চাকমা প্রথম চিত্রশিল্পী চুনীলাল দেওয়ান সর্ম্পকে ভারতীয় চিত্রশিল্পী অমরেন্দ্র নাথ রায়ের একটি পত্র ও কিছুকথা

0
43

বিংশ শতাব্দীর চল্লিশ-এর দশকে পার্বত্য চট্টগ্রামের যে মহান চিত্রশিল্পী পার্বত্য চট্টগ্রামের চিত্রকর্ম, কবিতা ও সঙ্গীতকে দেশে বিদেশে তুলে ধরেছিলেন তিনি হলেন চুনীলাল দেওয়ান। অষ্টাদশ শতকের প্রায় অধিকাংশ সময় জুড়ে মুলিমা গঝার ধাবানা বংশজ চাকমা রাজারা পার্বত্য চট্টগ্রামে রাজত্ব করেছিলেন। এই চাকমা রাজবংশে রাজা শের দৌলত খান তৎপুত্র রাজা জাবক্স খান এর মত বেশ কয়েকজন বিখ্যাত রাজা জন্ম গ্রহণ করেছিলেন। পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রথম চিত্রশিল্পী চুনীলাল দেওয়ান ছিলেন সেই ইতিহাস খ্যাত রাজা শেরদৌলত খানেরই ১০ বংশধর। পার্বত্য চট্টগ্রামে তিনি ৪০ এর দশক থেকে ৬০ এর দশকের প্রথমভাগ পর্যন্ত সময়ে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন প্রধানত তাঁর চিত্রকর্মের জন্য এবং সেই সাথে বাংলায় তারঁ রচিত কবিতা এবং গানগুলির জন্য। উল্লেখ্য যে, তাঁর রচিত ‘ঘর দুয়ারত’ শীর্ষক কবিতাটি চাকমা ভাষায় বাংলা বর্ণে রচিত একটি কবিতা যা গান হিসেবেও গাওয়ার যোগ্য। চাকমা রাজমাতা বিনীতা রায়ের অনুবাদ সহ ঐ কবিতাটি ১৯৪৬ সালে গৈরিকা পত্রিকায় (১১ বর্ষ ১২ সংখ্যাতে) প্রকাশিত হয়েছিল এবং সাথে সাথে গুণীজন ও সাধারণ পাঠকের মধ্যে খুব জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন।

তিনি কেবল চিত্রশিল্পী বা কবিই ছিলেন না, সঙ্গীতেও তার অসাধারণ দক্ষতা ছিল। তিনি সঙ্গীত রচনা ও সেগুলিতে সুর দিয়েছিলেন। বহু প্রদর্শনিতে তাঁর চিত্র দর্শককে ভারী আনন্দ দিয়েছিল। বাংলাদেশের বিখ্যাত শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনও তাঁকে খুব পছন্দ করতেন। তিনি তারও পূর্বে আর্টস স্কুলে পড়েছিলেন। চুনীলাল বাবুর ছেলে দেবী প্রসাদ দেওয়ান ও আমি একবার ১৯৭৪ সালে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের বাড়িতে গেলে তাঁরা চুনীলাল দেওয়ানের ছেলে হিসেবে দেবীবাবুকে খুবই স্নেহ ও আপ্যায়ন করেছিলেন।

নিম্নে তাঁর সর্ম্পকে ভারতীয় চিত্রশিল্পী অমরেন্দ্র নাথ রায়ের লেখা একট অপ্রকাশিত পত্র পাঠকের জন্য প্রদত্ত হলো –

Mr. Sugata chakma                                   October 1st 1972

The Chairman

Jubhaprad Jumia Bhasa Prochar Daptor

C/O. Saroj Art Press

P.O Rangamati

Chittagong Hill Tracts,

Bangladesh

প্রিয় মহাশয়,

আপনার September 12-এর পত্রের প্রাপ্তি সংবাদ আমি September 23rd এ পাইয়াছি। তাহা এতদিনে আপনি পাইয়া থাকিবেন।

ইংরেজী ১৯২৭ or ১৯২৮ আমি Government School of Arts, Chowrispure, Calcatta-তে ভর্তী হই। 1st year-এ Admission পাওয়ার পর কিছুদিনের মধ্যে প্রথমে যে কয়টি ছাত্রের সাথে আমার প্রথম পরিচয় ও আলাপ হয় ভাই চুনীলাল তাহাদের মধ্যে একজন। সেই প্রথম আলাপ হইতে তাহা ক্রমে সখ্যতা ও পরে ভ্রাতৃত্ব বন্ধুত্বে পরিণত হয়; ও সেই ভাব বরাবরই ছিল। আমি তার সাথে পুরা ৫(পাঁচ) বৎসর 5th year Aeax পড়িয়াছিলাম।

ভাই চুনী বহুবাজারের (এখন বিজিন বিহারী গাঙ্গুলি স্ট্রিট) এক মেসে থাকিত। সেই মেসে প্রায়ই সন্ধ্যার দিকে যাইয়া তার কাছে এসরাজ বাজান শিক্ষা করিতাম। চুনী ভাই খুব ভাল এসরাজ বাজাইতে পারিত।

কোন ছুটির দিনে কিংবা অবসর সময়ে তার সম্প্রতি আঁকা paintings-গুলো সম্মুখে রাখিয়া অল্পদূরে বসিয়া তণ্ময় হইয়া তারের বাজনা বাজাইয়া ঐ সমস্ত painting গুলোর defect বাহির করার চেষ্টা করিত। ইহাকে সাধনা বলা যায়।

প্রায় প্রত্যেক ছাত্রই painting class-G admission লইয়াছিল (profession হিসেবে)। কিন্তু  চুনীলাল এই চিন্তার সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল। সে painting-কে টাকা উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করিতে চায় নাই।

মাত্র তার আত্মার satisfaction এর জন্য ও সে তার জন্মস্থানের (প্রাকৃতিক সোন্দর্য্যের লীলাভূমি-চট্টলের) অশেষ সৌন্দর্য্যের কিছুটা তার তুলি দ্বারা ক্যানভাসে চিত্রিত করিয়া রাখার সাধনায় জীবন কাটাইয়া দিবে। এই মাত্র তার জীবন স্বপ্ন ছিল।

অবসর সময়ে অন্য ছাত্ররা যখন তাদের ভবিষৎ জীবনে painting এর নানান সম্ভাব্য ও অসম্ভব বিষয় আলোচনায় ব্যস্ত থাকিত সেই সময়ে প্রায়ই একা একা থাকার চেষ্টা করিত। সে ঠিক সাধারণ প্রকৃতির মানুষ ছিল না। ঠিক সাধারণের সহিত অতি সাধারণ বিষয়ে আলোচনায় নিজেকে কখনও জড়াইত না।

একান্ত স্বাধীন সে Mohabodhi Society-তে যাইয়া ভিক্ষু উত্তমের সাথে তার ভাবের ও painting এর আলোচনা হইতে। তিনি (ভিক্ষু উত্তম) painting এর ছাত্রদের বিশেষ করিয়া যারা নিস্কাম হইয়া painting করিতে চায় তাদের স্থান দিতেন সবার উর্দ্ধে। যে সমস্ত ছাত্রেরা, বিশেষ করিয়া general line-এ education এর জন্য university পড়িত তাদের তিনি বিদ্রুপ করিয়া তখনকার British Gov. machenary oiling এর ভাবি instrument বলিতেন।

মানুষ হিসেবে ভাই চুনী ছিল একদম খাঁটি। কখনও ছেলেমানুষি বা বালক সুলভ চপলতা (যাহা বেশির ভাগ ছাত্রেরই ছিল) তার মধ্যে ছিল না। তবে তাকে সর্বদাই সুখী ভাবে দেখিতাম।

অত্যন্ত মিতব্যয়ী ও সংযমী ছিল সে। বাক্য ও আচরণে এইরুপ সংযমী ছাত্র দৈবাৎ দেখা যাইত। ছাত্র বন্ধু হিসেবে তার অত্যন্ত নিকট আত্নীয় ছিলাম আমি। আমার কাছে তার ও তার কাছে আমার গোপন বা অজানা কিছু ছিল না।

খরচ করিয়া নানান দেশ দেখা তার প্রকৃতি বিরুদ্ধ ছিল। তথাপি মধ্যে মধ্যে জোর করিয়া তাকে আমি study করার জন্য বাহিরে লইয়া যাইতাম। শেষের দিকে সেও আমি উত্তর প্রদেশ ও বিহার এ যাই Land scape করার জন্য। ১৯৩০ জুনে যত দূর মনে আছে Lucknow এর ‘Residency’ [যাহা Captain (English) Beligar এর Resident ছিল] যাহার ভগ্নাশেষ এখনও আছে, তাহা ও বানারস এর গঙ্গার উপর হইতে ঘাটের ছবি ও তার সাথে অশোকস্তম্ভের oil sketch দুইজনেই sketch করি by oil colour-এ।

Admission পাওয়ার সময়ে আমরা mostly প্রাকৃতিক দৃশ্য বা scenry & human natural figure আঁকার পক্ষপাতী ছিলাম। এইরুপ painting-কে Western painting বলা হয়। কিন্তু কিছুদিন পরে যখন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমাদের school এ কিছুদিন তাঁর ছাত্র আমাদের principal এর guest হইয়া ছিলেন। মধ্যে মধ্যে class এ কাজ দেখিতে আসিতেন। তিনি Indian style এ আঁকা ছবি পছন্দ করিতেন।

এই সময়ের কিছু পর হইতে অনেকে Western painting ছাড়িয়া দিয়া Indian painting section এ চলিয়া যায়। কিন্তু যারা adamant হইয়া Western painting-এ ভরী হইয়াছিল, চুনী ভাই তাহাদের মধ্যে  ছিল। সে seriously natural painting এর পক্ষপাতি ছিল।

সেই সময়ের মধ্যে মধ্যে আমাদের school এ সে যুগের মনিষীদের মিলন ও বকৃতা হইত। শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, গগণেন্দ্র নাথ ঠাকুর, আচার্য্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, জগদীশ চন্দ্র বোস ইত্যাদি। সেই সমস্ত বকৃতার পর নানান ছাত্রের মধ্যে নানান রূপ মতানৈক্য দেখা যাইত। কিন্তু চুনীলাল সর্বদা তার নিজের idea-তে ভরী থাকিত। কোন circumstance-এসে তার মত হইতে অন্য মতে যাইত না।

কোন কোন ছুটিতে সে আমাদের বাটিতে আসিত। তার নিজের বাটির মত থাকিত। এ বাটির সবার সাথে সে এক হইয়া যাইত। সে যে অন্য বাটির কিংবা অন্য family-র তাহা বোঝা যাইত না।

আমার ৪র্থ ভাই শ্রীমান সমরেন্দ্র নাথ তখন তার ৬/৭ বৎসর বয়স। ভাই চুনী সম্বন্ধে তার যাহা মনে আছে সে তার নিজ ভাষায় লিখিয়া এই পত্রের মাঝে পাঠাল। ইহা হইতেও তার কিছু কিছু পরচয় পাইবেন।

তার সম্বন্ধে ৫/৬ বৎসর অনেক ছোট বড় ঘটনার সহিত জড়িত ছিলাম। পরে পরে যদি মনে হয় লিখিতে পারি; অবশ্য যদি আপনার অপছন্দ না হয়।

ভাই চুনীলালের প্রতিভা হঠাৎ তার জীবনের পূর্ণতার পর্বেই অস্তমিত হওয়ার অপুরনিয় মানবিক ক্ষতি হইল বটে; কিন্তু সেই অমর আত্নার সম্বন্ধে আপনি অগ্রণি হইয়া কিছু কিছু প্রকারে উদ্যোগী জানিয়া আমি এত আনন্দিত হইয়াছি যে তাহা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। শ্রী ভগবান তার আত্নাকে higher heaven এ শান্তিতে রাখুন এই প্রার্থনা করি।

আপনি আমার অনেক অনেক ধন্যবাদ, শুভেচ্ছা ও নমষ্কার জানিবেন। ভগবান আপনার এই ঐকান্তিক প্রচেষ্টার সার্থক করুন ইহা ইচ্ছা করি।

আমার হস্তাক্ষর হয়ত আপনার পড়িবার অসুবিধা হইবে ইহাতে অনেক ভুল ও ভাষার ত্রুটি রইল। অতএব যেহেতু আপনি ঐ ভাষা (প্রকার) সংস্থার সভাপতি, যদি ইহা আপনার publication-এ দিতে ইচ্ছা হয় আপনার মনোমতভাবে edit করিয়া লইবেন দয়া করিয়া।

আপনার সংস্থার পত্রিকায় যদি কোন (print) থাকে পাঠাবেন। আপনাদের সংস্থার activity সম্বন্ধে জানার ইচ্ছা রহিল।

আবার নমস্কার লইবেন।

ইতি-

শ্রী অমরেন্দ্রনাথ রায়, painter

Roy’s pedigree poultry firm

 

 



লেখকঃ সুগত চাকমা ( ননাধন), কবি, গীতিকার, প্রাবন্ধিক ও গবেষক; প্রাক্তন ভারপ্রাপ্ত পরিচালক, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইন্সটিটিউট, রাঙ্গামাটি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here