ত্রিপুরা ইতিহাসের আলোকে এদেশে আদিবাসী অস্তিত্বের প্রমাণ

3
885

“প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানের ওপর অধিক নির্ভরশীলতার কারণে প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে কিছু বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। অনেক ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না। তাই ঐতিহাসিকদের মধ্যে স্বাভাবিক কারণে রয়েছে মতানৈক্য। লিপিমালায় বিধৃত সামান্য তথ্যের নানান ধরনের বিশ্লেষণের ফলে গড়ে ওঠে নানান মতবাদ। তাছাড়া সমাজ বা অর্থনৈতিক জীবনের অনেক প্রশ্নেরই উত্তর দেয়া সম্ভব হয় না উৎসের অভাবে। নতুন উৎসের আবিষ্কার বদলে দেয় অনেক ধারণাকেই। তাই ইতিহাস পুণর্গঠনের প্রক্রিয়া চলছে অবিরত।”

উপরিউক্ত উক্তিটি ‘বাংলাদেশের ইতিহাস’ নামক গ্রন্থের ৪০ নং পৃষ্ঠা থেকে নেওয়া হয়েছে। গ্রন্থটি লিখেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারজন প্রথিতযশা বাঙালি অধ্যাপক, কোন আদিবাসী অধ্যাপক নয়। কাজে এদেশে আদিবাসীদের স্বীকৃতির পথে ‘উয়ারী-বটেশ্বর’ বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনা। এমনও হতে পারে সেই ‘উয়ারী-বটেশ্বর’-এর নিচেই অন্য আরেক সভ্যতা লুকিয়ে আছে। তাছাড়া যে দেশে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি করা যায়, সে দেশে আদিবাসীদের ইতিহাস যে বিকৃতি হবে না তা আকাশ-কুসুম কল্পনা মাত্র।

এদেশে চাকমাদের ইতিহাস বলতে শুধু কার্পাস মহলের কথা তুলে ধরা হয়, খাসিয়াদের ইতিহাস খাসিয়াপুঞ্জিতেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়, গারোদের ইতিহাস গারো পাহাড়েই শুরু, গারো পাহাড়েই শেষ করা হয়। আর ত্রিপুরাদের ইতিহাস! এক্ষেত্রে এদেশের ইতিহাসবিদগণ খুব সাবধানে এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করেন। পারতপক্ষে পার্শ্ববর্তী ত্রিপুরা রাজ্যের দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে দেন, তবুও এদেশের ত্রিপুরাদের কথা বলেন না। বিষয়টা আদিবসীবান্ধব নেতৃবৃন্দদের কাছেও অজানা। আর যে কজন জানেন তারাও মনে করেন- ত্রিপুরাদের ইতিহাস ত্রিপুরারাই বলবে, আমাদের বলার কী দরকার? কিন্তু ধ্রুবসত্য হচ্ছে, ত্রিপুরাদের ইতিহাসের সাথে যেমন বাঙালিদের ইতিহাস ওতপ্রোতভাবে জড়িত, ঠিক তেমনি জড়িত এদেশের আদিবাসীদের ইতিহাসও।

আমার লেখার উদ্দেশ্য এদেশে আদিবাসীদের অস্তিত্ব প্রমাণ করা, ত্রিপুরার ইতিহাস আলোচনা করা নয়। তাই ত্রিপুরা ইতিহাসের কেবল মৌলিক উপাদানসমূহকে এখানে প্রামাণ্য দলিল হিসেবে ব্যবহার করেছি। এসব উপাদানগুলো বিভিন্ন মনীষী, গবেষক, ইতিহাসবিদ, ভাষাচার্য, সাহিত্যিক ও অন্যান্য লেখকগণ কর্তৃক স্বীকৃত। কাজেই এখানে ত্রিপুরা ইতিহাসের মৌলিকত্ব নষ্ট হয়নি, বরং ত্রিপুরাসহ অন্যান্য আদিবাসীদের অস্তিত্বের বিষয়টি আরও জোরালোভাবে উন্মোচিত হয়েছে।

যেহেতু আমি ইতিহাসবেত্তা নই, তাই ঐতিহাসিক উপাদানগুলোকে এখানে অনুচ্ছেদ আকারে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। কারণ নিজের মতো করে লিখলে পাঠকবৃন্দের কাছে বিষয়টি অতিরঞ্জিত বলে মনে হতে পারে। উপাদানগুলোর উৎস সূচক নির্দেশ করার জন্য প্রতিটি অনুচ্ছেদের শেষে নির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ করেছি :

১) প্রাচীন বাংলার প্রাচীনতম ইতিহাস অস্পষ্ট পুরাণ কথায় সমাচ্ছন্ন। (উৎস-১)

২) পুরাণে প্রাচ্যদেশের তালিকায় বঙ্গের উল্লেখ রয়েছে। …… গঙ্গার দুই প্রধান স্রোত অর্থাৎ ভাগিরথী ও পদ্মার স্রোত-অন্তর্বর্তী এলাকা যে ত্রিভুজাকৃতি ব-দ্বীপ সৃষ্টি করেছে তাই ‘বঙ্গ’দের অঞ্চল। (উৎস-২)

৩) বর্তমানে যমুনাও যদি ব্রহ্মপুত্রের প্রাচীনতর কোনও প্রবাহপথ হইয়া থাকে তা হইলেও ফরিদপুর-বাখরগঞ্জ প্রাচীন বঙ্গ বহির্ভূত হয়ে পড়ে। (উৎস-১)

৪) বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন- “ভারতীয় কাব্য, পুরাণ, রামায়ণ, মহাভারত ইত্যাদি গ্রন্থ পাঠ করে প্রাচীনকালের ভারতীয় রাজাদের সম্বন্ধে যে উচ্চ ধারণা আমাদের মনের মধ্যে জাগে সেইসব রাজ্যোচিত গুণাবলী ত্রিপুরা রাজন্যবর্গের মধ্যে দেখেছিলাম।” (উৎস-৩)

৫) মহাভারত যুগের প্রথম অধ্যায়ে ত্রিপুরা রাজ্যকে ত্রিবেগ রাজ্য, প্রতিষ্ঠান নগর ও কিরাত রাজ্য নামে অভিহিত করা হয়। মহাভারতের দ্বিতীয় অধ্যায়ে বিশেষ করে মহারাজা ত্রিপুরের রাজত্বকালে ত্রিপুরা রাজ্য সমধিক পরিচিতি লাভ করেছিল ‘ত্রিপুরা’ নামে। আরাকান রাজ্যের প্রাচীন ইতিহাস ‘রাজোয়াং’ গ্রন্থে ত্রিপুরা রাজ্যকে ‘খুরতন’ ও ‘পাটিকার’ নামে অভিহিত করা হয়েছে। ভারতের প্রাচীন ইতিহাস লেখকগণ ত্রিপুরা রাজ্যকে ‘জাজনগর’ বা ‘জাজিনগর’ নামে অভিহিত করতে প্রয়াস পেয়েছিলেন। ইংরেজগণ ত্রিপুরা রাজ্যকে Tipperah নামে অভিহিত করার প্রয়াস পেয়েছিলেন। পর্তুগীজগণ তাদের ইতিহাসে ত্রিপুরা রাজ্যকে তাদের ভাষায় নাম দিয়েছিলেন ‘Tipora’। ত্রিপুরা জাতি নিজেদের রাজ্যকে স্বীয় মাতৃভাষায় (ককবরক) ‘তিপারা’ রাজ্য বা ‘তৈপ্রা’ নামে অভিহিত করে থাকে। (উৎস-৩)

৬) তৎকালীন সমাজে কোন যৌথ মনোভাব ছিল না, ছিল না কোন সুদৃঢ় সামাজিক কাঠামো। …… তাই মঙ্গোল, দ্রাবিড়, নিগ্রো, অষ্ট্রিক ইত্যাদি মানবগোষ্ঠীগুলো নিজেদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেই চলত। …… মহাভারতের যুগেই ভারতবর্ষে প্রথম সামাজিক ঐক্যের ভাবনা জগতে শুরু করে। দৃষ্টান্তস্বরূপ, পাণ্ডবরা ছিলেন অষ্ট্রিকো-আর্য অথবা আর্য-অষ্ট্রিক। আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংহতি তখন থেকেই শুরু হয়েছিল। যেমন- ভীমের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল মঙ্গোলকন্যা হিড়িম্বার -পূর্ব ভারতের মেয়ে। কৃষ্ণের সঙ্গে বিয়ে হয়েছে রুক্মিণীর – নেফার মেয়ে। অর্জুনের অন্যতমা পত্নী চিত্রাঙ্গদা ছিলেন মঙ্গোলীয়। ( উৎস-৪)

৭) THE CONSTITUTION OF INDEPENDENT TRIPURA 1351 T.E. (1941 A.D.)-এর Preface-এ উল্লেখ আছে, “The historians know that the Mongoloid people known as Kirata settled in the eastern part of India long before 1200 B.C. They were warrior race by nature. For this reason, they could protect their land from foreign Turkeys and Muslims from North India successful. …… In later period, though Srihatta (Syhlet) was won by the Mohammedans, but Tripura was alone independent with valor and superior tactics of the wars, they have ousted the foreigners.” (উৎস-৩)

৮) মহাভারতের যুগে প্রচলিত সাতটি প্রাকৃত ভাষার মধ্যে একটি ছিল পৈশাচী প্রাকৃত যা উত্তর পশ্চিম ভারতে প্রচলিত ছিল। মূলত এটিই ছিল মঙ্গোলদের ভাষা। (উৎস-৪)

৯) ‘রাজমালা’ অনুসারে ত্রিপুরা মহারাজা যথাতির (৬ষ্ঠ) রাজত্বকালে রাজ্যের নাম ছিল প্রতিষ্ঠান নগর। তিনি তাঁর চারপুত্রের মধ্যে তিন পুত্রকে প্রতিষ্ঠান নগরের বিভিন্ন প্রান্তে নির্বাসিত করেছিলেন। তৃতীয় পুত্র দ্রুহ্য (৭ম মহারাজা) নির্বাসিত হন প্রতিষ্ঠান নগরের উত্তর পূর্ব প্রান্তের সমুদ্র ও গঙ্গা নদীর সঙ্গমস্থল সগরদ্বীপে। তিনি অত্যন্ত শক্তিশালী ছিলেন। তাই সগরদ্বীপ থেকে কপিলাবস্তু (নেপাল) পর্যন্ত রাজ্য বিস্তার করে ত্রিবেগ রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। (উৎস-৩, ৫)

১০) প্রাচীন ‘রাজমালা’ গ্রন্থাদিতে উল্লেখ আছে- মহারাজা ত্রিপুর (৪৫ তম) কিরাত নামের বিলোপ সাধন করে নিজের নামানুসারে রাজ্যের নাম রাখেন ‘ত্রিপুরা’ এবং স্বজাতীয় লোকদের ‘ত্রিপুরা জাতি’ বলে প্রচার করেন। (উৎস-৩)

১১) মহারাজা ত্রিলোচন (৪৭ তম) দ্বাদশ বছর বয়সে ত্রিপুরা সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন। বিবাহ করেছিলেন হেড়ম্ব (কাছার) রাজকন্যাকে। (উৎস-৩)

১২) মহাভারত গ্রন্থসূত্রে জানা যায়, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে ত্রিপুরা মহারাজা ত্রিলোচন পাণ্ডবপক্ষ অবলম্বন করে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে ত্রিপুরা মহারাজা ত্রিলোচনের বীরত্ব দেখে মহারাজ যুধিষ্টির অতিশয় প্রীত হয়ে বন্ধুত্বের নিদর্শন স্বরূপ, বহু মণিযুক্ত ও রত্নখচিত একটি সিংহাসন উপহার দিয়েছিলেন। এই সিংহাসন বর্তমানে ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলাস্থ ‘উজ্জয়ন্ত’ রাজপ্রাসাদে রক্ষিত থেকে ত্রিপুরা জাতির অতীত ক্ষাত্রজ শক্তির মহিমা বহন করে চলেছে। (উৎস-৩)

১৩) কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ শেষে ত্রিপুরা মহারাজা ত্রিলোচন স্বদেশে ফিরে আসেন। অতঃপর তিনি রাজ্য বিস্তারে সচেষ্ট হন। তাঁর রাজত্বকালে ১০ জন রাজাকে পরাজিত করে ত্রিপুরা রাজ্যকে অধিকতর সম্প্রসারণ করেছিলেন। মহারাজা ত্রিলোচন ১২০ বছর প্রবল বিক্রমে রাজ্য শাসন করেছিলেন। (উৎস-৩)

১৪) The ancient Twipra was very vast. According to the chronicle books of the Babugrakhumtang (Rajmala) second phase: Twipra kingdom seemed to have extended its westward boundary up to Magadha and Mithila (Now Bihar and some parts of Uttar Pradesh) to the North-East-South Nepal, Bhutan, Prag Jyotish, Naga Hills, Manipur and Burma. (উৎস-৭)

১৫) মহারাজা ত্রিলোচনের বার জন পুত্র ছিল যা ইতিহাসে “বার ঘর ত্রিপুরা” নামে প্রসিদ্ধ। জেষ্ঠ্য পুত্র দিকপতি বাল্যকাল থেকে মাতামহ কাছার অধিপতির রাজপ্রাসাদে লালিত পালিত হয়েছিলেন। কাছার অধিপতি অপুত্রক ছিলেন। কাজেই মাতামহের মৃত্যুর পর দিকপতি কাছার রাজ্যের রাজা হন। অপরদিকে মহারাজা ত্রিলোচনের মৃত্যুর পর পরই দ্বিতীয় পুত্র দাক্ষিণ ত্রিপুরা রাজ্যের মহারাজা (৪৮তম) হিসেবে সিংহাসনে অভিষিক্ত হন। এতে দিকপতি অতিশয় ক্রুদ্ধ হন এবং যুদ্ধ ঘোষণা করেন। মহারাজা দাক্ষিণ জেষ্ঠ্যভ্রাতা দিকপতির কাছে পরাজিত হন। দিকপতি যুদ্ধে জয়ী হয়ে ত্রিপুরা রাজধানী- ত্রিবেগ নগর অধিকার করেন। মহারাজা দাক্ষিণ পৈতৃক রাজধানী ত্রিবেগনগর পরিত্যাগ করে স্বীয় অনুসারীদের নিয়ে খলংমায় (বরাক নদী অববাহিকার বিস্তৃর্ণ ভূ-ভাগ খলংমা নামে পরিচিত) রাজ্যপাট আপন করেন। ভারতীয় ঐতিহসিকগণের অভিমত, ত্রিপুরা মহারাজা দাক্ষিণ খলংমায় রাজ্য স্থাপনের মধ্য দিয়ে ত্রিপুরাগণের দক্ষিণদিকের রাজ্য বিস্তার করার পথ সুগম হয়েছিল। (উৎস-৩)

১৬) মহারাজা ত্রিপলীর (৭৯তম) রাজত্বকালে খ্রীস্টপূর্ব ২৮৯ অব্দে সমুদ্র গুপ্তের অভ্যুদয় হিন্দুগণকে চট্টগ্রামে ঠেলে এনেছিল। সমুদ্রগুপ্ত সমতট (বঙ্গ), কামরূপ (আসাম) ও নেপাল জয় করেছিলেন। …… সমুদ্রগুপ্ত চট্টগ্রাম আক্রমণ করেছিলেন। মাহবুব উল আলমের ‘চট্টগ্রামের ইতিহাস’ গ্রন্থে ২৭ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, “চট্টগ্রামের উপর শাসন কর্তৃক নিয়ে ত্রিপুরা মহারাজের সাথে সমুদ্রগুপ্তের এটাই ছিল প্রথম যুদ্ধ। আলেকজান্ডারীয় যুগে খ্রীস্টপূর্ব ৩২৭ অব্দে প্রাগজ্যোতিষপুরের রাজার সাথে ত্রিপুরা রাজন্যবর্গেরও যুদ্ধ সংঘটিত হয়। সমুদ্রগুপ্ত ত্রিপুরা রাজ্যকে বশীভূত করে কর দিতে বাধ্য করেছিলেন। কিন্তু এই সকল সাম্রাজ্যিক যুদ্ধ বিগ্রহ সত্ত্বেও ত্রিপুরা রাজ্যের স্বাধীনতা অক্ষুন্ন ছিল এবং চট্টগ্রাম ত্রিপুরা রাজ্যের অধিকারে ছিল এইরূপ আমরা ধরে নিতে পারি। (উৎস -৩)

১৭) ত্রিপুরা জাতি বংশগতভাবে মংগোলীয় জনগোষ্ঠীভুক্ত এবং ভাষাগতভাবে তিব্বতীবর্মন শ্রেণীভুক্ত। (উৎস- ৯)

১৮) টিবেটো-বর্মণ, সিনো-টিবেটান ভাষা শ্রেণীভুক্ত একটি ভাষা। চীনের উত্তর-পশ্চিমে ইয়াংসি এবং হোয়াংহো নদীর উৎসস্থলের মধ্যবর্তী অঞ্চলে এই ভাষার জন্ম বলে পণ্ডিতগণ মনে করেন। পরবর্তীকালে এই ভাষার জনগোষ্ঠী চীনের দক্ষিণাঞ্চলে ভারত-বার্মা-ইন্দোচীনের দিকে অগ্রসর হতে শুরু করে এবং পরে ইরাবতী, চিন্ডুইন, ব্রহ্মপুত্র, সালাউইন, মেকং, মেনাম নদীর অববাহিকার পথ ধরে ভারত-বার্মা-ইন্দোচীন ও দক্ষিণ এশিয়ার সর্বত্র বিস্তৃতি লাভ করে। (উৎস-১০)

১৯) নৃ-তাত্ত্বিক বিচারে ত্রিপুরা জাতি মঙ্গোলীয় বংশোদ্ভূত। ইতিহাসবেত্তাদের অভিমত এই জনজাতির পূর্বপুরুষগণ প্রায় ৫ হাজার বছর আগে মূল মঙ্গোলীয় থেকে মধ্য এশিয়ার তিব্বত ও সাইবেরিয়ার পথ পরিক্রমায় ভারতবর্ষের পূর্বাঞ্চলসমূহে আগমন করেছিল। এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীর একটি অংশ Bodo বা Boro নামে পরিচিত ছিল। ভারতবর্ষে আর্যগণের পূর্বে এই বোডো বা বরো জনজাতি সুদৃঢ়ভাবে আধিপত্য কায়েম করেছিল। ঐতিহাসিক কাব্যগ্রন্থ রামায়ণ ও মহাভারত সূত্রে জানা যায়, ভারতবর্ষের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যসমূহ Bodo বা Boro জনজাতির নৃপতি কর্তৃক শাসিত হতো। আর্যগণ তাদেরকে কিরাত, দানব ও অসুর নামে আখ্যায়িত করতো। এই Bodo বা Boro জনজাতির একটি শক্তিশালী দল ক্রমে ক্রমে গঙ্গানদী, শীতলক্ষ্যা, ব্রহ্মপুত্র, ধলেশ্বরী নদীর অববাহিকার বিস্তীর্ণ ভূ-খণ্ডে স্থায়ীভাবে গোড়াপত্তন করেছিল। শক্তিশালী এই জনজাতিই পরবর্তীকালে এই উপমহাদেশের ত্রিপুরা জাতি এবং নামে একটি রাজ্যের নামাঙ্কিত করতে সক্ষম হয়। ত্রিপুরা জাতি সম্পূর্ণ অনার্য এবং উপমহাদেশের অন্যতম মাটি ও মানুষের আদি সন্তান বলে দাবীদার। অতিশয় সংস্কৃতি সমৃদ্ধ এই জনজাতি মাঝারি গড়ন, উজ্জ্বল গায়ের রং, নাক অনেকটা বোঁচা, চোখ ছোট ও তীক্ষ্ণ এবং খাড়া চুলের অধিকারী। স্বভাবে স্বাধীনতা, কূটনীতিপরায়ণ, শান্তিপ্রিয় ও অতিশয় অতিথি বৎসল। মদ্য ও মাংস প্রিয়। যুদ্ধ ও শিকার কার্যে খুবই পটু। (উৎস-৩)

২০) গোপাল হালদার মহোদয় তাঁর ‘বাংলা সাহিত্যের রূপরেখা’ গ্রন্থে লিখেছেন- “অস্ট্রো এশিয়াটিক ও দ্রাবিড় ভাষীরা ছাড়াও পূর্ব ও উত্তর বাঙালার বহু পূর্বকাল থেকে নানা সময়ে এসেছিলেন মঙ্গোলীয় বা ভোটচীনীয় গোষ্ঠীর নানা জাতি-উপজাতি যেমন গারো, বরো, কোচ, মেছ, কাছারি, টিপরা, চাকমা ইত্যাদি। বাঙালি বলে গোটা জাতটাই তখনও পর্যন্ত জন্মায়নি।” (উৎস-১১)

২১) ভাষাচার্য ড. সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, “…… সম্ভবতঃ খৃষ্ট জন্মের কাছাকাছি সময়ে বাঙালার জলপাইগুড়ি, কোচবিহার রাজ্য, রঙ্গপুর, আসামের গারো পাহাড়, বাঙ্গালার ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, ত্রিপুরা রাজ্য ও আসামের শ্রীহট্ট ও কাছার জুড়িয়া বোড়ো জাতির অধ্যুষিত দেশ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। মাঝখানে একটুখানি জায়গায় অষ্ট্রিকভাষী খাসিয়া আর আংটির মতো তাহার চারদিকে ঘিরিয়া ভোটচীন বোডোদের দেশ।” (উৎস-১১)

২২) ঐতিহসিক মাহবুব আলম তাঁর ‘চট্টগ্রামের ইতিহাস’ গ্রন্থে লিখেছেন, “বাংলার অধিকাংশ স্থান সমুদ্রগর্ভে ছিল। যেটুকু ডাঙ্গা ছিল কিরাতভূমিত অনার্য Tibeto-Burman-দের দেশ।” (উৎস -১১)

২৩) খৃষ্টপূর্ব তৃতীয় অব্দ থেকে খৃষ্টীয় তৃতীয় শতাব্দী পর্যন্ত, বাংলার ইতিহাস প্রায় অন্ধকারাচ্ছন্ন। (উৎস-২)

২৪) ষষ্ঠ শতকের গোড়ায় গুণাইঘর লিপির (৫০৭-০৮) সাক্ষ্যে দেখিয়েছিলাম বৌদ্ধ ত্রিপুরা অঞ্চলে রাষ্ট্র ও রাজবংশের পোষকতা লাভ করেছিল। …… এই পোষকতা ঢাকা-ত্রিপুরা (কুমিল্লা) অঞ্চলেই যেন সীমাবদ্ধ। (উৎস-১)

২৫) তাম্র শাসনাদিতে উল্লিখিত দেব বংশীয় রাজাদের রাজধানী শহর দেবপর্বত এর অবস্থান যে লালমাই এলাকাতেই সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই, তবে এখনও সঠিক করে নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি এর অবস্থান। দেবরাজাদের সময়কাল সম্বন্ধে জানার কোনও সঠিক প্রমাণ নেই। (উৎস-২)

২৬) পাটিকারা, হরিকেলা প্রভৃতি রাজ্য ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বলে ঐতিহাসিকের মনে করে থাকেন। অথচ এই জনগোষ্ঠীর নাম তখন কি ছিল তা কেউ সঠিকভাবে বলতে পারেননি। (উৎস-১০)

২৭) মাহাবুব উল আলম তাঁর ‘চট্টগ্রামের ইতিহাস’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন- “আরাকান কখন ত্রিপুরা শাসন থেকে স্বাধীন হয়েছিল সঠিকভাবে বলা সম্ভব নহে। তবে বার্মার ক্রোনিকলস অনুসারে দশম শতাব্দীতে শানগণ আরাকান জয় করলে আরাকানদের চন্দ্রবংশীয় শাসকগণ পাট্টিকারায় চলে আসেন। ময়নামতির রাজা ভবদেবের পূর্বপুরুষ দাখোদার দেবকে ত্রিপুরা রাজা এবং হরিকেলা ও পট্টিকারা তাহাদেরই রাজ্য ছিল এবং ইহা যে সুপরিচিত ত্রিপুরা রাজ্যের তাহাতে সন্দেহ নাই। কমলাংক (কুমিল্লা), চট্টল (চট্টলা), বর্মণক (পরবর্তীকালে বমাং বা আরাকান) এর অন্তর্ভুক্ত ছিল। তিপারা জাতি ইহার পত্তন করেন।” (উৎস-৫)

২৮) ত্রিপুরাগণ যে বহুদিন আরাকানের ছিলেন তা আরাকানের বিভিন্ন লোককাহিনী এবং কিংবদন্তী থেকে জানা যায়। রাখাইন বা মারমাগণ আরাকানে এসে ত্রিপুরাদের দেখতে পেয়ে ম্রোহং বা ম্রোং নামে অভিহিত করেন। অথচ ম্রো বা মুরং একটি সম্পূর্ণ আলাদা জাতিগোষ্ঠী। (উৎস-৫)

২৯) বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে (চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, সিলেট) এবং ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের বেলোনিয়া অঞ্চলে বেশ কিছু সংখ্যক রৌপ্য মুদ্রা পাওয়া গেছে। যার একদিকে অর্ধশায়িত অবস্থায় ষাঁড়ের প্রতিকৃতি ও অপরদিকে ত্রিশুল, আকৃতির চিহ্ন রয়েছে। (উৎস-২)

৩০) প্রাচীন পট্টিকেরা, ব্রহ্মদেশীয় ইতিকথার পটিক্কর-পটেইক্কর, আদি ব্রিটিশ যুগের পট্টিকেরা-পাইটকেরা পরগণা এবং বর্তমান পাইটকারা-পটিকেরা এক এবং অভিন্ন। (উৎস- ১)

৩১) কেউ কেউ মনে করেন- ‘ত্রিপুরা’ রাজ্য পাত্তিকারা নামেও অভিহিত হতো। বর্মি ‘রাজা ওয়েং’ পুস্তকে বলা হয়েছে, সেখানকার পেগান রাজ্যের রাজকুমার আলংকিছু এই পাত্তিকারা রাজ্যের রাজকন্যাকে বিয়ে করেছিলেন দ্বাদশ শতকের দিকে। এই সময় নির্দেশ কতখানি ঠিক তা বলা দুস্কর। (উৎস-১২)

৩২) ত্রিপুরা নামের একটি কথ্যরূপ ‘তিপারা’- এই শব্দের অন্তর্গত ‘প’ বর্ণের উচ্চারণ কোন কোন আঞ্চলিক বা জনগোষ্ঠী অভ্যাসহেতু ‘ক’ বর্ণের রূপ ধারণ করতে পারে। …… এতে ‘তিপারা’ শব্দ ‘তিকারা’ হতে বাধা নেই এবং বস্তুত পক্ষে নোয়াখালী অঞ্চলের বহু ব্যক্তিকে এখনো ‘তিপারা’ জনকে তিকরা বা তিকারাই নামে অভিহিত করতে দেখা যায়। এই সূত্রে পাত+তিকারা=পাততিকারা বা পাত্তিকারা নামের উদ্ভব হতে পারে বৈকি। …… ‘পাত্তিকারা’ রাজ্য যে এদেশের কুমিল্লা-চট্টগ্রাম অঞ্চলের নিকটবর্তী স্থানেই কোথাও অবস্থিত ছিল এ সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে দ্বিমত দেখা যায় না। (উৎস-১২)

৩৩) চীন পরিব্রাজক ‘সেংচি’ রাজভট্ট নামে সমটতের এক বৌদ্ধ রাজার নাম উল্লেখ করিয়াছেন এবং ইৎসিঙও দেববর্মা নামে পূর্বদেশের এক রাজার খবর দিতেছেন। দেববর্মা ও দেবখড়গ এক ব্যক্তি হইলেও হইতে পারেন, নাও হতে পারেন, …… খড়গ এই উপান্ত নাম দেশজ বলে মনে হয় না। খড়গ বংশের রাজারা কোনো পার্বত্য কোমের প্রতিনিধি হইলেও হতে পারেন। খড়গ বংশ বোধ হয় স্বাধীন রাজবংশ ছিলনা। রাজভট্টের আস্রফপুর-লিপিতে একখণ্ড ভূমির উল্লেখ আছে: এই ভূমিখণ্ড ইতিপূর্বেই জনৈক ‘বৃহৎ পরমেশ্বর’ কর্তৃক দান করা হইয়াছিল। এই বৃহৎ পরমেশ্বর কে ছিলেন বলা কঠিন। (উৎস-১)

৩৪) ত্রিপুরা মহারাজা বীররাজ যুঝারুফা (হামতর কা) ৫৮৫ খ্রীষ্টাব্দে ত্রিপুরা রাজ্য সম্প্রসারণ করতে প্রয়াসী হন। অতঃপর ৫৯০ খ্রীষ্টাব্দে ‘বঙ্গদেশ’ জয় করেন। বঙ্গবিজয়কে চিরস্মরণীয় করে রাখার জন্য মহারাজা হামতরফা ‘ত্রিপুরাব্দ’ নামে একটি বর্ষপঞ্জিকা প্রবর্তন করেন। (উৎস-৩)

৩৫) ত্রিপুরাব্দ বাংলা সন থেকে তিন বছর প্রাচীন। যে সময়ে ত্রিপুরাব্দ ঘোষণা করা হয়েছিল ত্রিপুরা রাজদরবার থেকে, তখন গৌড়বঙ্গের সমস্ত রাজারা বিব্রত অবস্থায় নিপতিত হন। কেননা ত্রিপুরাব্দ অনুসরণ করা মানে ত্রিপুরা মহারাজর বশ্যতা স্বীকার করার সামিল। এ উদ্দেশ্যে গৌড়বঙ্গের রাজারা বঙ্গাব্দ নামে পঞ্জিকা প্রকাশ করার প্রয়ান পান। প্রথমদিকে (হাজার বছর ধরে) বাংলা সনে মান, দিন, তিথি গণনার কোন রেওয়াজই ছিল না। ১৫৫০ খ্রীষ্টাব্দ পূর্ববর্তী সাহিত্য, দলিল কিংবা তাম্রশাসনাদিতেও কোনো বঙ্গাব্দ উল্লেখ পাওয়া যায়নি। মোঘল সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে বাংলা পঞ্জিকায় বৈদিক মাস, দিন, তিথি সন্নিবেশিত করে পুনর্বিন্যাস করা হয়। (উৎস-৩)

৩৬) আজো আমরা বাংলাদেশের বৃহত্তর সিলেট, কুমিল্লা, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামে অঞ্চলগুলোর পুরনো নথিপত্রে এবং দলিল দস্তাবেজে ত্রিপুরা সন লিপিবদ্ধ দেখি। (উৎস-৩)

৩৭) রাজা হরিরায়ের (১২২তম) ১৮ জন পুত্র ছিল। …… তিনি জৈষ্ঠ্যকে রাজানগর (বর্তমানে কুচবিহার), দ্বিতীয়কে কাচরঙ্গে, তৃতীয়কে আচরঙ্গ, বা আগরতলা এভাবে পুত্রদের রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠালেন। ১৮তম কুমার শাসনকর্তা হলেন- ধর্মনগর, বিশালনগড়, মধুগ্রাম, তারফ, খুঁটি মুড়া, নাকবাড়ি, লাউগঙ্গা, মুহুরী নদীর পার্শ্ববর্তী অঞ্চল, তেলারঙ, থানচি, ধোন পাথর, বরাক ইত্যাদি অঞ্চলের। (উৎস-৫)

৩৮) তিপুরা/ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী এই উপমহাদেশের বৃহত্তর বোদো/বোরো/ বোরাক/বুরোক জনশক্তির একটি অংশবিশেষ এবং উচ্চব্রক্ষে বুয়োক (বুরোক) নামে এই জনশক্তির কথা ৩৫০-১০০০ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে বিভিন্ন চৈনিক বর্ণনায় উল্লেখিত। (উৎস-১২)

৩৯) নবম থেকে একাদশ শতাব্দীর মধ্যে লিখিত আরব নাবিক ও ভৌগলিকদের বিবরণে বাংলা সম্পর্কে বেশ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। …… আল ইদ্রিসি, সোলায়মান, মাসুদি, ইবন খুর্দাদবে প্রমুখের বিবরণে চট্টগ্রাম এলাকায় আরবদের প্রভাবের পরিচয় পাওযা যায়। বাংলার দক্ষিণ-পূর্বাংশের বাণিজ্যিক সমৃদ্ধির চিত্র আরবদের বিবরণের ওপরই নির্ভরশীল। (উৎস-২)

৪০) দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় বেশ স্থানীয় রাজাদের রৌপ্য মুদ্রাও পাওয়া গেছে। তবে বাংলার পাল বা সেন বংশের কোন মুদ্রা আজ পর্যন্ত আবিস্কৃত হয়নি। (উৎস-২)

৪১) একাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে কামরূপ রাজ রত্নপালও বাংলা আক্রমণ করেছিলেন বলে মনে হয়। (উৎস-২)

৪২) তিব্বতীয়েরা কোন কোন গ্রন্থে ‘কম্বোজ’ নামে অভিহিত হয়েছে এবং লুসাই পর্বতের নিকটবর্তী বঙ্গ ও ব্রহ্মদেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে কম্বোজ জাতির উল্লেখ পাওয়া যায়। তিনজন রাজার নাম ছাড়া বিশেষ কিছু আমরা কম্বোজ শাসন সম্বন্ধে জানতে পারি না। (উৎস-২)

৪৩) খুব সম্ভবত কুমিল্লার লালমাই অঞ্চলেই চন্দ্রবংশীয় রাজারা প্রথমিক পর্যায়ে ভূ-স্বামী ছিলেন। ক্রমে ক্রমে তাঁদের অবস্থার উন্নতি হয় এবং ত্রৈলোক্যচন্দ্র এতো ক্ষমতশালী হয়ে ওঠেন যে, হরিকেল রাজার শক্তির প্রধান অবলম্বণ হিসেবে পরিগণিত হন। …… পরবর্তী কোনো এক সময়ে ত্রৈলোক্যচন্দ্র চন্দ্রদ্বীপের (বরিশাল ও পার্শ্ববর্তী এলাকা) নৃপতি হন। তাদের রাজত্বকাল ( ৯০০-১০৪৫)। (উৎস-২)

৪৪) একাদশ শতাব্দীর শেষভাগে পাল শক্তির দুর্বলতার সুযোগে দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় বর্ম-উপাধিধারী এক রাজবংশের প্রতিষ্ঠা হয়। তাম্রশাসন ও ভবদেবের লিপির ওপর নির্ভর করে বর্ম রাজবংশের বিস্তারিত ইতিহাস পুনর্গঠন সম্ভব নয়। (উৎস-২)

৪৫) ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে বাংলাদেশে মুসলিম বিজয়ীদের আগমনের পর থেকে বাংলায় তুর্কি, পাঠান, মুগল শাসকগণ এই টিবেটো-বর্মণ জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত অঞ্চলগুলিতে বারবার আক্রমণ করতে শুরু করে এবং এভাবে ধীরে ধীরে উত্তরে গোয়ালপাড়া, দক্ষিণে ময়মনসিংহ, সিলেট, করিমগঞ্জ প্রভৃতি অঞ্চলে বোরো ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী খণ্ডিত হয়ে উত্তরে কুচ, গারো, হাজং, পূর্বে কাছারি, ডিমাসা, দক্ষিণে ত্রিপুরা (বরোক) নামে পরিচিত হতে থাকে। (উৎস-১০)

৪৬) ১২৭৯ খ্রীষ্টাব্দে মুসলমান বিস্তৃতির ঢেউ আসে যা ঢেউ নয়- একাবারে মহাপ্লাবণ। সে বছর ত্রিপুরার রাজপুত্র রত্নফা (১৪৫তম) খাল কেটে কুমির আনলেন। তাদের ঘরোয়া বিবাদের সর্দারী করার জন্য তিনি লক্ষ্মণাবর্তীর সুলতান মগীস উদ্দিন তোগ্রীলকে ডেকে আনেন। …… এই যে গোড়ের মুসলমান রাজশক্তি চট্টগ্রামের পথ চিনল এরপর দুর্বার বিক্রমে চলল তাদের আক্রমণের পর আক্রমণ। সঙ্গে সঙ্গে চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী অঞ্চলে মুসলমান বসতি বেড়েই যেতে লাগল। (উৎস-১৩)

৪৭) মহারাজা রত্নফাই সর্বপ্রথম ত্রিপুরা রাজাদের মধ্যে মাণিক্য উপাধি ধারণ করেন। তার আমলে তামা, পিতল ও লৌহজাত শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটানো হয়। এই মহারাজা ১০ হাজার হিন্দু-মুসলিমকে ত্রিপুরা রাজ্যে বাস করার জন্য সুযোগ করে দেন এবং পুনর্বাসিত করেন। (উৎস-৫)

৪৮) মহারাজা রত্নমাণিক্যের (১২৭৯-১৩২৭) প্রবর্তিত ব্যাংকিং ব্যবস্থাটিই পরবর্তীকালে ‘ত্রিপুরা স্টেট ব্যাংক’-এর রূপ নিয়েছিল। এর বহু শাখা ছিল রাজ্যের প্রধান প্রধান নগরী ও শহরসমূহে। চট্টগ্রাম জেলায় আন্দরকিল্লা ও খাতুনগঞ্জে, কুমিল্লা জেলা সদর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়, চাকলা ও রোশনাবাদ এবং সিলেটে ত্রিপুরা স্টেট ব্যাংকের শাখা চালু ছিল। পাকিস্তান আমলে এই সব ব্যাংক অবলুপ্ত করা হয়েছিল। (উৎস-৩)

৪৯) মহারাজা ধন্যমাণিক্য (১৪৯০-১৫২০) ১৪৯০ খ্রীষ্টাব্দের পর তাঁর মুদ্রায় ‘ত্রিপুরান্দ্র’ উপাধি খোদিত করেন ….. এরপর ১৫৫০ খ্রীষ্টাব্দে পর্তুগীজ নাবিক জোয়া ডি ব্যারোজের অংকিত মানচিত্রে “রেইনো ডে তিপোরা” নাম দেখা যায়। (উৎস-১০)

৫০) সম্রাট আকবরের প্রধানমস্ত্রী আবুল ফজল তাঁর আইন-ই-আকবরী পুস্তকে উল্লেখ করেছেন- “ভাটী প্রদেশের সহিত সংলগ্ন একটি স্বাধীন রাজ্য আছে। এ রাজ্যের নাম ত্রিপুরা এবং ইহার অধিপতির নাম বিজয়মাণিক্য। এই রাজ্যের অধিপতিগণ ‘মাণিক্য’ উপাধিতে ভূষিত হন এবং তাঁদের অমাত্যবর্গ নারায়ণ নামে অভিহিত হন। এই মহারাজারা দুই লক্ষ পদাতিক এবং এক হাজার বনহস্তীর সামরিক শক্তি আছে কিন্তু অশ্ব অতি বিরল।” (উৎস-৩)

৫১) বিজয় মাণিক্যের (১৫৫তম) পরলোক গমনের বৎসর, ১৫৭৫ সালে পাশ্চাত্য পর্যটক র‌্যাফল ফিচ তাঁর ভ্রমণ বৃত্তান্তে উল্লেখ করেন- “From Satagaon I travelled by the country of king of Tippera.” (উৎস-৩)

৫২) ত্রিপুরা মহারাজা কল্যাণ মাণিক্যের (১৬২৬-১৬৬০) রাজত্বকালে ১৬৫২ খ্রীষ্টাব্দে ইউরোপীয় পর্যটক পিটার হেলস ত্রিপুরা রাজ্য সফর করেছিলেন। তিনি তার বিবরণীতে উল্লেখ করেছিলেন- “মোঘল বাদশাহগণের সাথে ত্রিপুরা মহারাজাদের অনবরত যুদ্ধ হতো। ত্রিপুরা রাজ্য পাহাড় পর্বত বেষ্টিত বলে মোঘলগণ যুদ্ধে তেমন সুবিধা করতে পারতো না।” (উৎস-৩)

৫৩) বাংলায় যারা বার ভূঁইয়া ছিলেন তারা ত্রিপুরা রাজ্যের অধীনে ছিলেন এবং ত্রিপুরা মহারাজাকে কর দিতেন। মোঘল সম্রাট আকবর এটা সহ্য করতে না পেরে তিনিও কর দাবি করেন। তবে অনেক সময় বার ভূঁইয়াদের কেউ কেউ মোঘল বশ্যতাও স্বীকার করে নেন। ত্রিপুরার ইতিবৃত্ত ‘রাজাবলী’ একখানি প্রাচীন গ্রন্থ। এখানে উল্লেখ আছে যে, বার ভূঁইয়াদের বঙ্গদেশও ত্রিপুরা রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। (উৎস-৩)

৫৪) বার ভূঁইয়াদের শ্রেষ্ঠ ভূঁইয়া ঈশা খাঁ শাহবাজ খানের হাতে পরাজিত হলে মহারাজা বিজয়মাণিক্য আশ্রয় প্রদান করেন। ঈশা খাঁ ত্রিপুরা মহারাজার ধর্মপুত্র হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। ফলে ত্রিপুরা রাজ্য সেনা বাহিনীর প্রধান হিসেবে চাকরি পান। (উৎস-৫)

৫৫) ত্রিপুরার সেনাপতি ঈশা খাঁর সঙ্গে আকবরের সেনাপতি মানসিংহের যুদ্ধ হয়। এতে মানসিংহ পরাজিত হন এবং বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে ত্রিপুরা মহারাজার সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলেন। (উৎস-৩)

৫৬) বৈদেশিক আক্রমণ এবং বিভিন্ন কারণে ষোড়শ শতাব্দী ও সপ্তদশ শতাব্দী থেকে এ রাজ্যের ধ্বস নামে। (উৎস-৫)

৫৭) ত্রিপুরা রাজমহলের ইতিহাস বিচার বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৭৬০ খ্রী: উদয়পুর (রাঙ্গামাটি) থেকে পুরাণ আগরতলাতে স্থানান্তরিত হয়। তার আগে উদয়পুর, অমরপুর, পুরান রাজবাড়ি (তৃষ্ণা পাহাড়), চিটাগাং, মেহেরকুল (বর্তমান বাংলাদেশে) ইত্যাদি স্থানে রাজবাড়ি ছিল এবং এখনো ভগ্নদশায় আছে। (উৎস-৮)

৫৮) রাজা মহারাজাদের আমল থেকেই ত্রিপুরা রাজ্যে কলিকাতা থেকে হিন্দুরাজ কর্মচারী নিয়োগ করা হতো। (উৎস-৫)

৫৯) মহারাজা কৃষ্ণ চন্দ্র মাণিক্য (১৭৬০-১৭৮৩) ছিলেন অত্যন্ত দয়ালু ও ধার্মিক। তিনি নবদ্বীপ থেকে ব্রাহ্মণদের এনে ভূমিদান ও অর্থদান করেছিলেন। এভাবেই আজকের আগরতলা বা ত্রিপুরা রাজ্যে সেসব বাঙালি হিন্দুরা রাজকীয় হালে বসবাস করে যাচ্ছেন তা মহারাজা কৃষ্ণ চন্দ্র মাণিক্য এবং অন্যান্য মহারাজাদের অনুকম্পারই ফলশ্রুতি। (উৎস-৫)

৬০) পলাশী যুদ্ধে জয়লাভ করার পর ইংরেজগণ ছলে, বলে, কৌশলে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ গ্রাস করতে উদ্যত হয়েছিল। চাকলা-রোশনাবাদের রাজস্ব প্রশ্নে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তথা ব্রিটিশ গভর্নমেন্টের সাথে ত্রিপুরা গভর্নমেন্টের বিরোধ সৃষ্টি হয়। এর ফলে ১৭৬৯ খ্রী: ২৪ ফেব্রুয়ারিতে কৈলাগড়ে ত্রিপুরাদের সাথে ইংরেজদের মধ্যে সর্ব প্রথম যুদ্ধ হয়। ত্রিপুরা জেনারেল রাম হরি বক্সীর বিশ্বাসঘাতকতার কারণে (ইংরেজদের কাছ থেকে উৎকোচ পাওয়ায়) ত্রিপুরা সৈন্যগণ বাধ্য হয়ে রণে ভঙ্গ দেন। এ যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এক সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়:

১. যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি বাবদ ত্রিপুরা গভর্নমেন্টকে ৪৫,৪৬৩ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

২. ত্রিপুরা রাজ্যের স্বাধীনতায় ব্রিটিশ গভর্নমেন্ট কোন হস্তক্ষেপ করবেনা । তবে উভয় দেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় দেখাশোনা করার জন্য রেসিডেন্ট (রাষ্ট্রদূত) নিয়োগ করা হবে।

৩. চাকলে রোশনাবাদসহ বৃহত্তর কুমিল্লা ত্রিপুরা মহারাজার জমিদারী সম্পত্তি বলে গণ্য হবে এবং মোট রাজস্ব পরিমাণ ৮, ৩৪,০০০ টাকার মধ্যে ১,৫২,৫১১ টাকা ব্রিটিশ গভর্নমেন্ট পাবে। (উৎস-৩,৫)

৬১) ঐতিহাসিক জে. ই. ওয়েবস্টার উল্লেখ করেছেন কমলাঙ্ক নামটি ত্রিপুরা রাজ মহিষীর নামে নামাঙ্কিত হয়েছে। পুর্বকাল থেকে ত্রিপুরা জেলা (কুমিল্লা) ত্রিপুরা রাজ্যের সাথে যুক্ত ছিল। ত্রিপুরা নামটি তুই-প্রা শব্দ থেকে গৃহীত হয়েছে। যার অর্থ নদীর মোহনা। ত্রিপুরীদের কাছে তুই মা অর্থাৎ মেঘনা নদী এখনো দুগ্ধ স্রোতরূপী মাতৃনদী হিসেবে পূজিত হয়ে থাকে। (তথ্য: কুমিল্লা জেলা গেজেটিয়ার: ১ম অধ্যায়)। (উৎস-৩)

৬২) ১৭৮২ খ্রীষ্টাব্দের ১১ জুলাই মহারাজা কৃষ্ণ মাণিক্য মারা যান। এ সুযোগে ব্রিটিশ সরকার চাকলে রোশনাবাদের জমিদারীত্ব ও প্রাশাসনিক কর্তৃত্ব দখল করে নিয়ে গিয়েছিল। রাজধর মাণিক্য (১৭৮৫-১৭৯৭) ত্রিপুরা সিংহাসন অধিষ্ঠিত হবার পরপরেই চাকলে রোশনাবাদ অঞ্চলকে ত্রিপুরা রাজ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে দাবি করেন। এর ফলে মহারাজার সাথে গভর্নর জেনারেল লর্ড কর্ণওয়ালিসের ৩ টি সমঝোতা চুক্তি স্বক্ষরিত হয়:

১. কুমিল্লা প্রদেশের চাকলে রোশনাবাদ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত বলে গণ্য হবে।

২. চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের আওতায় জমিদারী, চাকলা রোশনাবাদ তথা বৃহত্তর কুমিল্লার শাসন কর্তৃত্ব ত্রিপুরা মহারাজার অধীনে থাকবে।

৩. ত্রিপুরা মহারাজা কৃষ্ণ মাণিক্যের আমলে চুক্তিকৃত দ্বিতীয় অংশ অর্থাৎ রেসিডেন্ট প্রথা বাতিল বলে গণ্য হবে। (উৎস-৩)

৬৩) কুমিল্লা হস্তগত করার পর ব্রিটিশ সরকার ১৭৯০ খ্রীষ্টাব্দে স্বতন্ত্র জেলা ঘোষণা করে এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত মনোভাবাপন্ন হয়ে থাকলে রোশনাবাদ (কুমিল্লা) নাম পরিবর্তন করে নামকরণ করে Tipperah District। স্বাধীন ত্রিপুরা রাজ্যকে নামারোপ করে Hill Tipperah নামে। (উৎস-৩)

৬৪) বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলে যে এক সময় ত্রিপুরাগণ (তৎকালীন যেসব বোরো ভাষাভাষী নিজেদের ত্রিপুরা বলে পরিচয় দিয়েছিল কেবল তারাই অন্তর্ভুক্ত) সর্বত্র ছিল তার কিছু প্রমাণ আদমশুমারী প্রতিবেদন পরীক্ষা করলে পাওয়া যায়। এখানে ১৮৭২ ও ১৮৮১ সালের আদমশুমারী রিপোর্ট অনুযায়ী উল্লেখিত অঞ্চলে ত্রিপুরাদের জনসংখ্যার চিত্র তুলে ধরা হল:

 

ক্রমিক নংজায়গার নাম১৮৭২১৮৮১
১.কুচবিহার১১২৬
২.ঢাকা৩৮৪৭
৩.ফরিদপুর১০১
৪.বাখেরগঞ্জ২১৭৪৫
৫.নোয়াখালী২৩২১৬
৬.চট্টগ্রাম৪৫২২৫
৭.কুমিল্লা৩০০৪১৮৯৫
৮.হিল ট্র‌্যাক্টস১১৮০০১৫০৫৪
মোট১৫৩৩৬১৮৫০৯

 

৬৫) ত্রিপুরা মহারাজা ঈশান চন্দ্র মাণিক্যের (১৮৫০-১৮৬১) আমলে Capt. T.H. Lewin নামক একজন ইংরেজকে ত্রিপুরা রাজপ্রাসাদের তত্ত্বাবধায়ক পদে নিযুক্ত করা হয়েছিল। পরবর্তীকালে Capt. T.H. Lewin পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক পদে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক নিযুক্ত হন। (উৎস-৩)

৬৬) অধ্যাপক শাহেদ আলী তাঁর ‘বাংলা সাহিত্যে চট্টগ্রামের অবদান’ গ্রন্থে লিখেছেন, “চট্টগ্রামে যারা প্রথমে বসতি স্থাপন করে তারা টিবেটো বর্মন ও দ্রাবিড় গোষ্ঠীর লোক।” (উৎস-১৪)

৬৭) চট্টগ্রাম আগ্রাবাদ হোটেলের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সময় চট্টগ্রাম পরিচিতি দানের জন্য প্রকাশিত ফোল্ডারে উল্লেখ করা হয় যে, “Historically Chittagong was a small fishing village in the ancient kingdom of Tipperah.” (উৎস-১৪)

৬৮) আরাকানীগণ মহারাজা যশোরাজকে (১২৯তম) উদয়গিরি নামে আখ্যায়িত করত। …… ৯৫৩ খ্রীষ্টাব্দে মহারাজা উদয়গিরির রাজত্বকাল পর্যন্ত ত্রিপুরা রাজন্যবর্গ বংশ পরম্পরায় চট্টগ্রাম শাসন করেন। আরাকান রাজ সুলা সুন্দ্রা ৯৫৩ খ্রীষ্টাব্দে চট্টগ্রাম অধিকার করেন। অতঃপর আরাকান রাজন্যবর্গ একটানা ২৯৭ বছর চট্টগ্রাম শাসন করেন। পরে ত্রিপুরা মহরাজা সেংথুমফা (১২৩০-১২৫০) ১২৪০ খ্রীষ্টাব্দে আরাকান রাজাকে পরাজিত করে চট্টগ্রাম অধিকার করেন। (উৎস-৩)

৬৯) ষোড়শ শতাব্দীর পরবর্তীকাল থেকে চট্টগ্রামের উপর শাসন কর্তৃত্ব নিয়ে ত্রিপুরা ও আরাকান রাজ্যের রাজশক্তি ক্রমে স্তিমিত হয়ে আসে। ১৬৬৬ খ্রীষ্টাব্দের ২৭ জানুয়ারি শাহসুজার পুত্র বুজুস উমেদ খাঁ শাসন ক্ষমতা গ্রহণের পর চট্টগ্রাম মোঘল শাসনাধীনে ক্রমে ক্রমে চলে যায়। কিন্তু চট্টগ্রামের উত্তরাংশ (হালদা নদীর উত্তর-পূর্বাংশ) ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটি জেলা দুটি ত্রিপুরা রাজন্যবর্গের শাসনাধীনে থেকে যায়। মোঘল শাসনের স্থায়ীত্ব ছিল ১৬৬৬ খ্রীষ্টাব্দ থেকে ১৭৬৫ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত। ১৭৬৫ খ্রীষ্টাব্দে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী তথা ব্রিটিশ সরকার বঙ্গদেশের উপর দেওয়ানী স্বত্ত্ব অধিকার পাবার পর চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে মোগল শাসনের অবসান ঘটে। (উৎস-৩)

৭০) মোঘল শাসনামলে পার্বত্য চট্টগ্রামের অংশ বিশেষ কার্পাস মহল হিসেবে আখ্যায়িত হয়েছিল। মূলত এই কার্পাস মহলটি ছিল পার্বত্যাঞ্চলের দক্ষিণাংশ তথা বান্দরবান অঞ্চল। এই কার্পাস মহলের চুক্তি সম্পাদনকারী ছিলেন চাকমা রাজন্যবর্গ। রামু, আলীকদম, চকরিয়া, বাকখালী নদীর অববাহিকা অঞ্চল, পদুয়া, দেয়াং, রাঙ্গুনিয়াসহ কয়েকটি অঞ্চল নিয়ে কার্পাস মহল গঠিত ছিল। বর্তমান রাঙ্গামাটি জেলা ও খাগড়াছড়ি জেলা কার্পাস মহলের বহির্ভূত ছিল। (উৎস-৩)

৭১) ব্রিটিশ সরকার চট্টগ্রাম থেকে বিচ্ছিন্ন করে পার্বত্য চট্টগ্রামকে স্বতন্ত্র জেলা ঘোষণা করেছিল ১৮৬০ খ্রীষ্টাব্দে। জেলা ঘোষণা করার প্রথম দিকে বর্তমানে খাগড়াছড়ি ও লুসাই পাহাড় পার্বত্যাঞ্চল বহির্ভূত ছিল। লুসাই পাহাড়ের পূর্ব নাম ছিল ত্রিপুরা হিলস। ব্রিটিশ সরকার Tripura Hills নামটি পরিবর্তন করে Lusai Hills রেখেছিল। (উৎস-৩)

৭২) ত্রিপুরা মহারাজা রাধা কিশোর মাণিক্যের (১৮৯৬-১৯০৯) রাজত্বকালে ত্রিপুরা রাজপ্রাসাদের সাথে ব্রিটিশ সরকারের কূটনৈতিক সম্পর্ক চরম অবনতি ঘটেছিল। এ সময়ে ব্রিটিশ সরকার নানা ধরনের রাষ্ট্র বিপ্লবের সুযোগ নিয়ে বর্তমান খাগড়াছড়ি জেলা ও লুসাই পাহাড়কে জোর জবরদস্তি দখল করে পার্বত্য জেলার সাথে অন্তর্ভুক্ত করে এবং ১৯০৫ খ্রীষ্টাব্দে রামগড়কে মহকুমা ঘোষণা করে। (উৎস-৩)

৭৩) ত্রিপুরা মহারাজা বীরেন্দ্র কিশোর মাণিক্য (১৯০৯-১৯২৩) ব্রিটিশ সরকারের অনুরোধে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য ত্রিপুরা সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন এবং যুদ্ধ তহবিলে প্রচুর অর্থ দান করেন। …… অধিকন্তু তিনি রাজ্যের আকাশকে শত্রুমুক্ত রাখতে ‘সিঙ্গাল বিল’ নামক স্থানে বিমান ঘাঁটি স্থাপন করেছিলেন। (উৎস-৩)

৭৪) মহারাজা বীর বিক্রম কিশোর মাণিক্য বাহাদুর (১৯২৩-১৯৪৭) ছিলেন সংস্কার মুক্ত। তিনি অন্যান্য দেশের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে ১৯৩০ খ্রীষ্টাব্দে ইতালী সফর করেন। সেখানে ইতালীর রাষ্ট্রনায়ক মুসোলিনী তাকে অভ্যর্থনা জানান এবং জেনারেল বেলবো তার সম্মানে বিমান সম্ভার মহড়ার আয়োজন করেন। রাষ্ট্রীয়ভাবে ১৯৩৬ খ্রীষ্টাব্দে অলিম্পিক খেলা পরিদর্শনে আমন্ত্রণ জানান জার্মানীর চ্যান্সেলর হিটলার। তিনি মহারাজাকে আন্তরিক অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করেন। ১৯৩৯ খ্রীষ্টাব্দে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঘোষণার আগে তিনি আমেরিকা ও ইংল্যাণ্ড সফর করেন। প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট একুশবার তোপধ্বনির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সম্মান ও অভ্যর্থনা জানান। ১৯৩৯ খ্রীষ্টাব্দের ৩ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আরম্ভ হয়ে গেলে মহারাজা সর্বোতভাবে ই্ংরেজ সরকারকে সহযোগীতা করেন এবং ত্রিপুরা রাজ্যের প্রতিটি মহকুমায় ‘রয়াচ কমিটি’ গঠন করেন। (উৎস-৫)

৭৫) ত্রিপুরা সেনাবাহিনীর সাতটি বিভাগের প্রায় ৮ হাজার সৈন্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল। ত্রিপুরা বিমানবাহিনীর দুটি বিমান বার্মা আক্রমণকালে জাপানীদের গুলিতে বিধ্বস্ত হয়েছিল বলে জানা যায়। (উৎস-৩,৫)

৭৬) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ত্রিপুরা সৈন্যদের সামরিক দক্ষতা ও বীরত্ব দেখে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক ফিল্ড মার্শাল স্যার ক্লাউডি আউচিনলীক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বেইনকে আগরতলায় প্রেরণ করেন। মহারাজা বীর বিক্রম কিশোর মানিক্য বাহদুরকে ১৩ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে ‘গার্ড অব অনার’ দিয়ে বিপুল সম্মানে ভূষিত করেছিলেন। (উৎস-৩)

৭৭) স্বাধীন ত্রিপুরা রাজ্যের সর্বশেষ মহারাজা বীর বিক্রম কিশোর মাণিক্য বাহাদুর ভারত থেকে ব্রিটিশ শাসনের অবসান হবার পূর্বাভাস উপলব্ধি করে হৃত রাজ্যাংশ পুণরুদ্ধার করার জন্য তৎপর হয়েছিলেন। (উৎস-৩)

৭৮) দেশ বিভাজনের আগে ত্রিপুরা রাজ দরবার কুমিল্লা নোয়াখালী অঞ্চলকে ত্রিপুরা রাজ্যের সাথে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি উত্থাপন করেছিলেন। কিন্তু র‌্যাডক্লিফ কমিশন ত্রিপুরা রাজদরবারের দাবি উপেক্ষা করে পূর্ব পাকিস্তানের সাথে যুক্ত করার সুপারিশ করে। এ সুপারিশের ফলে উক্ত দুটি অঞ্চল পূর্ব পাকিস্তানের সাথে যুক্ত হয়ে যায়। (উৎস-৩)

৭৯) দেশ বিভাজনের আগে পার্বত্য চট্টগ্রামের তৎকালীন জনসমিতির চাকমা নেতৃবৃন্দ পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলকে ভারত রাষ্ট্রের সাথে অন্তর্ভুক্ত করার দাব উত্থাপন করে রাঙ্গামাটিতে ভারতীয় পতাকা উত্তোলন করেছিলেন। অপরদিকে ত্রিপুরাগণ (ত্রিপুরাসংঘ) দাবি উত্থাপন করেছিলেন স্বাধীন ত্রিপুরা রাজ্যের সাথে অন্তর্ভুক্ত করার। …… ত্রিপুরা নেতৃবৃন্দ খাগড়াছড়িতে ত্রিপুরা রাজ্যের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেছিলেন। …… কিন্তু র‌্যাডক্লিপ কমিশন পার্বত্য চট্টগ্রামকে পূর্ব পাকিস্তানের সাথে সম্পৃক্ত করার সুপারিশ করে। এ সুপারিশের ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম পূর্ব পাকিস্তান রাষ্ট্রের সাথে যুক্ত হয়। (উৎস-৩)

৮০) মহারাজা বীর বিক্রম কিশোর মাণিক্য ১৯৪৭ খ্রীষ্টাব্দে ১৭ মে রাত ৮:৪০ মিনিটে মৃত্যুবরণ করার পর ত্রিপুরা রাজ্যের শাসনের যবনিকা ঘণ্টা বাজে। তার সময় অনুসারে এখন থেকে মাত্র ৭৫ বছর পূর্বে ত্রিপুরা রাজ্যের ক্ষমতা হস্তান্তরিত হয়। এরপর থেকে শুরু হয় ত্রিপুরা জাতির অন্ধকার অধ্যায়। …… জাতি থেকে পরিচয় পায় উপজাতি হিসেবে। (উৎস-১৮)

৮১) মহারাজা বীর বিক্রম মারা যাওয়ার পর ত্রিপুরা রাজ্যের শাসন পরিচালনার এমন সংকট মুহূর্তে দেশের নিরাপত্তার প্রশ্নে রিজেন্সি মহারাণী কাঞ্চনপ্রভা দেবী ১৩ আগস্ট ১৯৪৭ সনে ব্রিটিশ ভারত সরকারের সাথে Instrument of accession নামে একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। চুক্তির কোথাও ত্রিপুরাকে ভারতের অংশ বলে উল্লেখ নেই। (উৎস-১৫)

৮২) Instrument of accession চুক্তি পার্শ্ববর্তী দেশ হিসেবে পারস্পরিক স্বার্থ ও নিরাপত্তা প্রশ্নে করা হয়েছে এবং দুই দেশের মধ্যে কোন প্রকার মর্যাদা হানি বা স্বার্বভৌমত্ব ক্ষুন্ন হয়নি। তাছাড়া মহারাণী ভারতের সংবিধান অস্বীকার করে স্বাধীন ত্রিপুরা ঘোষণা করার ক্ষমতা এই চুক্তিতে রয়েছে। (উৎস-১৫)

৮৩) স্বাধীন ত্রিপুরা মহরাণী কাঞ্চনপ্রভা দেবীকে গভীর ষড়যন্ত্রের মুখে ফেলে তথাকথিত নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলে দিল্লীতে অঘোষিতভাবে বন্দী রেখে ত্রিপুরার জনগণ অর্থাৎ ত্রিপুরী জনগণের মতামত ব্যতীত ৯ই সেপ্টেম্বর ১৯৪৯ সালে দিল্লীতে অঘোষিত অবস্থায় “Merger Agreement” অবৈধ, বলপূর্বক চুক্তি স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়, যা আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত ও গ্রহণযোগ্য নয়। স্বাক্ষরিত Agreement অনুসারে ত্রিপুরা রাজ্য ভারতের একটি অঙ্গরাজ্য হিসেবে গণ্য হয়। স্বাধীন ত্রিপুরা ভারতের উপনিবেশিক শাসনে চলে আসে ১৫ই অক্টোবর ১৯৪৯ সালে। (উৎস-১৫)

৮৪) একবিংশ শতাব্দীর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে যখন বৃহৎ জাতির গৌরবময় যুগের কথা স্মরণ করছি, তখন আমার হৃদয়-মন দুঃখে ভারাক্রান্ত হয়ে যাচ্ছে। বৃহৎ বোডো জাতি এক সময় এক উন্নত সভ্যতা ও সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। উত্তর-পূর্ব ভারতের এক বৃহৎ ভূ-খন্ড বোডোদেরই শাসনাধীনে ছিল। বর্তমানে আসাম, উত্তরবঙ্গ, বাংলাদেশের রংপুর, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, নোয়াখালী, শ্রীহট্ট, আদি বিস্তীর্ণ এলাকার উপর আধিপত্য ছিল বোডো নৃপতিদের। মাইরং বা মহীরঙ্গ থেকে শুরু করে ভগদত্ত, ভাস্করবর্মণ, রত্নপাল, খুংখ্রা, ডেটচুং, ধন্যমাণিক্য, বিজয়মাণিক্য, বিশ্বসিংহ, নারায়ণ, সংকল, সংকলদ্বীপ, আলী মেচ, শ্রীহট্ট, রাজ কেশদেব, দনুজমর্দন দেব, বাংলার কাম্বোজ বংশ এর সবাই ছিলেন বোডো নৃপতি। (উৎস-১৬)

৮৫) যে কুমিল্লার নাম এক সময় ত্রিপুরা ছিল সেই কুমিল্লার ত্রিপুরা, আদিবাসীদের তাদের ঐতিহ্যবাহী পোষাক হারিয়ে ফেলেছে, তাদের ভাষা হারাতে বসেছে। ভাষা হারাবার পর এই আদিবাসী জনগোষ্ঠী তাদের মঙ্গোলয়েড চেহারাও হারিয়ে ফেলবে। (উৎস-৯)

৮৬) চাঁদপুর জেলার চাঁদপুর সদর, ফরিদগঞ্জ, কচুয়া, হাইমচরসহ প্রায় সব থানাতেই ত্রিপুরা রয়েছে। … সব মিলিয়ে প্রায় ৫০০০ ত্রিপুরা বসবাস করে থাকে। … চাঁদপুরের ত্রিপুরাদের জীবনধারণ অনেকটা বাঙালিদের মতো। … তাদের প্রায় ৯৯% সনাতন ধর্মাবলম্বী এবং বাকিরা খ্রীষ্টান ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। (উৎস-১৮)

৮৭) দক্ষিণাঞ্চলের উসুই ত্রিপুরাগণ ধীরে ধীরে খ্রীষ্টান ও ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হতে শুরু করেছে এবং এইভাবে তাদের মূল সংস্কৃতির মধ্যে পরিবর্তন লক্ষিত হচ্ছে। (উৎস-১৫)

যে কথাগুলো না বললে নয়

৮৮) বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্যমান ত্রিপুরা মহারাজাদের স্থাপত্য, মন্দির, মসজিদ, বৌদ্ধ মন্দির, পুকুর, দিঘী ইত্যাদি নিদর্শনগুলো এখনও ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে। কুমিল্লায় রয়েছে রাণীর কুঠি, ধর্মসাগর, কমলাসাগর, শাহমুজা মসজিদ, সতের রত্ন মন্দির, কুমিল্লা টাউন হল, কুমিল্লা জিলা বোর্ড, কুমিল্লা বালিকা বিদ্যালয়, কুমিল্লা হাসপাতাল, কুমিল্লা মাধ্যমিক ইংরেজী স্কুল, অভয়াশ্রম, হিন্দুসভা ভবন, তত্ত্বজ্ঞান সভাভবন, কুমিল্লা খাদিমূল ইসলামী মাদ্রাসা ইত্যাদি। চট্টগ্রামে রয়েছে চট্টেশ্বরী মন্দির, শম্ভুনাথ মন্দির, গোবিন্দ সাগর, অন্নপূর্ণা মন্দির, বিরুপক্ষ মন্দির। সিলেটে রয়েছে তিতাস নদীর তীরে হাটখোলা বাজার (মহোদয়াগঞ্জ), মহোদয়া দিঘী। এভাবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় রামসাগর, গঙ্গাসাগর, কসবায় গুণসাগর, খাগড়াছড়িতে মানিক্য দিঘী ইত্যাদি।

এছাড়াও সর্বশেষ মহারাজা চট্টগ্রামস্থ নন্দন কানন বৌদ্ধ মন্দিরের একটি কক্ষ নির্মাণের জন্য ১৫০০ রৌপ্য মুদ্রা, চন্দ্রঘোনাস্থ চিৎমরম বৌদ্ধ মন্দির নির্মাণের জন্য ২০০০ রৌপ্য মুদ্রা, মাণিকছড়ি মহামনি বৌদ্ধ মন্দির সংস্কারের জন্য মংরাণী নিউমাকে ২০০০ রৌপ্য মুদ্রা এবং খাগড়াছড়ি বাজারস্থ বৌদ্ধ মন্দির সংস্কারের জন্য রাজচন্দ্র চৌধুরীকে ২০০০ রৌপ্য মুদ্রা অনুদান করেছিলেন।

৮৯) বিভিন্ন ঐতিহাসিক বই পুস্তকের আলোকে আর আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় এটা সত্য যে, ত্রিপুরারা স্বজাতির তুলনায় পরজাতির প্রতি খুব সংবেদনশীল। আমার যেসব বন্ধুরা খাগড়াছড়িতে পড়ার সময়, আমার সাথে ককবরকে কথা বলত, তারাই শহরে এসে (বিশেষত ঢাকা) আমার সাথে এখন বাংলায় কথা বলে। রাঙ্গামাটির ত্রিপুরারা ককবরকের চেয়ে বাংলা ও চাকমা ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পটু। সেখানকার আসামবস্তি নামক এলাকার ত্রিপুরারা (আমার হাইস্কুলের বন্ধু টুটুন ত্রিপুরার বাড়িও সেখানে) বিকৃত বাংলায় কথা বলে, চাকমা ভাষাও বলতে পারে না। কিন্তু ওরা আবার বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। চাঁদপুরের ত্রিপুরারা বাংলা ভাষায় ভাব প্রকাশ করে, আর জাতির পরিচয় হিসেবে নামের শেষে দেব লিখে, ত্রিপুরা লিখেনা। প্রায় বার-চৌদ্দ বছর আগে বান্দরবান সদরে ৩০টা ত্রিপুরা পরিবার মুসলিম ধর্মান্তরিত (ইচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায়) হয়ে বাঙালি জনসংখ্যায় মিলে গেছে। তারও প্রায় বহু বছর আগে খাগড়াছড়ির গঞ্জপাড়া নামক এলাকার ত্রিপুরারা বৌদ্ধ ধর্মান্তরিত হয়ে স্বীয় মাতৃভাষা ও সংস্কৃতি ছেড়ে মারমা ভাষা ও সংস্কৃতি গ্রহণ করেছে। ত্রিপুরা ছেলে বা মেয়ে অন্যজাতির (প্রধানত বাঙালি, চাকমা, মারমা) মেয়ে বা ছেলেকে বিয়ে করলে সেই মেয়ে বা ছেলের জাতি কিংবা ধর্মে রূপান্তরিত হয়। এই রহস্যের উত্তর আমার জানা নেই।

৯০) বিশিষ্ট চাকমা গবেষক সলিল রায়ের মাধ্যমে জানা যায় যে, মধ্য তিব্বতের নাম ‘পোদ’ বা ‘পোদো’ আর এ স্থান থেকে আগত বলে ত্রিপুরারা ‘পোদো’ বা বোদো বা বোরো জনগোষ্ঠীভুক্ত (‘প’ বর্ণ ‘ব’ বর্ণ আর ‘দ’ বর্ণ ‘র’ হয়)। আবার ‘বাঙ্গালীর ইতিহাস’ ও ‘বাংলাদেশের ইতিহাস’ গ্রন্থদ্বয়ে পুণ্ড্রবর্ধনের রাজধানী পুণ্ড্রনগরকে কখনো কখনো পুদ্‌নগল বা পোদ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আবার ত্রিপুরা রাজ্যের প্রাচীনতর রাজধানী ত্রিবেগনগর মূলত বর্তমান বাংলাদেশের উত্তর দিকে বলে ঐতিহাসিকেরা মত দেন। আবার উৎস-৩ এর মাধ্যমে জানা যায় যে, ৪৮তম মহারাজা দাক্ষিণ রাজধানী ত্রিবেগনগর ত্যাগ করে বরাক নদীর অবাইকার অঞ্চলে রাজ্যপাট প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ত্রিপুরাদের দক্ষিণদিকে আসার পথ সুগম হয়েছে। আবার উৎস-১ এর (পৃষ্ঠা ৫৩৭) মাধ্যমে জানা যায়- রাজশাহী, দিনাজপুর, বগুড়া জেলায় এবং ফরিদপুর-ঢাকা-ত্রিপুরা (কুমিল্লা) জেলায় যত মূর্তি পাওয়া গিয়েছে বাংলাদেশের অন্যকোথাও তেমন পাওয়া যায় নি।

৯১) উৎস-১ ও উৎস-৬ এর মাধ্যমে জানা যায়, চর্যাপদের লেখকগণের মধ্যে দুইজন ছিলেন ত্রিপুরা- বিরূপা ও ডোম্বীপা। বিরূপা অষ্টম শতকে জন্মেছিলেন। তারই শিষ্য ডোম্বীপা ছিলেন ত্রিপুরা মহারাজা। তিনি জন্মগ্রহণ করেন ৭৯০ খৃষ্টাব্দে আর মৃত্যুবরণ করেন ৮৯০ খৃষ্টাব্দে। তার অলৌকিক ক্ষমতা ছিল বলে মনে করা হয়। তিনি বিভিন্ন দেশে দেশে পরিভ্রমণ করে জীবন অতিবাহিত করেন। তবে ‘ডোম্বীপা’ নামে কোন রাজার নাম ত্রিপুরা রাজবংশের তালিকায় পাওয়া যায়নি। তিনি হয়তো বৌদ্ধ ধর্মান্তরিত হয়ে বিরূপার শিষ্যত্ব লাভ করার পরপরই ডোম্বীপা নাম ধারণ করেন এরূপ ধারণা করতে কোন বাধা নেই। কারণ বৌদ্ধ শ্রামণ হওয়ার সাথে সাথে নামও পরিবর্তন করতে হয়।

৯২) যেহেতু বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ১২০১ খ্রীষ্টাব্দ থেকে ১৩৫০ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত সময়কালকে অন্ধকার যুগ আর চর্যাপদই বাংলা সাহিত্যের তথা ভাষার প্রথম নিদর্শন বলে ধরে নেওয়া হয়, সেহেতু তখনকার সময়গুলোকে বাংলা ভাষা এবং বাঙালি তথা সংকর জাতির শৈশব কাল বলে ধরে নেওয়া যায়। যার ফলে শশাঙ্ককে প্রথম বাঙালি রাজা বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। অর্থাৎ তার পূর্বে কোন বাঙালিই রাজা হননি। আর তখন যদি বাঙালি বলে কোন জনগোষ্ঠী থেকে থাকে তাহলে তারা অবশ্যই অন্য কোন জাতির রাজার অধীনে বসবাস করতো এবং তাদের ভাষা অবশ্যই ‘বাংলা’ ছিল না, হয়তো দ্রাবিড়, অষ্ট্রিক কিংবা তিব্বতী বর্মণ অথবা এ ভাষাগুলোর সংমিশ্রণ ছিল। উদাহরণস্বরূপঃ- বাংলা ভাষার উৎপত্তির ক্ষেত্রে ‘বঙ্গ-কামরূপী’কে টেনে আনা হয়। অথচ কামরূপীতে বসবাসকারী সকলেই জাতিতে তিব্বতী বর্মন ভাষাভাষী বোডো জনগোষ্ঠী। যদিও সময়ের বিবর্তনে রাজনৈতিক, দেশ বিভাজন ও অভিবাসনের কারণে বর্তমান আসামে বিভিন্ন জাতির মানুষের বসবাস দেখা যায়, তথাপি প্রাচীন আসাম শাসিত হতো সম্পূর্ণ মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠী দ্বারাই।

৯৩) বাংলাদেশের ইতিহাসে চন্দ্র, পাল, দেব, বর্মন, কাম্বোজ বংশীয় রাজাদের উত্থান-পতন সম্পর্কে খুব একটা নিখুঁত তথ্য পাওয়া যায় না। বরং তাদেরকে কখনো রাজা, কখনো কোন রাজার অধীন রাজা, কখনো বা স্থানীয় অধিপতি হিসেবে চিহ্নিত করার প্রয়াস চালানো হয়েছে।

৯৪) ত্রিবেগ রাজ্যের রাজধানী ছিলো ত্রিবেগনগর এবং এক সময় রাজ্যের নাম পরিবর্তন করে কিরাত রাখা হয়। এই নামটিই পরবর্তী রাজা ত্রিপুরের (৪৬তম) আগ পর্যন্ত বহাল থাকে। পরে মহারাজা ত্রিপুর তার নামানুসারে ‘ত্রিপুরনি হা’ (ত্রিপুরের দেশ) অর্থাৎ ‘ত্রিপুর+হা (দেশ)’ তথা ‘ত্রিপুরা’ নামে রাজ্যের নামকরণ করেন। এরই মধ্যে তিব্বতী-বর্মণ ভাষাভাষী ত্রিপুরারা রাজ্যের পূর্ব-দক্ষিণ দিকে ছড়িয়ে পড়ে। সলিল রায়ের মতে, ব্রহ্মদেশীয় ও কম্বোজ থেকে পঞ্চম/ ষষ্ঠ শতাব্দীর যে সকল শিলালিপি পাওয়া গেছে, ব্রহ্ম চীন সমুদ্রের তীরবর্তী কম্বোজ পর্যন্ত বসবাসকারী জনকে ব্যাপকভাবে কিরাত বা কিরান্ত আখ্যায় অভিহিত করা হয়েছে। নেপালে এখনো ‘কিরান্তি’ বা ‘করান্তি’ আখ্যা প্রচলিত।

৯৫) কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ হয়েছিল খ্রীষ্টপূর্ব ২৫০০ অব্দে। কুরুক্ষেত্র স্থানটি বর্তমান ভারতের হরিয়ানা রাজ্যে (দিল্লীর কাছাকাছি) অঞ্চলে অবস্থিত। আবার দিল্লীর সংলগ্ন স্থানকে উত্তর-পশ্চিম ভারত (যেখানে পৈশাচি প্রাকৃত প্রচলিত ছিল) বলা হয়। কাজেই ত্রিপুরাদের প্রাচীনতম রাজ্য প্রতিষ্ঠান নগর হরিয়ানা রাজ্যের কাছাকাছি অথবা বর্তমান নেপাল ও উত্তর প্রদেশের মাঝামাঝি কোথাও ছিল বলে ধরে নেওয়া যায়। তা না হলে বর্তমান ত্রিপুরা রাজ্য থেকে হরিয়ানায় গিয়ে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে সসৈন্যে অংশগ্রহণ করা মহারাজা ত্রিলোচনের পক্ষে অসম্ভব হতো। তাছাড়া কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে পাণ্ডবদের আত্মীয়-স্বজন, গুরুজনসহ প্রায় অধিকাংশ সৈন্যেই কৌরবদের পক্ষে ছিলেন। তাই পাণ্ডবগণ ত্রিপুরা তথা মঙ্গোল জাতিসহ অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীদের নিজেদের পক্ষে টেনে আনতে বাধ্য হয়েছিলেন।

৯৬) কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের আগ পর্যন্ত ত্রিপুরা রাজ্য শাসন করেছিলেন মোট ৪৬ জন রাজা। তাদের নামগুলো হিন্দু নামের মতো। কিন্তু এ কথা মনে রাখা উচিত যে, মহাভারত রচিত হয়েছিল কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের অনেক পরে। তাছাড়া ত্রিপুরারা হিন্দু ধর্মে প্রভাবিত হয় কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পরে। কাজেই ধরে নেওয়া যায় যে, পূর্ববর্তী রাজাদের নামগুলোতে এর প্রভাব পড়েছিল। তাছাড়া ত্রিপুরাদের ঐতিহাসিক গ্রন্থ ‘রাজমালা’ প্রথম দিকে রচিত হয়েছিল ককবরক ভাষায়, এরপর সংস্কৃতে, অবশেষে বাংলায়। এ সম্পর্কে রাজমালায় একটা উক্তিও সংযোজিত আছে।

“পূর্বে রাজমালা ছিলো ত্রিপুরা ভাষাতে।

পয়ার গাঁথিল সব সকলে বুঝিতে।।”

(রাজমালা ২য় খন্ড, ধর্মমাণিক্য অধ্যায়, পৃষ্ঠা-৬)

৯৭) উপমহাদেশে মঙ্গোলীয় জাতিগোষ্ঠীর আগমনকাল নিয়ে প্রশ্ন জাগাটাই স্বাভাবিক। মূলত মানুষের স্থানান্তরের কারণগুলোর মধ্যে প্রধানতম কারণ হচ্ছে খাদ্যের সন্ধান লাভ। কারণ এটাই মানুষের প্রথম মৌলিক চাহিদা। বিষয়টি মঙ্গোলীয় জাতিগোষ্ঠীদের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কারণ তারা অনেকটা প্রকৃতির উপর নির্ভর করেই চলে। যদিও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীরাও প্রাচীনকাল থেকে প্রাগৈতিহাসিক কাল পর্যন্ত প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল ছিল। তবুও মঙ্গোলীয়দের আলাদা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তারা বিভিন্ন খাদ্য উৎপাদনের জন্য ‘জুম’ চাষ করে (আর্য, দ্রাবিড়, অষ্ট্রিক, নিগ্রোরা ‘জুম’ চাষ করে কিনা আমার জানা নেই)। এই জুম চাষ সুদূর মঙ্গোলীয়া থেকে ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত। জুমের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে কোন বছরে একটা পাহাড়ে জুম চাষ করলে পরের বছরে অন্য আরেকটা নতুন পাহাড়ে গিয়ে জুম চাষ করতে হয়। এভাবে মঙ্গোলীয় সমাজের মানুষগুলো স্থানান্তরিত হয়। বর্তমানে যদিও সেরকম কিছুই দেখা যায় না। কারণ জনসংখ্যা বৃদ্ধির চাপে জুম চাষ প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছেছে। চাকমা গবেষক সলিল রায়ের মাধ্যমে জানা যায়, বিজ্ঞানীদের ধারণা এই কৃষির বিকাশ ঘটতে থাকে আনুমানিক খ্রীষ্টপূর্ব ১৩,০০০ – ৩০০০ অব্দ জুড়ে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে।

ঐতিহাসিক উপাদানগুলোর সত্যতা যাচাই

উল্লেখ্য যে, ‘ত্রিপুরা’ শব্দটি ঐতিহাসিক কাল থেকে দেশবাচক শব্দ হওয়ায় এবং তাকে ঘিরে একটা সভ্যতা, একটা জাতি ও একটা ইতিহাস গড়ে উঠায় এখানে ‘ত্রিপুরা’ শব্দটি জাতি অর্থেও ব্যবহৃত হবে।

১. ত্রিপুরাদের পরিচয়:

একটা জাতির পরিচয় নির্ভর করে মূলত দুইটি বিষয়ের উপর- দৈহিক গঠন ও ভাষা। অনুচ্ছেদ-৭, ৮, ১০, ১৭, ১৮, ১৯, ২০, ২১, ২২, ৯০, ৯৪ অনুসারে প্রতীয়মান হয় যে, ত্রিপুরাদের প্রারম্ভিক পরিচয় ছিল মঙ্গোল জাতি আর তখন ভাষা ছিল চীনা (সেসময় আরেক ধরনের চীনা ভাষার প্রচলন ছিল।) তারা যখন চীনের ইয়াংসি এবং হোয়াংহো নদীর উৎসস্থলের মধ্যবর্তী অঞ্চলে বসবাস করতে শুরু করে তখন তাদের ভাষা ‘সিনো-টিবেটান’-এ রূপান্তরিত হয়। এরপর তারা যখন মধ্য তিব্বতে এসে ‘পোদো’ অঞ্চলে অনেক কাল যাবত বসবাস করতে থাকে, তখন তাদের ভাষা ‘টিবেটো বর্মণ’-এ রূপান্তরিত হয় এবং জাতিগতভাবে ‘পোদোবাসী’ বলে বিবেচিত হতে থাকে। এরপর তার বরফে আচ্ছন্ন হিমালয় অঞ্চলে এসে সুবিধা করতে না পেরে নেপাল হয়ে উপমহাদেশে প্রবেশ করে। এরপর থেকে তাদের রাজ্যপাট স্থাপন শুরু হয়। একসময় তারা ভারত-বার্মা-ইন্দোচীনের দিকে অগ্রসর হওয়া শুরু করে। ধীরে ধীরে ‘পোদো’ জাতি ‘বোডো’ বা ‘বোরো’ জাতিতে রূপান্তরিত হয়। এক সময় তাদের বিস্তৃত অঞ্চলসমূহ কিরাত নামে পরিচিত হতে থাকে। ত্রিপুরা মহারাজা ত্রিপুরের কারণেই পরবর্তীতে ‘দেশ ও জাতি’ অর্থে ‘ত্রিপুরা’ শব্দটির প্রচলন শুরু হয় যা আজ অবধি প্রচলিত আছে। ‘বোরো’ ভাষাই বিংশ শতাব্দীতে ‘ককবরক’ নামে পরিচিতি পায়। তবে মহাভারতের লেখকগণ, চীনারা, পর্তুগীজগণ, ইংরেজগণ, বাঙালি, চাকমা, মারমা, বর্মীগণসহ অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীরা ত্রিপুরাদের বিভিন্ন নামে আখ্যায়িত করার প্রয়াস পেয়েছেন।

২. ত্রিপুরাদের আগমনকাল:

অনুচ্ছেদ- ৭, ৮, ৯, ১৮, ১৯, ৯৫, ৯৭ অনুসারে প্রতীয়মান হয় যে, ত্রিপুরারা ইয়াংসি ও হোয়াংহো নদীর উৎসস্থলের মধ্যবর্তী অঞ্চল থেকে মধ্যতিব্বতে আসে আনুমানিক খ্রীষ্টপূর্ব ৪৫০০ অব্দে। সেখান থেকে ভারতে প্রবেশ করে আনুমানিক খ্রীষ্টপূর্ব ৩৩০০ অব্দে আর বর্তমান ত্রিপুরা রাজ্যের সৃষ্টি খৃষ্টপূর্ব ১২০০ অব্দে। কাজেই ৭নং অনুচ্ছেদটি কেবল বর্তমান ত্রিপুরা রাজ্যের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আর ১৯ নং অনুচ্ছেদে উল্লেখিত ‘৫০০০ বছর’ শব্দটির পূর্বে ‘খ্রীষ্টপূর্ব’ শব্দটি ব্যবহার করাই সমীচীন বলে মনে করি। কারণ এখন চলছে ২০১৩ খ্রীষ্টাব্দ, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ হয়েছিল প্রায় ২৫০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে। কাজেই বাকি ৫০০ বছরের মধ্যে চীনদেশ থেকে ভারতে এসে রাজ্যপাট করে ত্রিপুরাদের কুরুক্ষেত্র যু্দ্ধে অংশগ্রহণ করা অসম্ভব বললেই চলে।

৩. ত্রিপুরা রাজ্যের নামকরণ:

অনুচ্ছেদ ৯, ১০, ১৫, ২৬, ২৭, ২৮, ২৯, ৩০, ৩১, ৩২, ৯৪, ৯৫, ৯৬ অনুসারে প্রতীয়মান হয় যে, রাজ্যের প্রারম্ভিক নাম ছিল প্রতিষ্ঠাননগর, এরপর ত্রিবেগ, এরপর কিরাত আর অবশেষে ‘ত্রিপুরা’, যা আজোবধি বিদ্যমান। তবে রাজ্যটাকে বিভিন্ন জনগোষ্ঠী বিভিন্ন নামে আখ্যায়িত করার প্রয়াস পেয়েছেন। এমনকি রাজ্যের একাংশকে বিভিন্ন নামে (পাটিকারা, হরিকেল, চট্টলা, কুমিল্লা, ত্রিপুরা, বর্মণক) আখ্যায়িত করে সম্পূর্ণ রাজ্যটিকে গুলিয়ে ফেলেছেন।

৪. ত্রিপুরা রাজ্যের বিস্তৃতি:

অনুচ্ছেদ- ৫, ৭, ৮, ৯, ১৩, ১৪, ১৫, ১৮, ১৯, ২০, ২১, ২২, ২৭, ৩৪, ৩৬, ৩৭, ৫০, ৬৮, ৮৪, ৯৪ অনুসারে প্রতীয়মান হয় যে, প্রাচীনতম প্রতিষ্ঠাননগর (বর্তমান হরিয়ানা রাজ্যের কাছাকাছি উত্তর-পূর্ব কোথাও ছিল, তখন রাজ্যটি ছোট ছিল) থেকে বর্তমান আরাকান পর্যন্ত বিবেচনা করলে ত্রিপুরা রাজ্যের বিশালতা খুঁজে পাওয়া যায়। যদিও বর্তমান রাজ্যটির আয়তন মাত্র সাড়ে ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার। একটা বিষয় জেনে রাখা দরকার যে, তৎকালীন ত্রিপুরা মহারাজারা জ্যেষ্ঠ পুত্র অথবা সবচেয়ে বুদ্ধিমান পুত্রকে রাজ্যের শাসনভার অর্পণ করে অন্যান্য রাজকুমারদের রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলের দায়িত্বে নিয়োজিত করতেন। এতে পিতা মারা গেলে সেসব অঞ্চলের রাজকুমাররা নিজেদের স্থানীয় রাজা হিসেবে ঘোষণা করতেন। ফলে তারা কখনও বহিরাজ্য দখল করতেন, কখনও বহিজাতি দ্বারা তাদের রাজ্য দখল হয়ে যেত। এ বিষয়টি স্পষ্ট ধরা পড়েছে ৯, ১৫, ৩৭ নং অনুচ্ছেদে। তাছাড়া এরূপ কাহিনী ত্রিপুরা রূপকথা, গল্প, কাহিনীগুলোতেও প্রচলন আছে। কাজেই ত্রিপুরা রাজ্য কখনও সম্প্রসারিত হয়েছে আবার কখনও সংকুচিত হয়েছে।

৫. ত্রিপুরাদের ধর্মান্তর:

ত্রিপুরারা মূলত ভগবান শিবসহ চতুর্দশ দেবতায় বিশ্বাসী। এ বিশ্বাস হিন্দু ধর্মান্তরের পূর্বেও ছিল, আজও বিদ্যমান। তাদের পূজার্চনার রীতি হিন্দুদের সাথে হুবহু মিলে না, বরং চাকমা, মারমা, কোচ, গারো ইত্যাদি জাতিদের দেবতা পূজার্চনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ত্রিপুরারা প্রথমে হিন্দুধর্মে ধর্মান্তরিত হয় মহাভারতের যুগে, এরপর বৌদ্ধধর্মে ধর্মান্তরিত হয় ৭ম-একাদশ শতাব্দীতে, মুসলিমধর্মে ধর্মান্তরিত হয় মধ্যযুগে, যখন ত্রিপুরার অধিকাংশ অঞ্চল মুসলিম শাসনে চলে যায় আর খ্রীষ্টানধর্মে ধর্মান্তরিত হয় ইউরোপীয়দের আগমনের বহু বছর পর। এরূপ ধর্মান্তরিত হওয়া এবং অন্য জাতিতে মিশে যাওয়া আজও চলমান। এর ফলে একেক সময় ত্রিপুরা জাতির একেক অংশ অন্য জাতিতে রূপান্তরিত হয়ে বিলীন হয়ে গেছে অথবা নতুন নতুন জাতি সৃষ্টিতে মুখ্য ভুমিকা পালন করেছে। এসবের প্রমাণ মেলে ৬, ১৬, ২৪, ৪৫, ৪৭, ৪৬, ৫৯, ৬৪, ৪৯, ৮৪, ৮৫, ৮৬, ৮৭, ৮৯, ৯১ নং অনুচ্ছেদগুলোতে। এরপরও যারা ত্রিপুরা জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী ছিলেন, তারাই স্বকীয় বৈশিষ্ট্য বজায় রেখে যুগ যুগ ধরে ত্রিপুরা জাতির অস্তিত্বকে টিকিয়ে রেখেছেন। তাই আজও আমরা দেখতে পাই, বোরোল্যান্ডসহ আসামে ৩ লক্ষাধিক, ত্রিপুরায় ১৩ লক্ষাধিক, বাংলাদেশে কমপক্ষে আড়াই লক্ষ, মিজোরামে দেড় লক্ষাধিক, বার্মায় ৩০-৩২ হাজার, মেঘালয়ে অর্ধ লক্ষাধিক, আর অন্যান্য রাষ্ট্রে ছড়িয়ে ছিটিয়ে প্রায় ১০ হাজার ত্রিপুরা স্বগৌরবে বসবাস করছে।

৬. ত্রিপুরাদের নিয়ে কিছু ঐতিহাসিক ভুল:

ড. নীহাররঞ্জন রায় তার ‘বাঙ্গালীর ইতিহাস’ গ্রন্থে প্রাচীন বাংলার মানচিত্রে বর্তমান ত্রিপুরা রাজ্যকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন, যা আদতেই সঠিক নয়। বরং ঐতিহাসিক সত্য যে, উনবিংশ শতাব্দীতেও বাংলাদেশের অনেক অঞ্চলই স্বাধীন ত্রিপুরা রাজ্যভুক্ত ছিল। আবার উপমহাদেশের কিংবদন্তী দুই শিল্পী শচীন দেববর্মন ও রাহুল দেববর্মনকে বাঙালি বলে চালিয়ে দিতে চান ৯৯% বাঙালি। অথচ তারা দুজনই ছিলেন ত্রিপুরা এবং ত্রিপুরা রাজপরিবারের সদস্য। তাছাড়া দেববর্মন বা দেববর্মা, টাইটেল কেবল ত্রিপুরা রাজপরিবারের সদ্স্য ও তাদের আত্মীয়-স্বজন ছাড়া অন্য কোন জাতি ব্যবহার করেনা। বর্তমান বলিউডের দুই অভিনেত্রী রাইমা সেন ও রিয়া সেন মূলত ত্রিপুরা বংশোদ্ভূত। কারণ তাদের বাবা ভরত দেববর্মন হচ্ছেন ত্রিপুরা রাজপরিবারের সদস্য। কলকাতায় এখনো ত্রিপুরা রাজপরিবারের বাংলো আছে। সেখানে থাকাকালীন অবস্থায় মূলত ভরত ও মুনমুন সেনের পরিচয়, এর পর বিয়ে হয়। যেহেতু মা মুনমুন সেন এবং মাতামহী সুচিত্রা সেন ছিলেন অভিনেত্রী। তাই রাইমা ও রিয়া দুজনই অভিনয় জগতে এসে মায়ের বংশের পরিচয়ে পরিচিত হওয়ার প্রয়াস পেয়েছেন। এভাবে আরও ভুরি ভুরি উদাহরণ দেয়া যাবে। উদাহরণস্বরূপ, পাল বংশ মূলত তিন জাতির ছিল:

১) কামরূপ পাল রাজবংশ

২) বাঙালি পাল রাজবংশ

৩) কুমিল্লাকে (ত্রিপুরা) কেন্দ্র করে গড়ে উঠা বৌদ্ধ পাল রাজবংশ। তাই অনেক ইতিহাসবিদ এদেরকে এক মনে করে ইতিহাস রচনা করে ঐতিহাসিক ভুল করেছেন। আবার রাঙ্গামাটি নামে তিনটি স্থানের নাম পাওয়া যায়:

ক) পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটি

খ) ত্রিপুরা রাজ্যের প্রাচীন রাজধানী উদয়পুরের (বর্তমানে এ নামটিই বহাল আছে) পূর্ব নাম ছিল রাঙ্গামাটি (এ নামটি এখনও প্রচলন আছে)

গ) সুবর্ণগ্রামের (সোনারগাঁ) সংলগ্ন একটি এলাকার নাম রক্তমৃত্তিকা, যা পরবর্তীতে ঐতিহাসিকদের লেখনীতে রাঙ্গামাটি রূপ ধারন করেছে। এই তিনটি স্থানকে এক মনে করে ইতিহাস রচনা করে অধিকাংশ ইতিহাসবিদ চরম ঐতিহাসিক ভুল করেছেন। তারা এই তিনটি স্থানকে গুলিয়ে ফেলেছেন। তাই অনেক ইতিহাসবিদই ত্রিপুরা মহারাজা হামতরফার ৫৯০ খ্রীষ্টাব্দে “বঙ্গ বিজয়”কে রাঙ্গামাটি বিজয় এবং বর্তমান রাঙ্গামাটিতে ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী স্থাপন বলে চালিয়ে দেওয়ার প্রয়াস পেয়েছেন। অথচ হামতরফার বঙ্গবিজয় ছিল সেই সুবর্ণগ্রাম সংলগ্ন ‘রক্তমৃত্তিকা’সহ সম্পূর্ণ বঙ্গ জনপদ আর সেই সময়ে মূলত ত্রিপুরার রাজধানী উদয়পুরে (তৎকালীন রাঙ্গামাটি) স্থাপিত হয়েছিল। তাছাড়া ত্রিপুরার ইতিহাসে বাংলাদেশের বর্তমান রাঙ্গামাটি কোন কালেও রাজধানী ছিল না। আবার, এখন যদি বলি বাংলাদেশের ইতিহাসে আলোচিত কম্বোজ, চন্দ্র, দেব, বর্ম, পাল (কুমিল্লাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা) রাজবংশ মূলত স্থানীয় ত্রিপুরা অধিপতি কর্তৃক সৃষ্ট এবং মূলত ত্রিপুরা মহারাজার দুর্বলতার সুযোগে তাদেরই অভ্যুত্থান ঘটেছে, তাহলে ৯৮% বাঙালিই বিশ্বাস করতে চাইবে না। কিন্তু খুব ধৈর্য্য সহকারে বুঝতে চেষ্টা করলে বিষয়টা বোধগম্য হবে।

#২৪ নং অনুচ্ছেদে বর্ণিত হয়েছে যে, ষষ্ঠ শতকে বৌদ্ধধর্ম ত্রিপুরা রাজ্যে বিস্তার লাভ করেছে এবং তা কেবল ঢাকা-ত্রিপুরায় (কুমিল্লা) সীমাবদ্ধ। ৪০ নং অনুচ্ছেদে বর্ণিত হয়েছে পাল বংশের কোন মুদ্রা আজ পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি। ৪১ নং অনুচ্ছেদে কামরূপ রাজ্য আক্রমণের কথা বলা হয়েছে। আবার চর্যাপদের অন্যতম লেখক ডোম্বীপা ছিলেন ত্রিপুরা রাজা। অথচ তিনি রাজ্য শাসনে মনোযোগী না হয়ে দেশে দেশে পরিভ্রমণ করে ধর্মীয় কাজ করতেন।

#২৫ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, দেববংশীয় রাজাদের রাজধানী এখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি এবং তাদের শাসনকাল সম্পর্কে কোন সঠিক তথ্য নেই। অথচ চাঁদপুরের ত্রিপুরারা এখনো দেব টাইটেল ব্যবহার করে।

#৩৩ নং অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে, দেববর্মা ও দেব খড়গ একই হতে পারেন, কিংবা খড়গ বংশের রাজারা কারও প্রতিনিধি হতে পারেন, তাই তাদের কখন ও স্বাধীন রাজবংশ ছিল না। অথচ একমাত্র ত্রিপুরা রাজপরিবারের সদস্যদের ক্ষেত্রে ‘দেববর্মন’ বা ‘দেববর্মা’ টাইটেল ব্যবহার করতে দেখা যায় যা আজোবধি বিদ্যমান।

#৪২ নং অনুচ্ছেদে বর্ণিত হয়েছে, কম্বোজদের তিনজন রাজার নাম ছাড়া কিছুই জানা যায়নি এবং কম্বোজরা মূলত লুসাই পাহাড় ও ব্রহ্মদেশীয় সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বসবাস করতো। অথচ তৎকালীন এসব অঞ্চলেই ত্রিপুরাদের বসতি ছিল যা আজোবধি মিজোরাম ও বার্মায় বিদ্যমান।

#৪৩ নং অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে. চন্দ্রবংশীয় রাজারা প্রথমত ভূ-স্বামী ছিলেন, তাদেরই একজন পরে বরিশাল ও পার্শ্ববর্তী এলাকার নৃপতি হন। অথচ উৎস- ৩, ৪, ৭ সূত্রে প্রদত্ত প্রাক-মধ্যুযুগের ত্রিপুরা মানচিত্রে সুন্দরবন পর্যন্ত ত্রিপুরা রাজ্যের বিস্তৃতি দেখা যায় আর বহু ইতিহাসবিদ এবং ‘রাজমালা’ সূত্রেও বিষয়টা ধরা পড়ে।

#৪৪ নং অনুচ্ছেদে বর্ম রাজবংশের ইতিহাস পুনর্গঠন সম্ভব নয় বলে মত প্রকাশ করা হয়েছে। অথচ ত্রিপুরা তথা বোডো জাতির একটা অংশ আজ বর্মন নামে পরিচিত। যদিও তারা তাদের মাতৃভাষা ভুলতে বসেছে এবং বাংলা ভাষায় অভ্যস্ত হচ্ছে।

#২৯ নং অনুচ্ছেদে ত্রিশুল অংকিত মুদ্রার কথা বলা হয়েছে। অথচ সেই তাম্রশাসন থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত ত্রিপুরা রাজ্যের মুদ্রায় সব সময় ত্রিশুল চিহ্ন ব্যবহার করা হয়েছে। কাজেই এটা স্পষ্ট যে, তৎকালীন ত্রিপুরা মহারাজাদের দুর্বলতার সুযোগ কিংবা ডোম্বীপার মতো মহারাজাদের রাজকর্মে উদাসীনতার কারণে স্থানীয় ত্রিপুরা অধিপতিরা নিজেদেরকে রাজা ঘোষণা করে রাজ্যের বিভিন্ন অংশ শাসন করতে থাকেন। কিন্তু তাদের এসব কাজকর্মের অবসান ঘটে মহারাজা সেংথুমফা (১২৩০-১২৫০) সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার পরপরই। উৎস-৩ থেকে জানা যায়, তিনি বিশেষ পরাক্রমশালী ছিলেন বলে ত্রিপুরা রাজ্যের সীমানা মেঘনা নদীর তীর পর্যন্ত বিস্তার করেছিলেন। কিন্তু বরিশাল ও এর আশেপাশের অঞ্চলগুলো হাতছাড়া হয়ে যায় মুসলিম শাসকদের অধিকারে চলে যাওয়ায়। এর ফলে তৎকালীন বঙ্গদেশে এবং ত্রিপুরা রাজ্যে বৌদ্ধ রাজাদের শাসনের অবসান ঘটে। সুতরাং আলোচিত রাজবংশসমূহ মূলত ত্রিপুরা রাজ্যের স্থানীয় অধিপতিদের দ্বারা উদ্ভূত বলে আমরা ধরে নিতে পারি যার স্পষ্ট প্রমাণ ২৭, ৮৪, ৯৩ নং অনুচ্ছেদে। যদি তাই হয়, তাহলে বাংলাদেশের ইতিহাস এখনও অসামঞ্জস্যপূর্ণ বললে খুব বেশি কটুক্তি হবে না।

উপরিউক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে একথা বলতে দ্বিধা নেই যে, ত্রিপুরারা ত্রিপুরা রাজ্য থেকে; চাকমা, মারমা, রাখাইনরা, আরাকান থেকে; গারোরা আসামের গারো পাহাড় থেকে; কোচেরা কুচবিহার থেকে; মনিপুরীরা মনিপুর রাজ্য থেকে বাংলাদেশে আগত ইত্যাদি বলে যে প্রচারণা চালনো হচ্ছে তা নিছক রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত কিংবা এদেশে আদিবাসীদের স্বীকৃতি দান থেকে রেহাই পাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা ছাড়া কিছুই নয়। যদি তাই হতো তাহলে আমরা ও বলতে পারি যে, বাঙালিরা ‘বঙ্গ’ থেকে বাংলাদেশে আগত। স্বয়ং দিপুমনিও সে কথা বলেছেন- “প্রাচীন বঙ্গ ভূ-খন্ডই আজ স্বাধীন বাংলাদেশ।“ অথচ বঙ্গ ছিল একটি ক্ষুদ্র জনপদ মাত্র, সম্পূর্ণ বাংলাদেশ বঙ্গ জনপদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না। দিপুমনি ইতিহাসের ছাত্রী নন, কিন্তু অল্প বিদ্যায় ইতিহাসবিদ সাজার চেষ্টা করেছেন। তার মতো অল্প বিদ্যার জ্ঞানীরাই আজ শাসনকর্তার আসনে বসে বসে জাতিকে ধোকা দিচ্ছেন, জাতির সাথে মিথ্যাচার করছেন।

সকল জ্ঞানী-বিজ্ঞানীরাই জানেন যে, পৃথিবীর আদিতে মাত্র তিনটি জাতি বাস করতো- মঙ্গোলীয়, নিগ্রোয়েড ও ককেশীয়। এদের থেকে পরে তিব্বতী বর্মন, ভোটচীন, আর্য, অষ্ট্রিক, দ্রাবিড়, নিগ্রো ইত্যাদি জাতির জন্ম হয়। বাংলাদেশে আদিম অধিবাসী বলতে মূলত মঙ্গোল (তিব্বতী বর্মন, ভোটচীন), অষ্ট্রিক ও দ্রাবিড় জাতিকে বোঝায়। অষ্ট্রিকভাষী খাসিয়ারা এখনো টিকে আছে, তিব্বতী বর্মণ ও ভোটচীন (ত্রিপুরা, গারো, বর্মন, চাকমা, মারমা, বম, লুসাই ইত্যাদি) জনগোষ্ঠী সংখ্যালগু হলেও এখনো তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। কিন্তু দ্রাবিড়! বাংলাদেশে দ্রাবিড় জাতি বিলুপ্ত বললেই চলে। মূলত অষ্ট্রিক, দ্রাবিড়, মঙ্গোল, বহির্দেশ থেকে আগত আর্য, তুর্কি, আফগানীম আরবীয়, পাঠান ইত্যাদি জাতির মিশ্রণে আজ বাঙালি জাতির সৃষ্টি। এ বিষয়টি স্পষ্ট ধরা পড়ে প্রথিতযশা গবেষক ড. আহমদ শরীফের বক্তব্যে – “আমাদের গায়ে আর্যরক্ত সামান্য, নিগ্রো-রক্ত কম নয়, তবে বেশী আছে দ্রাবিড় ও মঙ্গোল রক্ত অর্থাৎ আমাদেরই নিকট জাতি হচ্ছে কোল, মুণ্ডা, সাওতাল, নাগা, কুকী, তিব্বতী, কাছারী, অহম প্রভৃতি।” (উৎস-১৯)

কথা বললে যেমন কথা বাড়ে, তেমনি লিখতে থাকলে লেখার উপাদান ‍ও বাড়তে থাকে। তবে অল্প লেখায় বিষয়টি বোঝানো গেলে বেশি লেখার প্রয়োজন পড়ে না। কাজেই আদিবাসী ইস্যু নিয়ে এতো গালভরা মিথ্যা বক্তব্য না দিয়ে, আই.এল. ও. কনভেনশনের ধারায়, উপধারায় বা সনদে কি লেখা আছে তা বিশ্লেষণ করে করে অলস সময় না কাটিয়েও প্রকৃত ইতিহাসের আলোকে আদিবাসীদের স্বীকৃতি দেওয়া বাঞ্ছনীয়। কারণ আদিবাসীরা হচ্ছে বাঙালি জাতির “পুর্বপুরুষ”।

তথ্যসূত্র:

১. নীহাররঞ্জন রায়, বাঙ্গালীর ইতিহাস

২. ড. মুহাম্মদ আবদুর রহিম, ড. আবদুল মমিন চৌধুরী, ড. এ.বি.এম. মাহমুদ, ড. সিরাজুল ইসলাম, বাংলাদেশের ইতিহাস

৩. প্রভাংশু ত্রিপুরা, ত্রিপুরা জাতির ইতিহাস ও সংস্কৃতি

৪. শ্রী শ্রী আনন্দমূর্তি, মহাভারতের কথা

৫. শোভা ত্রিপুরা, ত্রিপুরা জাতি

৬. ড. সৌমিত্র শেখর, বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জিজ্ঞাসা

৭. INDEPENDENT TWIPRA MANIFESTO

৮. DONG (Buisu Festival-2009)

৯. শক্তিপদ ত্রিপুরা, সমাজ ও সংস্কৃতিঃ ত্রিপুরা আদিবাসী প্রেক্ষিত (বাংলাদেশে ত্রিপুরা জনজাতি)

১০. সুরেন্দ্র লাল ত্রিপুরা, ত্রিপুরা ভাষা ও সাহিত্য (বাংলাদেশে ত্রিপুরা জনজাতি)

১১. মথুরা ত্রিপুরা, ত্রিপুরাঃ বাংলা সাহিত্যের উর্বরভূমি (বাংলাদেশে ত্রিপুরা জনজাতি)

১২ সলিল রায়, ত্রিপুরা জাতির পূর্ব পরিচয় (বাংলাদেশে ত্রিপুরা জনজাতি)

১৩. বরেন ত্রিপুরা, বাংলাদেশের ত্রিপুরা আদিবাসী তথা উপজাতি প্রসঙ্গে (বাংলাদেশে ত্রিপুরা জনজাতি)

১৪. সুরেন্দ্র লাল ত্রিপুরা, ত্রিপুরা একটি জাতি (বাংলাদেশে ত্রিপুরা জনজাতি)

১৫. এস. ডি. ত্রিপুরা, ত্রিপুরা-ভারত অন্তর্ভুক্তি চুক্তি: আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে মূল্যায়ন (EMANG)

১৬. হীরা চরণ নার্জিনারী, আত্মঘাতী বোডো জাতি (Santua Journal)

১৭. অজিত দেব (ত্রিপুরা), চাঁদপুরের ত্রিপুরা অধিবাসীদের সম্পর্কে প্রতিবেদন (EMANG)

১৮. রাজিব ত্রিপুরা, ইতিহাস ও শিক্ষা (EMANG)

১৯. সজীব চাকমা, কোথায় পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী আর কোথায় নরসিংদীর উয়ারী বটেশ্বর! (জুম)


লেখক: মুকুল ত্রিপুরা, সাবেক শিক্ষার্থী, ইন্টারন্যশনাল বিজনেস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

3 COMMENTS

  1. “এডমিনের সুদৃষ্টি কামনা করছি”

    আমার লেখাটি মূল্যায়ন পূর্বক প্রকাশ করায় “জুম জার্নাল”-এর প্রকাশনা পরিবারকে অশেষ কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন। লেখাটি লিখেছিলাম ২০১৩ সালে তখনকার জুম প্রকাশনার জন্য এবং এটি ছাপানোও হয়েছিল। প্রায় দীর্ঘ ৪ বছর পর এটি অনলাইন ভার্সনে রূপান্তরিত হয়েছে জেনে দারুণ খুশি হলাম।

    ২০১৩ সালে ম্যাগাজিনে ছাপানো লেখাতে অনেকগুলো শব্দ ও বাক্য মিসিং ছিল, যার ফলে যা বুঝাতে চেয়েছিলাম, সেটি না হয়ে অন্য আরেকটি অর্থের রূপ ধারণ ফেলেছিল। আমার মনে হয়, সেটি প্রিন্টিং মিস্টেক ছিল। তাই পুরনো লেখাটা পেয়ে বেশ সময় করে কয়েকবার পড়লাম। ভেবেছিলাম, হয়তো পূর্বের মিস্টেকগুলো আর থাকবে না। কিন্তু মিস্টেকগুলো একই র‍য়ে গেছে। তাই কিছুটা চিন্তায় পড়ে গেছি। কারণ, যেহেতু অনলাইনে যুক্ত থাকা যেকোনো ব্যক্তি মাত্রই এটি পড়বেন, কাজেই মিসিং শব্দ ও বাক্যের কারণে লেখাটি তাদের কাছে এতটা বোধগম্য নাও হতে পারে। ফলে লেখাটি যে উদ্দেশ্যে প্রকাশিত হয়েছে, সেটি হয়তো অর্থপূর্ণ নাও হতে পারে।

    আমার মনে হয়, প্রকাশকের কাছে লেখাটির আসল কপি সংরক্ষিত নেই। কাজেই মিসিং শব্দ ও বাক্যগুলো বের করা তার একার পক্ষে কখনই সম্ভব নয়। তাই, লেখাটির আসল কপির লিঙ্কটা এখানে দেওয়া শ্রেয় মনে করছি। লেখাটির আসল কপির লিঙ্কঃ https://www.facebook.com/mukul.tripura.5/posts/1277187129046858

    যেহেতু অনলাইন ভার্সনগুলো সংশোধনযোগ্য, কাজেই আমার প্রদত্ত লিংক থেকে লেখাটি হুবহু কপি-পেস্ট করে সংশোধিত করে নিতে খুব একটা অসুবিধা হবে না বলে মনে করি। পাঠকদের জন্য অন্তত এতটুকু সহায়ক ভূমিকা রাখার ইচ্ছা পোষণ করাটা বোধয় আমার অপরাধ হবে না। সকলকে অশেষ ধন্যবাদ। সবাই সুস্থ থাকবেন আর সেইসাথে জ্ঞান চর্চা করবেন।

    • ধন্যবাদ আপনাকে আমাদেরকে সঠিক তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করার জন্য।

      • লেখাটিতে সংশোধনী আনায় এডমিনসহ “জুম জার্নাল”-এর প্রকাশনা পরিবারকে অশেষ ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here