চাকমা সমাজের যত পূজা পার্বণ (পর্ব – ২)

0
40

গঙাত ভাতজরা দেনা 

ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের জ্বরজারি হলে চাকমা জননী সন্তানের রোগমুক্তির জন্য গঙা অর্থাৎ নদী বা ছড়ার জলে একমুঠি ভাত ছিটিয়ে দিয়ে আসেন। এই উদ্দেশ্যে একমুঠি ভাত এক টুকরো কলাপাতায় দিয়ে তাতে বাড়ির চারকোণা আর মাঝের খুঁটি থেকে দা’ও দিয়ে কিছু চিলতে তুলে মেশানো হয়ে থাকে। তারপর রুগ্নছেলের মাথায় উপর তা’ ধরে ছেলের মা এই বলে প্রার্থনা করেন যে, আজ অমুখের অসুখ ভালো হওয়ার জন্য ভাতজরা (মুঠিভাত) দিচ্ছি, হে মা গঙা!* ছেলেকে ভালো করে দাও। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘নিঝিলনাহ্’। এরপর সেই মিশ্রিত ভাতগুলো ঘাটে নিয়ে পানিতে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।

কারো যদি চোখ টাটায়, চোখ থেকে পিচুট গলে, কারো গায়ে দাদ, খোসপাঁচড়া ইত্যাদি চর্মরোগ দেখা দেয়, তবে তারও প্রাথমিক চিকিৎসা হিসাবে অনেকে গঙায় ভাতজরা দিয়ে থাকে। এসময় ভাতে সঙ্গে আর কিছু মেশাতে হয় না।

শুধু রোগ ব্যাধি নয় যেকোন ধরনের মানসিক মানসের ক্ষেত্রে এবং পারস্পরিক প্রতিজ্ঞাবোধের কাজেও এই ভাতজরা চাকমা সমাজে প্রচলিত। তাই গ্রামাঞ্চলে প্রায়ই যুবক যুবতীরা প্রেমের মোহে আবদ্ধ হয়ে পরস্পর মিলন ইচ্ছায় একসাথে গঙ্গায় ভাতজরা দিয়ে আসে। এই প্রসঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রেমিক যুগলের মুখে উভাগীত জুড়ে দেওয়া হয়েছে –

”দিলং ভাতজরা গঙ্গা-রে,

মলেহ্ মরিবং সমারে,”

 

গঙ্গাকে ভাতজরা দিলাম। প্রার্থনা করি,আমরা মরি তো যেন একসাথে মরি। অর্থাৎ মৃ্ত্যু পর্যন্ত কেউ যেন আমাদের পৃথক করতে না পারে।


মালক্ষ্মী মা পূজা 

আগেকার দিনে নিষ্ঠাবতী চাকমা গৃহিনীরা সপ্তাহে প্রতি বৃহস্পতিবার বাড়িতে একটি সিদ্ধ ডিম আর সাধারণ ভাত তরকারী দিয়ে মালক্ষ্মী মার পূজা দিত। বিশেষতঃ কেউ যদি স্বপ্ন দেখে যে কোন বুড়ি তার বাড়ীতে বেড়াতে এসেছে, তাহলে তো কথাই নেই। পরদিন মালক্ষ্মী মার পূজা অবশ্য কর্তব্য। বলাবাহুল্য, মালক্ষ্মী মা হলেন হিন্দুদের লক্ষ্মীদেবী। ধান ‘ফাঙ’ করার সময় এবং নবান্ন উৎসব কালেও মালক্ষ্মী মার পূজা অবশ্য করণীয়। মালক্ষ্মী মার প্রিয় ভোগ হল ভাডুই পাখী। অভাবে শূকর, মোরগ এমনকি কাঁকড়াও হলেও চলে। তাছাড়া মদতো আছেই। মজার কথা, হিন্দুদের নিবামিযাশী লক্ষ্মীদেবী চাকমাদের হাতে পড়ে মদ মাংস সবই ধরেছেন। সকালবেলা সকলের আহারের আগে মালক্ষ্মী মার ভোগ দিতে হয়। এর জন্য কোন অঝার দরকার পড়ে না। বাড়ীর গৃহিনীই স্নানান্তে শুদ্ধ শুচি হয়ে মাথায় ‘খবং’** জড়িয়ে পূজার চারধারে কিছু চাল আর জল ছিটিয়ে দেবীকে আবাহন করে ভোগ নিবেদন