তোমায় নিয়ে

0
45

বৃষ্টি নেমেছে আজ আকাশ ভেঙ্গে
হাঁটছি আমি মেঠো পথে,
মনের ক্যানভাসে ভাসছে তোমার ছবি
বহুদিন তোমায় দেখি না যে।

তোমায় নিয়ে কত স্বপ্ন আজ কোথায় হারায়
পুরোনো গানটার সুর আজ মোরে কাঁদায়।

তুমি তো দিয়েছিলে মোরে কৃষ্ণচূড়া ফুল
আমি তো বসেছিলাম নিয়ে শুধু গানের সুর,
তুমি তো দিয়েছিলে মোরে কৃষ্ণচূড়া ফুল
চলে গেছ কোথায় আমায় ফেলে বহুদূর…….বহুদূর।

গানের কথা: অর্থহীনের সুমনের গাওয়া গান।

 

Tandra Chakma and Tatu Roy
তন্দ্রা চাকমা, অজন্তা তালুকদার এবং তাতু রায়, ছবি: তন্দ্রা চাকমা

হ্যাঁ তোমাকে নিয়ে আজ লেখার এইদিন। এইদিনটা শুধু তোমার জন্য। কেমন আছ তুমি সেই দেশে যেখান থেকে কেউ কখনও ফিরে আসেনি? অনেকে সেখানে গেছে জানিনা তোমার সাথে দেখা হয়েছে কিনা! তুমি কি সেই আগের মত আছ না বেশ বদলে গেছ? আজ আমি বলব সবাইকে কেমন ছিলে তুমি পাবলিক ফিগার হওয়ার আগে।

আমি হওয়ার পরপরই তুমি জন্মেছিলে। বড় হয়েছি যমজদের মত। সবাই বলত তন্দ্রা/তাতু বা তাতু/তন্দ্রা। আমাদের সময়ে যারা আশেপাশে ছিলে তাদের কাছে একথা সবার জানা আছে। নতুনদের হয়ত জানা নাও থাকতে পারে। আমাদের আত্মীয়, বন্ধু ও শিক্ষকরা পর্যন্ত একই ভুল করত। আমরা কার্বন কপি ছিলাম না তবু কেন এই ভুল জানিনা! আমাকে তোমার তোমাকে আমার নাম ধরে ডাকাডাকি বেশ মজা পেতাম, তুমিও পেতে আমি জানতাম। এই সেদিনও একজন ডাকছিল তোমার নাম ধরে। আমার মনে আছে আমরা দু’জনে এটা বেশ উপভোগ করতাম। প্রতিরাতে ঘুমানোর আগে মানুষের ডাকাডাকির পর্বটা অভিনয় করে একচোট হেসে নিতাম। এই ছিল আমাদের জীবন। বেশতো চলছিল জীবনটা কিন্তু এই ছন্দের পতন তোমার জীবনের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা দিয়ে, যার শুরু ১৯৮৯ সালের ২৬শে ফেব্রুয়ারী। তোমার সংসার জীবন। তুমি চলে গেলে পাবলিক ফিগার হতে, আমি পরে রইলাম। কি করব? কি হবে আমার? এইসব নিয়ে তখনও ভাবিনি আমি। আমি আসলে তখন ভাবিনি কখনো মাঠে ঘাটে ঘুরব, লেকচার দিয়ে বেড়াব এখানে ওখানে। প্রতিবাদ সভায় যাব, প্রতিবাদ করব, লিখব নিজের ইছেমত যা ভাল লাগে তাও টিভিতে টকশো করব। কারণ ছোটবেলা থেকে আমি শুনতাম, তোমার দ্বারা কিছু হবে না, তুমি সেদাম ছাড়া, না পারো সেলাই করতে, না পারো ভাল নাস্তা বানাতে। আমি এইসব শুনতাম কিন্ত বিশ্বাস করতাম না।

Tatu Roy
তাতু রায়, ছবি: তন্দ্রা চাকমা

তুমি যখন পাবলিক ফিগার হলে আমাকে তখন সবাই ভুলে গেছে। আমি কি হব তা নিয়ে বেশি মাথা ব্যথা ছিল না। সেই সময়টা কেবল আমি কি হব তা ভাবার সময় পেলাম। মনের সুপ্ত বাসনা অনেক অপূর্ণ থেকেছে কিন্তু করতে পেরেছি যা করতে চেয়েছিলাম তা। ছোটবেলা থেকে অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করতাম। করেছি অনেক এখনও করে যাচ্ছি। অসহায়ের পাশে সবসময় ছিলাম এখনও আছি, চিরকাল থাকব। এত গেল নিজের কথা এবার আসি দুজনের কথায়।

দু’জনে আমরা অনেক মজা করতাম। সেই মজার সবটাই বাবা মাকে বলতাম না। তবে সেইসব যে ক্ষতিকারক নয় তা আমরা বুঝতাম। তার একটা ঘটনা আজ না বললেই নয়। কোন এক রোজার ছুটিতে খেলার সাথীদের সাথে প্ল্যান করলাম ফাংসন ফাংসন খেলার। বাসা থেকে আমারা মায়েদের শাড়ি নিয়ে একজনের বাসার খালি বারান্দায় ষ্টেজ সাজান হলো। তার আগে এক সপ্তাহ ধরে মহড়া হলো কি হবে সেটা। তবে কেউ শিল্পী ছিলাম না, যার যতটুকু গুণাগুণ আছে তা ঢেলে দিলাম। আহা কি সেই গান। হাহাহাহা…, গান গাওয়া হত চার লাইনের, কি সুর কি তাল তা আমরা জানিনা। পরে করেছিলাম নাটক। নাটক না ছাই ১০ মিনিটের সেই নাটকের বিষয় ছিল টিচার টিচার খেলা। স্কুলে যেই টিচার আমাদের অপ্রিয় ছিল তার ক্লাস নেওয়া অনুকরণ করা। কে কত মনের মাধুরী মিশিয়ে অভিনয় করে সবাইকে দেখাতে পারে সে নিয়ে প্রতিযোগিতা। অনেক মজার ছিল সেইদিনগুলি।

Devasish Roy and Tatu Roy
দেবাশীষ রায় এবং তাতু রায়, ছবি: তন্দ্রা রায়

পাবলিক ফিগার হওয়ার পর তুমি বেশ জনপ্রিয় ছিলে সবার কাছে। তোমার কত নাম ডাক। তোমার তো গুণের শেষ নেই। তুমি জুতা সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ সবই পারতে। আর সময়ের আগে সব ভাবতে আর কোন যাদু মন্ত্র বলে করেও ফেলতে। আমি জানতাম অনেকের তা ভাল লাগত না। কিন্তু তোমার সাথে পেরে উঠা সাধ্যি কার! তুমি তো তুমিই। তুমি অদ্বিতীয়া, তাই বোধ হয় নিয়তি তোমাকে এক কঠিন অসুখ দিয়ে পরীক্ষা করেছিল। তুমি এইবার হেরে গেলে একটা ছোট্ট জীবাণু হেপাটাইটিস সি এর কাছে। যেদিন কোমায় চলে গেলে সেদিন কাউকে না ভুগিয়ে চলে গেলে না ফেরার দেশে। এতদিন পর আমার মনে হচ্ছে তুমি হারনি। তুমি অদ্বিতীয়া, তুমি হারবে কি করে? তুমি সর্বজয়া, তাই তোমাকে স্মরণ করি এই দিনে। মনের ক্যানভাসে তুমি উজ্জ্বল ছবি। এই ১৯ বছরে অনেক কিছু বদলেছে, কিন্তু বদলায়নি তোমার সাথে আমাদের আত্মিক সম্পর্ক।

তাতু: মৃত্যু ১৫ই নভেম্বর ১৯৯৮ সাল।

নোট: তাতু চাকমা পরে তাতু রায় আমার ছোট বোন। চাকমা রাজা দেবাশীষ রায়ের প্রয়াত স্ত্রী, বর্তমান যুবরাজ Trivuban Aryadev Roy ও রাজকুমারী Aradhana Ayetri Srestha এর মা।


তন্দ্রা চাকমা

১৪ই নভেম্বর ২০১৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here