icon

গারো ইতিহাস ও সংস্কৃতি

Jumjournal

Last updated Jan 19th, 2020 icon 1293

অস্তিত্বের লড়াইয়ে টিকে থাকা অল্পসংখ্যক মাতৃতান্ত্রিক আদিবাসী জাতির মধ্যে গারো অন্যতম। গারো নামে পরিচিত হলেও গারোরা নিজেদের ‘আচিক মান্দি’ বা ‘মান্দি’ নামে পরিচয় দিতে পছন্দ করে।

‘আচিক’ মানে ‘পাহাড়’ এবং মান্দি মানে ‘মানুষ’। দুইয়ে মিলে অর্থ ‘পাহাড়ের মানুষ’ দাড়ালেও গারোরা পাহাড় এবং সমতল দুই অঞ্চলেই বাস করে। ধারনা করা হয়, গারোদের আদি নিবাস চীনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সিন কিয়াং প্রদেশে।

সেখান থেকে তিব্বত অঞ্চল এবং পরবর্তীতে ভারত উপমহাদেশে গারোরা বসতি স্থাপন করে। ৪০০ খ্রীষ্টপূর্বে জাপ্পা জালিমের নেতৃত্বে ভারত উপমহাদেশে গারোদের আগমন।

প্রথমে তারা ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে বসতি স্থাপন করে, কিন্তু পরবর্তিতে বিদ্যমান অন্যান্য আদিবাসী গোষ্ঠির তাড়নায় গারো পাহাড়ের দিকে সরে যেতে বাধ্য হয়। উল্লেখ্য, গারো পাহাড়ের নামকরণ গারোদের নামানুসারেই হয়।

বর্তমানে গারোদের বাস ভারতের আসাম, মেঘালয়, কোচবিহার, নাগাল্যান্ড এবং বাংলাদেশের বৃহত্তর ময়মনসিংহ, সিলেট ও মৌলভীবাজার উপজেলায়। গারো সমাজব্যবস্থা ও সংস্কৃতি মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার কারনে নারীরা পরিবার ও সমাজের প্রতিনিধিত্ব করে।

কন্যাসন্তান সকল সম্পত্তির অধিকারী হয়, বিশেষত ছোট মেয়ে (নকি্মচিক)। তবে বর্তমানে অনেক মা-বাবাই তাদের সকল সন্তানদের সম্পত্তি ভাগ দিয়ে থাকেন।

পূর্বে গারো ছেলেদের যুবক বয়সে মা-বাবার বাড়ি ছেড়ে নক্পালথে (যেখানে যুবকদের বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া হয়) – তে থাকার নিয়ম থাকলেও এখন এ নিয়ম পালন করা হয় না।

তবে ছেলেদের বিয়ের পর স্ত্রীর বাড়িতে থাকতে এবং স্ত্রীর পরিবারের দায়িত্ব পালন করতে হয়। গারো সমাজে যদিও মেয়েরা সম্পত্তির মালিক হয়ে থাকে, পুরুষেরা গৃহস্থালী ও সম্পত্তি দেখাশোনা ও সমাজের ভালোমন্দ পরিচালনা করে। এ ব্যাবস্থা গারো নারীদের এক ধরনের নিরাপত্তা প্রদান করে।

গারো সমাজে এক বিবাহ প্রচলিত তবে বহুবিবাহ নিষিদ্ধ নয়। কিন্তু একই গোত্রের মধ্যে বিবাহ নিষিদ্ধ। যেমন একজন চিছাগ গোত্রের মেয়ে চিছাম গোত্রের কোন ছেলেকে বিয়ে করতে পারবে না। আবার মৃ গোত্রের ছেলে মৃ গোত্রের কাউকে বিয়ে করতে পারবে না।

Garo Traditional Dress
নিজস্ব পোশাকে গারো নারী ও পুরুষ, ছবিঃ ইন্টারনেট

ভাষা: গারোদের ভাষার নাম মান্দি ভাষা। অর্থাৎ ‘মানুষের ভাষা’ বাঞলা ভাশাড় মোট মাণ্ডি ভাষাতেও বিভিন্ন ভাগ রয়েছে। যেমন- আচিক, আবেং, আতং, মিগাম, দুয়াল, চিবুক, চিসাক, গারা, রুগা ইত্যাদি।

বাংলাদেশে বসবাসরত গারোরা সাধারনত আবেং, আতং ব্যাবহার করে। আবার ভারতে বসবাসরত গারোদের মধ্যে আচিকের প্রচলন বেশি। মান্দি ভাষায় বর্ণমালা না থাকায় হাজার বছর ধরে গারো ইতিহাস ও সংস্কৃতি পুরুষ থেকে পুরুষে মৌখিক ভাষা ও রীতি পালনের মাধ্যমেই স্থানান্তরিত হয়ে এসেছে।

আবার গারোদের মতে, পূর্বে গারোদের বর্ণমালা ছিল, তবে তা তিব্বত থেকে উপমাহাদেশে আসার পথে হারিয়ে যায়। কাহিনীটা এরকম, গারোরা যখন দুর্ভিক্ষপীড়িত তিব্বত থেকে উপমাহাদেশে আগমন করেছিল তখন যার যার দায়িত্বে পশুর চামড়ায় লিখিত গারো লিপি পুঁথি বা ছিল সেই ব্যাক্তি পথিমধ্যে ক্ষুধার জ্বালায় সেসব পুঁথি খেয়ে ফেলে।

এ ঘটনার অনেক পরে যখন বিষয়টি প্রকাশ পায়, ততদিনে বর্ণমালা হারিয়ে যাই। কারন ওই সময়টাতে গারোদের নিজস্ব অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য বহু যুদ্ধে নামতে হয় এবং এর মধ্যে বর্ণমালা সম্পর্কে অভিজ্ঞ ব্যাক্তিরাও মারা যায়। পরবর্তিতে বর্ণমালা পুনরুদ্ধার করা না গেলেও বর্তমানে অনেকেই নতুন করে উদ্ভাবনের প্রচেষ্টা করছেন।

ধর্ম: বর্তমানে গারোরা অধিকাংশই খ্রীষ্ট ধর্মের অনুসারী। তবে এখনো অনেক গারো গারোদের প্রাচীন ধর্ম ‘সাংসারেক’ পালন করে থাকে।

অবশ্য গারোরা নিজেদের এই প্রাচীন ধর্মকে “দকবিওয়ান” হিসেবে অভিহিত করে। এই ধর্মমতে গারোরা অসংখ্য দেব-দেবী ও প্রকৃতি পূজায় বিশ্বাসী ছিল।

উৎসব ও বাদ্যযন্ত্র: গারোদের সবচেয়ে বড় উৎসব ‘ওয়ানগালা’। ফসল তোলার পর দেবতা সালজং এর উদ্দেশ্যে এ উৎসব নিবেদন করা হয়। গারোদের বিশ্বাস তিনিই প্রকৃতি ও মানব জাতিকে ফুলে ফসলে ও বিত্তে পরিপূর্ন করে তোলেন।

সাধাণত নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে ওয়ানগালা অনুষ্ঠিত হয়। বিশেষ এ উৎসবে ঐতিহ্যবাহী গারো নাচ গানের সাথে সাথে বাজনার তালে তালে চারপাশ মূখরিত হয়ে উঠে। সাধারনত গারো জীবন সংগ্রাম, প্রেম, প্রকৃতির সৌন্দর্য গানগুলোর প্রধান বিষয়। বিভিন্ন সময় গারোরা তাদের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করে থাকে। বাদ্যযন্ত্র গুলোর মধ্যে দামা, আদুরি, দাং, বাংশী, সিংগা উল্লেখযোগ্য।

Garo festival
গারোদের উৎসব, ছবিঃ ইন্টারনেট

অলংকারাদি: গারো সংস্কৃতিতে পুরুষ নারী উভয়েরই অলংকার পরিধানের চল আছে। এ অলংকারগুলো সাধারণত রূপা, বিভিন্ন ধরনের পাথর, কঁড়ি দিয়ে তৈরী করা হয়।

বিভিন্ন ধরনের গারো অলংকারের মধ্যে জাকসান (হাতে পড়ার চুড়ি), রেংমাদু ( গলায় পড়ার জন্য কয়েকস্তরের বিশিষ্ট হারর), সেংকি (কোমরবন্ধনি), জকশিনন (সম্ভ্রান্ত পুরুষের হাতে পড়ার আংটি) নাদারিং উল্লেখযোগ্য।

খাদ্য ও পানীয়: গারোরা সব ধরনের পানীয় গ্রহণ করলেও তাদের মধ্যে প্রধান খাদ্য ভাত। এছাড়া গারোরা শুটকি পছন্দ করে যা তারা নিজেরাই তৈরী করে। উৎসবের সময় গারোরা বিভিন্ন ধরনের পিঠা তৈরী করে থাকে।

তাছাড়া পানীয় হিসেবে ‘চু’ (এক ধরনের মদ) গারোদের উৎসবের অপরিহার্য অংশ। বর্তমানে আধুনিক জীবন যাপনের কারণে এবং কিছুটা অসচেতনতার অভাবে গারো ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি অনেক অংশই হারিয়ে গেছে বা যাচ্ছে।

তবে এটা সুখের বিষয় যে গারোরা নিজেদের ভাষা সংস্কৃতি, অধিকার সংরক্ষনে আগের তুলনায় অনেক সচেতন ও তৎপর হয়েছে।

গারো কৃষিকাজ
গারোদের কৃষিকাজ, ছবিঃ ইন্টারনেট

লেখক: এনি ক্লারা ঘাগ্রা

তথ্যসূত্র: জুম ম্যাগাজিন (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত)

Share:
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - [email protected] এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা

Jumjournal

Administrator

Follow Jumjournal

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *