চাকমা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে জুমচাষ

0
92

সম্প্রতি ‘জুম’ এর রাজনৈতিক অর্থনীতি’ বিষয়ে একটি সেমিনারে যোগ দিতে গিয়ে আমি একটি বিস্ময়কর ব্যাপার নতুন করে লক্ষ্য করেছি; জুম চাকমাদের ঐতিহ্যগত জীবনধারায় বড় অংশ জুড়ে থাকলেও অধিকাংশ শিক্ষিত আদিবাসী, যারা সরাসরি জুএর সাথে জড়িত নন, তারাও অনেকে জুমের সাংস্কৃতিক মূল্য ও রাজনৈতিক অর্থনীতি সম্পর্কে পরিস্কার ধারণা রাখেন না। অ-আদিবাসীদের কথা বলাই বাহুল্য। জুম একটি সাধারণ কৃষিব্যবস্থা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে, যা ‘বন পুড়িয়ে’ পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিবেশের ক্ষতি করে চলেছে। কিংবা, এটি একটি চাকমা নৃত্যের বিষয়বস্তু, যেটি মূলত ‘অনুন্নত’ ও ‘আদিম’ বা ‘ক্ষুদ্র’ সংস্কৃতির একটি উপাদান।

কিন্তু প্রকৃতপক্ষে জুম চাকমা সংস্কৃতি ও জীবনাচরণের মূল স্তম্ভগুলির এক্টি। এটি চাকমা সংস্কৃতির বহু অমূল্য উপাদানের অন্যতম উৎস। নতুন প্রজন্মের কাছে জুমের এই সাংস্কৃতিক মূল্য তুলে ধরা না গেলে তারাও নানাবিধ উদ্দেশ্য প্রণোদিত প্রচারণার ফাঁদে পা দিতে পারে। এতে জুমকে নিয়ে গর্বের বদলে জুমিয়া পূর্বপুরুষ সম্পর্কে তাদের একটি খারাপ ধারণা গড়ে উঠবে। ফলে তারা নিজ ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি নিয়ে হীনমন্যতায় ভুগবে। এ ধারণা থেকেই এ নিয়ে লেখার তাগিদ অনুভব করেছি।


জুম প্রসঙ্গ

আদিবাসীদেরকে প্রকৃতির সন্তান হিসেবে অভিহিত করা হয়ে থাকে। প্রকৃতির সঙ্গে তাদের নিবিড় ঘনিষ্ঠতা ও মিথস্ক্রিয়তা বহুযুগের কালধারায় বিস্তৃত। পাহাড়ের প্রকৃতি নির্ভর জীবিকার সন্ধান করতে গিয়ে চাষাবাদের জন্য তারা বন-পাহাড়েরই দ্বারস্থ হয়ে এসেছে। পাহাড়কে খুব বেশি পীড়িত ও ক্ষতিগ্রস্ত না করে একটি পাহাড়ে চাষাবাদ থেকেই অধিকাংশ প্রয়োজনীয় ফসল ফলানোর জন্য জুমচাষ একটি আলোচিত পদ্ধতি যা অধিকাংশ পাহাড়ি আদিবাসী সম্প্রদায়ের প্রধান চাষাবাদ পদ্ধতি হিসেবে গৃহীত হয়েছে। বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম, ভারতের আসাম, মেঘালয়, অরুণাচল প্রদেশ, নাগাল্যান্ড, মণিপুর ও ত্রিপুরা রাজ্যে এর প্রচলন আছে। এশিয়ার অন্যান্য দেশ যেমন ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া ইত্যাদি দেশেও ব্যাপক হারে এর প্রচলন অদ্যাবধি চোখে পড়ে।

জুমচাষ এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল, একটি পাহাড়ে একবার চাষ করার পর ৫-১২ বছরের আবর্তনকাল অপেক্ষা করতে হয়। তাই জুমচাষী আদিবাসীদের পাহাড় থেকে পাহাড়ে পরিযায়ী জীবনে অভ্যস্ত হতে হয়েছে। এই চাষ পদ্ধতি তাদের জীবিকার মূল চালিকা শক্তি হওয়ায় জুমকে কেন্দ্র করে নানা মাত্রিক বস্তুগত ও অবস্তুগত সাংস্কৃতিক চেতনা ও উপাদান সৃষ্টি হয়েছে যা পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা সহ অধিকাংশ আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ প্রবন্ধে জুমকে কেন্দ্র করে চাকমা জনগোষ্ঠীর যে সাংস্কৃতিক ধারাগুলো বিকাশলাভ করেছে এবং জুমকে ঘিরে কবি-সাহিত্যিক-শিল্পী ও গবেষকগণের যে মনোভঙ্গি ও ভাবনা বিভিন্ন সৃষ্টিতে প্রতিফলিত হয়েছে, তার উপর যৎকিঞ্চিৎ আলোকপাত করা হয়েছে। এ প্রবন্ধে বিশদ আলোচনায় না গিয়ে শুধুমাত্র নির্বাচিত বিশেষ দিকগুলি সম্পর্কেই আলোচনা করা হয়েছে, যেগুলি ভাবনার ভিন্নতা যোগ করে।


চাকমা সংস্কৃতি ও জুম

‘মালেয়্যা দাগানা’ চাকমা সংস্কৃতির অন্যতম একটি ভিত্তিস্তম্ভ। গ্রামাঞ্চলে জুমের জন্য জঙ্গল কাটা, জমিতে চারা লাগান, ধান পাকলে ধান কাটা এ জাতীয় কাজে কেউ কোন কারণে পিছিয়ে পড়লে সে গ্রামবাসীদের কাছে জনবল এর জন্য সাহায্য সহযোগিতা চায়। তখন তার পাড়াপড়শিরা প্রতিবাড়ি থেকে একজন করে এসে টাকে ঐ কাজে সাহায্য সহযোগিতা করে তার কাজ সম্পাদন করে দেয়। এ জাতীয় সহযোগিতাকে চাকমা ভাষায় ‘মালেইয়্যা দাগান’ বলে। পারস্পরিকভাবে চাষাবাদের কাজে সহযোগিতার ক্ষেত্রে এটি একটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় প্রথা। জুমে কাজ করার সময় একটি পরিবারের পক্ষে স্বল্প সময়ে শেষ করা প্রয়োজন এমন কাজগুলি সম্পন্ন করা অত্যন্ত দুরূহ। দূর পাহাড়ের জুমে বাইরে থেকে শ্রমিক পাওয়া দুঃসাধ্য। তাই পারস্পরিক সহযোগিতার বন্ধন রচনা করার মধ্য দিয়ে জুমিয়া প্রথাগত সংস্কৃতি বিকশিত হয়েছে। ‘বালা দেনা’ বা ‘বালা ধারানা’ অর্থাৎ মালেইয়্যায় অংশগ্রহণ তাই টিকে থাকার একটি আবশ্যকীয় বিষয়। পাশাপাশি এটি সামাজিক বন্ধন রচনা ও সুদৃঢ় করারও ইন্ধন জুগিয়েছে। এটি সন্দেহাতীতভাবে বলা যায় যে, জুমের প্রবর্তন না ঘটলে এই অসাধারণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এই আঙ্গিকে বিকাশ ও জনপ্রিয়তা লাভ করত না।

‘উভোগীত’ চাকমা গানের একটি বিশিষ্ট ধারা। এ ধরনের গানে সাধারণত পালা করে দুজন শিল্পী অংশগ্রহণ করে থাকেন, প্রায়শ যাঁদের একজন নারী ও অন্যজন পুরুষ। এ গানের মূল উপজীব্য প্রেম ও প্রকৃতি। অনেক ক্ষেত্রে মুখে মুখে একটি বিশেষ ঢং ও সুরে চলতি বিষয়ের সাথে বিভিন্ন উপমার প্রয়োগে এ গান রচিত হয়ে থাকে। তরুণ তরুণীদের মনের ভাব প্রকাশের একটি গীতিময় উপায় হিসেবেও এটির সমাদর রয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ গানের কথাগুলি প্রেমরসে পূর্ণ হয়ে থাকে। তাই চাকমা জনপদে গ্রামের অভ্যন্তরে ঐতিহ্যবাহী এই উভোগীত গাওয়া সাধারণভাবে নিষিদ্ধ। তবে সঙ্গীসাথীদের নিয়ে জুমের কাজে বা বিশ্রামের সময় হঠাৎ কোন যুবক প্রেমরসাত্মক উভোগীত গাইতে শুরু করলে তারা উল্লাসিত হয়ে তাকে উৎসাহ দেওয়ার জন্য ‘এ হো হো হো’ করে উল্লাসধনি ‘রেইং’ দিয়ে উঠত। বলা যায় যে, জুম উভোগীত চর্চার জন্য একটি পরিবেশ সৃষ্টি করতে সাহায্য করেছে যেখানে মন খুলে এর চর্চা করতে কোন বাধার সম্মুখীন হতে হয় না। তাছাড়া জুমের নিরিবিলি পরিবেশ, শোভাময় প্রকৃতি, কঠোর শ্রমের পর বিশ্রাম ও আনন্দের জন্য গানের আসর বসানো – এগুলির কারণে প্রকৃতি ও সমাজ জীবনের নানা চমৎকার উপাদান বিভিন্ন রস যোগে তরুণ-মানসে সঞ্চারিত হতে পেরেছে।

‘চাঙমা বাঝি’ বা বাঁশি চাকমাদের বাদ্যযন্ত্র সম্ভারে একটি অনন্য স্থান দখল করে আছে। ঐতিহ্যবাহী পালাগান ‘রাধামন ধনপুদি পালা’ তে যেমন খুব গুরুত্বের সাথে বাঁশির উল্লেখ আছে, তেমনি আধুনিক চাকমা গান পর্যন্ত বাঁশির সুর ছাড়া কদাচিৎ কুলীনতা অর্জন করতে পারে। চাকমা গানে চারটি ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্রের উল্লেখ সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায় – ধুধুক, বাঝি, শিঙা ও হেংগরং। এখানেও বাঁশি শীর্ষস্থানীয়। প্রকৃত অর্থে সেই বাঁশির খোঁজ পাওয়া যায় তরুণ জুমিয়ার কোমরে; জুমে ছুঁচাল দা’র গুরুত্ব যতটুকু, জুমিয়া তরুণের বিশ্রামকালীন শ্রান্ত দেহপ্রাণ নবপ্রেরণার আবেশে জুড়াতে গিয়ে বাঁশির মিষ্টি সুরের প্রয়োজন তার চেয়ে কম নয়। প্রথাগত চাকমা বাঁশির সুরের যে কারুকাজ, জুমের অনবদ্য প্রেরণা ছাড়া তা পরিস্ফূট হতে পারত না বলেই মনে হয়।

‘প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধা ও প্রথাগত প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা’ আদিবাসী মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।  এই প্রথাগত জ্ঞান ও প্রকৃতিকে শ্রদ্ধা করার ধারণাগুলি যুগবাহিত হলেও, ধারণা করা হয় যে এগুলো জুমের মতোই প্রাচীন বা সমসাময়িক। এর মধ্যে অন্তত কয়েকটি বিষয় সুনির্দিষ্ট করে উল্লেখ করা যায়, যেগুলি জুম কেন্দ্রিক। জুম পোড়ানোর সময় বাতাসের প্রতিকূলে আগুন দেওয়ার রীতি রয়েছে, যাতে করে বাতাসের তোড়ে আগুণের অনাকাঙ্ক্ষিত বিস্তারে অযথা অগ্নিকান্ডে অপ্রয়োজনীয় কোন জুমসম্পদ বা প্রাকৃতিক সম্পদ পুড়ে না যায়। জুমক্ষেত্রের বড় বৃক্ষগুলিকে অক্ষত রাখা, গণহারে আগুন দিয়ে বন না পুড়িয়ে একটি বাছাইকৃত এলাকা কেটে শুকান, ঝোপঝাড়ে আগুন দেওয়া, বাছাইকৃত এলাকা থেকে বন্য পশুপাখিকে সরে যাওয়ার রাস্তা রেখে দেওয়া, জুমের পাশে ছড়া ও ঝিরি থাকলে ঐ ছড়ার পাড় থেকে ১-২ বাঁশ বা ২০-৪০ ফুট পর্যন্ত প্রাকৃতিক বন অক্ষুন্ন রাখা এই সংস্কার বা নিয়মগুলি আদিবাসীদের জীবিক বা প্রধান অবলম্বন জুমকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে।

চাকমাদের কিছু ‘বিশেষ রন্ধনশৈলী’ রয়েছে, যেগুলি চাকমা সংস্কৃতির অন্যতম অংশ। যেগুলি সাধারণ রান্না থেকে বিশেষ কিছু কারণে আলাদা করা যায়। উল্লেখযোগ্য শৈলীর মধ্যে রয়েছে – চুমো গোরাঙ ও পাদা কেবাঙ। এই খাবারগুলির বৈশিষ্ট্য হল – এগুলি প্রায় তেলহীন, গরম-মসলা ছাড়া প্রাকৃতিক মসলাযোগে বাঁশের চোঙা বা কলাপাতার মত প্রাকৃতিক আধারে রান্না করা হয়। সুঘ্রাণ ও সুস্বাদে এগুলি অনন্য। এট ধারণা করা অসমীচীন হবে না যে, দূর প্রান্তের জুমের ক্ষেতে কাজ করতে গিয়ে আশপাশ থেকে সংগ্রহ করা টাটকা খাবার রান্নার জন্য বেশি সংখ্যক হাঁড়িপাতিল বহন না করে স্থানীয়ভাবে সংগ্রহীত বাঁশের চোঙা বা পাতায় রান্না অনেক সুবিধাজনক ও উপাদেয়। জুমের বিনি চাউল ছাড়া কলাপিঠা, সান্যাপিঠা, ধুগিপিঠা, বিনিহগা ইত্যাদি উপাদেয় পিঠা তৈরি সম্ভব নয়। জুমের ‘হোন্‌ চোল্‌’ বা কাউন চালের পায়েস একটি উৎকৃষ্ট খাবার। আবার বিঝুর সময় যে মিধা জগরা বা বিনিচালের মিষ্টি মদজাতীয় পানীয় পরিবেশন করা হয় তার উপাদানও জুম থেকেই আসে। তাই এই খাবারগুলির রন্ধনশৈলীর সৃষ্টি ও জনপ্রিয় ও ঐতিহ্যবাহী খাবার হিসেবে পরিচিত লাভ করার ক্ষেত্রে জুম এর অবদান অনস্বীকার্য।


জুমের বস্তুগত সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ

অনেক চাষী নিজ গ্রাম থেকে অনেক দূরের জুমক্ষেতে চাষ করার জন্য জুমে একটি জুমঘর-মোনঘর তৈরি করে নিতেন, যা নিরাপত্তা ও স্বস্তিকর অবস্থান বিবেচনা করে তৈরি করা হত। এই মোনঘর বা জুমঘর প্রথাগত বাস্তুসংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। সাধারণত এটি বাঁশের তৈরি দুই-তিন কামরার ঘর, যেখানে থাকে এটি ইজোর বা খোলা মাচাং, একটি বৈঠখানা, একটি মুলগুদি বা থাকার ঘর, একটি সাজঘর বা ওজোলেং, এবং একটি রান্নাঘর বা পিজোর। ঘরটি এমনভাবে তোইরি যাতে তা মাঝারি মাপের ঝোড়ো বাতাসে টিকে যেতে পারে। এমন একটি স্থানে স্থাপন করা হয় যাতে এখান থেকে জুমক্ষেতের উপর ভালভাবে চোখ রাখা যায়। এটি উচু করে তৈরি করা হয় যাতে বন্য জন্তুর হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। এতে ওঠানামার জন্য একটি বড় বাঁশ বা গাছে খাজ কেটে ‘সাঙ্গু’ বা সিঁড়ি তৈরি করা হয় যা রাত্রে ঘুমে যাওয়ার আগে তুলে রাখা হয় নিরাপত্তার প্রয়োজনে। ঘরের বেড়া সাধারণত দুটি রীতিতে বোনা হয়, উজু জু এবং দ-ধারা জু। দুগ্ধপোষ্য শিশু থাকলে তার জন্য একটি ‘ধুলোন’ বা দোলনা রাখা হয়, যা সাধারণত ‘কেরেঙ জু’ নামক একটি বুনন রীতিতে বোনা হয়। পাকঘর বা পিজোরে থাকে মাটির চুলা বা উলোনশাল, ছাই ফেলার জন্য পাক্কন নামক ঝুড়ি, মাটি বা এলুমিনিয়ামের হাড়িপাতিল, মসলা ও লবণ রাখার পাত্র বা চুমো। চাউল বা ডাল জাতীয় খাবার মাপার জন্য থাকে ধ নামের বাঁশের পাত্র। শুঁটকি রাখার জন্য এবং চুলার উপরে দিয়ে তাজা মাছ মাংস শুকানোর জন্য ‘দুলো’ বা বাঁশের তৈরি ‘লুদুং’ বা খোলাপাত্রো প্রথাগত ব্যবহার্য্য সামগ্রীর অন্যতম। পানি খাওয়ার জন্য দীর্ঘদিন ধরে ‘হুত্তি’ বা মাটির গোল কেটলিসদৃশ পাত্র ব্যবহৃত হয়ে আসছে। পানিতে ফিল্টার করা তামাক বা ধোয়া পানের জন্য আদিবাসীদের নিজস্ব আবিস্কার বাঁশের ‘দাবা’ বা হুক্কা। এটিও জুমঘরের একটি প্রায় অত্যাবশ্যকীয় অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। যেহেতু এটি দিয়ে অতিথি আপ্যায়নের রীতি প্রচলিত রয়েছে। ধান তোলার আগে জুমঘরে মজুত করা হয় তোলোই বা বড় বেতের পাটি, যেগুলি ধান শুকানোর কাজে লাগে। ধান মজুতের জন্য বাঁশের বেত দিয়ে বানান বড় ঝুড়ি বা ‘গোলা’ তৈরি রাখা হয়। জুমক্ষেত  দেখাশুনার ফাঁকে ঐতিহ্যবাহী কাপড় বুনন এর জন্য ইজোরের এক কোণায় বা ঘরের কোণে তৈরি রাখা হয় ‘সজপদর’ বা বুননের সামগ্রী। এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল – ‘তার্জ্যে চাম বা তাচ্চি চাম’ সাধারণত হরিণের চামড়ার তৈরি তলপৃষ্ঠ বন্ধনী, বিয়োঙ, ব হাধি, থুরচুমো, কুদুক কাদা, ট্রাম ইত্যাদি। কোমার তাঁতে নারীদের বুননের রীতি থাকায় এই সামগ্রীগুলোর উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে যে পরিবারে কিশোরী বা যুবতী নারী আছে। সাজঘরে স্থান পেতে পারে চাকমাদের ঐতিহ্যবাহী অলংকার থেঙৎহারু, বাঙ্গোরি, পিজিছরা, আজুলি, তেঙ্গাছড়া, কজফুল, চিকছরা ইত্যাদি। জুমঘরের ছাউনি দেওয়া হয় শন দিয়ে। কদাচিৎ বাঁশ পাতার ছাউনিও দেখা যায়। কাপড় মেলে দেওয়ার জন্য ঘরের আড়াআড়ি বাঁশ ঝুলিয়ে রাখা হয়। জুমিয়াদের মধ্যে তরুণ তরুণী থাকলে ঘরের বেড়ায় বাঁশের খাপে হেংগরং, বাঝি বা বাঁশি ও ধুধক লটকে থাকতে দেখা যায়। ইজোরের কোণে পশুপাখি তাড়ানোর জন্য তাগলক নামক একধরণের লম্বা বাঁশের তৈরি বিকট শব্দ তৈরির যন্ত্র রাখা হয়। এ ছাড়াও মজুত থাকে পাখি মারা বা তাড়ানোর জন্য ব্যবহৃত বাদোল নামক বাঁশ বা বেতের তৈরি অস্ত্র যা দেখতে অনেকটা ধনুকের মত, তবে গুলতি ছুড়ার কাজে ব্যবহৃত হয়। ধান মাড়াই, চাল বাছা ও তুষধান উড়িয়ে ফেলার জন্য কুলা বা ‘কুলো’ এবং চালুনি বা ‘চালোন’ ব্যবহৃত হয়, যা পিজোর বা ধানগোলার উপর রক্ষিত থাকে। ধান মাপার জন্য ব্যবহৃত হয় আরী নামের পাত্র যা গাছের কান্ড কুদে বা লতাবাশের বেত দিয়ে মজবুত করে তৈরি করা হয়। জু করার জন্য যা না হলে কোন ভাবেই চলে না তা হল ‘চুচ্চেং তাগল’ বা ছুঁচাল দা এবং বীজ কোমরে বহন করার জন্য ‘থুরুং’, ‘সামো’ বা বীজঝুড়ি। এখানে যে সকল সামগ্রীর কথা বলা হল সেগুলির অধিকাংশই নিজেদের তৈরি। এটি জুমিয়া চাকমাদের স্বনির্ভরতার দিকটি তুলে ধরে।


চাকমা ঐতিহ্যবাহী নৃত্যে জুমের প্রভাব

জুম নৃত্য ইদানিংকালে প্রায় চাকমা নৃত্যের সমার্থক হয়ে উঠেছে। এটি নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, চাকমাদের প্রধান দুটি ঐতিহ্যবাহী নৃত্যের মধ্যে একটি হল জুম নৃত্য। এই নৃত্যে জুমের বিভিন্ন কাজ ও ধরণ, যৌথ অংশগ্রহণ, জুম জীবনের বিভিন্ন দিকে ফুটিয়ে তোলা হয়। এটি নিয়ে বিভিন্ন শিল্পী ও কোরিওগ্রাফার কাজ করে যাচ্ছেন এবং নিত্য নতুন চিন্তা ও আইডিয়ার প্রয়োগে আরও নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। এ ক্ষেত্রে প্রথমদিকে কবি সুগত চাকমা ননাধনের ‘হিল্লো মিলাবো জুমত যায়দে’ এবং রণজিৎ দেওয়ানের ‘হোই হোই জুমত যেবং’ গানগুলির সুরে জুম নৃত্যের পসরা সাজানো হয়। দুটি গানেরই সুরারোপ করেন কিংবদন্তী শিল্পী রনজিত দেওয়ান। আধুনিক গানগুলির সুরে জুম নৃত্যের কোরিওগ্রাফীর পথিকৃৎ হিসেবে ভুমিকা রাখেন তৎকালীন উসাই এর সংস্কৃতি কর্মকর্তা শাহানা দেওয়ান। এই গানগুলি নিয়ে সবচেয়ে বেশিবার জুম নাচের বিভিন্ন মুদ্রার পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হয়েছে। জুম নৃত্যের একটি নতুন আঙ্গিক হিসেবে জুমপাহাড়ে নারীদের পানি আনার থীমকে ঘিরে নৃত্য প্রশিক্ষক সুস্মিতা চাকমার কোরিওগ্রাফ করা জুমে পানি তোলার নৃত্য বিটভিতে প্রচারিত হওয়ার পর বেশ আলোচিত হয়েছে। জুমপাহাড়ের কুয়া বা ঝিরি থেকে পানি উত্তোলন এর এই কঠিন ও শ্রমসাধ্য কাজটি আদিবাসী জুমিয়া নারীরা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে নিত্যদিন করে থাকে। এই কোরিওগ্রাফি জুমিয়া নারীদের একটি নান্দনিক স্বকৃতি প্রদানের প্রয়াস হিসেবেও অভিহিত করা যায়। এই নৃত্যে রাজা দেবাশীষ রায়ের হারমোনিকায় তোলা ‘মোন মুরো ছরা গাঙ ফেলেই যাঙরলোই ………’ এর মিউজিক ব্যবহৃত হয়। পরে অনেক কোরিওগ্রাফার অন্য মিউজিক সহযোগে এটি নিয়ে নতুন কাজ করেছেন। নৃত্যে চাকমা সংস্কৃতিকে তুলে ধরতে বলা হলে অদ্যবধি যে নৃত্যটি প্রাধান্য পেয়ে এসেছে তা এই জুম নৃত্য। চাকমা সংস্কৃতির ঝান্ডাধারী যে ক’টি উপাদান বহুল প্রশংসিত ও সুচচিত হয়েছে, বলা যায় সেগুলির অধিকাংশ জুমকেন্দ্রিক। তাই জুমকে অস্বীকার করে চাকমা প্রথাগত নৃত্যধারার সঠিক বিকাশ ঘটবে না তা নিঃসংকোচে বলা যায়।

jumjournal
Morning Light, Image: Nantu chakma


জুমসংশ্লিষ্ট চাকমা পূজা-পার্বণ, তন্ত্রমন্ত্র ও আচারাদি

‘ধোজ্যে লাগারা’ হল কোন জুমভূমি চিনহিত করার পর তার উপর মালিকানার বিশেষ চিনহ স্থাপন করা। একটি বাঁশের মাথায় একটি কাঠি আড়াআড়িভাবে ঢুকিয়ে তার উপর একটি মাটির ঢেলা রেখে দেওয়া হয়। এটা অন্য জুমিয়াদের সংকেত দেয় যে, এই স্থানটি ইতোমধ্যে কারও দ্বারা মনোনীত করা হয়ে গেছে, তাই জুমের জন্য অন্য স্টাণ বেছে নিতে হবে।

আহল পালনী হল জুমিয়াদের একটি চমৎকার উৎসব। এর মাধ্যমে জুম্ম জীবনের প্রকৃতি নিষ্ঠতা ও কৃতজ্ঞতাবোধ প্রকাশ পায়। জুনের তৃতীয় সপ্তাহে অর্থাৎ আষাঢ়ের ৭ তারিখ এই দিনটি পালন করা হয়। এ দিনে জুমের সকল কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়। এতে একটি লোকবিশ্বাস কাজ করে যে, এই দিনটি মাতা ‘বসমপুদি’ বা বসুমতির রজঃকাল। এই দিনটিতে সকল প্রকার ফলমূল ও শাকসব্জি সংগ্রহ ও রান্না করে মাতা ‘বসমপুদি’, মাতা ‘গঙ্গি’, মাতা ‘লক্ষ্মী’, ‘দেবা’ এবং ‘ধিঙি’ সহ জুমচাষে ব্যবহৃত  ‘চুচ্চ্যেং তাগল’, ‘চারি’, ‘হুরোল’ ইত্যাকার সকল যন্ত্রপাতির উদ্দ্যশ্যে উৎসর্গ করা হয়।

আঙ হল জাদুক্ষমতা সম্পন্ন লেখা যা কোন দুষ্ট আত্মা বা ব্যক্তির ‘টোনা’ থেকে সুরক্ষা প্রদান করে। ‘জুম মারা আঙ’ কোন বিরোদপূর্ণ বা খারাপ চিনহ বহনকারী দুষ্ট আত্মাগুলিকে জুম থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত হয়। এই আঙ স্লেট পাথরে লিখে মু-লুগেয়্যে বান্দর চাম, ঘোড়াঘু, মোনচত্তা, আয়রন অক্সাইড, লুরি মাধা খের সহযোগে প্রদুস্থ স্থানের মাটির নিচে পুঁতে রাখা  হয়।

বিপরীতে, ‘জুম মারা বান’ ব্যবহৃত হয় কোন বেদখলকৃত জুমভুমির উর্বরতা নাশ করার কাজে। একটি বিশেষ আঙ স্লেট পাথরে লিখে নির্দিষ্ট জুমের মাঝামাঝি স্থানে পুঁতে রাখা হয়। ‘জুম মারা চোল পরা’ হল মন্ত্রপূত চাল পাঁচটি কাটা মিডিঙ্গা বাঁশের ডগায় রেখে বাঁশগুলির একটিকে মাঝখানে ও অন্য চারটিকে জুমের চার কোনায় পুঁতে রাখা। এটিও অনিষ্টকারী আত্মাগুলিকে দূরে রাখার কাজে ব্যবহৃত হয়।


চাকমা বুননশিল্পে জুমের প্রভাব

জুমে উৎপাদিত কার্পাস তুলার সুখ্যাতি বহু পুরোনো। বাংলার বিখ্যাত মসলিন এর সুতা এই পার্বত্য চট্টগ্রামের কার্পাস থেকে সংগৃহিত হত বলে জানা যায়। চাকমাদের মূল পরিধানের বস্রগুলির মধ্যে পিনন, হাদি, হবং, সিলুম ও কাহনি উল্লেখযোগ্য। একসময় এই সকল পরিধেয় বস্র তৈরি হত জুমসুতা দিয়ে। এতে বিভিন্ন গাছের বাকল, ফল, মূল ইত্যাদি থেকে প্রস্তুতকৃত রং ব্যবহৃত হত যেগুলির অধিকাংশই জুম থেকে সংগৃহীত। জুমভুমির পাশে গভীর বনাচ্ছাদিত এলাকায় মিলত প্রয়োজনীয় শিকার, যার একটি হল হুদুগ বা সজারু। সজারুর কাঁটা বা ‘কুদুক কাদা’ চাকমা বুননের একটি আবশ্যক উপাদান বলে দিরগদিন ধরে স্বীকৃত। জুমের  ধারে প্রায়শ মিলত ‘ঋঝি’ নামক এক ধরনের ফল, যা পরিপুষ্ট হলে ফালি করে কেটে নিয়ে সুতা ব্রাশ করার কাজে ব্যবহৃত হত। এখনো, কঠিন চীবর দান ইত্যাকার উৎসবে চাকমা বুননশিল্পীদের দেখা যায় চরগা-চরগি-সজপদর নিয়ে বসে যেতে, যেখানে জুম তুলা থেকে সুতা এবং সেই সুতায় ভিক্ষুদের জন্য পরিধেয় কাপড় ‘চীবর’ বোনা হয়। জুম্ম সুতার পাতলা কম্বল বা বুরগী একটি ঐতিহ্যবাহী কাপড় হিসাবে স্বকৃত। চাকমা বুননরীতিতে ‘আলাম’ বা বহুনকশাধারী চাদর একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য। এই চাদরে চাকমা বুননশিল্পে ব্যবহৃত বিভিন্ন নকশাগুলি পরপর সন্নিবেশিত থাকে। এই নকশায় বিভিন্ন পশুপাখি, বৃক্ষলতা ও ফুলের প্রতিকৃতি ইত্যাদি জ্যামিতিক ও সাধারণ আকারে ফুটিয়ে তোলা হয়। এই ফুল, লতাবৃক্ষাদির অনেকগুলিই জুমভুমিতে জুমকালীন কিংবা ‘রান্যা’ বা ছাড়া জুমে ফুটে থাকতে বা গজাতে দেখা যেত। জুমের অসাধারণ পরিবেশে এই জিনিসগুলির শোভা হয়ত কোন চাকমা বুননশিল্পীকে গভীরভাবে  অনুপ্রাণিত করেছিল। জুমের মোনঘরের ইজোরে বসে ধীরে ধীরে এগুলির অনন্য প্রতিকৃতি সে নকশায় তুলে আনতে শুরু করেছিল। এভাবেই আলামে বহুসংখ্যক নকশা স্থান করে নেয় যেগুলি জুমের অনুষঙ্গ থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে চাকমা বুননশৈলীর ক্ষেত্রে অনবদ্য অবদান রেখে চলেছে।

চাকমা সঙ্গীত ও সাহিত্যে জুম প্রসঙ্গ:

সবচেয়ে বিখ্যাত, হৃদয়স্পর্শী ও জনপ্রিয় কিছু চাকমা গান জুমকে নিয়ে রচিত হয়েছে। কবি সুগত চাকমার ‘হিল্লো মিলাভুয়া জুমত যায়দে’ এবং শিল্পী রণজিৎ দেওয়ানের ‘হোই হোই হোই হোই হোই জুমত যেবং’ গানগুলিতে জুমের কাজ, প্রকৃতি, অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও নৈসর্গিক সৌন্দর্যের কথা উঠে এসেছে। ‘আয় তুঙ্গোবি ম লগে’ গানটি জুমক্ষেত্রের বৈচিত্র্য এবং তাঁর পারিপার্শ্বিক প্রাকৃতিক সম্পদের উৎকর্ষের কথা তুলে ধরে। আশির দশকে গেংহুলি শিল্পীগোষ্ঠীর বিশিষ্ট শিল্পী যখন গেয়ে ওঠেন, ‘জুম আগুনো ছেই ফুদোগুন উরি যাদন্দে, ছেই ফুদোগুন দেইনেই তরে ইদোত উদেদে’ অর্থাৎ ‘জুম আগুনের ছাইরাশি ভেসে যাওয়া দৃশ্য দেখে তোমার কথা মনে পড়ে গেল, তখন তরুণ চাকমা মন উচাটন না হয়ে পারে না। ‘সাজোন্যে তারাবো ঐ দুপ্পেগোই/আগাজত উত্তোন জুনি’ গানটিতে দূরের কালো পাহাড়ে প্রেয়সীকে নিয়ে ঘর বাঁধার স্বপ্ন রূপায়িত হয়েছে। বিদগ্ধ লেখক ডা. ভগদত্ত খীসা তাঁর ‘ভিম পারাল্য বো চেলে’ গানটিতে তুলে ধরেন প্রেয়সীর জন্য আকুতি এওবং জুম করে নতুন জীবন শুরু করার স্বপ্নের কথা। ‘জুম গাবুরী মুরো উদের আজং আজং মু গুরি’- তরুণ কুমার চাকমার লেখা এই গানটি তরুণ সমাজের কাছে বেশ সমাদৃত হয়েছিল। সাম্প্ররতিক সময়ে সঙ্গীতপ্রেমী চাকমাদের নাড়া দিয়ে গেল সম্রাট সুর চাকমার লেখা, চিত্রা ও পল্টু চাকমার যৌথ কন্ঠে ‘মোন উগুরে জুম গোজ্যেই – ইক্কে ইদু আমা ঘর’ গানটি। অসাধারণ রূপকসমৃদ্ধ এই গানটি জুমের ফসল থেকে জীবন্ত কিংবদন্তী অগলক পাখি, লাজুরী লতা থেকে জুমপার্শ্বের ঘন সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক বন সবকিছুই পরম মমতায় তুলে এনেছে।

‘তান্যাবি বারমাস’ একটি বিখ্যা চাকমা গীতি কবিতা। এর প্রথম চরণেই জুমের শেষ অবস্থা বা রান্যার কথা বলে – ‘তান্যাবি রান্যাত যায়, সুগুরিদাদি টানেরলোই…।’ চাকমা ঐতিহ্যবাহী পালাগান ‘রাধামন ধনপুদি’ পালা তে ‘জুম কাবা পালা’ নামে একটি পরিচ্ছেদ আছে। বিশিষ্ট কবি ফেলাজিয়া চাকমা তাঁর ‘জুম্মবী পরাণী মর’ কবিতায় সাঁজবেলাকার লাঙ্গেল-জুমপথ, মোনঘরের ইজোরে বসে বাঁশি, ধুধুক, হেংগরং, শিঙা বাজান, হাসিমাখা কার্পাস সুতার ফুল ইত্যাদিকে ভালবাসার মাধ্যমে জুম্মবীকে ভালবাসার ছলে জুমকেই ভালবাসার কথা ফুটিয়ে তুলেছেন। জুম জুড়ে শধু রঙ এর খেলা দেখতে পান লে। কর্ণল (অব) পরিমল বিকাশ চাকমা, তাঁর ‘ম গাভুরান গেলে’ কবিতায়। জুম রান্যা ডা ভগদত্ত খীসাকে মনে করায় ইতিহাসের রাজা বিজয়গিরির রাজ্যের কথা-তার রান্যাপথ কবিতায় – ‘জানং জানং মুই এই রান্যা বিজয়গিরির দেচ’। জুমের জমির প্রতি অ-আদিবাসীদের লোভাতুর দৃষ্টির কথা ফুটে অঠে কবি মুকুন্দ চাকমার কবিতায় -জুম্মুনে জুম হান/ রান্যা ভুইয়ানি ফেলেই যান… জুম্ম উনর রান্যা ভুই বাঙ্গালে লুভ গরণ/ সেই ভুওয়ানি পাত্যায় ইংরাজরে ধরন’। ‘জুম কাবা’ কবিতায় কবি মুকুন্দ তালুকদার লিখেছেন, ‘ও ভেই ও ভেই যেই যেই যেই বেক্কুনে মিলি জুম হাবা যেই’ এ কবিতায় আদিবাসীদের জুমভূমিগুলিতে একটি দীর্ঘ সময় পর বারবার জুমচাষের জন্য ফিরে আসার ইঙ্গিত দিয়েছেন। কবি শ্যামল তালুকদার তাঁর ‘জুম’ কবিতায় লিখেছেন, কবরক ধানর শিজা এহলানি মেহলানি খান বৈয়ারে- / নুও ধানত তুম্বাচ ছিদেই পরে চেরোকিত্যা/ জুম্মর চোগত খুঝির ঝিমিলানি’ অর্থাৎ জুমের কবরক ধানের মৌ মৌ গন্ধে জুমিয়ার চোখ আনন্দে ঝিলিক দিয়ে ওঠে। জুমকে ঘিরে চাকমা সাহিত্যে চিত্তাকর্ষক সব শব্দবন্ধ ও চিরায়ত বাক্য রচিত হয়েছে। বিচিত্র সব দৃষ্টিকোণ থেকে চাকমা কবিরা জুমকে পর্যবেক্ষণ করেছেন, এ নিয়ে ভেবেছেন ও লিখেছেন। এ থেকে ইঙ্গিত মেলে যে, চাকমা সমাজ ও জীবনের ছবি আঁকার ক্ষেত্রে কবিরা জুম থেকে যথেষ্ট অনুপ্রেরণা পেয়েছেন।


প্রবন্ধ ও গবেষণায় জুম

জুমকে ঘিরে অনেক প্রবন্ধ রচিত হয়েছে ও গবেষণাকর্ম সম্পাদিত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে যাঁদের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়, তাঁরা হলেন, গবেষক অমরেন্দ্রলাল খীসা, প্রশান্ত ত্রিপুরা, অবন্তী হারুন, গৌতম কুমার চাকমা, তনয় দেওয়ান প্রমুখ। জুম নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার কাজ করেছে পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রসমূহ। তনয় দেওয়ান তাঁর গবেষণায় জুমের বিভিন্ন সুবিধার দিকগুলী চিহ্নিত করেছেন। গৌতম কুমার চাকমা দেখিয়েছেন, কীভাবে জুম বনজ পশুপাখির বংশবৃদ্ধি এবং তাদের খাদ্য প্রাপ্তিতে ভূমিকা রাখে। জুমভূমি কমে যাওয়া এবং পাহাড়ে খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার মধ্যে ধনাত্মক সম্পর্কটিও তিনি তুলে এনেছেন। পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্র এবং পার্বত্য জেলা পরিষদ তাদের কৃষিবৈজ্ঞানিক গবেষণায় উৎপাদন বৃদ্ধি এবং সংশ্লিষ্ট আয় বৃদ্ধিকে গুরুত্ব দিয়েছেন। জুমচাষের পুরো প্রক্রিয়া এবং জুমসংশ্লিষ্ট নানামাত্রিক খাদ্য ও সামাজিক সাংস্কৃতিক শৃঙ্খল তাদের গবেষণায় উঠে আসে নি। প্রশান্ত ত্রিপুরা এবং অবন্তী হারুনের কাজগুলির ব্যাপ্তি এবং বিষয়গত গভীরতার নিরিখে বিশেষ গুরুত্বের দাবী রাখে। তাঁরা গতানুগতিক তথ্যসমৃদ্ধ উপস্থাপনার পাশাপাশি জুমের রাজনৈতিক অর্থনীতির দিকটি বিশেষ যত্নসহকারে তুলে এনেছেন। জুমবিরোধী বিবিধ অপপ্রচারণা একটি পদ্ধতি মেনে বিভিন্ন মিডিয়ায় চালানো হয়ে থাকে। সাধারণ জনমানসে তাঁর একটি গভীর প্রভাব পড়ে। তাছাড়া, প্রফেসর প্রশান্ত দেখিয়েছেন, তথাকথিত শিক্ষিত আদিবাসী প্রজন্ম সরাসরি জুমচাষের সাথে সম্পর্কহীন অবস্থায় বেড়ে উঠছে। ফলে তাদের মধ্যেও একটা ধোয়াশা বিদ্যমান থাকে এবং ক্রমাগত অপপ্রচারণার ফাঁদে তারাও পা দিয়ে বসেন।

বিভিন্ন গবেষকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, পার্বত্য এলাকার মূল্যবান কাঠ ও জুমিয়াদের প্রথয়াগত মালিকানার জমিগুলি হাতিয়ে নিয়তে যেসব চক্র সক্রিয়, তারাই কখনো বন ও পরিবেশ রক্ষার নামে, কখনো আধুনিক কৃষি ও উৎপাদনশীলতার দোহাই দিয়ে আইন কানুনের নানা ফাঁক গলে পার্বত্য এলাকায় শত শত বছর ধরে জুমিয়া আদিবাসীদের দ্বারা সুরক্ষিত বনগুলি উজার করে সেখানে একক বাণিজ্যিক বৃক্ষের বাগান গড়ার প্রয়াসে লিপ্ত। হাজার হাজার আদিবাসী জুমিয়ার নামে কোন তথাকথিত লীজ এর নামে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে বলে জানা যায়। সেগুনের একচেটিয়া বাগান গড়ার পর বিভিন্ন সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী সহ অর্থলোভী মহলের যোগসাজসে হাজার হাজার টন কাঠ অজস্র চেকপোস্ট সদর্পে পার হয়ে রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরের বিলাসী দালানের শোভা বর্ধন করলেও বন উজারের জন্য দায়ী করা হচ্ছে ‘বন’ পুড়িয়ে জীবিকার সংস্থান করা জুমপদ্ধতি ও জুমিয়াদের। বনের তথাকথিত রক্ষাকর্তা বনবিভাগের প্রধান বা ‘বনের রাজা’র বালিশ তোষকও টাকা দিয়ে তৈরি হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিবেশবিধ্বংসী বন উজার-কাঠ পাচারের মধ্য দিয়ে; ২ একরের জুম করে প্রান্তিক মিয়ার ক্ষুধার অন্ন যোগাতে কষ্ট হয়, সন্তানদের শিক্ষার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়, তবুও ‘বন পুড়িয়ে’ পরিবেশ নষ্ট করার দায় তাকে বহন করতে হয়। উন্নয়নের বরাত দিয়ে বন কেটে বাগান করে, ‘সংরক্ষিত’ ঘোষণা করে জুমিয়ার জুমভূমি দখল করে বা নামমাত্র মূল্যে ‘কিনে’ নিয়ে জুমিয়াদেরকে অধিকতর প্রান্তিকতার দিকে ঠেলে দিয়ে জুমসংস্কৃতির ধ্বংসসাধন চলছে।

জুমে যে সকল ফসল ফলে তার মধ্যে ধান অন্যতম। অনেক গবেষক মনে করেন, ধান চাষবিহীন জুম প্রকৃত অর্থে জুম নয়। জুমের প্রধান কয়েকটি ধানের জাত হল: মেলেধান, কুকী মেলে, কামারাঙ, তোর্গি, কবরক, বাধেই, লেঙদা চিগোন, গেলঙ, পাত্তেগী, গুরিচিনেল, বিনি, কবাবিনি, লোবাবিনি, লঙ্কাপোড়া বিনি, বানরনঙ বিনি, পাধাতটারা, আমেই কালাকবরক, সংগেলঙ। অন্য ফসলগুলির মধ্যে রয়েছেঃ ভুট্টা, যব, তিল, মিষ্টি কুমড়া, চাল কুমড়া, মারফা, তুলা, শীম, চিন্দিরা, মরিচ, বেগুন, জুরো আলু, মারেজ, সাবারং, ফুজি, আমিলে, আলু, এরকচু, গুরিকচু, রাঙাপিলে, ধুবপিলে, ওলকচু, সাম্মোকচু, মু রাঙাকচু, এরাকচু, গুরিচকচু, নারিকেল কচু, বিনিকচু, বদাকচু, জেদেনাবিচি, মুগলি, কুকী, দুমোর সুমি, দেড়জ, রেং, মেইয়েশাক ইত্যাদি। এ থেকে জুমের ফসল বৈচিত্র্যের অনন্য চিত্র পাওয়া যায়। এগুলি স্থানীয় ফসল বিধায় এর বীজ জুমিয়ারা নিজেরাই সংরক্ষণ করে। ফলে বীজের জন্য অতিরিক্ত টাকার প্রয়োজন পড়ে না। প্রথাগত জুমে কীটনাশক, মারাত্মক আগাছানাশক, হাইব্রিড বীজ, রাসায়নিক সার। এতে করে জুমিয়াদের স্বাস্থ্যগত অবনতি ও দুর্গতি দেখা দিচ্ছে। জুমিয়ারা যে অর্গানিক খাবার খেতেন তা অনেক অসুস্থতাকে দূড়ে রাখত। বর্তমান অবস্থা পর্যবেক্ষণে দেখা যায় যে, স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় দিন দিন জুমিয়ার সাধ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে। জুমপাহাড়ের খাঁড়ি বা ঝিরিতে -ছড়ায় মাছ-কাকড়াসহ আমিষপ্রদায়ী প্রাণিগুলি বিলুপ্তপ্রায়। এখন প্রাণিজ আমিষের জন্য জুমিয়ার হাহাকার এবং এ সম্পর্কিত অপুষ্টি বাড়ছে। ডা শহীদ তালুকদার, খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার মেডিকেল অফিসার, তার এক অনানুষ্ঠানিক সমীক্ষায় দেখান যে, জুমচাষী যেসব রোগী আসেন, তাদের মধ্যে রক্তহীনতা ও অন্যান্য অপুষ্টিজনিত লক্ষণ এক দশক আগের তুলনায় বহুগুণ বেড়েছে। ২০১৩ সালে সবচেয়ে বেশি রোগী এসেছেন, শ্বাসযন্ত্রের নানা ব্যাধি নিয়ে। অন্যান্য কৃষির পাশাপাশি জুমচাষে রাসায়নিক কীটনাশক ও আগাছানাশক এর ব্যবহার বৃদ্ধি এর অন্যতম কারণ।


সারকথা:

আবহমানকাল ধরে জুমকে ঘিরে চাকমাদের জীবনপঞ্জি আবর্তিত হয়ে এসেছে। তাদের সংস্কৃতির মূল স্তম্ভগুলির অধিকাংশই জুমকে ঘিরে গড়ে উঠেছে। জুম পরিচালনা করতে গিয়ে তারা প্রাকৃতিক বনভূমি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার প্রয়াস চালিয়েছে, প্রাকৃতিক জলাধারগুলি সযত্নে বাঁচিয়ে রেখেছে যুগের পর যুগ। বিগত কয়েক দশকের নানা পরিবর্তন, বিশেষতঃ কাপ্তাই বাঁধ পরবর্তী সময়ে অনেককে বাধ্য হয়ে হলেও জীবিকার একমাত্র অবলম্বন হিসেবে জুমচাষকে বেছে নিতে হয়েছে। ২০০৩ সালের একটি গবেষণামতে, প্রায় ৪০০০০ আদিবাসী পরিবার তাদের জীবিকার জন্য সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে জুমের উপর নির্ভরশীল, যাদের একটি বড় অংশই চাকমা সম্প্রদায়ের। জুমকে নিয়ে অনেক হৃদয়গ্রাহী সাহিত্য সৃজিত হয়েছে। নৃত্য ও সংগীত রচিত হয়েছে। এগুলি চাকমা সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্বও করছে। কিন্তু জুমভূমির মালিকানার প্রশ্নে জুমিয়ার অধিকার সবসময় অস্বীকৃত থেকে যাওয়ায় তার প্রাম্ভিকতা সময়ের সাথে সাথে বেড়ে চলেছে। বাজারী ব্যবস্থার ফাদে পা দিয়ে জুমভূমিতে বাণিজ্যিক ফসলের একচেটিয়া আবাদও বাড়ছে। রাসায়নিক সার ও কীটনাশক নির্ভর জুমব্যবস্থা চালু হওয়ায় জুমের প্রাকৃতিক পরিবেশ হুমকিগ্রস্ত হয়েছে। জুমচাষীকে খলচরিত্র আর জুমচাষ পদ্ধতির উপর ‘পরিবেশবিধ্বংসী’ তকমা লাগিয়ে, জুম নিয়ন্ত্রণ বিভাগ খুলে, জুমভূমিকে তথাকথিত ‘সংরক্ষিত’ করে ও পাশাপাশি জুম নিয়ে নানা ধাঁচের গবেষণাও চলমান রয়েছে।

জুমকে শুধু একটি কৃষিপদ্ধতি হিসেবে দেখলে, তার সমাজতাত্বিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যকে অস্বীকার করা হলে, কিংবা পদ্ধতিগতভাবে জুমিয়ার অধিকার হরণের প্রক্রিয়া চলমান থাকলে জুমিয়া ও আদিবাসীদের সম্মান ও অধিকার ভূ-লুন্ঠিত হবে। নতুন প্রজন্ম সুশিক্ষিত হয়ে অন্য কোন সম্মানজনক পেশায় পদার্পণের পূর্বেই জুমসংস্কৃতি ও জুমজীবনধারা একটি শো-পিস আইটেমের মত কিংবা কোন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের নৃত্যগীতে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ার আশংকা অমূলক নয়। এতে জুমিয়ার জীবিকা চরম হুমকির মধ্যে পড়বে। তাই জুম নিয়ে কোন শুভবুদ্ধিসম্পন্ন পক্ষ কাজ করতে চাইলে জুমকে জুমিয়ার জীবনবিন্যাস, ইতিহাসের প্রেক্ষাপট ও সাংস্কৃতিক সংযোগ অর্থাৎ একটি সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিবেচনা করা দরকার। নতুন সচেতন প্রজন্ম এই দৃষ্টিভঙ্গির দীক্ষায় দীক্ষিত হোক।

সহায়ক গ্রন্থপুঞ্জী:

১। ত্রিপুরা, প্রশান্ত ও হারুন, অবন্তী, ২০০৩, পার্বত্য চট্টগ্রামে জুমচাষঃ সমস্যা ও সম্ভাবনা, SHED.

২। ত্রিপুরা, প্রশান্ত, জুমের রাজনৈতিক অর্থনীতি

৩। চাকমা, গৌতম কুমার, Traditional Livelihoods and Indigenous Peoples/ AIPP/2010

৪। ত্রিপুরা, সুরেন্দ্রলাল, ১৯৯৪, পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রকৃতি ও সংস্কৃতি, উসাই, রাঙ্গামাটি

৫। জুম পোস্টার, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন

৬। চাকমা, সুগত, ২০১৪, প্রসঙ্গঃ চাকমা কবি ও কবিতা

৭। Chakma, L.B, বিঝু নিজেনি, ২০১৪

৮। চাকমা, সুগত, ২০১১, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সামাজিক প্রথা ও রীতিনীতি

৯। দেওয়ান, তনয়, জুমচাষ

১০। Rashid, Harunor and Chakma, Paban Kumar, Suitability of Rice Varieities with other crops and exploration of better managemnent particles in Jum Field.

১১। Chkama, Sujash, Training module for traditinal leaders on NRM.


লেখক: সুযশ চাকমা, উন্নয়নকর্মী, হিল ডেভেলপমেন্ট এন্ড কালচারাল রিসোর্চ একাডেমী-হিডক্রা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here