জুম্মবির অতীত কথা ও স্মৃতি

0
82

জুম্ম ঘরে জন্ম হওয়াতে তার নাম জুম্মবি। জুম্মবির তেরোটি জাতিসত্ত্বার দশ ভাষার ছোট একটি দেশ জুম্ম দেশ। দশ ভাষায় কথা বলাতে তাকে ভাষাবিও ডাকা হয়। চার দিকে সবুজ সবুজ মুড়ো ও পাহাড় নিয়ে জুম্মবির জুম্মদেশে প্রধানত বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী সাইনো তিব্বতী মঙ্গোলয়ড ১৩টি জাতিগোষ্ঠী এখানে ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে এই অঞ্চলে এসে বসবাস শুরু করেছে। প্রায় ৫,০০,০০০ (পাঁচ লক্ষ) জনসংখ্যার অধিবাসী জুম্মজাতি প্রধান দু’টি হলো চাকমা এবং মারমা। এরা ছাড়াও আছে ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, লুসাই, পাংখো, ম্রো, খিয়াং, বম, খুমি, চাক, গুর্খা, আসাম।

খুব সুখে ছিল সেখাানে তারা। জুম্মবির জুম্মদেশে দশ ভাষাভাষী তেরোটি জাতি ছাড়া অন্য কোন জাতি ছিল না। ১৫৫০ সালের দিকে প্রণীত বাংলার প্রথম মানচিত্রে বিদ্যমান ছিল। তবে এর প্রায় ৬০০ বছর আগে ৯৫৩ সালে মগধের চম্পক নগরের রাজা উদয়গিরি এই অঞ্চল অধিকার করেন। ১২৪০ সালের দিকে ত্রিপুরার রাজা এই এলাকা দখল করেন। ১৫৭৫ সালে আরাকানের রাজা এই এলাকা পুনর্দখল করেন এবং ১৬৬৬ সাল পর্যন্ত অধিকারে রাখেন। মুঘল সাম্রাজ্য ১৬৬৬ হতে ১৭৬০ সাল পর্যন্ত এলাকাটি সুবা বাংলার অধীনে শাসন করে। ১৭৬০ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এই এলাকা নিজেদের আয়ত্তে আনে। ১৮৬০ সালে এটি ব্রিটিশ ভারতের অংশ হিসাবে যুক্ত হয়। ব্রিটিশরা এই এলাকার নাম দেয় চিটাগাং হিল ট্র্যাক্ট্‌স বা পার্বত্য চট্টগ্রাম। এটি চট্টগ্রাম জেলার অংশ হিসাবে বাংলা প্রদেশের অন্তর্গত ছিল। ১৯৪৭ সালে এই এলাকা পূর্ব পাকিস্তানের অংশ হয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এটি বাংলাদেশের জেলা হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৮০ দশকের শুরুতে পার্বত্য চট্টগ্রামকে তিনটি জেলা – রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে বিভক্ত করা হয়।

চাকমাদের ভাষার নামও চাকমা (চাংমা)। চাকমাদের নিজস্ব বর্ণমালা রয়েছে। চাকমারা ৪৬টি গুত্তি বা গোষ্ঠীতে বিভক্ত। চাকমা শব্দটি সংস্কৃত শব্দ শক্তিমান থেকে আগত। তবে বার্মায় প্রচলিত চাকমাদের নাম সংক্ষেপ “সাক” শব্দটি সংস্কৃত শব্দ শক্তিমানের বিকৃত রূপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এরই এক পর্যায়ে, জনগোষ্ঠীটির নাম “সাকমা” এবং পরবর্তীতে বর্তমান “চাকমা” নামটি গ্রহণযোগ্যতা পায়। ১৫৪৬ সালে আরাকান রাজা মেং বেং বার্মার সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। যুদ্ধাবস্থায় “চাকমা” রাজা উত্তর দিক থেকে তৎকালীন আরাকান, অর্থাৎ আজকের কক্সবাজারের রামু আক্রমণ করে দখল করে নেন।

ডিয়েগো ডি এস্টোর, একজন পর্তুগীজ, প্রাচীন বঙ্গ অঞ্চলের মানচিত্র তৈরি করেন। যা Descripção do Reino de Bengalla হিসেবে Quarta decada da Asia (Fourth decade of Asia) নামক বইয়ে João de Barros ১৬১৫ সালে প্রকাশ করেন। ঐ মানচিত্রে বর্তমান চট্টগ্রাম বন্দর কর্ণফুলি নদীর পূর্বতীরে “চাকোমাস” নামে একটি অঞ্চলের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। ঐ নির্দেশিত অঞ্চলটিই ছিল তখনকার চাকমাদের আবাসভূমি। পরবর্তীকালে আরাকান রাজা মেং রাজাগ্রী (১৫৯৩-১৬১২) পর্তুগীজ মানচিত্রে উল্লেখ করা চাকোমাস অঞ্চলটি অধিকারে নেন। পর্তুগীজ বণিক Philip de Brito Nicote ১৬০৭ সালের এক চিঠিতে উল্লেখ করেন যে, মেং রাজাগ্রী নিজেকে আরাকান, চাকোমাস এবং বেংগল এর সবচেয়ে শক্তিশালী রাজা হিসেবে পরিচয় দেন। আরাকানীদের কাছে পরাজিত হয়ে চাকমা জনগোষ্ঠী বর্তমান পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে চলে আসেন এবং আলেক্যাদং, বর্তমান আলীকদমে তাদের রাজধানী স্থাপন করেন। পরবর্তীতে আলেক্যাদং থেকে আরো উত্তরে সরে এসে বর্তমান চট্টগ্রাম বিভাগের রাঙ্গুনিয়া, রাউজান, ফটিকছড়ি উপজেলায় বসতি স্থাপন করেন।

Chakma Kingdom in Portuguese Map
১৬১৫ সালে পর্তুগীজদের মানচিত্রে তৎকালীন চাকমা রাজ্য #চাকোমাস, ছবিঃ ফেসবুক

১৬১৬ সালে মুঘল সুবেদার শায়েস্তা খান, আরাকানীদের পরাজিত করে চট্টগ্রাম দখলে নেন এবং চট্টগ্রামের নাম ইসলামাবাদ রাখেন। ঐ সময় মুঘল সাম্রাজ্য চট্টগ্রামের সমতল অংশগুলোই নিয়ন্ত্রণ করতো এবং চাকমারা তখনো পর্যন্ত মুঘল সাম্রাজ্যের অন্তর্গত ছিলেন না। তার কিছু সময় পর, মুঘলরা চাকমাদের কাছ থেকে চট্টগ্রামে ব্যবসা করার বিপরীতে খাজনা দাবি করতে থাকেন। এর ফলে মুঘলদের সাথে চাকমাদের বিরোধ শুরু হয়। পরবর্তীতে ১৭১৩ সালে চাকমা এবং মুগলদের মাঝে শান্তি স্থাপিত হয় এবং একটি দৃঢ় সম্পর্কের ও সূত্রপাত ঘটায় এই শান্তি স্থাপন। তারপর থেকে মুঘল সাম্রাজ্য আর কখনোই চাকমাদেরকে তাদের বৈশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করেনি। মুঘলরা একইসাথে চাকমা রাজা সুখদেব রায়কে পুরষ্কৃত করেন। সুখদেব রায় নিজের নামে রাজধানী স্থাপন করেন, যা আজো সুখবিলাস নামে পরিচিত। সেখানে আজো পুরনো রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ এবং অন্যান্য প্রাচীন স্থাপনা রয়েছে। পরবর্তীতে রাজানগরে রাজধানী স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে যা চট্টগ্রাম জেলায় রাঙ্গুনিয়া উপজেলার, রানীরহাটের রাজানগর হিসেবে পরিচিত।

১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে পরাজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়। পরবর্তী প্রায় ২০০ বছরব্যাপী ইংরেজরা বাংলা তথা সমগ্র ভারতবর্ষ শাসন করে। কিন্তু তাদের শাসনের পথ কুসুমাস্তীর্ণ হয়নি। তাদের অত্যাচার-নির্যাতন ও শোষণের বিরুদ্ধে বাংলার অধিবাসীরা বারবার প্রতিবাদ জানিয়েছে, বিদ্রোহ করেছে, যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। তিতুমীরের বিদ্রোহ, সিপাহী বিপ্লব, মাস্টারদা সূর্যসেনের চট্টগ্রামের বিদ্রোহ, নেতাজী সুভাস বসুর ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ’-এর বিদ্রোহের কথা বাংলার ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ রয়েছে। কিন্তু আলোড়ন সৃষ্টিকারী এসব বিদ্রোহ ছাড়াও ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে আরো অসংখ্য বিদ্রোহ-বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে, যেসবের ইতিহাস সম্পর্কে এদেশের অধিকাংশ মানুষই অবগত নন। এরকমই একটি ইংরেজ বিরোধী সংগ্রাম ছিল ১৭৭৭ থেকে ১৭৮৭ সালে সংঘটিত “চাকমা বিদ্রোহ“।

চাকমা বিদ্রোহ 
চাকমা বিদ্রোহ সম্পর্কে আলোচনার আগে আরও একটি চাকমাদের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস জেনে নেয়া জরুরি। চাকমারা জুম্মবির জুম্মদেশের বসবাসকারী একটি জাতি যাদের নিজস্ব শাসনব্যবস্থা বিদ্যমান। চাকমাদের রাষ্ট্রপ্রধান হলেন তাদের রাজাগণ।

বাংলার স্বাধীন সুলতানি শাসনামলে, মুঘল শাসনামলে এবং পরবর্তী স্বাধীন নবাবি শাসনামলে চাকমা রাজার সঙ্গে বাংলার সুলতান, সুবেদার এবং নবাবদের সম্পর্ক ছিল সৌহার্দ্যপূর্ণ। চাকমা রাজা বাংলার শাসকদের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছিলেন এবং বশ্যতার নিদর্শনস্বরূপ তাঁদেরকে সীমিত হারে রাজস্ব দিতে হতো। চাকমাদের সমাজ ব্যবস্থায় তখন মুদ্রার প্রচলন ছিল না। ছিল বিনিময় প্রথা। দ্রব্য বিনিময়ের মাধ্যমে তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য চলত। এজন্য চাকমা রাজা মুদ্রার পরিবর্তে দ্রব্যসামগ্রীর মাধ্যমে রাজস্ব পরিশোধ করতেন। বিনিময়ে বাংলার শাসকরা চাকমা রাজ্যের অভ্যন্তরীণ বিষয়াদিতে হস্তক্ষেপ করা থেকে সম্পূর্ণভাবে বিরত থাকতেন। তাঁদের অধীনে চাকমারা পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন ভোগ করছিল। কিন্তু পলাশীর যুদ্ধের পর পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন ঘটে। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ক্রমেই বাংলার রাজনীতির সর্বেসর্বা হয়ে ওঠে। ১৭৬০ সালে ইংরেজদের অনুগত নবাব মীর জাফর তাদের বিরাগভাজন হন এবং ইংরেজরা তাঁর জামাতা মীর কাসিমকে বাংলার নতুন নবাব পদে অধিষ্ঠিত করে। বিনিময়ে মীর কাসিম ইংরেজদেরকে বর্ধমান, মেদিনীপুর ও চট্টগ্রাম অঞ্চল প্রদান করেন। এর ফলে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম ইংরেজ কর্তৃত্বাধীনে চলে আসে। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে পর্তুগীজদের তৈরি করা পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের একটা ম্যাপ ইংরেজরা যথারীতি গণ্ডগোল শুরু করে দেয়। আগেই বলা হয়েছে, সুলতানি, মুঘল ও নবাবি শাসনামলে চাকমাদের ওপর আরোপিত রাজস্বের হার ছিল অত্যন্ত সীমিত। ১৭৬১ সাল থেকে ইংরেজরা বারবার রাজস্বের হার বৃদ্ধি করতে থাকে। শুধু তাই নয়, ইংরেজরা তাদের স্বভাব অনুযায়ী চাকমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়াবলীতে হস্তক্ষেপ করতে আরম্ভ করে দেয়। ১৭৭২-১৭৭৩ সালে ইংরেজরা চাকমাদেরকে মুদ্রার মাধ্যমে রাজস্ব প্রদান করতে বাধ্য করে এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে মুদ্রা ভিত্তিক অর্থনীতি প্রচলনের জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করে। এর ফলে চাকমাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জীবনে নানারকম সমস্যা ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। ক্রমে ইংরেজ শাসনের প্রতি চাকমারা বীতশ্রদ্ধ হয়ে ওঠে এবং তাদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়তে থাকে।

১৭৭৭ সালে ইংরেজরা পার্বত্য চট্টগ্রামের ওপর রাজস্বের হার আরো বৃদ্ধি করে এবং রাজস্ব সংগ্রহ করার জন্য ‘উদাদার’ (চুক্তিবদ্ধ ইজারাদার) নিযুক্ত করে। এসময় চাকমাদের রাজা ছিলেন ‘জোয়ান বখশ’ (তাঁর নাম কোথাও কোথাও ‘জান বখশ’ লেখা হয়েছে)। তাঁর প্রধান নায়েব ছিলেন ‘রণু খাঁ’। রণু খাঁ’র ওপরই রাজস্ব সংগ্রহ করার দায়িত্ব ন্যস্ত করা হয়েছিল। কিন্তু ১৭৭৭ সালে ইংরেজরা রাজস্বের হার আরো বাড়িয়ে দিলে তা আদায় করা রণু খাঁ’র পক্ষে সম্ভব হয়নি। নির্ধারিত হারে রাজস্ব আদায়ের জন্য ইংরেজরা রণু খাঁ’র ওপর চাপ প্রয়োগ করে। ক্ষিপ্ত রণু খাঁ বেশি রাজস্ব আদায়ের জন্য প্রজাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করার পরিবর্তে ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করাটাই সমীচীন বলে মনে করেন। ১৭৭৭ সালের এপ্রিল মাসে রাজা জোয়ান বখশের অনুমতিক্রমে তিনি বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। রণু খাঁ স্বাধীনতার ঝাণ্ডা উত্তোলন করেন এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম ও ঐ অঞ্চল ঘেঁষা নিম্নাঞ্চল থেকে ইংরেজ ও ইংরেজদের অনুগত কর্মচারীদের বিতাড়িত করেন। রণু খাঁ’র বিদ্রোহ দমনের জন্য ইংরেজ কর্তৃপক্ষ বারবার পার্বত্য চট্টগ্রামে সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করে, কিন্তু প্রতিবারই তাদের অভিযান শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়। ইংরেজদের বিপুল সংখ্যক সৈন্য ও আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের মোকাবেলা করার জন্য রণু খাঁ গেরিলা পদ্ধতিতে যুদ্ধ পরিচালনা করেন। প্রতিটি যুদ্ধে ইংরেজ সৈন্যরা চাকমা বাহিনীর কাছে পরাজিত হয়। বিশেষত ১৭৮০ সালে পরিচালিত একটি বড় মাত্রার ইংরেজ অভিযান সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিকূল ভৌগোলিক পরিবেশ, চাকমাদের অসীম সাহসিকতা এবং রণু খাঁ’র রণকৌশল – এই তিনের কাছে ইংরেজ শক্তি পর্যুদস্ত হয় এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম কার্যকরভাবেই ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ‘ভিয়েতনামে’ পরিণত হয়। ছল আর বল উভয়ই ব্যর্থ প্রমাণিত হওয়ায় ইংরেজরা শেষ পর্যন্ত কৌশলের আশ্রয় নেয়। যুদ্ধক্ষেত্রে চাকমাদের পরাজিত করতে ব্যর্থ হয়ে তারা চাকমাদের অর্থনৈতিকভাবে ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত নেয়। তারা ১৭৮১ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীরা লবণ, মাছ, শুঁটকি, লৌহজাত দ্রব্যাদি, মৃৎপাত্র প্রভৃতি আমদানি করতো চট্টগ্রাম থেকে।

ইংরেজরা এসব দ্রব্য সরবরাহ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দেয় এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের ওপর অবরোধ কঠোরভাবে আরোপ করে। বোধহয় তারা মনে মনে ভাবছিল, ‘হু হু! এইবার তোমাদের বাগে পেয়েছি, বাছাধন!’ ‘কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস এই যে, যে ইংরেজ অবরোধ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় মহা-পরাক্রমশালী জার্মান সাম্রাজ্যকে কাবু করে ফেলেছিল, সেই ইংরেজ অবরোধ চাকমাদের গায়ে ‘ফুলের টোকা’ও দিতে পারেনি। উল্টো রণু খাঁ ক্ষিপ্ত হয়ে ইংরেজদের ওপর পাল্টা অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করেন। সেসময় লবণ ব্যবসা ছিল ইংরেজদের প্রধান ব্যবসা। ভূমি রাজস্বের পর লবণ ব্যবসাই ছিল তাদের আয়ের দ্বিতীয় প্রধান উৎস। ইংরেজদের লবণ উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র ছিল চট্টগ্রামে এবং এই লবণ উৎপাদনের জন্য অতি প্রয়োজনীয় জ্বালানি কাঠের প্রায় ষোল আনাই আসত পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে। রণু খাঁ সেই জ্বালানি কাঠ সরবরাহ বন্ধ করে দিলেন! ঠিক যেন ভীমরুলের চাকে ঢিল পড়ল! ইংরেজরা দেখল এতো ভয়াবহ সর্বনাশ! চাকমাদের উচিত শিক্ষা দিতে গিয়ে তাদের নিজেদের অর্থনীতিরই বারোটা বেজে গেল। লবণ ব্যবসা থেকে তাদের প্রচুর আয় হত। তার প্রায় পুরোটাই বন্ধ হয়ে গেল। অর্থাৎ, ইংরেজদের ‘অবরোধ’ নামক অস্ত্র বুমেরাং হয়ে তাদের কপালেই আঘাত করলো! মরিয়া হয়ে ইংরেজরা আবার পার্বত্য চট্টগ্রাম দখল করার জন্য সৈন্যবাহিনী প্রেরণের সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু আবারো তারা বিপর্যয়ের মুখোমুখি হলো। ১৭৮২ ও ১৭৮৫ সালে প্রেরিত তাদের বৃহৎ দুইটি সৈন্যবাহিনী চাকমাদের হাতে বিধ্বস্ত হয়। ফলশ্রুতিতে ইংরেজদের মান-সম্মান নিয়ে নতুন করে টানাটানি পড়ে যায়। ছল-বল-কৌশল কোনোটাই তাদের কাজে এলো না।
পার্বত্য চট্টগ্রামে ইংরেজদের ব্যর্থ অভিযানসমূহ এবং চাকমাদের আরোপিত অর্থনৈতিক অবরোধের কারণে ইংরেজরা মারাত্মক সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল। ইংরেজ কর্তৃপক্ষ বুঝতে পারে যে, পরাজয় স্বীকার ব্যতীত এ যুদ্ধ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার উপায় নেই। বাধ্য হয়ে ১৭৮৭ সালে তারা চাকমা রাজার সঙ্গে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করে।

চুক্তির শর্তানুযায়ী,
(১) ইংরেজরা নির্দিষ্ট হারে রাজস্ব প্রদানের বিনিময়ে চাকমাদের অভ্যন্তরীণ স্বাধীনতা স্বীকার করে নেয়।
(২) মুদ্রার পরিবর্তে দ্রব্যের মাধ্যমে রাজস্ব প্রদানের পদ্ধতি পুন:প্রচলিত হয় এবং চাকমা রাজা ইংরেজদের বার্ষিক ৩০০ মণ তুলা রাজস্ব হিসেবে দিতে স্বীকৃত হন।
(৩) সমতলভূমি থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে অভিবাসন বন্ধ করার জন্য ইংরেজরা রাজি হয়।
(৪) আরাকানের যুদ্ধবাজ জাতিগুলোর আক্রমণ থেকে চাকমা রাজ্যকে রক্ষা করার জন্য ইংরেজরা চাকমা রাজাকে সহায়তা করবে বলে অঙ্গীকারবদ্ধ হয় এবং এ উদ্দেশ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামে কিছুসংখ্যক ইংরেজ সৈন্য মোতায়েন রাখা হয়।

এই চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ১০ বছরব্যাপী চাকমা বিদ্রোহের অবসান ঘটে। বিদ্রোহের অবসান ঘটায় ইংরেজরা স্বস্তির নি:শ্বাস ফেলে, অন্যদিকে চাকমারাও তাদের পূর্ণ অভ্যন্তরীণ স্বাধীনতা তথা স্বায়ত্তশাসন আদায় করে নিতে সক্ষম হয়।

** ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে সংঘটিত ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয়ের পর থেকে কোনো ক্ষুদ্র জাতির কাছে কোনো বৃহৎ জাতির পরাজয়কে ‘ভিয়েতনাম’-এর সঙ্গে তুলনা করা হয়। যেমন: ১৯৭৯-১৯৮৯ সালের আফগান যুদ্ধকে বলা হয় ‘সোভিয়েত ইউনিয়নের ভিয়েতনাম’। সেই অর্থে চাকমা বিদ্রোহের সময় পার্বত্য চট্টগ্রাম ছিল ইংরেজদের ‘ভিয়েতনাম’।


লেখক: তারাচরন চাকমা
সাবেক উপসচিব এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের ভাইস-চেয়ারম্যান 


*** ‘বুমেরাং’ অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের ব্যবহৃত এক ধরনের অস্ত্র, যেটিকে নিক্ষেপ করা হলে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করলে সেখানেই পড়ে থাকে, আর আঘাত না করলে আবার নিক্ষেপকারীর হাতে ফিরে আসে।
**** প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ১৭৭৬-১৭৮৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইংরেজদের পরাজিত করে স্বাধীনতা লাভ করে। প্রায় একই সময়ে (১৭৭৭-১৭৮৭) চাকমারাও ইংরেজদের পরাজিত করে অভ্যন্তরীণ স্বাধীনতা অর্জন করে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here