চাকমা সমাজের যত পূজা পার্বণ (পর্ব – ৪)

0
68

সিন্দি

অনেকদিন আগে সিন্দি পুধি বা সত্যনারায়ণের পাঁচালী নামে একটা পুঁথি বাজারে কিনতে পাওয়া যেতো। পঞ্চাশের দশকে স্বর্গীয় হর কিশোর চাকমা এই বইয়ের অনুকরণে ভগবান বুদ্ধের সত্য পারমীকে ভিত্তি করে সত্য পাঁচালী নামে আরেকটি পুৃঁথি রচনা করেন।এটাও আর এখন পাওয়া যায়না। চাকমা ভাষায় সিন্দি আর বাংলায় শির্ নী। তখনকার দিনে চাকমাদের প্রায় ঘরে ঘরে হিন্দুদের দেখাদেখি সত্য নারায়ণের নামে শির্ নী দেওয়া হতো। মুসলমান সমাজে ও তখন এই ধরণের শির্ নী দেওয়ার রেওয়াজ ছিলো আর তা উৎস্বর্গ করা হতো সত্য পীরের নামে। সত্য নারায়ণ আর সত্য পীর যেই হউন, উভয়ে তখন খুব জাগ্রত দেবতা বলে বিবেচিত হতেন। সন্ধ্যাকালে কিংবা এঁটোমুখে ভূলে ও কেউ কখন ও শির্ নীর নাম মুখে আনতে সাহস করত না। অকারণে এই পূজার কথা নিয়ে তোলপাড়া করলে কিংবা শির্ নী নিয়ে কেউ কখন ও সামান্যতম অশ্রদ্ধা দেখালে তখন নাকি সত্যি সত্যি কিছু একটা বিপদ দেখা দিতো। হয়তো: জঙ্গলে বাঘের উপদ্রব দেখা দেবে। পাড়া গ্রামে ওলাউঠা, বসন্ত ইত্যাদির মড়ক লেগে যাবে; নির্দেশপক্ষে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বিশেষ কিংবা তার পরিবারের কারো না কারোর প্রাণহানি ঘটতে পারে। নানা কারনে লোকে এই পূজা মানত করে। বিবিধ রকমের বিপদমুক্তি, জীবনাশঙ্কা, বৈষয়িক সমৃদ্ধি এমন কি ক্ষেতে পোকা মাকড়ের উপদ্রব নিবারণের জন্যও লোকে সত্যেপীর বা সত্য নারায়ণের নামে শির্ নী দিত। তবে বাঘের উপদ্রব নিবারণই নাকি এই পূজার বিশেষত্ব। বিপদের গুরুত্ব অনুসারে লোকে একসঙ্গে একাধিক শির্ নী মানত করত। পুঁথির ভাষায় এই পূজার জন্ম – ‘সোয়াসের দুগ্ধ লাগে সোয়াসের আটা, সুপক্ষ কদলী লাগে সোয়াসের মিঠা।’ তাছাড়া আখ, নারিকেল, পান সুপারি এবং বিবিধ প্রকার ফুল ও লাগে। তুলসী এই পাতায় অপরিহার্য। একাধিক পূজা হলে সমপরিমাণ উপকরণ দিয়ে আলাদা আলাদা পূজা পাশাপাশি সাজাতে হয়। পূজার সময় প্রত্যেকটা পূজার শিয়রে এক একটা পিদিম জ্বলে আর লেখাপড়া জানা একজন লোক ব্রাক্ষ্মণের ভূমিকা নিয়ে সুর করে পুঁথি পড়তে থাকে। এই সময় গৃহস্থ এবং উপস্থিত ব্যক্তিবর্গ পূজার কিছু না কিছু দক্ষিণা দিয়ে থাকে। পূজার প্রদত্ত পান সুপারি এবং এইসব দক্ষিণার পয়সা পুঁথি পাঠকারী ব্রাক্ষ্মনেরই প্রাপ্য। পূজা শেষে দুধ, আঠা, গুড়, কলা, নারিকেল, ইত্যাদি একটা বড় পাত্রে নিয়ে শির্ নী মাখানো হয়ে থাকে। তারপর গৃহস্থের জন্য পরিমাণ মতো কিছু শির্ নী রেখে বাকিটা পড়শী দের মধ্য বিলিয়ে দেওয়া হয়। খাওয়ার আগে শির্ নী প্রথমে মাথায় নিতে হয়। এই সময় শির্ নী খাওয়ার জন্য পাড়ার ছেলে পিলেদের মধ্য এমন কাড়াকাড়ি লেগে যায় যে, তাই নিয়ে চাকমাদের মধ্যে একটা বাঁগধারাই চালু হয়ে গেছে-“সিন্দি খিয়া গুরাগুন” অর্থাৎ কিনা শির্ নী খেকো বাচ্চারা। এই শির্ নী যেখানে সেখানে ফেলা বারণ। উচ্ছিষ্ট সবকিছুই নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। মুসলমান সমাজে শির্ নী করে খাওয়া হয়ে থাকে। চাকমাদের মধ্যে কিন্তু কাঁচা খাওয়াই বিধি। ব্যাপারটা যদি ও স্বাস্থ্য রক্ষা সম্মত নয় তবু এটা একটা আশ্চর্যের ব্যাপার যে শির্ নী খেয়ে কারোরো কোনদিন সামান্যতম পেটের অসুখ করেছে, এমনটি কখন ও শুনা যায়নি। চাকমা ভাষায় সিন্দি নিয়ে মোট তিনটি বাঁগধারা পাওয়া গেছে। যেমন – ১। সিন্দি খিয়া গুরাগুন, যেটি পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে।

২। “মানিক্যা বাবর সিন্দিখানা”- অর্থ, মানিকের বাবার শির্ নী খাওয়া। অর্থাৎ যখন সে শির্ নী খেতে গেলো কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। এরুপ দেরী করা যাদের স্বভাব ইংরেজীতে তাদের বলা হয়, ‘Late latif’. ৩। ‘সিন্দিকলা’-অর্থাৎ শির্ নী পূজায় দেওয়া খোসা ছাড়ানো কলার মতো একেবারে উদোম গা।


ফানাচ্ বাত্তি

চাকমারা বিশেষ বিশেষ বৌদ্ধ পর্বদিনে ফানাচ্ বাত্তি উড়িয়ে দেয়। ফানাচ্ বাংলায় ফানুচ। একে আকাশ প্রদীপ ও বলা হয়ে থাকে। ফানুস উড়িয়ে দেওয়া বৌদ্ধদের এক ধরণের প্রদীপ পূজা। কথিত আছে- রাজ কুমার সিদ্ধার্থ যখন গৃহত্যাগ করে অনোমা নদীর তীরে উপস্থিত হন তখন প্রব্রজ্যা গ্রহণের জন্য স্বহস্তে অসি দিয়ে নিজের ভ্রমর কৃষ্ণ কেশরাজি ছেদন করেন। মহাব্রক্ষ্মা সঙ্গে সঙ্গে ঐগুলি মাটিতে পড়ার আগে স্বহস্তে গ্রহণ করে ব্রক্ষ্মলোকে নিয়ে যান এবং সেখানে সেই চুল নিয়ে ‘চুলামনি চৈত্য’ নামে একটি চৈত্য স্থাপন করেন। চাকমারা তথা সমগ্র বৌদ্ধ জগত ফানাচ্ বাত্তি অর্থাৎ আকাশ প্রদীপ জ্বেলে সেই চুলামণি চৈত্যর উদ্দেশ্য পূজা নিবেদন করে থাকে।


আহ্জার বাত্তি

বিপদমুক্তি কিংবা রোগমুক্তি কামনায় লোকে আহ্জার বাত্তি মানত করে। এটি আসলে ভগবান বুদ্ধের উদ্দেশ্য প্রদীপ পূজা। এই অনুষ্ঠান বৌদ্ধ বিহারে কিংবা স্বগৃহে সম্পন্ন করা যায়। আগেকার দিনে পুরোনো বৌদ্ধ পুরোহিত রুরিরাই এই পূজায় পৌরোহিত্য করতেন এই অনুষ্ঠানে। আহ্জার বাত্তি বা এক হাজার বাতি জ্বালিয়ে বুদ্ধের পূজা করা হয়ে থাকে। এতে এক হাজার মোমবাতি অথবা ছোট ছোট মাটির চার্টির উপড় সলিতা দিয়ে এক হাজার সরষে তেলের পিদিম জ্বালানো হয়ে থাকে। চাকমারা এই পিদিমকে বলে ‘এইচাদি’। স্বগৃহে এই পূজা অনুষ্ঠান সম্পন্ন করতে হলে প্রথমে বাড়ির প্রাঙ্গণে খোলা জায়গায় চতুষ্কোণ আকারে একটা পূজা মণ্ডপ তৈরী করে নিতে হয়। তার চারধারে জোড়ায় জোড়ায় খুঁটি পুঁতে বেশ কিছু বাঁশ লম্বালম্বি দুই ফালি করে চিরে সেগুলো খুঁটিগুলোর ফাকে প্রস্থাকারে এমন ভাবে সারি সারি বাঁধা দেওয়া হয়, যাতে প্রত্যেকটা বাঁশের ফালির খাঁজযুক্ত অংশটুকু উপরমুখো হয়ে থাকে। তারপর সেই খাজের মধ্যে সারি সারি মোমবাতি অথবা ‘এইচাদি’ অর্থাৎ সরষে তেলের পিদিম বসিয়ে দেওয়া হয়। সাধারণত সন্ধ্যারাতে এই হাজার বাতি জ্বালানো হয়ে থাকে। তখন গৃহস্থ পরিজন ছাড়া বহু পাড়া প্রতিবেশি এ কাজে অংশ নিতে আসে এবং বাতি জ্বালানো কাজে সরিক হয়ে পূণ্যাংশ গ্রহণ করে থাকে। অনেকে এই অনুষ্ঠানের সময় দুয়েকটা ফানুস ও উড়িয়ে দেয় এবং অনেক গৃহস্থ পরদিন ভিক্ষুসংগ সহ লোকজনকে খাওয়ায়।


ধর্মকাম

এই পূজার একাধিক নাম, যেমন – ধর্মকাম, জাদিপূজা, শিবপূজা, সীবলী পূজা ইত্যাদি। আসলে এটা বুদ্ধের শিষ্য লাভী শ্রেষ্ঠ সীবলী মহাস্থবিরের পূজা। এই পূজা এখন বৌদ্ধশাস্ত্র সম্মতভাবে বিহারে অথবা স্বগৃহে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। বৌদ্ধ ধর্মের চরম অবনতির যুগে মহাযানী বৌদ্ধ মতবাদের সাথে যখন হিন্দুদের তান্ত্রিক মতবাদের সাথে সংমিশ্রণ ঘটে তখন এই পূজা অনুষ্ঠানে ও বিকৃতি দেখা দেয়।সীবলী পূজা হয়ে যায় শিবপূজা। ক্রমে ক্রমে বলিদান প্রথাও এই পূজায় চলতি হয়ে পড়ে। তবে এই পূজা অনুষ্ঠানে যথাস্থানে বুদ্ধমূর্তী সংস্থাপন করা অবশ্য কর্তব্য। বছর সতেরো আগে ১৯৭০ ইংরেজীর শেষ ভাগে ১০৩ নং বাকছড়ি মৌজার বড় কাটাছড়ি গ্রামে স্বর্গীয় দুলাল দেওয়ানের গৃহে আমার একবার এরুপ এক পূজা অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার সৌভাগ্য হয়েছিলো। পূর্বোক্ত বৌদ্ধ পুরোহিত রুরিদের পৌরোহিত্যেই কেবল এই পূজা সম্পন্ন হতে পারে প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ “আঘরতারা” আবৃতি ও এখানে অপরিহার্য। তাছাড়া এই পূজার এমন কতকগুলো বিধিবিধান রয়েছে যার মূলে নিঃসন্দেহে বৌদ্ধ মতাদর্শ নিহিত রয়েছে। যেমন পূজার সময় গৃহস্থের ঘরে কিংবা পূজা মণ্ডপে শুচি শুদ্ধ না হয়ে কেউ প্রবেশ করতে পারে না। আর যতক্ষণ না পূজা শেষ হয় ততক্ষণ পর্যন্ত মদ, জগড়া প্রভৃতি নেশাপান প্রত্যেকের জন্য নিষিদ্ধ থাকে। এসব বিধিবিধান কোনটার বর খেলাপ ঘটলে পূজায় বিপর্যয় ডেকে আনে। অতি বিপদে পড়ে লোকে ধর্মকাম মানত করে। সিন্দির মতই এই ধর্মকাম ও বাসি মুখে মুখে জানতে নেই। সাধারণত: যখন জুমের ধান তোলা হয়, কাজকর্ম কর আসে, এরুপ প্রসস্ত সময়ে একটা শুভদিন দেখে এই অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা হয়। এতে পাড়ার সবাই যেমন নিমন্ত্রিত থাকে তেমনি একাজে সবার সক্রিয় সাহায্য ও পাওয়া যায়। পূজায় ৭টি মোরগ মুরগি, ১টি শূকর, প্রচুর শুঁটকি মাছ আর বিবিধ রকমের তরি তরকারী লাগে। অনেকে মানত করার দিনই নিজের পালের একটা শূকরের বাচ্চাকে পূজার জন্য নির্ধারিত করে খাসী করে দেয়। সেটা বড় হতে থাকে আর গৃহস্থ ধীরে ধীরে তৈরি হতে থাকে পূজার জন্য, যেহেতু এটা খুবই ব্যয়বহুল ব্যাপার। এই পূজার জন্য নিয়ত করে আগে ভাগে আলাদা ভাবে মদ বানানো হয়ে থাকে। চাকমাদের বিশ্বাসমতে এভাবে পূজার জন্য বানানো মিষ্টি জগরা দীর্ঘদিন রেখে দিলেও কিছুতে টকে যেতে পারে না। এই অনুষ্ঠানের দুটি পর্যায় রয়েছে। দু’টি দু’দিনে সম্পন্ন করতে হয়। প্রথম দিন পিঠা খাওয়া আর দ্বিতীয় দিনে আসল পূজা।

পিঠা খাওয়া পর্বে জন্য তেলে ভাজা ও ভাবে সিদ্ধ উভয় প্রকারের হরেক রকম চাকমা পিঠা প্রচুর পরিমাণে তৈরি করা হয়ে থাকে। পিঠা খাওয়ার দিন সন্ধ্যাবেলা অনেকে আবার আহ্জার বাত্তি ও জ্বালিয়ে থাকে, ফানুস ওড়ায়। তবে সেটা মানত করা নিয়ে কথা। পিঠা খাওয়ার পর সে রাত্রের মধ্যেই মুরগী, শূকর ইত্যাদি বধ করে আর শুটঁকি এবং অন্যান্য সব তরি তরকারী কুটনো কুটে নিয়ে পরদিন ভোরে পূজার জন্য রান্না চাপানো হয়ে থাকে। রুরিরা বলে থাকেন, মোরগ মুরগি এবং শূকর শিবের উদ্দেশ্যেই উৎসর্গ করা হয়। তবে আর্শ্চযের বিষয় যে, অন্যান্য পূজার মত এগুলো বলি দেওয়ার পূর্বে আগ্ পাতা ফেলে কোন দেবতার মতামত চাওয়া হয় না। মোরগ মুরগিতে ও কোন বাছবিচার নেই। ইত্যাদি কারণে স্বভাবতঃই এই পূজায় বলির বিধান নিয়ে প্রশ্ন জাগে। রান্না করতে হয় বাড়ীর বাইরে কোন সুবিধা জনক স্থানে। পূজার জন্য প্রথমে বাড়ীর উঠানে ৫/৭ জন লোক বসতে পারে মত একটা বাঁশের মাচান ঘর করতে হয়, যাকে বলে দানঘর। আসল পূজার জন্য জায়গা করতে হয় এর থেকে কিছু দুরে অপেক্ষাকৃত প্রশস্ত চত্বরে, যেখানে আলাদা একটা পূজা মণ্ডপ তৈরি করা হয়ে থাকে। নির্বাচিত জায়গাটি পরিষ্কার করে আগে থেকেই মাটি আর গোবর দিয়ে উত্তমরুপে নিকিয়ে ঝকঝকে তকতকে করে রাখা হয়। তারপর সেখানে জার্ফার বেড়া দিয়ে ঘিরে পূজা মণ্ডপ তৈরি করা হয়ে থাকে, যার উত্তর দক্ষিণ পূর্ব পশ্চিম চারদিকে চারখানা দরজা থাকে। এর কেন্দ্রস্থলে একই ধাচেঁর আরেকটি অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্রবৃত্ত তৈরি করে উভয় বেড়ার মাঝের ফাঁকা অংশটাকে চারভাগে ভাগ করা হয়। কেন্দ্রস্থলে বৃত্তটি ফাঁকাই থাকে। সমস্ত ব্যাপারটা চতুষ্কোণ কিংবা গোলাকার বৃত্তও করা যেতে পারে। পশ্চিম দরজার মুখে বুদ্ধিমুর্ত্তি স্থাপিত হয়ে থাকে। এই পূজায় একাধিক রুরির উপস্থিতি প্রয়োজন এবং তাদের মধ্যে যিনি প্রধান তিনিই এই পূজায় পৌরোহিত্য করেন। তাকে বলা হয় ‘গাথ্যা রুরি’। পূজার সময় তাকে ‘আঘরতারা’থেকে গাথা পাঠ করতে হয়, এজন্যই সম্ভবত:তাঁকে এই নাম দেওয়া হয়েছে। দান ঘরে পাঠ রতে হয় ‘মালেম তারা’ আর পূজা মণ্ডপে পাঠ করতে হয় সাহসফুলু তারা’ এবং ‘ধা-পারামী তারা’ (দান পারমী?)। রান্নাবান্না হয়ে গেলে সমস্ত অন্নব্যঞ্জন প্রথমে দানঘরেই তোলা হয়। সেখান থেকে পরিমাণ মত নিয়ে পূর্বাহ্নের মধ্যেই পূজা মণ্ডপে উৎসর্গ করা হয়ে থাকে। প্রথমে কেন্দ্রস্থলে একটি বৃহদাকারের অন্নকূট স্থাপন করে পূজা সাজানো হয়। বহির্ভাগের চার অংশে অন্নকূট স্থাপন করতে হয় প্রতি অংশে ষোলটা করে। তবে এগুলো অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র আকারের হয়ে থাকে। এগুলো দেখতে অনেকটা বৌদ্ধ চৈত্যের মত, মগ ভাষায় যাকে’জাদি’ বলে। এ জন্যই বোধ হয় এই পূজাকে জাদি পূজা ও বলা হয়ে থাকে।এ পূজার একটি অদ্ভুত সত্য আছে। পূজাতে একটি মাকড়সা আসবেই, না এলে পূজা সিদ্ধ হবে না। সেটি যদি আবার পূর্বদ্বারে ঢুকে পূজার যে কোন স্থানে জাল বুনে পশ্চিমদ্বারে বেরিয়ে যায় কিংবা রয়েই গেল ‘ভিতরে’ তবে গৃহস্থের পক্ষে অতি শুভ ফল দায়ক হয় বলে মনে করা হয়ে থাকে। মাকড়সা আসার আগে পূজায় মাছি বসলে সেটি অশুভ লক্ষণ বলে বিবেচিত হয়। পরে শত মাছি বসতে পারে, তাতে কোন ক্ষতি বৃদ্ধি ঘটেনা। কোন কারণে পূজায় যদি মাকড়সার আবির্ভাব না ঘটে তবে গৃহস্থ পরিজন সহ রুরি লুখাক* সকলে মন্ত্র আবৃতি করতে করতে পূজা মণ্ডুপ প্রদক্ষিণা করতে হয়, যতক্ষণ না মাকড়সার আগমন ঘটে। তবে সাধারণত: এতদূর কষ্ট স্বীকার করতে হয় না। স্বাভাবিক ভাবেই পূজারম্ভ-কালে মাকড়সার আবির্ভাব ঘটে। এই রকম কোন পূজায় কখনও কোন মাকড়সা আসেনি এরুপ ব্যাপার কখন ও ঘটেনি। পূজা শেষে রুরি লুখাক সকলে এসে দানঘরে আসন গ্রহণ করেন। তখন অবশিষ্ট অন্নব্যঞ্জন ভাগ করে কিছুটা নিজেদের জন্য রেখে বাকিটা দশের খাওয়ার জন্যে মাটিতে নামিয়ে দেওয়া হয়। আর তখন থেকে মদ, জগরা এবং খানাপিনা চলতে থাকে।


*রুরির সাহায্যকারী


লেখকঃ শ্রী বঙ্কিম কৃষ্ণ দেওয়ান

চাকমা পূজা পার্বণ, ১৯৮৯ ইং

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here