পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে জুমচাষ ও জুমিয়া

0
41

পার্বত্য চট্টগ্রামে বর্তমানে যে ১১টি পাহাড়ী গোষ্ঠী বসবাস করছে, এই অঞ্চল ব্রিটিশ শাসনের আওতায় আসার আগে তাদের সবাই কোনো একক কেন্দীয় শাসন ব্যবস্থার আওতায় ছিল না। ফলে ব্রিটিশ শাসনামলের শুরুতে সেখানকার ‘পাহাড়ী’ অধীবাসীরা সবাই জুম চাষ করলেও তার অর্থ এই ছিল না যে এই অভিন্নতার ভিত্তিতে প্রাক-ঔপনিবেশককালে সামাজিক, রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিকভাবে বিভিন্ন পাহাড়ী গোষ্ঠী কোনো একক ও অভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে বাঁধা ছিল। প্রকৃতপক্ষে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম’ ‘পাহাড়ী’ প্রভৃতি যে পদগুলো আমরা ব্যবহার করছি প্রাক ব্রিটিশ যুগের প্রেক্ষিতে এগুলির কোনো তাৎপর্য নেই (ত্রিপুরা ১৯৯২, ১৯৯৮)।


প্রাক ব্রিটিশ যুগ

পার্বত্য চট্টগ্রামের ‘পাহাড়ী’ জাতিসমূহের সাথে ঐতিহাসিকভাবে ত্রিপুরা, আরাকান ও মোগল রাষ্ট্রের বিভিন্ন মাত্রার সম্পর্ক ছিল। ল্যুইন (Lewin 1869:28) এই জাতিসমূহকে মারমাদের মধ্যে প্রচলিত একটি শ্রেণীকরণ অনুসারে দুইটি বর্গে ভাগ করেছিলেন। ‘খিয়ংথা’ বা ‘নদীতীরবাসী” এবং ‘টংথা’ বা ‘পর্বতবাসী’। প্রথমোক্ত বর্গে অন্তর্ভুক্ত ছিল মারমা ও চাকমাদের মত জনগোষ্ঠী যারা সচরাচর নদীর তীরে বা নিচু পাহাড়শ্রেণীর পাদদেশে বাস করত। এই গোষ্ঠীগুলো অন্যদের আগেই ব্রিটিশ প্রভাব বলয়ে চলে এসেছিল। দ্বিতীয় বর্গে অন্তর্ভুক্ত ছিল ম্রো, বম, লুসাই প্রভৃতি জনগোষ্ঠী যাদের লোকালয়গুলো সচরাচর অপেক্ষাকৃত প্রত্যন্ত এলাকার পর্বতশ্রেণীর শিখরদেশে অবস্থিত ছিল। এদের মধ্যে কোনো গোষ্ঠী যেমন লুসাইরা প্রথমদিকে পুরোপুরি ব্রিটিশ শাসনের আওতা বহির্ভূত ছিল। প্রাক ব্রিটিশ আমল থেকে লুসাইসহ যেসব গোষ্ঠী পার্শবর্তী রাষ্ট্রগুলোর বশ্যতা স্বীকার করত না, তারা অতীতে অন্যান্য জনগোষ্ঠীর উপর হামলা করে নরমুণ্ড, দাস প্রভৃতি সংগ্রহ করত বলে জানা য়ায়। এ অঞ্চলের ইতিহাসে এরাই ‘কুকী’ নামে পরিচিত পেয়েছে (এর নামে বর্তমানে কোনো জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব পার্বত্য চট্টগ্রামে নেই)। ল্যুইনের দেওয়া বিবরণ থেকে জানা যায়, বাঙালিরা চট্টগ্রাম জেলার সীমান্তবর্তী এলাকার বন্ধুভাবাপন্ন উপজাতিগুলোকে ‘জুমিয়া’ বলে অভিহিত করত এবং অন্যদের, বিশেষ করে যারা বাংলা বলতে পারত না তাদের ‘কুকী’ হিসাবে আলাদাভাবে চিহ্নিত করত (Lewin 1869:28)।

প্রকৃতপক্ষে ‘পাহাড়ী’ জনগোষ্ঠীর অনেক প্রাক-ব্রিটিশ কালেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রাষ্ট্র ও বাজার ব্যবস্থার আওতায় চলে এসেছিল। চাকমা ও মারমারা তাদের ‘রাজা’দের মাধ্যমে মুগলদের কার্পাস-কর দিত এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলের হাটবাজারের সাথে তাদের সম্পর্ক ছিল। আর চট্টগ্রাম অঞ্চল মুগলদের শাসনে আসার আগেও আরাকান ও ত্রিপুরা রাষ্ট্রের সাথে বিভিন্ন ধরণের সম্পর্ক ছিল একাধিক ‘পাহাড়ী’ গোষ্ঠীর, যাদের অনেকের উপর প্রাক-মুগল আমল থেকেই বিভিন্ন মাত্রায় করের বোঝা ছিল বলে অনুমান করা যায়। একমাত্র ‘কুকী’দের মত জনগোষ্ঠীদের বেলায় সম্ভবত এ ধরণের করের বোঝা ছিল না, তবে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রগুলোর সাথে তাদেরও মিথস্ক্রিয়া ছিল, যেমন মাঝেমধ্যে ‘কুকী’দের সামরিক সহায়তা নিত অনেক রাজারা। আর ল্যুইনের দেওয়া তথ্য ঠিক হয়ে থাকলে ‘কুকী’রা পার্শ্ববর্তী জনগোষ্ঠীদের উপর হামলা চালিয়ে দাস সংগ্রহ করত, যাদের জুম ক্ষেতে কাজ করানো হত। প্রাক ঔপনিবেশিক আমলে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে বাঙালি কৃষকদের কোনো বসতি গড়ে না ওঠার প্রধান কারণ সম্ভবত ছিল ‘কুকী’ হামলার ভয়। শুধু বাঙালী কেন, চাকমা ও ত্রিপুরাদের মত জনগোষ্ঠীর মধ্যেও কুকী-ভীতি ছিল (এ সংক্রান্ত বিভিন্ন কিংবদন্তী এখনো প্রচলিত রয়েছে), ফলে অতীতে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে তাদের জন-বিস্তৃতি এখনকার মত ব্যাপক ছিল না।

Morning Light By Nantu Chakma
Morning Light By Nantu Chakma
পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা সৃষ্টি এবং চাষের ‘সীমানা’ নির্ধারণ

ব্রিটিশরা ‘কুকী’দের ‘দমন’ করার পরপরই ধীরে ধীরে চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা এবং সবশেষে বাঙালী জনপদ এ অঞ্চলে অভ্যন্তরভাবে বিস্তার লাভ করেছে। উল্লেখ্য যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলার সৃষ্টির একটা প্রধান উদ্দেশ্য ছিল কুকীদের দমন করা (Lewin 1869:Chapter XXII)। অন্যদিকে ১৮৬০ সালে সৃষ্ঠ পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলার সীমানা নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে একটা প্রধান মাপকাঠি ছিল দুই ধরণের কৃষির ব্যবস্থার আপেক্ষিক অবস্থান। যেসব অঞ্চল লাঙল চাষের আওতায় চলে এসেছিল সেগুলোকে বাদ দিয়েই পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলার সীমা নির্ধারণ করা হয়। অর্থাৎ শুরুতে গোটা পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা জুড়ে কৃষির একমাত্র ধরণ ছিল জুমচাষ। অন্যদিকে চট্টগ্রাম জেলায় পড়ে যাওয়া পাহাড়ী এলাকাগুলোতে ১৮৭০ সালে জুমচাষ নিষিদ্ধ করা হয়, যদিও কার্যত এ নিষেধাজ্ঞাটা একটা আনুষ্ঠানিকতা মাত্র ছিল বলে মনে হয় (Sopher 1964: 120)। তার আগেই চট্টগ্রামের সীমানা পড়ে যাওয়া চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা জুমিয়ারা পার্বত্য চট্টগ্রামে সরে যায় (অবশ্য সীতাকুন্ড পাহাড় শ্রেণীর আনাচে-কানাছে এখনো বেশ কিছু ত্রিপুরা গ্রাম রয়েছে)। ব্রিটিশ শাসনের গোড়াতে পার্বত্য চট্টগ্রামের লাঙল চাষের প্রচলন ছিল না, তবে রাঙ্গুনিয়া অঞ্চলের কিছু অভিজাত চাকমা পরিবার ‘বাঙালী’ চাষীদের দিয়ে আবাদ করত বলে জানা যায়।

ব্রিটিশরা আনুষ্ঠানিকভাবে পার্বত্য জেলা সৃষ্টি করে একে তাদের প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় আনার অনেক আগে থেকেই এ অঞ্চলের প্রতি তাদের বাণিজ্যিক দৃষ্টি প্রসারিত ছিল। এখন থেকে দু’শ বছরের বেশি আগে ফ্রান্সিস বুখানন দক্ষিণপূর্ব বাংলার বিভিন্ন স্থানে মশলা চাষের উপযোগী জায়গা খুঁজতে বেরিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলেও উপস্থিত হয়েছিলেনশ্লেষণ করলে বোঝা যায় জুমচাষের মত ‘আদিম ও ‘ অপচয়মূলক’ (বুখাননের দৃষ্টিতে) ইৎপাদন পদ্ধতির বদলে সে অঞ্চলকে  (ভাস সেন্দেল ১৯৯৪; Van Schendel 1992)। তাঁর ভ্রমণ-বৃত্তান্তের বিভিন্ন জায়গায় জুমচাষ সম্পর্কে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ ও মন্তব্য বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় জুমচাষের মত আদিম ও অপচয়মূলক (বুখাননের দৃষ্টিতে) উৎপাদন পদ্ধতির বদলে সে অঞ্চলকে কীভাবে লাভজনকভাবে (ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জন্য) ব্যবহার করা যায়, সেদিকে ব্রিটিশদের দৃষ্টি ছিল। ব্রিটিশরা পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা সৃষ্টি করার প্রায় সাথে সাথেই প্রশাসনিকভাবে জুমচাষ বন্ধ করার চিন্তাভাবনা শুরু হয়ে যায়। একদিকে লাঙল চাষের প্রবর্তনের মাধ্যমে রাজস্ব বাড়ানোর লক্ষ্য় ছিল, অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের একটা বড় অংশ জুড়ে সংরক্ষিত বনাঞ্চল তৈরীও ছিল আরেকটা প্রধান লক্ষ্য (বৃক্ষ সম্পদ আহরণ, সেগুন চাষের পরকিল্পনা ইত্যাদি)।

প্রশাসসিক মহলে জুমচাষীদের যাযাবের বলে ভাবা হত এবং এই ধারণা থেকে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার সুবিধার্থে জুমচাষ বন্ধ করে লাঙল চাষের প্রতি জুমচাষীদের আগ্রহী করে তোলার কথা বিবেচিত হত। ১৮৭৪ সালে পার্বত্য পার্বত্য চট্টগ্রামের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক এ. ডব্লিউ. বি. পাওয়ার কর্তৃক চট্টগ্রামের কমিশনারের কাছে একটা চিঠি লিখেছেনঃ লাঙল চাষ প্রবর্তনের উদ্যোগ গৃহীত হওয়ার পেছনে মূল লক্ষ্য ছিল পাহাড়ীদেরকে তাদের যাযাবর প্রবৃত্তি (যা হল জুম পদ্ধতিতে আদিম ধরণের চাষাবাদের প্রত্যক্ষ পরিণাম) থেকে সরিয়ে এনে নির্দিষ্ট আবাসস্থলে স্থায়ী করে তোলা (Selections 1887-95)। বাস্তবে জুমচাষীরা দু’এক বছর পর পর চাষজমি পাল্টালেও তাদের গ্রামগুলো তুলনামূলকভাবে স্থায়ী ছিল, এ বিষয়টা অবশ্য পরবর্তীকালে একজন প্রশাসক ঠিকই ধরতে পেরেছিলেন (Hutchinson 1906: 50-54; cf. Roy 1994)। তথাপি সাধারণভাবে জুমচাষীরা যাযাবর ছিল এ ধরণের ভ্রান্ত অনুমান এখনো বিনা প্রশ্নে গ্রহণ করা হয়ে থাকে।

লাঙল চাষের প্রসার ও ‘পাহাড়ী-বাঙালী’ দ্বন্দের সূচনা

সাধারণভাবে বলা যায় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক নীতিমালার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামে ধীরে ধীরে জুমচাষ ও জুমচাষীদের প্রান্তিক করে দেওয়া হয়, যে প্রান্তিকীকরণ প্রক্রিয়া ব্রিটিশশাসনের অবসানের পর ত্বরান্বিত হয়েছে। অন্যদিকে ব্রিটিশদের নেওয়া বিভিন্ন প্রশাসনিক পদক্ষেপের কারণে চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরাদের মত জনগোষ্টীদের একটা ক্রমবর্ধমান অংশ বিভিন্ন নদী ও ছড়ার তীরবর্তী সমতল ভূমিতে স্থায়ী চাষাবাদের দিকে ঝুঁকে পড়তে শুরু করে। এটা সুবিদিত যে ষাটের দশকে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের ফলে এই প্রক্রিয়া প্রচন্ডভাবে বিঘ্নত হয়। বাঁধের ফলে স্থানচ্যুত প্রায় এক লক্ষ মানুষের মধ্যে যারা দেশান্তরী হয় নি, তাদের মধ্যে স্থায়ী কৃষিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠা অনেককে নতুন করে জুমচাষে ফিরে যেতে হয়েছিল। অন্যদিকে গোটা পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের ৪০% প্রথম শ্রেণীর সমতল কৃষি জমি জলমগ্ন হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি কর্ণফুলী নদীর দুই তীরের পাহাড়ের ঢালগুলোও অনেকাংশে জুমচাষের আওতার বাইরে চলে গিয়েছিল।

(কাপ্তাই বাঁধের ফলে) শুধু সমতল কৃষির ক্ষতি সাধন ঘটেনি, জুমচাষের উপযোগী পাহাড়ী জমিও অন্যভাবে ব্যবহৃত হতে থাকে। ১৯৬৭ সালে চালু হওয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন প্রকল্প (বর্তমান উন্নয়ন বোর্ড) বাস্তবায়নের মাধ্যমে হ্রদে উপদ্রুত অঞ্চলে ৫৯টি মৌজায় ১০,৮২৫ একর পাহাড়ী জমিয় ব্যক্তি মালিকানায় প্রদান করা হয়। এ জমির প্রায় ৬০ শতাংশে বর্তমানে আধুনিক পদ্ধতিতে কলা, আনারস প্রভৃতি ফলের চাষ করা হচ্ছে (খীসা ১৯৯৫.৫০)।

একই সময়কালে পার্বত্য চট্টগ্রামে পার্শ্ববর্তী অঞ্চল থেকে বাঙালী কৃষকদের অভিবাসনের প্রক্রিয়াও শুরু হয়, যা পরবর্তী কালের ‘পাহাড়ী-বাঙালি’ দ্বন্দের একটা প্রধান ক্ষেত্র রচনা করে।

এখানে যে বিষয়টা লক্ষ্য করা দরকার সেটা হল, এই দ্বন্দ কিন্তু সমতল ভূমির দখলকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে (পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন প্রকার ভূমির বণ্টন সারণী-১ এ দেখানো হল)। সত্তর ও আশির দশকে মাঝামাঝি সময়কালে সামরিক শাসকরা সরকারি উদ্যোগে ব্যাপক সংখ্যক বাঙালি জনগোষ্ঠীকে পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থানান্তরিত করার আগে থেকেই নানান প্রক্রিয়ায় লাঙল-চাষে অভ্যস্ত পাহাড়ী কৃষকদের জমি-জমা বাঙালীদের হাতে যেতে শুরু করে। অন্যদিকে ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে প্রশাসনিক কাঠামো সকল ক্ষেত্রেই যেহেতু বাঙালীদের প্রায় একচেটিয়া আধিপত্য ছিল, পাহাড়ীদের মধ্যে জুমচাষ ছেড়ে দেওয়া মানুষদের মধ্যে থেকে যে শিক্ষিত মধ্য-বিত্ত শ্রেণী গড়ে উঠছিল তাদের অস্তিত্বের সংকট বোধই তৈরী করেছে জনসংহতি সমিতি পরিচালিত সশস্ত্র সংগ্রামের ভিত্তি।

জুম চাষ
জুম্মবি, ছবিঃ নান্টু চাকমা
সারণী-১ঃ পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন ধরনের জমির পরিমাণ

পার্বত্য চট্টগ্রামের মোট আয়তন – ৩২,৫৯,৫২০ একর

মোট আবাদী জমি – ৩,২৫,৭৪৫ একর

আবাদযোগ্য জমি – ১০,৮১০ একর

মোট বনভূমি – ২৪,২৩,৯৪৫ একর

কর্ষণের অযোগ্য ভূমি – ৫,৬৪,০৭০ একর

কাপ্তাই বাঁধে নিমজ্জিত আবাদী জমি – ৫৪,০০০ একর

(উৎস-সু.লা. ত্রিপুরা ১৯৯৪;২৫-২৬)

অরণ্য ভূমি – ২৯,০২,৭৩৯ একর

চাষযোগ্য জমি – ৯৩,০০২ একর

(কাপ্তাই হ্রদে নিমজ্জিত ৫৪,০০০ একর)

চাষের অযােগ্য জমি – ৫৪,০০০ একর

মোটেই চাষাবাদযোগ্য নয় এমন জমি ১,৭০,৮৯৯ একর

পতিত জমির পরিমাণ – ১০,০০০ একর

(উৎস: খীসা ১৯৯৬ঃ১২৯)

বি:দ্র: দুইটি অপ্রাথমিক উৎসে আমরা দুই ধরণের হিসাব দেখেছি। দুইটিই এখানে দেখানো হল।

জুমিয়া বনাম জুমঃ পাহাড়ী সমাজে শ্রেণী-বিভাজন

উল্লিখিত সংগ্রামের প্রেক্ষিতে ‘জুম্ম জাতীয়তাবাদী’ আন্দোলনের নেতা-কর্মীদের অধিকাংশই এসেছে জুমচাষ ছেড়ে দেওয়া পাহাড়ী (বিশেষত চাকমা) শ্রেণীসমূহ থেকে। অন্যদিকে বিভিন্ন পাহাড়ী গোষ্ঠীর মধ্য আক্ষরিক অর্থে যারা জুমিয়া রয়ে গিয়েছিল তারা এই আন্দোলনের মূল স্রোত থেকে সবচাইতে দূরে রয়ে গেছে বলা যায়। অবশ্য কৌশলগত কারণে শান্তিবাহিনীর ঘাঁটিগুলো জুমিয়া অধ্যুষিত এলাকা সমূহেই হয়ত বেশি ছিল এবং এদিক থেকে জুমিয়াদের সাথে শান্তিবাহিনী তথা জনসংহতি সমিতির সদস্যদের সম্পৃক্ততা গড়ে উঠেছিল (আমরা জানতে পেরেছি যে, জনসংহতি সমিতির সশস্ত্র আন্দোলন চলাকালে ‘জুমিয়া সমিতি’ নামে এর একটি অঙ্গসংগঠন ছিল)। এই প্রেক্ষিতে সহজেই অনুমেয় কেন সামরিক কর্তৃপক্ষ একসময় পার্বত্য চট্টগ্রামের অনেক জায়গায় জুমচাষ পবন্ধ করার বা ‘জুমিয়া পুনর্বাসন’-এর উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল (cf. Roy 1996:35., also, Loeffler n.d.:5)। অন্যদিকে শান্তিবাহিনীও বিভিন্ন কারণে তাদের তরফ থেকে বিভিন্ন জায়গায় জুমচাষ বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেছিল বলে জানা যায় (Mohsin 1997:119-120)।

খোদ পাহাড়ীদের মদ্যে থেকেই যে জুমচাষ বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তা কোনো অপ্রত্যাশিত ঘটনা নয়। ব্রিটিশ আমল থেকে রাষ্ট্র কর্তৃক বিভিন্নভাবে জুমচাষ ও জুমচাষীদের প্রান্তিক করে দেওয়ার প্রক্রিয়া পাহাড়ীদের সকল শ্রেণী ও গোষ্ঠীর জন্য একই ধরণের ফলাফল বয়ে আনেনি। ব্রিটিশ শাসনের সূচনালগ্লে পাহাড়ীদের সবাই কমবেশী জুমচাষের সাথে সংশ্লিষ্ট থাকলেও এই সংশ্লিষ্টতার ধরণ সবার জন্য সমান ছিল না। অর্থাৎ আগে থেকেই পাহাড়ীদের মধ্যে শ্রেণী বিভক্তির অস্তিত্ব ছিল যা ব্রিটিশ শাসনের সুবাদে একটা নির্দিষ্ট কাঠামোও রূপ লাভ করে। উল্লেখ্য যে, ব্রিটিশ আমলে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত ব্যবস্থা অনুসারে কার্বারী বা গ্রাম প্রধানদের কোনো ‘জুম কর’ দিতে হয় না এবং রাজা ও হেডম্যানদের বেলায় এই কর তো তাদের দিতে হয়ই না, উল্টো তারা এর ভাগ পায়। অধিকন্তু কার্বারি ও হেডম্যানরা নিজেদের জন্য সেরা জমিগুলো বেছে নিতে পারে জুম চাষের জন্য। কাজেই এভাবে পাহাড়ীদের মধ্যে সুস্পষ্ট শ্রেণী বিভাজনের একটা ভিত্তি রাষ্ট্রীয়ভাবে রচিত হয়েছিল।

সাধারণ জুমিয়া কৃষকদের উপর করের যে বোঝা ছিল তা যথেষ্টই ভারি ছিল। আজ থেকে প্রায়ই একশ বছর আগে ধানের যে বাজার দর জানা যায়, তাতে টাকায় ৪ আড়ি (এক আড়ি = ৩০ পাউন্ড বা প্রায় ১৫ সের) ধান মিলত (Hutchinson 1906:)। সে হিসাবে জুম কর যদি ৪ টাকা হয়ে থাকে, তা ছিল ১৬ আড়ি ধানের সমতুল্য, যার বর্তমান বাজার দর হবে ১,০০০ (এক হাজার) টাকার উপরে। এ থেকে স্পষ্টতই বোঝা যায় করের বোঝাটা কত ভারী ছিল। এই বোঝা যে সাধারণ কৃষকরা বহন করত তাদের সাথে নিশ্চিতভাবেই একটা শ্রেণীগত বিভাজন ছিল রাজা-হেডম্যান-কার্বারিদের। (বর্তমানে কোন মৌজায় যদি ১০০টি জুমিয়া পরিবারের কাছ থেকেও ১,০০০ টাকা হারে কর নেওয়ার ব্যবস্থা থাকত, তাহলে আদায়যোগ্য মোট ১,০০,০০০ টাকা থেকে রাজা ও হেডম্যানের ভাগে পড়ত যথাক্রমে ৪১,৬৬৬ ও ৩৭,৫০০ টাকা) জুমিয়া কৃষকদের বেগারও খাটতে হত, যে ব্যবস্থা ১৯০০ সালের শাসনবিধিতে আইনগতভাবে স্বীকৃতি পেয়েছিল। এছাড়া পাহাড়ীদের মধ্যে ‘মাজন’ (মহাজন) নামে পরিচিত একশ্রেণীর সম্পন্ন পরিবার দেখা যেত যারা ধান কর্জ দিত চড়া হারে সাধারণ জুমিয়া কৃষকরা অনেক ক্ষেত্রেই এ ধরণের মাজনদের উপর নির্ভরশীল থাকত। একসময় বাঙালি (বা ক্ষেত্রবিশেষে পাহাড়ী) মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের ‘দাদন’ ব্যবসার কবলেও জুমিয়া কৃষকদের অনেকে পড়তে থাকে। স্পষ্টতই স্থানীয় আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে সাধারণ জুমিয়া কৃষকরা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলের শুরু থেকে বা তারো আগে থেকেই ছিল প্রান্তিক অবস্থানে, এই প্রান্তিকতা সময়ের সাথে সাথে বেড়েছে মাত্র। অন্যদিকে পাহাড়ীদের মধ্যে যারা জুমচাষ ছেড়ে দিয়েছিল বা আগে থেকেই যারা সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল (যেমন হেডম্যান, ‘মাজন’ প্রমুখরা), তাদের মধ্যে থেকে উঠে এসেছে একটা শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী, যে শ্রেণী থেকে গড়ে উঠেছে পাহাড়ীদের স্বায়ত্বশাসনের আন্দোলনের নেতৃত্ব। ব্যাপকতার পরিসরেও এই শ্রেণীই বর্তমানে পাহাড়ী সমাজে আধিপত্য করছে বলা চলে। জুমচাষ বা সমকালীন জুমিয়া কৃষকদের সাথে এই শ্রেণীর তেমন কোনো নিবিড় সম্পর্ক আর নেই। এই প্রেক্ষিতে এটা কোনো অপ্রত্যাশিত ঘটনা হবে না যদি জুম্ম জাতীয়তাবাদের প্রবক্তারাই (অর্থাৎ জনসংহতি সমিতি বা অনুরূপ কোনো পাহাড়ী রাজনৈতিক সংগঠন) অদূর ভবিষ্যতে জুমচাষ চিরতরে বন্ধ করে দেওয়ার উদ্যোগ নেয়। এই মুহূর্তে এ ধরণের কোনো সম্ভাবনা নেই ঠিকই, তবে তা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।


পার্বত্য চট্টগ্রামে জুমচাষ, নভেম্বর ২০০৩

প্রশান্ত ত্রিপুরা ও অবন্তী হারুন 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here