icon

পাহাড়ি নারীর সংগ্রাম

Jumjournal

Last updated Jan 18th, 2020 icon 57

আদিকাল হতে মানব সমাজে নারী ও পুরুষ জীবিকা নির্বাহের তাগিদে যৌথভাবে সংগ্রাম করে আসছে। তবে প্রকৃতি ও সমাজের বিবর্তন বা পরিবর্তনের সঙ্গে নারী ও পুরুষের অবস্থান, ভূমিকা, অধিকার ও মর্যাদার পরিবর্তন হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী পাহাড়ি বা জুম্ম সমাজেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। পাহাড়ে নারীদের সংগ্রাম সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকের। সেখানে সমতলের নারীদের সঙ্গে তাদের সংগ্রামকে মেলানো যাবে না।

শুধুমাত্র পানি সংগ্রহের জন্য একজন নারীকে যে সংগ্রাম করতে হয় তা দেখলে জীবন থমকে যায়। পাহাড়ি দুর্গম পথে দুই থেকে ছয় মাইল হেঁটেও পানি আনতে হয়।

তারপর অন্যান্য খাবার সংগ্রহ, কৃষিকাজ বা দোকান করা অথবা পিঠে ঝুড়ি ভরা কাঠ বা অন্যান্য কৃষি সামগ্রী সামনে সন্তানকে রেখে তার যত্ন করা এটা একজন আদিবাসী নারীর নিত্য দিনের কাজ।

পার্বত্য চট্টগ্রামে দশ ভাষাভাষী এগারটি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সঙ্গতি রয়েছে।

স্বাভাবিকভাবে জুম্ম সমাজের সব জনগোষ্ঠীর মধ্যে নারী ও পুরুষের অবস্থান অধিকার, ভূমিকা ও মর্যাদায় সামঞ্জস্য পরিলক্ষিত হয়।


আদিবাসী নারী সমাজে এক সময় মাতৃতান্ত্রিক পরিবার থাকলেও নিয়মটা না বদলালেও সমাজ ক্রমশ পুরুষশাসিত হয়ে উঠছে।

পুুরুষ শাসিত জুম্ম সমাজে পুরুষের প্রধান্য বিরাজমান। তবে সংসারের কাজ ছাড়াও জুম্ম নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে সক্রিয় অংশগ্রহণ পুরুষের একক কর্তৃত্বের মাত্রাকে হ্রাস করেছে।

পাহাড়ে জুম চাষে বন জঙ্গল কাটার কাজ এবং সমতল ভ‚মিতে জমি কর্ষণ ব্যতীত জুম্ম নারীরা অন্যান্য সব কৃষি কাজে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করে।

ইদানীং শিক্ষিত সমাজে নারী-পুরুষ উভয়েই চাকরিতে কিংবা অর্থোপার্জনের কোনো না কোনো পেশায় নিয়োজিত। ফলত জুম্ম সমাজে অর্থনৈতিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে পুরুষের পাশাপাশি নারীর ভ‚মিকা লক্ষণীয়।

সে ক্ষেত্রে পুরুষের প্রধান্য বিস্তৃতি লাভ করছে। শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে বদলাচ্ছে দিন, বদলাচ্ছে পরিবেশ, পরিস্থতি মানসিকতা।

দুজনে চাকরি করলেও টাকাটা পুরুষের ইচ্ছায় খরচ হয় বা নারী নিজের ইচ্ছা খরচ কওে না, তাতে অশান্তির ভয় থাকে। ক্রমশ সমাজ এমন হয়ে উঠছে।

স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদ, বহুবিবাহ, সন্তান-সন্ততির গৃহত্যাগ বা ত্যাজ্যকরণকে সমাজে সম্মানের চোখে দেখা হয় না।

ফলে দিনের পর দিন কোনো নারী যন্ত্রণায় পুড়লে বা নির্যাতিত হলে সে স্বাধীনভাবে চলে আসতে পাওে না সমাজের ভয়ে।

আগেকার দিনে নারীদের ব্যাপকভাবে হাটে-বাজারে, রাস্তাঘাটে দেখা যেত। আজগুলো তারাই করত। কিন্তু এখন নারীদের বাইওে ঘোরাফিরাকে সমাজে অপছন্দ করা হয়।

শিক্ষার প্রসার লাভের সঙ্গে সঙ্গে এসব সংকট নতুন করে যুক্ত হয়েছে। কিছু কিছু নারীকে উত্তরাধিকার সূত্রে কিংবা গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সমাজ শাসনের বিভিন্ন পদেও অধিষ্ঠিত হতে দেখা যায়।

যৌতুক প্রথা, জোরপূর্বক বিয়ে দেয়া, বধূ নির্যাতন ইত্যাদি পাহাড়িদের মধ্যে নেই বললেই চলে। কিন্তু নারী অধিকারের প্রশ্ন ক্রমশ সঙ্কুচিত হয়ে আসছে।

পিতৃতান্ত্রিক পরিবারের দিকে আদিবাসী সমাজ ঝুঁকে গেলে আগের শান্তি বিনষ্ট হতে থাকে। পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব থেকে নতুন নতুন আইন প্রয়োগ হতে শুরু হয় পুরো পার্বত্য অঞ্চলে।

তাতে যেসব সমস্যা হয় তাহলো পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই নারীকে সব সময় অধীনতার প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের ৮০ শতাংশের বেশি নারী ঘরের বাইরে কাজ করে থাকেন। তা সত্ত্বেও সম্পদের ওপর পাহাড়ি নারীদের অধিকার না থাকায়, পুরুষের চেয়ে নারীরা আজো অনেকটাই পিছিয়ে।

পাহাড়ি সমাজের প্রচলিত উত্তরাধিকার প্রথায় ছেলে সন্তানই সম্পদের একক অধিকারী হিসেবে গণ্য হয়। প্রথাগত আইনের মাধ্যমে নারীদের এ অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে।

ফলে সম্পত্তির ওপর নারীর মালিকানার বিষয়টি পরিবারের পুরুষের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপরই নির্ভরশীল। কেবল দান বা উইলের মাধ্যমে নারীরা সম্পত্তির অধিকার লাভ করতে পারেন। এ ছাড়া, স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রী অধিকার লাভ করতে পারেন।

তবে অপুত্রক অবস্থায় অন্য কোথাও বিয়ে হলে, তিনি প্রয়াত স্বামীর সম্পত্তির ওপর অধিকার হারান।

পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রশাসনিক কাঠামোর অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হচ্ছে ‘পার্বত্য জেলা পরিষদ’ ও ‘আঞ্চলিক পরিষদ’। এ ছাড়া ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও উপজেলা পরিষদে নারীর ক্ষমতায়নের সুযোগ রয়েছে।

১৯৯৭ সালে পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর, পার্বত্য জেলা পরিষদগুলোয় ১৯৯৮ সালে সংশোধনী আনা হয়। সেই সংশোধনীর মাধ্যমে জেলা পরিষদগুলোয় দুজন পাহাড়ি এবং একজন বাঙালি নিয়ে তিনজন নারী সদস্য অন্তর্ভুক্ত রাখার ব্যবস্থা আছে।

কিন্তু অন্তর্র্বতী পরিষদে দীর্ঘ একযুগ ধরে কোনো নারী প্রতিনিধিত্ব নেই। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় নারীর প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি উপেক্ষিত রয়ে গেছে।

বর্তমানে নারীর মতামতের বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্ব পাচ্ছে, কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থানীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থায় নারীর মতামত প্রকাশের অধিকারকে স্থবির করে দেয়া হয়েছে।

শুধু সংখ্যালঘুদের ভোট পাওয়ার জন্য নয়, বরং সংসদে এমন আদিবাসী নারী প্রতিনিধি থাকা উচিত, যারা আদিবাসী নারীদের স্বার্থ সংসদে তুলে ধরে তাদের নিরাপত্তা ও ক্ষমতায়নকে নিশ্চিত করতে পারবেন।

সুতরাং পার্বত্য চট্টগ্রামে নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রকে প্রসারিত করতে হলে স্থানীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথাগত ব্যবস্থায় নারীর উত্তরাধিকার নিশ্চিত করতে সামাজিক আইনের পরিবর্তন, বিবাহ নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা দরকার। সমাজের অর্ধেক অংশ নারী।

কিন্তু বাস্তবতার আদলে দেখা যায়, পার্বত্য নারীদের সংকট এক ধরন থেকে আরেক ধরনের হয়েছে। তাতে সংকট থামেনি। কাজেই তাদের পিছনে ফেলে রেখে আন্দোলনের অগ্রগতি সম্ভব নয়।

লেখকঃ দীপঙ্কর গৌতম
তথ্যসূত্রঃ ভোরেরকাগজ ডট কম।

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - [email protected] এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা

Jumjournal

Administrator

Follow Jumjournal

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *