icon

পার্বত্য চট্টগ্রামে জুমচাষে আদিবাসী লােকজ্ঞান

Jumjournal

Last updated Dec 21st, 2020 icon 113

ভূমিকা :

পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে আদিবাসীরা এখনাে জুমচাষ করে জীবিকা নির্বাহ করে। জুমচাষের সাথে তাদের সখ্যতা স্মরণাতীত কাল থেকে। কে, কবে, কখন জুমচাষ গােড়াপত্তন করেছিল তা বলা কঠিন।

জুম নিয়ে গড়ে উঠেছে তাদের জীবনধারা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। জুম চাষ শুধু উৎপাদনের সাথে নির্ভরশীল নয়, এটি আদিবাসীদের সংস্কৃতি ও জীবনের উপর গভীরভাবে প্রভাব ফেলে।

জুমচাষ সম্পর্কে অনেকে নেতিবাচক মনােভাব পােষণ করলেও এখানাে আদিবাসীরা ঐতিহ্যবাহী জুমচাষ প্রক্রিয়াকে তাদের অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরশীল চাষাবাদ পদ্ধতি বলে মনে করেন। এই ঐতিহ্যবাহী জুমচাষ প্রক্রিয়া একদিকে যেমন তাদের প্রয়ােজনীয় খাদ্য ও পুষ্টির যােগান দেয়, তেমনিভাবে তাদের আত্মনির্ভরশীলতার ভিত্তিকে সুসংহত করে তােলে।

বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামে ২০ হাজার হেক্টর এলাকায় জুম চাষ করা হচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী তিন পার্বত্য জেলায় খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও রাঙামাটিতে অবস্থিত ৫ হাজার ৪৮০ কিলােমিটার অশ্রেণীভুক্ত বনভূমির সিংহভাগই জুমচাষ করা হয়।

পার্বত্য চট্টগ্রামে তিন জেলার ৩৪ হাজার পরিবার এখনাে জুমচাষ নির্ভর জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত। এর মধ্যে খাগড়াছড়িতে ১২ হাজার, রাঙামাটিতে প্রায় ১০ হাজার ও বান্দরবানে প্রায় ১৩ হাজার জুমিয়া আছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) জরিপে দেখা যায় দেখা গেছে পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসী জনগােষ্ঠীর মধ্যে শতকরা ৮০ ভাগ জুমচাষের উপর নির্ভরশীল।

জুমচাষ এমন একটি কৃষি পদ্ধতি সেখানে। শুধু ধান্য ফসল নয়, এর পাশপাশি নানা ধরনের শাক-সবজি, আলু, দানাজাতীয় শস্য সবকিছু পাওয়া যায়। তাই জুমচাষ করে আদিবাসীরা খাদ্যের স্বয়ংসম্পূর্ণতা লাভ করে।

জুমচাষ কি ?

সাধারণভাবে পাহাড়ের প্রাকৃতিক জঙ্গল কেটে রােদে শুকিয়ে তা আগুনে পুড়িয়ে কৃষিজ পত্র উৎপাদনের পদ্ধতিকে জুমচাষ বলা হয়ে থাকে। এ চাষাবাদ পদ্ধতিকে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে।

ভারতের আসামে জ্যাহােমা, সলােমন দ্বীপুঞ্জে ‘য়্যাম’ (yam), জাপানে ‘কারেন’ (karen), জাভা ‘হুমা’ (huma), সুমাত্রায় ‘জুমা’ (Djuma), মায়ানমারে ‘টঙ্গিয়া’ (Taungya), তিব্বতে ‘ঝােং’ (Jhung), ব্রাজিলে ‘রােকা’ (Roca), ইত্যাদি নামে অভিহিত করা হয়।

বাংলাপিডিয়ায় জুমচাষ সম্পর্কে বলা হয়েছে- Jhum slash and burn technology of Agriculture practiced mainly by the people of pre-plough age. Jhum is still practiced in Chittagong Hill Tracts. Jhuming or shifting cultivation, popularly known as Sweden cultivation or cultivation of slash and burn, is the most prevalent form of cultivation in the hill areas of Bangladesh. Most tribal people are well acquinted with this type of farming. Jhuming is practiced on sloppy hills outside reserve forest. At present, about 20,000 hectares of land are being brought under jhum cultivation every year, decaying 100 to 250 metric tons of soil per hectare of land.

বাংলাদেশে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের চাষাবাদ পদ্ধতিকে জুমচাষ বলা হয়। জুমচাষ এক প্রকার প্রকৃতি নির্ভর চাষাবাদ পদ্ধতি। এ চাষে কোন আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার হয় না।

কখন জুমের স্থান জঙ্গল পরিস্কার করা হবে, কোন সময়ে জুমের আগাছা, গুলাে আগুন দিতে হবে, কোন সময়ে বপন করতে হবে, এসবকিছুই ঋতুর পালাবদলের সাথে সাথে সম্পন্ন করতে হয়। অর্থাৎ দিনক্ষণ সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে কাজ করতে হয়। যদি সময়ের সাথে তাল মিলাতে না তাহলে জুমের কোন ফসলই উত্তমরূপে ফলবে না।

স্থান নির্বাচন :

জুমচাষের জন্য প্রথমে স্থান নির্ধারণ করতে হয়। প্রকৃতির অফুরন্ত ভান্ডার থাকতে পারে, কিন্তু সব পাহাড়ের গায়ে সবস্থানে জুমচাষ উপযুক্ত নয়। কারণ পাহাড়েও বিভিন্ন ধরনের মৃত্তিকা রয়েছে। কোন কোন পাহাড়ে শুধু পাথর আর পাথর থাকে। কোন কোন পাহাড়ের গায়ে থাকে শুধু এঁটেল মাটি। পাহাড়ে আবার শুধু দোআঁশ মাটি থাকলেও চাষ করা যায় না।

সেখানে কোন ধরনের বৃক্ষ, গুল্ম, লতা-পাতা আছে তাও দেখার বিষয়। দোঁআশ মাটি হলেও সেখানে যদি আতিরিক্ত ছনের খলা থাকে অথবা আগাছা জাতীয় লতা-পাতা ও বাশ ঝাড় যদি অতিরিক্ত থাকে।

তাহলে সেসব স্থানে জুমচাষ করা যাবে না। জুম চাষের জন্য সবচেয়ে লক্ষণীয় দিক হলাে মাটি, বৃক্ষ আর গুল্মের ধরন। আবার মৃত্তিকা কনিকা আদ্র, শুষ্ক কিনা তাও লক্ষ্য রাখতে হয়।

কারণ বৃক্ষ-গুল্ম ও মাটির উপযােগিতা সঠিক হলেও যদি মাটির আর্দ্রতা শুষ্ক থাকে সেক্ষেত্রেও সে স্থানে জুমচাষ করা যাবে না। আবার জুমের নিকটবর্তীস্থানে জলাশয়/ জলাধার থাকা আবশ্যকীয়। আবার জুমের আশে-পাশে কি ধরনের বনভূমি রয়েছে তাও দেখার বিষয়।

কারণ আশে-পাশে বনে যদি ফসলহানিকর জীব-জন্তু, পশু-পাখি, কীট-পতঙ্গ থাকে তাহলেও সেসব স্থান ত্যাগ করতে হবে। আবার অনেকে এসব পশু-পাখি, জীব-জন্তু ও পােকা-মাকড়ের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সবাই মিলে সেখানে সম্মিলিতভাবে চাষ করে।

জুম চক্ৰ (Jhum Cycle) :

ঋতু/মাসকাজের বিবরণ উপকরণ
পৌষ ও মাঘ১। জুমের স্থান নির্ধারণ
২। মাটির পরিক্ষ- নিরীক্ষা
৩। আশে-পাশে বন-জঙ্গলে জীব- জন্তু, পশু-পাখি, পোকা- মাকড় আছে কিনা তা জরিপ করা।
৪। আশে-পাশে পানীয় জলাশয় আছে কিনা তা দেখা।
দা, ঝুড়ি, পানি, পানি রাখার লাউয়ের খোলস, শাণ দেয়ার জন্য চকমকি পাথর
ফাল্গুন ও চৈত্রজুমের নির্ধারিত স্থানে বৃক্ষ-গুল্ম ও জঙ্গল কাটা বা পরিস্কার করা।দা, ঝুড়ি, পানি, পানি রাখার লাউয়ের খোলস, দা শাণের জন্য চকমকি পাথর
চৈত্র ও বৈশাখ১। জুুমে অগুন দেওয়া
২। অবশিষ্ট ভস্মগুলো করা
৩। অবশিষ্ট খড়কুটো পরিস্কার করা
দা, ঝুড়ি. পানি, পানি রাখার লাউয়ের খোলস, দা শাণের জন্য চকমকি পাথর
বৈশাখ ও জৈষ্ঠ্য ১। ফসলের বীজ বপন করা
২। ধান, তুলো, তিল, তিশি ভূট্টা, কইন ধান কার্পাস তুলা, বরবটি, ঢেরস, মিষ্টি কুমড়ো ইত্যাদি।
দা, ছাবল, খন্টি, ঝুড়ি, পাথর, তলই (চাতাই), খাবার পানি, হাড়ি-পাতিল
আসাঢ় ও শ্রাবণ ১। ফসলের চারা রক্ষণাবেক্ষণ।
২। আগাছা সাফ করা।
৩। লতা জাতীয় ঘাস কাটা।
৪। সার দেওয়া (আগে জুম সার দেওয়া হতো না। বর্তমানে জনসংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে পাহাড়ী অঞ্চলে জায়গা সঙ্কুচিত হওয়ায় একই স্থানে বারবার জুমচাষ করার ফলে কোন কোন জুুমে রাসায়নিক সার প্রয়োগ করতে হয়)।
দা, নিড়ানী, ঝুড়ি, পাথর, টুকড়ী / ঝুংড়ি / ইত্যাদি।
শ্রাবণ ও ভাদ্র১। ফসলের চারা রক্ষণাবেক্ষণ ।
২। আগাছা সাফ করা।
৩। লতা জাতীয় ঘাস কাটা।
৪।সার দেওয়া (আগেকালে জুমে সার দেওয়া হতো না । বর্তমানে জনসংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে পাহাড়ী অঞ্চলের জায়গা সঙ্কুচিত হওয়ায় একই স্থানে বারবার জুমচাষ করার ফলে কোন কোন জুমে রাসায়নিক সার প্রায়োগ করতে হয়)।
দা, নিড়ানী, ঝুড়ি, পাথর, টুকড়ী / ছংড়ি ইত্যাদি।
ভাদ্র ও আশ্বিন ১। পশু-পাখি, জীব-জন্তু তাড়ানো
২। পরিবারে নিয়ে জুমঘর / টংঘরে উঠা। জুমে ফসল আসতে শুরু করেছে। তখন জীব-জন্তু পশু-পাখির আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য জুমে পাহাড়া দিতে হয়।
বাঁশের ফালি, দা, তুম প্লুং (এক প্রকার বাঁশি), ফাঁদ, ফাদের সরঞ্জাম, বাঁশ, গাছ, হাড়ি-পাতিল ইত্যাদি।
আশ্বিন ও কার্তিক১। জুমের ফসল উত্তোলনের কাজ শুরু। ধান কেটে থুরুং (ঝুড়ি) ভর্তি করে টংঘরে নিয়ে স্তুপাকারে সাজিয়ে রাখা।
২। অন্যান্য ফসলও ধরতে শুরুকরেছে।
কাঁচি, দা, থুরুং (ঝুড়ি), থালা-বাসন, হাড়ি-পাতিল, খাবার পানি, লাউয়ের খোলস, টংঘর মশারী ইত্যাদি
কার্তিক
ও অগ্রহায়ণ
১। ধান মাড়াই করা
২। ধান শুকনো
৩। অন্যান্য ফসল রক্ষণাবেক্ষণ করা
যুবক-যুবতীরা দল বেধে পালাক্রমে জুমে জুমে ‍গিয়ে পায়ে চেপে চেপে ধানা মাড়াইয়ের কাজ সম্পন্ন করে।
অগ্রহায়ণ জুমের টংঘর হতে গ্রামে জুড়ি বোঝাই ধান নিয়ে যায়া। এ সময় অন্যান্য ফসলের মধ্যে তুলা, তিলা, তিশি, কইন ধান, আলু ইত্যাদি উত্তোলন করা হয়।তলই (চাতাই), থুরুং (ঝুড়ি), কুলা, দা, কাঁচি ইত্যাদি।

জুমের মালিকানা ধরন :

‘চিহ্ন’ স্থাপনের পর জুম প্লটের উপর অস্থায়ীরূপে ব্যক্তি অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। ঐতিহ্যগতভাবে র‌্যান্যা শর্ত দ্বারা জুমের মালিকানা নির্ধারিত হয়। জুমিয়ারা তার জুমভূমিকে রান্যা হিসাবে ফেলে রাখলে তা পরবর্তীতে জুমচাষে উপযােগী হলে সেখানে তার মালিকানা স্বীকৃত।

স্বাভাবিক প্রক্রিয়াগত মেয়াদের পর পর ১২ বছর একই স্থানে জুমচাষ করলে মালিকানাস্বত্ত্ব স্থায়ী হয়। গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র না যাওয়া পর্যন্ত ঐ জুমভূমির উপর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অধিকার বলবৎ থাকবে। কোন ব্যক্তি স্বেচ্ছায় অন্যত্র বসবাসের উদ্দেশ্যে গ্রাম ত্যাগ করে চলে গিয়ে উক্ত ব্যক্তি যদি আবার ফিরে আসে, সেক্ষেত্রেও তার আগের জুমভূমির উপর মালিকানার অধিকার পাবে।

যদি কোন ব্যক্তি কোন দুস্কর্ম বা অনুরূপ কোন কারণে গ্রাম ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যায়, তাহলে সেক্ষেত্রে। উক্ত ব্যক্তি তার জুমভূমির উপর দাবী করার অধিকার হারাবে। উক্ত ব্যক্তি যদি কোন এক সময় তার আগের গ্রামে ফিরে আসে তাহলে, সেক্ষেত্রে তাকে নির্ধারিত জুম এলাকা থেকে নতুন জুমের প্রট বরাদ্দ দেয়া হবে। ভিন্ন গ্রাম থেকে স্থানান্তরিত হয়ে আসা পরিবারকে নির্ধারিত জুম এলাকা থেকে জুমভূমি বরাদ্দ দেয়া হয়। জুম চাষের প্রথম বৎসরে অন্যের জুম থেকে কোন কিছু আহরণ করা অবৈধ ও শাস্তিযােগ্য অপরাধ।

প্রতি বছর নির্ধারিত জুম এলাকার কোন এক পার্শ্বে জুমের প্লট পরিবারের সংখ্যার ভিত্তিতে ভাগ-ভাটোয়ারা করা হয়ে থাকে। কোন ব্যক্তি যদি তার জুমে কোন ফলদ বা বনজ গাছ রােপণ করে থাকে সেই ক্ষেত্রে উক্ত ব্যক্তি যেখানেই বসবাস করুক না কেন, ঐ গাছের উপর তার অধিকার বলবৎ থাকবে। ঐ ব্যক্তির বর্তমানে তার আত্মীয়দের মধ্যে যে ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ গাছের দেখাশুনা করবে সেই ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের উপর ঐ গাছের অধিকার বর্তাবে।

জুমের উপর অধিকার :

পিতামহ ও পিতার আমলে ৪-৫ বৎসর অন্তর জুমচাষের ইতিহাস আছে এমন ক্ষেত্রে ঐ জুমভূমির উপর মৃত ব্যক্তির স্ত্রী বা সন্তানদের উত্তরাধিকার হওয়ার অধিকার থাকে। বন্দোবস্তী আছে এমন টিলা জমির উপর ছেলে মেয়েদের উত্তরাধিকারী হওয়ার অধিকার আছে।

তবে প্রথাগত আইন অনুযায়ী মেয়েদের উপর ঐ জমির অংশীদার হওয়া অধিকার বর্তাবে না । তবে পিতা-মাতা চায়লেই মেয়েকে সম্পত্তি অংশ দিতে পারে। চাষীলা জমির ক্ষেত্রে জমির উপর উত্তরাধিকার প্রথা একই ধরনের। অংশীদারিত্বে এবং উত্তরাধিকার সূত্রে ছেলেদের অগ্রাধিকার রয়েছে।

বাবা মারা গেলে ছেলেরা সম্পত্তির অধিকারী হবে। সাধারণত মা-বাবা যে ছেলের সাথে থাকে সেই ছেলে ভূসম্পত্তির বেশি অংশ পায়। মৃতব্যক্তি পুত্রহীন অবস্থায় মারা গেলে সেই ক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তির ভাই বা ভাইয়ের ছেলেরা তার সম্পত্তি অধিকার হবে। তবে উল্লেখ থাকে যে, যে ভাই বা ভাতুস্পুত্র মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি অধিকারী হবে সেই মৃত ব্যক্তির ছেলে-মেয়েদের দেখভাল করবে।

কোন মেয়ে পিত্রালয়ে থাকার সময় নিজ পরিশ্রমে কোন স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি উপার্জন করে থাকলে সেই সম্পত্তির উপর তার মালিকানা বজায় থাকবে। তবে মেয়ে যদি কোন কারণে মারা যায় সেক্ষেত্রে মেয়ের উপার্জিত সম্পত্তির উপর পিতার মালিকানা বর্তাবে। মেয়ের স্বামী মৃত স্ত্রীর সম্পত্তির দাবী করতে পারবে না। কারণ, স্বামী আবার নতুন করে সংসার পেতে বসার অধিকার রাখে। বিধবাও সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবেন যদি তিনি কোন ছেলের সাথে থাকেন।

জুম সংক্রান্ত রীতি-নীতি :

মৌজার প্রধানের নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট কারবারী ও অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিগণের সমন্বয়ে আলােচনাক্রমে জুম এরিয়া নির্বাচন ও সরেজমিনে সীমানা নির্দিষ্টকরণ করা হয়। তদনুযায়ী কারবারীগণের মধ্যে আন্তঃজুম এলাকা সীমানা নির্ধারিত হয়।

জুমের অবস্থানগত কারণে যদি দুই হেডম্যানের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় কোন ব্যক্তির জুম হয়ে থাকে তাহলে সেই ক্ষেত্রে উক্ত ব্যক্তিকে দুই হেডম্যানকে জুমের খাজনা প্রদান করতে হবে। প্রতি বছর নির্ধারিত জুম এলাকার কোন এক পার্শ্ব ধারে জুম চাষ করা হয়ে থাকে।

প্রতি বছর পারিবারিক সংখ্যার ভিত্তিতে জুম এলাকা নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। আলােচনাক্রমে সরেজমিনে দেখার পর পছন্দ অনুযায়ী জুমস্থানে চিহ্ন স্থাপন করা হয়ে থাকে। চিহ্ন স্থাপনের সময় স্বপ্নদর্শনের জন্য জুম দেবতার নামে সত্যক্রিয়া করা হয়। স্বপ্ন বিচারে অশুভ বিবেচিত হলে ঐ জুমের প্লট বাতিল হয়। অশুভ ইঙ্গিতবাহী অনেক স্বপ্ন আছে। যেমন: স্বপ্নে মাংস কাটা, আগুন, বিশেষ বাহিনী, মর মুরগী, মৃত জীব-জন্ত অশুভ ইঙ্গিতবহ হিসাবে ধরে নেয়া হয়।

জুম কাটার আগে অনেক আদিবাসী ২-৩ দিনের ‘পাড়া বন্ধ’ পূজা আয়ােজন করে। সাধারনত বুধ, বৃহস্পতি ও মঙ্গলবার প্রতিবেশিদের সাথে জুম কাটা শুরু হয়। বিধবা ও অসুস্থ লোকের জন্য প্রয়ােজনীয় সংখ্যক শ্রম হিসেব করে স্বেচ্ছাশ্রম দানের মধ্যে দিয়ে সংশ্লিষ্ট জুম কর্তন করা হয়। যেমন: ১০ জনের ১ দিনের শ্রম বা ৫ জনের ১ দিনের শ্রম ইত্যাদি।

জম পােড়ানাের আগে প্রয়ােজনে পার্শ্ববর্তী এলাকার গ্রাম প্রধানের সাথেও পরামর্শ করা হয়। আলােচনাক্রমে দিন তারিখ ঠিক করে গ্রামের সবাইকে সতর্ক করে দেয়া হয়। পোড়ানাে, ২-৩ দিন আগে জম এলাকার চারপাশ পরিস্কার করে ফেলা হয় যাতে আগুন নিয়ন্ত্রণে থাকে।

পােড়ানাের সময় ঝুঁকিপূর্ণ স্থানসমূহে পাহারায় লােক নিয়ােজিত রাখা হয়। গ্রামের পার্শ্বে জুম হলে বাড়ীর ছাদে পানি নিয়ে পাহারা দেয়া হয়। আদিবাসী সমাজে নারীরা কি কি ফসলের বীজ বােনা হবে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে। পােড়া জুমের এক পাশে পবিত্রস্থান ঠিক করা হয়। প্রথম বীজ বপনের দিনে রােপণ করা হবে এমন সব বীজ সেখানে জড়াে করা এই স্থানে কাজ রাখা হয়।

ফসল তােলার আগে পূর্বনির্ধারিত পবিত্র স্থানে নবান্ন দেবতার নামে মুরগী উৎসর্গ করে বাঁশের চোঙায় মুরগীর রক্ত দিয়ে পূজা করা হয়। জুমের উৎপাদিত প্রথম ফলমূল ও সবজি নিয়ে নবান্না দেবতার উদ্দেশ্যে নৈবদ্য সাজিয়ে পূজা করা হয়। এই পূজার আগে কেহ জুমের উৎপাদিত ফসল ও ফলমূল খেতে পারে না।

জুমের ধান কেটে জুম ঘরের অস্থায়ী গােলায় ধান রাখার সময় যে অনুষ্ঠান করা হয় তাকে নবান্ন বলা হয়। জুমে ধান রােপণের পর থেকে ধানের পাক ধরার পর্যন্ত পাশের ঝিড়ি (ঝর্ণা) থেকে কোন মাছ, কাঁকড়া, ধরা যাবে না। নিরামিষ খাওয়া পালন করতে হবে। বড় ছেলের জন্য নতুন বৌ ঘরে না তােলা পর্যন্ত এই নিয়ম মেনে চলতে হবে। নবান্ন পূজা: জুমে সমস্ত ফসল তােলা হয়ে গেলে নবান্ন পূজা আয়ােজন করা হয়।

আদিবাসী জ্ঞানের ব্যবহার :

আদিবাসীরা তাদের ঐতিহ্যগত জ্ঞানের দ্বারা জুমচাষ করে থাকে। পাহাড়ের গায়ে কিভাবে চাষাবাদ করা যায় তা আদিবাসীরাই সৃষ্টি করেছে। তারা পরিবেশ বান্ধব জীবন ধারণের অর্থবহ উৎপাদনে সক্ষম। আদিবাসীদের জুমচাষ পদ্ধতিতে হাজার বছর ধরে পাহাড়ে চাষবাদ করলেও প্রাকৃতিক কোন বিরূপতা লক্ষ্য করা যায়নি।

পাহাড়ের কোন অংশে, জুমচাষ করলে ফসল হবে তা আদিবাসীরাই জানে। জুমচাষ করতে হলে কয়েকটি বিষয় বিবেচনয় রাখতে হয়। সেগুলাে হলাে: মাটির অবস্থা, ধরন, রােদ বা ছায়া, বাঁশ ও গাছের অবস্থা এই সব দেখে তারা কি ধরণের ফসল ভাল হবে ফলন দেবে তা জমিয়া ছাড়া কেউ বলতে পারবে না। জুমের পাশে ঝরণা বা কোন জলাশয় থাকতে হবে।

পার্শ্ববতীর এলাকার বনের দেখে জুমিয়ারা অনুমান করতে পারে জুমের ফসল ক্ষতিকর কোন জীব-জন্ত থাকে। পাশ্ববর্তী এলাকার যদি ডুমুর গাছ, ডল বাঁশের ঝাড় ও নানা ধরনের ফলদ বৃক্ষ থাকে তাহলে সেই বন শুকর, ভাল্লুক, কাঠবিড়ালী, বানরসহ নানা ধরনের ফসলের জন্য ক্ষতিকর জীব-জন্তু বসবাস করে।

আবার এটা লক্ষণীয় বিষয় যে, পার্শ্ববর্তী এলাকায় অতিরিক্ত ঝােপঝাড় থাকলে আগুন নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে না বলে জুমিয়ার এসব জায়গায় জুমচাষ করে না। জুমে জঙ্গল কাটার সময় জুমিয়ার বড় বড় বৃক্ষ কর্তন করে না। শুধু ডালপালা ছেটে দিয়ে রাখে। এই বৃক্ষগুলাে জুমে ছায়া দিয়ে জুমকে সর্বক্ষণ শীতল রাখে।

আগুন লাগানাে কৌশল :

ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে জুম কাটার এপ্রিল মাসে আগুন দিয়ে জুম পোড়াতে হয়। জুমের আগুন নিয়ন্ত্রণের আদিবাসীরা বিভিন্ন ধরনের পদ্ধতি প্রয়ােগ করে। তারা যখন জুমে আগুন দেয় তখন বাতাসের গতি পর্যবেক্ষণ করে। কোন দিক থেকে বাতাস বয়ছে। এরপর তারা জুমে আগুন লাগায়।

জুম পােড়ানাের সময় অগ্নি নির্বাপকের ব্যবস্থা (Protection Wall) না করলে অশেপাশের বন-জঙ্গল পুড়ে যায়। তাই তারা জুম পােড়ার আগে পার্শ্ববতী জঙ্গলের সাথে জুমের নিরাপদ দূরত্ব সৃষ্টি করেই তারপর আগুন লাগায়। জুমটি যদি গ্রামের পার্শ্ববর্তী স্থানে হয় তাহলে সন্ধ্যা বেলায় তাপ যখন কমে আসে তখন তারা জুম পােড়ায়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জুমিয়ারা পরস্পরকে অবহিত করে সবাই মিলে জুমে আগুন দেয়। পার্শ্ববর্তী এলাকায় আগুন ছড়িয়ে পড়লে জুমিয়ারা ‘আগুন দিয়ে আগুন’ নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার করে। এই পদ্ধতিতে আগুন যেদিকে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠে তার বিপরীত দিকে আগুন লাগিয়ে দিয়ে আগুনের তীব্রতাকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

মাটির উর্বরতা সৃষ্টি :

আদিকালে জুমে রাসায়নিক সার ব্যবহার করা হতােনা। জুম পােড়ার পর ছাই ও ভষ্ম সারে পরিণত হয়। এই ছাই ও ভষ্ম ছাড়াও আদিবাসীরা জুমের ধানের সাথে নানা ধরনের সাথে নানান জাতের ফসল ফলায়। এই ফসলগুলাের মধ্যে কিছু কিছু ফসল আছে যার শিকড় থেকে নিঃসৃত রস সার হিসাবে কাজ করে।

এগুলাের মধ্যে অরহর, তিল, তিশি, ভূট্টা, কাউন ধান, কাপাস তুলা ইত্যাদি। আবার কিছু কিছু ফসল আছে Land Cover Corps হিসাবে। এরা ভূমিতে ভূমিকে সর্বক্ষণ আর্দ্রতা বজায় রাখে। আবার কিছু কিছু ফসল আছে শিকড় বহুমুখী হওয়ায় ভূমির ক্ষয়রােধ করে। এ সম্পর্কে এখন সংক্ষেপে আলােকপাত করার চেষ্টা করছি।

আর জুমের উর্বরতা আনার জন্য জুমিয়ারা একবার জুমচাষ করার পর পরিত্যক্ত অবস্থায় ৬-৭ বছর ফেলে রাখে। অনেক বছর ফেলে রাখার পর পুনরায় সেখানে বনভূমিতে পরিণত হয়। মরা লতা পাতা পঁচে পুনরায় মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি পায়। যতদিন জুম ফেলে রাখা হয় সেখান থেকে জুমিয়ারা কোন গাছ পালা কাটে না। এমনকি জুম পােড়া আগুনে যেন কোনভাবে ক্ষতি না হয় সে ব্যাপারেও সতর্কতা অবলম্বন করে।

ভূমির ক্ষয়রােধ:

পাহড়ে ভূমি ক্ষয় হলে জুমে উর্বরতা হ্রাস পাবে। তাই জুমে পােড়া মাটি সংরক্ষণের জন্য জুমিয়ারা তাদের জ্ঞানকে নানাভাবে কাজে লাগায়। জুম পােড়ার পর পরই বৃষ্টির আগে জুমিয়ারা কলা গাছ, নানা ধরনের আলু (লতা জাতীয়), শিমুল আলু ইত্যাদি রােপণ করতে হয়। বৃষ্টি হলেই এগুলাে তাড়াতাড়ি গজে উঠে।

এরফলে বৃষ্টি পানিতে জুমের ভূমির উপরিভাগ সহজে ক্ষয় হয় না। মাটির কণাগুলাে ফসলের চারায় আটকে যায়। সামান্য পরিমাণ বৃষ্টি হলে তারা ধানসহ নানা ধরনের সবজি বীজ বপন করে। ফসলের বীজ বপন করার সময় তারা কোন প্রকার মাটি কর্ষন করে না।

একটা সূচালাে দা ব্যবহার করে মাটির খুঁড়ে খুঁড়ে একই গর্তে নানা ধরনের ফসলের বীজ বপন করে। জুম ক্ষেতে ফসলের সবুজাভ রঙ দেখা না দিলে তারা আগাছা পরিস্কার করে না। ধান, সবজি ও নানা ধরনের অর্থকরী ফসলের চারাগুলাে সবুজ রঙে ভরে উঠলে বৃষ্টির পানি সরাসরি মাটিতে আঘাত করতে পারে না।

ফসল বৈচিত্র্য :

জুম মানে একটি বাজার। বাজারে সমস্ত কৃষিপণ্য পাওয়া যায়। জুম হতে জুমিয়ারা তাদের সারা বছরের আর্থিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রয়ােজনীয়তা মেটায়। আদিবাসীরা জুমে অনেক রকমের ফসল ফলায়। ধান, সবজি ও অর্থকরী ফসল ছাড়াও সহ-ফসল হিসেবে নানা ধরনের ফুল, ডাল ও মসলা জাতীয় ফসল জন্মায়। এগুলাে হলাে:

ধান গ্যালং, সাদা বিন্নী, লাল বিন্নী, কালো বিন্নী, মাইমংসিং, দেংপ্লি, চ্যরে, চারু, রিক, নাইংসা, কোয়ার তুই চা (ম্রো ভাষা)।
শাক/সবজি/ ফলমূল মারফা,ঢেঁরস, চাল কুমড়া, মিষ্টি কুমড়া, বেগুন. তিতা বেগুন, বরবরটি, ঝিঙা, ঝিঝিঙা, লাউ, করলা, কাকড়লা, চিনাল, মিষ্টি কুমড়া, বেসংরা (কামরাঙা সিম), কোয়ার পাও, ক্রাকমা, (ম্রো ভাসা)।
মসলা জাতীয় ফসল সংসনি, সংনাট, কানলুং, বাকর (ধন্যাপাতা), ওয়াক্লিসং, তাম (আদা), সোয়াম (হলুদ), লিংক (মরিচ), (ম্রো ভাষা)।
আলু জাতীয় ফসল পংম, মপু, রুকে, খকদিয়া, রুলং, পাক্কিরু, মসিং, পুসরু, রুলং, পাকিরু, মডিং, হাবরু চপম, মওয়াই, মখাং, পাংম, মসিংপম, পুনরু (ভাষা)।
ফুল সংপ্রেম পাও, ‍খেতপাও, রামা পাও, চিংরিং পাও, নিকুপ চিং, তে পাও, সংকু পাও, সংক্লাং, সংহিরমা, সাকমাং চাপাও, চপান পাও, (ম্রো ভাষা)
টক জাতের সবজিকানসুর য়ি, সুরয়ামা (ম্রো ভাষা)।

জমে সবজি জাতীয় ফসল জুমিয়াদের খাদ্যাভাব ও পুষ্টির অভাব মেটাতে সহায়তা করে। এ ফসল বিক্রি করেও অথােপার্জন করা সম্ভব। এ ফসলগুলাে শুধু জুমিয়াদের অর্থাভাব, খাদ্যাভাবই ‍দূর করে না, এ ফসলগুলাে জুমের ফসলের Nitrogen Fixing এর কাজ করে। মিষ্টি কুমড়া, মারফা, আলুসহ লতা জাতীয় ফসলের শিকড়গুলাে একদিকে ভুমির ক্ষয়রােধ করে অপরদিকে Nitrogen Fixing এর ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।

মসলা জাতীয় ফসল চাষ করে আদিবাসীরা তাদের রান্না সুস্বাদু করতে ব্যবহার করে। এটি তারা শুধু মসলা হিসেবে ব্যবহার করে না। তারা চিকিৎসাশাস্ত্রে বিভিন্ন রােগের ঔষধ হিসাবেও ব্যবহার করে। এ মসলা জাতীয় ফসল শিকড়বহুল হওয়ায় ভূমির ক্ষয়রােধ করে। অপরদিকে এর পাতা ও ফুলের গন্ধের জুমে ফসলের ক্ষতিকর পােকাগুলােকে ঘেষতে দেয় না।

আদিবাসীরা জুমে নানা ধরনের আলু জাতীয় ফসল জন্মায়। এ আলু তাদের খাদ্যাভাবে অর্থাৎ দুর্দিনে ভাতের বিকল্প হিসাবে দৈনন্দিন চাহিদা পূরণ করে থাকে। তাছাড়া আল, লতা পাতা জুমে আচ্ছাদন করে সর্বক্ষণ মাটির আদ্রতা ধরে রাখে। এই আলু লতা পাতা জুমে Land Cover Crops হিসাবে বিশেষ ভূমিকা রাখে।

টক জাতীয় ফসল লাগানাে হয় মূলতঃ খাদ্যের জন্য। তবে এ জাতীয় ফসলের শিকড় মাটির আর্দ্রতা বজায় রাখে। শিকড়ের রস রাসায়নিক সার হিসেবে জুমের ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি করে।

আদিবাসীরা জুমে ডাল জাতীয় ফসলও ফলায়। এগুলাের মধ্যে বাইসিন, তিং, খুন, সিম, অরহর বিশেষভাবে উল্লেযােগ্য। অরহর গাছ নাইট্রোজেন ফিক্সিং এর কাজ করে। এছাড়া বাইসিন, তিং (তিশি) থুন (তিল) এবং সিম গাছ ধান গাছকে সারাক্ষণ ছায়া দেয়। যে জুমে ডাল জাতীয় ফসল বেশী সেই জুমে ধান বেশী উৎপাদন হয়।

আদিবাসীরা জুমে নানা ধরনের ফুল লাগায়। এফুল তারা সাজগুজের জন্য ব্যবহার করে। অন্যদিকে এ ফুলগুলাে শিকড়বহুল হওয়ায় ভূমির ক্ষয়রােধও করে। তাছাড়া এটা জুমের সৌন্দর্য বৃদ্ধির পাশপাশি পতঙ্গ পরাগায়নের ক্ষেত্রেও কার্যকর ভূমিকা পালন করে থাকে।

চারা ও ফসল সংরক্ষণের পদ্ধতি :

ফসল ও চারা সংরক্ষণ করতে জুমিয়ারা বদ্ধপরিকর। ফসলের চারার সাথে উথিত আগাছাগুলাে দা এবং নিড়ানী দ্বারা কেটে ফেলা হয়। ফসলের চারা যদি কোন কীট-পতঙ্গের দ্বারা আক্রান্ত হয়। সেক্ষেত্রে জুমিয়ারা পােকা-মাকড় দমনের জন্য জঙ্গল হতে বিভিন্ন ধরনের বৃক্ষের ছাল (যেগুলাে দুর্গন্ধযুক্ত ও বিষাক্ত) পানিতে পচিয়ে জুমের ফসলের উপর বিশেষ কৌশলে বাঁশের চোঙা দিয়ে স্প্রে করে।

আদি চাষাবাদ পদ্ধতি এ জুমচাষে কোন সার প্রয়ােগ প্রয়োজন পড়ে না। শুধু সময়মত পরিচর্যা করতে পারলেই যথেষ্ট। তবে ফসলের বীজ বপন করার পর থেকে জুমে যথেষ্ট সময় দিতে হয়। অনেক সময় দেখা যায় যে, ফসলের বীজ বপন করার সাথে সাথে বপনকৃত বীজগুলাে বনের পশু-পাখিরা মাটি উল্টিয়ে বীজের ডানাগুলাে খেয়ে ফেলে।

বিশেষ করে ইঁদুর ও ঘুঘু পাখি ধানের বিচির প্রতি অত্যন্ত লােভ। এ ক্ষেত্রে আদিবাসীরা বিভিন্ন ফাঁদ পাতে অথবা জঙ্গলের বৃক্ষছাল জলে পঁচিয়ে বীজের সাথে মিশিয়ে ছিটানাে হয়। পশু-পাখি, জীব-জন্তু এসব বীজ খেয়ে প্রাণত্যাগ করে।

জমের ফসলের চারা বড় হয়ে উঠলেও চারা আক্রমণের ভয়ের কমতি নেই। এসময় সাধারণত বানর ও হরিণের উপদ্রব বেশী দেখা যায়। বরবটি, ঢেঁরস ও ধানের চারা হরিণ ও বানরের অত্যন্ত লােভনীয় খাদ্য। ফসলের চারাগুলাে রক্ষার জন্য তখন জমিয়ারা নানা ধরনের ফাদ পাতার ব্যবস্থা করে।

জীব-জন্তু ফাঁদে পড়লে একদিকে তাদের এক বেলা আহারও যােগান হয় অন্যদিকে জুমের ফসলও রক্ষা পায়। এ সময় জমিয়ারা ফসলের চারা সংরক্ষণ ও ভাল ফসলের আশায় স্বীয় সংস্কারের পদ্ধতিতে নানা ধরনের পূজো-অর্চনা করে থাকে। ফসলহানি, পােকা-মাকড়ের আক্রমন পশু-পাখি, জীব-জন্তু আক্রমণ হতে রক্ষা পাওয়ার জন্য এসব পূজা-অর্চনা করে।

ফসলের চারা বৃদ্ধির জন্য আলাদা কোন সেচ ব্যবস্থার প্রয়ােজন হয় না। এ চাষাবাদ পদ্ধতি সম্পূর্ণ প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল। যখন ধান ও অন্যান্য ফসলাদি পাকে তখন বানর, শুকর ও ভালুকেরা ফসল নষ্ট করে বেশি। এক্ষেত্রে ফাঁদ পেতে রাখার ছাড়া কোন উপায় থাকে না।

অনেকে আবার ঢাক-ঢােল পিটিয়ে জীব-জন্তু হাত থেকে ফসল রক্ষার ব্যবস্থা করে থাকে। অন্যদিকে বনমােরগ, টিয়া পাখি আক্রমণেও অনেক ফসল নষ্ট হয়। এসব পাখির আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য জাল টাঙিয়ে ধরার ব্যবস্থা করতে হয়। আর জুমের মধ্যিখানে অনেকে বাঁশের ফালি দিয়ে একপ্রকার যন্ত্র টাঙিয়ে টানার ব্যবস্থা করে। এ যন্ত্রের দড়ি টান দিলে বিকট শব্দের সৃষ্টি হয়। এতে পশু-পাখি ভয়ে পালিয়ে যায়।

বীজ সংরক্ষণ:

জমের সমস্ত ফসল থেকে বীজ ভাল হয় না। জমের যে স্থানে ফসল বেশি ভাল হয় সেখান থেকে ফসলের বীজ সংগ্রহ করতে হয়। বীজের অঙ্করােদগমনের ক্ষমতা ভাল এমন ফসল থেকে বীজ সংগ্রহ করা প্রয়ােজন। বীজ অঙ্করােদগমনের ক্ষমতা যাতে ভাল রাখা হয় এবং ভৌত গুণাবলী সংরক্ষণের জন্য উপযুক্ত পদ্ধতিতে বীজ গুদামজাত করা প্রয়ােজন।

এক্ষেত্রে লাইয়ের খোলসের ভেতর, ঝুড়িতে করে অথবা অন্য কোন উপায়ে বীজ গুদামজাত করা হয়। মিষ্টি কুমড়া, তিল, তিশি, ঢেঁরস, বরবটি, কুমড়ো লাউ ইত্যাদি বীজ সংরক্ষণ করা হয় লাউযের খােলসের ভেতর অথবা বাঁশের চোঙায়। লাউয়ের খোলসে এবং বাঁশের চোঙায় বীজ রাখা হবে সেটা অবশ্যই ছিদ্রযুক্ত হতে হবে।

অনেকে ধানের বীজ রাখে ঝুড়ি বানিয়ে। ঝুড়ি বানিয়ে তার ভেতর শুকনাে কলার পাতা অথবা কুরক পাতা বিছিয়ে ধানের বীজ রাখা হয়। এরপর এগুলােকে শুকনাে ও ঠান্ডা আবহাওয়ায় ঘরের মেঝেতে রাখা হয়।

আলু জাতীয় ফসলের বীজ সংগ্রহ করা হয় পরিপক্ক আলুর থেকে। যেমন-মিষ্টি আলু, আদা, ওল কচু, হলুদ, পাহাড়ী আলু ইত্যাদি। এ বীজ গুলাে পরবর্তী বছরে যাতে উপযুক্ত বীজ হিসাবে অঙ্কুরিত হয় তার জন্য বীজগুলােকে মাটিতে গর্ত খুঁড়ে হালকাভাবে মাটি চাপিয়ে রাখা হয়। মাটি বেশী চাপালে বাতাস চলাচলের গতিতে বন্ধ হয়ে গরম আবহাওয়ায় পচে যায়। যার ফলে মাটি হালকাভাবে চেপে দিয়ে বিশেষভাবে রাখা হয়।

পােষাক পরিচ্ছদ :

আদিবাসীরা জুমের উৎপাদিত কার্পাস তুলা দিয়ে তাদের প্রয়ােজনীয় পােষাক পরিচ্ছদ ও কাপড় তৈরী করে। জুমের উৎপাদিত কার্পাস তুলা থেকে তারা বিশেষ উপায়ে সুতাে তৈরী করে। বন থেকে নানা ধরনের গাছের রস ও লতা পাতার রস মিশিয়ে সুতাে বিভিন্ন রঙ করানাে হয়।

এই সুতাে দিয়ে বিছানা কম্বল, গায়ের দেওয়া কম্বল, ওড়না, পরিধানের কাপড়, জামা ইত্যাদি তৈরী করে। ম্রো আদিবাসীরা জুমে ‘স্রাম’ নামে এক প্রকার উদ্ভিদ জন্মায়। এই উদ্ভিদ গরম পানিতে সেদ্ধ করে সুতার কালাে রং করায়। এরপর তার মেয়েদের পড়নের কাপড় ‘ওয়ানক্লাই’ তৈরী করে। অনেকে জুমের উৎপাদিত দোপাটি ফুলের পাতার রস, সীমের পাতার রস, হলুদ ইত্যাদি দিয়ে সুতাে রং করায়।

গৃহস্থালী সামগ্রীতে তিতা লাউয়ের খােলস ব্যবহার :

আদিবাসীরা জুম থেকে উৎপাদিত তিতা লাউ এর খােলস পানি তােলার কাজে ব্যবহার করে। এ জাতীয় লাউ অত্যন্ত তিতা হওয়ায় খাওয়া যায় না। এ লাউয়ের খােলসের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলাে ভিতরে ফোম এর মত এক প্রকার প্রলেপ থাকে। যা পানিকে সর্বক্ষন শীতল রাখে।

পানিতে কোন ময়লা-আবর্জনা থাকলে সেই ফোমের প্রলেপে জমে যায়। তাই লাউয়ের খােলসের পানি দেখতে মিনারেল পানির মত স্বচ্ছই থাকে। এই লাউয়ের খােলস শুধু পানি খাওয়ার কাজে ব্যবহার হয় না, এ লাউয়ের খােলসে নানা ধরনের ফসলের বীজ রাখা হয়। ভিতরে বিশেষ ধরনের প্রলেপ থাকাতে ফসলের বীজ নষ্ট হয় না। ম্রো আদিবাসীরা এই তিতা লাউয়ের খােলস দিয়ে তাদের ঐতিহ্যবাহী বাঁশি (পুং) তৈরী করে।

জুমচাষ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ :

জুমচাষ জীববৈচিত্র্যের সংরক্ষণেও বিশেষভাবে ভূমিকা রাখে। জুমে যখন ফসল উঠে তখন নানা ধরনের পশু-পাখি জুমকে খাদ্যভান্ডার হিসেবে ব্যবহার করে। জুমে নানা ধরনের ফসল ও ফুল চাষ করার ফলে নানা ধরনের কীটপতঙ্গ সমাবেশ ঘটে। তারা জুমে ধানসহ নানা ধরনের ফসলে পরাগায়ন ঘটায়। জমিয়ারা জুম হতে সব ফসল এক সাথে গলে তােলেনা। এগুলাে বনের পাখি ও পশুদের খাদ্য হিসাবে ব্যবহৃত হয়। আদিবাসীরা জুমচাষ করার পর ভূমি পতিত অবস্থায়

ফেলে রাখে। এই পতিত জুমকে ম্রো ভাষায় ‘প্রামচ্যা’, চাকমা ভাষায় ‘রান্যা’ র্মার্মা ভাষয় ‘ইয়া পুংছােঃ’, তঞ্চঙ্গ্যা ভাষায় ‘র‌্যান্যা জুম’ বলে। এই পতিত জুমে অনেক শাক-সবজি ও ফসল জন্মে এবং ধীরে ধীরে তাতে ঝােপঝাড়সহ গাছপালা জন্মে। এ সময় খাদ্যের সন্ধ্যানে অনেক পশু-পাখি পতিত জমে ভিড় জমাতে থাকে।

জুমে ফসলের চারা অঙ্কুরােদগমন না হওয়া পরযন্ত জুমে কোন পাখির বাচ্চা ধরা নিষেধ। হরিণের মাংস, লাল কাঁকড়া, শামুক রান্না করে খাওয়া নিষেধ। আদিবাসীদের এই সব লােকবিশ্বাস জীববৈচিত্র্যের সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমির রাখে। International Center for Integrated Mountain Development (ICIMOD) এর একটা স্টাডিতে জানা যায় যে, খামার হিসেবে, মাটি ও পানি সুরক্ষা এবং জীববৈচিত্র্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে জুমই হলাে সবচেয়ে ভাল উপায়।

আদিবাসীদের জুমচাষ ও শ্রম বিনিময় প্রথা :

পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসীদের শ্রম বিনিময় প্রথা বিদ্যমান রয়েছে। এই প্রথাটি পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের চিরায়ত প্রথা। এটি মূলত জুমে কাজে বেশী দেখা যায়। একটি জমিয়া পরিবার অনেক সময় বিশাল এলাকা নিয়ে জুমচাষ করে। কোন কোন পরিবারের কর্মক্ষম সদস্য আছে মাত্র ২-৩ জন।

সেক্ষেত্রে তারা অন্য জুম পরিবারের সাথে শ্রমবিনিময়ের মাধ্যমে কাজ করে। এই ৩ জন অন্য পরিবারের জুমে কয়েকদিন কাজ করে। পরবর্তীতে অনুরূপভাবে সেই পরিবারের সদস্যরাও শ্রমবিনিয়ােগকারীরা জুমে কাজ করে। এভাবে তারা পর্যায়ক্রমে একেক জুমে শ্রমবিনিময় করে।

এ শ্রমবিনিময় প্রথাকে মারমা ভাষায় “লাক্চা”, চাকমা ভাষায় “মালেয়্যে” তংঞ্চ্যা ভাষায় “আইল্যা”, ম্রো ভাষায় “তক্রুট” নামে স্থানীয়ভাবে অভিহিত করা হয়ে থাকে। পার্বত্য অঞ্চলে এই শ্রমবিনিময় প্রথার মাধ্যমে সমাজের লােকদের মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্য, মৈত্রী, সাম্য, আন্তরিকতা ও ভালবাসার বন্ধন গভীরতর হয়। কাজ করার সময় কেউ গান করে, কেউ ছাড়া আওরায় আবার কেউ কেউ কেউ হাসি-ঠট্টা করে পুরাে পরিবেশটাকে আনন্দময় করে তােলে। এতে সবাই অনুপ্রাণিত হয় আর তাদের কাজের স্পৃহা বাড়ে।

উপসংহার :

পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস পর্যালােচনা করলে দেখা যায়, বৃটিশ শাসনের গােড়া থেকে স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে সরকারী ও বেসরকারী উদ্যোগে জুমিয়াদের উন্নয়নের নামে বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হয়েছে। তবে এসব প্রকল্প কোনটিই জুমিয়াদের উন্নয়নে বাস্তবিক অর্থে কার্যকরী হয়নি।

বরং তাদের স্বাভাবিক জীবন-যাপন প্রক্রিয়াকে আরা নানাভাবে বাঁধাগ্রস্থ করেছে। এই কার্যক্রমগুলাের মধ্যে যেমন:- সংরক্ষিত বনাঞ্চল সম্প্রসারণ প্রকল্প, যৌথ খামার প্রকল্প, রাবার বাগান প্রকল্প, জুমিয়া পুনর্বাসন প্রকল্প ইত্যাদি। এই প্রকল্পসমূহ কার্যত জুমিয়াদের জীবন ও জীবিকার ক্ষেত্রে আত্মনির্ভশীলতার পরিবর্তে পরনির্ভশীলতাই বাড়িয়েছে।

অনেক পরিবার নিজ বস্তুভিটা হতে ভূমিহীন হয়েছে। এমনকি সামাজিক মালিকানাধীন ঐতিহ্যগত জুমভূমিও নানাভাবে হাতছাড়া হয়েছে। এরফলে জুমিয়াদের অভাব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই জুমচাষের বিকল্প হিসেবে পবিপূরক অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের সন্ধান করা অতিব জরুরী। যাতে তারই ভিত্তিতে খাদ্য, পরিবেশ ও সকল প্রাণবৈচিত্র্যের মধ্যে ভারসাম্য বজায় থাকে।

এর ফলে একদিকে স্থানীয় উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে জুমিয়াদের অংশগ্রহণ বাড়বে। সেই সাথে খাদ্য ও পুষ্টির নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের মাটির গঠন প্রকৃতি, পরিবেশ, খাদ্য ও জননিরাপত্তা এবং জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য প্রভৃতি বিষয়সমূহকে বিবেচনা করে ফলন বাগান চাষে জুমিয়াদের উৎসাহ প্রদান করা দরকার।

লেখকঃ সিংইয়ং ম্রো।

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - [email protected] এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা

Jumjournal

Administrator