ত্রিপুরা রূপকথা – খুম কামানি (পুষ্পচয়ন/ফুল গাছে আরোহন)

0
67

দাবিং পাড়ার এক যুবক অার যুবতীর মধ্যে ছোটবেলা থেকে বড়ই ভাব ছিল। তারা ছোট বেলায় বালি এবং নানা রকম গাছের কচি পাতা নিয়ে খেলা করত। তাদের দু’জনের মধ্যে এতই ভাব ছিল যে, একজনকে বাদ দিয়ে অন্যজন চলতে পারে না। ছোটবেলা থেকে এক সাথে বড় হওয়ার কারণে তাদের এরূপ ভাবকে তাদের মা-বাবারা অন্যকিছু মনে করত না। ছেলেমেয়েরা ছোটবেলা হতে মেলামেশা করত বলে এতবেশি গুরুত্ব দেয়নি। তারা এক গ্রামের ছেলেমেয়ে, এক সঙ্গে খেলাধুলা করতে করতে অাস্তে অাস্তে এক সময় যৌবনে পা দেয়। যৌবনে পা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের মধ্যে প্রেমের গভীর সম্পর্ক গড়ে উঠে এবং তা পরে সমাজের চোখে ধরা পড়ে। তারা পারিবারিক সম্পর্কে খুব নিকট অাত্নীয় ছিল। ছেলেমেয়ের মা-বাবারা তাদের এই সম্পর্ককে মেনে নিতে নারাজ। ফলে তাদেরকে উভয়পক্ষ বাঁধা দিতে থাকে। কোনো সময় মা-বাবার চোখে পড়লে গালিগালাজ তো অাছেই এমনকি দু’একবার মারও খেতে হয়েছে। মা-বাবারা যত বাঁধা দেয়ার চেষ্টা করে তাদের সম্পর্ক ততো গভীর হতে থাকে। কিন্তু কোনো রকমে তাদেরকে বাঁধা দিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। তাদের যতবেশি করে নজর দেয়ার চেষ্টা করা হয় ততই তারা গোপনে সাক্ষাত করে তাদের সম্পর্ককে অারও গভীর করার চেষ্টা করে।

Love Birds collectig flowers
যুবক আর যুবতীর ফুল সংগ্রহ, ছবি: ত্রিপুরা লোককাহিনী ও কিংবদন্তি

একদিন তারা দু’জনে সিদ্ধান্ত নেয় যে, যুবতী তার প্রেমিক যুবকের জন্য একদিনের মধ্যে চরকায় সুতো কেটে মাথার পাগড়ি বা সাদা গামছা তৈরি করে দেবে। যুবক একদিন জঙ্গল থেকে বাঁশ কেটে এনে মাছ ছাকার লুই তৈরি করবে। এভাবে দু’জন চুক্তিবদ্ধ হয়ে সাদা গামছা ও লুই তৈরি করে। একদিন তারা মাছ ধরার নামে ছলনা করে গ্রামের বাইরে চলে যায়। তারা অনেক ছড়া, নদীনালা, পাহাড়, পর্বত অতিক্রম করে বহুদূরে যাওয়ার পর এক অজানা ছড়ায় গিয়ে পৌঁছে। সেখানে তারা লুই দিয়ে কিছু মাছ ও ইছা (চিংড়ি) ধরে নিয়ে বাঁশের চোঙায় রান্না করে নেয় এবং চোঙাতে ভাতও রান্না করে। রান্না শেষ করার পর দু’জনেই সেই ছড়ায় পাথরের উপর বসে ভাত খেয়ে নেয়। ভাত খাওয়ার সময় উত্তর দিক হতে হঠাৎ মৃদু মন্দ বাতাস বইতে শুরু করে। বাতাসে এমন সুগন্ধ ভেসে অাছে যা বর্তমান যুগের সুগন্ধি তৈলের চেয়েও অারো বেশি সুগন্ধ। সেই সুগন্ধ পেয়ে যুবতীর মন ব্যাকুল হয়ে উঠে। ফুলের যে এত সুগন্ধ থাকে তা অনুভব করে সে ফুলকে দেখার জন্য যুবতীর মন পাগল হয়ে উঠে। তখন যুবকটি নানাভাবে বোঝানোর চেষ্টা করে যে, এ ফুল সাধারণ জঙ্গলে থাকে না। এটি কোনো গাছে স্বাভাবিক নিয়মে ফোটে না। দেবতার গাছে এ ফুল ফোটে। সে দেবতা গাছের ঢালের ফাঁকে ময়লা জমলে সেখানে সেই ফুলের গাছ জন্ম হয়ে এ ফুল ফোটে। সে ফুল নিতে হলে পূজা দিতে হয়। প্রথম পূজা দিয়ে দেবতাগণের নামে উৎসর্গ না করলে এর ঘ্রাণ নেওয়া যায় না। অার সেখান থেকে ফিরে অাসতে পারে না। তারা যতদিন পর্যন্ত সাদা মোরগ মুরগি ও সাদা পাঁঠা বলি দিয়ে সুকুন্দ্রাই ও বুকুন্দ্রাই দেবতাদ্বয়কে পূজা দেওয়া না হবে ততদিন সেই গাছ থেকে নেমে অাসা সম্ভব হয় না। এভাবে যুবক নানা কথা যুবতীকে বুঝিয়ে বলে। যুবতী কিন্তু জীবন দিয়ে হলেও সেই ফুল দেখতে ইচ্ছুক। তা না দেখলে সে বাড়িতে ফিরে যাবে না। যুবকটি বলে, অাজ অার সময় নেই। বেলা শেষ হয়ে অাসছে। সেই ফুলের সন্ধান নিতে গেলে রাত গভীর হবে। তখন অার ফিরে যাওয়া সম্ভব হবে না। তখন যুবতীটি বলে, কেন! যদি রাত বেশি গভীর হয় অামরা সেই গাছের উপর অাশ্রয় নিয়ে থাকবো। অাবার অামরা ফুলের জন্য অাসতে পারবো না। অামরা কি এ ধরনের সুযোগ অাবার পাবো? মা-বাবা অার কোনোদিন অামাদের মিশতে দেবে না। এখানে অাসতে দেবে না। এই সুযোগ অার দ্বিতীয়বার পাওয়ার অাশা নেই।

এভাবে অনেক কথা অালাপ করার পর সে অজানা ফুলের সন্ধানে যুবক-যুবতী দু’জনে গভীর বনের পথ ধরে হাঁটতে থাকে। অবশেষে বহু ছড়া, নালা, পাহাড়-পর্বত অতিক্রম করে এক ছড়ার ধারে তারা সেই গাছের সন্ধান পায় এবং গাছের উপর সেই ফুলগুলো দেখতে পায়। সাদা রঙে ঝুলন্ত ফুল। ফুলগুলোর সুগন্ধে চারদিকের পরিবেশ সুগন্ধে ভরে অাছে। ফুলগুলো পাওয়ার জন্য যুবতীয় মন অারো বেশি ব্যাকুল হয়ে উঠে। তখন যুবতীকে সন্তুষ্ট করার জন্য যুবক সেই ফুল নেওয়ার উদ্দেশ্যে গাছের উপর উঠে। সে যখন ফুলের সুগন্ধ পায় তখন অাত্নহারা হয়ে উঠে সুকুন্দ্রাই-বুকুন্দ্রাই দেবতার নামে উৎসর্গ করার কথা অার স্মরণ করতে পারে না। ফুলগুলো হাতে নিতে না পারলেও ফুলের সুগন্ধে সে অাত্নহারা হয় এবং বলে উঠে অাঃ কী সুগন্ধ! তখন যুবকের হাত-পা শক্ত রশি দিয়ে বেঁধে যায় এবং চোখ দুটো অন্ধ হয়। তখন অার শরীর নাড়াচড়া না করতে পেরে হাত-পা গাছের সঙ্গে অাটকে যায়। ফলে যুবক অার মাটিতে নেমে অাসতে পারছে না। এ কারণে সেই গভীর জঙ্গলে যুবতীকে একা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। যুবক তখন যুবতীকে ত্রিপুরা ভাষায় বলে, “থাংদি কুসুম নং নগ থাংদি তক্কুফুল পুন্দা কুফুল লাগইদি। যত মানুই জুগালই তগই সুকুন্দ্রাই-বুকুন্দ্রাই মাতাইনো দালি চার ফাইনি। অাইয়া খাই অাং অাখল মান্ গালাক।” এর বাংলা হচ্ছে, “যাও কুসুম তুমি বাড়িতে যাও। সাদা মোরগ মুরগি ও সাদা পাঁঠা নিয়ে এসো। সবকিছু জোগাড় করে এনে সুকুন্দ্রাই-বুকুন্দ্রাই দেবতাদ্বয়কে পূজা দাও। তা না হলে অামি নামতে পারবো না। যুবকের সেই কথা শুনে যুবতী ত্রিপুরা ভাষায় বলে, “কাইনুই ফাইমানী লামানো সাইচুং তাঁ খায়ই থানানি। বলংনি মাছা য়াগ সুংগই তৎখান রোয়া দিংগীতই তংগনো। থামিং তক্ মাতই তংগনো কাইনুই ফাইমানি লামানো সাইচুং তাঁ খায়ই থামানি।” এর বাংলা অর্থ হচ্ছে, “দু’জনের রাস্তা অামি একা কেমন করে যাবো। বনের বাঘ ওৎঁপেতে থাকবে। ঢেঁকির মত বড় বড় জোঁক থাকবে। মুরগির মত বড় বড় মশা উড়ে থাকবে, একা কিভাবে যাবো।

Conversion of Bear and Monkey
ভাল্লুক এবং বানররূপী যুবতী ও যুবক, ছবি: ত্রিপুরা লোককাহিনী ও কিংবদন্তি

এই বলে যুবতী সেই রাতের অন্ধকারে একা মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকে। অপরদিকে যুবকও ফুলগাছ থেকে নেমে অাসতে পারছে না। দু’জনে বড়ই অসহায় হয়ে সেখানে পড়ে রইলো। রাত যত গভীর হয় বনের চারদিক থেকে তত বাঘের গর্জন শোনা যাচ্ছে। হাতির চিৎকার শোনা যাচ্ছে। বড় বড় মশা ভন ভন করতেছে। ঢেঁকির মত বড় বড় জোঁক রক্ত খাওয়ার জন্য মানুষ অার পশুর দেহ খুঁজতেছে। তখন এই বিপদ হতে মুক্ত করার জন্য ঈশ্বরের নিকট দু’জনই অারাধনা করতে থাকে। তাদের সুকরুণ অাবেদনে ঈশ্বর সন্তুষ্ট হয়ে যুবতীকে ভাল্লুক রূপে পরিণত করে এবং যুবককে গাছ বানর বা লাখা বানর হিসেবে পরিণত করে দেয়। ত্রিপুরাদের মধ্যে অাজো কিংবদন্তি হিসেবে লোকমুখে সেই কাহিনী প্রচলিত রয়েছে। এই দু’টি প্রাণীর সেই প্রেম নাকি অাজো অক্ষুণ্ন রয়েছে। তারা প্রতি বৎসরের শেষে মিলিত হয়। একে অন্যের কাছে প্রেম নিবেদন করে।


মহেন্দ্র লাল ত্রিপুরা

ত্রিপুরা লোককাহিনী ও কিংবদন্তি (২০১২ ইং)