স্বপ্নহীনদের স্বপ্ন দেখাবে কে?

0
177

আমি প্রায় সময় শুভাকাঙ্ক্ষীদের আমার একটি অনুভূতির কথা বলি- তা হলো ‘আমি জীবনে যা চেয়েছি তার চেয়েও পেয়েছি বেশি’। আমার জীবনে কোন স্বপ্ন ছিল না, স্বপ্ন ছিল আমার স্বর্গীয় বাবার। তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন যে, তিনি যেহেতু বাংলা ভাষা জানতেন না, তাঁর ছেলে-মেয়েরা যেন বাংলা ভাষা জানে। বাংলা ভাষা জানতেন না বলে উৎপাদিত জিনিস পত্র ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে জীবনে অনেক ঠকেছেন বলে তিনি আক্ষেপ করতেন। বাংলা জানলে তাঁর সেই স্বপ্ন নিয়ে আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে আমার স্বর্গীয় পিতা প্রকৃত বিষয় না জানিয়ে আমাকে নতুন প্যাণ্ট-শার্ট, টুপি এবং জুতা কিনে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে কেওকাড়াডং পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত ঘোলাইন পাড়া থেকে একদিন রুমা বাজারে তার সাথে যাওয়া জন্য বলেন। প্রকৃত বিষয়টি হয়তো আমার দাদা-দাদি এবং মা ছাড়া আমাদের ঘরের অন্য কোন ভাই-বোনেরা জানতো না। প্রথম প্রহরে মোরগ ডাকা শব্দে মা ঘুম থেকে উঠে রান্না-বান্না ছেড়ে বাবার বাঁশের থ্রুং-এ ভাতের মোচা ভরে দিল। অত্যন্ত উৎফুল্ল মনে খুব ভোরে শিশির ভেজা পথ পাড়ি দিতে দিতে বাবার সাথে বাজারে রওনা হলাম। মনে মনে খুবই খুশি যে জীবনে প্রথমবার বাজারে যাচ্ছি এবং বাবা নতুন প্যান্ট-শার্ট কিনে দিবেন। প্রায় টানা তিন ঘন্টা আঁকা-বাঁকা ও উঁচু-নিঁচু পথ পাড়ি দিয়ে বাজারে পৌঁছলাম। কোন ক্লান্তিবোধ করি নি। বাবা তাঁর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আমাকে সব কিছু কিনে দিলেন। কিনে দেয়ার পর দুপুর ১টার দিকে এক অচেনা মার্মার বাড়িতে আমাকে রেখে প্রাকৃতিক ডাকে যাবার কথা বলে বাবা উধাও হয়ে গেলেন। বাবার খোঁজে আমি এদিক-সেদিক ছুটাছুটি করছিলাম। কান্না করতে করতে দীর্ঘক্ষন খুঁজা-খুঁজির পরও তাঁকে আর পাওয়া গেল না। মনে হয়েছিল যেন আমি কোন এক ভিন দেশে আসলাম। তখন নিজ ভাষা ‘খুমী’ ছাড়া আর অন্য কোন ভাষা জানতাম না। কখন খাবো, কোথায় ঘুমাবো, প্রাকৃতিক ডাক ছাড়বো কোথায় কিছু চিনতাম না-জানতামও না।

আমার অবিরাম কান্না দেখে সন্ধ্যায় এক বয়স্ক মার্মা নারী আমাকে চকলেট বিস্কুট দিয়ে সান্তনা দিতে আসলেন। তিনি কি বললেন না বললেন কিছুই বুঝি নি। যাই হোক, অন্ধকার নামার পরও যখন বাবাকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না তখন বুঝে নিলাম যে বাবা আমাকে এ মারমার বাড়িতে রেখে পাড়ায় চলে গেছেন। সেদিন রাতে এক মিনিট ও ঘুম হয় নি। শুধু দাদা-দাদীর কথা মনে পড়ছিল। আমি আমার দাদা-দাদীর প্রথম দৌহিত্র। তাঁদের আদর, স্নেহ, মায়া-মমতা আমার মতন অন্য কোন নাতী-নাতনীরা পায় নি। গ্রামে থাকতে প্রতি রাত্রে তাদের কাছে লোক-কাহিনী, ধাঁধাঁ এবং ছড়া গুনতে গুনতে ঘুমাতাম। ছড়া এবং লোক-কাহিনী কে আগে বা পরে আমাকে বলে শুনাবে এই নিয়ে দাদা-দাদী দু’জনের মধ্যে রীতিমত অযথা তর্ক হতো। দাদা-দাদীর অকৃত্রিম ভালবাসা, নির্মল প্রকৃতিতে সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে আপন মনে ঘুরে বেড়ানো অনেক স্মৃতির কথা মনে পড়তে পড়তে কত নির্ঘুম রাত যে কাটিয়েছিলাম ভাষায় বলে বুঝানো যাবে না। ভোর হলে মা-বাবার সাথে জুমে যাওয়া অথবা মাছ ধরা, পশু-পাখি শিকার করাই যার রীতিমত অভ্যাস তাকে সম্পূর্ণ এক নতুন ভিন্ন সমাজে রেখে যাওয়াটা- সে যেন এক বন্য প্রানীকে খাঁচায় বন্দী করে রাখার সামিল। আপন সংস্কৃতি- প্রকৃতিতে বেড়ে উঠা দুরন্ত ৭-৮ বৎসরের ছেলে এক অচেনা-অজানা পরিবেশেই বা কেমন করে ভাল লাগবে। সকালে ঘুম থেকে উঠে বই-খাতা নিয়ে বিদ্যালয়ে যাওয়া যার কোন সহজাত প্রকৃতির মধ্যে পড়ে না। ঐ মারমা বাড়ি ছেড়ে পাড়ায় চলে যাওয়ার কথা অনেকবার ভেবেছিলাম। কিন্তু বাবার পিটুনির ভয়ে পাড়ায় চলে যাবার সাহস করি নি। আমরা সকল ভাই-বোনেরা বাবাকে প্রচুর ভয় পেতাম।

সেই যাই হোক, এভাবে রাতের পর রাত দুঃসহ নির্ঘুম সময় অতিক্রম করার পর একদিন বই-খাতা নিয়ে লজেন্স-বিস্কুট কিনে দিয়ে আমাকে বিদ্যালয়ে নিয়ে গেলেন ঐ মারমা নারী। শ্রেণী কক্ষে ঢুকে অন্যদের অনুকরণ করতে করতে শিক্ষকের সাথে সুর মিলিয়ে তোতা পাখির মত আমিও অ, আ, ই, ঈ……….. বলা শুরু করলাম। এভাবে ৩ বৎসর ঐ রুমা আদর্শ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার পর ১৯৮৮ সালে UNICEF-এর অর্থায়নে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক পরিচালিত রুমা আবাসিক বিদ্যালয় স্থাপিত হলে বাবা সেখানে আমাকে ভর্তি করান। সেখান থেকে আমি মেট্রিক পাশ করি ১৯৯৮ সালে। মেট্রিক পাস করার পর বাবা আমাকে আর লেখা পড়া না করে চাকরী খুঁজতে বলেন। তারা হয়ত ভেবেছিলেন যে তাদের ছেলে যথেষ্ঠ শিক্ষিত হয়েছে। পরিবারের বড় ছেলে হিসেবে ঘর সংসার করে পরিবারের  হাল ধরতে বললেন। মা-বাব দু’জনই চেয়েছিলেন আমি যেন একজন অশিক্ষিত খুমী মেয়ের সাথে সংসার করে আমার সহধর্মীনি যেন তাদেরকে গৃহস্থালী কাজে সহযোগিতা করে। এ পর্যন্তই ছিল তাদের স্বপ্ন। কিন্তু তাদের সেই ইচ্ছা আমি সাথে সাথে প্রত্যাখান করি এবং আমি তাঁদেরকে আমার আরও লেখাপড়া করার ইচ্ছা শক্তির কথা বলি। আমার লেখা পড়ার ইচ্ছা থাকলেও বাবা আমাকে আর্থিক সহযোগীতা দিতে পারবেন না বলে জানিয়ে দেন। দ্বিতীয় বারের মত জীবনে কঠিন সংগ্রাম করার জন্য দৃঢ়চিত্তে মনে মনে শপথ নিলাম। স্বপ্ন দেখতে শুরু করলাম-আমাকে এ শত শত বৎসর ধরে অবহিলিত, বঞ্চিত, শোষিত জাতিগোষ্ঠীরর জন্য কিছু একটা করতেই হবে। উপলব্ধি করলাম যে এ স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হলে পড়া-লেখার কোন বিকল্প নাই। অনেক কঠিন পথ অতিক্রম করে ২০১০ সালে খুমী আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রথম গ্র্যাজুয়েট হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করলাম। নিজের সীমিত জ্ঞান দিয়ে নিজেকে, সমাজকে, পরিবেশ-প্রতিবেশকে , পৃথিবীটাকে এবং বহির্বিশ্বকে জানা-বুঝার চেষ্টা করে যাচ্ছি তখন থেকে।

যখন পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিকতর বঞ্চিত সংখ্যালঘু আদিবাসী জনগোষ্ঠীদের বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে নানান দিক যেমন- রাজনৈতিক বিষয়, আর্থ-সামাজিক অবস্থা, শিক্ষা, ক্ষমতার কাঠামো ও জনগোষ্ঠী ভিত্তিক প্রতিনিধিত্বের সুযোগ, উন্নয়ন কার্যক্রমে অংশীদারিত্ব বা অংশগ্রহণ তথা জাতিগোষ্ঠী ভিত্তিক অবস্থা-অবস্থান নিয়ে বিশ্লেষণ করি-তখন প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে যে জাতিগত বৈষম্য লক্ষ্য করছি তা আমাকে রীতিমত গভীরভাবে ভাবিয়ে তোলে। মাঝে মধ্যে মনে হয় এ স্বাধীন দেশে এ যেন এক অভিশপ্ত জীবন!! এ অভিশপ্ত জীবন থেকে মুক্তি লাভ করতে হলে জাতিগত বৈষম্য দূর করা জরুরী। পার্বত্য চট্টগ্রামের সব প্রতিনিধিত্বমূলক প্রতিস্থানগুলোতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সকল জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধির প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ বাঞ্চনীয়। জেলা পরিষদের অন্তর্বর্তীকালীন গঠনে হোক আর আঞ্চলিক পরিষদের ক্ষেত্রে হোক-এক ভিন্ন জাতিসত্তা অন্য এক ভিন্ন জাতিসত্ত্বার জন্য যৌথভাবে প্রতিনিধিত্ব করার বিষয়টি কতটা যৌক্তিক এবং কে বা কারা কী কী সুফল পেয়েছে তা যখন মূল্যায়ন বা পর্যালোচনা করি তখন অধিকতর সুবিধা বঞ্চিত সংখ্যালঘু আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীদের যে বাস্তবতার চিত্র ফুটে উঠে তা আমাকে খুব বেশি নাড়া দেয়। যাদের প্রতিনিধিত্ব হেডম্যান থেকে রাজা এবং ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ পর্যায় তথা মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী পর্যন্ত আছে- তারা কেন অন্যান্য অধিকতর বঞ্চিত, যাদের গোটা জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে একজন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান প্রতিনিধিও নেই, এমন সংখ্যালঘু ভাই-বোনদের প্রতিনিধিত্বে অংশগ্রহন নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা ভাবছে না তা বোধগম্য নয়। ঔপনিবেশিক শাসনামলে ইংরেজরা যেমন বাংলার সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষা করার চেষ্টা না করে বরং শোষণ করেছিল; তেমনি বাংলার শাসক গোষ্ঠীও সংখ্যালঘুদের আত্মপরিচিতির অস্বীকৃতি দিয়ে বিভিন্নভাবে অধিকার লংঘন করে তাদের স্বার্থ যথাযথভাবে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং হচ্ছে। অনুরূপভাবে, একজন বম বা খিয়াং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে খুমি বা ম্রো জনগোষ্ঠীদের প্রতিনিধিত্ব করলেও বাস্তবতা ভিন্ন। এ ধরনের আলংকারিক প্রতিনিধিত্ব পরস্পরের মধ্যে আস্থাহীনতা এবং বৈষম্য বাড়ানো ছাড়া প্রকৃতপক্ষে কোন সুফল বয়ে আনছে না বলে পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিষয়টি ভুক্তভোগী জাতিগোষ্ঠী ছাড়া কেউ উপলব্ধি করেছেন কিনা জানি না। কোন উন্নয়ন কার্যক্রমে, শিক্ষা-দীক্ষায়, ক্ষমতার কাঠামোসহ সর্বক্ষেত্রে সকলকে নায্যতার ভিত্তিতে অংশগ্রহনের ক্ষেত্র তৈরি করে না দিলে, পরস্পরের প্রতি বৈষম্যমূলক মন-মানসিকতা বা আচরণ পরিহার না করতে পারলে আমাদের অস্তিত্ব, আন্দোলন-সংগ্রামে অনৈক্য দিন দিন বাড়বে এবং সুযোগ-সন্ধানীরা তাদের চিরাচরিত স্বভাবানুযায়ী ষড়যন্ত্রের জাল বুনে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতেই থাকবে। পরিণাম কারোর জন্য সুখকর হবে না। সে হোক সংখ্যালঘু কিংবা সংখ্যাগুরু।

খুমি অলিখিত সাহিত্য অনুযায়ী তারা বাংলাদেশে আট পুরুষ ধরে বসবাস করছে। এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে গোটা একটি জাতিগোষ্ঠী থেকে কেন এখনও একজন মাত্র গ্রাজুয়েট হবে। ভাবতেই খুব কষ্ট লাগে!! কারন এ অধিকতর বঞ্চিত জনগোষ্ঠী যুগ যুগ ধরে জাতিগত বৈষম্যের শিকার না হলে আজ এ অবস্থা হত না। এ জাতিগত বৈষম্য দূরীকরণে সমতার (Equality) ভিত্তিতে নয় নায্যতার (Equity) ভিত্তিতে সকলের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। সংখ্যাগুরু অগ্রজদের আরও উদারতার পরিচয় দিতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের ভিন্ন ভিন্ন আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা অর্জন করার লক্ষ্যে উন্নয়ন পরিকল্পনায় ও কার্যক্রম বাস্তবায়নে এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে সকল জনগোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহন যেন নায্যতার ভিত্তিতে হয় সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

শৈশবে বাবা ঐ মারমা ঘরে আমাকে রেখে যাওয়ার পর যে মারমা নারী চকলেট-বিস্কুট দিয়ে কান্না থামিয়ে আদর, মায়া-মমতা ও ভালবাসা দিয়ে আমাকে বিদ্যালয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন, যিনি আমার আস্থা এবং অশেষ শ্রদ্ধা আজীবন অর্জন করেছেন, আমাদের নিজেদের সার্বিক স্বার্থে ঠিক তেমনি অধিকতর সুবিধা বঞ্চিত সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীদেরও অনুরূপ অকৃত্রিম ভালবাসা দিয়ে পারস্পরিক আস্থা অর্জন করে হাতে হাত-কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অগ্রসর হওয়ার সময় এসেছে। সংখ্যাগুরু অগ্রজদের নৈতিক দায়িত্ব হবে বেঁচে থাকার, টিকে থাকার ও উত্তরণের লক্ষ্যে সংখ্যালঘুদের স্বপ্ন দেখান এবং তা বাস্তবায়নে ‘বিশেষ ব্যবস্থা’ গ্রহণ করা। তবেই আমাদের সকলের চাওয়ার চেয়েও প্রাপ্তি হবে বেশি।


লেখক: লেলুং খুমি, একজন উন্নয়ন ও অধিকারকর্মী, বান্দরবান।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here