প্রসঙ্গ: পাহাড়ী ছাত্র সমিতি ও গিরিসুর শিল্পী গোষ্ঠী

0
146

১৯৫৮ সাল, তৎকালীন পূৃর্ব পাকিস্তানের দক্ষিণ পূর্বাংশে বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রামের ১৩ ভাষাভাষী শিক্ষা-দীক্ষায় অনগ্রসর অনুন্নত আদিবাসী জুম্ম জনগণকে আধুনিক শিক্ষায়, রাজনৈতিক ও সমাজ সচেতনতায় জাগিয়ে তুলে বিশ্ব সভায় মর্যাদা ও স্থান লাভের মহান লক্ষ্য নিয়ে জন্ম লাভ করে “Tribal Student Association”। এর পুরোধা ছিলেন জুম্ম জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের স্বপ্নদ্রষ্টা অবিসংবাদিত নেতা প্রয়াত এম এন লারমা (M.N. Larma) এবং আরো অনেক প্রগতিশীল ছাত্র নেতা কর্মী। এর কেন্দ্রীয় কার্যালয় ছিল ঢাকায়। পরবর্তীতে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে এর কার্যালয় স্থানান্তর করা হয়। ১৯৬২ সালে ১৩ নভেম্বর Tribal Student Association এর বদলে এর নতুন নামকরণ করা হয় “Hill Student Association”। পরবর্তীতে ১৯৬৬ সালে বাস্তবতার প্রয়োজনে এবং সাংগঠনিক কাজের সুবিধার্থে Dhaka থেকে রাঙ্গামাটিতে কেন্দ্রীয় কার্যালয় নিয়ে আসা হয়। রাঙ্গামাটিতে স্থানান্থর হলেও কয়েকটি বছর এর কার্যক্রম খুব একটা পরিলক্ষিত হয়নি।

রণজিৎ দেওয়ান
রণজিৎ দেওয়ান

পরবর্তীতে ১৯৭০ সালে পুনরায় কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হয়। ওখান থেকে এর কার্যক্রম পুরোপুরি পরিলক্ষিত হতে থাকে। এক পর্যায়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন সার্বভৌম গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে ১৯৭১ সালে ১৬ ডিসেম্বর। সদ্য স্বাধীন দেশের পুনঃগঠনের মহা কর্মযজ্ঞ যেমন শুরু হয় তেমনি চির অবহেলিত বঞ্চিত পশ্চাৎপদ পার্বত্যবাসীর স্বায়ত্বশাসন অধিকার আদায়ের দাবিতে পাহাড়ি ছাত্র সমিতি জনমত সৃষ্টির লক্ষ্যে এক বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে শুরু করে। ১৯৭২ সালের মার্চ-এপ্রিলে চেঙ্গী, মাইনী, মারিশ্যা ভ্যালি এবং বান্দরবান ছাত্র প্রতিনিধি দল সাংগঠনিক সফর করে। তখন আমরা ৬ (ছয়) জন প্রতিনিধি চেঙ্গী, মাইনী সফর করি। এতে আমি নিজে বাদে প্রয়াত চাবাই মগ (তখন তিনি সভাপতি ছিলেন), শ্রী উষাতন তালুকদার, শ্রী প্রমোদেন্দু চাকমা, সুভাষ চাকমা (বর্তমানে কানাডায় আছেন) ও জিতেন্দ্রিয় চাকমা গুংগু। ১৯৭২ সালে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি গঠিত হয়। ঐ কমিটিতে চাবাই মগ সভাপতি হিসেবে পুনঃনির্বাচিত হন। সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন দীপংকর চাকমা ধামাই। আর আমি দায়িত্ব পাই সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদকের পদ। ঐ বছরই তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মালেক উকিল রাঙ্গামাটি সফরে এলে সার্কিট হাউসে স্বায়ত্বশাসনের দাবীতে স্মারকলিপি প্রদান করি কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে। ঐ প্রতিনিধি দলে রুপায়ন দেওয়ান এবং আমিও ছিলাম। এভাবে বিভিন্ন সময় পাহাড়ী ছাত্র সমিতি শুধু জুম্ম ছাত্র সমাজ ও জাতিকে রাজনৈতিক সচেতন করেনি, নিজস্ব ঐতিহ্য মন্ডিত সংস্কৃতিকে তুলে ধরে বিকাশ ও প্রকাশ সাধনের ক্ষেত্রে অনন্য ভূমিকা পালনে ব্রতী হয়। একের পর এক সৃষ্টি হতে থাকে বিভিন্ন দেশাত্ববোধক গান, গণসঙ্গীত, আধুনিক চাকমা গান। ঐতিহ্যবাহী জুম নৃত্য, বিঝু নৃত্য, ঘুমপাড়ানি গানের উপর নৃত্য। বিঝু নৃত্য ধারণাটি অবশ্য আমারই ছিল। ঝর্ণা চাকমা, আমি দু’জনে মিলে সৃষ্টি করি আমাদের ঐতিহ্য বিঝুর উপর নৃত্যটি। ১৯৭২ সালে পাহাড়ি ছাত্র সমিতির মাধ্যমে ঢাকায় বিজয় দিবস উপলক্ষে সর্বপ্রথম সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করি এবং প্রচুর সাড়া জাগে ঢাকাবাসীদের মধ্য।

এক সময় আমাদের সবার মনে একটা ভাবনা উদয় হয় যে কেন্দ্রীয় কমিটির সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক বিভাগের অধীনে একটি শিল্পী গোষ্ঠীর সৃষ্টি করা অর্থাৎ পাহাড়ী ছাত্র সমিতির পতাকা তলে সমবেত হওয়া। এই ভাবনা থেকে ১৯৭৩ সালে জন্ম লাভ করে গিরিসুর শিল্পী গোষ্ঠী। নামকরণ করেন প্রয়াত মিসেস প্রতিমা চাকমা। যিনি হুক্কি মা হিসেবে এক নামে পরিচিত ছিলেন। তাঁদের পরিবারটি পুরোপুরি ছিল সংস্কৃতিমনা। তখন আমি ছিলাম সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক। বলা চলে আমার হাত ধরেই গিরিসুর শিল্পী গোষ্ঠীর জন্ম। গিরিসুর শুধু রাঙ্গামাটিতে নয় দেশের বিভিন্ন স্থানে যেমন: কাউখালী, কাপ্তাই, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে, কক্সবাজারে, ঢাকায়, ঠাকুরগাঁওতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করে অনেক সুনাম ও প্রশংসা অর্জন করে। মনে আছে ১৯৭৩ সালে বিজয় দিবস উদযাপন উপলক্ষে মহিলা সাংসদ মিসেস সুদিপ্তা দেওয়ানের নেতৃত্ত্বে গিরিসুর শিল্পী গোষ্ঠী ঢাকায় অনুষ্ঠান করে। এক পর্যায়ে বঙ্গভবনে বঙ্গবন্ধুর সম্মানে ৩০ মিনিটের বিভিন্ন আদিবাসী নৃত্য পরিবেশন করা হয়। ঐ সময় বঙ্গবন্ধুর হাতে Buddhist Stinted দেওয়ার দাবিতে স্মারকলিপি প্রদান করেন গৌতম কুমার চাকমা (বর্তমানে সম্মানিত সদস্য পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ)। তখন শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন ইউসুফ আলি। গৌতম চাকমা তখন পাহাড়ি ছাত্র সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন আর আমি ছিলাম সিনিয়র সহ-সভাপতি। এটা ছিল ১৯৭৩-৭৪ সালের মেয়াদকাল। রাঙ্গামাটিতে সর্বপ্রথম গিরিসুর শিল্পী গোষ্ঠী জন্মলাভ করে পাহাড়ি ছাত্র সমিতির পতাকা তলে। গিরিসুর শিল্পী গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে অনুপ্রাণিত হয়ে পরবর্তীতে ত্রিপুরা জাতি গোষ্ঠীর “সাধোন খুমবার” এবং মনোজ বাহাদুর গুরকার নেতৃত্বে “সূর্য শিখা” শিল্পী গোষ্ঠীর জন্ম হয়। তখনকার সময়ে নৃত্যের ক্ষেত্রে ঝর্ণা চাকমার নাম ছিল সবার উপরে। তাঁর অনেক নৃত্য সৃষ্টির মধ্য আরও একটি উল্লেখযোগ্য নাচ ছিল উত্তোন পেগে মেঘে মেঘে গানটির উপর অনবদ্য এক সৃষ্টি। এই নৃত্যটি প্রথম পরিবেশিত হয় ১৯৭৩ সালে ১৩ নভেম্বর পাহাড়ি ছাত্র সমিটির প্রতিষ্ঠা বার্ষিক উদযাপন উপলক্ষ্যে। ১৯৭৩ সালে অক্টোবরের শেষের দিকে সাংগঠনিক কাজে যেতে হয়েছিল মারিশ্যায়, একদিন দুপুরবেলায় জীবঙ্গ ছড়ার (বর্তমানে বাবুপাড়া) এক বাড়িতে মিটিং শেষে মারিশ্যার বর্তমান সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অমর শান্তি চাকমা পকেট থেকে একটা গান বের করে বিনম্রভাবে বললেন কথা ও সুর দেখে দিতে। গানের কথা দেখে ও সুর শুনে আমিতো অবাক! গায়ে শিহরণের ঢেউ খেলে গেল। এত সুন্দর ছন্দবন্ধ গভীর অর্থপূর্ণ কথা আর সুর। একটি মাত্র শব্দ এগালা পরিবর্তে এগা মনে বসিয়ে দিতে হল। সুরটা অবশ্য কিছুটা পরিবর্তন করতে হয়েছিল। সে গানটি তাৎক্ষণিক সুর ঠিক করে গলায় তুলে রাঙ্গামটি নিয়ে আসি এবং ১৩ নভেম্বর নাচ ও গান একসাথে পরিবেশিত হয়। পরে এই গানটি জনপ্রিয়তার শিখরে উঠে যায় এবং খ্যাতি লাভ করে। এমন কথার মাধুর্য্য আর গভীরতায় ভরা গান মনে হয় আমিও সৃষ্টি করতে পারিনি। একথা নির্দ্বিধায় বলা চলে যে পাহাড়ি ছাত্র সমিতির পতাকা তলে একমাত্র গিরিসুর শিল্পী গোষ্ঠীই পার্বত্য চট্টলার সাংস্কৃতিক বিপ্লবের জোয়ার সৃষ্টি করে স্বকীয় বৈশিষ্ট্যময় আত্মপরিচয়ের দুয়ার উন্মোচন করে। সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে শাহানা দেওয়ান, নিরুপা দেওয়ান, স্নেহময় চাকমা, মিন্টুনী উল্লেখযোগ্য। নৃত্য শিল্পী ছিলেন ঝর্ণা চাকমা (ধক্কবী), অর্পিতা দেওয়ান, শাশ্বতী দেওয়ান, বিপাশা দেওয়ান, টিঙ্কু তালুকদার, এনাক্ষী খীসা, সুবর্ণা চাকমা, আলোকপ্রিয় চাকমা, স্মৃতিমোহন চাকমা, মোহন মার্মা, বিশ্বকীর্তি ত্রিপুরা, মুকুল মার্মা (বর্তমানে আমেরিকায়), বিনয় চাকমা, স্মৃতিপ্রকাশ চাকমা, সাগরিকা রোয়াজা এবং আরো অনেকে। গীতিকার হিসেবে সুগত চাকমা ননাধন পরিচিতি লাভ করেন একমাত্র গিরিসুর শিল্পী গোষ্ঠীর মাধ্যমে। পাহাড়ি ছাত্র সমিতি না হলে রনজিৎ দেওয়ানের ব্যাপক পরিচিতি লাভ করা সম্ভব হতো কিনা শতভাগ প্রশ্ন থেকে যায়। পাহাড়ি ছাত্র সমিতির গিরিসুর শিল্পী গোষ্ঠীর শিল্পীরা শুধুমাত্র নতুন গান, নৃত্য সৃষ্টি করেনি, পোষাকের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন ও আন্দোলনের জোয়ার সৃষ্টি করেছিল। নারী শিল্পীরা পিনন খাদি পরে যখন নৃত্য গীত পরিবেশন করত তখন অপূর্ব এক পরিবেশ ও আবেগের সৃষ্টি হতো। এ থেকে ধীরে ধীরে নারী সমাজে জন্ম নিল জাতীয় চেতনা। অনেক মা বোন তখন পিনন খাদি পরা শুরু করল। আমি মনে করি বেইন টেক্সটাইলও সুপ্তভাবে এ থেকে প্রেরণা পেয়েছিল। যা আজ আমাদের সমাজে পিনন খাদি ও বয়ন শিল্প অর্থনীতির ক্ষেত্রে এক বিরাট ভূমিকা পালন করছে। এখনো স্পষ্ট মনে আছে ঐ সময় মা আমাকে কোমড় তাঁতে সুন্দর একটা গামছা বুনে দিয়েছিলেন। জাতীয় চেতনায় এত উদ্বেলিত ছিলাম যে, ঐ গামছা পড়ে ছোট্ট রাঙ্গামাটি শহরটা ঘুরে বেড়াতাম। শুধু তাই নয়, ১৯৭২ সালে ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সৈন্যদের (শিখ, ডোগরা, তিব্বতী, ভুটিয়া) সম্মানে প্রশাসনের উদ্দ্যোগে গিরিসুর শিল্পী গোষ্ঠীর পরিবেশিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ঐ গামছাটি পরে আমার লেখা ও সুর করা তৃতীয় চাকমা গানটি (মুর’ বন্দার পুঅ এক মুই) গেয়েছিলাম। এর দেখাদেখি লক্ষী প্রসাদ, বিনয় এবং আরো বেশ কিছু ছেলে তখন কোমড় তাঁতে বোনা গামছা পড়ত।

তখনকার সময়ে শিল্পীরা ছিল ঐক্যবদ্ধ এবং প্রাণ চাঞ্চল্যে হাসি খুশি ভরপুর। বলা যায় নব সৃষ্টির আনন্দে উল্লসিত যা বর্তমান সময়ের শিল্পীদের মধ্যে বড় অভাব দেখা যায়। এর মধ্যে অনেক সময় গড়িয়ে গেল।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের পরিবর্তন হলো। বাকশাল সৃষ্টি হলো। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হলো। বাংলাদেশের রাজনীতির আকাশে কালো মেঘের ঘনঘটা দেখা দিল। চির অবহেলিত বঞ্চিত পার্বত্য আদিবাসী জনগণ অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে স্বশস্ত্র আন্দোলন শুরু করে দিতে বাধ্য হলো। এক অনিশ্চিত তালমাতাল পরিস্থিতির উদ্ভব হল। এই পরিবেশে পাহাড়ি ছাত্র সমিতির কার্যকলাপ বন্ধ হয়ে গেলে স্বাভাবিকভাবে গিরিসুর শিল্পী গোষ্ঠীর সৃষ্ট সংস্কৃতির জোয়ারও স্তব্ধ হয়ে গেল। পরবর্তী সময়ে গিরিসুর শিল্পী গোষ্ঠীর অন্য আঙ্গিকে অন্যরূপে পুনঃজাগরণ ঘটল পার্বত্য জনসংহতি সমিতির অংগ সংগঠন হিসেবে।

আজ বিশ্বরাজনীতির প্রক্ষাপট বদলে গেছে। আন্তর্জাতিক জাতিসমূহের সাথে আমাদের জুম্ম জাতিসমূহের পরিবর্তন হয়েছে মানসিক চিন্তাধারা ও দৃষ্টিভঙ্গির। গিরিসুরও এর ব্যতিক্রম নয় বলে মনে করি। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের আশা আকাঙ্খাকে মনে ধারণ করে একে আরো গতিশীল ও সক্রিয় করতে হবে বলিষ্ঠ কর্ম উদ্দ্যোগের মাধ্যমে। তা না হলে এক সময় “এক যে ছিল রাজা” এর মত অতীত ইতিহাস হয়ে থাকবে।

আকাশ সাংস্কৃতিক আগ্রাসন, মুক্ত বাজার অর্থনীতি, আঞ্চলিক ও জাতীয় রাজনীতির অস্থির পরিবেশ, শান্তি চুক্তির যথাযথ বাস্তবায়ন না হওয়া সর্বোপরি আত্মকেন্দ্রিক স্বার্থপূরণের কারণেই আজ শুধু গিরিসুর শিল্পী গোষ্ঠী নয়, কোন আদিবাসী সংগঠনেই নতুন প্রজন্ম সেভাবে এগিয়ে আসছে না। নিজের সৃষ্টিশীল মেধা ও প্রতিভাকে বিকশিত করে আমাদের আদিবাসী জুম্ম জাতির সাহিত্য সংগীত, নৃত্যকলা, চারুকারু শিল্পকে রক্ষা, উন্নয়ন, প্রকাশ ও প্রচার করা সংরক্ষণের জন্য আমাদেরকেই যত্নবান হতে হবে। রাষ্ট্র বা কোন সরকার তা করে দেবে না। নিজের যোগ্যতা, দক্ষতার বলে বিশ্ব সভায় নিজের আত্ম-পরিচয় তুলে ধরতে হবে। এর জন্য বড় বেশি প্রয়োজন আত্ম-জিজ্ঞাসা, আত্ম-উপলদ্ধি এবং আত্ম-চেতনার জাগরণ। বাংলাদেশে যত আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী রয়েছে তার মধ্যে চাকমারাই সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং শিক্ষার হার ৭৮% শতাংশেরও বেশি। তাই দায়বোধও আমাদের বেশি। অবশ্য এটাও সত্য যে দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ থেকে বড় ভাই আন্তরিকভাবে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য, অভিন্ন স্বার্থ পূরণের জন্য ছোট ভাইয়ের দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেও যদি ছোট ভাই নিজের চাওয়া পাওয়াকে সম্যকভাবে বুঝতে না পেরে বড় ভাই এর হাত ধরে এগিয়ে যেতে না চায় তাহলে বড়ভাই এর কিছু করার থাকে কি?

এখানে আমার কথা হচ্ছে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া যথার্থ নয়, অফিস আদালত, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পিয়ন দারোয়ান থেকে শুরু করে ডাক্তার প্রকৌশলী বড় আমলা হওয়া বড় কথা নয়, নিজের ঐতিহ্য সমাজ সংস্কৃতিকে আত্ম-চেতনার মধ্য দিয়ে ধারণ, লালন, পালনের মাধ্যমে আমাদের মূল শিকড়কে অবলম্বন করে প্রতিযোগিতার বিশ্বে নিজের পরিচয় ও অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতে হবে। তা না হলে অনাগত কালের বিবর্তনে আমাদের পরিচয় হবে ছোট চোখ, খাড়া চুল, বোঁচা নাক, চেপ্টা মুখের গড়ন, নাপ্পি পোড়া মরিচ দিয়ে কোরবু আর চোঙায় গুতাইয়া খাওয়া এক মঙ্গোল জনগোষ্ঠী। তাই আদিবাসী নতুন প্রজন্মের কাছে আমার বিনীত প্রশ্ন আমরা কোনটা চাইবো? আত্ম-অচেতন হয়ে কেবলমাত্র আত্মকেন্দ্রিক স্বার্থপূরণের প্রয়াসে কচুরিপানার মত জীবন আছে ভিত্তি নেই, শিকড় আছে মাটি নেই, বিস্তার আছে স্থায়িত্ব নেই, সৌন্দর্য আছে নেই মনোমুগ্ধকর গন্ধ মাধুর্য। এই পথ দিয়ে কি আমরা আমাদের ঠিকানা নির্ধারণ করবো নাকি হৃদয় ভূমিতে চেতনার বীজ বুনে ফুলে ফসলে ঐতিহ্যমন্ডিত হয়ে জগৎসভায় নিজেদের আসন পেতে নেবো? হে নতুন প্রজন্ম আত্মস্থ হয়ে একবার ভাববেন কি? এখনো সময় আছে চতুর্দিক প্রতিকূল পরিবেশ থাকা সত্বেও এগিয়ে যাওয়ার। প্রয়োজন আত্ম-জিজ্ঞাসা, আত্ম-উপলব্ধি এবং চেতনার বন্ধ দুয়ার খুলে কর্মোদ্যমী হওয়া। নিজের আত্ম-পরিচয়কে ঊর্ধে তুলে ধরা। তা না হলে জাতিগতভাবে সেই বিখ্যাত বাংলা আধ্যাত্মিক গানটির মত বলতে হবে –

“আইলাম আর গেলাম,
পাইলাম আর খাইলাম
ভবে দেখলাম শুনলাম
কিছুই বুঝলাম না।”

এটাই হবে আমাদের ভবিষ্যৎ পরিণতি।

বি.দ্র. এই নিবন্ধটি গত ৫/৩/২০১৩ খ্রিঃ গিরিসুর শিল্পী গোষ্ঠীর সম্মেলনে পঠিত।


রণজিৎ দেওয়ান, গীতিকার, সুরকার ও সংগীত শিল্পী, রাঙ্গামাটি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here