমির মালিকানা নিশ্চিত করার জন্য দাবী জানিয়ে আসছে আদিবাসীরা। অতি সম্প্রতি ৫ নভেম্বর ২০০৭ নওগাঁর পত্নীতলা উপজেলাধীন কাজী পাড়ায় বসবাসকারী ৫০টি আদিবাসী পরিবারকে উচ্ছেদের উদ্দেশ্যে সংঘবদ্ধ হামলা চালানো হয়। আদিবাসীরা বংশ পরম্পরা ধরে উক্ত জমিতে বসবাস করে আসছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও জমিটি খাস খতিয়ানভূক্ত দেখিয়ে বিএনপি’র জনৈক কর্মী ইজারা নিয়ে জবরদখল করার চেষ্টা করে।১৩

উত্তরবঙ্গে দিনাজপুর জেলায় আদিবাসী অধ্যুষিত ৪টি উপজেলায় (ফুলবাড়ি, নবাবগঞ্জ, বিরামপুর ও পার্বত্যপুর) আদিবাসীসহ স্থানীয় অধিবাসীদের উচ্ছেদ করে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের সরকারী উদ্যোগ ইতিমধ্যে জাতীয় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে আদিবাসী অধ্যুষিত ৬৭টি গ্রাম ধ্বংস হয়ে যাবে। প্রায় ৫০ হাজার বাঙালী-আদিবাসী মানুষ নিজ বাস্তুভিটা থেকে উচ্ছেদ হয়ে পড়বে। উন্মুক্ত পদ্ধতি কয়লা উত্তোলনের ফলে সেখানকার এলাকায় দেখা দেবে মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয়।

১৯৫০ সালের পূর্বে বঙ্গ জমিদারী প্রথা ও প্রজাস্বত্ব আইনে সমতল অঞ্চলের আদিবাসীদের ভূমি রক্ষার বিধান রয়েছে। উক্ত আইনের ৯৭ ধারায় আদিবাসী জমি রাজস্ব অফিসের অনুমোদন ব্যতীত অ-আদিবাসীদের নিকট বিধিনিষেধ রয়েছে। এই আইন লঙ্ঘন করে কোন কোন ক্ষেত্রে আদিবাসীদের জমি অ-আদিবাসীদের নিকট স্থানান্তরিত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সামাজিক বনায়ন ও আদিবাসী জনগোষ্ঠী

বন ধ্বংস রোধকল্পে সরকার নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। তম্মধ্যে অন্যতম হচ্ছে সামাজিক বনায়ন প্রকল্প। সরকার ব্রিটিশ আমলে প্রবর্তিত ১৯২৭ সালের বন আইন সংশোধন করে ২০০০ সালে যা বন (সংশোধন) আইন নামে পরিচিত। বনের পরিমাণ বৃদ্ধির জন্য করা হলেও এই আইনকে “পরিবেশ-বিরোধী” এবং “গণ-বিরোধী” বলে ব্যাপকভাবে সমালোচনা করা হয়। সংশোধিত বন আইনের ২৮(৪) ও ২৮(৫) ধারা অনুসারে সামাজিক বনায়ন বিধিমালা ২০০৪ প্রবর্তন করা হয়। এই বিধিমালায় সামাজিক বনায়ন প্রকল্পে সুবিধাভোগী হিসেবে ভূমিহীন ব্যক্তি ও দুঃস্থ মহিলাদের পাশাপাশি আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে বলে বিধান করা হয়। কিন্তু বাস্তবে এই সামাজিক বনায়ন প্রকল্পকে মানবাধিকারের সাথে বিরোধাত্নক বলে আখ্যায়িত করেন আদিবাসী নেতৃবৃন্দ ও পরিবেশবাদীরা। এই প্রকল্পে সুবিধাভোগী হিসেবে আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার প্রদানের বিধান থাকলেও জনগোষ্ঠীকে ভূমির অধিকার প্রদানের কোন বিধান নেই এবং বনবিভাগের কর্মকর্তাদের এতই ক্ষমতা দেয়া হয়েছে তাদের মর্জির উপর নির্ভর করবে সুবিধাভোগীদের ভবিষ্যৎ। যেকোন মূহুর্তে যেকোন অজুহাতে বনবিভাগের কর্মকর্তারা সুবিধাভোগীদের বাদ দিতে পারবেন।১৪

২০০০ সালে সংশোধিত আইন অনুসারে এটা প্রতীয়মান হয় যে, সরকার আগের মতই বন ব্যবস্থাপনায় তার নজরদারী ও পুলিশি কার্যক্রম বহাল রাখতে চাই। নতুন করে বনভূমির পার্শ্ববর্তী ভূমিগুলোর ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত কার্যক্রমে বনবিভাগের কর্মকর্তাদের নজরদারী ও পুলিশি ক্ষমতার শক্তিবৃদ্ধির প্রবণতা থেকে এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, আদিবাসীদের প্রথাগত ভূমি অধিকারের প্রতি সরকারের বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধাবোধ নেই, স্বীকৃতির প্রশ্ন তো আসেই না।

বন মামলা ও আদিবাসীদের হয়রানি

আদিবাসীরা বনবিভাগের নানা হয়রানির শিকার হয়। তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে মামলার শিকার। প্রাকৃতিক সম্পদের উপর আদিবাসীদের অধিকার কিংবা বনজ সম্পদ আহরণে আদিবাসীদের প্রথাগত অধিকার বন আইনে স্পষ্টভাবে স্বীকৃত না থাকার কারণে বা বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে ধারণা না থাকার কারণে আদিবাসীরা এই হয়রানির শিকার হয়। বনবিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দৃষ্টিতে আদিবাসীরা বনাঞ্চলে অবৈধ প্রবেশকারী। তারা বনজ সম্পদ চুরি করে। বনজ সম্পদ ধ্বংসের জন্য আদিবাসীরাই দায়ী ইত্যাদি। কিন্তু বস্তুত পক্ষে বন ধ্বংসের প্রধান কারণ কতিপয় দুর্নীতিগ্রস্থ বন কর্মকর্তা ও কাঠ ব্যবসায়ীদের উদ্যোগে বাণিজ্যক ভিত্তিতে অবাধে বনজ সম্পদ আহরণ। বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ইতিমধ্যে অনেক দুর্নীতিবাজ বন কর্মকর্তা ধরা পড়েছে। তাদের কাছ থেকে বিপুল সম্পদ ও অর্থ উদ্ধার করা হয়েছে। এ থেকে স্পষ্ট যে, বন সম্পদ লুন্ঠন ও উজার করে এবং সীমাহীন দুর্নীতির মাধ্যমে এসব বন কর্মকর্তারা বিপুল সম্পদ কুক্ষিগত করেছে।

তাই বনজ সম্পদ উজার করার জন্য কখনই আদিবাসীরা দায়ী নয়, বরং বন কর্মকর্তারা বনের সম্পদ লুন্ঠন করার জন্য আদিবাসীদের নির্যাতন করে; মিথ্যা মামলায় জড়িত করে হয়রানি করে। একজন আদিবাসীর বিরুদ্ধে শত শত মামলা দায়ের করার ঘটনাও ঘটেছে। এমনকি জেলে অন্তরীণ থাকাকালেও অনেক আদিবাসীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে অনেক আদিবাসী অভিযোগ করেছে। মৃত ব্যক্তির বিরুদ্ধেও মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে এমন দৃষ্টান্তও পাওয়া গেছে। ভোটার তালিকা থেকে নাম সংগ্রহ করে এসব মামলা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। শুধু তাই নয়, অসংখ্য আদিবাসী জীবনও অকালে ঝরে গেছে বনরক্ষীদের গুলিতে। কিন্তু বনবিভাগ বনজ সম্পদ পাচারকারী কোটিপতি বাঙালী ব্যবসায়ী ও বন কর্মকর্তাদের গ্রেফতার করতে কখনই দক্ষতার পরিচয় দিতে পারে না।

Backing home by Mongchainu Marma
বাড়ি ফেরা, ছবি: মংসাইনু মারমা

ভূমি সমস্যা ও আদিবাসী জনগোষ্ঠী

জমি, পাহাড়, বন ইত্যাদি আদিবাসীদের জীবন, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিকতার কেন্দ্রবিন্দু। সর্বত্রই আদিবাসীরা জমিকে পবিত্র হিসেবে গণ্য করে। শুধু জমি কেন, জমিভিত্তিক সম্পদ যেমন – প্রকৃতি, পানি, জলাশয়, বন ও বনজ সম্পদ, খনিজ সম্পদ, পশু-পাখি সবকিছু পবিত্র হিসেবে জ্ঞান করে থাকে। বন, পাহাড় ও জমির সাথে এই সম্পর্কের কারণে আদিবাসীরা জমিকে ও তার সম্পদের যত্ন নেয়া তাদের পবিত্র দায়িত্ব মনে করে। কেবল নিজেদের স্বার্থে নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থেও তারা তা মনে করে। পশ্চিমা শিল্পোন্নত সমাজে বন, পাহাড় ও জমি সম্পর্কে আদিবাসীদের এই ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করা হয়।১৫ বাংলাদেশের শাসক মহলেও জমি সম্পর্কে পশ্চিমা ধারণা উত্তরাধিকার ভিত্তিতে ধারণ করেছে। তাই আদিবাসী জনগোষ্ঠী নির্মূলীকরণের প্রক্রিয়ায় শাসক মহল ভূমিকে প্রধান টার্গেট হিসেবে নির্ধারণ করে থাকে।

জমি সম্পর্কে উল্লেখিত মৌলিক পার্থক্য থাকার কারণেই স্বাভাবিকভাবে আদিবাসী সমাজে প্রচলিত প্রথাগত ভূমি ব্যবস্থাপনা এবং পশ্চিমা বিশ্বের ধারণার উপর প্রতিষ্ঠিত দেশে প্রচলিত আইনী ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে মৌলিক বৈপরিত্য দেখা দেয়। আদিবাসীদের প্রথাগত ভূমি ব্যবস্থাপনায় বন্দোবস্তীকরণের বাধ্যবাধতা নেই, ভোগদখলই সবকিছু। অপরদিকে দেশে প্রচলিত আইনে ভোগদখল অত্যন্ত গৌণ বিষয়, বন্দোবস্তীই হচ্ছে মূখ্য বিষয়। আদিবাসীদের ভূমি সমস্যা অত্যন্ত জটিল আকার ধারণ করার পেছনে এই পরস্পর বিপরীত দুই পদ্ধতিই অন্যতম কারণ। একটা সমাজে বা দেশে আইন করে কোন সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয় যদি সমাজ তৃণমূল পর্যায় থেকে সে বিষয়ে অভ্যস্ত ও সচেতন না হয়। সেটা যদি করা হয় তাহলে সমস্যা আরো হয়ে উঠে জটিলতর। আদিবাসী জনগোষ্ঠীসমূহ যুগ যুগ ধরে যে প্রথার সাথে অভ্যস্ত এবং যে নিয়ম সচেতন ও সহজভাবে অনুসরণ করছে সেটা তাদের গণতান্ত্রিক তথা মৌলিক অধিকার। সেই অধিকারকেই যদি স্বীকার করা না হয় তাহলে সেটা অধিকার হরণের সামিল বৈ কিছু নয়। আজ আদিবাসীদের বেলায় সেটায় চলছে।

ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আদিবাসী জাতিসমূহের প্রধান সমস্যা হলো ভূমি সমস্যা। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলেই তার স্বরূপ বেরিয়ে আসবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল দেশের এক-দশমাংশ এলাকা নিয়ে গঠিত হলেও এ অঞ্চলে চাষযোগ্য জমির পরিমাণ অত্যন্ত নগণ্য। দেশের সমতল এলাকার তুলনায় এখানকার জমির উর্বরতা শক্তি এবং মাথাপিছু চাষযোগ্য জমির পরিমাণ কম। ১৯৬০ সালে কাপ্তাই বাঁধের ফলে ৪০% আবাদী জমি পানির নিচে তলিয়ে যায়। জমির অভাবে বাঁধে ক্ষতিগ্রস্ত ও উদ্ভাস্তু জুম্মদেরকে জমি বন্দোবস্তী দেয়া সম্ভব হয়নি। অপরদিকে জেনারেল জিয়া ও জেনারেল এরশাদের আমলে সমতল জেলাগুলো থেকে সরকারী উদ্যোগে পার্বত্য চট্টগ্রামে নিয়ে আসার সময় বহিরাগত সেটেলারদের প্রতারণা করে বলা হয় যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রচুর জায়গা-জমি রয়েছে। প্রত্যেক পরিবারকে ২.৫ একর ধান্য জমি ও ৫.০ একর পাহাড় জমি বন্দোবস্তী দেয়া হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়। বস্তুত পার্বত্য চট্টগ্রামে চাষযোগ্য কোন খাসজমি ছিল না। ফলে সরকার জুম্মদের জায়গা-জমির উপর এসব সেটলারদের বসতি দেয় এবং সেটলাররা কোন উপায়ান্তর না দেখে জুম্মদের জায়গা-জমি জবর দখল করে নেয়।

ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আদিবাসী জাতিসমূহের ভূমি সমস্যার ক্ষেত্রে নানা কারণের মধ্যে অন্যতম দু’টি কারণ হচ্ছে – (১) রাষ্ট্রীয় নীতির বদৌলতে জাতিগত নির্মূলীকরণের (Ethnic Cleansing) আওতায় আদিবাসীদের জমি জবর দখল এবং (২) আদিবাসীদের প্রথাগত ভূমি ব্যবস্থাপনা আইনী বৈধতার অভাব। সমতল জেলাসমূহের আদিবাসীদের জমিসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্মদের জমি জবর দখলের চরিত্র থেকে প্রথমোক্ত বিষয়ে কোন সন্দেহ থাকার কথা নয়। জমি দখলের জন্য বিগত আড়াই দশকব্যাপী পার্বত্য চট্টগ্রামে যেভাবে সরকারী উদ্যোগে উলঙ্গভাবে বহিরাগত পুনর্বাসন দেয়া হয় এবং জুম্ম জণগণের উপর যেভাবে একের পর এক বর্বরোচিত হামলা চালানো হয় তা অনেকে প্রত্যক্ষ করেছেন। গত ২০০০ সালে নওগাঁ জেলার ভীমপুরে জমি দখলের জন্য যেভাবে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলীয় পান্ডারা প্রশাসনের প্রত্যক্ষ সহযোগীতায় সংঘবদ্ধভাবে আদিবাসীদের উপর হামলা করেছে, মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলায় খাসিয়া ও গারোদের পানপুঞ্জীসহ জমি-জমা বেদখলের ষড়যন্ত্র অব্যাহত রয়েছে এবং আলফ্রেড সরেনকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে তাতে একটা বিষয় স্পষ্ট হয় যে, আদিবাসীদের জমি দখলের ক্ষেত্রে শাসকগোষ্ঠী দলমত নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ। এটা রাষ্ট্রীয় নীতির অধীনে জাতিগত নির্মূলীকরণের একটা অতি সূক্ষ কার্যক্রম না হলে দল-মত নির্বিশেষে মিলে সংঘবদ্ধভাবে কখনোই এই হামলা করা সম্ভব হতো না।

আদিবাসীদের ভূমি মালিকানা পদ্ধতি হচ্ছে সামাজিক মালিকানার পদ্ধতি। এই পদ্ধতি অত্যন্ত সহজ-সরল। মৌজা অধীন সমস্ত জমিজমা এবং বনভূমি ও বনজ সম্পদ মৌজাবাসীর সামাজিক সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। মৌজা পদ্ধতির ব্যবস্থাপনায় এই সম্পদ মৌজাবাসী একাধারে যৌথ ও ব্যক্তিগতভাবে ভোগদখল করে থাকে। মৌজা এলাকায় অবস্থিত বনভূমি ও বনজ সম্পদ গৃহস্থলির প্রয়োজনে যে কেউ আহরণ ও ব্যবহার করতে পারে। অন্যদিকে কোন একটা জমিতে বা পাহাড়ে কেউ একবার জুম বা অন্য কোন চাষ করলে উক্ত জমির উপর ঐ ভোগদখলকারীর ব্যক্তির অনুমতি ছাড়া কেউ জুম চাষ বা অন্য কোন উদ্দেশ্যে দখল করতে পারে না এটাই হচ্ছে যুগ যুগ প্রচলিত প্রথাগত নিয়ম। এই নিয়ম ভঙ্গ করলে দেশে প্রচলিত দন্ডনীয় অপরাধের মতো আইন লঙ্ঘনের সামিল বলে বিবেচিত হয়ে থাকে। ফলে এর ব্যতিক্রম কেউ করে না বা ভঙ্গ করার প্রশ্নই উঠে না এবং জায়গা-জমির বন্দোবস্তীর প্রয়োজনও পড়ে না। আজকের যুগে দেশে প্রচলিত বন্দোবস্তীকরণের যে জটিল আইনানুগ ব্যবস্থাপনা চলছে তা আদিবাসীদের সমাজে ভূমি ব্যবস্থপনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য তো নয়ই, উপরন্তু আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি সম্পর্কে ধারণার সাথে সম্পূর্ণভাবে বিরোধাত্নক বটে।১৬

আদিবাসী জ্ঞান ব্যবস্থা ও স্থায়ীত্বশীল প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার

আদিবাসী জ্ঞানের মধ্য দিয়ে আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও পরিবেশের মধ্যে একটা সহজাত সম্পর্ক গড়ে উঠে। এই জ্ঞান প্রথাগত আইনের মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে থাকে। আদিবাসী জ্ঞানের মাধ্যমে একাধারে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও আদিবাসীদের বেঁচে থাকা বা অস্তিত্ব সংরক্ষণের ক্ষেত্রে একটা ভারসাম্যপূর্ণ উপায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আদিবাসী ঐতিহ্যের সাথে আদিবাসী জ্ঞানের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক রয়েছে। আদিবাসী জ্ঞান হচ্ছে-

  • আদিবাসী জ্ঞানকে ঐতিহ্যগত বা স্থানীয় জ্ঞান হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয় যা একটি নির্দিষ্ট সংস্কৃতি বা সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আদিবাসী সমাজে কৃষিব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্য উৎপাদন, শিক্ষা, পরিবেশ সংরক্ষণ ও অন্যান্য দৈনন্দিন কাজের সিদ্ধান্ত-নির্ধারণের ক্ষেত্রে এই জ্ঞানই হচ্ছে মূল ভিত্তি।
  • অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই জ্ঞান বংশ পরম্পরায় এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে মৌখিকভাবে হস্তান্তরিত ও বিকশিত হয়ে আসছে।
  • পরিবেশ ব্যবস্থার উপর আদিবাসীদের ব্যাপক জ্ঞান রয়েছে যার মাধ্যমে তারা প্রাকৃতিক সম্পদকে স্থায়ীত্বশীলতার সাথে ব্যবহার করে আসছে। তাই শতাব্দীর পর শতাব্দী ব্যাপী অভিজ্ঞতার আলোকে গড়ে উঠা এই আদিবাসী জ্ঞানের গুরুত্ব স্থায়ীত্বশীল উন্নয়নের ক্ষেত্রে অপরিসীম।
  • স্থায়ীত্বশীল উপায়ে কিভাবে প্রকৃতির সাথে সম্প্রীতি বজায় রেখে বাস করা যায় এই জ্ঞান মানুষকে শিক্ষা প্রদান করতে সহায়তা করে।
  • এই জ্ঞান গতিশীল ও পরিবেশ উপযোগী এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব রক্ষা ও জীবন-জীবিকার সাথে সম্পর্কযুক্ত।

রাষ্ট্রের দৃষ্টকোণ থেকে, প্রাকৃতিক সম্পদকে অধিগ্রহণ ও আহরণের মাধ্যমে রাষ্ট্রের অবকাঠামো উন্নয়ন ও অন্যান্য ব্যয়ের অর্থায়নের উৎস হিসেবে মূলতঃ বিবেচনা করা হয়। সেখানে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন ধারণাকে শ্রদ্ধা করা হয় না, এটাকে অনুৎপাদনশীল হিসেবে দেখা হয় এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রাকৃতিক সম্পদের প্রথাগত ব্যবহারকে প্রায় ক্ষেত্রে উৎসাহিত করা গড়ে তোলা হয় না। আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে ক্রমবর্ধমান হারে মূলস্রোতধারা উন্নয়ন ও বাণিজ্যিকীকরণে অন্তর্ভূক্ত করা হয় বা গ্রহণ করতে বাধ্য করা হয়। এটা প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনাকে চ্যালেঞ্জের মধ্যে ফেলে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনায় আদিবাসীদের অংশীদারিত্বের কথা বলা হলেও তা কেবল মুখের বুলি এবং প্রায় ক্ষেত্রে আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে শান্তকরণ বৈ কিছু নয়।

আদিবাসীর ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ সম্পৃক্তকরণ ও সহযোগীতা ব্যতীত বন ও প্রাকৃতিক সম্পদ পুনরুদ্ধার ও স্থায়ীত্বশীল ব্যবস্থপনা সফল হতে পারে না। আদিবাসী জ্ঞান ও প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা সন্নিবেশকরণের জন্য বিদ্যমান প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত নীতিমালা সংশোধন করা অতীব জরুরী। এতে সম্পদের উপর আদিবাসীদের অধিকারকে সুস্পষ্টভাবে স্বীকার করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন চাহিদার সাথে আদিবাসী অধিকার স্বীকার করা এবং সিদ্ধান্ত-নির্ধারণী প্রক্রিয়ায় আদিবাসীদের অন্তর্ভূক্তিকরণকে অবশ্যই সমন্বয় করতে হবে; এক্ষেত্রে অ-আদিবাসী সেটলার কর্তৃক ভূমি বেদখলের ন্যায্য সমাধান করা; স্বায়ত্বশাসন ও স্বশাসিত সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন; আদিবাসীদের ভূমি ও সম্পদের অধিকার সংরক্ষণ; আদিবাসীদের ওইতিহ্যগত স্বাস্থ্যসেবা ও মানব উন্নয়ন; আদিবাসীদের ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ ইত্যাদি বিষয়গুলোর উপর সবিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।

*প্রবন্ধটি বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ও বেন আয়োজিত ‘আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও পরিবেশ’ শীর্ষক প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মেলন-এ পঠিত প্রবন্ধ।

১। প্রথম আলো, ২৩ অক্টোবর ২০০৭।

২। Indigenous people and forest care by Md. Mahfujur Rahman, The Daily Star, 11 November 2007.

৩। Natural Resource Management Country Studies (Bangladesh Report) by UNDP RIPP.

৪। Bangladesh Gazette, July 6, 1995. pp 241- 244.

৫। পার্বত্য চট্টগ্রামে বন ও ভূমির অধিকার, রাজা দেবাশীষ রায়, ইসিমোড, ২০০৪

৬। A Compilation of list of leases of Bandarban district by CHT Affairs Ministry, 2005

৭। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে, ২০০৬, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি।

৮। পার্বত্য চট্টগ্রামে বন ও ভূমির অধিকার, রাজা দেবাশীষ রায়, ইসিমোড, ২০০৪

৯। বাংলাদেশ ইকোপার্ক উন্নয়নঃ পরিপ্রেক্ষিত প্রতিবেশ-নারীবাদী আন্দোলন, আনোয়ারুল্লাহ ভূঁইয়া, সংহতি, ২০০৭

১০। ৯ আগষ্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস 2০০৭ উপলক্ষে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম ও বাংলাদেশ আদিবাসী অধিকার আন্দোলন- এর সংবাদ সম্মেলনে পঠিত বিবৃতি।

১১। বাংলাদেশ ইকোপার্ক উন্নয়ন: পরিপ্রেক্ষিত প্রতিবেশ-নারীবাদী আন্দোলন, আনোয়ারুল্লাহ ভূঁইয়া, সংহতি, ২০০৭

১২। আদিবাসীদের ভূমি হারানোর কারণ এবং সামাজিক জীবনে এর প্রভাবঃ প্রেক্ষিত গাজিপুর – জয়ন্ত আচার্য, পিযুষ বর্মণ, বিভাষ চক্রবর্তী ও সৌরভ সিকদার।

১৩। বাংলাদেশ আদিবাসী অধিকার আন্দোলনের সংবাদ সম্মেলন, ৯ নভেম্বর ২০০৭, ঢাকা।

১৪। Natural Resource Management Country Studies (Bangladesh Report) by UNDP RIPP.

১৫। সারা বিশ্বে দেশজ আদি জনগোষ্ঠী নির্মূলের চক্রান্ত – জগন্নাথ পতি (দিকদর্শন, পৃষ্ঠা- ২৬)।

১৬। গণতন্ত্র, ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা এবং নাগরিক সমাজ: পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রেক্ষিত – মঙ্গল কুমার চাকমা, ২০০৫


লেখক: মঙ্গল কুমার চাকমা ও হিরণ মিত্র চাকমা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here