icon

তালিক শাস্ত্র ও চাকমা বর্ণমালা

Jumjournal Admin

Last updated Feb 19th, 2020 icon 596

বাংলা ভাষার প্রাচীন গ্রন্থ চর্যাপদ ও শ্রীকৃষ্ণ কীর্তনের পান্ডুলিপিগুলো বাংলা মুদ্রণ যন্ত্র আবিষ্কার হওয়ার পূর্বে লিপিকারদের দ্বারা অনুলিখিত হয়ে বিভিন্ন জায়গায় প্রচলিত ছিল। এভাবে বিভিন্ন প্রাচীন পুঁথি পত্রগুলো প্রতিলিপি ও অনুলিখিত হয়ে চালু ছিল। ঠিক তেমনি চাকমা ভাষাও বর্ণে বৈদ্যদের দ্বারা লিখিত তন্ত্র মন্ত্র ও কবি (গীতি কবি) লেখকদের রচিত পুরোনো পুঁথি পত্রগুলো আবহমান কাল ধরে চাকমা সমাজের মধ্যে বিক্ষিপ্ত অবস্থায় প্রচলিত আছে।

সংখ্যালঘু সম্প্রদায় যেমন সংখ্যাগুরু ব্যাপক জনগোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্য স্বীকারে বাধ্য হওয়ার মাধ্যমে কালক্রমে নিজ মৌলসত্তার অবলুপ্তিকে স্বীকার করে নিয়ে আপন ভাষা, সংস্কৃতি শব্দ ও বর্ণের ব্যবহার্যতা সম্পর্কে নানা দ্বিধা, দ্বন্ধ ও অনীহার জন্ম দেয়, তেমনি চাকমা বর্ণ বা অক্ষরগুলো ও বিশেষভাবে স্মতর্ব্য যে চিন্তা সে নিজগুণে যতই উৎকৃষ্ট হোক না কেন নিত্য নতুন খোরাক না পেলে তার ক্ষয় অনিবার্য। যার ক্ষয় হয়ে যেতে বর্তমানে বৈদ্য বা অঝারা ছাড়া আমরা নিজেরাই নিজস্ব বর্ণমালাকে অচেনা ভিনদেশী বর্ণমালার মত মনে করতে দ্বিধা করছি না। অথচ চাকমা বর্ণমালায় লিখিত প্রাচীন পুঁথিপত্র, বৈদ্যদের তন্ত্র মন্ত্র ও তালিক শাস্ত্রের দ্বারা বিভিন্ন জটিল রোগ ব্যাধির চিকিৎসা এবং পারিবারিক সামাজিক রীতিনীতি, ধ্যান ধারনা ও লৌকিক আচার ক্রিয়া কর্মগুলো সমাধা করে আসছে; হয়তো ভবিষ্যতেও করবে।

এই প্রসঙ্গে আমার একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা না বলে পারছি না। সেটা হচ্ছে ১৯৭০ সালে বাবা যখন আমাকে স্থানীয় একটি বৌদ্ধ বিহারে এক সপ্তাহের জন্য শ্রমণ করে দেন। এই সপ্তাহের মধ্যে লক্ষ্য করলাম বিহার অধ্যক্ষের বাংলা বর্ণের ধর্মীয় কোন পুস্তক নাই। তাহলে তিনি কীভাবে ধর্মীয় সূত্রগুলো মুখস্ত করে ধর্মীয় পৌরহিত হলেন? জেনে নিয়ে দেখি তিনি বাংলা জানা অন্যকেহ থেকে চাকমা বর্ণে শ্রুতি লিখন করতেন আর যাদের চাকমা বাংলা অক্ষর জ্ঞান আছে তাদের মাধ্যমেও অনুলিখন করে নিতেন। পরবর্তীতে গ্রাম অঞ্চলে লক্ষ্য করলাম চাকমা বর্ণমালার সাহায্যে ধর্মীয় গাঁথা ও সূত্রগুলো ঠিক অনুরূপভাবে অনুলিখন করে বাংলা অক্ষর জ্ঞানহীন চাকমা সম্প্রদায়ের বৌদ্দ ভিক্ষুকেরা বিভিন্ন ধর্মীয় ক্রিয়া কর্মগুলো সম্পাদন করতেন। বর্তমানে প্রত্যন্ত গ্রাম অঞ্চলে প্রবেশ করলে হয়তো এরকম দু’একজন বৌদ্দ ভিক্ষুকের সাক্ষাৎ এখনো পাওয়া যেতে পারে।

অন্যদিকে কবি বা গীতি কবিদের দ্বারা রচিত চান্দবী বারমাসী, মেয়্যাবী বারমাসী আর পালদের মধ্যে নরপুদি পালা, যুক্তপুদি, কমলা পুদি পালা সহ ইত্যাদি পালার পান্ডুলিপিগুলো দেখে জানা যায় তাঁদের চাকমা বর্ণমালার প্রীতি আর মমত্ববোধ রয়েছে। এছাড়াও এই সমস্ত পান্ডুলিপিগুলো পাঠ উদ্ধার করে জানা যায় চাকমা সমাজের ঐতিহাসিক শৈর্য্যাবীর্য্যর কাহিনী এবং রোমান্টিক প্রণয় রসবোধের ধারা। যদিও তারা ব্যাকরণগত শিক্ষায় শিক্ষিত নয়, এমনকি বাংলা বর্ণেও পর্যন্ত দক্ষ নয়, তবুও তারা নিবিড়ভাবে মনের অগোচরে লালন-পালন করে গিয়েছে নিজস্ব ভাষা ও বর্ণে। যাই হোক আলোচ্য প্রবন্ধে যখন অঝা বা বৈদ্যদের কথা লিখতে যাচ্ছি, সুতরাং একটু স্পষ্ট করে বললে বোধ হয় তাদের সম্পর্কে ধারনাটা পরিস্কার হয়ে যাবে।

চাকমাদের মধ্যে অনেক অঝা আছে যেমন বুর পারা, থান মালা (গঙ পুজা) চুমুলঙ অঝা ইত্যাদি অঝা থাকলেও মূলত অঝা দুই প্রকার প্রথমত যারা পূজা পার্বনসহ বিভিন্ন তন্ত্রমন্ত্র ও তালিক শাস্ত্রের মাধ্যমে মানুষের নানা রোগ ব্যাধির চিকিৎসা করে থাকেন, তারা অঝা নামে সমাধিক পরিচিত। আর যারা ধাত্রী কাজে নিয়োজিত তারাও অঝা নামে পরিচিত এবং সাধারণত মহিলারাই এ কাজগুলো করে থাকেন। প্রথমোক্ত অঝারা প্রচুর জ্ঞানের অধিকারী। প্রয়োজনে তারা ধাত্রীর ভূমিকা পালন করে থাকেন, যদি জরুরী মুহূর্তে ধাত্রী অঝা (মহিলা) পাওয়া না যায়। তবে অনেকেই ধাত্রীর কাজগুলো বা ধাত্রীবিদ্যা চর্চা করে না, তার কারণ ধাত্রীবিদ্যা মহিলা অঝাদের কাজ বলে।

এবার বৈদ্যদের প্রসঙ্গে ফিরে আসা যাক, তন্ত্র মন্ত্র ঝার ফুঁক ও তালিক শাস্ত্রের মাধ্যমে যারা বিভিন্ন রোগ ব্যাধির চিকিৎসা করে থাকেন তাদের বলা হয় বৈদ্য। সাধারণত বিভিন্ন তন্ত্র মন্ত্র ও তালিক শাস্ত্রের প্রচুর জ্ঞানের অধিকারী। ফলে তারা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করার ক্ষমতা রাখেন। শুনা যায় অনেক বৈদ্যের এমন কতগুলো লিখিত কড়া তন্ত্র মন্ত্র আছে যে সেগুলো বাড়ীতে রাখা যায়না। যার জন্য পুঁটলী বেঁধে সে কড়া তন্ত্র মন্ত্র লিখিত বইগুলো নিরাপদ জায়গায় রাখতে হয়। গাছের নিচে রাখলেও নাকি সে গাছ যত বড় হোক না কেন ধীরে ধীরে সে গাছ মরে যায়।

এই সমস্ত বিদ্যা সংরক্ষণের জন্য নানাবিধ অসুবিধার দরুন বৈদ্যদের মধ্যে অনেকেই এ বিদ্যা থেকে ক্রমান্বয়ে দূরে সরে যাচ্ছন। আর যারা এ বিদ্যাগুলো সংরক্ষণে বা দীক্ষা নিতে ইচ্ছুক তারা পরিপূর্ণভাবে পাচ্ছন না কিংবা বড় বৈদ্যরা দিচ্ছেন না। তার প্রধান কারণ এ কড়া বিদ্যা বা তন্ত্র মন্ত্র গুলে শিষ্যের হাতে গিয়ে পড়লে সেগুলো যে কোন সময় ব্যবহৃত হতে পারে বা অন্যের প্রভূত ক্ষতি হতে পারে। আবার অনেক বৈদ্যই তার উত্তরসূরী বা শিষ্যকে এ বিদ্যা দিয়ে থাকেন। কিন্তু তা নির্ভর করে গুরু ও শিষ্যের মন মানসিকতার উপর।

আরো একটি লক্ষনীয় বিষয় এই যে, বৈদ্যরা বিশ্বাস করতেন যতক্ষণ পর্যন্ত সঠিক বানান ও শুদ্ধ উচ্চারণ হবে না ততোক্ষণ পর্যন্ত মন্ত্রটা প্রয়োগের ক্ষেত্রে কাজে আসবেনা। তাই তারা তাদের উত্তরসূরী বা শিষ্যদের দীক্ষা দেওয়ার সময়ে তন্ত্র মন্ত্র গুলোর বানান ও উচ্চারণ শুদ্ধ হচ্ছে কিনা তা সজাগ দৃষ্টি রাখেন। এইভাবে অঝা বা বৈদ্যদের মাধ্যমে যুগ যুগ ধরে আমাদের চাকমা বর্ণমালা বিচ্ছিন্নভাবে প্রচলিত আছে।

এইভাবে অঝা, বৈদ্য, লিপিকর, অনুলেখক গীতি কবি (গেঙখুলী) ও চায়ন কবিদের কাছ থেকে চাকমা ভাষা ও বর্ণে রচিত বিভিন্ন তন্ত্র মন্ত্র, পুঁথি, পালা গান, আখান ভাগ ও প্রণয় কাহিনী আমরা পেয়েছি যেগুলো আমাদের ভাষা ও সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ হিসেবে উত্তীর্ণ। আজ আমাদের বলতে দ্বিধা নেই যে, অঝা বা বৈদ্যরা যদি গুরু পরম্পরায় ও শিষ্যের শিষ্য গড়ে তুলে চাকমা ভাষা ও বর্ণে লিখিত তাদের তন্ত্র মন্ত্র গুলো যদি হস্তান্তর বা প্রদান না করতেন তাহলে বিংশ শতাব্দীর এই প্রান্তে জোড় গলায় বলতে পারতাম না যে আমাদের নিজস্ব ভাষা আছে, বর্ণ আছে, সাহিত্য আছে। তাই চাকমা বর্ণ বা ভাষার লিখিত রূপের অস্তিত্বের জন্য অঝা বা বৈদ্যদের অবদান সবচেয়ে বেশী একথা অস্বীকার করার কোন জো নেই। যুগের বিবর্তন ও সময়ের প্রয়োজনে নবীনরাও বর্তমানে যুব সমাজ নিজস্ব ভাষা ও বর্ণের প্রতি ধীরে ধীরে সচেতন হয়ে উঠছে তাঁরা প্রাচীনদের মত আর ঘুমিয়ে নেই। তাদের চেতনা ও নিরলস প্রচেষ্টা একদিন নয় একদিন আমাদের ভাষা ও বর্ণ ফুলে ফুলে সুশোভিত হয়ে উঠবে বলে আমার একান্ত বিশ্বাস।


লেখকঃ মৃত্তিকা চাকমা

Share:
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - [email protected] এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা

Jumjournal Admin

Administrator

Follow Jumjournal Admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *