নির্বাসন থেকে ফিরে দেখাঃ এক চাকমা ব্যক্তির অভিজ্ঞতা (পর্ব ০৪)

0
361

এ পর্বে উঠে এসেছে লেখকের স্বদেশ ত্যাগপূর্বক বার্মা তথা মিয়ানমারে শরণার্থী হিসেবে বসবাসকালীন অভিজ্ঞতা, সেখানকার পরিবেশ; সেই সাথে উঠে এসেছে আরো অগণিত পাহাড়ি আদিবাসীর দেশত্যাগের করুণ ইতিহাস, আর তাঁদের অব্যক্ত সকল বেদনা

তৃতীয়বারের পরিত্রাণ, রাঙামাটি থেকে বার্মাঃ

তখনও ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাস চলছে। এদিকে আমি অব্যাহত হত্যা, নির্যাতন আর উচ্ছেদের যত খবর পাচ্ছিলাম ঠিক তত বেশি উত্তেজিত, ভীত এবং শঙ্কিত বোধ করছিলাম।

আমার এক ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত বন্ধুর সাথে আমি প্রায়ই আলাপ করতাম। বাঙালি মুক্তিযোদ্ধা[1] দের হাতে আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের সার্বিক অবস্থা কি হতে চলছে এ নিয়েও আমরা দুজন কথা বলতাম।

“আমরা কিভাবে বাঁচতে পারি? পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ভাগ্যে কিই বা লেখা আছে? বাঙালিরা আমাদের নির্মূল করেই ছাড়বে। পাহাড়ি আদিবাসীরা পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে[2] সাহায্য করেছিল- এ অজুহাত দিয়ে পাহাড়িদের উপর হামলা, হত্যা ও ভূমি থেকে উচ্ছেদের পাঁয়তারা করা হচ্ছিল”।

ভোরের কাপ্তাই হ্রদ, Image Source: Andreas Torhaug/ Flickr

এ জিজ্ঞাসাগুলো প্রতিটা মুহূর্ত অন্তর্দগ্ধ করছিল আমাদের। আমরা রাঙামাটিতে থাকাটা নিজেদের জন্য নিরাপদ বলে মনে করছিলাম না।

তখনও শহরটিতে ভারতীয় সৈন্যদের অবস্থান ছিল। কিন্তু তারা চলে গেলেই বাঙালি মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার সম্ভাবনাই ছিল অধিক।

একজন চাকমা ভিক্ষুর সাথে আমাদের একদিন দেখা হল। তিনি বার্মা (মিয়ানমার) এ পালিয়ে যাচ্ছিলেন এবং আমাদেরকে উদ্বুদ্ধ করলেন তাঁকে অনুসরণ করার।

কিন্তু আমরা তখন ছিলাম কপর্দকশূণ্য। তাই আমরা তার সাথে যেতে পারলাম না।

তারপরেও তিনি আমাদেরকে পথ চিনিয়ে দিলেন এবং জানালেন কোথায় গেলে তাঁকে পাওয়া যেতে পারে।

তিনি আরো জানালেন যে তিনি আমাদের জন্য চট্টগ্রাম এবং বার্মার বিভিন্ন বৌদ্ধ বিহারে সাহায্যের বার্তা জানিয়ে যাবেন। 

এরপর আমরা কিছুদিন চেষ্টা করে কিছু অর্থ জোগাড় করলাম। রাঙামাটি ছেড়ে কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে আমাদের যাত্রা শুরু হল।

আমরা কক্সবাজারে পৌঁছে একটি কিয়াং (বৌদ্ধ বিহার) এ আশ্রয় নিলাম। পরেরদিন আমরা আবারও বের হই এবং বেশ কিছুদূর পাড়ি দিয়ে বার্মার সীমান্তে এসে পৌঁছাই।

পরিচিত ভিক্ষুর নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা নিকটবর্তী একটি বৌদ্ধ বিহারের প্রধান ভিক্ষুর সাথে কথা বলি।  

তিনি আমাদের বক্তব্য শোনেন এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর দুঃখ দুর্দশার জন্য আন্তরিকভাবে সমবেদনা প্রকাশ করেন।

তাঁর মতে দুর্ভাগ্যবশত পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীরা সংগঠিত নয়, যার কারণে তারা একতাবদ্ধ হয়ে হত্যাযজ্ঞ ও উচ্ছেদের প্রতিবাদে লিপ্ত হতে পারে না।

এরপরে প্রধান ভিক্ষু আমাদেরকে সীমান্ত পার হওয়ার জন্য সর্বাত্মক সহায়তার আশ্বাস  প্রদান করেন।

তার পরদিন বেলা প্রায় ১২টার দিকে আমরা একদল মারমার সাথে সীমান্ত পার হই। ইতিপূর্বে প্রধান ভিক্ষু আমাদেরকে মারমাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন এবং আমাদেরকে সাহায্য করতে তাদের অনুরোধ করেন।

নাফ নদ পার হলেই আমরা স্টিমার পেয়ে যাব, যা সেখান থেকে মঙডু (Maungdaw) (একটি বার্মিজ সীমান্তবর্তী শহর) এর উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। নদী পার হওয়ার আগে আমরা আমাদের সাথে থাকা টাকা বদলে নিই।

দুই ম্রো শিশু, Image Source: JCH Travel/ Flickr

স্টিমারটি আনুমানিক ২টার দিকে এসে পৌঁছায় এবং আমরা তাতে উঠে বসি।

সেখানে কিছু বার্মিজ পুলিশ সদস্য দেখে আমরা চিন্তিত হয়ে পড়ি; কিন্তু আমাদের মারমা সাথীরা আমাদের সাথে তৎক্ষণাৎ আরাকানী ভাষায় কথা বলতে থাকে।

যেহেতু আমরা সেই ভাষা জানতাম না, সে কারণে আমাদের কথাবার্তা ছিল একপাক্ষিক। কিন্তু এ পন্থায় আমাদেরকে পুলিশেরা কোনো সন্দেহ করে নি।

দুই থেকে তিন ঘন্টার মধ্যেই আমরা মঙডু (Maungdaw) পৌঁছালাম। আমাদের সাথে থাকা একজন আরাকানী যিনি আবার ইংরেজিও জানতেন তিনি আমার বন্ধুকে সাথে নেন এবং আমাকে একটা বিহারে রেখে আসেন।

বিহারটিতে আমাদের পরিচিত চাকমা ভিক্ষুটি সংবাদ রেখে গেছিলেন। তাঁর কথা মোতাবেক তিনি কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ফিরে আসবেন।

মঙডু (Maungdaw) এর পুরোটাই ছিল চট্টগ্রাম থেকে পালিয়ে আসা মারমা শরনার্থীতে সয়লাব। এদের বেশিরভাগই ছিল বান্দরবান মহকুমা (Sub-division) থেকে।

তখনকার সময়ে প্রায় ১৫০০০ শরনার্থী বার্মায় আশ্রয় নিয়েছিল বলে জানা যায়।
মঙডু (Maungdaw) এ তখন অবৈধ অভিবাসী বাঙালিদের সংখ্যাও ছিল চোখে পড়ার মতন। তারা প্রায়ই সীমান্ত পেরিয়ে চলে আসত একটু সচ্ছল জীবনযাপনের প্রত্যাশায়।

আমি শ্রামণদের কাছ থেকে বার্মিজ ভাষা শিখতে শুরু করি। তার বিনিময়ে আমি তাদের ইংরেজি শিখাতাম।

বিহারে ঘুরতে আসা অনেকের সাথেই আমি কথাবার্তা বলি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে থাকি।

মঙডু (Maungdaw) নামের ছোট্ট শহরটিতে ছিল অজস্র কাঠের তৈরি ঘরবাড়ি এবং ধূলিধূসর রাস্তাঘাট।

শহরের  অনেক বাসিন্দা ছিল ছোট ছোট দোকানের মালিক। কিন্তু এই ব্যবসার আড়ালে তাদের আরেকটা গোপন পেশা ছিল চোরাকারবার।

তারা চাল, পান, বাদাম ইত্যাদি বাইরে পাঠাত এবং প্রসাধণ, রকমারি সামগ্রী, বিভিন্ন বিলাসী দ্রব্য আর ওষুধপত্র বার্মায় নিয়ে আসত।

বার্মিজ সরকার বিদেশী জিনিসপত্র আমদানি করত না। এ কারণে ব্যবসা হিসেবে চোরাকারবার ছিল অনেক বেশি আর্থিকভাবে লাভজনক।

লামায় সূর্যাস্ত, Image Source: Asif Yousuf/ Flickr

আমরা নিজেরাই আকিয়াব (Akyab) এর উদ্দেশ্যে যাত্রা করে আমাদের পরিচিত চাকমা ভিক্ষুর কাছে যাব বলে ঠিক করেছিলাম। কিন্তু আমাদেরকে তা করতে নিষেধ করা হয়।

বিহারের প্রধান ভিক্ষু এবং আমাদের বন্ধুদের মাধ্যমে আমরা জানতে পারি যে বুথিডঙ (Buthidong) এ একটা তল্লাশী চৌকি অবস্থিত এবং এটি অতিক্রম করা খুবই দুষ্কর।

বার্মিজ সরকারের প্রদান করা পরিচয় পত্র ছাড়া সেখানে যাকেই পাওয়া যায় তাকেই আটক এবং গ্রেফতার করা হয়ে থাকে।

তবে উল্লেখ্য যে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে আগত বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের সাথে তাদের নিজেদের ধর্ম মিলে যাওয়ায় তারা কিছুটা হলেও সহানুভূতিশীল।  কিন্তু তাদের কাছ থেকে ছাড় পেতে হলে অবশ্যই আরাকানী বা বার্মিজ ভাষা জানা চাই।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা ভাষা দুটোর মধ্যে কোনোটিই জানতাম না। তার উপর স্থানীয় পুলিশ আমাদের মঙডু (Maungdaw) ত্যাগের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। তাদের অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও যাওয়াতেও ছিল বারণ।

অবশেষে চাকমা ভিক্ষু মঙডু (Maungdaw) ফিরে এলেন। তাঁকে পেয়ে আমরা যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।

পরদিন খুব ভোরেই আমরা মঙডু (Maungdaw) ছেড়ে যেতে উদ্যত হলাম। তখন ছিল শীতকাল আর সকালে ছিল হাড়কাঁপানো ঠান্ডা।

বুথিডঙ (Buthidong) এর আগের তল্লাশী চৌকিটি আমরা নির্ঝঞ্ঝাটে পার হয়ে যাই। আমাদের পরিকল্পনা ছিল সেখান থেকে আকিয়াব (Akyab) গামী স্টিমারে ওঠা।

স্টিমারটি বেলা ১১টার দিকে ছেড়ে যায়। সুতরাং আমাদের হাতে আরো পাঁচ ঘণ্টার মত সময় ছিল।

আমরা আমাদের পথপ্রদর্শকের পরিচিত একটি বিহারে বিশ্রাম নিতে যাই। সেখানে আমাদের খাবার সামগ্রী দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়।

আমি স্টিমারে উঠে অন্য সকল ভিক্ষু ও শ্রমণদের সাথে গিয়ে বসে পড়ি। বার্মায় ভিক্ষুদের খুবই সম্মান করা হয় বিধায় প্রায় প্রতিটা যানবাহনেই তাদের জন্য নির্দিষ্ট কিছু আসন থাকে।

এখানে একজন ভিক্ষুর সামনে যে কেউই দ্বিধাহীনভাবে মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে শ্রদ্ধা জানাতে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য বোধ করে না।

বসার পর পরই আমার সঙ্গী আমাকে ডাকতে থাকে সেখান থেকে চলে আসার জন্য।

কুকুর ছানার সাথে এক ম্রো শিশু, Image Source: JCH Travel/ Flickr

আমি তার ওখানে গিয়ে হাজির হই। কিছু বার্মিজ শুল্ক কর্মকর্তা তাকে ঘিরে ছিলেন।

বার্মিজ ভাষায় তাঁকে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। আমার সঙ্গীও বার্মিজ ভাষায় জবাব দিলেন এবং অনুরোধ করলেন আমাদেরকে যেন আকিয়াবে যেতে দেওয়া হয়।

পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে মারমা সম্প্রদায়ের লোকেরা খুব সহজেই আকিয়াব (Akyab) এবং রেঙ্গুনে (Rangoon) যেতে পারত এ কথার সত্যতা নিশ্চিত করা হয়।

আমরাও একই সুযোগ পেতে পারি কিন্তু তার আগে মঙডু (Maungdaw) থেকে আমাদের আরাকানি ভাষা শিখে নিতে হবে।

তারপরেই আমরা আকিয়াব (Akyab)যেতে পারব। এসব জেনে নিয়ে আমরা এক প্রকার হতাশ হয়েই মঙডু (Maungdaw) এ ফিরে আসি।

শুল্ক কর্মকর্তারা আমাদের সাথে একজন প্রহরীকে পাঠান। আমাদেরকে মঙডু (Maungdaw) পুলিশ স্টেশনে একটা প্রতিবেদন দাখিল করতে হয়।

আমাদেরকে তারা এর পরদিন দেখা করতে বলে। তারা এখন কি দেখতে পারে?

ইতিপূর্বে তারা আমাদের নির্দেশ দিয়েছিল এলাকা ত্যাগ না করার জন্য কিন্তু আমরা নির্দেশ পালন করি নি।

আমার সঙ্গী গ্রেফতারের আশঙ্কায় খুবই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। জেলে যাওয়া এড়ানোর জন্য তিনি খুব শীঘ্রই বার্মা ত্যাগ করতে চাচ্ছিলেন।

তিনি আমাকেও সাথে নিতে চান। তবে আমি তখনকার সময়ে একজন বৌদ্ধ শ্রমণ হওয়ার আমার এ  ভয় খুব একটা ছিল না।

বার্মায় যদি একজন শ্রমণকে পুলিশ আটক করে জেলে দেয় তখন সেখানকার জনগণের মধ্যে যে রোষানলের সৃষ্টি হবে তা বলার অপেক্ষা  রাখে না। 

কিন্তু আমরা দুজনই একসাথে এসেছি, সেজন্য যে কোনো পরিস্থিতিতে একসাথে থাকাটাই হবে যথাযথ সিদ্ধান্ত। তাই সে রাতেই আমরা একটা নৌকায় করে মঙডু (Maungdaw) ত্যাগ করি।

(চলবে…)


[1] মুক্তিযুদ্ধের সময়কালেই বৃহৎ পরিসরে পাহাড়ে বাঙালি অভিবাসন শুরু হয়ে যায়। এ সময়কালে আনুমানিক ৩০,০০০-৫০,০০০ বাঙালি রামগড় মহকুমাতে (Sub-division) প্রবেশ করে এবং মারমা ত্রিপুরা এবং চাকমা সম্প্রদায়ের জায়গাজমিগুলি দখল করে নেয়। একই প্রক্রিয়ায় অভিবাসন এর পরবর্তী সময়কালেও পরিলক্ষিত হয়।

[2] স্বাধীনতা যুদ্ধের একেবারে শেষ দিকে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী চেষ্টা করে উত্তরাঞ্চলের আদিবাসী গোষ্ঠিগুলো থেকে যোদ্ধা সংগ্রহ করে তাদেরকে বাঙালিদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিতে। কিন্তু খুব অল্পসংখ্যক লোক অনিয়মিত যোদ্ধা হিসেবে সেখানে যোগ দিয়েছিল। সাবেক চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে আমন্ত্রণ জানানোর বিষয়টিকে পরবর্তীতে আদিবাসীদের বাঙালি মুক্তিবাহিনীর বিরুদ্ধাচরণের একটা বড় প্রমাণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। যদিও এটা পরবর্তীকালে পাহাড়ি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর উপর গণহত্যা ও বৃহৎ পরিসরে ভূমি থেকে উচ্ছেদের অজুহাত হিসেবেই ব্যবহৃত হয়েছে (আরও দেখুন Montu 1980:1510)।  


৩য় পর্বের লিংক


মূল লেখাটি প্রকাশিত হয়েছেঃ Genocide in the Chittagong Hill Tracts, Bangladesh, Wolfgang Mey (ed.), IWGIA Document 51

লেখকঃ এ.বি. চাকমা (ছদ্মনাম)

লেখাটির অনুবাদকারীঃ সায়ক চাকমা, আইন বিভাগের শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here