সময়টা খুব সম্ভবত ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারীর দিকে। আমরা ব্যস্ত ছিলাম ২য় পার্বত্য চলচ্চিত্র উৎসব আয়োজন নিয়ে। তখনই তুরিন (তুরিন তনচংগ্যা) বলছিল, পার্বত্য চট্টগ্রামের চলচ্চিত্র নির্মাতারা কি ভাবছে তা মনে হয় জানা এবং জানানো দরকার। যদিও সময় স্বল্পতা এবং অন্যান্য অনেক কারণে তখন থেকে জানা শুরু করলেও জানানোর কাজটা হয়ে উঠছিল না। অবশেষে আমরা ২০১৬ তে তা শুরু করি এবং ২০১৭ তে এসে কাজ ও শেষ করেছি। আমরা এবার পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন ভাষার চলচ্চিত্র এবং চলচ্চিত্র নির্মাতাদের নিয়ে আমাদের প্রামান্য চলচ্চিত্র “ফেলিম” ‘৩য় পার্বত্য চলচ্চিত্র উৎসব’ এ প্রদর্শন করেছি যেখানে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন ভাষার, বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সিনেমাকে জানার চেষ্টা করা হয়েছে। যতটুকু পেরেছি, জানিয়েছি এবং জেনেছি পার্বত্য চট্টগ্রামের চলচ্চিত্র নির্মাতাদের ‘ফেলিম’ নিয়ে ভাবনা।

পার্বত্য চট্টগ্রামের চলচ্চিত্রের কথা বলতে গেলে মূলত চাকমা চলচ্চিত্রের কথাই বলতে হয়। কারণ অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর লোকেরা তাদের নিজ ভাষায় কোন চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছে বলে আমরা জানতে পারি নি। আমরা প্রথমবার একটি ত্রিপুরা ছবি প্রদর্শন করেছিলাম যেটি নির্মিত হয়েছিল ভারতে। আমরা পার্বত্য চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শনের জন্য ছবি ও আহ্বান করেছিলাম। কিন্তু দুই একটা চাকমা ছবি বাদে অন্য কোন জাতিগোষ্ঠীর সিনেমা আমাদের কাছে আসে নি। তবে অতি সম্প্রতি একটা তনচংগ্যা ভাষায় ছবি নির্মাণ করা হয়েছে। আর আমাদের চোখে না পড়লেও অন্য জাতিগোষ্ঠীর ছবি থাকলে ও থাকতে পারে। তবে এখনও পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রামের চলচ্চিত্র মূলত চাকমা চলচ্চিত্র যদিও সেখানে ১৪ টি আলাদা আলাদা সম্প্রদায় বসবাস করে। তবে এর পাশাপাশি বিভন্ন প্রামাণ্য চলচ্চিত্র ও নির্মিত হয়েছে।

ইংরেজীতে যেটা cinema, movie, talkies, film সেটা বাংলায় চলচ্চিত্র, সিনেমা, ছবি ইত্যাদি। আর আমরা চাকমারা এসবের পাশাপাশি ফেলিম, ফিলিম ইত্যাদি বলে থাকি। তবে চাকমা বাদে অন্যান্য জাতিগোষ্ঠির লোকেরা অন্য নামেও ডাকতে পারে। গ্রামের দিকে চাকমারা সিনেমাকে ‘ফেলিম’ নামেই ডাকে। তাই আমরা ও আমাদের প্রামাণ্যচিত্রের নাম রেখেছি ‘ফেলিম’।

পুরো পৃথিবীতেই চলচ্চিত্রের বয়স ১৩০ বছরের কাছাকাছি। সেখানে আমাদের পদার্পন খুব বেশী বছর হয় নি। আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রথম চলচ্চিত্র নির্মিত হয় ১৯৯৬ সালে। একটি চাকমা স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। নাম ‘আন্দলত পহর’। এর পর এই ২২ বছরে আরও প্রায় ২৫ টির মত কাহিনীচিত্র বানানো হয়েছে। কিন্তু সেসবের অধিকাংশের নাম দেওয়া হয়েছে ‘টেলিফ্লিম’। যদিও এগুলোর দৈর্ঘ্য যেমন ১ ঘন্টার কম ও আছে আবার ২ ঘন্টার উপরে ও আছে। টেলিফ্লিম নামকরণের পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ থাকতে পারে। তার মধ্যে একটি হতে পারে, তখন বিটিভি তে এক ঘন্টার বা এর কাছাকাছি বা একটু বেশী দৈর্ঘের নাটক দেখানো হতো। মূলত টেলিভিশনে প্রদর্শন করা হয় বলেই এসবের নাম ‘টেলিফ্লিম’ দেয়া হয়। এসবের দেখাদেখিতে আমাদের অগ্রজরা ‘টেলিফ্লিম’ বলে থাকতে পারেন। আমরা আমাদের প্রামাণ্য চলচ্চিত্রে সবগুলোকেই চলচ্চিত্র ধরে নিয়েছি যদিও সত্যিকার অর্থে কি এগুলো স্বার্থক চলচ্চিত্র হয়েছে কি না তার বিশ্লেষণ আমরা দিতে চেষ্টা করি নি। তবে এক্ষেত্রে উল্লেখ করা যেতে পারে, চলমান চিত্রকেই চলচ্চিত্র বলা হত।এখনও তাই বলা হয়। তাই বলে তুমি আমি খেলছি আর সেটা কেউ একজন ভিডিও করল, তা কিন্তু চলচ্চিত্র হতে পারে না। চলচ্চিত্রের একটি ধরন আছে। যেটা দেখলে আমরা বলে দিতে পারি যে এটা সিনেমা । চলচ্চিত্রে বা সিনেমায় একটা সিনেম্যাটিক লুক বা গল্প থাকে কিংবা ট্রাজেডিক অথবা ড্রামাটিক একটা ব্যাপার থাকে। সর্বোপরি সিনেমার একটি অর্থপূর্ণ আবেদন থাকে। সিনেমা হচ্ছে শিল্পের সকল শাখাসমূহের সমষ্টি কাজেই এগুলো বাদে ও সিনেমার আর ও অনেক মাত্রা বা সংজ্ঞা থাকতে পারে বা দেয়া যেতে পারে। যাই হোক, আমরা ‘ফেলিম’ নাম ধরেই এগোচ্ছি।

আসুন, তাহলে ‘ফেলিম’ এর গল্প বা ইতিহাস জানার চেষ্টা করি। জুম ঈসটেথিকস কাউন্সিল (জাক) এর নাম মনে হয় আমরা সবাই শুনেছি। জুম্মদের সাংস্কৃতিক বিকাশে যারা জন্মলগ্ন থেকেই কাজ করে যাচ্ছে। ‘ আন্দলত পহর’ ও কিন্তু তারাই নির্মাণ করেছিল।১৯৯৬ সালে। যেটি মূলত মঞ্চ নাটক থেকে ভিডিও রুপ দেয়া হয়েছিল। তবে সত্যি বলতে কী, নিজের ই ঐ ফেলিমটা দেখার সৌভাগ্য হয় নি। তবে খুব কাছের দায়িত্বশীল সূত্র থেকে তথ্যগুলো পেয়েছি। এর পর আরো অনেকে ফেলিম বানিয়েছেন এবং বানাচ্ছেন। আমাদের এখানে ফেলিম বানানোর কাজটা করেছে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন যারা মূলত বিভিন্ন নাট্য গোষ্ঠী বা শিল্পী (আর্টিস্ট) গোষ্ঠী যেটা পৃথিবীর অনেক দেশেই করেছিল প্রোডাকশন হাউসগুলো এবং সিনেমাগুলো বানানো হয়েছে অঞ্চল ভেদে। যেমন- ঘাগড়া, দিঘীনালা, জুরাছড়ির বনযোগীছড়া প্রভৃতি অঞ্চলের সাংস্কৃতিক সংগঠনের ব্যানারে। তখন সিনেমাগুলো বানিয়ে সিডি বিক্রি করা হত। দোকানগুলো বাদেও সিডিগুলো বাড়ীতে বাড়ীতে বিক্রি করা হত। এ থেকে সিনেমা বানানোর অর্থ কিছুটা পাওয়া যেত। অনেক ক্ষেত্রে হাজার দশেক কিংবা হাজার বিশেক লাভ ও থাকত। বলা বাহুল্য যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রায় দুই লাখ টাকার একটা বাজার ছিল। তবে এই ব্যবস্থাটা এখন ধ্বসে পড়েছে। একদিকে সিডি প্লেয়ারের যুগ মনে হয় শেষ আর অন্যদিকে ডিজিটাল পাইরেসি। এ প্রসঙ্গে একবার কমল দা (নির্মাতা, অভিনেতা কমল মনি চাকমা) বলছিলেন যে, এখন নাকি সিডি বিক্রিই হয় না। কোনভাবে কেউ একজন পেল আর তা মোবাইলে মোবাইলে বন্ঠিত হয়ে যায়। আর সুদত্ত দার (নির্মাতা সুদত্ত তালুকদার) তো লাভের চেয়ে ক্ষতির পরিমাণটা বেশী। তবে অনেক সময় সমাজের অবস্থাপন্ন লোকেরা ও যে যা পারেন সাহায্য করে থাকেন। তারপরও তারা ফেলিম বানিয়ে যাচ্ছেন এবং যাবেন। তাহলে সিনেমা বানিয়ে লাভ কী?

ডকুমেন্টারীটি বানাতে গিয়ে আমরা এই প্রশ্নটাই করেছিলাম সুদত্তদা কে। উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘ আমরা লাভ ক্ষতির চিন্তা করি না। বলতে গেলে, আমরা আমাদের সংস্কৃতি রক্ষা করতে চায়। ঠিক সেই কারণেই আমাদের সিনেমা বানানো। আমরা আমাদেরকে মানুষের কাছে তুলে ধরতে চায়।’ আমরা এই প্রশ্নটা আরো অনেককেই করেছিলাম। উত্তরগুলো ও এরকম কাছাকাছিই পেয়েছিলাম।

তবে লাভ-ক্ষতির চিন্তা করতে গেলে আমার মনে হয় না ক্ষতি হলেও খুব বেশী হয়েছে। এখনও পর্যন্ত আমাদের এখানে যেসব সিনেমা বানানো হয়েছে তার অর্থ সিডি বিক্রি করে কিংবা পরিচিতজনদের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা নিয়ে সামাল দেয়া হয়েছে। তবে অভিনেতা অভিনেত্রীদেরসহ পুরো নির্মাণ প্রক্রিয়ায় জড়িত কলাকুশলীদের পারিশ্রমিক বা শ্রমের হিসাব আর্থিক মানদন্ডে করলে কিন্তু ক্ষতির পরিমাণটা বিশাল। যেহেতু উনারা ভালবেসে কিংবা প্রচলিত অর্থে সংস্কৃতি রক্ষার্থে বানিয়ে থাকেন, সেখানে মনের সুখের চেয়ে কোন কিছুকে লাভ মনে হওয়ার কথা না। তাই ব্যক্তিগতভাবে আরো অনেক দিক বিবেচনা করে আমি লাভের দিকটাই বেশী দেখি।

আমরা আরও অনেকগুলো প্রশ্নের পাশাপাশি আরেকটা প্রশ্ন করেছিলাম। ‘সিনেমা বানানোর প্রয়োজনীয়তা কী ? উত্তরে কমল দা বলেছিলেন, ‘ মারমা সম্প্রদায় যদি সিনেমা বানায়, তাহলে লোকে বলবে মারমা সিনেমা, যদি ত্রিপুরা সম্প্রদায় বানায় তাহলে বলবে ত্রিপুরা সিনেমা, ঠিক তেমনি আমার চাকমা ছবি পরিচিতি পাচ্ছে চাকমা সিনেমা হিসেবে। বলতে গেলে এটা একটা সংগ্রাম। জাতির পরিচিতির সংগ্রাম।’

প্রয়োজনীয়তার কারণে হোক কিংবা লাভের আশায় হোক, যে কারণেই আমরা সিনেমা বানাই না কেন সর্বোপরি আমাদেরকে সিনেমাকে ভালোবাসতে হবে। তখনই আমরা এই সম্ভাবনার দিকগুলো নিয়ে আরও ভালোভাবে ভাবতে পারব। তবে আমি এই স্পর্ধা রাখি না যে বলব, উনারা সিনেমাকে ভালোবাসেন না। কিংবা দায় নিব যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে একমাত্র আমিই সিনেমাকে ভালোবাসি। সিনেমাকে ভালো না বাসলে একটা ফেলিমও বানানো সম্ভব না। সেখানে আমরা সব মিলিয়ে প্রায় ৫০ টার মত ফেলিম বানিয়েছি। আমি বলব না যে, আমাদের মেধার ঘাটতি নেই। তবে যন্ত্রপাতির অপ্রতুলতা বা অভাব যে বিশাল তাও অস্বীকার করব না। তার চেয়েও বড় কথা, আমার মনে হয়, আমরা ফিল্ম মেকিং এর উপাদানগুলো ধরতে পারছি না বা আর্থিক অসংগতির কারণে ব্যবহার করতে পারছি না।

উপরের দুইজন চলচ্চিত্র নির্মাতার কথা থেকে আমরা একটি জিনিস বুঝতে পেরেছিলাম। তা হল, সিনেমা বানিয়ে লাভ না থাকলেও সিনেমা বানানোর প্রয়োজনীয়তা আছে। এই প্রয়োজনীয়তা পরিচয়কে অর্থাৎ আত্মপরিচয়কে প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়োজনীয়তা। তবে আমার মনে হয় সিনেমার মূল কাজ কাউকে পরিচিত করানো নয়। অবশ্য আমি এটাকে সিনেমার একটি মাত্রা বলে ধরে নিয়েছি। এ প্রসঙ্গে পরে আসছি।

অং দার (নির্মাতা অং রাখাইন) ‘মর থেংগারি’ এই সময়ে বেশ আলোচিত। ইউরোপের কয়েকটি ফেস্টিভালে প্রদর্শিত হয়েছে। রাশিয়ায় একটা পুরষ্কার ও পেয়েছে। যেমন- এই ছবিটি দেশে পরিচিত হয়েছে চাকমা ছবি হিসেবে আর বিদেশে বাংলাদেশী চাকমা ছবি হিসেবে। এই দিক দিয়ে চিন্তা করলে হয়তোবা পরিচিত হওয়ার বা সিনেমার মাধ্যমে আত্মপরিচয়কে প্রতিষ্ঠিত করার একটা ব্যাপার থাকে এবং ব্যাপারটি প্রচলিত অর্থে সত্যি বলে ধরে নেওয়া যায়। আমরা সিনেমার মাধ্যমে আমাদেরকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে পারি। পরিচিত করাতে পারি। অং দাকে এই জায়গায় আমাদেরকে অবশ্যই অগ্রদূত ধরতে হবে। সিনেমাকে বৈশ্বিক করার দৃষ্টান্ত তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের অনেক চলচ্চিত্র নির্মাতার কাছে উপস্থাপন করেছেন। তবে যে বিষয়টি বলা হচ্ছে, এটিই চাকমা ভাষায় নির্মিত প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, তা কিন্তু সত্যি নই। এবং অং দা নিজে বলছেন যে, মূলধারার প্রথম চাকমা সিনেমা। এটা সত্যি যে, কেবল ঢাকায় কিংবা আমেরিকায় প্রদর্শন করলেই ছবি হয় তা না, রাংগামাটিতে প্রদর্শন করলেও ছবি হয়। তবে আমরা অনেকেই এই জিনিসটা ধরতে পারলে ও এখন ও পর্যন্ত অংদাই তা করে দেখিয়েছেন। আমরা বরং স্বার্থক বা অর্থপূর্ণ এই মানদন্ডে বিচার করতে পারি যদিও সাহিত্যের ক্ষেত্রে এই মানদন্ডে বিচার করা হলেও সিনেমার ক্ষেত্রে এখনও আমার চোখে পড়ে নি। সিনেমাটি বর্তমানে সেন্সর বোর্ডে আটকে আছে। আশা করি, আমরা বাংলাদেশের জনগণ সিনেমাটি দেখতে পারব।

কিছুক্ষণ আগে যা বলছিলাম, সিনেমার মূল কাজ এর ব্যাপারে। সিনেমার মূল কাজ কী ? একটা জিনিস দেখলাম, সিনেমা বাংলাদেশকে পরিচিত করাতে পারে। সিনেমা চাকমাদেরকে পরিচিত করাতে পারে। সিনেমা ভারতে বাঙালিদেরকে পরিচিত করাতে পারে। সিনেমা কোরিয়ানদেরকে আমাদের তরুণ প্রজন্মের কাছে পরিচিত করাতে পারে। সিনেমা ইতালিয়ানদেরকে পরিচিত করাতে পারে। তবে এসবের বাইরে আমার মনে হয়, সিনেমার মূল কাজ হচ্ছে, গল্প বলা। আমরা যেমন সাহিত্যকে ভাগ করি তেমনি করে চলচ্চিত্রকেও ভাগ করতে পারি মাত্র কিন্তু তার মূল কাজকে আমরা কখনোই অস্বীকার করতে পারবো না। যেমনি করে আমরা বাংলা সাহিত্য, পার্সি সাহিত্য, ইংরেজী সাহিত্য ভাগ করি তেমনি করেই চলচ্চিত্রকে ও বাংলা সিনেমা, হিন্দি সিনেমা, চাকমা সিনেমা নামে ভাগ করা যাবে কিন্তু সব ভাষার সিনেমাতেই একটি সাধারণ চরিত্র পাওয়া যাবে। তা হল গল্প বলা। গল্প তৈরী করা। নিজের জীবনবোধকে তুলে ধরা। সেজন্যই বলা হয়ে থাকে, সিনেমার ভাষা কখনোই চাকমা, বাংলা বা হিন্দি নয়। সিনেমার ভাষা তার উপস্থাপনে। তার গল্প বলার ধরনে। এজন্য আমরা যারা পার্বত্য চট্টগ্রামে সিনেমা নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা বা লাভ খুঁজছি বা শখের বশে দুই একটা ছবি করার চেষ্টা করছি তাদের উচিত হবে সিনেমার ভাষা বোঝার। তার ব্যাকরণ পড়ার। তবে ক্ষেত্রটা উন্মুক্ত। শিল্পের স্বাধীনতা থাকা দরকার। শিল্পীর ও। তবে সাধারণ অর্থে , অং দার সাথে একমত হয়ে বলা যায়, আমাদেরকে পর্দায় যৌক্তিক হতে হবে।

বিশ্বায়নের যুগে সবই বৈশ্বিক। সেখানে সিনেমা যেন আরও বেশি বৈশ্বিক। ইন্ডিয়ায় বানানো সিনেমা আমেরিকায় মুক্তি পায়। হলিউডের সিনেমা বলিউডের বাজারে প্রবেশ করতে পারে অবাধেই। হয়তোবা রাংগামাটিতে বানানো সিনেমাও লন্ডনে মুক্তি দেয়া যাবে। তবে এই জায়গায় আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নেই। তাই চুপটি মেরে গেলাম। কেউ কেউ এভাবে চিন্তা করলে ও করতে পারেন। তবে একটা জায়গায় জোর দিয়ে বলা যায়, পৃথিবীর বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে অংশগ্রহন করে আপনার গল্পকে উপস্থাপন করতে পারেন। উপস্থাপন করতে পারেন আপনার জাতিকে। উপস্থাপন করতে পারেন আপনার দেশকে। আমাদের এই দেশের বৈচিত্র্যকে। এক্ষেত্রে একটা বিষয় মাথায় রাখা যেতে পারে, অনেকেই মনে করেন ক্যামেরার কোয়ালিটি ভালো হতেই হবে। তা কিন্তু ঠিক না। ক্যামেরা কোয়ালিটি সিনেমার একটা উপাদান হলেও কখনোই ক্যামেরা কোয়ালিটি সিনেমার কোয়ালিটি হতে পারে না। সিনেমার কোয়ালিটি তার উপস্থাপনে। ক্যামেরাকে কীভাবে পর্দায় ব্যবহার করে আপনি আপনার গল্পকে উপস্থাপন করছেন তার উপর নির্ভর করেই সিনেমার কোয়ালিটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এবং অবশ্যই ভাল গল্প হতে হবে। আমি আগেও বলেছি, এখন ও বলছি। এ ক্ষেত্রটা উন্মুক্ত। আপনাকেই বুঝতে হবে কোনটা ভাল গল্প আর কোনটা খারাপ। যদিও কোন সৃষ্টিকেই খারাপ বলাটা অনুচিত তাই আমরা বলতে পারি ‘শক্তিমান’ গল্প সৃষ্টি করতে হবে।

৯৬ সালে যদি প্রথম চলচ্চিত্র বানানো শুরু হয়, তাহলে চলচ্চিত্রের সাথে আমাদের সরাসরি পরিচয় প্রায় ২২ বছরের। এই ২২ বছরে সব মিলিয়ে প্রায় ৫০ টির মত চলচ্চিত্র, সংখ্যার দিক দিয়ে খুব একটা নগন্য নয়। বর্তমানে রাংগামাটিতে অনেক তরুণ কাজ করছেন। তারচেয়ে ও বড় কথা, ডকুমেন্টারিটি বানাতে গিয়ে আমরা যাদের সাথেই কথা বলেছি তাদের মধ্যে জুম্ম চলচ্চিত্র নিয়ে আশাবাদীদের সংখ্যাই বেশী। আমরা ও চলচ্চিত্র উৎসব নিয়ে আশাবাদী। প্রতি দুই বছর অন্তর একটি জুম্ম সিনেমাকে অনুদান দেওয়ার পরিকল্পনায় আমরা এগোচ্ছি। তবে সেটা এখনও চূড়ান্তভাবে কিছুই বলা যাচ্ছে না কারণ অনুদানের জন্য আমাদেরকে নির্ভর করতে হবে ১০০, ২০০ বা ৫০০ কিংবা ১০০০ ব্যক্তির উপর যারা সিনেমাকে ভালবেসে বা জুম্মদেরকে ভালবেসে প্রতি বছর কিছু অনুদান দেবেন সেটা ৫০০ টাকা বা ১০০০ বা ১০০ টাকা ও হতে পারে। এ ব্যাপারে আমরা আমাদের অগ্রজ বা অনুজদের সাথে ও কাজ করতে রাজী এবং তাদের মতামত ও আমরা শুনতে প্রস্তুত। আমরা ইতিমধ্যে কয়েকজন অগ্রজের সাথে কথা বলেছি যাদেরকে আমরা এই কর্মসূচির উপদেষ্টা হিসেবে পেতে চাই। আর সামনের বার থেকেই ‘সেরা প্রামাণ্যচিত্র’ এবং ‘সেরা স্বল্পদৈর্ঘ্য’ পুরষ্কার প্রদান করব।

আমি আর একটি জিনিস নিয়ে লিখব বলে টাইটেল এ যোগ করেছিলাম। আমাদের সামাজিক সংস্কৃতি। কিন্তু এখন কি লিখব ভেবে বা খুঁজে পাচ্ছি না আবার টাইটেল টা বাদ দিলে কেন জানি বেমানান লাগে। যাই হোক, সামাজিক সংস্কৃতি বা সামাজিক বাধা বা ব্যক্তিগত বাধা যাই হোক না কেন, যতদূর সম্ভব কাজ করে যাওয়াটাই মনে হয় প্রয়োজনীয় বা কর্তব্য হয়ে উঠেছে। সেটা যে যতদূর পারি।

ডকুমেন্টারিটি বানাতে গিয়ে বেশ কয়েকটি জায়গায় ঘুরলাম। বেশ কয়েকজন চলচ্চিত্র নির্মাতার সাথে পরিচিত হলাম। চলচ্চিত্র বানানো ও দেখলাম। তবে যে জিনিসটি আমাদেরকে সবচেয়ে খুশি করেছে, কিছুটা অবাক ও, তা হচ্ছে, আমরা দীঘিনালায় একটা ফিল্ম স্কুল পেয়েছি যেটা প্রতিষ্ঠিত হয় ২০১১ সালে নির্মাতা জ্ঞানকীর্তি চাকমা এবং অন্য আরও অনেকের সহায়তায়। সেখানে নিয়মিত শেখানো হয়, পড়ানো হয়। তবে একটা জিনিস পরিষ্কার। আমরা চাকমা চলচ্চিত্র নির্মাতারা এখনও বিশ্ব সিনেমার সাথে পরিচিত হয়ে উঠতে পারছি না। এই কাজটা আমরা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দ্রুত করতে পারব, ততই আমাদের জন্য মঙ্গল। আমাদেরকে অবশ্যই বিশ্ব সিনেমার ইতিহাস পাঠ করতে হবে। বুঝার চেষ্টা করতে হবে সিনেমার ভাষা। আমরা সবসময় সিনেমা বানাতে পারি না। দশ বছরে একটা সিনেমা করলেই যেন তা অর্থপূর্ণ, যৌক্তিক হয় সেই দিকে খেয়াল রাখাটা মনে হয় খুব বেশী অসম্ভব নয়। তিনি প্রফেশনাল বা নন প্রফেশনাল হতে পারেন। তবে ইত্তুতগুলো চাকমার মত যারা সিনেমাকে ভালবাসেন তারা চেষ্টা করছেন সিনেমার ভাষা বোঝার। সবশেষে যারা নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়িয়ে সিনেমাকে ভালোবেসে ছবি বানিয়েছেন বা বানাচ্ছেন তাদের প্রতি রইল অশেষ শ্রদ্ধা।

ও আরেকটি কথা, এই লেখাটি যখন শেষ করছি তখন জেন্স দা (জেন্স এিপুরা) একজন ত্রিপুরা চলচ্চিত্র নির্মাতার খোঁজ দিলেন। কথা বলে জানতে পারলাম, তিনি তিনটা ছবি বানিয়েছেন। আপনারাও বানান। আমরা পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল জাতিগোষ্ঠীর সিনেমা ‘পার্বত্য চলচ্চিত্র উৎসব’ এ প্রদর্শন করার স্বপ্ন দেখছি।


লেখক : এডিট দেওয়ান, আয়োজক, পার্বত্য চলচ্চিত্র উৎসব।

০৭ এপ্রিল, ২০১৭, জগন্নাথ হল, ঢাবি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here