icon

পাহাড়ী বাংলার কবি কার্তিকচন্দ্র তঞ্চঙ্গ্যা , কবিরত্ন

Jumjournal

Last updated May 8th, 2021 icon 197

পাহাড়ী বাংলার কবি কার্ত্তিকচন্দ্র তঞ্চঙ্গ্যা , কবিরত্ন
(১৯২০- ২২শে মার্চ ১৯৯৭)
ড. মনিরুজ্জামান

ভূমিকাঃ

তঞ্চঙ্গ্যাদের সাহিত্য-চর্চার ইতিহাস দুই ধরণের। এক. গেঙ্গুলি তথা চারণকবিদের গীত উভাগীত, ধনপুদির গীত, ‘পুরান কদা’ কিংবা শিবচরণের (অষ্টাদশ শতক) গােসাইনলামা অথবা রামায়ণ-মহাভারত ও জাতকাদির জনপ্রিয় কাহিনীর ব্যাখ্যামূলক নীতি বা গীতিকা রচনা।

এসব গীত গেঙ্গুলিদের সংগৃহীত, হস্তলিখিত এবং প্রাচীন চাকমা (মনক্ষেমর) ও বার্মা লিপিতে চাকমা/তঞ্চঙ্গ্যা ভাষায় রচিত। এর সবই অপ্রকাশিত (উভাগীতের কিছু অনুবাদ যথা সলিল রায় কৃত ইংরেজি অনুবাদ ও বঙ্গীয় সংস্করণ এর ব্যতিক্রম)। গেঙ্গুলি সংগ্রহের কিছু নমুনা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রন্থাগারে ফটোকপি হিসাবে চয়িত আছে।

এই ধরণের রচনা ব্যতীত আর যা পাওয়া যায় তা বাংলা ভাষায় রচিত পার্বত্যবাসীদের নানা গ্রন্থ ও সম্পাদিত নানা পত্রিকা ও সাময়িকা, – যার প্রধান ভাষা বাংলা। অর্থাৎ এ গুলিকে চাকমা ও অন্যানা পার্বত্যজাতির বাংলা ভাষাপ্রীতির ও বাংলা ভাষায় সাহিত্য চর্চার প্রকাশ। এবং সাহিত্যের নানা দিকে নিজেদের প্রতিভা স্ফুরণের প্রচেষ্টা।

এখানে বাংলাভাষী লেখকদের সাথে প্রতিযােগিতার কোনও প্রয়াস এখনও লক্ষ্য করা যায় না যদিও বাংলা সাহিত্যের (বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ প্রভৃতির) সমালোচনার যােগ্যতা তারা রাখেন এবং সেসব রচনা বাস্তবিক উপভােগ্য।

সাহিত্যের নানা বর্গে (genre) তাদের এই পদচারণার(নাটকে উপন্যাসে গল্পে আলােচনায়। অনুবাদে ও গানে এবং মৌলিক কবিতায় নানা পরীক্ষা নিরীক্ষা তাদের এসব সৃষ্টির প্রয়াস যথেষ্ট উজ্জ্বল ও সম্ভাবনাময়) কোন স্বতন্ত্রমূল্য আছে বা হবে কি না তা এখনও বলার সময় আসে নি।

তবে এই সব সৃষ্টি বা প্রকাশনার ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক ভাষিক ও সাহিত্যিক মূল্য একদিন হয়তবা অনুসন্ধানের বিষয় হয়ে উঠতে পারে। আজ কাল ডায়াসপােরা ( Diaspora) বা অভিবাসিতের সাহিত্যের যে মূল্যায়ন হচ্ছে, সেই রকম এসব বিভাষীদের বাংলা চর্চার মূল্যও যে কালের দাবী হয়ে উঠবে না, কে বলতে পারে? এই প্রশ্নের প্রাসঙ্গিকতায় আমরা রাজস্থলী (কাপ্তাই) এক অস্ফুট কিন্তু অসাধারণ এক প্রতিভা কার্তিকচন্দ্র তঞ্চঙ্গ্যার পরিচিতি প্রদানে প্রবৃত্ত হবাে।

পটভূমিঃ

বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের পর পার্বত্যবাসীদের উল্লেখ করে প্রমথবিশী বলেছিলেন, বঙ্গভূমি কেবল পূর্ব বাংলা এবং পশ্চিম বাংলাই নয়, পার্বত্য বাংলাও। যাই হােক, বাংলা ভাষা শিক্ষার মাধ্যম হওয়ায় পার্বত্যবাসীরাও বাংলা চর্চায় আগ্রহী হন।

যদিও নন্দলাল শর্মার ভাষায় ‘বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় পার্বত্য চট্টগ্রামবাসীদের অবাধ বিচরণের সংবাদ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে উপেক্ষিত’। যাই হােক তঞ্চঙ্গ্যাদের এই বাংলা সাহিত্য চর্চার ইতিহাস চাকমাদের বাংলা সাহিত্য চর্চার ইতিহাসের সাথে যুক্ত।

একথা সত্য যে, বাংলা ভাষা ও সাহিত্য-সংস্কৃতিকে প্রথম আলিঙ্গন জানান চাকমা রাজবাড়ির প্রধান পুরুষগণ। তবে যতদূর জানা যায় এ বিষয়ে রাঙ্গামাটি সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়েরও একটি সক্রিয় ভূমিকা আছে। স্কুলটি বিশ শতকের গোড়ায় প্রতিষ্ঠিত হয়। এই স্কুলের শিক্ষক সতীশচন্দ্র ঘােষ ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকা’র ত্রয়ােদশ বর্ষ চতুর্থ সংখ্যায় (কলিকাতা, ১৩১৪) ‘চাকমাদিগের ভাষা তথ্য’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেন।

পরে তিনি (সম্ভবত রাজবাটির উৎসাহ ও প্রণােদনায়) ‘জ্যোতি’ পত্রিকার লেখক গগনচন্দ্র বড়ুয়ার সূত্র ব্যবহার করে ও বহু শ্রম স্বীকার করে ‘চাকমাজাতি’ ( ১৩১৬ সন) শীর্ষক একটি গ্রন্থও প্রকাশ করেন।

সিবিলিয়ানদের পরে ও বাংলাভাষাতে এটিই প্রথম পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীগণের সম্পর্কে একটি বিস্তারিত বঙ্গীয় অম্বেষণ। এক দশক পরে রাজা ভুবনমােহন রায়-এর ‘চাকমা রাজবংশের ইতিহাস’ (১৯১৯) প্রকাশিত হয়। এটিই চাকমাদের কর্তৃক বাংলা চর্চার আদি নির্দশন।

তবে কলকাতার বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় (বিচিত্রা, দেশ প্রভৃতি) রাজ পরিবারেরই লেখা কিছু কিছু গল্প কবিতা এর আগেও প্রকাশিত হয়ে থাকবে। কুমার কোকনদক্ষ রায়ের সাহিত্য চর্চার ইতিহাস সেই সাক্ষ্য দেয়।

যাই হােক, বাংলা ভাষা চর্চায় পৃষ্ঠপােষকতা দানে পরবর্তী কালেও রাজবাটির উৎসাহের প্রাবল্য লক্ষ্য করা গেছে। রানী কালিন্দী রায়, রানী বিনতা রায়, রাজা নলিনাক্ষ রায়, কুমার কোকনদাক্ষ রায়, এঁরা সকলেই যেমন নিজেরা যােগ্যতার সাথে বাংলা সাহিত্যের সেবা করেছেন, তেমনি অন্যদেরও সে সুযােগ সৃষ্টি করে দিয়েছেন।

বাংলা ভাষা-চর্চার এই পরিবেশটি আসলে গড়ে ওঠে বিংশ শতকের তৃতীয় দশকেরও মধ্যকালে এসে। প্রথম মহাযুদ্ধের পর বাংলাদেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতির অঙ্গনে, এমন কি রবীন্দ্রনাথের নিজের সাহিত্য- পটভূমিতেও নানা পরিবর্তন যােজিত হতে থাকে।

নতুন পত্র পত্রিকার আবির্ভাব, উনিশ শতকের সাহিত্যের ভিন্ন মূল্যায়ন, মাক্সির্য় দর্শনের প্রভাব, লােকসংস্কৃতির পঠনপাঠন (কবি জসীম উদদীনেরও আবির্ভাব এই সময় : রাখালী ও কর’ ১৯২৭, নকশীকাঁথার মাঠ ১৯২৯, সােজন বাদিয়ার ঘাট ১৯৩৩ প্রভৃতি) এবং রাজনৈতিক দর্শনের ক্ষেত্রে হিন্দু-মুসলিম ঐক্য, নৰ জাতীয়তাবাদ প্রভৃতি ‘কাল-চিহ্ন’ বহন করে চলছিল সময়ের নিম্নবাহী স্রোত।

সমকালীন আধুনিক বাংলা সাহিত্যেও আধুনিকতার নামে এক ‘তিমির তীর্থ’ পরিক্রমণে উদ্যোগী তখন। এই পটভূমি বৃহত্তর দেশ ও তার সংস্কৃতিকে অন্যরকম প্রতিক্রিয়ার মুখােমুখি করে। অর্থাৎ একদিকে এক ধরেণর নম্রজাতীয়তাবাদ ও অন্যদিকে নাগরিক বােধ সৃষ্টি ও বিশ্বমুখিন চেতনা বিকাশের নামে শিকড়বিহীন যে আধুনিক সাহিত্য ও নব সংস্কৃতি সৃষ্টি, তার প্রতি অনীহা সংস্কৃতি- সচেতন মানুষকে তার অন্তবােধের প্রতি বিশ্বস্ত হতে প্রেরণা যােগায়।

বৃত্তের মধ্যে যে কেন্দ্রাতিগ ও কেন্দ্রাভিমুখী শক্তির কথা বলা হয়। এখানে যেন তারই উদাহরণ লক্ষ্য করা যায়। এইভাবেই কেন্দ্র থেকে দূরে প্রান্তীয় অবস্থানে বাংলাভাষার লােকজ, আঞ্চলিক বা গ্রামীণ, এবং উপসীমান্তিক একটি স্বতন্ত্র ধারা গড়ে উঠতে থাকে।

রেঙ্গুনে ‘বুদ্ধবাণী’ প্রকাশ ও পার্বত্য চট্টগ্রােম ছাত্র সমিতির মুখপত্র ‘প্রগতি’ প্রকাশনা (যদিও অস্থায়ী) এবং রাঙ্গামাটিতে গৈরিকা-গােষ্ঠীর উত্থান তারই প্রামাণ্য বহিঃপ্রকাশ।

গৈরিকা’র প্রভাবে ও গৈরিকা’র অবর্তমানে পরে আরও কিছু পত্রিকার ও আবির্ভাব ঘটে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে। ‘গৈরিকা’র প্রকাশ কাল (১৯৩৬- ১৯৫১), পরে বান্দরবানে ‘ঝরণা’ (১৯৬৬), এবং আরও পরে রাঙ্গামাটিতেই ‘বনভূমি’, ‘পার্বত্যবাণী’ প্রভৃতি প্রকাশিত হয়। ‘পার্বত্যবাণী’ সম্পাদনা করেন বিরাজমােহন দেওয়ান (১৯৬৭-১৯৭০;মােট সংখ্যা ২৬টি)। এতে আগরতারা ও উভাগীত এবং রাজ পরিবারের অনেকের রচনা ও স্মৃতি কথাও (রানী বিনীতা রায়ের জীবনস্মৃতি সহ) প্রকাশিত হয়।

পার্বত্য চট্টগ্রাম ও বিশেষ করে রাঙ্গামাটি থেকে পরবর্তীতে বহু পত্র-পত্রিকা ও সংকলন প্রকাশিত হলেও (বিস্তৃত তালিকার জন্য বর্তমান লেখকের গােষ্ঠী পত্রিকা ও সাময়িকী ২০০৬ দেখা যেতে পারে। এছাড়া নন্দলাল শর্মারও একটি সমীক্ষা রয়েছে)। ‘গৈরিকা’র ভূমিকা ঐতিহাসিক। ‘গৈরিকা’র নামকরণেরও ঐতিহ্য আছে। এটি রবীন্দ্রনাথের দেওয়া নাম। রানী বিনীতা রায়ের পরিচালনায় রাঙ্গামাটি থেকেই এটি প্রকাশিত হয়।

রাজা নলিনাক্ষ রায়ের প্রয়াণে তার স্মৃতি সংখ্যাটিই এর শেষ সংখ্যা ছিল (১৯৫১)। প্রভাতকুমার দেওয়ান ও পরে অরুণ রায় পত্রিকাটি সম্পাদনা করেন। অরুণ রায়ের প্রথম প্রকাশ ‘বুদ্ধবাণী’তে (রেঙ্গুন)।

আরও অনেকের প্রাথমিক প্রস্তুতি বাইরের, তন্মধ্যে কলকাতা আর্ট কলেজের ছাত্র ও রবীন্দ্রপ্রভাবিত গীতিকার চূণীলাল দেওয়ানের কথাও বলা যায়। কুমার কোকনদাক্ষ রায়ের কথা আগেই বলা হয়েছে।

কিন্তু নন্দলাল শর্মার উক্তিটি সমর্থন করে বলা যায় যে, সাম্প্রতিককালে চাকমা ভাষায় যে কবিতা চর্চা হচ্ছে তার ভিত্তি স্থাপন করেছে ‘গৈরিকা’। নন্দলাল শর্মা গৈরিকা’র লেখকদের একটি তালিকাও প্রস্তুত করেছেন এভাবে।

প্রভাত কুমার দেওয়ান, অরুণ বা, কন্যার কোকনদাক্ষ রায়, বঙ্কিমকৃষ্ণ দেওয়ান, রানী বিনীতা রায়, অবিনাশচন্দ্র দেওয়ান, কালাঞ্জয় চাকমা, ঘনশ্যাম দেওয়ান, ভগবানচন্দ্র বর্মন, শেখর দেওয়ান, ও সােমেন দেওয়ান (আসলে বঙ্কিমকৃষ্ণ দেওয়ানের দুটি ছদ্মনাম), কুমার বিপাক্ষ রায়, গােপাল চন্দ্র গুর্খা, তনুৱাম খীসা, নীলা রায়, বিপুলেশ্বর দেওয়ান, রাজা নলিনাক্ষ রায়, চমীকাল দেওয়ান, শান্তি রায়, সুনীতিজীবন চাকমা, গিরীন্দ্র বিজয় দেওয়ান, নীরােদরঞ্জন দেওয়ান, কুমার রমণী মােহন রায়, সলিল রায়, মুকুন্দ তালুকদার, জগদীশ চন্দ্র বর্মন ও রাজেন্দ্রনাথ তালুকদার।

এই তালিকায় হয়তাে আরও দু একটা নাম যুক্ত হতে পারে যেমন, কুমার কুবলয়াক্ষ রায়, সৌমেন্দ্র নারায়ণ দেওয়ান, নােয়ারাম চাকমা, বেণীমাধব বড়য়া প্রভৃতি। পরবর্তীতে আমরা এমন অনেককে পাই যাদের নাম এই তালিকায় পাই, যেমন- বীরকুমার তঞ্চঙ্গ্যা, বিজয়কেতন চাকমা বা মহেন্দ্রলাল ত্রিপুরা প্রভৃতি।

হতে পারে গৈরিকা-গােষ্ঠী ভুক্ত ছিলেন না তারা। সেই রকমই একটি নাম হল কার্তিকচন্দ্র তঞ্চঙ্গ্যা (১৯২০-২২শে মার্চ ১৯৯৭)।

তিনি কোনও দলভুক্ত হয়ে সাহিত্য চর্চার প্রয়ােজনীয়তা স্বীকার করেন নি বলে প্রতীয়মান হয়। তিনি স্বাধীনভাবেই সাহিত্য চর্চা করেছেন, যদিও ‘পার্বত্যবাণী’তে তাঁর কিছু রচনা প্রকাশিত হতে দেখা যায়।

অন্য পত্রিকায়ও তার রচনা প্রকাশিত হয়ে থাকবে। বস্তুত কার্তিকচন্দ্রের আবির্ভাব কালের সময় ও পরিবেশ ছিল এটাই। অবশ্য তাঁর প্রথম আবির্ভাবের তথ্যটি অর্থাৎ প্রথম রচনা প্রকাশের তথ্য এখনও অস্পষ্ট। তাঁর অনেকগুলি পান্ডুলিপি পাওয়ার পর তাঁর সম্পর্কে আগ্রহ বৃদ্ধি পেয়েছে এ কথা স্বীকার্য।

কবি কার্তিকচন্দ্র তঞ্চঙ্গ্যা ভূমিকা ও অবস্থান

কবি কার্ত্তিকচন্দ্র যা কিছু রচনা করেছেন তা মূলত বৌদ্ধ সাহিত্য এবং তাঁর সবই বাংলা ভাষায় রচিত। তিনি কি বৃহত্তর পাঠকের চিন্তা থেকেই তা করেছিলেন? তঞ্চঙ্গ্যা সমাজেই বা তার অবস্থান কোথায়? – এ প্রশ্নের উত্তরে ও বিশ শতকের তৃতীয় দশকেই যেতে হবে আমাদের, যখন পালিসাহিত্য চর্চায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছেন বিলাইছড়ি রাইংখ্যং-এর আশাছড়িমুখ নিবাসী এক লােক চিকিৎসক- কবি পমলাধন।

পমলাধনের সমকালে বা সামান্য আগে শরৎ রােয়াজার এবং চূনীলাল দেওয়ানের সংগীত ও কাব্যচর্চার কথা কেউ কেউ উল্লেখ করেন (দ্রষ্টব্য, নন্দলাল শর্মা, ঐ), কিন্তু। তাদের কোনও গ্রন্থ পাওয়া যায়নি।

পলাধন ধর্ম- সাহিত্যের দিক থেকে চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যাদের আদি কবি। তারই যােগ্য উত্তর পুরুষ কার্তিকচন্দ্র তঞ্চঙ্গ্যা। পলাধনের সাহিত্যকে বিস্তৃত করেন তিনি। এবং বাংলা সাহিত্যের চর্চার মধ্য দিয়েই তঞ্চঙ্গ্যাদের অবস্থানকে উজ্জ্বল করেন এই দুই কৃতিমান পুরুষ।

কার্তিকচন্দ্রের জন্ম হয় ১৯২০ সালে। প্রথম মহাযুদ্ধের পর । তিনি চাকমা জাতির ইতিকথা’র বিখ্যাত লেখক বঙ্কিমকৃষ্ণা দেওয়ান এর সমবয়সী এবং বিরাজ মােহন দেওয়ান (চাকমা জাতির ইতিবৃত্ত), প্রভাতকুমার দেওয়ান (গৈরিকা-সম্পাদক), চূনীলাল দেওয়ান (চাকমা কবিতা, জুমিয়া গৃহিণী –লেখক), কবি অরুণ রায়, গল্পকার জগদীশ দেব বর্মন, প্রবন্ধকার ভগবানচন্দ্র বর্মন, ‘প্রগতি’ সম্পাদক শরৎচন্দ্র তালুকদার ও সুনীতিজীবন চাকমা, কবি-অনুবাদক সলিল রায়, তঞ্চঙ্গ্যা পরিচিতি’র লেখক বীরকুমার তঞ্চঙ্গ্যা প্রমুখের তিনি সমকালীন বা অগ্রজ। তাঁর “বৌদ্ধগল্পমালা’ (১৩৯৬) গ্রন্থের ভূমিকায় (আমার কথা) প্রদত্ত দুটি তথ্য নিম্নরূপ:

“… রাঙ্গুনীয়া উত্তর পদুয়া শাক্যমনি বিহারের অধ্যক্ষ বৌদ্ধসাহিত্য সুসাহিত্যিক ও সুপন্ডিত শ্রীমৎ প্রিয়দর্শী মহাস্থবির মহােদয় আমার রচিত এই বৌদ্ধগল্পমালা পুস্তকের পান্ডুলিপিখানা আগাগােড়া পড়ে আমাকে ধর্ম প্রচারের জন্য বিশেষ ভাবে উৎসাহিত করেন। আমি মহাস্থবির মহােদয়ের নিকট চির কৃতজ্ঞ।
‘পার্বত্য চট্টগ্রাম রাঙ্গামাটী সরকারী কলেজের বাংলার অধ্যাপক বাবু নন্দলাল শৰ্মা তাঁহার লিথিত ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের (বাংলা) সাহিত্য ও সাহিত্যিক’ পুস্তকে আমার রচিত পুস্তক সমূহ বিশেষভাবে সমালােচনা করে আমাকে চির কৃতজ্ঞতা পাশে আবদ্ধ রেখেছেন।”…

দুটি মন্তব্যের অনুরূপ বক্তব্য তাঁর অপরাপর গ্রন্থেও লক্ষ্য করা যায়। অর্থাৎ কবি তাঁর প্রতিটি গ্রন্থেই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে গিয়ে কোনও না কোনও ধর্মগুরু বা রাজগুরুর কথা উল্লেখ করেছেন এবং ধর্মপ্রচার ও মানুষের মঙ্গলের বিবেচনাকেই সেখানে প্রধান্য দিতে দেখা গেছে।

মহাস্থবির মহােদয়ের প্রভাবে তিনি এই গ্রন্থ শেষেও বলেছেন, ‘এই পুস্তকের দ্বারা ধর্মপ্রাণ নর-নারীগণের যৎসামান্য উপকারে আসলে আমার রচনা শ্রম সার্থক মনে করবাে।’ এই গ্রন্থের প্রকাশকাল ১৩৯৪/১৯৮৭ ইং। অর্থাৎ এর আগেও তিনি যেসব ধর্মকেন্দ্রি গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন, যেমন- মহাবােধি পালঙ্ক কথা (১৯৮৪), বুদ্ধ সালামী গাথা (১৯৮৫) কিংবা যেসব রচনার পান্ডুলিপি পাওয়া গেছে যেমন – রাধামন ধনপতি প্রভৃতি মিথ ভিত্তিক জাতীয় লােক গাথা এবং “অশােক চরি” নামীয় একটি চরিত কাব্য ও অন্যান্য কিছু রচনা, – সেগুলিরও প্রত্যেকটি মধ্যেই কবির এই ধর্মপ্রীতি ও ধর্মপ্রচারের আকাঙ্খা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

আগেই উল্লেখিত হয়েছে, (১৯৩৬ সালে) পমলাধন তঞ্চঙ্গ্যা ‘ধর্মজ জাতক’ গ্রন্থটি মূল পালি থেকে পদ্যানুবাদ করে বা পদ্যরীতিতে ভাবানুবাদ করে এবং তৎসহ ‘ধর্ম্ম হিত উপদেশ’ সংযােজন করে বাংলা ভাষায় বৌদ্ধধর্ম সাহিত্য রচনার সূচনা করেছিলেন, কার্তিকচন্দ্র তঞ্চঙ্গ্যা তাকেই আদর্শ হিসাবে নিয়েছেন।

এই সাহিত্যের শাখাকে বিস্তৃত করাতেই মনােযােগী হয়েছেন তিনি। কাজটি তিনি সম্পন্ন করেছেন, দুই ভাবে- মননী মেধা প্রয়ােগে (যেমন, তত্ত্ব- কাব্য ও ধর্মকাব্যের মাধ্যমে) ও সৃজনী মেধার মাধ্যমে বা মৌলিক রচনার মধ্য দিয়ে, অর্থাৎ চরিত কাব্য, কাহিনী বা গাথা কাব্য ও কাব্য নাটক সৃষ্টির মাধ্যমে।

রচনার বিষয় ও তার সরস প্রকাশ, নাটকীয় গুণ ও কাব্যবােধ মিলিয়ে উৎকর্ষের পরিচয় পাওয়া যায় তাঁর সকল সৃষ্টিতেই। উল্লেখ্য কার্ত্তিকচন্দ্র ‘মহাবােধি পালঙ্ক কথা’র সাথে পমলাধনের ‘ধর্যধ্বজ জাতক’ গ্রন্থটিও সম্পাদিত ও সংশােধিত আকারে প্রকাশ করেন।

এই কারণে তিনি রাজস্থলী বিহারপতি কর্তৃক “পন্ডিত” ও ‘উদয়ন যন্ত্র’ রচনার জন্যে প্রিয়দর্শী মহাস্থবির কর্তৃক “কবিরত্ন” উপাধি লাভ করেন রাঙ্গুনীয়া উত্তর পদুয়া বৌদ্ধ সমিতির আয়ােজনে।

কবি কার্তিকচন্দ্র তঞ্চঙ্গ্যা রচনা পরিচিতি

কবি তাঁর একাধিক গ্রন্থে অধ্যাপক নন্দলাল শর্মার উল্লেখ করে বলেছেন তিনি তাঁর (কবির) গ্রন্থের মূল্যায়ন করেছেন, এজন্য তিনি তাঁর (অধ্যাপক শর্মার) কাছে কৃতজ্ঞ। ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের বাংলা সাহিত্য ও সাহিত্যিক’ (১৯৮১) পুস্তিকায় নন্দলাল শৰ্মা পাহাড়ী বাংলা সাহিত্যের সামগ্রিক মূল্যায়ন তুলে ধরেছেন এবং সেই প্রসঙ্গেই কার্ত্তিকচন্দ্র তঞ্চঙ্গ্যার কথাও এসেছে প্রাসঙ্গিক ভাবেই। উক্ত গ্রন্থের বিভিন্ন অধ্যায়ে কার্ত্তিকচন্দ্রের মূল্যায়ন সমূহ আমরা প্রথমে তুলে ধরতে চাই। তা নিম্নরূপ –

১. উদয়ন বস্তু:

১৯৬১ সালে প্রকাশিত হয় কার্তিকচন্দ্র তঞ্চঙ্গ্যার ‘উদয়ন বস্তু’। পয়ার ছন্দে লিখিত এবং ছাব্বিশটি ছােট ছােট অধ্যায়ে বিভক্ত। এই কাব্য গ্রন্থে বর্ণিত শ্যামাবতীর কাহিনী যুদ্ধের সমকালীন ঘটনা হলেও অনেকটা বুদ্ধের পূর্ববর্তী ঘটনা সম্বলিত।

বার্মায় ষষ্ঠ সংঘায়নের কার্যকারক বার্মা ইউনিয়ন বুদ্ধ শাসন কর্তৃক প্রচারিত The light of the Dhamma নামক প্রচার পত্রের The story of udena (Udena Vathu) অনুসরণে কাব্যটি রচিত। কর্মফলের দৃষ্টান্ত দেখিয়ে কবি এ কাব্যের শেষাংশে বলেছেন-

“দানশীল ভাবনাতে মন কর স্থির
কুশল কর্মেতে লিপ্ত থাক সদা ধীর।”

২. অনাগত বংশ :

“অনাগতবংশ’ নামে তিনি একখানা কাব্য প্রণয়ন করেছেন। বর্মী ভাষায় রচিত মূল গ্রন্থটি বাংলায় অনুবাদ করেন চিনি অং মাষ্টার। সেখান থেকে কার্তিক বাবু সরল পয়ার ছন্দে বইটি রচনা করেন। এ কাব্যে আর্থমিত্র প্রমুখ অনাগত বৃদ্ধদের সংক্ষিপ্ত জীবনী বর্ণিত হয়েছে।” (পৃ. এগার)

৩. বিজয়গিরি:

“মূলত কবি হলেও কার্ত্তিকচন্দ্র তঞ্চঙ্গ্যা (জন্ম ১৯২০) দু’খানা নাটক রচনা করেন। তাঁর নাটকদ্বয় প্রকাশিত হয় নি। ঐতিহাসিক কাহিনী অবলম্বনে রচিত ‘বিজয়গিরি’ চার অঙ্কের নাটক।

চম্পক নগরের রাজা উদয়গিরির পুত্র বিজয়গিরিকে রাজ্যভার অর্পন করে শ্রী বৌদ্ধ মন্দিরে গমন করতে চান। কিন্তু বিজয়গিরি বের হতে চান দিগ্বিজয়ে। এ সময় উদয়পুরের রাজা জংলী কুকীরাজ কালঞ্জয় দ্বারা আক্রান্ত হয়ে তাঁদের শরণাপন্ন হন।

বিপুল বিক্রমে বিজয়গিরি মিত্ররাজ্য পুনরুদ্ধার করেন। রোয়াং দেশের রাজা মঙ্গল উদয়পুর লুণ্ঠন করতে আসলে সেনাপতি তা প্রতিহত করেন। বিজয় অভিযানে বের হয়ে বিজয়গিরি রােয়াং রাজ্য জয় করেন। এই হল নাটকের সংক্ষিপ্ত কাহিনী।

ঐতিহাসিক ঘটনার প্রতি অনুগত থেকেও নাট্যকার কতিপয় কাল্পনিক চরিত্র-নাগরিকগণ, ব্রাহ্মণ-ব্রাহ্মণী, গয়ারাম, গঙ্গরাম প্রভৃতি চরিত্র উপস্থাপন করে হাস্যরস সৃষ্টি করেছেন।

এ নাটকের সংলাপ কখনাে গদ্যে আবার কখনাে মিলহীন প্রবহমান। পয়ার ছন্দে রচিত হয়েছে। বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে কথনাে দৃশ্যে উপস্থাপিত করা হয়েছে। বিবেক চরিত্র ও সংগীতের সংযােজন নাটকটিকে যাত্রাভিনয়ের মর্যাদা দান করেছে।”

৪. মানুষ দেব :

“ ভগবান গৌতম বুদ্ধের অতীত (জাতক) কাহিনী অবলম্বনে কার্ত্তিকচন্দ্র তঞ্চঙ্গ্যা ‘মানুষ দেবতা’ নামে তিন অঙ্কের একখানা নাটক রচনা করেছেন। রাজস্থলী মৈত্রী বিহারে নাটকটি মঞ্চস্থ হয়েছে।

মঘবা নামে বােধিসত্ত্ব মানুষকে পঞ্চশীল পালনে ও জনহিতকর কার্যে উধুদ্ধ করেন। মাতালদের বিচার করে উৎকোচ করত মন্ডল। মদ্যপান বন্ধ হয়ে গেলে সে মঘবাকে ডাকাত বলে রাজ সমীপে নালিশ করে। বিনা বিচারে মঘবার শাস্তি হয়। কিন্তু মহমী মঘবাকে পদলিত না করায় রাজা নিজের ভুল বুঝে মঘকে মুক্তি ও মন্ডলকে প্রাণদন্ডে দন্ডিত করেন।

জাতকের এ কাহিনীকে যাত্রাগানের মত নাট্যকার উপস্থাপিত করেছেন। আধুনিক নাট্যকলা শ্ৰী তঞ্চঙ্গ্যার নাটকে অনুপস্থিত। ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় চেতনাই তাঁকে নাট্য রচনায় উদ্বুদ্ধ করেছে।”

৫. রাধামন ধনপুদি গেঙ্গুলী গীত :

“ বান্দরবান মহকুমার ‘মৌলিক গণতন্ত্রী’ হেডম্যান ও জনসাধারণের একমাত্র মুখপত্র ত্রৈমাসিক ‘ঝরণা’র প্রথম সংখ্যার ১৯৬৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বান্দরবান থেকে প্রকাশিত হয়।

… চার সংখ্যা প্রকাশিত হবার পর ‘ঝরণা’ বন্ধ হয়ে যায়। ঝরণা’তে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রচনা প্রকাশিত হয়েছিল। যেমন- কার্ত্তিকচন্দ্র তঞ্চঙ্গ্যার ‘রাধামােহন ধনবতী কাহিনী অবলম্বনে ‘গেঙ্গুলী গীত’ … ইত্যাদি।”

৬. বৌদ্ধ ধর্ম শিক্ষাঃ

শ্রী নন্দলাল শর্মার বর্ণিত গ্রন্থে কার্ত্তিক চন্দ্র তঞ্চঙ্গ্যা এই পাঁচটি গ্রন্থের বিবরণ ছাড়া আর একটি গ্রন্থের নাম পাওয়া যায় গ্রন্থের পরিশিষ্টে ও ধর্ম বিষয়ক গ্রন্থের তালিকাংশে। উক্ত গ্রন্থের নাম ‘বৌদ্ধ ধর্ম শিক্ষা’।

গ্রন্থটির প্রকাশকাল দেওয়া নেই এবং প্রকাশের স্থানে উল্লেখ আছে (রাইংখ্যং মুখ?), অর্থাৎ প্রকাশনা সংক্রান্ত তথ্যটি অনিশ্চিত বা অজ্ঞাত। এছাড়া ‘পার্বত্যবাণী’ পত্রিকায় বা অন্যত্র ও অন্যভাবে কবি যে ‘কালেভদ্রে’ দুএকটা কবিতা প্রকাশ করেছেন তার উল্লেখ আছে কিছুটা সমালােচনার ভঙ্গিতে-

“কবি অরুণ রায় ও কবি কার্ত্তিক চন্দ্র তঞ্চঙ্গ্যা সত্তরের দশকে নিজ নিজ কাব্য প্রতিভার অবক্ষয় অপরােক্ষ করলেও কালে ভদ্রে দু’চার চরণ। কবিতা লেখা থেকে বিরত থাকতে পারছেন না।”

পাঁচ. কবির মাধ্যম, প্রকরণ ও মূল্যায়নঃ কবির পূর্ণ গ্রন্থতালিকা এটি নয়। বর্ণিত তালিকা ও বিবরণ থেকে কবির একটি সামান্য পরিচয় মাত্র লাভ করা যায় যা অধ্যাপক গবেষক নন্দলাল শর্মা পরিশ্রম সহকারে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।

আমার অপর ছাত্র শ্রীমান কর্মধন তনচংগ্যার সহায়তায় আমি একটি শ্রেণীকৃত রচনা তালিকা তৈরীর প্রয়াস পেয়েছি, সেটি পরিশিষ্টে যােগ করা হল।

কবির রচনাপঞ্জি (আংশিক নয়) নির্মিত না হলে এবং সমুদয় রচনা প্রকাশিত না হলে। তাঁর সম্পর্কে পূর্ণ মূল্যায়ন অপেক্ষিত থাকে। আমরাও এখানে কবির কর্মের সম্পূর্ণ মূল্যায়নে বিরত থাকলাম তার অধিকাংশ রচনাই অপ্রকাশিত থাকার কারণে।

কবির মূল রচনা সমূহ কাব্যাকারে রচিত, যদিও এসব রচনা নানা শ্রেণীতে বিভক্ত, যথা রাধামন ( রাধামােহন)-ধনপুদি (ধনবতী) গাথা একটি মিথ ভিত্তিক জাতীয় লােকগাথা শ্রেণীর, অশােক চরিত একটি কাব্যনাট্য শ্রেণীর, অনাগত বংশ একটি মিশ্র রীতির রচনাগুচ্ছ, অধিকাংশ নাটক আবার পালা বা যাত্রা জাতীয় এবং কাব্য শ্রেণীর গ্রন্থগুলি ধর্মদেশনা ও ধর্মতত্ত্ব ব্যাখ্যামূলক। কবির সব রচনাই আবার পয়ার ছন্দে বদ্ধ।

তাঁর প্রবন্ধ সমূহ ও কিছু কিছু গীতি ও নীতি কবিতা এর ব্যতিক্রম মাত্র। অধিকাংশ বা প্রায় সমুদয় রচনা বাংলা ভাষায় রচিত হলেও ‘বুদ্ধ সালামী গাথা মনত ভাবি চেবা’ (১৯৮৫) এই বার পৃষ্ঠার প্রার্থনামূলক গ্রন্থটি তঞ্চঙ্গ্যা ভাষায় রচিত। তাঁর ভাষার নমুনা এই রূপ –

বুদ্ধ ধৰ্ম্ম সংঘ গুণ
ভাবনা গরং মনত্তুন।
কায়ামনে কধায়ে,
ভজন গরং সদায়ে।

এখানে ভাষাই পরিবর্তিত হয় নি, ছন্দরীতিরও পরিবর্তন ঘটেছে।

ছয়. পরিশিষ্ট – ১

প্রকাশিত গ্রন্থসমূহের প্রকাশনা সংক্রান্ত অন্যান্য তথ্য

১. বৌদ্ধ শিক্ষা (১৩৪৬) ও ২. উদয়ন বন্ধ (১৩৬৮):

“মহাবােধি পালঙ্ক কথা (১৯৮৪) গ্রন্থের ভূমিকায় (‘আমার কথা’) উল্লেখ আছে : “আমি ইতিপূর্বেও কয়েকখানা বই লিখেছিলাম। ১৩৪৬ সন বাংলাতে ‘বৌদ্ধ শিক্ষা’ নামক একখানা বই লিখে প্রেসে ছাপাইয়া প্রকাশ করেছিলাম।

আর ১৩৬৮ বাংলা সনে উদয়ন বস্তু” নামে একখানা বই লিখে, তাহা প্রেসে ছাপিয়ে ধর্মপ্রাণ বৌদ্ধ নর-নারীগণের হাতে তুলে দিয়েছিলাম। আরও কিছু বই লিখেছি। কিন্তু ছাপাকারে প্রকাশ হয়নি। …”

৩. উদয়ন বা কৰ্ম্মফল (১৩৬৮/১৯৬১ ইং), গ্রন্থ পৃষ্ঠা ১৩০

গ্রহারম্ভে ‘মূল গাথা’, ‘পরিচিতি’ ও ‘আমার কথা’ যুক্ত ‘পরিচিতি থেকে উদ্ধৃতি-

“অপ্রমাদ মূল পাথা ভাষিত যখন
মহারাজ উদয়ন সময়ে তখন।
আরম্ভ করিব গল্প কাহিনী বিস্তার,
কার্তিক তঞ্চঙ্গ্যা রচে শ্বায় পার।”

“আমার কথা”

“বৌদ্ধধর্ম কর্মহী; লােকে যাহা কর্ম করে তাহাই কর্মের ফলরূপে ভােগ করিয়া থাকে। ‘উদয়ন বন্ত্র’ গল্প কাহিনী কর্মফলের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্বরূপ ।…

বার্মার ষষ্ঠ সংঘায়নের কার্যকারক বার্মা ইউনিয়ন বুদ্ধ শাসন কাউন্সিল কর্তৃক প্রচারিত The light of the Dhamma ( ধর্মের আলাে) নামক প্রচার পত্রের The story of udena (Udena Vatlu) ইংরেজি অনুবাদের অনুসরণে ‘উদয়ন বন্ধু’ নামকরণে এই পুস্তক প্রণয়ন করিলাম ।…”

সূচিপত্র

বিষয় – দুইবন্ধু – উদয়ন- উদয়নের রাজ্যলাভ – অভিষেক উৎসব- তৃষ্ণালয়ে জন্ম দাসীর ভাগ্য- সাধু সঙ্গ লাভের ফল- কৰ্ম্মফল ভুগিতে হয়- কৰ্ম্ম রাখে যারে কে মারিতে পারে- ঘােষক শ্ৰেষ্ঠী- সুখ দুঃখ চক্রবৎ-শ্রেষ্ঠী কুমারী শ্যামাবতী- মহারাজ চন্দ্র প্রদ্যোতরাজকুমারী বসুল দত্তা- দ্বিজ নন্দিনী মাগন্দ্বিরা – অর্দ্ব উপোসথের ফল- কৌশাম্বীতে বুদ্ধের শুভাগমন- কুজোত্তরা- মাগন্দ্বিয়ার শক্রতা- শ্যামাবতীর বর লাভ কৰ্ম্মফলমাগন্দ্বিয়ার সাজা- ভিক্ষগণের প্রতি বুদ্ধের উপদেশ- উপসংহার ।

৪. মহাৰােধি পালঙ্ক কথা (১৯৮৪); গ্রন্থ পৃষ্ঠা সংখ্যা ৩৮। প্রকাশকের (শ্রীমৎ শান্ত জ্যোতি: ভিক্ষু) নিবেদন’… ভগবান বুদ্ধের অমৃতময় দেশবাণীকে প্রচার করা (র) … সংকল্প পােষণ করে আমার দায়ক শ্রদ্ধাবান উপাসক কবি কার্ত্তিকচন্দ্র তঞ্চঙ্গ্যার রচিত ‘মহাবােধি পালঙ্ক কথা’ তৎসঙ্গে স্বর্গীয় কবিরাজ মশাধন তঞ্চঙ্গ্যা রচিত ‘ধৰ্ম্মধ্বজ জাতক’ বই খানা … প্রকাশ করতে কৃত সংকল্প… হলাম । এই পুস্তক প্রচারের দ্বারা ধর্মপ্রাণ বৌদ্ধ নরনারী গণের যৎকিঞ্চিৎ উপকার হলে আমার আশা পূর্ণ হবে।’

আমার (গ্রন্থকার) কথা-
‘মহাকারুণিক শান্তা তথাগত ভগবান গৌতম বুদ্ধের সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখতে আমি বহুদিন ধরে আশা পােষণ করে আসছি।… বুদ্ধের… এসব বিষয়ে সর্বসাধারণের সহজে যাতে বােধগম্য হতে পারে মােটামুটি এক নজরে বুদ্ধকে জানবার জন্য আমি ‘মহাবােধি পালঙ্ক কথা’ নাম দিয়ে এই বইখানা… মহাবােধি পালঙ্কের আদি বিবরণ সরল বাংলা পয়ার ছন্দে লিখে… পাঠ করে শুনালে শ্রদ্ধেয় শ্রীমৎ শান্ত জ্যোতি: স্থবির বইখানা প্রেসে ছাপাইয়া প্রকাশ করে দিতে আগ্রহ প্রকাশ করলেন। তাই আমি শ্রদ্ধেয় ভান্তের নিকট চির কৃতজ্ঞ।’

উৎসর্গ –
‘স্বর্গীয় পিতৃদেব আন্তখা তঞ্চঙ্গ্যা (কালাবৈদ্য) স্বর্গীয় মাতৃদেবী মনপুরি তঞ্চঙ্গ্যা – তাঁহাদের পূণ্য স্মৃতি স্মরণে’ । (১০ ঢরণের কবিতা সহ)।
বিষয়: বন্দনা – মাতাপিতা গুরু বন্দনা – মহাবােধি পালঙ্ক কথা – কুলপুত্র নন্দিয় কথা।

৫. ধর্মধ্বজ জাতক : কবিরাজ পলাধন তঞ্চঙ্গ্যা প্রণীত, পন্ডিত শ্রী কার্তিক চন্দ্র তঞ্চঙ্গ্যা, কবি রত্ন কর্তৃক সংশােধিত ও সম্পাদিত ১৩৯০: পৃ. ৩৯-৮০। সুচিপত্র। বন্দনা- সূচনা- বারমাসী পুরীর বর্ণনা- বিনিশ্চয় বিচার- ধর্থ ঋজকে পঞ্চকৰ্ম্ম আদেশ-বিশ্বকৰ্মাকর্তৃক গজদন্ডময় গৃহ নিৰ্মাণ- ছত্রপানি কর্তৃক চণ্ডুবিধ গুণ।

ব্যাখ্যা- রাজা যশাপানিকে পঞ্চজের উপদেশ দান- কবিরাজ পমপান তঞ্চঙ্গ্যা সংক্ষিপ্ত জীবনী।

৬. বুদ্ধ সালামী গাথা মনত্ ভাবি চেবা (১৯৮৫/২৫২৯ বুদ্ধাব্দ)
উৎসর্গপত্রঃ ‘আমার পিতামহ পরম উপাসক স্বর্গীয় শােভাধন তঞ্চঙ্গ্যা ও তাহার সহধর্শিনী উপাসিকা স্বর্গীয় কইবী তঞ্চঙ্গ্য-এর পূণ্যস্মৃতি স্মরণে’। (১২ চরণের কবিতা সহ)

সাত, পরিশিষ্ট -২

কবিরত্ন কার্ত্তিকচন্দ্র তঞ্চঙ্গ্যার রচনাসমূহ
(শ্রেণীকৃত তালিকা)

১। প্রকাশিত গ্রন্থ (কাব্য বা ধৰ্মকাব্য)
ক. ভাষা: তঞ্চঙ্গ্যা- বুদ্ধ সালামী গাথা মনত ভাবি চেবা (আগষ্ট ১৯৮৫)।
খ. ভাষা: বাংলা – বৌদ্ধশিক্ষা (১৩৪৬); উদয়ন বস্তু বা কৰ্ম্মফল (১৩৬৮); মহাবােধি পালঙ্ক কথা (১৯৮৪); বৌদ্ধ গল্পমালা (১৯৮৭)।
২। সম্পাদিত গ্রন্থ
ক. ধৰ্ম্ম ঋজ জাতক – পলাধন তঞ্চঙ্গ্যা মূলগ্রন্থের সংশােধন ও সম্পাদনা (১৩৯০)।
৩। প্রাপ্ত পান্ডুলিপি ও অপ্রকাশিত গ্রন্থ-
ক. লােকগাথার কাব্যরূপ ঐতিহাসিক) : রাধামন ধনপুদি কাব্য।
খ. চরিত কাব্য: অশােক চরিত (রচনা ১৯৮৩); অনাগতবংশ।
গ. নাট্য কাব্য (ঐতিহাসিক) : বিজয়গিরি।
ঘ. চরিত নাটক (ধর্মীয়); মানুষ দেবতা।
ঙ. তপ কীর্তন ও যাত্রা পালা । বুদ্ধ সন্ন্যাস পালা (রচনা ২৫/০৪/১৯৮৫) শ্রীবুদ্ধের বারােমাস স্মৃতি (রাজস্থলী মৈত্রী বিহার প্রাঙ্গণে মঞ্চস্থ, ২৬/০৩/১৯৭৮)
চ. বিবিধ শ্রেণীর কল্পতরু দান ফল কথা; বন্দনা ও দান ফল কথা; অক্ষর গাথা।
৪। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত কবিতা –
ক. ‘নববর্ষ’। রাজবলাকা (১৫ এপ্রিল ১৯৮৭ সংখ্যা)।
খ. ‘আশ্বিনী পর্ণিমা’। নৈরঞ্জনা (সম্পা, সয় চাকমা, ২০ আশ্বিন ১৩৮৮ সংখ্যা)।
গ. দেবৱিলােকন’। সম্বােধি (সম্পা. ভিক্ষু শদ্ধা প্রিয়, ১ম বর্ষ ১ম সংখ্যা ১৩৯০)।
ঘ. ‘জীবন রহস্য’। পার্বত্যবাণী (সম্পা. বিরাজ মােহন দেওয়ান) ১ম বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা সেপ্টেম্বর ১৯৬৭।

৫। প্রকাশিত প্রবন্ধক-
ক. ‘চাকমা পেঙ্গুলীগীত’ (লােক কাহিনী):
ঝরণা ১ম বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা মার্চ ১৯৬৭ (সম্পাদক, সৈয়দ খাজা আহমদ)
ঝরণা ১ম বর্ষ ৪র্থ সংখ্যা জুন ১৯৬৭ (সম্পাদক, সুনীতি বিকাশ চাকমা)।
ঝরণী ২য় বর্ষ ১ম সংখ্যা সেপ্টেম্বর ১৯৬৭ (সম্পাদক,সুনীতি বিকাশ চাকমা)
খ. তঞ্চঙ্গ্যা উপজাতি (জাতিতত্ত্ব) : সাপ্তাহিক বনভূমি, ২৬ মার্চ ১৯৮৪ (সম্পাদক : এম মকসুদ আহমদ)*

তথ্য নির্দেশ
১। শ্রী নন্দলাল শর্মা (১৯৮১): পার্বত্য চট্টগ্রামের বাংলা সাহিত্য ও সাহিত্যিক।
রাঙ্গামাটি
২। বীর কুমার তঞ্চঙ্গ্যা (১৯৯৫) : তঞ্চঙ্গ্যা পরিচিতি। বান্দরবান ও রাঙ্গামাটি।
৩। ‘গৈরিকা’র ফাইল
৪। শ্রীমান কর্মধন তন্চংগ্যার ব্যক্তিগত সংগ্রহ।

* টিকা : কার্তিকচন্দ্রের প্রকাশিত গ্রন্থের নামপত্রেও অনেকগুলি গ্রন্থের নাম আছে। কিন্তু সব গ্ৰন্থই প্রকাশিত কিনা জানা যায় না। নন্দলাল শর্মার গ্রন্থে (১৯৮১) বৌদ্ধ ধর্ম। শিক্ষার উল্লেখ থাকলেও কবির ‘মহাবােধি পালঙ্ক কথা’ র আখ্যাপত্র প্রদত্ত পুস্তক তালিকার মধ্যে এবং উক্ত গ্রন্থের ভূমিকা (আমার কথা”)-তেও বৌদ্ধ শিক্ষা’ নামটিই পাওয়া যায়। নন্দলাল শর্মা ‘ধর্মপ্লজ জাতক’ এর প্রকাশ কাল ১৯৩৬ বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু তিনি গ্রন্থটি সম্পাদিত রূপ (কবিরত্ন কার্তিকচন্দ্র তঞ্চঙ্গ্যাকর্তৃক ১৯৮৪ সংস্করণ)- টি সম্ভবত পান নি।

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - [email protected] এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা

Jumjournal

Administrator