icon

চুনীলাল দেওয়ানঃ আমাদের গর্ব ও প্রেরণা

Jumjournal

Last updated Mar 14th, 2020 icon 425

জুম্ম জাতির নক্ষত্রতুল্য এক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব শ্রী চুনীলাল দেওয়ান। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এই ব্যক্তিত্ব জীবদ্দশায় ছিলেন সমকালীন জুম্ম সাহিত্য, সংষ্কৃতির একমাত্র ধারক ও বাহক।

বিভিন্ন সৃজনশীল কর্মের মাধ্যমে তিনি নিজ প্রতিভার স্বার্থক পরিস্ফুটন ঘটিয়েছেন। তাঁর দক্ষ ও শৈল্পিক হাতের ছোঁয়ায় জুম্ম সাহিত্য, সংষ্কৃতি নব নব সংযোজনায় সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে।

দীর্ঘকাল যাবত মূল জাতির স্রোতধারা থেকে বিচ্ছিন্ন জুম্ম সভ্যতা শ্রী চুনীলালের মাধুর্যমন্ডিত ঐতিহ্যবিজড়িত শৈল্পিক কর্মধারাকে বুকে ধারণ করেই জাতীয় ক্ষেত্রে বেশ পরিচিতি লাভ করেন।

এই ব্যক্তি একাধারে চিত্রশিল্পী, কবি, গীতিকার, সুরকার, গায়ক এবং ভাষ্কর্য শিল্পী ছিলেন। আবার তাঁর দক্ষ হাতের স্পর্শে হারমোনিয়াম, পিয়ানো, বাঁশী, সেতার ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্র সুরের মূর্চ্ছনায় নেচে উঠত।

ইংরেজী ১৯১১ অব্দের ৩রা ফেব্রুয়ারি পার্বত্য চট্টগ্রামের দীঘিনালার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে শ্রী চুনীলাল দেওয়ান জন্ম নেন।

চেঙ্গী বড়াদামবাসী পিতা শশীমোহন দেওয়ান তখন দীঘিনালা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পদে কর্মরত। বাল্যকাল থেকেই এই শিল্পী সাহিত্য-সংষ্কৃতির একনিষ্ঠ প্রেমিক ছিলেন। রাংগামাটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষা সমাপ্ত করে তিনি কলকাতা আর্টস কলেজে ভর্তি হন।

সেখানে অধ্যয়নকালে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে তিনি বেশ সাফল্যের পরিচয় দেন। নিজ প্রতিভা তাঁকে রবি ঠাকুর প্রমুখ বরেণ্য ব্যক্তিত্বদের সংস্পর্শে আসতে সহায়তা করে।

দুই মৌজার হেডম্যান ও একটি বাজারের বাজার চৌধুরী শ্রী চুনীলাল দেওয়ান রাংগামাটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়েও দুই বৎসরকাল শিক্ষকতা করেন।

প্রথমে বিয়ে করেন কউলি বাজারের ডাকসাইটে বাজার চৌধুরী আনন্দ মোহন দেওয়ানের কন্যা শ্রীমতি চারুবালা দেওয়ানকে। প্রথমা স্ত্রীর বিয়োগের পর তিনি দ্বিতীয়বার দ্বার পরিগ্রহ করেন।

তাঁর দ্বিতীয়া স্ত্রী শ্রীমতী বসুন্ধরা দেওয়ান বর্তমানে ছয়কড়ি বিল মৌজার হেডম্যান ও নানিয়াচর বাজারের বাজার চৌধুরী।

১৯৫৫ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তায় এক আন্তর্জাতিক চিত্র প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়ার জন্য তাঁর যুক্তরাষ্ট্র যাবার যাবতীয় ব্যবস্থাদি সম্পন্ন হয়। কিন্তু তাঁর আর যাওয়া হয়নি। সে বছরের ৮ই ডিসেম্বর ‘ফুড পয়জনিং’ এর শিকার হয়ে তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত হতে বাধ্য হন।

চুনীলাল দেওয়ান ছিলেন মূলত চিত্রশিল্পী। পেন্সিল বা কলমের স্কেচ,জল রং ও তৈল রঙের চিত্র তিনি আঁকতেন। তাঁর চিত্রকর্মের উপজীব্য ছিল বৈচিত্র্যময় প্রকৃতি, জুম্ম সমাজের মানুষ এবং তাঁদের সহজ সরল জীবনধারা।

ঢাকায় অনুষ্ঠিত লোকশিল্প প্রদর্শনীতে তাঁর চিত্রকর্মসমূহ ব্যাপকভাবে দর্শকদের দৃষ্টি কাড়ে। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন ও কামরুল হাসান তাঁর চিত্রকর্মের বেশ প্রশংসা করেন।

উল্লেখ্য যে জয়নুল আবেদিন ছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তিনি তাঁর সাথে যৌথভাবে ‘জলপ্রপাত’ নামক বিখ্যাত ছবিটি অংকন করেন।

ঢাকা, রাংগামাটি, চট্টগ্রাম ও ফরিদপুরে তাঁর অংকিত চিত্রকর্মের প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এটা অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে প্রতিভাবান এই শিল্পীর অধিকাংশ চিত্রকর্মই নানাভাবে হারিয়ে যায়। অল্প কয়েকটি মাত্র ছবি আজও তাঁর স্মৃতিকে ধরে রেখে টিকে আছে।

চুনীলাল দেওয়ানকে একজন ভাস্কর্য শিল্পী হিসেবেও আখ্যা দেয়া যায়। মাটি, সিমেন্ট, কাঠ ইত্যাদি উপাদানের মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন ডিজাইনের ভাস্কর্য গড়তেন।

তাঁর নিজের তৈরি সিমেন্টের একটি বিরাট মূর্তি ও কাঠের উপর খুদিত বুদ্ধ ও আনন্দের একটি ভাস্কর্য বর্তমানে নানিয়াচর থানার ‘বিশ্বলতা জনকল্যাণ বৌদ্ধ বিহার’ এ আছে বলে জানা গেছে।

আজ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যানুসারে বলা যায় যে, শ্রী চুনীলাল দেওয়ানই চাকমা ভাষায় প্রথম আধুনিক কবিতা রচনা করেন। তাঁর লিখিত একটি মাত্র আধুনিক চাকমা কবিতা পাওয়া গেছে যেটির কোন শিরোনামাংকৃত ছিল না।

কবিতাটি বঙ্গানুবাদসহ ‘চাকমা কবিতা’ নামে ‘গৈরিকা’ পত্রিকার ১১শ বর্ষ ১২শ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। কবিতাটির বঙ্গানুবাদ করেন তৎকালীন রাজমাতা বিনীতা রায়। এ কবিতাটি আদ্যপান্ত পড়লে মনে একটি প্রশ্ন জাগে কবি কি প্রথম লেখনীতেই এমন উৎকৃষ্ট কবিতা রচনা করতে পেরেছিলেন?

আর যদি তা না হয়ে থাকে! তাহলে তৎপূর্বে লিখিত আধুনিক কবিতাগুলো কোথায় গেল? নাকি সেগুলোর ভাগ্যও তাঁর হারিয়ে যাওয়া চিত্রকর্মের অনুরূপ হয়েছে?

Chunilal Dewan and his mate of Art college including Zainul Abedin
চুনীলাল দেওয়ান (ছবির ১ম সারির বাম দিক থেকে তৃতীয়)
শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনসহ কোলকাতা আর্ট কলেজের প্রাঙ্গণে, ছবিঃ জ্যোতি চাকমার নিজস্ব সংগ্রহ

কবিপুত্র শ্রী দেবীপ্রসাদ দেওয়ানের প্রচেষ্টায় বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কবির কবিতাগুলোর পান্ডুলিপি সংগৃহীত হয়েছে। তাতে বাংলা ভাষায় রচিত ১১টি কবিতা রয়েছে। তাঁর কাব্য রচনার একটি বিশেষ দিক ছিল তিনি অনেকাংশে ধর্মীয় চেতনার দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন।

তাঁর বেশ কয়েকটি কবিতায় মহামানব বুদ্ধের প্রশস্তি কীর্তিত হয়েছে। এছাড়া চিরন্তন প্রেম কথা ও নির্মল নিসর্গপ্রীতি ছিল তাঁর কবিতার প্রধান উপজীব্য।

জ্ঞান তাপস কবি তাঁর ‘সারস্বত আহ্বান’ কবিতার মাধ্যমে পার্বত্যবাসীকে জ্ঞানের আলো গ্রহণ করে নিজের অজ্ঞতা-অন্ধকারকে দূর করার উদাত্ত আহ্বান জানান।

চুনীলাল দেওয়ানের নিজ হাতে তৈরি পান্ডুলিপিতে বত্রিশটি গান পাওয়া গেছে। তার কয়েকটি গানের মধ্যে বাঁশির সুরে, ব্যর্থ আশা, মিলন, অভ্যর্থনা গীতি ও সভাসঙ্গীত উল্লেখযোগ্য। ১৯৭৯ সালে রাংগামাটি প্রকল্পনা সাহিত্যাঙ্গন থেকে প্রকাশিত কয়েকটি লিটল ম্যাগাজিনে তাঁর বেশ কটি গান প্রকাশিত হয়।

এর পর ১৯৮০ সালে একই প্রকাশনা সংস্থা কর্তৃক প্রকাশিত হয় তাঁর গীতসংকলন ‘নিবেদন’ (অধ্যাপক নন্দলাল শর্মা সম্পাদিত) চুনীলাল দেওয়ানের অধিকাংশ গানে বিশ্ববিধাতার স্বরূপ ও মহিমা কীর্তিত হয়েছে।

নিজের লেখা অনেক গানে তিনি সুরারোপ করেছিলেন বলে শোনা যায়। তাঁর গানগুলো রবীন্দ্র সংগীত দ্বারা সরাসরি প্রভাবিত। সুরের ক্ষেত্রেও একই কথা বলা যায়।

রবীন্দ্র সান্নিধ্যই হয়তো এ ক্ষেত্রে তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছিল তিনি নিজেও ভাল গায়ক ছিলেন। তাঁর লিখিত ও সুরারোপিত অনেক গানের লিখিত রূপ পাওয়া যায়নি সেগুলো লোকমুখে ছড়িয়ে আছে বলে অনেকের বিশ্বাস।

শ্রী চুনীলাল দেওয়ান সাহিত্য-সংষ্কৃতি অঙ্গনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাধনা চালিয়েছেন। তাঁর সৃষ্ট কোন কোন কর্ম ছিল জুম্ম সংষ্কৃতিতে সম্পূর্ণ নতুন সংযোজন। উপযুক্ত প্রচার মাধ্যম না পাওয়াতে তাঁর সৃষ্টি সম্পূর্ণ ও আরো বিস্তৃত আঙ্গিকে প্রচারিত হতে পারেনি।

অবশ্য তৎকালীন পার্বত্য চট্টগ্রামের দুই জেলা প্রশাসক মেজর জি. এল. হাইড ও লেঃ কঃ নিবলেট, শ্রী চুনীলাল দেওয়ানের প্রতিভাকে বিকাশ ও প্রচারে বেশ সাহায্য করেন। তাঁরা ব্যক্তিগতভাবে অনুরোধ জানিয়ে তাঁকে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করাতেন।

তাঁদের আগ্রগতিশয্য তাঁর শিল্পকীর্তিসমূহ লোকচক্ষুর দৃষ্টিগোচর হতে বেশ সহায়তা পায়। ১৯৫৫ সালের কোন এক অমানিশা লগ্নে আমরা তাঁকে হারালেও তাঁর চেতনাকে, মহৎ অবদান সমূহকে তো আমরা ভুলে যেতে পারি না।

জাতিকে এই মহান ব্যক্তিত্বকে সদা স্মরণ রাখতে হবে। এজন্য তাঁর জন্মজয়ন্তী ও মৃত্যুবার্ষিকী পালনের উদ্যোগ নিতে হবে, হারিয়ে যাওয়া বিভিন্ন শিল্পকর্মাদি উৎঘাটনের ও শিল্পকর্মসমূহের যথাযথ সংরক্ষণ ও প্রচারের ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

যাতে বর্তমান প্রজন্ম তাঁর অবদানগুলোকে স্মরণে রেখে জাতির স্বার্থে বিভিন্ন প্রগতিশীল ও কল্যাণধর্মী কর্মকান্ডে নিজেদের আত্মনিয়োগের প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হতে পারে।

তাঁরা জানুক, বুঝুক, উপলব্ধি করুক অমর ব্যক্তিত্ব চুনীলাল দেওয়ান শুধু জুম্ম জাতির গর্ব নয়, জাতিকে সমৃদ্ধ ও গৌরবোজ্জ্বল আসনে প্রতিষ্ঠিত করার অঙ্গীকারও।


লেখকঃ প্রতিম দেওয়ান

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা

Jumjournal

Administrator

Follow Jumjournal

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *